ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরিণীতা

১৩তম পর্ব

লেখক: তানজিনা ইসলাম স্রোতিস্বিনী

#পরিণীতা

#পর্ব:১৩

#তানজিনা ইসলাম

প্রিয়ম বেলকনির রেলিঙের সাথে হাত ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে।একটু আগেই গোসল সেরে বেরিয়েছে ও। চুপচাপ তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।চাঁদ উঠেছে আজ।দ্যোতি ছড়াচ্ছে চারিদিকে। একটু আগেই বৃষ্টি থেমেছে।সতেজ, ঠান্ডা হালকা বাতাস বইছে।প্রিয়মের গা ছুয়ে দিচ্ছে তা।চুলগুলো কপালের উপর লেপ্টে আছে ওর।বাইরে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে চিন্তার শেষ নেই প্রিয়মের।প্রাণেশার কষ্ট শান্তি দিচ্ছে না ওঁকে। একটামাত্র বনু ওর।সবসময় যেটা চেয়েছে সেটাই পেয়েছে, সবকিছুর বিনিময়ে প্রিয়ম দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসই তো দিতে পারলো না ওঁকে।প্রিয়মের এসব ভাবনার মাঝেই কেও একজন পেছন থেকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো ওঁকে। প্রিয়ম হকচকিয়ে গেলো।জোড় করেই মানুষটার হাত দু'টো ছাড়ালো ও।পিছনে ফিরে কোমড়ে হাত দিয়ে ছোট ছোট চোখে তাকালো অপর মানুষটির দিকে।আরিশা ফিক করে হেঁসে দেয়।হাসি থামিয়ে ঠোঁট কামড়ে এটিটিউড নিয়ে দাঁড়ায়।প্রিয়ম রেলিঙের সাথে হেলান দিয়ে বুকে দু'হাত গুঁজে দাঁড়ালো। ঠেস মেরে বললো

-"বেয়াদব মহিলা! লজ্জা সরম নাই, এভাবে লুকিয়ে একটা ছেলের রুমে ঢুকিস।আবার অনুমতি ছাড়া জড়িয়ে ধরিস তাকে!"

-"আমার রুম।আমার ফিউচার জামাই।অনুমতি নিব কেন!"

আরিশা ভাব নিয়ে বলে।

-"লুচ্চা রে।লজ্জা সরম কী সব পানিতে ভাসায় দিয়েছিস!যদি কারো চোখে পড়তি!"

প্রিয়ম ভ্রু কুঁচকে বললো।

-"পড়লে পড়তাম।তারপর দু'জনকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিতো। আরো বেশি সুবিধা না।"

প্রিয়ম কান টেনে ধরলো ওর।আরিশা ছটফটিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো নিজেকে।প্রিয়ম ছাড়লো না, শয়তানি হেসে ধরে রাখলো।আরিশা চেঁচিয়ে বললো

-"প্রিয়ম ভাই, ভালো হবে না বলছি।আমার কান ছাড়ো।নয়তো চিৎকার দিবো কিন্তু। তারপর দেখবো সবাইকে কি বোঝাও তুমি!"

প্রিয়ম ছেড়ে দিলো ওর কান।আরিশা কানে হাত দিয়ে ব্যাথা কমানোর চেষ্টা করলো।উত্তাপ ছড়াচ্ছে কান থেকে, আরিশা ব্যাথা অনুভব করলো ভীষণ। ঠোঁট টিপে হাসতে থাকা প্রিয়মের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললো

-"তুমি অনেক খারাপ। কত কষ্ট করে নিজের জীবন বাজি রেখে, লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাকে দেখতে এলাম আমি।আর তুমি আমার কান মুচড়ে দিলা!"

প্রিয়ম একটু এগিয়ে আসলো ওর দিকে।ছোটাছুটি করার ফলে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে আরিশার।প্রিয়ম যত্ন করে চুলগুলো সেট করার চেষ্টা করলো।এক গোছা চুল কানের পিছনে গুজে দিয়ে বললো

-"বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?"

-"তো!" আরিশা চোখ মুখ কুচকে বলে।

প্রিয়ম ওর মুখের অবস্থা দেখে হেসে দেয়।নরম স্বরে বলে

-"আচ্ছা, সরি।কিন্তু দিন দিন শয়তানি বাড়ছে তোর।এভাবে একা একা আমার রুমে আসলি কেন?এভাবে একজন ছেলের রুমে ঢোকা কী ঠিক?"

-"তোমারই তো রুম।তোমার রুমে ঢুকতে সমস্যা কোথায়?"

-"আমি বুঝি ছেলে নই?"

-"সেটা বলিনি তো!তুমি আর অন্য ছেলে এক হলে নাকি!"

-"এক নই?"

-"না তুমি আলাদা।"

প্রিয়ম হেঁসে দিলো।মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো

-"হোস্টেলে এভাবে ফোন দিস কেন?আমার ফোন মাঝেমধ্যে আমার বন্ধু দের কাছে থাকে।তোর মিষ্টি মিষ্টি কন্ঠ শুনে নাম্বার খোঁজে আমার থেকে।অনেকে আবার মজা উড়ায় আমাকে নিয়ে!"

আরিশা দাঁত দিয়ে জ্বিভ কাটলো।কাচুমাচু হয়ে বললো

-"তুমি কী দিয়েছো নাম্বার?"

-"না,দিই নি।কিন্তু তুই বললে দিতে পারি!"

-"না,না। কেন দিবা নাম্বার? আমি তো তোমার সাথে কথা বলার জন্য ফোন দিই।"

-"আমার সাথে কথা বলার দরকার কী?"প্রিয়ম ভ্রু কুঁচকে বললো।

-"তোমার কথা মনে পরে যে খুব।" সহজ স্বীকারোক্তি আরিশার।

-"কেন মনে পরে?"প্রিয়ম ওর চোখে চোখ রেখে বললো।

আরিশা চুপ হয়ে যায়।গলবিল ভেদ করে আর কোনো কথা বের হয়না ওর মুখ দিয়ে।প্রিয়ম তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। অপেক্ষা করে ওর উত্তর শোনার।অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তর পায় না ও।প্রিয়ম ঠোঁট টিপে হাসলো। কৌতুক করে বললো

-"আজ পর্যন্ত একটা কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার সাহস হলো না।সে নাকি আবার আমাকে মিস করে!"

আরিশা মাথা নিচু করে ফেললো। প্রিয়ম ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো

-"আরু!"

আরিশা মাথা তুলে তাকালো ওর দিকে।প্রিয়ম বিহ্বল স্বরে বললো

-"আমাদের বিয়ে হবে তো জান?পরিবার মানবে তো?"

-"এভাবে কেন বলছো,প্রিয়ম ভাই।" আরিশা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো

-"না,এমনিই।দেখছিস না আমার প্রাণেশার অবস্থা। প্রত্যুষ ভাইও ভালো নেই।ভাগ্যটা এমন কেন হলো ওঁদের!"

প্রিয়ম মুখ কালো করে বললো।আরিশার চোখ ভিজে যায় এহেন কথা শুনে।নাক টেনে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো ও।প্রিয়মকে হারানোর কথা ও স্বপ্নেও ভাবতে পারে না!আরিশা ভেজা গলায় বললো

-"না মানলে তুমি বুঝি আমাকে ছেড়ে দিবা?আরেকজনকে বিয়ে করে নিবা?আমি কীভাবে থাকবো প্রিয়ম ভাই!"

প্রিয়ম ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।মিহি স্বরে বললো

-"ধুর পাগলি! ছেড়ে দেওয়া এতো সোজা! দরকার হলে যুদ্ধ ঘোষণা করবো সবার বিরুদ্ধে।তবুও তোকে নিজের করবো।আর যদি জিততে না পারি ওদের বিরুদ্ধে, তবে পালিয়ে যাবো তোকে নিয়ে।পালাবি আমার সাথে?"

-"তুমি যেখানে নিয়ে যাবা,চোখ বন্ধ করে সেখানে চলে যাবো।তবুও তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না আমি।"

বলেই আরিশা জড়িয়ে ধরতে গেলো ওঁকে। প্রিয়ম দুরে সরে গেলো ওর থেকে।আরিশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।প্রিয়ম চোখ মুখ কুঁচকে বললো

-"ঐ বেডি! এভাবে ঝাপায় পরস কেন আমার উপর!লজ্জা সরম কী টোটালি নাই।এখনো বিয়ে হয় নাই আমাদের। কন্ট্রোল কর নিজেকে।"

আরিশা ঠোঁট উল্টালো।বললো

-"কিন্তু আমারতো তোমাকে জড়িয়ে ধরতে মন চাই।"

প্রিয়ম অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো।এই মেয়েকে বোঝানো ওর পক্ষে সম্ভব নয়।লজ্জা সরম সব ভাসিয়ে দিযেছে এই মেয়ে!আফসোস করতে করতে কক্ষের ভেতরে ঢুকলো ও।আরিশা আসলো ওর পিছুপিছু। প্রিয়ম ওর দিকে তাকিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বললো

-"এবার এখান থেকে যা বইন।আর কতক্ষণ আমার রুমে এভাবে কুন্ডলী পাকাইয়া দাঁড়ায় থাকবি!কেও দেখলে রক্ষে থাকবে না আর আমাদের।আমি চাইনা এখন কেও কিছু জানুক।"

আরিশা বললো

-"আরে যাচ্ছি যাচ্ছি। আর আমি কোন জনমের বোন হয় তোমার! হতে চাচ্ছি বউ বানায় দিচ্ছে বোন।" বলেই বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে গেলো আরিশা।

প্রিয়ম যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।মেয়েটাকে কোনো বিশ্বাস নেই ওর!কখন কী করে বসে।ছেলে হয়েও মেয়েটার গতিবিধি ভয় লাগে ওর।মাঝে মাঝে আরিশা এমন এমন কাজ করে বসে!পরিবার, সমাজ নিয়ে যেন কোনো চিন্তায় নেই ওর।কিন্তু প্রিয়মের চিন্তা হয়,অসম্ভব চিন্তা হয় ওর জন্য। মেয়েটা আর বুঝদার হলো না।তবে প্রিয়ম ওর অবুঝ মানুষটাকে আগলে রাখবে।নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আগলে রাখবে।

.

রওশা মলিন মুখে বসে আছে বিছানার উপর। প্রত্যুষ এখনো বাড়ি ফেরেনি সেই যে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো পুরোটা দিন একটুও খোঁজ পায়নি মানুষটার। আজকে পুরোটা দিনই খুব বিশ্রী কেটেছে রওশার। এ বাড়িতে আসার পর পুরোটা দিন তো রিধিতার সাথে গল্প করতে করতেই কেটে যেতো। তারপর যখন আরিশা এলো তখন থেকে ওর আরেকজন বন্ধু হলো। প্রাণেশা তো প্রথম থেকেই কথা বলতো না। ইশ কতটা বোকা ছিলো ও, প্রাণেশার ওর প্রতি এহেন ব্যবহার সত্ত্বেও একবারও বুঝতে পারেনি।একবারো বুঝলোনা যে মেয়েটার ব্যবহার সবার প্রতি এতো অমায়িক তার ব্যবহার ওর প্রতি এমন কেনো। রওশা বড় করে শ্বাস ফেললো। দীর্ঘশ্বাসের পাহাড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।ছোটবেলা থেকে না পাওয়ার আফসোস আর হারিয়ে ফেলার আফসোস নিয়ে জীবন কেটে যাচ্ছে। পুরোটা দিন আজ একা একা কাটিয়েছে ও। রিধিতা, আরিশা একটিবার কথা বলেনি ওর সাথে। একবার ওর পাশে এসে বসেনি পর্যন্ত, খালি দূরত্ব মেইনটেইন করেছে ওর সাথে। রওশা চুল টেনে ধরে বসলো। বিরবির করে বললো

- 'মা' কেনো আমাকে তুমি তোমার সাথে নিয়ে গেলেনা, কেনো এতো অভাগ্য আমার। চাচী ঠিকই বলে মা আমি আসলেই অলুক্ষুনে,অভাগী।'

রওশা একইভাবে বসে থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। দেওয়াল ঘড়ির ডং আওয়াজে ঘোর কাটে ওর।রওশা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুখ মুছে উঠে দাড়ালো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত তিনটা, চিন্তায় রওশার কপাল কুচকে আসে। এতটা রাত হয়ে গেলো প্রত্যুষ এখনো বাড়ি ফিরেনি। রওশা দরজা দিয়ে বেরোতে যাবে তার আগেই কারো পায়ের গটগট আওয়াজে থেমে যায় ও। পিছিয়ে এসে বিছানায় বসে। প্রত্যুষ হন্তদন্ত হয়ে কক্ষের ভেতর ঢুকলো, রওশাকে বিছানার উপরে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বললো

-"একি! এখনো ঘুমাননি আপনি? "

আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। প্রত্যুষ তাচ্ছিল্য হাসলো, বললো আমার জন্য অপেক্ষা করার কোনো দরকার নেই আপনার। অধিকার দেখাতে আসিয়েন না প্লিজ।আমার জীবনবিধি এমনই আপনার জন্য বদলাবে না। বলেই রওশার দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।রওশা অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।মনের অনেক প্রশ্ন মনেই রয়ে গেছে ওর, মুখে আনার সাহস পায়নি। স্ত্রীর অধিকার নিয়ে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলো, এতো রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলো প্রত্যুষ। কেনো এতো রাতে বাড়ি ফিরলো ও। কিন্তু পারেনি প্রশ্নটা করতে, প্রত্যুষ ওকে সেই অধিকার দেয়নি। রওশা বিছানা থেকে বালিশ নিলো ধীর পায়ে হেটে গিয়ে কাউচের উপর ধপ করে শুয়ে পড়লো , কয়েকদিন ধরে এভাবেই থাকছে ও,হয়তো ভবিষ্যতেও থাকতে হবে। যদিও প্রত্যুষ বলেছিলো রওশা যেনো খাটে শোয়। প্রত্যুষ কাউচে শোবে।কিন্তু রওশা কাউচের উপর থাকা বেছে নিয়েছে। মানুষ টার কক্ষে ঢুকে,তারই কোনো জিনিস কেড়ে নিতে চায়নি ও।এমনিতেই তো সব কেড়ে নিয়েছে। ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো রওশা।এভাবেই আরেকটা রাত বুকের দীর্ঘশ্বাসে কেটে যাবে ওর।

মাথার উপর কারো হাতের ছোয়া অনুভব হতেই প্রাণেশার ঘুম ভাঙে। প্রাণেশা চোখ পিটপিট করে খুললো, কেউ একজন যত্ন সহকারে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পুরোপুরি ভাবে ঘুম ভাঙতেই প্রাণেশা পাশ ফিরে তাকালো। প্রাণেশার ছোট মামা ইয়াসির আহমেদকে দেখতেই হাসি ফুটে উঠে ওর মুখে। সেও হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। প্রাণেশা এক প্রকার লাফিয়ে উঠলো, চিল্লিয়ে বললো

- "মামা, তুমি?"

-"ইয়েস প্রিন্সেস আমি।"

প্রাণেশা জড়িয়ে ধরলো ওনাকে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো -"জানো অনেক অনেক মিস করেছি তোমাকে।"

-" আমিও প্রিন্সেস..."

বলেই ছাড়লেন উনি প্রাণেশাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন

-"এসব কি শুনলাম আমি?"

প্রাণেশার হাসি নিভে যায়,তবুও মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে আমতা আমতা করে বলে

-"কী শুনেছো!"

-"চালাকি করছো?"

-"আম্মু তোমাকে এসব বলেছে তাই না?" প্রাণেশা কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো।

-"যেই বলুক তুমি কি মনে করেছো, জানবো না আমি?"

-"কিন্তু তুমি কি করে জানলে?তুমি তো এখানে ছিলে না গুরুত্বপূর্ণ কাজে দেশের বাইরে গিয়েছিলে আসলে কখন?"

-"আমার প্রিন্সেস্টার এই অবস্থা আর আমি ওখানে বসে থাকবো?ইয়াসির আহমেদ ভ্রু কুচকে বলেন।

প্রাণেশা মলিন হাসলো নম্র কন্ঠে বলে

- 'আমি ঠিক আছি মামা, বেঁচে আছি।"

-" ভালো আছো?"

প্রাণেশা উত্তর দেয়না। হাসলেন তিনি, বললেন

-"এসব বাদ দাও প্রিন্সেস, শক্ত করো নিজেকে।এভাবে জীবন থেমে থাকতে পারেনা।"

প্রাণেশা উপর নিচ মাথা নাড়ালো৷ তিনি আবার বললেন

-"এবার খেতে চলতো। তোমার আম্মু ফুলকো ফুলকো লুচি ভাজছে।আমি তোমার সাথে খাওয়ার জন্য না খেয়ে তোমাকে ডাকতে চলে এসেছি। এবার কিন্তু আমার খিদে বাড়ছে তুমি তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও একসাথে ব্রেকফাস্ট করবো আমরা কেমন!"

প্রাণেশা উজ্জ্বল হেসে মাথা নাড়ালো, দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো।

.

রান্নাঘরে মানারা বেগম লুচি ভাজছেন।একবার লুচি বেলছেন আবার তা উত্তপ্ত তেলে ছেড়ে দিচ্ছেন।মালিহা বেগম তরকারি কুটছেন। কয়েকজন সার্ভেন্ট সাহায্য করছেন তাদের। রিধিতা ডাইনিং এ বসে রাহাতকে খাওয়াচ্ছেন একটু পরই প্রহর অফিসের জন্য বেরোবে। রাহাতকে নামিয়ে দেবে ওর স্কুলের সামনে। রওশা নিশ্চুপ কিচেনের সামনে এসে দাড়ালো।খরগোশ পায়ে ঢুকলো কিচেনের ভেতর, সবাইকে কাজ করতে দেখে কুন্ঠিতবোধ করলো কিছুটা। ও নিজেও তো এ বাড়ির বউ তারপরও কাজ না করে গাঁট হয়ে দাড়িয়ে থাকা নিশ্চয়ই মানায় না ওকে। রওশা এগিয়ে গেলো মালিহা বেগমের কাছে। নম্রভাবে ডেকে বললো

-"আম্মু আমি কেটে দেই সবজিগুলো?"

মালিহা বেগম ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন -"উঠে গেছো তুমি? লাগবে না মা আমি কেটে নেবো।"

-"দিন না আম্মু আমি সাহায্য করি।"

মালিহা বেগম নাকোচ করলেন আবার। রওশার জোরাজুরিতে না পেরে বললেন

-"আমার সাহায্য লাগবে না রওশা তুমি বরং তোমার ছোট আম্মুর হাতে হাতে একটু কাজ করে দাও। ওর সাহায্য লাগবে কিনা দেখো।"

রওশা গিয়ে দাড়ালো মানারা বেগমের পাশে।উকি ঝুকি মেরে নম্র কন্ঠে বললো

-"আমি বানাই বাকি লুচি গুলো ছোটমা।"

-"লাগবে না।" মানারা বেগম কাঠ কাঠ স্বরে বললেন।

রওশা আবার বললো

-"আচ্ছা অন্তত বেলে দেই?"

-"সেটারও প্রয়োজন নেই।" অকপট স্বীকারোক্তি।

রওশা তবুও মানলো না।সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মানারা বেগম ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।তাই সে এটা ওটা জিজ্ঞেস করল। সাহায্য করতে চাইলো অনেকভাবে।

মানারা বেগম অতিষ্ঠ হয়ে শব্দ করে বেলন রাখলেন। রওশা চমকে উঠলো। মানারা বেগম কাঠ কাঠ গলায় বললেন

-'তোমার সমস্যা টা কি?কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছো কেন?বলছিনা সাহায্য লাগবে না। তুমি কি বুঝতে পারছো না আমি তোমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারছি না।"

রওশা থতমত খেলো। বিহবল স্বরে বললো

-"আমি কি করেছি ছোটমা? তুমি কেনো রেগে আছো আমার উপর? "

-"আমি তোমার উপর রেগে নেই রওশা। আমি শুধু তোমাকে সহ্য করতে পারছি না। তুমি আর আমার সামনে এসো না। আমি হাত জোর করে বলছি, এতো ভালোবাসা দেখানোর দরকার নেই তোমার।"

রওশা ধাক্কা খেলো যেনো, এতো কটু কথায় চোখে পানি চলে এলো ওর। মালিহা বেগম হতবাক হয়ে তাকালেন নিজের জায়ের দিকে, এতোটা রেগে যেতে তিনি কোনোদিন দেখেননি মানারা বেগমকে। উল্টো সে রেগে গেলে মানারা বেগম সামলাতো তাকে। তাহলে আজ কেন এই রাগ? মালিহা বেগম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন

-"কি হয়েছে তোর? রওশা কি ভুল কিছু করেছে?"

-"কিছু করেনি ও আপা। শুধু আমার থেকে দূরে থাকতে বলো ওকে।মানা করো এতো ভালোবাসা দেখাতে।" মানারা বেগম রাগী স্বরে বললেন।

মালিহা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন ছোট জায়ের দিকে।শান্ত মানুষগুলো সহজে রাগে না কিন্তু রেগে গেলে ভয়ংকর রুপ ধারণ করে। মানারা বেগমের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু তিনি হঠাৎ রেগে গেলো কেনো তা বুঝতে পারছে না মালিহা বেগম। মালিহা বেগম দেনামোনা করে বললেন

-"কিছু একটা তো হয়েছে তোর! নয়তো কোনো কারণ ছাড়া রওশার সাথে এমন কেন করবি তুই?"

মানারা বেগম উত্তর তো দিলেনই না উল্টো গম্ভীর সুরে বললেন

-"ছেলের বউয়ের জন্য কষ্ট লাগছে বুঝি আপা? নয়তো বললাম ওকে তোমার গায়ে লাগলো কেন?"

মালিহা বেগম আতকে উঠলেন যেন উনার কথা শুনে। এবার তিনিও কিছুটা শক্ত কন্ঠে বললেন

-"পাগল হয়ে গেছিস তুই?কী সব আবোলতাবোল বকছিস?"

মানারা বেগম বিচলিত হলেন না।তার বড় জা তাঁকে ধমক দিতেই পারে।বড় হওয়ার অধিকারে শাসন করতেই পারে।কিন্তু তিনি নিজের অভিব্যাক্তি বদলান না।গম্ভীর স্বরে বলেন

-"হয়তো আপা!বাড়িতে যেসব কান্ড-কারখানা ঘটছে তাতে পাগল না হয়ে উপায় কোথায়!"

-"কেন এমন করছিস রে?"মালিহা বেগম হতাশ ভঙ্গিতে বললেন।

-"তুমি বুঝবে না আপা।তোমার নিজের কেও সাফার করছে না।যেদিন নিজের কোনো মানুষকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা সহ্য করতে দেখবা,চোখের সামনে কষ্ট পাইতে দেখবা সেদিন হয়তো বুঝবা কেন আমি আজকে এমন করেছিলাম!

বলেই তিনি লুচির প্লেট হাতে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।পিছনে ফিরে একবার চাইলেন না পর্যন্ত।হয়তো তিনি বুঝতেও পারলেন না, কীভাবে তিনি একটা পরিবারের ভাঙনের সুর বাজিয়ে গেলেন।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন