#পরিণীতা
#পর্ব:১৯
#তানজিনা ইসলাম
রওশা নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে।রাতের কালো আঁধারকে ঢেকে দিয়ে শহরটি সেজে উঠেছে ঝলমলে আলোয়।গাড়ি তার নিজ গতিতে চলছে।রাস্তার সাদা পেঁজা তুলার মতো তুষারের আস্তরণ মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে গাড়ি।প্রোজ্জ্বল ঘুমিয়ে আছে ওর কোলের উপর।ছোট্ট দেহটাকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে রওশা।রওশা বাইরে থেকে দৃষ্টি এনে তাকালো প্রোজ্জ্বলের দিকে।গলার মাফলার টা ঠিকঠাক পেঁচিয়ে দিলো।নিজের সাথে মিশিয়ে আরেকটু উষ্ণ করার চেষ্টা করলো ওঁকে।অঘোরে ঘুমোচ্ছে বাচ্চাটা।ঘুমন্ত মুখটা অসম্ভব আদুরে লাগছে রওশার কাছে। ঘুমন্ত প্রোজ্জ্বলের গাল টেনে দিলো রওশা।মিষ্টি একটা বাচ্চা,দেখলেই খালি কোলে নিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে ওর। কিন্তু পরক্ষণেই মন খারাপ হয়ে যায় এই ভেবে যে বাচ্চাটার সাথে ওর কোনো নাড়ির টান নেই।সুন্দর, পুতুলের মতো ছেলেটা ওর জঠর থেকে জন্ম নেয়নি।তবুও এটা ভেবেই মনকে সান্ত্বনা দেয় ও, জন্ম না দিক তবুও ওকে ঘিরেই মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছে। যখন ওঁকে রওশা মাম ডাকে তখন ওর কলিজা জুড়িয়ে যায়।
আচ্ছা,জন্ম না দিয়েই, রক্তের টান না থেকেও যেভাবে ভালোবেসে ফেললো রওশা কিন্তু ওর গর্ভধারিণী মা কীভাবে ওঁকে ফেলে গেলো!ছোট্ট পুতুলটাকে ফেলে যেতে বুক কাঁপলো না তার।সেই ভীনদেশী মা'কে দেখতে মন চায় রওশার।প্রশ্ন করতে মন চায়,যদি এভাবেই ফেলে চলে যাবে,তাহলে জন্ম দিলো কেন!হয়তো এই জন্যই বলে জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না।আর ইউরোপের দেশগুলোতে তো এসব সচরাচর ঘটেই থাকে। তাঁদের মাতৃত্ব বোধ কম।বাংলা মা জননীদের মতো এরা বুক পেতে ভালোবাসতে পারে না সন্তানদের কে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো রওশা।ওর এখনো মনে আছে প্রত্যুষ যেদিন দুধের শিশু টাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলো।তখন লন্ডনে বসবাসের এক মাস চলে রওশার।শুনেছিলো, ভীনদেশী দম্পতিদের সংসারে অযাচিত ভাবেই এসে পড়েছিলো প্রোজ্জ্বল। ওরা দুজনের একজনও খুশি ছিলো না এই বিষয়ে।মূল সমস্যা ছিলো বৈবাহিক সম্পর্কে ছিলো না ওরা লিভ ইন করতো।আর অনেকটা অসাবধানতা বসত এসে পড়ে প্রোজ্জ্বল। যদিও এবোরশন করতে চেয়েছিলো মেয়েটা, কিন্তু ভ্রুণের বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় শরীরের ঝুঁকির সম্ভাবনা ছিলো।অনিচ্ছা আর অপারগতায় জন্ম দিয়েছিলো প্রোজ্জ্বল কে।প্রত্যুষদের হসপিটালেই জন্ম হয়েছিলো ওর। কিন্তু ও দুনিয়ায় আসার পর ওরা গ্রহণ করেনি ওঁকে, ওর জন্মদাত্রী নাক ছিটকে বলেছিলো ওঁকে যাতে কোনো অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসে।কিন্তু প্রত্যুষ ওঁকে অনাথাশ্রমে নিয়ে যেতে দেয়নি।নিজের কাছে যত্ন করে নিয়ে এসেছিলো।সেদিন হসপিটালের নার্স থেকে শুরু করে ডাক্তার রা সবাই হতবাক হয়ে দেখেছিলো প্রত্যুষকে।তাঁদের হার্টল্যাস ডক্টর যে এতটা মহানুভবতার পরিচয় দিবে সেটা ভাবতেও পারেনি কেও।বড় করে শ্বাস ফেললো রওশা।সময় কতটা দ্রুত চলে যায়।লন্ডনে এসেছে চারটা বছর হয়ে গেছে।কিন্তু মনে হচ্ছে কয়েকদিন আগেই এসেছে। যদিও এটাকে আসা বলে না,এটাকে যুদ্ধ করে আসা বলে ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো রওশা।ঘুমন্ত প্রোজ্জ্বল কে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে নিলো বুকের সাথে।রওশা মোবাইলে একবার সময় দেখে নিলো।রাত আটটা বাজে।আজ পুরোটা দিন বাড়ির বাইরে ছিলো ওঁরা,প্রোজ্জ্বলের সাথে ইচ্ছে মতো ঘুরেছে রওশা।যদিও অনেকবার বাবার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো প্রোজ্জ্বল, কিন্তু কান্না করেনি এই ঢের!প্রোজ্জ্বলের জন্যই তো কোনমতো লন্ডনে টিকে আছে ও।নয়তো কবেই এই একাকিত্বের দহনে শেষ হয়ে যেতো।
.
পরেরদিন,পার্লামেন্টে মিটিং চলছে।গ্রুপের সব মেম্বাররা মনোযোগ দিয়ে শুনছে এমপি ইয়াসির আহমেদের কথা।শুধু মুগ্ধর কোনো মনোযোগ নেই।সে আলসে ভঙ্গিতে থুঁতনিতে হাত ঠেকিয়ে বসে আছে।এই গোধূলি বিকেলে কোথায় একটা শান্তির ঘুম দিবে তা-না,প্রাণেশার ধমকে জান হাতে নিয়ে দৌড়ে আসতে হয়েছে।প্রতিবারের মতো এবারেও না এসে,কোনো কাজ না করে বেঁচে যেতে চেয়েছিলো মুগ্ধ।কিন্তু প্রাণেশার জন্য তা হলে না,এমন বন্ধু থাকলে শত্রুর কী দরকার!হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো ও।হাত ঘড়িতে দেখে নিলো সময়।অনেকটা সময় কেটে গেছে আসার।বসতে বসতে পিঠ, কোমড় ব্যাথা হয়ে গেছে।কিন্তু ওঁদের মিটিং শেষ হচ্ছে না।তাজিম কিছুক্ষণ পরপর বিরক্তিকর চোখে দেখছে ওঁকে। ও যে কোনো কথায় কর্ণকুহরে ঢুকাচ্ছে না তা ওর বসার ঢক দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ওদিকে মুগ্ধ পারছে না এখানেই শুয়ে পড়তে।ওর আরামের বিছানা ছেড়ে আসতে খুব বেশিই কষ্ট হচ্ছিলো।
অবশেষে মিটিং শেষ হলো।খুশিতে পানি চলে এলো মুগ্ধর চোখে।স্কুল জীবনে শেষ ক্লাসে আমরা ছুটির ঘন্টার জন্য যেভাবে অপেক্ষা করতাম,সেভাবেই মন-প্রাণ এক করে অপেক্ষা করছিলো মুগ্ধ। সবার আগে আগে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো ও।ওর বেরোনোর ধরণ দেখে অবাক হয়ে তাকালো সবাই, সহ-সভাপতির এ কী আচরণ!
বাইরে এসে কোমড়ে হাত দিয়ে বড় বড় করে শ্বাস ফেললো মুগ্ধ।মনে হচ্ছিলো এতোক্ষণ শ্বাস চেপে বসেছিলো।
-"কী হয়েছে ভাইয়া আপনার?"
রিনরিনে নারীকণ্ঠ কানে আসতেই দাঁড়িয়ে পড়লো মুগ্ধ। একজন সুন্দরী রমনী আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।মুগ্ধ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।চেনা মুখ দেখতেই ভ্রুকুঞ্চন শিথিল হলো ওর।মেয়েটার নাম তুলি। ওদের দলের জুনিয়র একজন মেম্বার।মুগ্ধ শান্ত কন্ঠে বললো
-"না,কিছু হয়নি।ঠিক আছি আমি।"
তুলির মুখে হাসি ফুটে।কিছু বলতে যাবে তার আগেই প্রাণেশাকে আসতে দেখে কথাটা গিলে ফেললো ও।প্রাণেশা এসে দাঁড়ালো ওদের সাথে।তাজিমও হাঁটতে হাঁটতে সাথে আসলো ওর।প্রাণেশা, তুলিকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"লিস্ট করতে বলেছিলাম। করেছো সেটা!"
তুলি উপর নিচ মাথা নাড়লো।ব্যাগ থেকে কাগজটা বের করে বিনীত ভঙ্গিতে এগিয়ে দিলো প্রাণেশার হাতে।
মুগ্ধ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।পরপর জিজ্ঞেস করলো
-"কীসের লিস্ট রে দোস্ত?"
-"আমাদের দলের মেম্বার দের লিস্ট।এই লিস্ট টাই ফিক্সড এন্ড ফাইনাল।এরপর আর কেও দলে ঢুকতে পারবে না।এমনিতেই গ্রামে একের পর এক ঘটনা ঘটছে।আমাদের দলে অযাচিত ভাবে কেও ঢুকে এসব ঘটনার দায় আমাদের উপর চাপিয়ে দিক সেটা মোটেও কাম্য নয়।তাই নিজেদের সাবধানতা নিজেদের কেই বজায় রাখতে হবে।"
মুগ্ধ মাথা নাড়লো।আসলেই এসব সাবধানতা প্রয়োজন। নয়তো বিপক্ষ দলের ছেলেরা যেভাব৷ উঠে পড়ে লেগেছে ওদের ক্ষতি করার কখন সফল হয়ে যায়।মুগ্ধ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো।বোজা গলায় বললো
-"কাজ তো শেষ, এবার আমি যায় তাহলে!"
-"কাজ করে উদ্ধার করে ফেলেছিস আমাদেরকে।আচ্ছা তুই বলতো,ওখানকার একটা কথাও কানে গিয়েছে তোর!বসে বসে ঝিমচ্ছিলি দেখিনি আমি!"
তাজিম পিঞ্চ মেরে বলে ওঁকে। মুগ্ধ ভ্রুকুটি গুটিয়ে ফেলে।নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে
-"সবসময় আমার সাথে এমন করা প্রয়োজন তোর!"
তাজিম মুখ বাকায়।প্রাণেশা ওদের উদ্দেশ্য করে শান্ত স্বরে বললো
-"সবসময় ঝগড়া বাঁধানো বন্ধ কর।"
চুপ হয়ে গোলো দু'জনে।তুলি কুণ্ঠিত স্বরে বললো
-"আমি চলে যায় আপু। সন্ধ্যা হয়ে গেলে যেতে পারবো না আর!"
-"তুমি চলে যাও তুলতুলি।এমনিতেই দিন কাল ভালো না।"
মুগ্ধ নম্র স্বরে বললো।তুলি ওর দিকে মায়াময়, নরম দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেলে। তাজিম বাঁকা চোখে দেখলো ওঁকে। হঠাৎ বলে উঠলো
-"তুলি এমনিতেই সন্ধ্যা নামছে।তুমি যেতে যেতে আধার ঘনিয়ে আসবে।তোমার যেহেতু যেতে ভয় লাগছে মুগ্ধ পৌঁছে দিবে তোমাকে।"
মুগ্ধ আঁতকে উঠলে।তুতলে বললো
-"আমি, আমি কেন?"
-"তুই যেহেতু বাড়ি চলে যাচ্ছিস,বাড়ি যাওয়ার পথে ড্রপ করে দিবি ওঁকে, সিম্পল। "
মুগ্ধ আইঢাই করলো।কী বলবে ভেবে পেলো না।ওর নিরবতা দেখে তুলি কুণ্ঠিত স্বরে বললো
-"সমস্যা নেই ভাইয়া ড্রপ করে দিতে হবে না।আমি রিক্সা নিয়ে চলে যেতে পারবো।"
মুগ্ধ উচ্ছ্বসিত হেসে বললো
-"চলে যেতে পারবে বলছে।
প্রাণেশা বাঁধা দিলে ওদের কথায়। গম্ভীর স্বরে বললো
-"তুই কেমন ছেলে রে মুগ্ধ!দেখছিস একটা মেয়ে একা যেতে ভয় পাচ্ছে,তবুও তুই তাকে একা চলে যেতে বলছিস।আমরা কেও গেলে আমরাই নামিয়ে দিতাম,কিন্তু আমরা আরো কিছুক্ষণ থাকবো এখানে।তাই ওঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা তোকে বলা হচ্ছে। নয়তো তুই যে আলসের আলসে,একটা কাজও তো করস না।"
নিজের ইজ্জতে হাত পড়ছে অনুভব করে মুগ্ধ থামিয়ে দিলো প্রাণেশাকে। মুখ ফুলিয়ে বললো
-"ঠিক আছে,পৌঁছে দিব আমি।আর ইজ্জত মারিস না!"
মুগ্ধ চোখ ছোট ছোট করে দেখলো তাজিমকে।ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে।মুগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে বোঝালো 'দেখে নিব তোকে।'
পরক্ষণেই তুলি কে উদ্দেশ্য করে বললো
-"তুলতুলি চলো।"
তুলি হাঁটা দেয় ওর সাথে।হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ তাকালো তুলির দিকে।মুখে লেপ্টানো বিস্তৃত হাসি ওর।যেন ও মনে মনে চাইছিলো মুগ্ধ ওঁকে পৌঁছে দিক।মুগ্ধ হালকা হাসলো।মেয়েটার সব কাহিণীই বোঝে ও।বোঝে ওর ফিলিংসও।নম্র,ভদ্র,সুমিষ্ট একটা মেয়ে।উলোটপালোট কিছু দেখলেই ভয়ে সিটিয়ে যায়।যারা নরম মনের হয় তারা আসলে রাজনীতি করতে পারে না। কিন্তু তুলি এসেছে ওদের দলে।প্রাণেশার পাল্লায় পড়ে এসেছে। মেয়েটা কেন যেন অসম্ভব মানে প্রাণেশাকে,ভালোবাসে।আমাদের জীবনে পরিবারের বাইরেও কিছু প্রিয় মানুষ থাকে।তুলির প্রিয় মানুষ প্রাণেশা।
এসব ভাবতে ভাবতেই গাড়ির কাছাকাছি চলে এলো মুগ্ধ।মুগ্ধ গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। তুলি গিয়ে পেছনের সিটে বসতে যাবে তার আগেই মুগ্ধ বললো
-"হেই তুমি কী আমাকে ড্রাইভার পেয়েছো তুলতুলি!সামনের সিটে এসে বসো।"
থমথম খেয়ে যায় তুলি।মুগ্ধ খারাপ ভাবতে পারে এই ভেবেই তো ওর পাশে বসতে চায়নি।তুলি গুটিগুটি পায়ে এসে বসলো ওর পাশের সিটে।মুগ্ধ গাড়ি স্টার্ট দেয়।তুলি আড়চোখে তাকালো মুগ্ধর দিকে।ঘর্মাক্ত মুখশ্রী। ঘেমে-নেয়ে একাকার ছেলেটা।পরণের শার্ট টা ভিজে চুপেচুপে হয়ে আছে।পিঠের দিকের শার্ট গায়ের সাথে লেপ্টে আছে।তুলি হাসলো।মুগ্ধর তুলতুলি ডাকটা মিষ্টি শোনায় ওর কর্ণকুহরে।প্রথম দেখা হওয়ার দিন থেকেই ছেলেটা এ নামে ডাকে ওঁকে। যদিও প্রথমে দুষ্টামি করেই ডেকেছিলো,কিন্তু এখনো সে ডাক টা ছাড়তে পারেনি।নামের পরিবর্তন করা মোটেও পছন্দ না তুলির, কিন্তু একজন ওর নাম টাকেই পরিবর্তন করে ডাকে আর সেটাও মুগ্ধতার সাথে শোনে তুলি সেটা শুনলে মানুষ নিশ্চয়ই হাসবে!তুলি মাথা নিচু করে ফেলে।মুগ্ধর কাছে আসলে ওর বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়।শান্তিতে থাকতে পারে না ও।কিন্তু পাষাণ ছেলেটা একবার ওর দিকে তাকায় না পর্যন্ত। ও যে সারাদিন মহোময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছেলেটা কী একবারো খেয়াল করে না সেটা!দীর্ঘশ্বাস ফেললো তুলি।মাঝে মাঝে মনের অসম্ভব চাওয়াগুলো আমাদের চায় না।আমরা তা পাওয়ার জন্য ছটফটাতে থাকি।কিন্তু সে চাওয়াগুলো হাতছানি দিয়ে ধরা দেয় না আমাদের হাতে।
.
জ্যামে বসে থাকতে থাকতে তিতিবিরক্ত প্রাণেশা।চট্টগ্রাম শহরের জ্যাম মানেই ঘন্টার ঘন্টা এক অসহ্য বিরক্তি নিয়ে বসে থাকা।প্রাণেশা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো।ক্লান্ত লাগছে অসম্ভব। ক্লান্তিতে সিটের সাথে গা এলিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো ও।কিন্তু কাউকে দেখতেই ধরফর করে উঠে বসে।কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালো বাইরে। রাস্তার অপসিড সাইডে রিধিতা দাঁড়িয়ে আছে একটা দোকানের সামনে।ফোনে দৃষ্টি নিবদ্ধ তার।মাঝে মাঝে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে আশেপাশে। প্রাণেশা ড্রাইভার কে বলে নেমে এলো গাড়ি থেকে।রিধিতা অন্যমনষ্ক হয় দাঁড়িয়ে ছিলো তখনই প্রাণেশা হুট করে সামনে চলে আসায় আঁতকে উঠলো ও। বুকে থুতু দিয়ে হড়বড় করে বললো
-"হঠাৎ কোত্থেকে টপকে পড়লি তুই!"
প্রাণেশা আলতো হেঁসে তাকালো ওর দিকে।হঠাৎ রিধিতা ছুটে এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওঁকে। গদগদ স্বরে বলে
-"অনেকদিন পর!কতটা মিস করেছি জানিস!"
-"কতটা?"
-"অনেক।" হাত দিয়ে অভিনয় করে দেখালো রিধিতা।
প্রাণেশা হাসলো।ভাবুক স্বরে বললো
-"এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো ভাবীপু?এই সন্ধ্যায় প্রহর ভাই আসতে দিলো তোমাকে?"
ঠাট্টা করে বললো প্রাণেশা। রিধিতা মাথা নুইয়ে হাসে। নম্রস্বরে বলে
-"কলেজের একজন কলিগ তার জন্মদিন উপলক্ষে ট্রিট দিয়েছে আমাদের সব টিচারদেরকে।কলেজ ছুটির পরপরই এসেছিলাম আমরা সবাই।কিন্তু কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছিলো টেরো পায়নি।গাড়িও আসতে মানা করে দিয়েছিলাম ফোন করে।তাই ক্যাব খুজছিলাম।"
-"ক্যাব খুঁজতে হবে না আর।আসো আমি ড্রপ করেদি তোমাকে।"
-"থ্যাংক্স বাবু!পুরো রাস্তা গল্প করতে করতে যাবো কেমন?"
রিধিতা ওর গলা জড়িয়ে ধরে বললো। প্রাণেশা আলতো হেসে ওর গাল টেনে দেয়।দুজনে গিয়ে বসলো গাড়িতে।আরো মিনিট খানিক অপেক্ষা করার পর জ্যাম ছুটলো।
প্রাণেশা বাইরে তাকিয়ে বসে ছিলো চুপচাপ। রিধিতা মাথা রাখলো ওর কাঁধে। ম্লান কন্ঠে বললো
-"বাড়িতে আসিস না কেন?"
-"এমনিই!"
গা ছাড়া উত্তর প্রাণেশার।রিধিতা আবার বললো
-"অনেক মিস করি রে তোকে।ছোট মা'র কথাও খুব করে মনে পরে। প্রথম প্রথম তো রাহাতের সাথে বসে বসে আমিও কাঁদতাম। কষ্ট লাগতো তোর জন্য!মনে হতো তুই আছিস বাড়িতে।বাচ্চাদের মতো ছুটোছুটি করছিস ওর সাথে।কিন্তু আদতে তুই নেই,শুধু তোর স্মৃতি গুলো রয়ে গেছে।ইউ নো দোস্ত,এই দুনিয়াতে তোর প্রহর ভাইয়ার পর, আমি তোকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।"
প্রাণেশা ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-"আমি ওখানে থাকলে মরে যেতাম ভাবীপু।ঐ বাড়ির দিকে তাকালেই আমার বুকে রক্তক্ষরণ হয়।"
দুজনেই চুপ করে গেলো ক্ষণকালের জন্য।নিরবতা ভেঙে রিধিতা বললো
-"প্রত্যুষ টাও কেমন জানি হয়ে গেছে রে!ফোন করে না তেমন বাড়িতে।মা তো মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে কান্না করে।বাবাও চিন্তা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।দিনকালে, শরীর ভালো যায় না।আমার দম বন্ধ হয়ে আসে রে ঐ বাড়িতে।চারিদিকে খালি বিষাদের ছোয়া।"
প্রাণেশার মনটা আনচান করে উঠলো।যতই ঐ বাড়ি থেকে চলে আসুক,কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যি এটাই যে ঐ মানুষগুলো ওর সবচেয়ে কাছের।বড় বাবা আর বড় মা'র কষ্টের কথা যে এখনো ওর বুকে পীড়া দেয়।প্রাণেশা ঢোক গিলে, সিক্ত গলায় বললো
-"বড় মা আর বড় বাবাকে দেখে রেখো ভাবীপু।তুমি ছাড়া যে এখন ঐ বাড়িতে আর কেউই ওদের দেখে রাখার মতো নেই।
রিধিতা বড় করে শ্বাস ছাড়ে।প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে মলিন স্বরে বললো
-"ওরা তো আমার মা-বাবা।ওদের না দেখলে কাদের দেখবো! তোর খবর বল।বিয়েসাদী কী করবি না?চব্বিশ তো হয়ে গেছে,আর কতো সিঙ্গেল থাকবি!আমার ওতো একটা বিয়ে খেতে মন চায়।"
প্রাণেষা তাচ্ছিল্য হাসলো।রিধিতা মজা করে বললেও প্রাণেশা তা মজা হিসেবে নিতে পারলো না।প্রাণেশা কাঠকাঠ স্বরে বললো
-"আমার বিয়ে করার শখ অনেক আগেই ঘুচে গেছে ভাবীপু!যার জন্য বউ সাজতে চেয়েছিলাম,সেই আমার সামনেই অন্য কোনো নারীকে বউ সাজিয়ে নিয়ে এসেছিলো।সেদিন থেকেই এই বিয়ে নামক শব্দটার প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গেছে।"
রিধিতার মুখ কালো হয়ে যায়।কালো মেঘ জমে ওর আদলে। প্রাণেশা অন্যদিকে কথা ঘুরিয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো রিধিতাকে।দুজনের এ কথা ও কথার মাঝেই রাস্তা ফুরিয়ে যায়,গাড়ি এসে থেমে যায় গন্তব্যে। রিধিতা আর প্রাণেশা নামলো গাড়ি থেকে।রিধিতা প্রাণেশার হাত ধরে আকুল স্বরে বললো
-"তোর সাথে সময়টা যেন খুব দ্রুতই চলে গেলো।দুজনের আলদা আলাদা বাড়িতে ঢুকতে হবে।দু বাড়ির মানুষগুলা অন্য বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখাও অশৌচ মনে করছে!অথচ একটা সময় সবাই এক বাড়িতে এক সাথে মিলেমিশে থাকতাম।"
প্রাণেশা ঠোঁট কামড়ে দৃষ্টি নিচে রাস্তায় নিবদ্ধ করলো। রিধিতা আবার বললো
-"জানি,অন্যায় আবদার।তবুও,সময় পেলে একবার আসিস রে বাড়িতে।মা-বাবা একটুও ভালো নেই।বাবার শরীর খারাপ যাচ্ছে আর মা মানসিক ভাবে কষ্ট পাচ্ছে। অন্তত মানুষ দুটোকে দেখতে আসিস।তোকে দেখলে অন্ততপক্ষে শান্তি পাবে ওরা।কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনটা খুশি হয়ে যাবে।আসবি তো?"
প্রাণেশা মলিন হাসলো।বললো
-"যাবো।অবশ্যই যাবো।মানুষগুলোর উপর আমার দায়িত্ব আছে না!ও বাড়িতে আমার যে একটা না হওয়া সংসার পড়ে আছে।"
#চলবে