পরিণীতা
পর্ব:২৭+২৮
তানজিনা ইসলাম
প্রত্যুষের গম্ভীর আদলে ফুরফুরে হাসি।গতিতে চঞ্চলতা।চোখেমুখে খুশি উপচে পরছে।অস্হির ভঙ্গিতে হেঁটে চলেছে সে।মনে অসীম, বাঁধভাঙ্গা আনন্দ।প্রায় ছয়টা বছর পর নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় পা রেখেছে ও।নিজের কাছের মানুষগুলোর নিকট যে আবার ফিরতে পারবে সেটা ভাবতে পারেনি প্রত্যুষ।আবার যে চেনা প্রিয় মুখগুলোর সামনাসামনি দেখা পাবে,চোখ ভরে দেখতে পারবে তাদেরকে সেটাও কল্পনাতীত ছিলো।কিছুদিন আগেও প্রত্যুষের মনে ঠাঁসা ছিলো সে আর কোনোদিন ফিরবে না।দেখবে না ওর প্রতি অন্যায় করা মানুষগুলোর মুখ।যাই হয়ে যাক না কেন প্রিয় জন্মভূমি তে আর ফেরা হবে না ওর।কিন্তু বাবার অসুস্থতা সব মিথ্যা প্রমাণ করে দিলো।আপনজনদের উপর যতই অভিমান-কষ্ট পোষণ করা থাকুক না কেন আমাদের আবার তাদের কাছেই ফিরে আসতে হয়।প্রত্যুষেরও ফিরতে হলো,নিজের প্রতি দৃঢ় থাকা সম্ভব হলো না ওর পক্ষে।
প্রত্যুষ আরেকবার চোখ ভরে দেখে নিলো নিজের প্রাণপ্রিয় বাড়িটি।যেখানে কেটেছে ওর সুন্দর শৈশব।যেখানে আছে ওর প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্য,তাদের সাথে কাটানো সুন্দর স্মৃতি। সবুজ ঘাস মাড়িয়ে এগিয়ে যায় প্রত্যুষ।আচ্ছা, ওর মা ওঁকে দেখলে কেমন অবাক হবে,নিশ্চয়ই চমকে যাবে! আর ওর ভাবীপু অভিযোগের লিস্ট নিয়ে বসবে নিশ্চয়। মায়ের সান্নিধ্য ভালোবাসা পাওয়ার লোভে আরেকবার মন পুলোকিত হয় ওর।পিছনে রওশা প্রোজ্জ্বল কে সাথে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে।কিন্তু প্রত্যুষের কী সে সময় আছে, যে ওদের সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে আসবে!
সদরদরজা হাট করে খোলা। প্রত্যুষ সদরদরজা দিয়েই উঁকি মেরে চাইলো।বসার ঘরে সোফার উপর মলিন মুখে বসে আছেন মালিহা বেগম।পাশেই রিধিতা তার কাঁধে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে বসে আছে তাকে।মায়ের কাছে ফ্লোরে পা গুটিয়ে বসে আছে রাহাত।ক্ষুদ্র ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। কান্নায় সিক্ত বাচ্চা মুখ।মালিহা বেগমের বিধ্বস্ত দশা।শুষ্ক, নিষ্প্রাণ চোখ।যেন অনুভূতিহীন, নির্বিকার।কিন্তু ফোলা ফোলা ফোলা চোখে, গালে চোখের পানির ছাপ স্পষ্ট।পাশেই রিধিতা নাক টানছে।রাহাত মায়ের আঁচল ধরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ পড়লো দরজায়।প্রত্যুষ কে দেখে, অবাক হয়ে গোল গোল চোখে তাকালো ও।সেকেন্ডে,সজোড়ে চিৎকার করে বললো
-"চাচ্চু!"
রাহাতের কথায় চমকে তাকালো দু'জনে। তীরের বেগে দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হলো প্রত্যুষের দিকে।মালিহা বেগম কান্না ভুলে ফ্যালফ্যাল নয়নে চেয়ে রইলেন ওর দিকে।প্রত্যুষ ছলছল চোখে ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো সদরদরজা পেরিয়ে। রাহাত উঠে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ বেগে দৌড় দিলো!ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো প্রত্যুষের কোমড়।প্রত্যুষ তাল সামলাতে না পেরে দু'পা পিছিয়ে যায়।মালিহা বেগম আর রিধিতা সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেছেন।প্রত্যুষের আগমন যেন ভাবনাতীত ছিলোওদের জন্য।মালিহা বেগম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।অবিশ্বাস্য দৃষ্টি তার।রিধিতা স্তম্ভিত।
প্রত্যুষ অশ্রুসজল চোখে চাইলো রাহাতের দিকে।মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো ওর।পরক্ষণেই রাহাতকে ছেড়ে এগিয়ে আসলো মায়ের কাছে।মালিহা বেগম দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলেন ওঁকে। শক্ত হস্তে জড়িয়ে বুকের সাথে মিশে থাকলো ক্ষণকাল।উদ্বিগ্ন, কম্পিত স্বরে কাঁপতে কাঁপতে বললো
-"প্রত্যুষ!কীভাবে এলি তুই?আমি স্বপ্ন দেখছি না তো।তুই সত্যিই এসেছিস,বাবা?আমি সত্যিই জড়িয়ে ধরেছি তোকে?"
প্রত্যুষ শ্বাস টেনে, তৃপ্তি ভরে অনুভব করলো মাতৃত্বের গন্ধ।এই মা মা গন্ধ টা-ই তো হন্যে হয়ে খুঁজ ছিলো ও। ছ'টা বছর এই মানুষটার ছোয়া পায়না ও।কতগুলো রাত এই মানুষটাকে মনে করে কেঁদেছে ও তার হিসেব নেই।তবুও কোথাও যেন আড়ষ্টতা থেকে যেতো।মালিহা বেগম ফোন করলেই কান্নাকাটি শুরু করতো।প্রত্যুষের বুক ভেঙে আসতো এতে।মন চাইতো ছুটে চলে আসতে। কিন্তু ও যে প্রতিজ্ঞা করে রেখেছিলো কোনোদিন আর এদেশের মাটিতে পা রাখবে না।যদি ও দুর্বল হয়ে যেতো মায়ের কথা শুনে তাইতো মায়ের সাথে বেশি কথা বলতে চাইতো না ও।কিন্তু সেই তো নিজের প্রতি করা প্রতিজ্ঞা ভাঙতে হলো ওর।আবার ফিরে আসতে হলো নিজের নীড়ে।
মালিহা বেগম গলা ছেড়ে কাঁদছেন।তবে এ কান্না খুশির।নিজের ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের।দু'দিন ধরে আতঙ্কে আছে ওরা সবাই।এবার সেই আতঙ্কে অনেকটা প্রশান্তি হয়ে ফিরে এসেছে প্রত্যুষ।বুকটা শান্ত হয়ে গেছে,মনে হচ্ছে সব আতঙ্ক,বিপদ যেনো কেটে গেছে।
চোখের জলে প্রত্যুষের শার্ট ভিজে যায়।প্রত্যুষ সরে এসে সযত্নে মুছে দিলো মায়ের অশ্রু।মোলায়েম স্বরে বললো
-"আমি চলে এসেছি আম্মু।দেখো চলে এসেছি তোমার কাছে।আর কেঁদো না।নিজের কী অবস্থা করেছো আয়নায় দেখেছো!আমার মা'কে কষ্ট দেওয়ার এতো সাহস কী করে হলো তোমার!"
মালিহা বেগম প্রত্যুষের চোখেমুখে হাত বুলিয়ে দিলেন।কন্ঠে অসীম আশা ঢেলে বললেন
-"আর যাবি না তো আমাকে ছেড়ে?"
প্রত্যুষ হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেলো।গালের সাথে মায়ের হাত লাগিয়ে হেঁসে বললো
-"যাবো না।"
মালিহা বেগম জ্বলজ্বল চোখে চাইলেন ওর দিকে।ঠোঁট ভর্তি চকচকে হাসি তার।দৃষ্টিতেই তার খুশি উপচে পড়লো।পরক্ষণেই নাক টেনে বললেন
-"প্রত্যুষ তোর বাবা..
থামিয়ে দিলো প্রত্যুষ।নিজ থেকেই সুধালো
-"জানি আমি।বড় ভাইয়া ফোন দিয়েছিলো। এয়ারপোর্ট থেকে হসপিটালে গিয়ে, বাবাকে দেখে তারপর এসেছি।ফ্রেশ হয়ে আবার যাবো হসপিটালে।আদনান আর প্রহর ভাইয়া আছে বাবার সাথে।"
-"ভালো করেছিস।কিছু খেয়ে রেস্ট নে আগে।"
প্রত্যুষের চোখ পড়লো রিধিতার দিকে।হাসিমাখা মুখে তাকিয়ে আছে ও।প্রত্যুষ হাসিমুখে ডাকলো
-"ভাবীপু!"
-"আমাকে তো একজনের চোখেই পড়ছে না।তুমি মনে হয় আমাকে চেনো না সাহেব?"
রিধিতা মিছিমিছি রাগ করে বললো।প্রত্যুষ ঠোঁট উল্টালো।বাচ্চাদের মতো করে বললো
-"ওহ নো!এ বাড়ির সর্দারনী কে আমি কীভাবে অদেখা করতে পারি।ভুল হয়ে গেছে আমার, মাতা রাণী!"
-"এবারের মতো ক্ষমা করলাম বৎস!"
হেঁসে দিলো প্রত্যুষ,সাথে রিধিতাও।পরক্ষণেই বললো
-"তুমি একা?"
-"আর কারো আসার কথা ছিলো কী?"
আমতা আমতা করে হাসলো রিধিতা।সদর দরজার সামনে রওশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাসি চওড়া হলো আরো।হাসিমুখে ফিসফিসিয়ে বলেই ফেললো
-"আমিতো মনে করেছি মেয়েটাকে দুর দেশে রেখে একাই চলে এসেছো!"
-"এতোটা দায়িত্বহীন মনে হয় তোমার দেবরকে!"
রিধিতা উত্তর দিলো না।শুধু চোখ দিয়ে আস্বস্ত করলো। রাহাত প্রোজ্জ্বল কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো।রওশার আঁচলের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে সে। বাবুটার কথা মায়ের কাছে অনেকবার শুনেছে রাহাত।কিন্তু কোনোদিন মুখ দেখতে পারেনি।আজ দেখলো,কিন্তু কেনো যেনো কথা বলতে ইতস্তবোধ করছে।মালিহা বেগম রওশাকে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন
-"ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন রওশা?আমাদের কাছে এসো।"
রওশা নরম পা ফেলে এগিয়ে আসলো।তার পিছু পিছু প্রোজ্জ্বল নিজেকে আচলের তলায় লুকিয়ে ছোট ছোট পা মেলালো ওর সাথে।পরক্ষণে উঁকি দিয়ে অপরিচিত মুখ দেখে আবার নিজেকে আড়াল করে ফেলে।সবাই হাসলো ওর অবস্থা দেখে। মালিহা বেগম এগিয়ে গিয়ে রিধিতার পেছন থেকে টেনে আনলো ওঁকে।শুঁকনো মুখে তাকালো প্রোজ্জ্বল। মালিহা বেগম কপালে চুমু খেলেন ওর।মুচকি হেসে কোলে তুললেন। বললেন
-"দাদুভাই!"
প্রোজ্জ্বল অবুঝ দৃষ্টিতে তাকালো। এ ডাকের সাথে পরিচিত না ও।প্রত্যুষের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অভিযোগ জানালো প্রোজ্জ্বল।প্রত্যুষ মুচকি হেঁসে বললো
-"ভয় পেয়ো না। তোমার দাদীমা।"
প্রোজ্জ্বল বুঝলোনা এর মানে।তবুও বাবা যেহেতু আস্বস্ত করেছে তাই ও একদম শান্ত।
রিধিতা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো ওদের কাছে।মালিহা বেগমের কোল থেকে নিতে নিতে বললো
-"দেখি দেখি আমাকে দাও।"
রিধিতা মালিহা বেগমের কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিলো ওঁকে। গাল টেনে দিয়ে বললো
-"মাশাল্লাহ!নজর না লাগুক। এতো সুন্দর দেখতে হয়েছে।ভীনদেশী বাবাই!"
মালিহা বেগম তাকালেন প্রত্যুষের দিকে।পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন
-"মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন?খাসনি কিছু।"
-"খেয়েছি আম্মু।প্লেনে খাবার দিয়েছে।"
-"কী ছাতার মাথা খেতে দিয়েছে রে!মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে।রুমে যা ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি রান্না বসাচ্ছি।"
মালিহা বেগম মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন।প্রত্যুষ মাথা নাড়লো।রিধিতা প্রোজ্জ্বল কে কোলে নিয়ে বললো
-"তোমরা দু'জন ফ্রেশ হয়ে এসো।প্রোজ্জ্বল আমার কাছে থাক।"
-"না,না আমি চলে যাবো।বাবা আমাকে নিয়ে যাও।"
অস্হির চিত্তে বললো প্রোজ্জ্বল। প্রত্যুষ হেসে দেয়।রিধিতাকে উদ্দেশ্য করে বলে
-"নামিয়ে দাও ভাবীপু।অনেক ধকল গেছে।ওকেও ফ্রেশ করিয়ে দেওয়া দরকার।"
প্রোজ্জ্বল কোল বেয়ে নেমে গেলো। দৌড় লাগালো বাবার কাছে।প্রত্যুষ জড়িয়ে নেয় ওঁকে। হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়।তিনতলার শেষ সিড়িতে আসতে থমকালো প্রত্যুষ।আশেপাশে চঞ্চল চোখ ঘুরিয়ে চাইলো।ভেতরটা উশখুশ করছে খুব।বুকের মধ্যে ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে। স্মৃতির পাতায় হানা দিচ্ছে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি গুলো।
ছোট ছোট পায় চঞ্চল চিত্তে কারো সাথে দৌড়ে বেড়ানো। তার সাথে লুকোচুরি খেলা।তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়ানো।কোথায় চলে গেলো সেই সুন্দর ছোটোবেলা! কোথায়!কোথায় বা ওর প্রিয় মানুষ! যে শুধুই বুকের মধ্যে স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে।
বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ওর।প্রোজ্জ্বলের হাত ধরে কক্ষের কাছে এগিয়ে যায় ও।দূরদৃষ্টে তাকায় ওপাশের কক্ষটির দিকে।লং বারান্দায় ওর ঘরটা পেরিয়ে বিপরীত পাশের ঘরটা।সেখান থেকে কেও একজন প্রতিনিয়ত তাকে উঁকি মেরে দেখতো।সত্ত্বা গুলিয়ে ফেললো প্রত্যুষ।বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে অক্লিষ্টে ঢোক গিললো। এই জন্যই তো ফিরতে চাইনি ও।মনের কোণে দাফন করা কষ্টগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।প্রত্যুষের দরজায় খিল দেওয়া, কিন্তু তালাবদ্ধ না।দরজা খুলে প্রোজ্জ্বল কে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আধারে নিমজ্জিত ঘরে,দেয়াল হাতড়ে লাইটের সুইচ খুঁজলো। লাইট জ্বালিয়ে জানালার দিকে এগিয়ে যায়।জানালার উপর পর্দা টানানো,বেলকনির দরজাও বন্ধ। প্রত্যুষ পর্দা সরিয়ে জানালার গ্লাস,বেলকনির দরজা খুলে দিলো।বাইরের সূর্যের কিরণ রুম জুড়ে ছড়াতেই পুরো কক্ষে চোখ বোলালো প্রত্যুষ।ঝা-চকচকে রুমটি দেখে মনেই হবে না এই কক্ষে ছয় বছর ধরে কেও থাকে না।কোথাও একটু ধুলাবালি নেই।প্রতিটি জিনিস তার আগের জায়গায় রাখা,একটা জিনিসও এদিক ওদিক হয়নি।ওর আর্টের জিনিসগুলোও সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে কেও।ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো প্রত্যুষ।ও জানে এসব কার কাজ।মালিহা বেগম যে এত বছরে এই রুমে কাওকে ঢুকতে দেয়নি তা রুমের অবস্থা দেখেই বোঝা যায়।হয়তো প্রতিদিন এসে রুমের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র জিনিস পরিষ্কার করে যেতেন তিনি।ফার্নিচার গুলোও চকচক করছে, প্রতি দিন যে এসব মোছা হতো এটাই তার প্রমাণ।
প্রত্যুষ তুলতুলে বিছানায় বসে হাত বাড়িয়ে ডাকলো প্রোজ্জ্বল কে।প্রোজ্জ্বল গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায়।প্রত্যুষ কোলে বসালো ওঁকে। গালে আলতো চুমু খেয়ে বললো
-"কেমন লাগলো সবাইকে বাবা!"
প্রোজ্জ্বল চুপ করে বসে থাকে।প্রত্যুষ ওর গাল টেনে দিয়ে
আবার বললো
-"ধীরে ধীরে ভালো লাগবে সবাইকে।এতটাই ভালো লাগবে যে ওঁদের ছাড়া এক সেকেন্ড থাকতে পারবে না তুমি, মানুষগুলোই যে এমন।মায়ায় ভরা।ওরা আমাদের পরিবার প্রোজ্জ্বল।শুধু ওরা না, আমাদের আরেকটা পরিবার আছে,যারা আমাদের চেয়ে খানিকটা দুরত্বে থাকে।অভিমানে জর্জরিত হয়ে ওরা আমাদের থেকে দুরে সরে গেছে।কিন্তু দেখো বাবা,আমরা আবার এক হয়ে যাবো।"
.
পিয়াস ভূইয়া ড্রইং রুমের সোফার উপর চিন্তিত বদনে বসে আছে।কপালে গাঢ় ভাঁজের পুরু রেখা। মনে উথাল-পাতাল শঙ্কা তার।বাবার মতো বড় ভাইকে দেখে আসার পর থেকেই মনটা বড়ো খচখচ করছে। মানুষটা তার কাছে অনেক বেশিই মূল্যবান।ও বাড়িতে পা না রাখলেও প্রতিনিয়ত ফোন দিয়ে খোঁজ নিতেন তিনি।পলক ভূইয়া কেঁদে কেঁদে বোঝাতেন তার কষ্টের কথা। তার একটা ভুলের জন্য তার ছেলে মেয়েরা তার থেকে দুরে সরে গেছে, এই নিয়ে আফসোসের শেষ ছিলো না তার।পিয়াস ভূইয়া তিক্ত শ্বাস ছাড়লেন।বড়ই কষ্ট হচ্ছে বুকের ভেতর।শক্তপোক্ত, গম্ভীর-রাগী বড় ভাইকে এই অবস্থায় দেখে বুক ভেঙে আসছে।
মানারা বেগমের ডাকে সম্বিত ফিরলো তার। চায়ের কাপ এগিয়ে দিলেন তিনি।পিয়াস ভূইয়া হাত বাড়িয়ে নিলেন।মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে তার।দু-তিন রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারে নি।চা খেলে যদি মাথা ব্যাথা কমে সেই আশায় চা চেয়েছেন।পিয়াস ভূইয়া মোলায়েম স্বরে বললেন
-"ভাবী কে দেখতে যাওনি?"
-"যাবো না তো!তুমি আসার আগ পর্যন্ত ওখানেই ছিলাম।অনেক কাঁদছিলো জানো।প্রচন্ড ভেঙে পরেছে ওরা।"
-"বড়ো ভাই যে ওদের সংসারের মাথা।শুধু ওদের না আমাদেরও।আমরা তো একটা পরিবারই বলো!"
মানারা বেগম মুখ কালো করে সোফায় পিয়াস ভূইয়ার পাশে বসলেন। কাঁদোকাঁদো স্বরে বললেন
-"তো!আমি কী কোনোদিন ওদেরকে নিজের থেকে আলাদা কেও ভেবেছি। একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে নাহয় আলাদা হয়ে গেছি। কিন্তু এর জন্যে কী ভালোবাসা কমে গেছে!ওরা তো আমাদের কাছের মানুষ!আমাদের আপনজন।ওদের বিপদ কী আমাদের বিপদ নয়!"
পিয়াস ভূইয়া ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন।অনেক্ষণ ধরেই একটা কথা বলার জন্য আকুপাকু করছিলেন তিনি।শেষমেশ পেটে কথা রাখতে না পেরে হাঁস-ফাঁস করে শুধালো
-"জানো, প্রত্যুষ এসেছে।"
মানারা বেগম স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকালেন।উৎসুক,বিভ্রান্ত চাউনি।উত্তেজনায়, কম্পিত স্বরে বললেন
-"কী বলো! কখন?"
-"কাল সন্ধ্যায়।পুরো রাত হসপিটালে ছিলো।সকালে আমি ওঁদের সাথেই এসেছি।"
মানারা বেগম মোলায়েম স্বরে বললো
-"ভালোই হয়েছে। ছয়টা বছর নিজের বাড়ি-ঘর, মা-বাবা সবার থেকে দুরে ছিলো।অবশেষে বাড়ির ছেলে বাড়িতে ফিরে এসেছে এই অনেক।"
পিয়াস ভূইয়া উপর-নীচ মাথা নাড়লেন।চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন
-"প্রাণেশা কই?"
-"কক্ষে ঘুমোচ্ছে। মেয়েটাও তো কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে।প্রিয়মও এখনো উঠেনি ঘুম থেকে।"
-"ঘুমোক। ডাকার দরকার নেই দু'জনকে। "
-"হুম।"
কিয়ৎক্ষণ চুপ থাকার পর মানারা বেগম নিষ্প্রভ কন্ঠে বললেন
-"প্রাণেশা আর প্রিয়মের সাথে দেখা হয়েছে প্রত্যুষের?"
-"না,ও আসার আগেই আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ওঁদেরকে।"
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মানারা বেগম।মলিন কন্ঠে বললেন
-"শুনেছি প্রত্যুষের বেবি হয়েছে!"
-"হ্যাঁ,দেখেছি।গাড়িতে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।কিন্তু বেবিটা ওদের না,এডপ্টেড!"
-"কী বলো!কে বলেছে এই কথাটা?"মানারা বেগম হতবাক হয়ে বললেন।
-"ভাইজান,আর কে!একমাত্র তার সাথেই তো কথা হতো আমার।" সূক্ষ্ণস্বরে বললেন পিয়াস ভূইয়া।
-"আমি আসলে জানতাম না।ও বাড়ির কারো সাথেই তো তেমন যোগাযোগ ছিলো না আমার।মাঝেমধ্যে রিধিতা ফোন দিতো শুধু। উড়ো খবর পেয়েছিলাম যে প্রত্যুষের ছেলে হয়েছে।এর বাইরে এতো কিছু জানতাম না।"
-"হু।শুনো প্রাণেশা কে এসবের কোনো কিছুই বলার দরকার নেই।"
পিয়াস ভূইয়া কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন।
-"প্রাণেশাকে কেন বলতে যাবো!আমি মা হয়ে আমার মেয়েটাকে আবার কী করে কষ্ট দিতে পারি!ও এখনো এসবে আটকে আছে।যতই বলুক ভুলে গেছে।কিন্তু আমি তো বুঝতে পারি। প্রিয়ম দুষ্টুমি করে বিয়ের কথা তুললেও ছ্যাৎ করে উঠে।"
পিয়াস ভূইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মানারা বেগম উঠে গেলেন পাশ থেকে।বেলা গড়াচ্ছে। ভাই-বোন দুটো দুপুরে ঘুম থেকে উঠবে সেটা জানা আছে ওনার।একেবারে দুপুরের খাবার খাবে ওঁরা। তবুও প্রাণেশার চা লাগবে।প্রচুর চায়ের নেশা ওর।ঘুম থেকে উঠে চা না পেলে পুরো বাড়ি চিল্লিয়ে মাথায় তুলবে।চা বানিয়ে আবার ডাকতে যেতে হবে ওদেরকে, ভেবেই মানারা বেগম কিচেনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলেন।
.
প্রোজ্জ্বল গুটিগুটি পায়ে উঠানের মধ্যে হাঁটছে।সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল উঠানের দুপাশে সুন্দর বাগান।বাগানে হরেকরকমের শীতকালীন সবজি বাগানের মাধুর্যতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।প্রোজ্জ্বল স্পন্দিত,বিমোহিত নেত্র যুগলে চারপাশে তাকিয়ে দেখছে।ওষ্ঠপুটে চকচকে হাসি লেপ্টে আছে।দুপুর গড়িয়ে বিকেলের সময়ে বর্তিত হয়েছে।সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে।শীতের বিকেল কখন চোখের পলকে কেটে যায়,তা টের পাওয়াও মুশকিল।
পুরো উঠানে হাঁটছে প্রোজ্জ্বল। সবকিছু কেমন যেন নতুন নতুন মনে হচ্ছে ওর কাছে।লন্ডনের পরিবেশ আলাদা।কিন্তু এই পরিবেশটা অসম্ভব সুন্দর মনে হচ্ছে ওর কাছে।ছোটবেলা থেকে যে পরিবেশে হয়েছে, যা দেখে বড় হয়েছে তার চেয়ে ভিন্ন কিছু দেখতে ভালো লাগছে ভীষণ।প্রোজ্জ্বল দৌড়ে গেটের কাছে আসলো।গেটের বাইরে উঁকি দিয়ে রাস্তার দু'পাশে তাকালো।কিছুক্ষণ পরপর দু-একজন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন ধরণের যানবাহন দেখে হাত তালি দিলো প্রোজ্জ্বল। এসব ওর কাছে একেবারে নতুন।লন্ডনে থাকতে সবসময় বাড়ির মধ্যে বন্দী হয়ে থাকতে হতো ওর।ও নিজেও বেরোতো না সাহস করে।কিন্তু এখানে সবকিছু খোলামেলা।যখন মন চাই তখন বেরোনো যায়।নিজ থেকে একটু দুরে, রাস্তার অপর সাইডে একটা ফুটবল পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গেলো প্রোজ্জ্বল। হাতে তুলে নিয়ে আশেপাশে তাকালো।নাহ,কেও তো নেই।তাহলে এটা কার?
সেকেন্ডেই, একটা গুলুমুলু টাইপের বাচ্চা ছেলে দৌড়ে এলো ওর কাছে।হাত থেকে বলটা ঝাড়া মেরে কেড়ে নিয়ে কর্কশ স্বরে বললো
-"অ্যাই,তুই আমার বল ধরলি কেন?"
ভয় পেলো প্রোজ্জ্বল। এভাবে উচ্চ স্বরে কেও কখনো ওর সাথে কথা বলেনি।এমনকি ওর বাবাও না।তাই এই কর্কশ বাক্য ওর কাছে বিষাক্ত লাগলো বটে!তবুও ঢোক গিলে মিনমিন করে বললো
-"সরি।"
প্রোজ্জ্বল জানে ভুল করলে সরি বলতে বলতে হয়। ওর বাবা শিখিয়েছে ওঁকে। আর ছেলেটা যেহেতু ওর চেয়ে বড়, তাই সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে।ছোট্ট মস্তকে এটুকু ভাবলো প্রোজ্জ্বল। কিন্তু ছেলেটার হয়তো আজ সরি গ্রহণ করার মুড নেই।তাই সে তপ্ত স্বরে বললো
-"সরি বললেই হলো! আমার বল ধরেছিস কেন সেটা বল।আর তুই কোত্থেকে এলি?আগে তো কখনো দেখিনি তোকে।এলাকায় নতুন?"
পিটপিট করে তাকালো প্রোজ্জ্বল। এতোগুলো প্রশ্নের উত্তর একসাথে তৈরি করতে পারলো না।তারউপর ছেলেটা জন্ম থেকে ইন্ট্রোভার্ট,চুপচাপ,দুর্বল।একমাত্র প্রত্যুষের সাথেই মন খুলে কথা বলতে পারে ও।তাও প্রত্যুষ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলালে তারপর বলে।প্রোজ্জ্বলের চুপ থাকায় অপরজনের মনোক্ষুণ্ণ হলো যেন! তাই সে চিল্লিয়ে বললো
-"অ্যাই! কথা বলিস না কেন!এটিটিউড দেখাচ্ছিস আমাকে!"
বলতে বলতেই ধাক্কা দিলো ওঁকে।ছোট দেহে তাল সামলাতে না পেরে পায়ের সাথে পা বেঝে পড়ে গেলো প্রোজ্জ্বল। জোরে-সোরে ব্যাথাও পেলো কোমড়ে।ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিলো প্রোজ্জ্বল।ওঁকে কাঁদতে দেখে ছেলেটার মায়া হবে তো দুর,উল্টো হিসহিসিয়ে বললো
-"তোর নাটক বন্ধ কর।আমাকে ফাসানোর জন্য কাঁদছিস তাই না।ওরে,একটু ধাক্কা দিলেই পড়ে যায়।"
প্রোজ্জ্বল ভয়ে আরো জোরে কেঁদে দেয়।ছেলেটা আবার হাত উঁচিয়ে মারতে যাবে, তার আগেই একজনকে দেখে থেমে যায়। প্রাণেশা প্রোজ্জ্বলের পিছনে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।ছেলেটা হাত নামিয়ে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়ালো। প্রোজ্জ্বল চোখ খিঁচে বসে আছে।হিচকি তুলছে ক্রমাগত।প্রাণেশা হাত বাড়িয়ে টেনে তুললো ওঁকে।প্রোজ্জ্বল দ্রুত পায়ে পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো ওর।প্রাণেশার পরণের টিশার্ট খামচে ধরে মুখ লোকালো।প্রাণেশা এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো ছেলেটার দিকে।ব্যগ্র কন্ঠে বললো
-"এই বেয়াদব! মারছিলি কেন ওঁকে? সবসময় তোকে নিজের নেতা গিরি দেখাতে হবে তাই না!তোর জন্য এলাকার একটা বাচ্চাও শান্তিতে নেই।নিজেকে কী মনে করিস তুই!"
-"ও আমার বল কেড়ে নিয়েছিলে প্রাণ আপু।" মিনমিন করে বললো ছেলেটা।
-"মিথ্যা বলছিস আমাকে শাওন।নিজের দোষ ঢাকতে ওর উপর দোষ দিচ্ছিস তাই না!"
প্রাণেশা ভ্রু কুঁচকে বললো। শাওন ব্যগ্র চিত্তে দু'পাশে মাথা নাড়ে।অভিযোগের সুরে বললো
-"মিথ্যা বলছি না।ও সত্যিই আমার বল কেড়ে নিয়েছে।নয়তো এমনি এমনি কেন মারবো আমি ওঁকে! আমি না ভালো ছেলে।"বলেই আমতা আমতা করে হাসলো।
-"ওলে আমার ভালো ছেলে রে!ভালো ছেলে রা রাস্তায় মারামারি করে?আমি জানি এমনিই মেরেছিস তুই ওঁকে।দেখ কতটা ভয় পাচ্ছে ও।আতঙ্কে ফেলে দিয়েছিস বাচ্চাটাকে।"
-"সত্যি বলছি আপু।ট্রাস্ট করো আমাকে।"
প্রাণেশা বাহু ধরে প্রোজ্জ্বল কে সামনে আনলো।ভয়ার্ত দৃষ্টিতে প্রাণেশার দিকে তাকালো ও।আবার ঝাপটে ধরলো প্রাণেশাকে। কম্পিত স্বরে বললো
-"আমাকে মারবে। আমি অনেক ব্যাতা পেয়েছি।"
প্রাণেশা নরম দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কোমল স্বরে বললো
-"ভয় পেয়ো না। আমি আছি তো।আমি থাকতে মারতে পারবে তোমাকে কেও!তুমি বলতো তুমি ওর বল কেঁড়ে নিয়েছিলে?"
টলমল চোখে তাকালো প্রোজ্জ্বল। ভেজা গলায় বললো
-"আমি তত্যি বলছি আমি ওর বল কেড়ে নিই নি।বলটা রাস্তায় পড়েছিলো,আমি তুলেছি।কিন্তু নিই নি,ওর বল ওঁকে দিয়ে দিয়েচি।তারপরও আমাকে মেরেচে।"
প্রাণেশা তেতে তাকালো শাওনের দিকে। ক্ষিপ্ত গলায় বললো
-"তোর এই গুন্ডামি আর গেলো না।কয়েকদিন আগেই তো রাহাত কে মেরেছিলি তুই।ও নাহয় শক্ত ছিলো তোর থেকে বেশি ছোটও ছিলো না,তাই তোর সাথে ফাইট করতে পেরেছে।কিন্তু এই বাচ্চাটার গায়েও হাত তুলেছিস তুই।তোর কী বিচার হতে পারে বল আমাকে?ওর মার টা তোকে ফিরিয়ে দেব নাকি তোর মা'কে বিচার দিব।"
শাওন দিশেহারা দশায় জ্বিভে ঠোঁট ভেজালো।আজ সকালেই মায়ের কাছে উত্তম-মধ্যম খেয়েছে ও।প্রতিদিনই ওর নামে একটা না একটা অভিযোগ আসেই আসে।শঙ্কায় ঢোক গিললো শাওন।অন্তঃপুরে দেখা দিলো মায়ের বেদম প্রহারের করুণ চিত্র।অসহায় কন্ঠে বললো
-"সরি প্রাণ আপু।আর হবে না।প্লিজ ক্ষমা করে দাও।"
-"ক্ষমা আমার কাছে না চেয়ে যার সাথে অন্যায় করেছিস তার কাছে চা।এতো মায়া মায়া চেহারার ছেলেটার গায়ে কীভাবে হাত তুললি তুই!" গম্ভীর স্বরে বললো প্রাণেশা।
শাওন ভয়ে শিটিয়ে থাকা প্রোজ্জ্বলের দিকে তাকিয়ে বললো
-"সরি। আর হবে না।তুমি আপুকে বলে দাও,আমার নামে যাতে নালিশ না দেয়।".
প্রোজ্জ্বল প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বোজা গলায় বললো
-"ওর নামে নালিশ দিয়ো না।"
ঠোঁট টিপে হাসলো প্রাণেশা।নিজের সাথে আরেকটু জড়িয় নিলো ওঁকে। শাওনের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললো
-"ঠিক আছে।আজকের মতো বেঁচে গেছিস তুই।আর যেন কাওকে বিরক্ত করতে না দেখি।"
ছেলেটা বাধ্যের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে জায়গা ত্যাগ করলো।
ও চলে যেতেই প্রাণেশা প্রোজ্জ্বলের দিকে তাকায়।মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।প্রাণেশা হাঁটু মুড়ে ওর বরাবর হয়ে বসলো।আলতো হাতে মুছে দিলো সিক্ত চোখ।কান্নার তোপে পুরো মুখ লাল টুকটুকে হয়ে আছে।কিছুক্ষণ পরপর নাক টানছে।এখনো গায়ে কাঁপুনির প্রভাব যায়নি।প্রাণেশা হাত বুলিয়ে দিলো ওর মাথায়।নম্র স্বরে বললো
-"ভয় পেয়ো না।শান্ত হও।ও চলে গেছে।"
-"থ্যাঙ্কিউ।"
-"ওয়েলকাম।" মুচকি হেঁসে বললো প্রাণেশা।
কনুইয়ের দিকে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলো প্রাণেশা।কনুইয়ের অনেকটা জায়গায় কেটে গেছে। চিকন ধারায় রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে।প্রাণেশা আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
-"একি!তোমার হাতে তো অনেকটা কেটে গেছে।ব্যাথা করছে নিশ্চয়ই।"
-"অনেক ব্যাতা।"
ঠোঁট উল্টে বললো প্রোজ্জ্বল। প্রাণেশা দুখী দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
-"তুমি কী এলাকায় নতুন?এর আগে তো কখনো দেখিনি তোমাকে।"
উপর-নীচ মাথা নাড়লো প্রোজ্জ্বল।আধো আধো স্বরে বললো
-"আজকে সকালে এঁচেছি।"
ঠোঁট গোল করে 'ও' বোঝালো প্রাণেশা।প্রোজ্জ্বল মুখে হাত ছোঁয়ালো ওর।প্রাণেশা গোল গোল চোখে তাকালো ওর দিকে।প্রোজ্জ্বল নিজের ছোট ছোট হাতে পুরো মুখে,ঠোঁটে, গালে হাত বোলালো ওর।ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো
-"আমি তোমাকে চিনি।"
হতভম্ব হয়ে তাকালো প্রাণেশা।বিহ্বল আওড়ালো
-"তুমি আমাকে কী করে চেনো?"
গালে হাত ঠেকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো প্রোজ্জ্বল। মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে অবশেষে মনে করতে সফল হলো।হাসিমুখে, উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো
-"বাবার মোবাইলে দেকেচি।"
প্রাণেশা নাক কুঁচকে তাকালো ওর দিকে।কপালে ভাজ ফেলে বললো
-"হেই!তোমার বাবার মোবাইলে আমার ছবি কোত্থেকে আসবে?"
-"জানি না।তবে আমি দেকেচি!মোবাইলে গেইম খেলছিলাম তখন দেখেছি।"
প্রাণেশা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।কোনোদিন রিলেশন করেছে বলে তো মনে পড়ে না,তাহলে ওর গোপন প্রেমিক কোত্থেকে টপকে পড়লো।তাও আবার নিজের মোবাইলে যত্ন করে ওর ছবি রেখে দিবে।প্রাণেশা নিজের ভাবনায় নিজেকেই শ'খানেক গালি দিলো।যে ছ্যাকা খেয়ে বেকা হয়েছে ও,সেই শোক ভুলে কোনোদিন সোজা হতে পারবে কি-না তারই কোনো ঠিক নেই।তারউপর এসব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা মাথায় আনছে।
কিছুক্ষণ চুপ থাকলো প্রাণেশা।পরক্ষণেই মনে হলো বাচ্চা মানুষ।কী দেখতে কী দেখেছে।হয়তো ওর মতো কাউকে দেখেছে,তাই 'ও' ভাবছে।এ দুনিয়াতে তো একই চেহারার সাতজন মানুষ আছে।নিজের কাছে নিজেই হিসাব ক্লিয়ার করলো প্রাণেশা।
প্রাণেশা ভাবনা ঝেড়ে বললো
-"হুয়াট এভার।হয়তো আমার মতো কাউকে দেখেছো।বাদ দাও এসব।শুনো, তুমি বাড়ি যাও।তোমার হাত অনেকটা কেটে গেছে।ওষুধ লাগাতে হবে,নয়তো ইনফেকশন হয়ে যাবে।"
-"আচ্চা।"বাধ্যের ন্যায় বললো প্রোজ্জ্বল।
প্রাণেশা ফের প্রশ্ন করলো
-"তোমার বাড়ি কোনটা?"
প্রোজ্জ্বল আঙ্গুল উঁচিয়ে রাস্তার ওপাশের বাড়িটি দেখিয়ে।প্রাণেশা হতবাক হয়ে তাকালো সেদিকে।উত্তেজনা রাখতে না পেরে দাঁড়িয়ে পড়লো ও।উতলা হয়ে শুধালো
-"ওটা তোমাদের বাড়ি?"
মাথা ঝাঁকালো প্রোজ্জ্বল। প্রাণেশা হিসাব মিলাতে ব্যস্ত হলো।কিন্তু দুনিয়ার সকল মান বসিয়েও হিসাব মিলাতে ব্যর্থ হলো ও।প্রোজ্জ্বল কে কিছু বলতে য