ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরিণীতা

১৭তম পর্ব

লেখক: তানজিনা ইসলাম স্রোতিস্বিনী

#পরিণীতা

#পর্ব:১৭

#তানজিনা ইসলাম

ফোনের তীব্র ভাইব্রেশনে ঘুম ভাঙলো মুগ্ধর।বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজেই বিছানা হাতড়ে ফোনটা নিলো ও।ঘুমের জন্য চোখ দুটো টেনে খুলতে পারছে না।চোখ বন্ধ করেই ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো ও।ঘুমাচ্ছন্ন স্বরে বললো

-"কে বলছেন?"

পরিচয় না দিয়েই ফোনের ওপাশ থেকে উচ্চস্বরে কয়েকটা বিশ্রী গালি ছুড়লো কেও।মুগ্ধ হকচকিয়ে যায়।ধরফরিয়ে উঠে বসে।ওপাশ থেকে এখনো কন্টিনিউয়াসলি গালাগালি করে যাচ্ছে ওকে।চোখ কচলে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকালো মুগ্ধ।স্ক্রিনে বড় বড় করে লিখা 'তাজিম'।বার কয়েক পলক ফেললো মুগ্ধ। ফোনটা আবার কানের মধ্যে সেটে ধরে হরবর করে বললো

-"কীরে বিয়াদব, গালি দিচ্ছিস কেন?শিক্ষা-দিক্ষা নেই নাকি,যে সকালে উঠে প্রার্থনার বদলে গালি চর্চা করছিস?"

-"নাটক করো তুমি আমার সাথে!সকাল বাজে ন'টা এখনো পরে পরে ঘুমোচ্ছিস,আর এদিকে আমরা খেটে মরছি।এখনতো আবার বিরোধী দলের মারও খাচ্ছি।"

নড়েচড়ে বসলো মুগ্ধ। উত্তেজিত স্বরে বললো

-"কী হয়েছে দোস্ত!সব ঠিক আছে তো?"

-"কিচ্ছু ঠিক নেই।মারপিট লেগেছে অনেক খারাপ ভাবে।সৌরভ সরদারের দলের ছেলেরা আক্রমণ করেছে আমাদের উপর।ইতোমধ্যে অনেকেই আহত।পরিস্থিতি কোনোমতেই সামাল দিতে পারছি না আমি।"

চেচামেচির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ফোনের ওপাশ থেকে।ছেলেদের চিৎকার, লাঠির শব্দ আর গাড়ির হর্ণে জগাখিচুরি শব্দ। মুগ্ধর বুকটা ধ্বক করে উঠলো।আতঙ্কিত গলায় বললো

-"তুই ঠিক আছিস তো?"

-"ঠিক আছি আপাতত। কিন্তু কতক্ষণ ঠিক থাকবো বলতে পারছি না।তুই তাড়াতাড়ি স্পটে আয়।"

মুগ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই ওপাশ থেকে ফোন কেটে গেলো।তড়িৎ গতিতে বিছানা ছেড়ে নিচে নামলো ও।দ্রুত পায়ে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো। তড়িঘড়ি করে বেরোতে দেখে কিচেন থেকে চটজলদি বের হয়ে আসলেন শানজানা বেগম।খুন্তি উচিয়ে বললেন

-"না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই?"

-"অনেক বড় সমস্যা হয়ে গেছে মা।বাইরে থেকে খেয়ে নিব কিছু।"

বলেই ছুট লাগালো মুগ্ধ। পিছন থেকে শানজানা বেগম অনেক কিছুই বললেন।কিন্তু তা কানে গেলো না মুগ্ধর।

ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে নির্বাচনের জায়গায় এসে থামলো মুগ্ধ।দ্রুত পায়ে নিচে নেমে ছুট লাগালো ভিতরে।এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আশেপাশে তাকালো ও।হন্যে হয়ে খুঁজলো তাজিমকে।পরিস্থিতি শান্ত দেখাচ্ছে,ভোট প্রদানের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। মুগ্ধর কপাল কুঁচকে আসে।যেভাবে বলেছিলো তাজিম,তার উপর যেসব শব্দ শুনতে পেয়েছে তার কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না।

এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কিছুদুর এগিয়ে টিন শেডের একটা ঘরের ভিতর ঢুকলো ও।মুগ্ধর ভাবনা সঠিক হলো,এখানেই আছে সবাই।সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো মুগ্ধ। তাজিম কথা বলছিলো সবার সাথে। ওঁকে দেখতেই চিবিয়ে চিবিয়ে বললো

-"আরে রাজা মশাই এসেছে যে!কেও তার সেবার ব্যবস্হা করো।"

মুখ বাকালো মুগ্ধ।চেয়ারের পাশাপাশি, স্কুলের বেঞ্চের মতো বেঞ্চ ছিলো কয়েকটা। এক লাফে আপ্পার বেঞ্চের উপর উঠে বসলো মুগ্ধ। পা নাড়তে নাড়তে বললো

-"সবতো ঠিকিই আছে দেখছি!সকাল সকাল ফোন করে এভাবে ভয় দেখালি কেন!"

তাজিম তেড়ে গিয়ে কিল মারলো মুগ্ধর পিঠে।ফুঁসতে ফুঁসতে বললো

-"শয়তান!এতোক্ষণে আসার সময় হয়েছে।কয়জন আহত হয়েছে জানিস!এসে বড় বড় লেকচার মারছিস যে!কীভাবে মার খেয়েছি আমরা!"

চোখমুখ কুঁচকে তাকালো মুগ্ধ। থাপ্পড়ে জোড় ছিলো ভীষণ।

তবুও দমলো না মুগ্ধ। ব্যঙ্গ করে বললো

-"মার কেনো খেয়েছো বেবি!ওরা যখন মারছিলো, তুমি হাতে চুড়ি পরে বসে ছিলে নাকি!"

আবার তেড়ে গেলো তাজিম। হিসহিসিয়ে বললো

-"এই বেয়াদব!চুড়ি পরে ঘরে তুই বসে ছিলি,আমি না।ওরা পাঁচটা মারলে আমরা পঞ্চাশ টা ফিরিয়ে দিয়েছি।"

মুগ্ধ দৌড় দিলো।সাথে ন্যাকা কন্ঠে বললো

-"বাঁচাও আমাকে।বাঁচাও কেও।"

রুমের বাইরে বেরোনোর আগে ব্রেক কষলো মুগ্ধ। সাথে থেমে গেলো তাজিম ও।প্রাণেশা বুকের সাথে দু-হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়ালো। গম্ভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ওঁদের দিকে।মুগ্ধ কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ালো।আমতা আমতা করে বললো

-"আরে তুই!আমরা তো দৌড় দৌড় খেলছিলাম।তুই খেলবি?"

প্রাণেশা ওর পাশ কাটিয়ে ভেতরে আসলো।নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এসে বসলো চেয়ারের উপর। তাজিম অভিযোগের সুরে বললো

-"কিছু বলবি না তুই ওঁকে!এতো দেরি করে এলো যে।"

-"বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করা বন্ধ কর।"বিরক্তির সুরে বললো প্রাণেশা।

মুগ্ধ সবার সাথে এসে বসলো।সাথে তাজিমও।মুগ্ধ এবার সিরিয়াস হলো।চিন্তিত স্বরে বললো

-"সৌরভ সরদার যে এমন বাচ্চাদের মতো কাজ করবে ভাবতে পারিনি!শুধু আজকে জিততে দে,সব কটারে কুত্তা মারা মারবো।"

-"বাচ্চাদের মতো কাজ না, প্ল্যান করেই এগিয়েছে। রক্তের বন্যা বয়ে আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিলো।"

তাজিম মুখ গোমরা করে বললো।হাসলো মুগ্ধ।তাচ্ছিল্য করে বললো

-"বেচারা গুলা!আমাদের কাঁপাতে এসেছিলো,নিজেরাই কেঁপে চলে গেলো।"

হেসে দিলো সবাই।মুগ্ধ তাকালো প্রাণেশার দিকে।একটা সাদা সালোয়ার পরেছে ও।কানে পুতির মতো ছোট ছোট দুল। কোমড় সমান চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া।মুখে কৃত্রিম কোনো সাজসজ্জা নেই,তবুও স্নিগ্ধ,মায়াময়।

সবাই হাসলেও প্রাণেশার মুখে হাসি নেই।মুখ গোমড়া করে বসে আছে ও।দীর্ঘশ্বাস ফেললো মুগ্ধ।হাসিটা খুব কমই দেখা যায় ওর মুখে।আঠারো বছরের প্রাণেশা চব্বিশ বছরে পদার্পণ করেছে।ছয়টা বছর কেটে গেছে জীবন থেকে।তবুও যেন প্রাণেশা আটকে আছে সেই দিনটাতে।

কেটে গেলো অনেকটা সময়।দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।একটু পরেই নির্বাচনের ফলাফর ঘোষণা করা হবে।দলের সবাই চিন্তিত। মুগ্ধ আর তাজিম গালে হাত দিয়ে এতিমের মতো বসে আছে টিন শেডের ঘরটাতে।জুনিয়র একটা ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসলো ওদের কাছে।হকচকিয়ে গেলো দুজন।মুগ্ধ আতঙ্কিত হয়ে বললো

-"কিছু কী হয়েছে?এভাবে দৌড়ে আসলে কেন?"

-"আমরা জিতে গেছি ভাই। আমরা জিতে গেছি।"

খুশিতে লাফিয়ে উঠলো তাজিম।মুগ্ধর অপেক্ষা না করেই দৌড় দিলো বাইরে।মুগ্ধ হাসিমুখে বের হলো ছেলেটার সাথে।প্রাণেশা দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাঝখানে।ফোনে কথা বলছে কারো সাথে।মুগ্ধ দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো ওঁকে। প্রাণেশা পরতে পরতে সামলালো নিজেকে।হতভম্ব হয়ে বললো

-"কীরে!"

মুগ্ধ ছাড়লো ওঁকে । উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো

-"আমরা জিতে গেছি সভাপতি ম্যাডাম।"

প্রাণেশা হাসলো।ওর বাহুতে হাত ঠেকিয়ে বললো

-"হ্যাঁ, জানি।সেটাই বলছিলাম মামাকে।"

-"পার্টি হবে আজকে ব্রো।অনেক উড়েছে সৌরভ সরদারের পাখিগুলা।ডানা কাটার সময় চলে এসেছে।"

.

যুক্তরাজ্য ও ইংল্যান্ডের রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর লন্ডন।বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর বলেও খ্যাত শহরটি । ডিসেম্বর বিধায় শীতের মৌসুস চলছে।

সেন্ট থমাস হসপিটাল,লন্ডনের একটি প্রাচীন হাসপাতাল।হৃৎরোগের জন্য শহরটিতে একটি বিখ্যাত হাসপাতালও বলা যায়।নার্সরা দফায় দফায় দৌড়াদৌড়ি করছে মেডিসিন নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই একটা হার্টের পেশেন্ট এসেছে মুমূর্ষু অবস্থায়। বাঁচা-মরার মাঝখানে ঝুলে থাকার মতো অবস্হা তার।ইনায়া নামের একজন নার্স দৌড়ে এলো কাউন্টারে।কাঠকাঠ ইংরেজিতে হরবর করে বললো

-"ইমার্জেন্সি! এক্ষুনি যদি হার্টের সার্জারী করা না যায় তাহলে পেশেন্ট বাঁচবে না।একজন ডক্টর ইমিডিয়েটলি প্রয়োজন।"

-"সরি,বাট। আজকে কোনো হার্ট স্পেশালিষ্ট উপস্থিত নেই।বেশিরভাগ ডক্টর বড় দিনের ছুটিতে বাইরে আছে।"

কাউন্টারে বসা মেয়েটি তার নরম গলায় বললো।

ইনায়া দিশেহারা হলো।একপ্রকার চিৎকার করে বললো

-"তাহলে,কী বলতে চাও পেশেন্ট চিকিৎসার অভাবে মারা যাক!তাও আমাদের হসপিটালে এসে।"

কাউন্টারে বসা মেয়েটির মুখ ছোট হয়ে এলো।তার ই বা কী করার আছে!ডক্টরই না থাকলে সার্জারী করবে কে!

ওঁদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সিনিয়র একজন নার্স দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসলেন।কপালে ভাজ ফেলে বললেন

-"কী সমস্যা তোমাদের? এভাবে চেচামেচি করছো কেন?"

ইনায়াসহ কাউন্টারে বসা মেয়েটি ঘুরে তাকালো বয়স্ক পঞ্চাশোর্ধ নার্সটির দিকে।জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নার্সটি।মুখে পৌঢ়ের ছাপ স্পষ্ট থাকলেও শরীরের গঠনে মনে হবে এখনো সদ্য যুবতী।ইউরোপ কান্ট্রি গুলোতে সিনিয়রদের মা-বাবার চেয়েও বেশি সম্মান দেওয়া হয়।তাই ইনায়া বিনয়ের সাথে এগিয়ে এলো।নম্র স্বরে বললো

-"আলিশা ম্যাম।অনেক বড় সমস্যা হয়ে গেছে।পেশেন্টের অবস্থা অসম্ভব খারাপ। কিন্তু বেশিরভাগ ডক্টর ছুটিতে।"

-"ক্যাসটা কী?"

-"হার্টের প্যাশেন্ট।এই নিয়ে তিনবার হার্ট অ্যাটাক করেছেন তিনি।"

আলিশা চিন্তিত বদনে মাথা নাড়লো।কাউন্টারে বসা মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললো

-"তুমি একটু চেক করে বলতো, কোনো ডক্টর ই কী নেই! খ্রিষ্টান ডক্টর রা ছাড়া তো সবাই ছুটিতে থাকার কথা না।"

-"ম্যাম,ডক্টর প্রট্যুষ এখনো প্রস্হান নেননি।হসপিটালে হার্ট সার্জেন হিসেবে এইমাত্র শুধু তিনিই উপস্থিত আছেন। কিন্তু ওনার ডিউটি শেষ!"

-"ডক্টর দের ডিউটি শেষ হয় না কখনো।ইনায়া ডেকে নিয়ে আসো ডক্টর কে।"

ইনায়া নড়লো না,গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।ওঁকে অনড় দেখে আলিশা বললো

-"কী হলো! তোমাকে না বললাম,ডক্টর কে ডেকে নিয়ে আসতে।"

-"সরি ম্যাম।কিন্তু আমার ভয় লাগছে। ডক্টর প্রট্যুষ অনেক রাগী। এখন ওনার ডিউটি শেষ। আমি গেলে নিশ্চয়ই ধমক খাবো।"

ইনায়া ভয়ার্ত কন্ঠে বললো।আলিশা বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে।কন্ঠে বিরক্তি এনে বললেন

-"এখন তুমি ধমক খাওয়ার ভয়ে ডাকতে যাবে না ওনাকে,আর পেশেন্ট মরে যাক! এটা চাও তুমি।"

ইনায়া দুপাশে মাথা নাড়লো।কাউন্টারের মেয়েটি মৃদু গলায় বললো

-"আমার মনে হয় না উনি আসবেন ম্যাম!হি ইজ অ্যা হার্টল্যাস।ওনাকে হসপিটালের ব্যাস্ট হার্ট সার্জেন বলা হলেও, ওনার নিজেরই হার্ট নেই।"

আলিশা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন মেয়েটির দিকে।কন্ঠে গাম্ভীর্যতা এনে বললেন

-"ডক্টরদের ধর্মই হচ্ছে মানুষের সেবা করা।সে হার্টল্যাস হোক আর যাই হোক আমার মনে হয় না একজন পেশেন্ট মরতে বসেছে, সেখানে তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন।তোমরা যখন কেউই যেতে পারবে না।আমিই ডেকে নিয়ে আসছি ওনাকে!"

বলেই গটগট করে চলে গেলেন আলিশা।কাউন্টারের মেয়েটি বিরবির করে ইনায়াকে বললো

-"আমি লিখে দিচ্ছি ডক্টর প্রট্যুষ আসবেনা।আলিশা ম্যাম শুধু শুধু নিজের শক্তি খরচ করতে গেছে।"

ইনায়া সায় জানিয়ে মাথা নাড়লো ওর কথায়।

.

চেম্বারে বসে থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে বসে আছে প্রত্যুষ।গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে টেবিলের উপর রাখা ফাইলগুলো।কয়েকজন পেশেন্টের ফাইল জমা থেকে গেছিলো,সেগুলো দেখতে দেখতে এতটা সময় পেরিয়ে গেছে।একহাতে চশমা খুলে টেবিলের উপর রাখলো প্রত্যুষ।নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস টানলো।বড়ই ক্লান্ত লাগছে আজ।আঠারো ঘন্টার অক্লান্ত ডিউটি।ব্যস্ততার নিমগ্নে অসুস্থ হওয়ার অবস্থা। এতোক্ষণ বাহিরে যেন সুনামি বয়ে যাচ্ছিলো।কোলাহল আর চিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে উঠছিলো।প্রত্যুষ তবুও বের হয়নি।নিজের ডিউটি শেষ হলে আর কোনো কিছুই কর্ণকুহরে নেয় না সে।তবুও এটাই স্বাভাবিক। এখান হতেই জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা দেওয়া হয়।নতুন কেও আসে নয়তো বিদায় নেয় পৃথিবী থেকে।সাধারণ মানুষদের এসবে বুক কাঁপলেও, ডক্টর রা এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত।তাদের কাছে স্বাভাবিক এসব।দরজায় টোকা পরতেই ভাবনার ছেদ ঘটলো ওর।বাইরে থেকে কেও বললো

-"মে আই কাম ইন?"

সোজা হয়ে বসলো প্রত্যুষ।চুলগুলো পেছনে ঠেলে গম্ভীর স্বরে বললো

-"কাম।"

মৃদু পায়ে কক্ষে ঢুকলো আলিশা।প্রত্যুষ তার দিকে তাকিয়ে বললো

-"এনি প্রবলেম?"

আলিশা তার কাঠকাঠ ইংরেজিতে বললো

-"একজন হার্টের পেশেন্টের অবস্থা খুবই খারাপ পর্যায়ে।যদি এখনই অপারেশন করা না যায় তাহলে বাঁচবে না।"

-"সো স্যাড।তাড়াতাড়ি ওটি রেডি করুন।সার্জারী করবে কে?"

-"বেশিরভাগ ডক্টর বড়দিনের ছুটিতে আছেন।আপনি ছাড়া আর কোনো হার্ট সার্জেন উপস্থিত নেই।অপারেশন টা আপনাকেই করতে হবে স্যার।"

আলিশা মিনমিন করে বললো।প্রত্যুষ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।কন্ঠে গাম্ভীর্যতা ঢেলে বললো

-"আমার ডিউটি শেষ।আজকে দু'টো অপারেশন করেছি আমি। আর সম্ভব না।অন্য ডক্টর খুঁজুন। আরেকটু পরেই বেরোবো আমি।"

-"স্যার প্লিজ।পেশেন্ট বাঁচবে না।"

-"ইট’স নট মাই রেসপন্সিবিলিটি।আমার কাজ শেষ।"

আলিশা মুখ কালো করে ফেললো।

-"বেরোন।"

প্রত্যুষের ঠান্ডা স্বর।আলিশা মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো প্রত্যুষ।বিরস ভঙ্গিতে পরণের কুঁচকানো শার্ট ঠিক করলো।কালো রঙের ব্যাগের ভিতর অ্যাপ্রোন, স্টেথোস্কোপ সহ নিজের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সবকিছু ঢুকিয়ে নিলো।টেবিলের উপর থেকে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে, বেরিয়ে পরলো চেম্বার থেকে।একটা কেবিনের সামনে আসতেই দেখতে পায় ছোটখাটো ভীড়।ভীড়ের মাঝে সিরিয়ালে রাখা চেয়ারের উপর একজন সাদা চুলের কিশোরী মাথা নুইয়ে বসে আছে।হাটু পর্যন্ত একটা ফ্রেক পরে আছে সে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে।আচ্ছা! কে মেয়েটা!মুমূর্ষু রোগীটার কোনো আত্মীয়? যে তার আপনজন হারানোর ভয়ে এভাবে কাঁদছে! প্রত্যুষের বুক ধ্বক করে উঠলো।স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে চোখে ভাসলো সদ্য কিশোরে পা দেওয়া কোনো কিশোরীর হাসি হাসি মুখ।যে মুখটা ছিলো ওর সবচেয়ে প্রিয়,সবচেয়ে পছন্দের। প্রত্যুষ আগালো না আর।পিছু ফিরে হন্তদন্ত হয়ে চেম্বারে গিয়ে ঢুকলো।কাঁধের ব্যাগটা টেবিলে রেখে সবকিছু বের করলো। অ্যাপ্রোন টা গায়ে গলিয়ে,স্টেথোস্কোপ গলায় জড়িয়ে দ্রুত পায়ে বের হলো চেম্বার থেকে।

আলিশা,ইনায়া আর কয়েকজন নার্স বিরসমুখে দাঁড়িয়ে ছিলো। কথা বলছিলো নিজেদের মধ্যে।ইনায়া হতাশ শ্বাস ফেলে আলিশা কে বললো

-"বলেছিলাম, প্রট্যুষ স্যার আসবে না।পেশেন্ট টা মরে গেলেও আসবে না।হি হেজ নো ইমোশোন।"

আলিশা মুখ কালো করে দাঁড়ালো।

আর তখনই প্রত্যুষ দ্রুত পায়ে এসে কেবিনে ঢুকলো।গলার স্বর উচিয়ে ওদের বললো

-"ওটি রেডি করো,ফাস্ট।"

নার্সরা হা হয়ে তাকালো সেদিকে।ইনায়া হতভম্ব হয়ে আলিশা কে বললো

-"হাউ!কীভাবে কনভিন্স করলেন ম্যাম।"

-"নো আইডিয়া।এখন এসব কথা বাদ দাও।কাজে লেগে পরো সবাই।"

নার্সরা সবাই সাই জানালো।ছুট লাগালো নিজেদের কাজে।

.

রাত্রির দ্বিপ্রহর।নিকষ কালো আধারে ছেয়ে আছে চারপাশ।ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। কুয়াশায় ঘেরা চারিদিক।মাঝে মাঝে ঝোপের আড়াল থেকে দল বেঁধে জোনাকি পোকার দেখা মিলছে।যদিও এখন আর অতটা জোনাকি পোকা দেখা যায়।সব কালের বিবর্তনে,বড় বড় দালানের আড়ালে হারিয়ে গেছে। তবুও গ্রাম-গঞ্জে এখনো জোনাকির দেখা পাওয়া যায়। গা - কাঁপানো ঠান্ডা ,উত্তরীয় বাতাস বয়ছে।শীতের আদ্রতা গায়ে মাখিয়ে পিছঢালা রাস্তার উপর হেঁটে চলেছে প্রাণেশা।দলের ছেলে,মেয়েরা বিজয়ের আনন্দে হৈ-হুল্লোড় আর নাচ-গানে মেতেছে। প্রাণেশাও এতোক্ষণ ওঁদের সাথেই ছিলো।কিন্তু কখন যে ওঁদের গ্যাং ছেড়ে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে এতো দূর চলে এসেছে তা টেরও পায়নি প্রাণেশা।শান্ত চোখে আশেপাশে তাকালো প্রাণেশা।কুয়াশায় ঘেরা নিস্তব্ধ, স্নিগ্ধ পরিবেশের সাথে রাতের আধারে ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্য দেখাচ্ছে। আশেপাশে মানুষ তো দুরের কথা কোনো অবলা প্রাণী কেও দেখা যাচ্ছে না।হাঁটতে হাঁটতে দাড়িয়ে পড়লো প্রাণেশা।গায়ের উষ্ণ জ্যাকেট টা আরেকটু নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো। জ্যাকেটের পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করলো।মুখে দিয়ে বিষাক্ত টান দিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ কালো প্রলেপে ঢাকা আকাশের দিকে।আজ আকাশে কোনো তারা নেই আর না চন্দ্র তার দ্যুতি ছড়াচ্ছে।আজ কী অমাবস্যা!

আকাশের দিকে নিষ্পলক তাকিয়েই মুখ দিয়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ছাড়লো প্রাণেশা।

গিটারের সুর কানে আসতেই আশেপাশে তাকালো ও।এই রাত-বিরেতে গিটার বাজাচ্ছে কে?ভুত!ভাবতেই হাসলো প্রাণেশা।কখন থেকে ভুতের ভয় পাওয়া শুরু করলো ও!যখন ছোট ছিলো তখন ভয় পেতো।কিন্তু যখন থেকে মানুষের আসল চেহারা চেনা শুরু করলো তখন থেকে মনে হলো মানুষের চেয়ে ভয়ঙ্কর এই দুনিয়ায় আর কিছুই নেই।সেখানে ভুত তো অতি নগন্য! গিটারের সুর ধরে হাটা শুরু করলো প্রাণেশা।বট গাছের সামনে যেতেই পা থেমে যায় ওর।

যদি তুমি ভালোবাসো ভালো করে ভেবে এসো

খেলে ধরা কোনো খানে রবে না।

আমি ছুঁয়ে দিলে পরে অকালেই যাবে ঝরে

গলে যাবে যে বরফ গলে না।

আমি গলা বেঁচে খাবো গানের আশে পাশে রবো

ঠোঁটে ঠোঁট রেখে কথা হবে না।

কারো একদিন হবো কারো এক রাত হবো

এর বেশি কারো রুচি হবে না।

আমার এই বাজে স্বভাব কোনোদিন যাবে না

আমার এই বাজে স্বভাব কোনোদিন যাবে না।

মগ্ন চিত্তে মুগ্ধ হয়ে শুনলো প্রাণেশা।বট গাছের গুড়ের পর একজন যুবক বসে।হাতের গিটারে সুর তুলে পুরুষালি গলায় মনোহর গেয়ে চলেছে।সামনে কয়েকজন পথশিশু সারিবদ্ধ বসে আছে। গান শেষ হতেই তালির ঝঙ্কার তুললো ওঁরা। প্রাণেশার ভাবনায় ছেদ ঘটে।যুবকটি গিটার হাতে উঠে দাঁড়ালো।হাসিমুখে সবার হাতে হাতে চকলেট দিলো।পথশিশু রা সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে।

প্রাণেশা নিজের আধখাওয়া সিগারেট নিচে ফেললো।কেডস দিয়ে পিষে মাড়ালো মাটির সাথে।

-"মিস।"

প্রাণেশা চকিত দৃষ্টিতে তাকালো সামনে।সামনের সে জন মুচকি হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে।প্রাণেশা বিহ্বল দৃষ্টি ফেলে তাকালো।যুবকটি ওর দিকে একটা ক্যাটবেরী এগিয়ে দেয়।প্রাণেশা হাত বাড়িয়ে নিলো,কাঠকাঠ গলায় বললো

-"চকলেট কেন?"

সে মুচকি হাসলো।নম্র গলায় বললো

-"এমনিই।বেবি দের কে দিচ্ছিলাম।"

-"আমি তো বেবি নই।"

আবার মুচকি হাসলো সে।বললো

-"কিন্তু দুর থেকে আপনাকে দেখে আমার বেবিই মনে হচ্ছিলো।যদিও আপনি বেবিদের মতো কাজ করছিলেন না।"

বলেই ঠোঁট বাঁকা করে হাসলো সে।প্রাণেশা গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে।বুঝলো সিগারেট খাওয়া টা দেখে ফেলেছিলো ছেলেটা,আর সেটা ইঙ্গিত করই পিঞ্চ মারছে।ফোঁস করে শ্বাস ফেললো প্রাণেশা।কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো

-"থ্যাংক্স।"

-"এতো রাতে এখানে কী করছেন মিস!"

-"কেনো কোনো সমস্যা? "ভ্রু কুঁচকে বললো প্রাণেশা।

"-জায়গাটা ভালো না।কাছেই নির্বাচনের কাজ চলছে।কখন কী সমস্যা শুরু হয়।বাড়ি চলে যান।"

প্রাণেশা ঠোঁট গোল করে 'ও' বোঝালো। বললো

-"আমি আসলে জানতাম না।"

-"এখন তো জানলেন।চলে যান।"

প্রাণেশা পিছন ফিরে পা বাড়ালো।পিছনে তাকাতেই হাত দিয়ে 'বাই' জানালো সে।প্রাণেশার হাসি পেলো।একজন অপরিচিত মানুষকে এভাবে বিদায় জানানো এই প্রথম দেখলো প্রাণেশা।কিছু একটা ভেবেই দুর থেকে প্রশ্ন ছুড়লো

-"নাম কী আপনার?"

-"নাম দিয়ে কাম কী?এতো বড় গ্রামে আপনার সাথে আর দেখা হওয়ার চান্স নেই আমার।"

-"তবুও! পৃথিবী টা গোল কোথাও না কোথাও আপনার সাথে দেখা হয়েও যেতে পারে।"

হাসলো সে।ছেলেটা শুধু কথায় কথায় হাসে,ভাবলো প্রাণেশা।একটু দুরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো প্রাণেশা।সে পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো ওর কাছে।মিষ্টি হেঁসে বললো

-"আমি উচ্ছ্বাস।"

-"শুধুই উচ্ছ্বাস?"ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো প্রাণেশা।

-"উচ্ছ্বাস শাহিরিয়ার।"

#চলবে

(ছয়টা বছর কেটে যাওয়ার পরও যারা যারা বলবেন গল্প আগাচ্ছে না,তাদের জন্য লাল সালাম।আর আল্লাহর ওয়াস্তে প্রত্যুষ-প্রাণেশার মিল চাই এই কনসেপ্ট বন্ধ করেন।পরের পর্বে অনেকের হার্ট ব্রেক হবে।আগেভাগে সাবধান করে দিলাম।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন