#পরিণীতা
#পর্ব: ১৮
#তানজিনা ইসলাম
হসপিটাল থেকে বেরিয়ে পার্কিং লটে এসে দাঁড়ালো প্রত্যুষ।প্রতিবারের মতো এবারেও ব্যর্থ হয় নি সে,অপারেশন সাকসেসফুল। ধীর গতিতে গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো সে।সন্ধ্যা তার চির চেনা রূপে আলো আর আধারের মিশেলে।গুড়ি গুড়ি তুষারপাত শুরু হয়েছে গতরাত থেকে।পেঁজা তুলোর মতো শুভ্র,নরম তুষারের কুঁচি অবিরত ঝড়ে পরেছে।ড্রাইভিংয়ের মাঝেই প্রত্যুষ জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি তাক করলো।ব্যস্ত জনজীবন। রাস্তা দিয়ে সবাই সোয়েটার, মাফলার আর টুপি পরে নিজেদের বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত।ছোট ছোট বাচ্চারা ছুটোছুটি করে পার্কে বা খালি জায়গায় স্নো ম্যান বানাচ্ছে। অনেকেই আবার বড়দিন উপলক্ষে ক্রিসমাস ট্রি সাজাচ্ছে।মুচকি হাসলো প্রত্যুষ।আশেপাশের সবকিছুই নতুন করে সজ্জিত করতে ব্যস্ত সবাই।ভালো লাগছে দেখতে।জানালা দিয়ে হুড়মুড় করে ঠান্ডা, স্নিগ্ধ বাতাস প্রবেশ করছে।কপালের উপর পরা ছোট ছোট চুলগুলো উড়ছে প্রত্যুষের।একহাতে জ্যাকেটের হ্যাডটা তুললো ও।এই ভর সন্ধ্যায় গান শুনে সময়টা কাটালে মন্দ হয় না।ড্রাইভিং করতে করতে মিউজিক শোনার ইচ্ছে পোষণ করলো সে। ভলিউম বাড়াতেই সুক্ষ স্বরে নারী কন্ঠে ভেসে আসলো রবীন্দ্র সংগীত
তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে আর কিছু নাহি চাই গো
আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো
আমার পরান যাহা চায়, তোমা ছাড়া আর এ জগতে
মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো আমার পরান যাহা চায়
তুমি তাই, তুমি তাই গো আমার পরান যাহা চায়।
গানের সুরে সুরে ঠোঁট মেলায় প্রত্যুষ।দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিয়ে এসে থামে একটা ডুপ্লেক্স হাউজের সামনে।ক্লান্ত ভঙ্গিতে নিচে নেমে সদরদরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ও। মিনিটখানেক বেল বাজানোর পর অবশেষে বাড়ির একজন সার্ভেন্ট এসে দরজা খুলে। লেইট হওয়ার দরুন বিনীত ভঙ্গিতে সরি জানায় প্রত্যুষকে।প্রত্যুষ গম্ভীর স্বরে 'ইট’স ওকে' বলে বাড়ির ভেতর ঢুকলো।কাঁধ ব্যাগটা সোফার উপর রেখে পরণের জ্যাকেট খুলে, টেনেটুনে শার্টের কয়েকটা বোতাম খুললো।আলসে ভঙ্গিতে এসে নিজেও বসলো সোফার উপর।ও বসতেই কেও একজন পা দু'টো জড়িয়ে ধরে ওর।প্রত্যুষ চমকে নিচে তাকালো।
-"পাপ্পা।"
প্রোজ্জ্বল তার কুট্টি কুট্টি দাঁত বের করে বললো।প্রত্যুষ ঠোঁট বিস্তৃত করে উজ্জ্বল হাসে।দু-হাত বাড়িয়ে আলতো হাতে কোলে তুলে নিলো ওঁকে। প্রোজ্জ্বল নিজের বাবার বুকের সাথে লেপ্টে থাকে।প্রত্যুষ চুমু খেলো ওর মাথায়।আদুরে স্বরে বললো
-"আমার পাপ্পা টা কেমন আছে!"
-"আমি বালো নেই।মিচ করেচি পাপ্পাকে।"
প্রোজ্জ্বল তার আধো আধো বুলি আওড়ে বললো।প্রত্যুষ হেসে দেয়।নরম গাল দুটো টেনে দিয়ে বলে
-"আমিও আমার বাচ্চা কে অনেক মিস করেছি!আজকে কী খাওয়া হয়েছে?"
-"কিচু কাইনি!" প্রোজ্জ্বল ঠোঁট উল্টে বললো।
প্রত্যুষ ভ্রু কুঁচকালো। গম্ভীর স্বরে বললো
-"কেন খাওনি?তোমার রওশা মাম খেতে দেয়নি কিছু তোমাকে।"
প্রোজ্জ্বল উত্তর দিলো না।প্রত্যুষ দাঁড়িয়ে যায়।উচ্চস্বরে ডাকলো
-"রওশা,রওশা!
রওশা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসলো।প্রত্যুষকে দেখে বললো
-"আপনি চলে এসেছেন? "
-"ওঁকে খাওয়াননি কেন?"
রওশা অপ্রস্তুত হলো!মিনমিন করে বললো
-"আমি খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি অনেক।কিন্তু ও আপনাকে ছাড়া খাচ্ছিলোই না।"
-"তাই বলে ও সকাল থেকে না খেয়ে থাকবে।আপনি আমাকে অন্তত একবার ফোন দিয়ে জানাতে পারতেন।"
-"অনেকবার কল করেছি আপনাকে।আপনি ফোন ধরেননি।"
রওশা মাথা নিচু করে বললো।প্রত্যুষ প্রোজ্জ্বল কে কোলে নিয়ে এক হাতে নিজের ফোন অন করে দেখলো বিশটা মিসড কল।কপাল কুঁচকে ফোনটা ছুড়ে মারলো সোফার উপর। গম্ভীর স্বরে বললো
-"সাইলেন্ট ছিলো!"
বলেই প্রোজ্জ্বল কে কোলে নিয়ে প্রস্হান করলো সেখান থেকে।রওশা মাথা নিচু করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রত্যুষ শার্ট না বদলেই কিচেনে গেলো।প্রোজ্জ্বল কে নামিয়ে দিলো কোল থেকে।চার বছরের প্রোজ্জ্বল টুকুর টুকুর দৃষ্টিতে দেখলো বাবার কাজ। চুলায় প্যানে করে দুধ গরমে দিলো প্রত্যুষ।হালকা জাল দিয়ে কুসুম গরম দুধ ফিডারে ভরলো।প্রোজ্জ্বল কে আবার কোলে নিয়ে বেরোলো কিচেন থেকে।
কক্ষে ঢুকে ওকে কোলে বসিয়ে নিজেও বসলো বিছানার উপর। প্রোজ্জ্বল বাবার বুকের সাথে লেপ্টে চুপচাপ ফিডার খাচ্ছে। বাবা ছাড়া কিছুই বোঝে না বাচ্চা টা।এমনকি বাবা না আসা পর্যন্ত খাইও না।তাই এখনও ফিডার ছাড়াতে পারেনি প্রোজ্জ্বল থেকে, যেহেতু ও বেশিরভাগ সময় বাইরে কাটায়।ফিডার খাওয়ানো শেষে ওঁকে বিছানার উপর বসিয়ে দিলো প্রত্যুষ।খেলনার জিনিসগুলো এগিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো প্রোজ্জ্বলের সামনে।চোখে-মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
-"নামবে না কেমন!এখানে বসে খেলো, বাবা এক্ষুনি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"
বলেই সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো প্রত্যুষ।ঘন্টাখানেক ধরে গোসল করার পর বের হলো প্রত্যুষ।টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছে সেটা মেলে দিলো বেলকনিতে।রওশা খেলছে প্রোজ্জ্বলের সাথে।প্রোজ্জ্বল নিজের আধো আধো বুলিতে কিছু একটা বোঝাচ্ছে ওঁকে। প্রত্যুষ রুমে আসতেই রওশা হাসলো ওর দিকে চেয়ে। বললো
-"আপনি বাড়িতে থাকলে ঠিকই আমার সব কথা শুনে,হেসে খেলে সময় কাটায়।কিন্তু বাইরে যাওয়ার পর সেই যে মুখে অমাবস্যা নামে,আমি আর হাজার চেষ্টা করেও মুখে হাসি ফোটাতে পারি না।"
প্রত্যুষ কিছু না বলে এগিয়ে এসে বসলো বিছানার উপর। প্রোজ্জ্বল বিছানার উপর হামাগুড়ি দিয়ে ওর কোলে উঠে বসলো।রওশা আমতা আমতা করে বললো
-"খাবেন না?"
-"আপনি খেয়ে নিন।খিদে নেই আমার!"
রওশা জোড়াজুড়ি করতে পারলো না।এতোগুলা বছরেও মানুষটার সাথে স্বাভাবিক হতে পারলো না ও।রওশা উঠে দাঁড়ালো।আবদার করে বললো
-"আজকে ও আমার সাথে থাকুক!"
-"রেখে লাভ কী রওশা!সেই তো মাঝরাতে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসবে।আগের বারও তো এমনিই হয়েছিলো। "
রওশা উত্তর দিতে পারলো না।একই ছাঁদের নিচে থাকলেও এখনো দুজনের মাঝে বিস্তর দূরত্ব। এখনো দুজনে আলাদা রুমে থাকে।একজন আরেকজন কে অদেখা করে সময় কাটায়।সদ্য পরিচিত মানুষের সাথে আমরা যেভাবে মত বিনিময় করি সেভাবেই কথা বলে ওরা।প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া আর কোনো কথাই হয় না দুজনের মাঝে। রাতে প্রোজ্জ্বল বাবার সাথেই থাকে।দীর্ঘশ্বাস ঝাড়লো রওশা।আলতো পায়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।প্রত্যুষ একপলক সেদিকে তাকিয়ে উঠে দাড়িয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।
রওশা তাকিয়ে থাকলো বন্ধ দরজার দিকে।প্রত্যুষ আগের মতো খারাপ ব্যবহার করে না ওর সাথে,তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করে না ওঁকে। কিন্তু ওর প্রতিটা বিষয়েই প্রত্যুষ নির্লিপ্ত, কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব ওর। যা বুকের মধ্যে অসম্ভব পীড়া দেয়।রওশার কান্না উগলে আসে।টলমল চোখে তাকালো ও বন্ধ দরজার দিকে।আজ ও কক্ষের বাইরে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে, অথচ এটা ওর কক্ষ হওয়ার কথা ছিলো।এ কক্ষ আর এ কক্ষে থাকা মানুষ দু'টোর উপর ওর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।কিন্তু সে অধিকার ফলানোর ক্ষমতা ওর নেই। রওশা টালমাটাল পায়ে পাশের রুমে ঢুকলো। প্রত্যুষ আর ওর রুম পাশাপাশি। দরজা বন্ধ করে দরজা ঘেঁষে বসলো ও।রাতের খাবার টুকু খাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো না। প্রতিটা রাতেই এমন হয়।প্রত্যেকটা দীর্ঘ রজনী ওর একাকিত্ব আর দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গী। আর পাঁচ টা মেয়ের মতো ওর স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখের সংসার হলো না কেন!রওশা নিজেকে প্রশ্নে জর্জরিত করলো।পরক্ষণে উত্তর পেয়েও গেলো।ঐ যে অভিশাপ। যে মেয়েটা তার স্বামী কে না পাওয়ার দুঃখে মরতে বসেছিলো,তার ভালোবাসার পরিমাণ কতটুকু ছিলো!ভাবতে পারলো না রওশা।এসব ভাবলে বুক চাপড়ে কাঁদা ছাড়া আর কিছুই করার সুযোগ থাকে না।কিন্তু রওশা এটুকু জানে মেয়েটার ভালোবাসা ওর চেয়ে সহস্র গুণ বেশি ছিলো।তবুও মেয়েটাকে তার ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয় নি ও,দিতে পারেনি।জীবন ওঁকে সেই সুযোগ দেয় নি।
রওশা হাঁটুতে থুঁতনি ঠেকিয়ে একইভাবে বসে থাকলো পুরো রাত।ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে। জানালা দিয়ে রোদের তীর্যক আলো পরতেই হুঁশ ফেরে ওর।দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ পরতেই দেখলাে ঘড়ির কাটায় সাতটা বেজে দশ মিনিট। তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে পড়ে ও।ওয়াশরুম থেকে চোখেমুখে পানির ছটা দিয়ে বেরিয়ে আসে।পুরো রাত না ঘুমানোর ফলে মাথা ধরে গেছে।এক কাপ কড়া করে কফি না খেলে শান্তি মিলবে না ভেবেই কক্ষ ছেড়ে বেরোলো ও।কিচেনে যেতেই থেমে যায় ওর পা।প্রত্যুষ ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিলো কিচেনে।ওঁকে দেখতেই টেডি হেঁসে বললো
-"উঠে গেছেন আপনি!"
রওশার মুখে হাসি ফুটে।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রিয় একজনের মুখে হাসি দেখতে কার না ভালো লাগে।বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো ও।বললো
-"আসলে,মাথা টা খুব ধরেছে।এক কাপ কফি বানাতাম।"
-"আপনি বসুন আমি বানিয়ে আনছি!"
মুচকি হেসে সম্মতি জানালো রওশা।ফুরফুরে মন নিয়ে বসলো সোফার উপর।
প্রত্যুষ রেডি হচ্ছিলো হসপিটালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।রওশা পা টিপে টিপে এসে দাড়ালো ওর সামনে।কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো ও কিন্তু বলতে যেয়েও আটকে যাচ্ছে বারংবার।ওঁকে উশখুশ করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালো প্রত্যুষ।গম্ভীর স্বরে বললো
-"কিছু বলবেন?"
-"হ্যাঁ।"
-"বলেন।"
-"আমার না খুব করে একটু বাইরে যেতে মন চাচ্ছে। শপিং করতে যায়?"রওশার কন্ঠে আকুলতা।
প্রত্যুষ তার কন্ঠে বরাবরের মতোই গাম্ভীর্য ঢেলে বললো
-"এখানে আমার পারমিশনের কী আছে!আপনার ইচ্ছে হলে যান।আমি তো কোনো কিছুতে বিধিনিষেধ দিইনি আপনাকে।"
রওশার মনঃক্ষুণ্ন হলো,আসলেই কপাল ওর!সে কোথায় যায় না যায় তা নিয়ে তার স্বামীর বিন্দুমাত্র কনসার্ন নেই।প্রত্যুষ নিজের মানিব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড এগিয়ে দেয় ওঁর দিকে।ব্যস্ত কন্ঠে বলে
-"যা যা লাগবে নিয়েন!"
রওশা হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করলো।প্রত্যুষ পায়ে মোজা পরতে পরতে বললো
-"প্রোজ্জ্বল কে তাহলে আমার সাথে নিয়ে যাচ্ছি!আপনি যেহেতু ঘুরতে যাবেন,ওঁকে তো একা রাখা যাবে না!"
-"এমা!তা কেন হবে?আমি কী একা যাবো না-কি ঘুরতে!প্রোজ্জ্বল কে নিয়েই যাবো!"
-"আচ্ছা, আমি ড্রাইভার কে বলবো। আপনার যেখানে যেখানে যেতে মন চাইবে যাইয়েন।"
বলেই উঠে দাঁড়ালো প্রত্যুষ।ঘুমন্ত প্রোজ্জ্বলের কপালে চুমু দিয়ে,কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে।
.
ব্যালকনির ডিভানের উপর বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে প্রাণেশা।দৃষ্টি তার পিচঢালা রাস্তার দিকে।সোনালী রঙের রোদ্দুর আঁচড়ে পরছে ওর চোখেমুখে।উপর থেকে শান্ত দেখালেও মনের মধ্যে খচখচ করছে ভীষণ। নির্বাচন কে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকদিন ধরেই গ্রামে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।তবে সেটা কী শুধুই নির্বাচন কে কেন্দ্র করে কি-না তা জানা নেই কারো!সৌরভ সরদারও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।এতো দিনের পদ হারিয়ে এত বড় হারের পর কোনো না কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে এখনো পরিস্থিতি ঠান্ডা,তার দলের ছেলেদের কোনো হদিস নেই,ঝড় আসার পূর্বাভাস যাকে বলে।নিচে নেমে দাঁড়ালো প্রাণেশা।আজকে একটা সুন্দর দিন, এসব ভেবে নষ্ট করতে চায় না ও।ধীর পায়ে কক্ষের ভেতর ঢুকলো ও।রুমটা বেশ বড় আকৃতির। রুমের একপাশে লাইব্রেরির মতো করে সাজানো।পুরো রেক জুড়ে উপন্যাসের বইয়ে সাজানো।প্রাণেশার উপন্যাস পড়ার নেশাটা প্রবল।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দেবদাস উপন্যাস হাতে আবার বেলকনিতে আসলো ও।বেলকনিতে সাদা রঙের একটা একক দোলনা আছে।দোলনার চারপাশে সাজানো বিভিন্ন ধরনের টব।প্রতিটা টবে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের গাছে ভর্তি।প্রাণেশা দুপা তুলে বসলো দোলনার উপর।বইয়ের পাতা উল্টে বের করলো একটা চিঠি।চিঠির ভাজ খুলে শান্ত দৃষ্টি বুলিয়ে পড়তে আরম্ভ করলো।
প্রিয় প্রাণ,
জানি প্রিয় ডাকার অধিকার নেই আমার।সব অধিকার হারিয়ে ফেলেছি নিজের দোষেই।তোর নরম মনকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলেছি।তোকে কাঁদিয়েছি,কষ্ট দিয়েছি।কিন্তু বিশ্বাস কর তোকে কষ্ট দিয়ে আমি ভালো ছিলাম না।তোঁকে কাঁদিয়ে আমি মরে গেছি।যখন নিজের প্রাণের উপর আঘাত আসে,তখন কে-ই বা ভালো থাকতে পারে বল!আমার হাতে আর বেশি সময় নেই। কিছু দিন পরেই চলে যাবো হয়তো।তোকে আর দেখা হবে না রে।তোর মুখটা না দেখলে যে আমার পুরোটা দিন খারাপ যায়।ইউ নো, তুই আমার লাকি গার্ল।আমার ছোটোবেলা,আমার পুতুল।তুই এখনো আমার কাছে সেই ছোটোটিই রয়ে গেছিস।যাকে আমি কোলে নিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরতাম।যে একটা পুতুলের মতো আমার বুকে লেপ্টে থাকতো।আমার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতো।তুই আমার জীবনে ঘটা ঘটনাগুলো যতটুকু জানিস ততটুকু তো আমার জন্মদাত্রী মা-ও জানে না রে!যেদিন থেকে তুই পৃথিবীতে আসলি সেদিন থেকে আমার ভাগ্যে শুধুই পূর্ণতা ছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, সেই লাক আমি ধরে রাখতে পারলাম না,তুই আমার পূর্ণতা হলিনা।কিন্তু বিশ্বাস কর ভালোবাসা আমার জীবনে শুধু একবার এসেছে।আর কোনোদিন আসবে না!কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন আসবে না।আসতে দেব না আমি।ভালোবাসলে শরীর ছুঁতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।আমার মনে সর্বদা তোর বসবাস থাকবে,দূর থেকেই আমি ভালোবেসে যাবো প্রাণ।কিন্তু আমি চাইবো তোর জীবনে ভালোবাসা আবার আসুক।কেও তোকে খুব করে ভালোবাসুক।আমি শেষ হয়ে যায়,কিন্তু তোর একটা সুখের সংসার হোক।নিজের যত্ন নিস জান।ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করিস।অবহেলা করিস না নিজের প্রতি।কোনো বেইমানের জন্য আর নিজের মূল্যবান চোখের জল নষ্ট করিস না।ভালো থাকিস।শেষবারের মতো, ভালোবাসি!
ইতি
তোর প্রত্যুষ ভাই।
প্রাণেশার হাত কাপে।যতবার চিঠিতে চোখ বুলায় ও ততবার রক্তক্ষরণ হয় বুকের মধ্যে।দিনের শুরুতে প্রতিদিন একবার করে চিঠিটা পড়ে ও।বাইরে থেকে নিজেকে যতই শক্ত দেখাক কিন্তু ভেতরটা যে ভেঙে চুড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে সেটা একমাত্র বন্ধ ঘরের মধ্যেই অনুভব করতে পারে প্রাণেশা।চিঠিটা বইয়ের ভাজে রেখে উঠে দাড়ালো প্রাণেশা।বেলকনির রেলিঙ ধরে আকাশপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। বিরবির করে বলে
-"আল্লাহ, যখন মানুষ টাকে ভাগ্যে রাখলেই না,তবে কেন মনের মধ্যে রাখলে!কেন ছয়টা বছরেও ভুলতে পারলাম না আমি তাকে।দীর্ঘ ছয়টা বছর কী যথেষ্ট ছিলো না তাকে ভোলার জন্য। তাহলে কেন প্রতিনিয়ত আমার মনে আরো গভীর ভাবে বসবাস করছে সে!আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি নিজের সাথে লড়াই করতে করতে।আর পারছি না,আল্লাহ।আমি সত্যিই আর পারছি না!"
.
পলক ভূইয়া নিস্তব্ধ আধশোয়া হয়ে বসে আছেন ঝুলন্ত চেয়ারের উপর। দৃষ্টি তার সিলিংয়ের দিকে।গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বন্ধ ফ্যানটার দিকে।হয়তো নিজের জীবনের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কষছেন।ওনার ভাবনার মাঝেই মালিহা বেগম এসে কক্ষে ঢুকলেন।ফ্যানটা ছাড়তে গিয়ে বললেন
-"ফ্যান অফ করে বসে আছেন কেন?এখনো তো অতটা শীত পরছে না।"
পলক ভূইয়া একপলক স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসলেন।হতাশ শ্বাস ফেলে বললেন
-"এমনিই ভালো লাগছে না কিছু।"
মালিহা বেগম এসে বসলেন বিছানার উপর।পলক ভূইয়া আবার বললেন
-"প্রত্যুষ বা রওশা কেও কী ফোন দিয়েছে?"
-"কালকে রাতে কথা হয়েছিলো রওশার সাথে।বলেছে ওরা ভালো আছে সবাই।কিন্তু প্রত্যুষের সাথে কথা হয়নি অনেকদিন।তার তো ব্যস্ততার শেষ নেই।এতটাই ব্যস্ততা যে মা-বাবার সাথে কথা বলার সময় টুকুও নেই!"
মালিহা বেগম মুখ কালো করে বললেন।পলক ভূইয়া বিরস মুখে চাইলেন স্ত্রীর পানে।নির্জীব স্বরে বললেন
-"ছেলেটা অভিমান করে আছে আমাদের উপর।আমরা ওর ভালোবাসা কে কেড়ে নিয়েছি না,তাই আমাদের থেকে আমাদের ছেলেকে কেড়ে নিলো।জানো,মাঝে মাঝে খুব বেশিই আফসোস হয়।যে আফসোস মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দেয়।ছেলেটা দুরে সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে। এই ছয় বছরে একবারো পা রাখেনি দেশে।ফোন করলেও কেমন যেন কথা বলে,কথার ভঙ্গিতে বুঝিয় দেয় আমার সাথে কথা বলতে খারাপ লাগছে!ছেলেটাকে হারিয়ে ফেললাম সাথে আমার একটা মাত্র মেয়েটাকেও।"
মালিহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।মলিন স্বরে বললেন
-"নির্বাচনে প্রাণেশার মামা জিতেছে!"
-"হ্যাঁ।শুনেছি। "
ম্লান হাসলেন মালিহা বেগম। বললেন
-"পাশাপাশি বাড়ি,কিন্তু যেন মাইল মাইল দুরত্ব।মেয়েটাকে প্রতিদিনই রাস্তা দিয়ে যেতে দেখি।কিন্তু ডেকে দু'টো কথা বলতে পারিনা।মুখ নেই যে কথা বলার।ওরা কেউই এ বাড়ির আঙিনায় পর্যন্ত পা রাখে না।আমাদেরও একই অবস্থা। একটা ভুলের কারণে নিজেদের পরিবারের মানুষগুলোর সাথেই যে যোজন যোজন দুরত্ব সৃষ্টি হয়ে যাবে সেটা তো কোনোদিন ভাবতেও পারিনি।"
পলক ভূইয়া নিশ্চুপ বসে থাকলেন।মালিহা বেগম আবার বললেন
-"এই খালি বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসে।নিজেকে খুব বেশিই একা একা লাগে।প্রহরটাও কাজে চলে যায়।রিধিতা থাকলে ওর সাথে দু'টো কথা বলা যেতো,সারাক্ষণ মা মা করতো।কিন্তু চাকরিটা হওয়ার পর থেকে ওরও বাইরে চলে যেতে হয়।আমি একা একা বসে থেকে সময় পার করি।"
পলক ভূইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।সময়,সুযোগ চলে যাওয়ার পরপরই আমরা আমাদের ভুল-ত্রুটি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি।কিন্তু তখন কোনো সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না আমাদের জন্য। নিজেদের জন্য দুঃখ প্রকাশ ছাড়া তখন আমাদের আর কিছুই করার থাকে না।এই আফসোস ভেতরে ভেতরে আমাদের শেষ করে দেয়।তবুও আমরা হাতড়ে বেড়ায় বাঁচার আশ্বাস।কিছু ভালোবাসার মানুষ।
.
রওশা ঘুরে ঘুরে শপিং করলো অনেক কিছুই। তবে যা কিনেছে বেশিরভাগই প্রোজ্জ্বলের জন্য। বায়না করে না বাচ্চাটা,চুপচাপ লেপ্টে থাকে বুকের সাথে।কিন্তু যখন খেলনার দোকানের পাশ দিয়ে গেলো তখন প্রোজ্জ্বল আবদার করলো অনেক কিছু।আর রওশা এতোক্ষণ এসবই কিনছিলো। একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে রওশা।পাশের চেয়ারে বসে ফোনে কার্টুন দেখছে প্রোজ্জ্বল। এখনো অর্ডার করা খাবারগুলো এসে পৌছায়নি। রওশা সেন্ডউইচ,কোল্ড ড্রিংক আর প্রোজ্জ্বলের জন্য বেবি মিল্ক অর্ডার করেছে।রওশা থুঁতনিতে হাত দিয়ে অপেক্ষা করছিলো।তখনই ওদের সামনে একজন পুরুষ এসে দাঁড়ালো। কারও উপস্থিতি অনুভব করতেই রওশা মাথা তুলে তাকালো।পরিচিত একটা মুখ দেখতেই থমকে গেলো ও।নীল হাসিমুখে তাকালো ওদের দিকে।রওশা দাঁড়িয়ে পড়লো। আলতো হেঁসে বললো
-"আসসালামু আলাইকুম!কেমন আছেন?"
-"ওয়ালাইকুম আসসালাম।ভালো আছি!আপনার কী খবর?"
নীল হাসিমুখে নম্র স্বরে বললো।
-"এই যে যেমন দেখছেন!"
নীল হাসি উপহার দিলো ওঁকে। চেয়ারের উপর পা তুলে বসা প্রোজ্জ্বলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। প্রোজ্জ্বল হা করে তাকালো দু'জনের দিকে।নীল আবার রওশার দিকে তাকিয়ে বললো
-"মা-ছেলে ঘুরতে এসেছেন?"
-"জ্বি।একটু শপিং করতে এসেছিলাম।"রওশা আমতা আমতা করে হেসে বললো।
-"প্রত্যুষ কোথায়?"
রওশার হাসি ধপ করে নিভে যায়।মুখে নেমে আসে বিষন্নতা। তবুও মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলে
-"হসপিটালে আর কোথায়!"
-"বাহ!স্ত্রীকে দেখে রাখার চেয়ে কাজ বড় হয়ে গেলো ওর কাছে।আমি তো ভাবছি ও আপনাকে এভাবে একা একা ছাড়লো কী করে!আমি হলে তো আমার ওয়াইফের সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকতাম।আমার ওয়াইফের সাথে টাইম স্পেন্ড করার জন্য এমন হাজারটা কাজ জলে ভাসিয়ে দিতাম।"
নীল উপহাস করে বললো।টলমল চোখ রওশার,মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে মাথা তুলে বললো
-"এতেই বোঝা যায়,আপনি কাজের প্রতি কতটা দায়িত্বহীন।কিন্তু প্রত্যুষ এমন নয়।ও নিজের কাজের প্রতি যথেষ্ট অনুগত।তবুও আপনার যদি এতটাই ছায়ার মতো থাকতে মন চাই কারো,চটজলদি বিয়ে করে নিন।তারপর নাহয় কোলের মধ্যে নিয়ে বসে থাকিয়েন।বিয়ে না করে এমন বড় বড় লেকচার সবাই দিতে পারে।"
ফিক করে হেঁসে দিলো নীল।রওশা ছোট ছোট চোখে তাকালো ওর দিকে।নীল নিজের হাসি থামিয়ে বললো
-"আপনি তো হাইপার হয়ে যাচ্ছেন দেখি!সরি,আমি আসলে মজা করে বলেছি।আপনাকে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে চায়নি।"
রওশা তাচ্ছিল্য হাসলো।ওঁকে নাকি কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে চায়নি!কিন্তু যতবারই দেখা হয় এভাবে বাঁশ মেরে কথা বলে।প্রত্যুষের সাথে গলায় গলায় বন্ধুত্ব থাকার দরুন এই নিয়ে অগণিত বার দেখা হয়েছে ছেলেটার সাথে।এমনকি অনেকবার বাড়িতেও এসেছে। কিন্তু যতবারই দেখা হবে,এভাবে কোনো না কোনো পিঞ্চ মারবেই মারবে।কোন জনমের শত্রুতা আছে ওর ছেলেটার সাথে আল্লাহ মালুম।এমনকি যেদিন প্রথমবার পরিচয় হয়েছিলো ছেলেটার সাথে সেদিনও পিঞ্চ মেরে কথা বলেছে।
রওশা ফোস করে শ্বাস ছাড়লো।নীল বিস্তৃত হেঁসে বললো
-"আচ্ছা,আপনি বসুন।আমি বরং যায়।"
রওশা মনে মনে বললো
-"চোখের সামনে থেকে দুর হ বেডা!"
কিন্তু মুখ ফুটে বললো
-"ঠিক আছে।বাড়িতে আসবেন কিন্তু!"
-"অবশ্যই,দাওয়াত না দিলেও চলে আসবো আমি!"
বলেই ঠোঁট বাঁকা করে হাসলো নীল।উল্টো ফিরে চলে গেলো ওদের সামনে থেকে।রওশা মুখ বাঁকায়।চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে
-"শালা,খাচ্চর!"
#চলবে
(যাঁদের মনে হচ্ছে গল্পটা একঘেয়ে হয়ে গেছে তাঁদের কাছে অনুরোধ গল্পটা একেবারে শেষ হলে পড়বেন।তখন আপনারা নিজেরা অদরকারী বা নীরস পর্বগুলো স্কিপ করে পড়তে পারবেন। গুছিয়ে লিখতে সময় লাগে অনেকটা।আপনাদের অপেক্ষা করাতে আমারও ভালো লাগে না।আর হ্যাঁ,আপনাদের জন্যই গল্প লিখি।আপনাদের পছন্দই প্রায়োরিটি দিবো,তবে একটু সময় দরকার।)