ফন্ট সাইজ:
থিম:
Tell me who i am(২য় খণ্ড)

২য় পর্ব

লেখক: আয়সা ইসলাম মনি

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_২_প্রথমাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

__________________________________________☞

নিচে নেমে কারান চুলের গোছা একত্রিত করে রাবার ব্যান্ডে বেঁধে ফেলল। অ্যাপ্রোন গায়ে চড়িয়ে কয়েকটি সতেজ সবজি বাছাই করল। ঠান্ডা পানির স্রোতে সেগুলো ধুয়ে কাটতে শুরু করল।

ঠিক তখনই এ্যারোন তার পাশে দাঁড়িয়ে যান্ত্রিক কণ্ঠে বলল, "হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ, একে?"

"তুমি মিরার কাছে যাও। ওর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করো।" এমনটা বলে সে আবার কাজে মনোনিবেশ করল।

রোবটটি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। মিরার কক্ষের দরজা অতিক্রম করতেই দেখল, সে কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে।

কারানের আদেশ ছিল মিরার সাথে সংলাপের সূচনা করা। সে অনুসারে অ্যারোন স্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল, "হ্যালো, হ্যালো।"

চেনা স্বর শুনে মিরা কপাল থেকে হাত সরিয়ে উঠে বসল। তার চোখে-মুখে অস্থিরতা আর সংশয়ের রেখা স্পষ্ট। অবশ্য তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু কারান। মানুষটাকে সে চেনে, অথচ কখনো কখনো মনে হয়, সে পরিচিত হয়েও অচেনা। কেন এমন মনে হয়? নিশ্চয়ই কারণ আছে।

মিরা এক মুহূর্ত আনমনে এ্যারোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বিভ্রান্তির চাদর সরিয়ে ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল, "হাই।"

"হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ, মিসেস কারান চৌধুরি?"

'মিসেস কারান চৌধুরি!' শব্দ তিনটি মিরার কানে বাজতেই ঠোঁটের কোণে একফালি লজ্জা মেশানো হাসি খেলে গেল। মিরা নরম স্বরে বলল, "তুমি বাংলা বুঝো?"

"ইয়েস।"

মিরা বুঝল, রোবটটি উন্নত প্রযুক্তির ফল। এটি আমেরিকায় নির্মিত, স্বাভাবিকভাবেই বাংলা বোঝার কথা নয়, তবুও বোঝে! নিশ্চয়ই এর আবিষ্কারকের কোনো না কোনোভাবে বাঙালিদের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে! একটু ভেবে মিরা প্রশ্ন করল, "তুমি এখানে কত বছর ধরে আছো?"

"ফাইভ ইয়ার্স।"

"তোমার ক্রিয়েটর কে?"

"সাইন্টিস্ট এমেকা ওকনকো।"

নামটি শুনে মিরার কপালের মাঝখানে কয়েকটি সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটে উঠল। এমন নাম তো সে কখনো কারানের মুখে শোনেনি! "ইনি কে?"

"একে'র ফ্রেন্ড।"

কারানের বন্ধু! নিশ্চয়ই সে আমেরিকান, তাই তো কারান তার কথা বলেনি। কিন্তু ফারহানের কথা তো বলেছে, এমেকার কথা কেন নয়? এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ লুকিয়ে নেই তো?

মিরা হঠাৎই অজানা তাগিদে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "কারান কে?"

রোবটটি নিশ্চুপ রইল। মিরা সামান্য ঝুঁকে এলো, কৌতূহলভরা কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল, "কারান কে, এ্যারোন?"

তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মিরা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল। বুঝতে পারল, যন্ত্রটির প্রোগ্রামে হয়ত সে উত্তর নেই, যা তার মনে জমে থাকা প্রশ্নের জট খুলতে পারে।

এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল, "আমি কি কারানকে নিয়ে অযথাই বেশি ভাবছি?"

অন্যদিকে কারান ইতোমধ্যেই রান্নার আয়োজন করে ফেলেছে। নিখুঁত হাতে মাংসের টুকরোগুলো মশলার সাথে নেড়েচেড়ে নিয়ে স্টকে ঢেলে দিল। ফুটন্ত ঝোলের মসলাদার সুগন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল। সে আঙুলের ডগায় সামান্য তুলে নিয়ে মুখে পুরে স্বাদ পরখ করল। এমন সময় ফারহানের কল এলো। কারান হাত ধুয়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে ফোনটি কানে তুলল।

ওপাশ থেকে ফারহানের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো, "ভাই, তুই কি আমার কথা সিরিয়াসলি নিচ্ছিস না?"

"কোন কথা?"

"তুই আমেরিকা ছেড়ে দুবাই চলে আয়। আমার ভয় হচ্ছে, ইয়ার।"

কারান মৃদু হাসল। "তুই আমাকে নিয়ে আমার বউয়ের চেয়েও বেশি টেনশন করিস। এত চিন্তা করিস না, আমি ঠিক আছি।"

"কারণ তোর বউয়ের থেকেও আমি তোকে বেশি চিনি। আমাদের ১৯ বছরের বন্ধুত্ব। আর তোকে ছাড়া এসব সম্ভব না। তুই ফিরে আয়।"

কারান গম্ভীর মুখে বলল, "আসবো। এমেকা কিছু জানিয়েছে?"

"হ্যাঁ, এমেকা খুলিগুলো পরীক্ষা করেছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথমত, এগুলোর বয়স আনুমানিক ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে হতে পারে। হাড়ের অম্লতা ও প্রোটিনের অবস্থা পরীক্ষা করে বোঝা গেছে যে এই শিশুদের মৃ'ত্যু অনেক দিন আগেই হয়েছে। আরেকটা কথা, খুলির মধ্যে ক্ষতিকারক স্নায়ুবিষের চিহ্নও পাওয়া গেছে, যা নিশ্চিত করে যে, এগুলো সংগ্রহ করার পেছনে কোনো সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে—অঙ্গপাচার কিংবা অন্য কোনো ভয়ংকর চক্রান্ত হতে পারে।"

কারান শুনতে শুনতেই খাবার পরিবেশন করছিল। ডায়নিং টেবিলে একের পর এক ব্যঞ্জনের বাটি সুচারুভাবে সাজিয়ে রেখে গভীর কণ্ঠে বলল, "আয়লা কোথায়?"

"শি ইজ আ জিনিয়াস গার্ল, ব্রো। ও জেহেরকে ম্যানিপুলেট করে গোপন তথ্য বের করেছে। মেইন কালপ্রিট জেহেরই। জেহের ওর অঙ্গ পাচারের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করছে। অবশ্য ওরও একটা গোপন চুক্তি রয়েছে। ও নারীদের পাচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ জেহের যদি এক্সপোজ হয়, তাহলে পুরো চক্রটাই ভেঙে পড়বে।"

"তাহলে তো আমার কিছুই করার দরকার নেই।"

"উফফ, তুই ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আয়লা শুধু মূল অপরাধীকে শনাক্ত করেছে, কিন্তু পুরো খেলাটা এখনো বাকি।"

"ওকে, বাকিটা দেখছি। রাখছি।"

"ওকে ওকে।"

ফোন কেটে দিয়ে কারান দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। "বউ।"

মিরা কারানের কণ্ঠ শুনে পাশ ফিরে তাকাল।

"দুপুরের রান্না শেষ?"

"হুঁ। আমাদের শিগগিরই বাংলাদেশ ফিরতে হবে, বুঝেছ?"

মিরা মাথা ঝাঁকালো। কারান মিরার পাশে এসে বসল। মিরা তার দিকে এগিয়ে এসে তার চক্ষু পানে তাকিয়ে বলল, "তোমাকে আজ বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে, কারান।"

কারান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। হ্যাঁ, উদ্বেগ তাকে গ্রাস করছে। এখনো কত কাজ পড়ে আছে, অথচ মিরাকে তার একটুও বুঝতে দেওয়া চলে না। কিন্তু সমস্ত দুশ্চিন্তার মাঝেও একটা প্রধান ভাবনা তার বুকের গভীরে ধাক্কা দেয়, আর সেই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু মিরা।

"আমি হারানোর ভয় পাই," বলতে গিয়ে থেমে গেল কারান।

মিরা তার মুখের কাছে এগিয়ে এলো। তার নরম হাত কারানের বাম গালে রাখতেই উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল কারানের চামড়ার গভীরে। মিরা একটুখানি ঝুঁকে আস্তে করে বলল, "কি হারানোর কথা বলছ?"

কারান তার গালে রাখা মিরার হাতটা আলতো করে সামনে এনে, আঙুলের ওপর এক আবেগময় চুম্বন এঁকে দিল। কারানের প্রতিটি স্পর্শেই মিরা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে। অজানা শিহরন শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই স্পর্শেই সমস্ত হতাশা, সমস্ত সংশয় বিলীন হয়ে যায়। মিরার ঠোঁটে সামান্য হাসির রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু কারানের চোখে তখনো অস্থিরতা। কারান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল, "তোমাকে।"

মিরা উত্তরে তার ঠোঁট কারানের ঠোঁটে নিবিড়ভাবে মিলিয়ে দিল। কারানের হাত মিরার ঘাড় আলতোভাবে আঁকড়ে ধরল। মৃদু টানে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের চোখ আপনা-আপনি বুজে এলো। দুজনেই মধুর স্বাদে ডুবে যেতে লাগল। না, কারান আজ আর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে না, প্রয়োজনও পড়ে না। কারণ তার মিরা যে নিজেই সমস্ত দ্বিধার বন্ধন ছিন্ন করে তাকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করেছে।

সময়ের হিসেব হারিয়ে তারা উপরের ঠোঁট নিচের ঠোঁটের বেষ্টনীতে বারংবার মিলিয়ে যেতে লাগল। দীর্ঘ অনুরণন শেষে মিরা তার লালিমায় ভরা ঠোঁট সরিয়ে নিল।

কারান চোখ মেলে মিরার লজ্জাভরা মুখের দিকে তাকাল। এতবার তারা একে অপরকে পেয়েছে, তবুও এই মেয়েটার লজ্জা কমে না। অথচ সে নিজেই কারানের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকতে চায়। তার বাহুডোরে নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজে নিতে চায়। তবে সে তো মেয়ে, লজ্জার আভা ছাড়া সে অসম্পূর্ণ। কারানের গভীর দৃষ্টি দেখে মিরা হঠাৎই তার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার গরম নিশ্বাস কারানের কান ছুঁয়ে গেল। কারানের কানে ফিসফিস করে বলল, "এই যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম, মৃ*ত্যুর আগে আর ছাড়ছি না।"

কারান হাসল। মিরাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

তাদের বুক আর গলা একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে আছে৷ কারানের ঠোঁট থেকে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ঝরে পড়ল। তবে এ নিশ্বাস ক্লান্তির নয়, উদ্বেগের নয়, বরং গভীর প্রশান্তির।

_______

মমতাজ রান্নাঘরে নিমগ্ন। আব্দুর রহমান সকালেই কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। মমতাজের ফোনটা ইলিজার কক্ষের বিছানার ওপর পড়ে আছে। বিছানায় বসে বহুক্ষণ ধরে ফোনটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বুঝিয়ে যাচ্ছে ইলিজা। শেষমেশ নিজেকে নিরস্ত করল, "ফোন দেওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে না।"

কিছুক্ষণ পরে বুকটা হালকা করার প্রয়াসে সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সামনের জানালাটা খোলা, সেখান থেকে ভোরের হিমেল হাওয়া বইছে। কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল। মাঝেমধ্যে দিগন্তের ছায়াপথে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তার। তবে সেটা কেবলই ক্ষণিকের ইচ্ছে।

সে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে কয়েকবার দরজার দিকে তাকালো, আবার মা আসছে না তো? যদিও ভালোভাবেই জানত, মমতাজ ব্যস্ত, এখন আসার প্রশ্নই ওঠে না।

"না, একবার দিয়েই দেখি। কী-ই বা হবে? উফফ, কী চিন্তায় পড়লাম রে বাবা!"

অবশেষে চোখ বন্ধ করে এক গভীর নিশ্বাস নিল।

এরপর ফোনটা হাতে তুলে নিল। কাপা কাঁপা আঙুলে কাব্যের নম্বর ডায়াল করল।

রিং বাজছে। হাতের তালুতে ঘাম জমে উঠেছে। চিন্তার বুননে দমবন্ধ লাগছে তার। সে এই প্রথমবার, হ্যাঁ, প্রথমবার ফোনের ওপাশ থেকে কোনো পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনবে। তাও এমন একজনের, যার সঙ্গে মধুর স্মৃতির তুলনায় বিষাদঘন ঘটনাই বেশি ঘটেছে।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই ওপাশ থেকে কাব্যের পরিচিত, ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসল, "আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?"

এখন কী বলবে ইলিজা? কোথা থেকে শুরু করবে? কণ্ঠস্বর বের হবে তো? হঠাৎ করেই মনে হলো, শব্দেরা তার কণ্ঠনালীতে আটকে আছে।

অন্যদিকে কাব্য আবারও জিজ্ঞেস করল, "হ্যালো? কথা বলছেন না কেন?"

তবুও ইলিজা নীরবতার গণ্ডি পেরোতে পারল না। একবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। কী অদ্ভুত, একটা কণ্ঠস্বরেই শরীরের প্রতিটি স্নায়ু থরথর করে কাঁপতে পারে?

কাঁপতে কাঁপতে ইলিজা মনে মনে বলল, "এবার আমি কী বলবো? কেন এমন হচ্ছে? হে আল্লাহ, এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?"

ওপাশে কাব্য এবার রীতিমতো বিরক্ত গলায় বলল, "আচ্ছা, আমি রেখে দিচ্ছি তাহলে।"

এটা শুনে ইলিজা হঠাৎই ঝাঁকি খেয়ে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল, "আমি... আমি ইলিজা।"

কাব্যের ঠোঁটে প্রশান্তিময় হাসি ফুটে উঠলো। ইলিজার কোমল কণ্ঠস্বরেই তার হৃদয়ের গভীরে সুখ ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল। সে হেসে নরম কণ্ঠে বলল, "হায় আল্লাহ! আমার ইলিজা! কেমন আছেন আপনি?"

এই সম্বোধনেই থমকে গেল ইলিজা। চোখ পিটপিট করে ঢোক গিলে বলল, "কি বললেন?"

কাব্য খুকখুকিয়ে কাশি দিয়ে সামলে নিল নিজেকে। "আপনার খোঁজ জানতে চাইলাম।"

"জি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?"

"অনেক ভালো... সত্যিই, অনেক বেশি ভালো।"

ইলিজার মনে হলো, তারই বলা এই ক'টি শব্দেই হয়ত কাব্যের অস্থির বুকটা স্থিরতা খুঁজে পেয়েছে। এই উপলব্ধিতে সে মৃদু হেসে ফেলল। তবে পরক্ষণেই গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "থানায় গিয়েছিলেন?"

কাব্য খানিক চুপ করে থেকে মাথা চুলকে বলল, "কিন্তু... ইয়ে মানে আমি তো কোনো অপরাধ করিনি।"

"স্নেহার জন্য।"

"ওহ হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। ওরা চেষ্টা করছে, এর বেশি কিছু জানায়নি।"

স্নেহার নাম উচ্চারিত হতেই ইলিজার বুকের গভীরে বিষাদের ঢেউ ছুটে এলো। তার প্রিয়তম বান্ধবী, তার একমাত্র নির্ভরতা, আজ কোথায় হারিয়ে গেল সে?

ভাঙা কণ্ঠে নিজেকেই প্রশ্ন করল, "আমাকে কি তুই একবারও মনে করিস না, সেনু? এতটা স্বার্থপর কবে হলি তুই? ফিরে আয় না, দোস্ত। আমি তো এখনো তোকে প্রতিটি নিশ্বাসে খুঁজে ফিরি। স্নেহা, চলে আয় লক্ষ্মীটি..."

বলতে বলতেই ইলিজার গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এপাশ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে কাব্য বুঝে গেল, ইলিজার মনটা ভেঙে পড়েছে। গভীর একটা নিশ্বাস ফেলে কাব্য শান্ত গলায় বলল, "আজ বিকেলে দেখা করতে পারবেন?"

ওড়নার প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছল ইলিজা। একটু খাঁকারি দিয়ে নীচু স্বরে বলল, "কখন?"

"মেসেজে জানিয়ে দেব। তবে একটা কথা, মা-বাবাকে জানিয়ে আসবেন কিন্তু।"

মনের ভেতর ভার জমে থাকলেও, কাব্যের অবাস্তব কথায় এবার ইলিজার মুখে এক টুকরো বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠল। "একটা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যাব, মা-বাবা যেতে দেবে—এমনটা আশা করেন আপনি?"

"তাহলে নাহয় একটু মিথ্যা বলে আসবেন। প্রেমে পড়লে দু-একটা মিথ্যা বললে খুব একটা পাপ হয় না মনে হয়।"

কাব্যের দুষ্টুমি মাখা কথায় ইলিজার কান্নার মাঝেও অধরে হাসি ফুটে উঠল। হাসির শব্দ শুনেই কাব্য নিজের মনে বলল, "এই তো! এই তো আপনাকে হাসাতে পেরেছি, মিস ইলি।"

ইলিজা নরম গলায় বলল, "আচ্ছা... আসব।"

কথাটা শুনে কাব্যের হৃদয়ের সুগভীর অনুভবকোষে আনন্দপ্রবাহের বিস্ফোরণ ঘটল। ঠোঁটের প্রান্তে অনাবিল হাসি প্রস্ফুটিত হলো। স্নিগ্ধ স্বরে বলল, "আমি কিন্তু অপেক্ষা করব। অবশ্যই গাড়িতে আসবেন। রাখছি তাহলে?"

"জি।"

ইলিজা মুচকি হেসে ফোনটা কেটে দিল। কিছুক্ষণ পরই ফোনটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে, বিছানায় বসে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। হঠাৎই কাব্যের প্রতি টান অনুভব করছে সে। কী আশ্চর্য! একজন সম্পূর্ণ অচেনা ছেলের প্রতি এমন আকর্ষণ! কেন? কীসের এত টান? কে এই কাব্য? কেনই বা তার নাম উচ্চারণে এমন কোমলতা জেগে ওঠে মনে? পরিচয় নেই, তেমন জানেও না—তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে, সে অনেক চেনা, খুব আপন।

ভাবনার ঘূর্ণিতে আবিষ্ট ইলিজা বিছানা ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে পড়ার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসল। পেন্সিল বক্স খুলে একটা রঙিন পেন্সিল তুলে নিল। আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে লাগল সেটি। তার কল্পনার অনন্ত পটভূমিতে ভেসে আসছিল কাব্যকে ঘিরে নানা দৃশ্য, নানা হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্ত। সামনে রাখা চিত্রাঙ্কনের খাতা খুলে নিল। ফিসফিস করে উচ্চারণ করে লিখতে শুরু করল, "মিস ইলি প্লাস কা..."

এই মুহূর্তে পিছন থেকে মমতাজ এসে হঠাৎ পিঠে একটা হালকা চাপড় দিয়ে বললেন, "কানটা একদিন না উড়িয়ে দেই, দেখিস! কখন থেকে ডাকছি, শুনিস না নাকি?"

মায়ের হঠাৎ আঘাতে ইলিজা মাত্রাতিরিক্ত চমকে উঠে প্রায় চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিল। কিন্তু মমতাজ চেয়ারটা ধরে বললেন, "হ্যাঁ, এবার চেয়ারের সঙ্গে নিজের পা-টাও ভেঙে ফেল।"

"তু-তুমি কখন আসলে?" ইলিজা তড়িঘড়ি খাতাটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "আর তোমার কাছে তো তোমার মেয়ের থেকে চেয়ার দামি বেশি। যাও যাও, আর ভালোবাসা দেখাতে হবে না।"

"হলো? কতক্ষণ ধরে খাওয়ার জন্য ডাকছি। কী করছিলি বলতো?"

"প...পড়ছিলাম, মা। সত্যি পড়ছিলাম।"

মমতাজ জানালার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠাট্টার স্বরে বললেন, "আজ সূর্য কোন দিক থেকে উঠেছে? আমার পাজি মেয়েটা পড়তে বসেছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে এখন?"

ইলিজা মুখ বেঁকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলল, "সবসময় 'পাজি' বলবে না তো। আমি এখন ছোট নেই, বুঝলে?"

এই বলে সে সটান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর এমন ছটফটে বেরিয়ে যাওয়া দেখে মমতাজ হেসে ফেললেন। তারপর একা একা বললেন, "পাজি হলেও আমার মেয়েটার জন্যই এই ঘরটায় এখনো প্রাণ আছে। মিরুটা থাকলে জানি না কতটা দুষ্টুমিই করতো। আচ্ছা, কেমন আছে আমার পরীটা? কতদিন দেখি না! না, আর সহ্য হচ্ছে না। এবার ওকে আসতে বলতেই হবে।"

_______

জানালার পাশে বিছানায় বসে ফাতিমা আর তারান্নুম ব্যস্ত হাতে শাড়ি গুছাচ্ছিল। গৃহস্থালির রেওয়াজমাফিক সকালে উঠেই কাজে মন দেয় মেয়েরা। এই তো সবেমাত্র দিন শুরু হয়েছে, অথচ হাতে কাজ জমে আছে অনেক অনেক।

ফাতিমা একপাশে ভাঁজ করা শাড়ির স্তূপ রেখে মৃদু হেসে বললেন, "ফারহানের লগে কথা বলাইলো কারান। বড্ড ভালো ছেলে। বড়োগো কেমনে সম্মান দিয়া কথা কইতে হয়, কেমনে আপন কইরা নিতে হয়, ভালোই জানে। কথার মধ্যে রসেরও অভাব নাই, ভদ্রতাও আছে।"

ফারহানের নাম শুনতেই তারান্নুমের মুখটা পলাশফুলের মতো লাল হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। কতটুকু সময়ই বা হলো পরিচয়ের! অথচ মনে হয়, সে তাকে বহু কাল থেকে চেনে। আর ক’দিন পরেই হয়ত নতুন এক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হবে তারা। বিয়ের পর সংসার হবে, নিজের ছোট্ট একটা জগৎ হবে—যেখানে থাকবে শুধু তারা দু’জন। এই ভাবনাতেই তারান্নুমের চোখ চকমক করে উঠল, মাথাটা নুয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি লাজুক হাসি খেলে গেল।

ফাতিমা তার মেয়ের মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে হালকা হেসে বললেন, "ওর বাপ-মা তো আগেই রাজি। এখন আমগো অনুমতির লাইগা বইসা আছে ছেলেটা।"

গুছিয়ে রাখা শাড়িখানা একপাশে সরিয়ে রাখলেন ফাতিমা। আরেকটি শাড়ি তুলে নিলেন। অথচ তারান্নুম যেন বাস্তবতা থেকে বিস্মৃত হয়ে ভাবনায় ডুবে গেছে। যেখানে সে আর ফারহান দুজনের চোখে চোখ রেখে পাশাপাশি হেঁটে চলেছে, আর রোমাঞ্চকর কথোপকথন করছে। এদিকে ফাতিমা তো অবিরাম বাকপ্রবাহে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। "ভাবলাম, মারে একবার কইয়া দেহি। ছেলেটারে আমার বেশ পছন্দ হইছে।"

তারান্নুম কোনো উত্তর দিল না। গুটি গুটি হাতে শাড়ির ভাঁজ ঠিক করতে করতে হঠাৎ ফাতিমার কোলে ভাঁজ করা শাড়িটা রাখল।

ফাতিমা ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন, "ওই মাইয়া, মন কোনদিকে?"

তারান্নুম তবুও নিশ্চুপ। কারণ সে তো এখন অন্য গ্রহে হারিয়ে গেছে, যেখানে আকাশেও ফারহানের নাম লেখা। মনে মনে হাসছে সে। ফারহান কবে এসে বলবে, 'এবার চলো তোমাকে বিয়ে করে ঘরে তুলি। অনেক তো অন্যের বাড়িতে থাকলে, গোবরচারিনী।'

এদিকে ফাতিমা বিস্ময়বিস্মৃত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মেয়ের বিমুগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, "ওই ছেমড়ি!"

সকালের স্বপ্নিল তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যে কেউ যদি হঠাৎ বরফশীতল জল মুখে ঢেলে দেয়, তখন যে অনুভূতি হয়; ফাতিমার ধাক্কায় তারান্নুমের মধ্যে তেমনি অনুভূতির জন্ম হলো। সে থরথর কণ্ঠে বলল, "কিক... কি হইছে, মা?"

"তোয়ার মাথা, আর আমার ঘাড় হইছে। জলদি কইরা শাড়িগুলান গুছাইয়া আলমারিতে ঢুকাইয়া রাখ। আমি রান্নার দিকে গেলাম।"

ফাতিমা একটি ভাঁজ করা শাড়ি বিছানার পাশে গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। একটা ঝাড়া দিয়ে পরনের কুঁচকানো কাপড়টা সোজা করে নিলেন। তারপর তারান্নুমের দিকে একবার চেয়ে নাক ফুলিয়ে চলে গেলেন।

ফাতিমার প্রস্থান করা মাত্র, তারান্নুম মন খারাপ করে শাড়ি ভাঁজ করতে করতে বলল, "সবাই শুধু আমার লগেই পারে, আমিই শুধু ফ্রিতে গালি খাই। সব দোষ ফয়সাইল্লার পোলার। উনি যদি আগেই বিয়া কইরা নিত, তাইলে তো এত কথা শুনতে হইতো না আমার।"

কথা বলার মাঝপথেই হঠাৎ টুন করে মোবাইলে শব্দ হলো। তারান্নুম ভ্রূ কুঁচকে, সামান্য বিরক্তিভরে পাশ ফিরে তাকাল। ফোনটা হাতে তুলে স্ক্রিনে চোখ ফেলতেই দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ফারহানের নামটা উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে। একটা অস্থির ধুকপুকুনি যেন হৃৎস্পন্দন ছাপিয়ে স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ল তার। সে তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলে পড়তে শুরু করল, "মাই ডিয়ার গোরবচারিনী, খুব ভালো আছেন বুঝি? আমাকে তো ভুলেই গেছো, কুইন।"

"তাই তো! আপনারে তো একটুও মনে পড়ে না আমার, অথচ চব্বিশ ঘণ্টা আপনার নামটাই জপি।" তারপর হেসে আবার পড়তে আরম্ভ করল, "বেশি ভালো থাকবেন না। খুব শিগগিরই আপনার ফয়সাইল্লার পোলা হাজির হবে। তখন এটা-সেটা বলে পালিয়েও লাভ নেই। ঘরে তুলে এনে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রাখব। এক সেকেন্ডও ছাড় দেব না।"

বার্তাটি পড়ার পর তারান্নুমের গালদুটি লালাভ হয়ে উঠল। চোখদুটি বিস্ময়ে প্রশস্ত হয়ে গেল। এতটা বেপরোয়াভাবেও কেউ কথা বলতে পারে? যেখানে তাদের সম্পর্কের সূচনাটুকু কেবলমাত্র দৃষ্টিসীমায় সীমাবদ্ধ, সেখানে ছেলেটি এমন নির্লজ্জ নির্ভরতায় তাকে বুকের ভেতর আগলে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করল! তারান্নুমের জন্য এটি এক নবাগত অভিজ্ঞতা, কিন্তু ফারহানের জন্য তো বহু পরিচিত পথের সহজচর্যা। তাই তার মধ্যে বিন্দুমাত্র সংকোচ বা লজ্জার চিহ্নও নেই।

"কত্ত বড় স্পর্ধা! আইস না, তোরে গরুর গোয়ালে বাইন্ধা রাখুম!"

তারান্নুম আবার মেসেজের শেষাংশ পড়তে শুরু করল, "ভেবেছিলাম আমার কুইন অনেক আপডেটেড। আমার আগেই আমাকে বলবে। কিন্তু আফসোস! তার মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা শুনতে গেলে আমাকে আরো দুই যুগ অপেক্ষা করতে হবে বুঝলাম। আমার আবার ধৈর্যের ধ-ও নেই! তাই আর অপেক্ষা করতে পারছি না, গোবরচারিনী।

ইফ লাভ ওয়ার আ মেলোডি,

ইউ'ড বি মাই সুইটেস্ট সং।

ইফ লাভ ওয়ার আ জার্নি,

আই'ড ওয়াক ইট অনলি উইথ ইউ।

আই লাভ ইউ বিয়ন্ড ওয়ার্ডস।

উইল ইউ লেট মি লাভ ইউ ফরএভার?"

এমন আকস্মিক প্রস্তাবে তার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে উঠল। বুকের গভীরে যেন তুষারশীতল প্রবাহ বয়ে যেতে লাগল। ফারহান এভাবে সরাসরি প্রকাশ করবে, তা কখনো কল্পনাতেও আনেনি সে। কী বলবে এখন? এত লজ্জা কোথায় চাপবে? ইশ, এভাবে প্রকাশ না করলেও তো পারত। এখন তো তার গলার স্বরটাই স্তব্ধ হয়ে গেছে।

ঠিক তখনই ফারহানের পক্ষ থেকে আবার একটি মেসেজ এলো, "ব্যাপারটা কি? কুইনের কি প্রোপোজালটা ভালো লাগেনি?"

আচমকা ভিডিও কলের রিংটোন বেজে উঠল। বিছানা থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল তারান্নুম। কিন্তু উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা হাত থেকে ফোনটা হঠাৎই মেঝেতে ছিটকে পড়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে ফোনটা তুলে দেখল, স্ক্রিনে ফাটল ধরেছে। মুখ বেঁকিয়ে বিড়বিড় করল, "এই লোকটা ফোন করলেই কিছু না কিছু ঝামেলা হইবেই।"

একটি গভীর নিশ্বাস ফেলে ফোন রিসিভ করল সে। উল্টোদিকে ফারহান গম্ভীর স্বরে বলল, "এত দেরি কেন, কুইন? বুঝতে পারো না আমি ওয়েট করছিলাম?"

তারান্নুম চোখ ছোট করে উত্তর দিল, "আপনি সবসময় ভিডিও কল দ্যান ক্যান?"

"তোমার লজ্জায় রক্তাভ মুখটা দেখতে চাই যে।"

একে তো ফারহান হঠাৎ করেই বিবাহপ্রস্তাব দিয়ে বসেছে, তার ওপর এই বাক্যটি শুনে তারান্নুমের লজ্জা সীমা ছাড়িয়ে রক্তিম মুখাবয়বে বিস্তার লাভ করেছে। ওড়নাটি তড়িঘড়ি মুখে টেনে নিয়ে বলল, "এইবার দেখেন।"

ফারহান কপাল কুঁচকে বলল, "এভাবে অত্যাচার করলে কিন্তু চুমু দিয়ে ফেলব।"

তারান্নুম তৎক্ষণাৎ ওড়না সরিয়ে ফেলল। ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, "অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া পুরুষ। একে তো হুট করে প্রোপোজাল দিছে, আবার আইছে চুমু খাইবে। তোমাকে রান্না করে হাঁসের মাংস খাওয়াবো আমি, তারপর অ্যালার্জিতে চুলকাবে, তখন ঠেলাটা বুঝবা।"

"পরেরবার এমন শাস্তি দিলেই হবে, বেবি। তোমার হাতের রান্না খেয়ে অ্যালার্জির টর্চারও সহ্য করতে রাজি আমি। আর আরেকবার 'তোমাকে' বলো, জান।"

তারান্নুম মুহূর্তের অসতর্কতায় জিহ্বা কেটে বিব্রতবোধে চোখ নামিয়ে ফেলল। আর তাতে ফারহানের হাসি আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "আর তোমাকে কে বলল যে আমি প্রোপোজাল দিয়েছি? আমার আইডি হ্যাক হয়েছে, হয়ত তারা কোনো উল্টোপাল্টা মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে তোমাকে।"

তারান্নুম এবার চোখ তুলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, "গ্রামের মাইয়া দেইখা এতটাও বোকা ভাইবেন না, অসভ্য ব্যাটা। হ্যাকারের আইডি হ্যাক হইছে, তাই না?"

ফারহান ফোনটি একদম ঠোঁটের কাছে নিয়ে নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, "আইডি হ্যাক না হলেও মন ঠিকই সম্পূর্ণরূপে হ্যাক হয়ে গেছে আমার।"

তারান্নুমের অন্তর ধক করে উঠল। সে জানে ফারহানের ইঙ্গিত কী, তবু নিজেকে সংযত করে বলল, "আচ্ছা তাই? তা সেই হ্যাকারটার নাম কী?"

"মাই কুইন, তারান্নুম তাজিন সোহা।"

তারান্নুম কাঁপতে থাকা আঙুলে ফোনটি ঝটপট কেটে দিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে দিল। তারপর শাড়ির ভাঁজ খুলে তার মধ্যে মুখ লুকিয়ে শুয়ে পড়ল, যেন সমস্ত লজ্জার ভার সেই নরম শাড়ির গভীরে অজ্ঞাত করে দিতে পারে।

অন্যদিকে ফারহান ফোনের উলটো প্রান্ত থেকে হাসিমাখা গলায় বলল, "আমার লজ্জাবতী কুইন, খুব শীঘ্রই তোমার জন্য বিশেষ সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।"

_______

রোমানা স্থির চোখে আরিয়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ যেন মানুষটার চেহারায় অচেনা রহস্যময় আবরণ মনে হচ্ছে। কীসের গল্প বলতে যাচ্ছে সে? রোমানার? কিন্তু সে জানলো কীভাবে? অসংখ্য প্রশ্ন ক্রমশ তার চিন্তার পরতে জট পাকিয়ে যাচ্ছে।

আরিয়ান কোমল হাসি ছড়িয়ে বলল, "এক দেশে এক সাধারণ রাজা ছিল। তার ছিল তিন কন্যা। তিনি তাদের জীবনে কখনো কোনো অভাব রাখেননি, এমনকি মার্শাল আর্ট শেখাতেও কার্পণ্য করেননি। তাছাড়া ড্রাইভিং শেখানো, সাঁতার শেখানো, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার, পাসপোর্ট-ভিসা আবেদন, ইত্যাদি ইত্যাদি সব নিজ হাতে শিখিয়েছেন তিনি, যেন মেয়েগুলো জীবন নামের যাত্রাপথে একা হলেও পথ ভুল না করে। যদিও বড় কন্যা এসবে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি, তবে মেজো কন্যা প্রতিটি শিক্ষা, প্রতিটি কৌশল শোষণ করেছে।

তার বড় কন্যা ছিল শ্যামবর্ণা, কিন্তু রূপের বাহ্যিক সীমারেখার চেয়েও তার খিটখিটে স্বভাব প্রকট ছিল। মেজো কন্যা ছিল ঝড়ের মতো চঞ্চল, সাগরের মতো গভীর, আর দুঃসাহসী। তার নিখুঁত চেহারায় এক বিন্দু দাগ পড়লেও তার বাবা ব্যাকুল হয়ে নিজ হাতে মলম নিয়ে আসতেন। এমনকি কাজ করে যেন মেয়ে এতটুকু ক্লান্তও না হয়, তাই কাজও করতে দিতেন না। কিন্তু মেজো কন্যা এসবে পরোয়া না করে বরাবরই বাবা মায়ের সাহায্য করে যেত।

তাছাড়া মেজো কন্যা বাবার নিঃশব্দ কষ্টের পরিমাণও বুঝতে পারতো। সীমিত আয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো কতটা কঠিন, তা সে অনুভব করত। অথচ বড় কন্যার চোখে এসব ধরা পড়ত না। সে নির্দ্বিধায় ব্যয় করত, বিলাসে মগ্ন থাকত।

অন্যদিকে ছোট কন্যা বয়সে ছোট থাকায় বাস্তবতার ভার বোঝার অবকাশ পায়নি। অথচ এই দুই ভিন্ন মনোভঙ্গির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল মেজো কন্যা। তবে তার মনে তীব্র জেদ জন্ম নিয়েছিল। কেন তার বাবা একা সংগ্রাম করবে? বড় করে তুলেছেন, এটাই কি যথেষ্ট নয়? তার বাবার কষ্টকে ভাগ করে নেওয়া কি তারও দায়িত্ব নয়?

একদিন সে স্থির করল, কিছু একটা করতেই হবে। যুক্তি দিয়ে বাবাকে বোঝালো। অবশেষে সমস্ত দ্বিধা ছাপিয়ে তার বাবাও রাজি হলেন।

পরে রাজকন্যা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে শিশুদের হাতে জ্ঞানের আলো তুলে দেওয়ার ব্রত নিল। কিন্তু সেই পবিত্র প্রয়াসও একদিন কলুষিত হতে বসলো। তারই এক ছাত্র, যে কিনা বয়সে কেবল নবম শ্রেণির, তার প্রতি লোভাতুর দৃষ্টি ফেলল। সে ইঙ্গিতে টাকার অঙ্ক বাড়ানোর লোভ দেখিয়ে তার শরীর দাবি করল। যা শুনে রাজকন্যার র'ক্তে তখন ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল। সে সোজাসুজি সেই ছেলের অভিভাবকদের জানিয়ে দিল। কিন্তু তারা শুনতে নারাজ, তাদের চোখে তাদের সন্তান নিষ্পাপ। রাজকন্যা তাই ভিন্ন পরিকল্পনা করল।

পরদিন ঠিক আগের দিনের মতোই সেই ছেলেটিকে পড়াতে গেল। কিন্তু ছেলেটির চোখের দৃষ্টি আগের মতোই বিষাক্ত ছিল। রাজকন্যা এবার শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কি চাও তুমি?’

ছেলেটি কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল, ‘ইয়োর বডি, বেইবি।’

ব্যাস! আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না রাজকন্যা। হাতে ধরা কলমটা নিমেষেই ছেলেটির চোখে বিদ্ধ করল। ছেলেটা চিৎকার করে উঠল, ওর চোখ থেকে দরদর করে র*ক্ত ঝরতে থাকল। পলকেই চারপাশে ছুটোছুটি, শোরগোল বেধে গেল।

রাজকন্যাকে ছেলের পরিবার পাকড়াও করল। আইনকে খবর দেওয়া হল, ক্ষণিকের মধ্যে পুলিশ চলে এলো।

কিন্তু রাজকন্যা নির্বিকার, তার চোখে ভয় নেই, নেই কোনো অনুশোচনা। পুলিশ যখন তাকে নিজের সাফাই গাওয়ার সুযোগ দিল, সে তখনও চুপ রইল। শুধু শান্তভাবে তার ফোন বের করে রেকর্ড চালু করল। রেকর্ডে ছেলেটার সেই কথোপকথন শোনা গেল।

তৎক্ষণাৎ ছেলেটা কান্না করে দিল।

সে ক্ষমা চাইল, অনুরোধ করে বলল, ‘আ...আ'ম এক্সট্রিমলি সরি, ম্যাম। প্লিজ, ম্যাম। আমি আর কখনো করব না। আমি... আমি জেলে যেতে চাই না, ম্যাম৷ ম্যাম, সরি। ম্যাম, প্লিজ বাঁচান।’

রাজকন্যা এবার কেবল একটিই কথা বলল, ‘অন্যায়ের সামনে নত হওয়ার শিক্ষা আমার বাবা আমাকে দেননি।’

একদিন দুপুরবেলা শহরের লোকাল বাসে রাজকন্যা দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা বই ধরা। সে মাথা নীচু করে বইটা পড়ছিল। বাসটা গাদাগাদিতে ঠাসা, তার জন্য হ্যান্ডেলে ঝুলে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সী লোক আচমকা গায়ের সঙ্গে ঘষাঘষি করতে লাগল। প্রথমে সে ভেবেছিল দুর্ঘটনা, কিন্তু লোকটার হাত যখন দ্বিতীয়বার কোমরের কাছে ধরা পড়ল, তখন আর ভুল করল না রাজকন্যা।

সে চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাল, ঠান্ডা গলায় কটমট করে বলল, ‘এই, কী করছেন এসব আপনি?’

লোকটা ঠোঁটে নোংরা হাসি টেনে বলল, ‘ভিড় তো, হতেই পারে, ম্যাডাম। ভুল না বুঝে এদিকে একটু আগান না...’

রাজকন্যা ঝট করেই লোকটার অ*ন্ড*কো*ষ বরাবর এমন এক লাথি দিল যে লোকটা আর্তনাদ করে বাসের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। বাসজুড়ে কথার রোল পড়ে গেল। কেউ কেউ তো রাজকন্যাকেই দোষারোপ করতে শুরু করল৷

কিন্তু রাজকন্যা তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে বলল, ‘আমার নামে আর একটা বাজে কথা যে বলবে, দ্বিতীয় লাথিটা আমি তার অ*ন্ড*কো*ষ বরাবর মারব।’

এরপর কি আর কারোর সাহস হবে নাকি? আর ঠিক তেমনই, সবাই চুপ করে রইল। তারপর ভিড় ঠেলে বাস থেকে নেমে গেল রাজকন্যা।

কিছুদিন পর রাজকন্যা ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণে পা রাখল। মুহূর্তেই তার আগমন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তার রূপ দেখে শিক্ষকরাও বিস্মিত। সে যখন ক্লাসে বসত, তখন চেয়ার টেনে দেওয়া হতো, কলম না আনলে নিজের কলমও ছেলেরা তার হাতে তুলে দিত।

ছোটবেলা থেকেই রাজকন্যার রূপ নিয়ে প্রতিবেশী থেকে বন্ধুবান্ধব সবাই-ই আলোচনায় মগ্ন থাকত। তাই তার উপলব্ধি করতেও খুব বেশি সময় লাগেনি, যে তার রূপের কারণেই সমস্ত আয়োজন, এত আলাপ- আলোচনা। এসব নিয়ে রাজকন্যাও খুশিই হতো। প্রতিদিনই যুবকেরা তাকে বিভিন্ন উপায়ে, বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তাব দিতে শুরু করল। ওরা বারবার তার পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। তবে রাজকন্যা চেয়েছিল আগে নিজ পায়ে দাঁড়াবে, বাবাকে একটু স্বস্তি দিবে, তারপর না হয় বিয়ের কথা ভাববে। তার পিতাও তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল, এবং রাজকন্যাকে বিবাহিত জীবন থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

একদিন কলেজ ক্যাম্পাসে দুপুরের আলোয় তার ক্লাসের বন্ধুরা আড্ডায় মেতে ছিল। রাজকন্যা আড়ালে এক কোণে বসে বইয়ের পাতায় ডুবে ছিল। কারণ তাকে তো বড় হতে হবে, ভালো ফল করতে হবে, আড্ডা-আলাপে সময় নষ্ট করার মতো অবসর কোথায় তার!

কিন্তু হঠাৎই পিছন থেকে এক যুবক এগিয়ে এসে রাজকন্যার সামনে মাথা ঝুঁকে বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে বলল, ‘ডার্লিং, যদি দেখানোর হয়, পুরোটা খুলেই দেখাও। অর্ধেক খুলে রেখে সিডি'উস করছ কেন?’

অপ্রত্যাশিত ও অশালীন এই মন্তব্যে রাজকন্যা প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। মুহূর্তেই চোখ তুলে তাকাল ছেলেটার দিকে। দেখল, তার চোখে দৃষ্টিকটু আগ্রাসী লালসা, যেন দৃষ্টির মাধ্যমেই গিলে ফেলবে তাকে। ছেলেটার ইঙ্গিত বুঝে রাজকন্যা পিছনের ফিতের দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু না, ফিতেটা আদৌ খোলা ছিল না।

এর মানে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বিভ্রান্ত ও অপমান করার জন্যই এমন কথা বলেছে ছেলেটি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অনিকেত নামের ছেলেটা হাসিতে ফেটে পড়ল। আশেপাশের কিছু ছেলেও বিদ্রূপে মুখ ভাসিয়ে দিল। অথচ পাশে দাঁড়ানো দুই মেয়ে অপমানের প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও শুধু মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।

কিন্তু রাজকন্যা ধীরে ধীরে ছেলেটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একটাও কথা না বলে আচমকা ছেলেটার গালে কষে কয়েকটা থাপ্পড় মারল। এরপর বলল, ‘আজকে তো শুধু থাপ্পড় মেরেছি, পরেরবার আমার সাথে তো দূরের কথা; অন্য কোনো মেয়ের সাথেও যদি এমন আচরণ করিস, ভবিষ্যতের ডাউনলোড করার সেই অপশনটাই আমি কেটে ফেলব।’

এরপর সে মাথা উঁচু করে সামনে হেঁটে চলে গেল। চারপাশের ছেলেগুলো চোখে চোখে বলল, ‘রূপের সঙ্গে তেজটা—কম্বিনেশনটা কিন্তু মারাত্মক, ইয়ার।’

অর্থাৎ সে বরাবরই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চলেছে। আর এতে সে সবসময়ই খুশি হতো। তার মতে এগুলো এক একটা মিশন, আর সে প্রতিটি মিশনে জয়ী হচ্ছে।

একদিন সে যখন ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণে চলছিল, হঠাৎই তার সামনে সেই ক্যাম্পাসের সবথেকে সুদর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে উজ্জ্বলতা আর ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে সোজা প্রস্তাব দিল, ‘উড ইউ লেট ইয়োর হার্ট বি মাইন, প্রিন্সেস?’

রাজকন্যার মনে তখন ঝড় বয়ে গেল। গোপনে সেও ছেলেটার প্রতি আকৃষ্ট ছিল, কিন্তু সেই অনুভূতি কখনো শব্দে প্রকাশ হয়ে ওঠেনি। এটা তার অহংকার নয়, তবে তার আত্মসম্মান ছিল প্রবল। তাই ছেলেটা যখন তার ভালোবাসার কথা জানায়, রাজকন্যা তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

কিন্তু ছেলেটা দিনের পর দিন তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে নানা চেষ্টা করত, ফুল দিয়ে অথবা রাজপথে গাড়ি থামিয়ে তার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত। রাজকন্যা প্রতিবারই সেই চেষ্টাগুলোকে উপেক্ষা করত। একদিন ছেলেটা রাজকন্যার জানালার নিচে দাঁড়িয়ে তার প্রিয় গান গেয়ে ওঠে। কিন্তু রাজকন্যা এমন ভাব দেখালো যেন তার এসব পছন্দ না, তাই সে জানালা আটকে দিয়ে ঘরে চলে গেল। অথচ ভিতরে সে কোথাও যেন সেই সুরের মাঝে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

কয়েকটি দিন কেটে গেল। প্রতিদিনই উপহার, আকুতি, আর চোখের ভাষায় ছেলেটা তাকে বোঝাতে চাইল, সে সত্যিই তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কিন্তু রাজকন্যা সময় নিল। তবে হঠাৎ করেই একদিন ছেলেটা আর ইউনিভার্সিটিতে আসল না। তার কোনো খোঁজও মিলল না। এবার রাজকন্যার বুকের ভেতর শূন্যতা জন্ম নিল। সে আর তাকে ফিরিয়ে দিতে চায় না। তাই সে নিজেই তার খোঁজ নিয়ে সম্মতি দিল।

প্রথমদিকে তাদের সম্পর্ক ছিল নির্মল, নিঃস্বার্থ। মাঝেমধ্যে তারা নদীর ধারে হেঁটে হেঁটে নিজেদের কথার আবেশে হারিয়ে যেত। রাজকন্যা কখনো রেগে বা কখনো হেসে হেসে তার ছোটবেলার গল্প বলত। আর ছেলেটা এক দৃষ্টিতে তার পানে তাকিয়ে থাকত।

একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলো। তারা দুজন একটা পুরোনো অশ্বত্থ গাছের নিচে আশ্রয় নিল। বাতাসে রাজকন্যার চুল উড়ছিল, চোখেমুখেও ঝিরিঝিরি জল জমেছিল।

ছেলেটা তার কপালের ভেজা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার হাসিটা ঠিক যেন এই বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে, আর আমি সারাজীবন তার মাঝে ভিজে থাকতে চাই, প্রিন্সেস।’

রাজকন্যা চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসিটা ঠিকই ধরা পড়ল। তার হৃদয়ের ভিতরটা সেদিন অজানা খুশিতে নেচে উঠছিল। সে বুঝল, সে ভুল কাউকে ভালোবাসেনি।

আবার রাজকন্যার জন্মদিনে ছেলেটা তার প্রিয় ফুল দিয়ে বানানো একটি চুলের মালা উপহার দিল। ভোরবেলার স্নিগ্ধ আলোয় সে মালাটা হাতে পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ মালাটা শুধু ফুলের না, সেখানে পরিশ্রম, মমতা আর ভালোবাসার গন্ধ লেগে ছিল। রাজকন্যা চুলে মালাটা পরল। এরপর আয়নায় নিজেকে দেখে একটু হেসে ফেলল। আবার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখও ভিজে উঠল। তার মনে হল, এই ভালোবাসা তো রাজ্য কিংবা মুকুটের চেয়েও অনেক দামি।

কিন্তু এত মুগ্ধতা আর কোমল মুহূর্তের মাঝেও, হঠাৎ করেই ছেলেটার আচরণ বদলে যেতে লাগল। ছেলেটি বারবার রাজকন্যার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য অপ্রতিরোধ্য চেষ্টায় লিপ্ত হতো। তার এই প্রবল আহ্বান রাজকন্যার মনের গোপন কোণগুলোতে আঘাত করতো। রাজকন্যা বহুবার মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছিল। অবশেষে একদিন রাজকন্যা তার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেলেটিকে বিয়ে করার সংকল্প করল। সে জানতো, তার বাবা কোনদিনই এই ছেলেটিকে মেনে নেবে না। কারণ ছেলেটি চাকরি করে না। কিন্তু সেসব ব্যাপারগুলো রাজকন্যার মনে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ জাগায়নি। যে গভীর ভালোবাসা তার হৃদয়ে সঞ্চিত ছিল, তাতে এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও, সে সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল। তারপর এক সুরেলা সন্ধ্যায় রাজকন্যা ভালোবাসার ছেলেটিকে বিয়ে করে ফেলল।"

আরিয়ান হঠাৎ থেমে গিয়ে রোমানার চোখে চোখ রেখে এক দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস ফেলল। লক্ষ করল, রোমানার মুখশ্রী যেন নিঃশেষিত কোনো গ্রীষ্মকালের আম্রপিণ্ড; চোখ দু’টি বিস্মৃত কোনো অতীতের গভীর খাদে ডুবে আছে।

আরিয়ান সমস্তটা অনুভব করেও মুখে শুধুই রহস্যাবৃত হাসি টেনে বলল, "রাজকন্যা যাকে ভালোবেসেছিল, সেই ছেলেটির নাম কি জানো?"

🍁চলবে?🍁

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_২_শেষাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

🔴 Warning: This post is a fictional story that contains sensitive content related to sexual violence. It is intended solely for awareness and educational purposes. It does not promote or glorify any form of abuse.

__________________________________________☞

রোমানা বিছানার একপাশে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে। কিন্তু তার শরীরটা পুরোপুরি নিথর হয়ে গেছে। চোখে-মুখে কোন অনুভূতি নেই, শুধু শ্বাসই চলছে।

আরিয়ানের প্রশ্ন শুনে সে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল, "ফারজাদ।"

ফারজাদের নাম শুনে রোমানার চক্ষুদ্বয় ক্রোধে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বুকটায় ধকধকানি শুরু হতে থাকল, আর আরিয়ানের দিকে তাকানো সম্ভব হচ্ছিল না। সে চোখ নিচে নামিয়ে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল, যেন কষ্টগুলো কিছুটা প্রশমিত হয়। কিন্তু তখনই আরিয়ান উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। রোমানা অবাক চোখে তার পানে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান রোমানার কোল থেকে উঠে তার গা ঘেঁষে বসে পড়ল। তারপর মাথা কাত করে রোমানার কাঁধে রাখল। ঠান্ডা কণ্ঠে বলতে লাগল, "এরপর ফারজাদের সঙ্গে রাজকন্যার জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। প্রথম প্রথম তারা বিলাসবহুল হোটেলে থাকতে শুরু করল—সেখানে মনের মতো ঘুরতে যাওয়া, দামি জিনিসপত্র ব্যবহার করতে কেউ বাধা দিত না। রাজকন্যা তো মুগ্ধ, কারণ এমন স্বপ্নময় জীবনই তো সে চেয়েছিল, তাও নিজের ভালোবাসার সঙ্গেই। এমন ভাগ্য কয়জনের হয়, বলো?

কিন্তু এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। এত বুদ্ধি থাকার পরও সে ভালোবাসার কাছে প্রতারিত হলো।

বিয়ের এক মাস যেতে না যেতেই রাজকন্যা বুঝতে পারল, ফারজাদ যা দেখিয়েছিল, তার সবই ছিল অভিনয়। আসলে সে কখনোই ভালোবাসেনি। শুধু তার সৌন্দর্য আর তার সত্তাটাকেই চেয়েছিল। ফারজাদ ছিল এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা বখে যাওয়া ছেলে, যাকে তার পরিবার ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। সে মদ খায়, সিগারেট খায়, জুয়া খেলে, আর রাতে বারে গিয়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটায়।

প্রথম প্রথম রাজকন্যা প্রতিবাদ করত, কাঁদত, চিৎকার করত, ফারজাদকে গালমন্দ করত। সে বারবার জানতে চাইত, কেন এমন করছে?

একদিন রাজকন্যা এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হল। ফারজাদ বাঁকা হেসে বলল, ‘অনিকেতকে মনে আছে? হুম? আমি ওর বন্ধু। যেদিন তুমি সবাইকে সামনে রেখে ওকে থাপ্পড় মেরেছিলে, সেদিনই ও আমাকে সব ঘটনা বলেছিল। আর আমি ওকে প্রমিস করেছিলাম, তোমার হৃদয় জয় করে, তোমার সৌন্দর্যের সমস্ত অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেব। আর দেখো, আমি পেরেছি।’

শব্দগুলো যেন বিষাক্ত তীর হয়ে এসে রাজকন্যার বুকে আঘাত করল, ভেতরে ভেতরে কোথাও এক পশলা রক্তপাত চলল। রাজকন্যার চোখের কোণে জমে থাকা জলের বাঁধ এক নিমেষেই ভেঙে গেল। ঠোঁট কাঁপল, গলা শুকিয়ে এলো, কিন্তু কিছুই বলার ছিল না তার। কী বলবে? কাকে বলবে? সেই মানুষটিকে—যার চোখে একদিন পৃথিবীর সবটুকু বিশ্বাস দেখেছিল? যার জন্য আপনজনদের ছেড়ে নির্ভীক হয়ে এসেছিল, তাকে বলবে? সে কি আসলেই বুঝবে?

না, সে কিছুই বুঝবে না। বুঝালেও বুঝবে না।

সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কাঁপতে কাঁপতে পাশের ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে পড়ল মেঝেতে। হয়ত সে কাঁদবে কিংবা হয়ত কাঁদবে না। কিন্তু কেউ দেখতে পাবে না।

কারণ ভালোবাসার কাছে হার মানলেও, আত্মসম্মান নামের যে শেষ প্রদীপটি এখনও নিভে যায়নি, সেটুকু আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকাই এখন তার একমাত্র পথ।

এর মাঝে রাজকন্যার পরিবারও তার বিয়ের খবর জানতে পারল। এমন একজন বখাটে ছেলের সঙ্গে মেয়ের সংসার শুনে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার মা একদিন ফোন করে বলেছিল, ‘তুই তো বলেছিলি সুখে আছিস, মা... তাহলে কাঁদছিস কেন?’

রাজকন্যা তখন কিচ্ছু বলেনি। গিলে নিয়েছিল কান্না। তাছাড়া বলাও উচিত না! কারণ দোষী তো সে-ই। তাই মা-বাবাকে বলে তাদেরও কষ্ট বাড়াতে চায়নি।"

এটুকু বলে আরিয়ান আবার স্থবির হলো; রোমানাকে সংবেদনশীল শব্দগুলো আত্মস্থ করার অবকাশ দিল। অথচ আরিয়ানের বাক্যসমূহ শোনার পর রোমানার হৃদয়ে ভয়াবহ প্রলয় নেমে এলো। এতসব সূক্ষ্ম ও গোপন তথ্য আরিয়ান জানল কীভাবে? এগুলো কি আদৌ সম্ভব? অথচ তার কণ্ঠের নিখুঁত বর্ণনাভঙ্গি দেখে রোমানার মনে হল, সে স্বয়ং সেই ঘটনাগুলোর জীবন্ত অবলোকন করছে।

এদিকে আরিয়ান গল্প চালিয়ে গেল, "এরপর শুরু হলো নতুন অধ্যায়। ফারজাদ তার গয়না বিক্রি করে, রাজকন্যার নাম করে লোন নিত। বাসায় মদ খেয়ে এসে মাঝরাতে দরজা ধাক্কাতো। কখনো গায়ে হাত তুলত, কখনো মানসিক বা শারীরিকভাবে তাকে ভেঙে ফেলত।

কিছুদিন পর ফারজাদের আসল রূপ বেরিয়ে এলো। রাজকন্যার ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করল। রাজকন্যার মাথায় যেন বাজ পড়ল। নিজের স্বামী কীভাবে এমন কথা বলতে পারল? ফারজাদ তখন তাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়ে দিল, ‘এখন থেকে তুমি যদি ইনকাম না করো, তবে সব কিছু বাইরে চলে যাবে, ডার্লিং।’

রাজকন্যা তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে আবার টিউশনি শুরু করে দিল। তারা দুজন ছোট একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতে লাগল, যেখানে রাজকন্যা দিনরাত খেটে টাকা আয় করত, আর ফারজাদ সেই টাকায় মদ, জুয়ায় বুঁদ হয়ে থাকত।

এক বছরের মাথায় রাজকন্যা জানতে পারল, ফারজাদ শুধু তার নয়, আরও অনেক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িত। তার হৃদয়ে কষ্টের এক তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ল। তখনই সে সিদ্ধান্ত নিল—এই সম্পর্ক আর নয়। সে ডিভোর্স চাইবে। কিন্তু পরক্ষণেই ফারজাদ হাসতে হাসতে জানাল, ‘ওহ মেরি ভোলাভালা অবলা জান, তোমার সঙ্গে তো আমার বিয়েই হয়নি, সবই তো ছিল নাটক! ডিভোর্স আবার কীভাবে দিবে?’

মুহূর্তে রাজকন্যার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। এতদিন যে সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিল, সেটাই যদি না থাকে, তবে সে কার জন্য সহ্য করেছে এতকিছু?

তবুও সে মনোবল হারাল না। ঠিক করল, সব ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে, সবকিছু নিজের মতো করে নতুন করে শুরু করবে। কিন্তু ঘর ছেড়ে বেরোনোর আগেই নতুন একটা দুঃসংবাদ তাকে থামিয়ে দিল। সে সন্তানসম্ভবা!

খবরটা শুনে সে প্রথমে ভেঙে পড়ল। চেয়েছিল, এবোরশন করবে। কিন্তু গর্ভে যে নতুন প্রাণ বেড়ে উঠছে, তার জীবন কেড়ে নিতে মন সায় দিল না। মা তো! সায় দেওয়ার কথাও না। তাই ভেবেছিল সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকবে। যে কারণে সব জেনেও সে ফারজাদের কাছেই থেকে গেল।

কিন্তু ফারজাদের ব্যবহার পাল্টাল না। প্রতিদিন অকথ্য গালিগালাজ, হেনস্তা, মানসিক নিপীড়ন—সব চলতে থাকল। রাজকন্যার কান ধরে যেত। আবার মাঝে মাঝে বাচ্চাটার কথা মনে করে ফারজাদ নরম হতো, কিছুটা আদর করত, কিন্তু তাও যেন ছিল হিসাবি, স্বার্থপর ভালোবাসা।

একদিন হঠাৎ ফারজাদ বলল, ‘দেখো রমু, তোমার গর্ভে আমার সন্তান; তাই ঠিক করেছি, এবার তোমাকে বিয়ে করব। উইল ইউ ম্যারি মি, প্রিন্সেস?’

রাজকন্যার মুখে তখন উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠেছিল। বুকের গভীরে টালমাটাল খুশির অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। অনুভবের তাপে চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু জমে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, সব বুঝি ঠিক হয়ে যাবে বা অন্তত ঠিক হওয়ার সম্ভাবনায় সে আবার বাঁচতে শিখবে। সে উপর নীচ মাথা ঝাঁকিয়ে বিয়েতে সম্মতি দিল।

সে আরো ভাবল, এবার বুঝি ফারজাদ তাকে ভালোবাসবে, সযত্নে আগলে রাখবে, তাকে সম্মান দেবে। এতদিনের ভুলে যাওয়া স্বপ্নেগুলো এবার সত্যি হবে। কিন্তু ভাগ্যও যেন তার সঙ্গে নির্মম খেলায় মেতে উঠেছিল।

তিন মাস পর রাজকন্যার জরায়ুতে ক্যান্সার ধরা পড়ল। প্রথমে সে বিশ্বাস করতে পারেনি। কারণ তার তো কোনো হরমোনাল সমস্যা ছিল না!

ডাক্তার জানালেন, ‘এটি এইচপিভি ভাইরাসের কারণে হয়েছে।’

সে অবাক হয়ে বলেছিল, ‘কিন্তু আমার তো এইচপিভি নেই!’

তখন ডাক্তার বললেন, ‘এটি যৌ'ন সংস্পর্শেও ছড়াতে পারে।’

সেখানেই সন্দেহটা ফারজাদের দিকে ঘুরে গেল। অর্থাৎ ফারজাদের এইচপিভি ছিল।

সে যে মানুষের জন্য জীবনের এতটা ঝুঁকি নিয়েছিল, আজ সেই মানুষই তাকে মৃ*ত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবুও ভাবল, সন্তানের মুখ দেখেই সে সব ভুলে যাবে। কিন্তু না, তার ভাগ্য সেখানেও নির্মম। এত ভালোবাসার সন্তানটাও আর থাকল না। গর্ভেই তার মৃ*ত্যু হলো।

ডাক্তারের চেম্বারে বসে সে শুনল, ‘আপনার জরায়ু কেটে ফেলতে হবে, না হলে আপনার মৃ*ত্যুর ঝুঁকি থেকে যাবে।’

রাজকন্যার কানে শব্দগুলো উত্তাল ঝড় হয়ে বাজল। সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এরপর নিজের পেটে হাত রেখে আপনমনে বলল, ‘তুইও ধোঁকা দিলি, সোনা...’

সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ল, প্রথমবার বাচ্চার নড়াচড়া টের পাওয়ার দিন। আবার সে টিউশনির টাকা জমিয়ে ছোট একটা হলুদ রঙের জামাও কিনে রেখেছিল। কিন্তু এখন... এখন তো সবই শেষ।

হাসপাতালের করিডোরে বসে সে মোবাইল বের করল। ফারজাদের নাম টাইপ করল। কল বাটনের উপর আঙুল রেখে থেমে নাম মুছে ফেলল। আবার মায়ের নাম্বার টাইপ করল। সেটাও মুছে ফেলল। আসলে কাকে বলবে? কে আছে তার? আদৌও কি কেউ তাকে বুঝবে?

জরায়ু অপারেশনের জন্য ৬৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ তার হাতে মাত্র সাড়ে তিনশ টাকা। তার চোখের নিচে কালি স্পষ্ট দেখা যায়। গলায় গোপন কান্না চেপে ধরে সে হাঁটতে লাগল। সে আবারও একাকী হয়ে পড়ল।

তারপর একসময় রাজকন্যার এবোরশন করানো হলো, কিন্তু ফারজাদ তার উপর রাগ দেখালো। তার সন্তান হারানোর জন্য রাজকন্যাকেই দায়ী করল। আবার রাজকন্যার জরায়ুও কেটে ফেলতে হবে। অথচ তার কাছে অর্থও নেই, যাতে সে অপারেশন করাতে পারে। একদিকে তার পুরো জীবন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আর অন্যদিকে সে আর কখনও মা হতে পারবে না।"

আরিয়ান কথা থামিয়ে বসে রইল। রোমানা ততক্ষণে অনর্গল কাঁপছে। তার ঠোঁট কাঁপলেও কোনো শব্দ নিঃসৃত হলো না। রোমানার চোখ বেয়ে অশ্রুর রেখা নেমে আসছিল। আরিয়ান তার দিকে দুটো টিস্যু এগিয়ে দিল। রোমানা চোখ মুছল, তবু তাতে তার দুঃখে কোনো প্রশমন এলো না।

আরিয়ান আবার শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলতে লাগল, "এদিকে ফারজাদের রাজকন্যার উপর রাগ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। এখন তো সে আর কখনো মা হতে পারবে না। তার আর কী দরকার? তার থেকে আর কোনো সুবিধা নেই। তাই সে নতুন এক শয়তানি পরিকল্পনা আঁটলো।

সে একদিন বলল, ‘চলো, তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবো।’

রাজকন্যা থমকে গেল। তার অপারেশনের আগে কোথাও যাওয়ার কথা সে ভাবতেও পারে না। কিন্তু ফারজাদ তাকে বিশ্বাস করাল, ‘তোমার চিকিৎসার জন্যই তো নিয়ে যাচ্ছি, প্রিন্সেস।’

রাজকন্যার বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। অন্তত ফারজাদ তাকে নিয়ে ভাবছে, তাকে ভালোবাসছে; এটাই তো সে চেয়েছিল। আজ কত আনন্দ রাজকন্যার মনে! কিন্তু সেই আনন্দ অল্প সময়েই বিষে রূপ নিল।

ফারজাদ তাকে একটা অন্ধকার বার-এ নিয়ে গেল। সেখানে ঢুকেই ধাক্কা দিয়ে তাকে কিছু পুরুষের মাঝে ঠেলে ফেলে দিল। রাজকন্যা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখের পানি যেন এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। এতটা নিকৃষ্ট, এতটা হীন কেউ হতে পারে? তার মন হাজার প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে গেল। কিন্তু সেই সময় তার সামনে আরও এক ভয়াবহ দৃশ্য খুলে গেল।

অপরিচিত সেই পুরুষগুলো ফারজাদের হাতে মোটা মোটা টাকার বান্ডিল তুলে দিচ্ছে। দৃশ্যটা যেন বিষের মতো গলায় এসে আটকে গেল তার, ভেতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যেতে লাগল।

সব কিছু ঘূর্ণিঝড়ের মতো মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল। দুনিয়াটা কি এমনই? এতো নির্মম, এতো পাষাণ?

অল্প হলেও বুকের গভীরে যে ভালোবাসাটাকে এতদিন পুষে রেখেছিল, সেটা আচমকা ছাই হয়ে চোখের সামনেই উড়ে গেল।

ফারজাদ... তার সেই প্রিয় ফারজাদ... তার ভালোবাসা... যার ছায়াটুকু দেখলেও একসময় চোখ ভরে যেত আনন্দে; সেই মানুষটাই কি তবে আজ তাকে বিক্রি করে দিচ্ছে? এটাও কি সম্ভব? আসলেই? না, এ সত্যি হতে পারে না। সে হয়ত ভুল দেখছে। কিন্তু চোখ তো ধোঁকা দেয় না। দৃশ্যটা তো স্পষ্ট—টাকার বিনিময়ে তার দেহটাকে অন্য কারোর কাছে করায়ত্ত করার আয়োজন চলছে।

তাহলে ফারজাদ কি কখনোই তার ছিল না?

এই প্রশ্নে তার ভিতরটা কেঁপে উঠল। হৃদয়ের গহীনে এক নিষ্ঠুর সত্য ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

ভালোবাসলে না হয় অসম্ভব হতো। কিন্তু যে সম্পর্কের শিকড় গোঁড়া থেকেই রূপ আর চাহিদায় গড়া, সেখানে ভালোবাসার আসনই বা কোথায়?

সে বোঝে, বিক্রি শুধু তার শরীরের হয়নি—বিক্রি হয়েছে বিশ্বাসের, বিক্রি হয়েছে আত্মার। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

লাফিয়ে গিয়ে ফারজাদের পা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ফা-ফারজাদ, প্লিজ, আই বেগ ইউ। প্লিজ, এমনটা করো না। প্লিজ, প্লিজ, ফারজাদ! এরচেয়ে ভালো ছিল তুমি আমাকে মে*রে ফেলতে। ফার-ফারজাদ... প্লিজ...’

কিন্তু ফারজাদ তাকে এক লাথিতে ছিটকে ফেলে দিয়ে চলে গেল। সে নিঃস্ব হয়ে বারের মেঝেতে কাঁদতে লাগল, কিন্তু এখন যে তার কাঁদার সময়ও নেই। চারদিক থেকে পুরুষগুলো তাকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখের লালসা, মুখের বিকৃত হাসি বোঝাচ্ছে, এখন শুধু তার সৌন্দর্য ভোগ করার অপেক্ষায় তারা। রাজকন্যা বুঝে গেল, আজকের রাতটা হয়ত তার জীবনের শেষ রাত। কিন্তু সে তো নত হওয়ার মেয়ে নয়!

তাই সাহস, বুদ্ধি আর প্রশিক্ষণ তার অস্ত্র হয়ে উঠল। মার্শাল আর্টের কৌশল প্রয়োগ করে ঝটপট আক্রমণ শুরু করল। হঠাৎ পাওয়া প্রতিরোধে পুরুষগুলো দিকভ্রান্ত হয়ে গেল। কিন্তু ব্যথায় তাদের রাগ আরও চড়ে গেল। রাজকন্যাও দমবার পাত্রী নয়। বারের টেবিল থেকে মদের গ্লাস তুলে একের পর এক তাদের মাথায় ভাঙতে লাগল। সবার মাথা ফেটে র*ক্ত বেরিয়ে এলো। সাথে ছটফট করতে লাগল। আবার তাদের অ*ন্ডকোষ বরাবর লাথি মারল সে, মুহূর্তেই কয়েকজন ছিটকে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু এতে পুরুষগুলো আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। ওরা উঠে দাঁড়িয়ে রাজকন্যাকে শিক্ষা দিতে তেড়ে আসতে লাগল। কিন্তু রাজকন্যা ঠিক তখনই খেয়াল করল, বারের দরজা খোলা। সে তাদের আঘাত করে কোনো রকমে বার থেকে বের হয়ে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু ওরা আরো লোক নিয়ে তার পিছু নিল। রাজকন্যা শুধু কান্না আর প্রার্থনা করতে করতে দৌড়াতে লাগল।

আর সেদিন সেই প্রার্থনা হয়ত আল্লাহর কাছে পৌঁছালো। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ এক শক্তপোক্ত শরীরে ধাক্কা খেল সে। চোখ তুলতেই সামনে এক ফরসা পুরুষের অবয়ব ভেসে উঠল। হঠাৎ ধাক্কায় থমকে গেল পুরুষটি। চোখ তুলে নিঃশেষিত এক মেয়েকে দেখতে পেল। কাঁপতে থাকা শরীর, এলোমেলো চুল, চোখে ভয় আর কান্না নিয়ে তার বুকের ভাঁজে এসে আটকে আছে মেয়েটা। অন্ধকারে সেই পুরুষকে দেখে রাজকন্যার ভয় দ্বিগুণ হয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেল। মনে হলো, পিছনে কুমির আবার সামনে বাঘের মুখে পড়েছে সে।

কিন্তু হঠাৎই কেন জানি রাজকন্যা সব দ্বিধা-সংকোচ সরিয়ে তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। পুরুষটি স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু সময়ের জন্য নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল। মনে হলো, তীব্র শীতল ঝাপটা বুক চিরে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এই প্রথম... হ্যাঁ, এই প্রথমবার কোনো নারী ভয়ডর উপেক্ষা করে তাকে এভাবে স্পর্শ করল। কোনো শব্দ করল না পুরুষটি, শুধু মেয়েটার কাঁপতে থাকা পিঠের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইল। রাজকন্যার উষ্ণ নিশ্বাস তার বুকের উপর পড়তে থাকল। হয়ত প্রতিটি শ্বাসে সে বলছিল, ‘আমাকে ঠেলে দিও না, আরেকবার আমি ভেঙে যাব। বাঁচাও আমাকে, দয়া করে বাঁচাও...’

পুরুষটির বুকের গভীরে অস্থির ঢেউ খেলে গেল, অব্যক্ত উত্তেজনায় ঢোক গিলল সে। সে জানত না এমন স্পর্শে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। এই অনুভব, এই দুর্বলতা, তার চেনা জগতের বাইরে ছিল। সে রাজকন্যাকে দূরে ঠেলে দিতে চাইল।

আর তখুনি রাজকন্যা তার গায়ের কালো জ্যাকেট এক হাতে শক্ত করে খামচে ধরে, অন্য হাতে তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে উঠল, ‘আমাকে বাঁচান, ওরা আমাকে মে'রে ফেলবে। পি-প্লিজ, বাঁচান...’

পুরুষটি, অর্থাৎ রাজা হালকা হাসল। এই প্রথম কোনো মেয়ে তার বুকের উপর এভাবে কেঁদে আকুতি জানালো। এত কোমল, এত মিষ্টি আকুতি শুনে, রাজা মনপ্রাণ দিয়ে সেই আবেদন গ্রহণ করল। কিন্তু রাজকন্যা আর কিছুই বলতে পারল না। সে রাজার বুকেই অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়তে লাগল। তবে পড়ার আগেই রাজা তাকে ধরে ফেলল। চোখ বন্ধ করে সেও তাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর অনুভব করল, পেছন থেকে সেই হায়নাদের দল এগিয়ে আসছে। রাজা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। দেখল, তাদের চোখে লালসা, মুখে হিংস্রতা। তাই রাজা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল, আর তখনই সেই মানুষরূপী হায়নাগুলো ছুটে পালাল। তারপর রাজা রাজকন্যাকে কোলে তুলে হাঁটতে লাগল। তার বুকের সাথে এক নিঃসাড় দেহ মিশে গেল।

পরের দিন একটা বিশাল ধবধবে সাদা কক্ষে রাজকন্যার জ্ঞান ফিরল। আলো পড়তেই চোখ কুঁচকে নিশ্বাস টেনে সে কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘এটা... কোথায়?’ সে দ্রুত উঠে বসে চিৎকার করে উঠলো, ‘কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে আমাকে? আর তোমরা কা–’

তৎক্ষনাৎ পাশেই রাজাকে দেখতে পেয়ে সে শান্ত হলো। রাজার পাশে কিছু কাজের লোকও ছিল, আর তার সেবা করতে নার্সও উপস্থিত ছিল। রাজা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘হাই...’

রাজার ভারী কণ্ঠ শুনে রাজকন্যা শুধু গভীর নিশ্বাস ফেলে চোখ নামিয়ে ফেলল। আবার একবার রাজার দিকে চোখ তুলে তাকাল।

এরপর কিছুদিন তাকে ঘিরে যত্নের অভাব ছিল না। কিন্তু রাজা কখনো কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করেনি, বরং দূর থেকে দেখেছে। তারপর রাজকন্যা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলে, রাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সামনে যেতে শুরু করলো। কিন্তু রাজা কোনো শব্দ করলো না, শুধু রাজকন্যার চলে যাওয়া দেখল। সে চলে যেতেই রাজা সামান্য হাসল।

এদিকে রাজকন্যার জন্য আর কোনো পথ ছিল না। তাকে বাধ্য হয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে হলো। বাবার ঘরে পা রাখতেই তার দুই বোন তাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে ছোটবোন বলল, ‘আপু, বাবা আর নেই...’

রাজকন্যা স্তব্ধ ছিল কিছুক্ষণ। এরপর হঠাৎ ঠান্ডা মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ল। তার চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছিল, অথচ ঠোঁট কাঁপলেও কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।

তার বাবা মারা যাওয়ার খবর ফারজাদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ফারজাদ সোজাসুজি বলে দিয়েছিল, ‘তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

বাবার ম'রদেহ তখনো খাটে। সে গিয়ে তার বাবার পায়ের কাছে বসল। পা দুটো জড়িয়ে ধরে চুম্বন করল। সেখানেই মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগল।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ রাজকন্যা পাথরের মতো হয়ে গেল। এদিকে জমানো টাকায় কিছুদিন সংসার চললেও, পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে লাগল। বড় বোনের বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে গেল, ছোটবোনের পড়াশোনার খরচ থেমে গেল। তাই রাজকন্যা চাকরির জন্য অনেক জায়গায় ছুটলো, কিন্তু ফলাফল কিছুই হলো না। তার বাবা আর্মিতে সম্মানিত পদে কাজ করতেন, আর বাবার সম্মান রক্ষার্থে সে কোনো নীচু কাজও নিতে পারছিল না। কিন্তু সম্মান দিয়ে তো পেট চলে না। তাই একদিন দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে একটা পরিকল্পনা করল সে।

এক সন্ধ্যায় রাজকন্যা আবার সেই রাজার প্রাসাদের ভারী লোহার গেটের সামনে দাঁড়াল।

প্রহরীরা তাকে চিনে ফেলে রাজাকে জানালো। রাজা সেই একই নির্লিপ্ত মুখে তার সামনে এসে দাঁড়াল। রাজকন্যা তখন মাথা উঁচু করেই তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?’

রাজা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর প্রশান্ত হাসল।

তবে সে কোনো প্রশ্ন করল না। জানতে চাইল না, তার নাম কী? তার পরিবারে কে কে আছে? সেদিন সে কেন দৌঁড়াচ্ছিল? কারা তাকে তাড়া করেছিল? বা তার অতীত কি?

সে শুধু বলল, ‘পরের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে।’

অর্থাৎ সে শুধু জানত, এই মেয়েটি তার শূন্যতা পূরণ করতে এসেছে, আর আজ তার সামনে তার ভবিষ্যতের রানি দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের বিয়েটি রাজকীয় আয়োজনে পরিণত হলো; হীরকখচিত সাজসজ্জা, প্রাসাদজুড়ে আতশবাজি আর অভিজাত আমন্ত্রিতদের গুণকীর্তনে ভরে উঠল দিনটি। বিয়েতে রাজার বাবা তার ছোট ছেলেকেও বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যদিও ছোট রাজার মন এসব বিয়েবাড়ির পাকে ছিল না।

বিয়ের পর রাজকন্যার জীবনে এক নতুন মোড় আসল। রাজা তাকে ভালোবেসে আগলে রাখত। এতটা যত্ন করত যে রাজকন্যার মনে হত, সে সেই যন্ত্রণাকে পেরিয়ে এক সুরক্ষিত কোলের মধ্যে এসে পড়েছে। দামি গয়না, বিলাসবহুল পোশাক, রাজকীয় খানাপিনা—তার জীবনে কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে রাজকন্যা কখনো রাজাকে তার অতীতের কথা বলেনি।

তারপর একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে রাজকন্যা তার জরায়ু কেটে ফেললো। অনেক চিন্তা, দ্বিধা আর ভয়ের পরেও সে এটা করতে বাধ্য হয়েছিল। অপারেশনের পর সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে চমকে গেল। যেন এক অচেনা মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ ছুঁয়ে দেখল, এই কি সে? চোখ দুটো কেমন শূন্য, অথচ তার ভেতরে জ্বলছে নোনতা দুঃখের অগ্নিশিখা। তার ঠোঁটে এক ফোঁটা হাসি ফুটল, যদিও সে হাসি ছিল ব্যথায় বিদীর্ণ। আজ থেকে সে আর কখনো মা ডাক শুনবে না, আর কখনো নিজের র'ক্তে গড়া একটি প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না। বুকের গভীরে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল, অথচ কাউকে সে কিছু বলতেও পারছিল না। রাজাকেও না। কীভাবে বলবে? কীভাবে বোঝাবে? এমন যন্ত্রণার ভাষা কি আছে?

তবুও কোথাও যেন আশ্চর্য একটা প্রশান্তি তাকে ছুঁয়ে গেল। কারণ প্রতিনিয়ত ভিতরটাকে ক্ষয় করে দেওয়া রক্তমাখা সেই অভিশাপ থেকে আজ সে মুক্ত। এ মুক্তি ব্যথার, তবুও তো মুক্তি!

বিয়ের প্রথম এক বছর তারা সত্যিই সুখে কাটালো। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন রাজা জানতে পারল, তার প্রিয় রানি কখনোই মা হতে পারবে না। রাজা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও তার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না, কিন্তু তার অন্তরের কান্না তো কেউ দেখেনি। রানি তার কাছে সব লুকিয়েছে, এই বিশ্বাসভঙ্গ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। তবুও রাজা রানীকে কখনো আঘাত করেনি। তার ভালোবাসায় অভিমান ছিল, কিন্তু বিদ্বেষ ছিল না।

কিছুদিন পর রাজার ছোট ভাই বিদেশ থেকে ফিরে এলো। তার উদ্দেশ্য ছিল, নিজের একটি বিশাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা।

এদিকে রানি প্রতিদিনের সংসারের দায়িত্ব সযত্নে পালন করলেও তার মুখের হাসিটা আর আগের মতো প্রাণবন্ত ছিল না।

এই সময়ে ফারজাদ হঠাৎ করেই ফিরে আসল। সে জানতে পারল, তার পুরোনো শিকার এখন রাজপ্রাসাদের রানি। হিংসা আর লোভে অন্ধ হয়ে সে রানিকে ফোন করতে শুরু করল। রানি প্রথমে বুঝতে পারেনি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন কে দিচ্ছিল।

কিন্তু তখন ফারজাদ তার পরিচয় দিয়ে বলল, ‘তোর গোপন ভিডিও কিন্তু আমার কাছে এখনো আছে, সোনা। টাকা না দিলে ভাইরাল করে দিতে এক সেকেন্ডও ভাববো না। টাকাগুলো দিয়ে দাও, সারাজীবনের জন্য তোমাকে ভুলে যাব। চিনবোই না তুমি কে! কবে দিবে জানার অপেক্ষায় আছি।’

এসব কথা শুনে তখন রানীর শরীর ঠান্ডা হয়ে আসল। তার শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল।

সে জানে, যদি এই কথা রাজার কানে যায়, তবে শুধুমাত্র তার সুখের নয়, রাজার হৃদয়েরও মৃ'ত্যু হবে। তাই সে কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে ফারজাদকে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ফারজাদকে টেক্সট করে জানালো, সে রাতে তার বাড়িতে গিয়ে টাকা দিয়ে আসবে। ফারজাদ খুশি হয়ে গেল।

রাত তখন দেড়টা। রাজা পাশে শুয়ে ছিল। রানি চোখ বন্ধ করে তার পাশেই শুয়ে ঘুমের ভান ধরে ছিল, আর মনে মনে ফারজাদের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাজা ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে সে খুব আস্তে করে একদম নিঃশব্দ পায়ে উঠে চলতে শুরু করল। কিন্তু সে জানতো না, রাজা ঘুমিয়ে নেই।

রানীকে কক্ষের দরজা দিয়ে বের হতে দেখে, রাজার মনে সন্দেহ জাগলো। রাজা মনে মনে ভাবতে থাকল, ‘ওয়াশরুম তো ভিতরে, তাহলে এত রাতে ও যাচ্ছে কোথায়?’

সেও চুপচাপ রানীর পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। রানি নীচে নেমে রান্নাঘরে ঢুকলো।

অন্যদিকে পাশের কক্ষে ছোট রাজা কোম্পানি নির্মাণের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। হিসেবের চাপে তার মস্তিষ্ক গরম হয়ে উঠেছিল। হঠাৎই রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে এসে ছোট রাজার ধ্যান ভাঙল। ওদিকে রানি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে দরজা খুলে বাইরে চলে গেল। ছোট রাজা কক্ষ থেকে বেরিয়ে সদর দরজা খোলা দেখে, তার মনেও সন্দেহ জাগলো। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গিয়ে দেখল, রানি গাড়িতে উঠছে। এত রাতে সে কোথায় যাচ্ছে? এই ভাবনায় সেও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রানিকে অনুসরণ করতে শুরু করল।

অন্যদিকে বড় রাজাও গাড়ি নিয়ে রানি এবং ছোট রাজার পেছনে চলতে শুরু করল।

ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে রানির গাড়ি শহরতলির একটা পুরোনো, অন্ধকার, ভাঙা-চোরা একতলা বাড়ির সামনে থামল। তখন চারপাশে শুধুই নিস্তব্ধতা; আশেপাশে একটা ঘরও নেই। বাতাসেও কেমন শো শো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। হয়ত ফারজাদ ইচ্ছে করেই রানিকে এখানে আসতে বলেছিল, যেন কেউ টাকার বিষয়টা দেখতে না পায়। অথবা রানিই ফারজাদকে এমন জায়গায় টাকা দিবে বলেছিল। যাক! এরপর রানি গাড়ি থেকে নেমে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিল।

ফারজাদ দরজা খুলে রানীকে দেখে প্রসারিত হাসি দিয়ে বলে উঠল, ‘ও এম জিইই! আমার রমু এত সুন্দর হয়ে গেল কবে থেকে? যদিও সে বরাবরই অমায়িক সুন্দর ছিল। যাক গে, টাকা আনছো তো?’

অন্যদিকে বড় রাজা এবং ছোট রাজা রানির পিছু পিছু এসে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। এসব কথা শুনে তাদের কপাল ভাঁজে পড়ল। হচ্ছে কী এসব? রানি এত রাতে এখানে কি করছে? এই ছেলেই বা কে? এর সাথে রানির সম্পর্ক কি?

তারা দুজনে কিছুই বুঝতে পারলো না। তবে বড় রাজা ছোট রাজাকে দেখলেও, ছোট রাজা বড় রাজাকে খেয়াল করেনি। সামনের দৃশ্য দেখে ছোট রাজা কিছু বলার জন্য মুখ খোলার চেষ্টা করতেই, তার চোখ মুহূর্তে বড় হয়ে গেল।

কারণ রানি কোনো কথা না বলে শাড়ির আঁচলের নীচ থেকে এক বিশাল ধারালো ছু*রি বের করে ফারজাদের বুকের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। প্রথম ছু*রিকাঘাতের পরেই পাঁজরের নীচ থেকে মাংস ছিঁড়ে হাড়ে আঘাত করার বীভৎস আওয়াজ বেরিয়ে আসল। দ্বিতীয়বার ছু*রি ঢোকানোর পর ফারজাদের শরীর কেঁপে উঠে থেমে গেল। বুকের মাঝ বরাবর ফাঁক তৈরি হলো। আর সেখান থেকে র*ক্তের গাঢ় স্রোত বেরিয়ে এসে তার শার্ট ভিজিয়ে দিতে থাকল। এরপর বারংবার করা ছু*রির প্রতিটি আ*ঘাতে মাংসপেশী ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে আলগা হতে থাকল। ফারজাদের মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এল। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকল, চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল।

বড় রাজা অবাক হয়ে রানির দিকে তাকিয়ে রইলো। ছোট রাজাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

এর মধ্যেই রানি তার মুখে একটি কাঁচের শিশি থেকে ঘন সবুজ বিষ ঢেলে দিল। ফারজাদ হাত দিয়ে গলা চেপে ধরল, বিষ যেন ভিতরে না পৌঁছাতে পারে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। তার চোখ পিত্তকণ্ঠী হয়ে গেল, ঠোঁট থেকে গ্যাঁজলা বেরিয়ে পড়ল।

গোঙাতে গোঙাতে ফারজাদ ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অনবরত কাঁপতে থাকা দেহটার বুকের মাঝখান দিয়ে হু-হু করে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ে মেঝে রঞ্জিত হতে থাকল। একসময় নিস্তব্ধ হয়ে গেল সে। ছোট রাজা আর বড় রাজা স্থির, তাদের চোখ চওড়া হয়ে গেল। দুজনেরই জিভ শুকিয়ে কখন কাঠ হয়ে গেছে।

অথচ রানি নির্বিকার। সে ধীর পায়ে ফারজাদের বুকের উপর উঠে বসল। একেবারে ঠান্ডা শীতল দৃষ্টিতে সে ছু*রিটা আবার তুলল। তারপর বারংবার ফারজাদের বুকের মধ্যে ঢোকাতে লাগল। হাড়ের ভেতর থেকে ছু*রির মুখে কলিজা আর পাঁজরের টুকরো ছিঁ*ড়ে আসল।

ফারজাদের দেহ থেকে ছিটকে আসা উষ্ণ র*ক্ত রানির মুখ ভিজিয়ে দিল। তার আঁচলে, তার চুলের গিঁটে লাল ছোপ ছোপ দাগ সৃষ্টি হতে লাগল।

প্রতিশোধ নিতে রানি ধীরে ধীরে আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।

একটুপর রানি সামান্য হাসল। কিন্তু তার হাত থামল না। মনে হয়, প্রতিটি কো*পে সে একেকটা অতীতের দুঃসহ স্মৃতি কেটে ফেলছে। বুক চি*রে, হাড়ের গহ্বর ভেদ করে ছু*রির ধারালো ফলক প্রবেশ করালো বারংবার। বু*কের মাঝখানটা দুভা*গ হয়ে অভ্যন্তরীণ ফুসফুস, র*ক্তনালি, হৃৎপিণ্ড সবকিছু দৃশ্যমান হলো।

তারপর হঠাৎ সে ফারজাদের গলাকেও টার্গেট করল। একবার, দুবার, তিনবার। এভাবে একই জায়গায় ঘন ঘন কো*পে গ*লার একপাশ থেঁতলে গিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ল। ঘাড়ের হাড় চি*রে গিয়ে খটাস শব্দে ভেঙে গেল। গলার শিরা ছিঁড়ে র*ক্ত ফোয়ারা হয়ে দেয়াল পর্যন্ত ছিটকে পড়ল। রানির মুখে, গালে, গলায়ও লেগে গেল।

ফারজাদের গলা থেকে গড়িয়ে আসা অর্ধেক বিচ্ছি*ন্ন কণ্ঠনালি ছটফট করতে থাকল। কাটা স্থানে গলার হাড় ফাঁক হয়ে গেল, তার নিচে নরম মাংসের ছিন্ন কুচি আর ফেনিয়ে ওঠা র*ক্ত দেখা গেল। চারপাশে শুধুই থপথপে র*ক্ত। রানির আঁচল র*ক্তে ভিজে নিচে পড়ে যাচ্ছিল, তার মাথার খোঁপা থেকে র*ক্তের বাজে গন্ধ ছড়ালো। রান্নাঘরের সেই ছু*রি তখন মৃতদেহের গলায় আটকে ছিল, রানি উঠে দাঁড়িয়ে সেটা ঘুরিয়ে টেনে বের করল, আর একধাক্কায় ফারজাদের চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। চোখের পাতা ফেঁটে গিয়ে কুঁচকানো জেলি মাটিতে ঝরে পড়ল।

ছোট রাজা পাশের ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার মুখে কথা আসল না, শরীর জমে গেল। বড় রাজাও স্তব্ধ, সে নিজের হৃৎস্পন্দনও শুনতে পাচ্ছিল। রানির অতীত, তার রাগ, তার প্রতিশোধ, তার মুখের উন্মাদনা সবকিছু দেখে তার মাথায় লাখো লাখো প্রশ্নের জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। তবে বড় রাজা একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিল, তাদের সামনে এমন এক নারী দাঁড়িয়ে, যার শুধু উপরের রূপটাই দেখেছে তারা।

রাতের বাতাসে তখন শুধু র*ক্তের গন্ধ ভাসছিল। সেই গন্ধে অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাচ্ছিল রানি। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়ালো, শরীর থেকে র*ক্ত ঝরে পথে গড়িয়ে পড়ল। শাড়ির কোঁচা ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে কেবল স্থির দৃষ্টিতে ফারজাদের নিথর লা*শ দেখতে থাকল। মৃ*তদেহের কাঁপুনি থেমে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু র*ক্তের ধারা থামছে না।

অথচ তবুও রানির উন্মাদনা কমল না। আবারো বসে মৃ*তদেহের উপরই পুনরায় আ*ঘাত হানতে লাগল। কখনো পেটে, কখনো হৃৎপিণ্ড বরাবর, আবার কখনো হাত-পায়ের শিরা ছিন্নভিন্ন করে দিল। ফারজাদের নাক-মুখ দিয়ে শুধু র*ক্তের ঢল নামতে থাকল। পেটের মাংস একদিকে ছিঁ*ড়ে গিয়ে কাঁচা মাংসের স্তর উন্মুক্ত হলো। অতিরিক্ত ছু*রির আ*ঘাতের ফলে ফারজাদের পেট একদম থেঁতলে গেল। পেটের এক পাশে র*ক্তের বুদ্‌বুদী উঠে আসছিল।

রানি থামল না, একবারের জন্যও থামল না। একজন নারীর শরীরে এত শক্তি তো থাকার কথা নয়, কিন্তু সেদিন রানির শরীর একবারের জন্যও ক্লান্ত হলো না। তার চোখ দুটো ক্রোধে টনটন করছিল। রানির পায়ের নিচে র*ক্ত জমে কাদার মতো হয়ে গিয়েছিল। তার পায়ের গোড়ালি সেই স্রোতে ডুবে যাচ্ছিল। অবশেষে সে তার সবটা শক্তি দিয়ে ফারজাদের অ*ণ্ড*কো*ষ* ফা*টিয়ে দিল। ফারজাদের প্যান্ট র*ক্ত ও অ*ন্ড*কো*ষের তরলে ভিজে গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে বিছিয়ে গেল।

রানির কপাল থেকে র*ক্ত গড়িয়ে চোখের কোণে এসে জমল, তবুও সে চোখ বন্ধ করল না। বড় রাজা এসব দৃশ্য দেখে শিউরে উঠল। তার নিশ্বাস আটকে এসেছিল।

তবে বড় রাজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ছোট রাজা আর সহ্য করতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে রানির হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। রানি তখন চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোখের সাদা অংশটা লালাভ হয়ে উঠেছিল।

সে পাগলের মতো চিৎকার করে ছোট রাজাকে বলল, ‘এখান থেকে চলে যাও। আমাকে মা*রতে দাও, দয়া করে আমাকে মা*রতে দাও। সরে যাআআও...’

ছোট রাজা আরো শক্ত করে রানির হাত ধরে রেখেই বলল, ‘ও অলরেডি মা'রা গেছে, ভাবী।’

কিন্তু রানির কানে কথাটা ঢুকল না। সে হিংস্র পশুর মতো ছোট রাজাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। তারপর আবার ফারজাদের দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এসব দেখে ছোট রাজা ও বড় রাজা দুজনেই বুঝতে পারল, এই হ*ত্যার পেছনে নিশ্চয়ই এক গভীর কাহিনি লুকিয়ে আছে। এমন উন্মাদ প্রতিশোধ কেউ নেয় না, যদি না তার বুকে শতাব্দীর দাহ লুকিয়ে থাকে। অবশ্য ছোট রাজা রানিকে কোনো প্রশ্ন করল না।

সে শুধু ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, ‘বাকি কাজটা আমাকে করতে দিন।’

রানি বুঝল, এবার লা*শ সরানোর পালা। সে থামল, ছু*রিটা হাতের মধ্যে চেপে ধরেই উঠে দাঁড়াল। সেটাতে মাং*স লেগে ঝুলে ছিল। তার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু মুখে প্রশান্তি খেলা করছিল।

সেই নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রানি বলল, ‘আরেকবার ফিরে আসতে চেষ্টা করো, ফারজাদ। আমি অপেক্ষা করব... দ্বিতীয় মৃ*ত্যু দিতে।’

তারপর নির্বিকার মুখে সামনে হাঁটতে শুরু করল। তবে একবারও পেছনে তাকাল না। কারণ সে এখন জয়ী, তার কাজ শেষ। সে গাড়িতে উঠে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বড় রাজা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে সব দেখে যাচ্ছিল।

সে যেতেই ছোট রাজা উপরে দুই হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙলো। কিছুক্ষণ চারপাশ নিরীক্ষণ করল, নিশ্চিত হলো কেউ নেই। এবার তার নৃ*শংসতা প্রকাশ পেল। সে ফারজাদের ঘর খুঁজে একটি কুঠার বের করল। নিখুঁত দক্ষতায় প্রথমে ফারজাদের মাথাটা আলাদা করল। তার মুখে বিন্দু বিন্দু র*ক্তের ফোটা ছিটে উঠেছিল। কাটা মাথাটার চুলে লেগে থাকা র*ক্ত মেঝেতে আঁকিবুঁকি কাটতে থাকল।

ছোট রাজা হঠাৎ করেই তার আঙুলগুলো খুলির ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। খোঁ*চাতে থাকলে তার নখের নিচে মগজের লিজলিজে অংশ আটকে গেল। এক সময় আঙুল দিয়েই চোখের পেছনের স্নায়ুগুলো ধরে টান মারল! চোখটা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। সাথে কিছু শিরা-উপশিরাও ছিঁ*ড়ে বেরিয়ে এলো।

সেখানে একটা গর্তের মতো তৈরি হলো। তারপর ধারালো এক কোপে তার পু*রু*ষা*ঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে দিল। সেটি ছিটকে দরজার বাইরে গিয়ে গড়াতে লাগল। সঙ্গে সেখান থেকে র*ক্ত ছিটে এসে ছোট রাজার ঠোঁট বেয়ে পড়তে থাকল। বড় রাজা দ্বিতীয়বার হতবাক হলো। অর্থাৎ সে শুধু রানিকে নয়, নিজের ছোট ভাইকেও এতদিন চিনতে পারেনি।

এদিকে ছোট রাজা ঠান্ডা মাথায় পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়তে ছাড়তে নিথর দেহটার দিকে ঝুঁকে বলল, ‘Death can be beautiful, but only when one deserves it.’

তারপর একে একে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করল। কাটা অংশগুলোর চারপাশের মাং*স ফুলে উঠেছিল।

এরপর ছোট রাজা পানি এনে র*ক্ত ধুয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করল। পকেট থেকে কী যেন একটা স্প্রে করল, যাতে র*ক্তের গন্ধ কিংবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে। সম্ভবত ব্লিচিং এজেন্ট বা ক্লিনিং সলিউশন হবে। সমস্ত কাজ শেষ করে দেহাংশগুলো তুলে গাড়ির ডিকিতে রাখল। তারপর ছোট রাজা গাড়ির গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলল, আর বড় রাজা গাড়িতে উঠে দূর থেকে তার পিছু নিল। কিছুক্ষণ পর ছোট রাজা এক নির্জন, ঘন জঙ্গলের মাঝে গাড়ি থামাল। সেখানে একটা স্পিডবোর্ডে উঠে অজানা গন্তব্যের দিকে হারিয়ে গেল। বড় রাজা নির্বাক হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কোথায় গেল ছোট রাজা? সে আসলেই কে? তার ভাইয়ের জীবনেও কি তাহলে গোপন কিছু রয়েছে, যা সে বা তার পরিবার জানে না? কোনো প্রশ্নের উত্তর মিলল না। তাই বড় রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গৃহপথে রওনা হলো।

পরদিন সকালে ছোট রাজা রানির হাতে একটি র*ক্তের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এবার গোসল করে আসুন।’

কিন্তু সে রানিকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। কারণ সে বুঝতে পারে, রানির অতীত ভয়ংকর; এতই ভয়ংকর যে তা দ্বিতীয়বার মনে করানো উচিত নয়। এই র*ক্তে সে সাফ হবে না, কিন্তু হয়ত একটু হালকা হবে। রানিও চুপচাপ হালকা হেসে সেই র*ক্তেই গোসল করল।

পরবর্তীতে ছোট রাজা ফারজাদের নকল ভিসা ও পাসপোর্ট তৈরি করল। এমনভাবে সব সাজালো, যেন সে বিদেশে পালিয়ে গেছে। তার এই দক্ষতা দেখে বড় রাজা হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু সেও এবার বসে রইল না। রানির পরিবার, শৈশব, বন্ধুত্ব সবকিছু নিয়ে সে খোঁজ নিল। এমনকি রানি কোন দিন কোথায় গেছে, কার সাথে সময় কাটিয়েছে, তাও জানার চেষ্টা করল। কিন্তু সব জেনেও সে চুপ থাকল, আর অপেক্ষা করল, রানি নিজেই কবে সবকিছু বলবে। অথচ রানি কিছুই বলল না। অবশেষে হতাশ হয়ে বড় রাজা রানিকে তার নিঃসন্তান থাকা নিয়ে খোঁটা দিতে লাগল। তবে রানি তাতেও কিছু বলল না। রাজা বুঝল, সে রানির মন ভাঙতে পারবে না। কারণ সত্য যাই হোক না কেন, সে রানিকে সত্যিই ভালোবাসে। আর ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।"

তারপর আরিয়ান রোমানার কাঁধ থেকে মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আর সেই রানি কে জানো?"

রোমানা আরিয়ানের চোখে দৃষ্টি রেখে গভীর কণ্ঠে বলল, "সাওদা রোমানা।"

🍁চলবে?🍁

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন