ফন্ট সাইজ:
থিম:
Tell me who i am(২য় খণ্ড)

৩য় পর্ব

লেখক: আয়সা ইসলাম মনি

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_৩_প্রথমাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

___________________________________________☞

এবার আরিয়ান কপট গাম্ভীর্যে হেসে বলল, "আর এখানে বড় রাজা হচ্ছে আরিয়ান চৌধুরি, আর ছোট রাজা কারান চৌধুরি। গল্পটা কেমন ছিল, প্রিয়দর্শিনী?"

রোমানা ঠোঁটে আলতো হাসির রেখা ফুটিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, "অনেক সুন্দর।"

"তবে আর যাই বলো, আমার রোমানাকে ঝগড়াতেই ভালো লাগে। তোর সাথে ঝগড়া করা ছাড়ছি না, শালির ঘরের শালি।"

রোমানা সেই চিরচেনা দুষ্টামির ঘূর্ণিতে ডুবে গিয়ে এবার আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে তার বুকের ওপর উঠে বসল। ঝাঁঝালো হাসিতে বলল, "আমিও এ জনমে তোমাকে মারামারি থেকে ছাড় দিচ্ছি না, শালার ঘরের শালা।"

আরিয়ান বুকের ওপর ওর ওজন পড়তেই অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। হাসিমুখে বলল, "রমু নামটা কিন্তু ভালো ছিল। কী বলো?"

রোমানার ঠোঁটে একটুখানি দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সে মাথা নীচু করে আরিয়ানের ঠোঁটের কাছাকাছি চলে এলো। তারপর দু'আঙুল বন্দুকের ট্রিগারের মতো সাজিয়ে তার বুকের উপর সেই আঙুল দুটো চেপে রেখে, ঠোঁট কামড়ে বলল, "দিব নাকি বুকের মধ্যে গুলিটা ঢুকিয়ে?"

আরিয়ান নিঃশব্দে হেসে ফেলল। সে রোমানাকে একটানে ঘুরিয়ে দিয়ে বিছানায় ফেলে দিল, তারপর ঠোঁটের দ্বারা তার গাল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠল। কিছুক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রোমানার কপালের উপরে থাকা চুলগুলো মমতার পরশে সরিয়ে দিল।

এই দৃষ্টির গভীরতা রোমানার ভেতর প্রশান্তির ঢেউ তুলল। মৃদু কণ্ঠে বলল, "একটা কথা বলো তো, বেকার জীবন রেখে আবার কবি হওয়ার ধান্দায় নামলে না তো?"

আরিয়ান সেই প্রশ্নের উত্তরে তার ঠোঁটে এক গভীর চুম্বন দিল। রোমানা হালকা হেসে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। আরিয়ান হেসে বলল, "চেষ্টা করছি বউকে কিছু একটা উপহার দেওয়ার। হোক না, কবি হয়ে যাই।"

এই কথায় রোমানার মস্তিষ্কে ভালোবাসার ঢেউ আছড়ে পড়ল। আজ তার মনটা অনেক হালকা লাগছে, যেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সব অপূর্ণতা, দমবন্ধ করা কষ্টগুলো সরে গেছে।

তবুও প্রেমের গভীরতায় ভেসে যাওয়ার চেয়েও দুষ্টুমিতে তার হৃদয় বেশি প্রশান্তি খোঁজে। তাই সে আচমকা আরিয়ানের পেটে ঘুসি মারল।

আরিয়ান চিৎকার করে উঠে পড়ল, "আহ! কু*ত্তার বাচ্চা রোমানা! এ জনমে তুই আর শুধরাবি না।"

রোমানা অট্টহাসি ফুটিয়ে বলল, "ওটা আর আমার দ্বারা হচ্ছেও না।"

_______

প্রতিদিন মানুষের কোলাহল থাকলেও পার্কের জায়গাটা আজ নিস্তব্ধ। অবশ্য এর পিছনে কারণ রয়েছে। ঘণ্টাখানেক আগে বৃষ্টি হয়েছিল।

ঘাসগুলো নুয়ে পড়েছে, আর গাছের কানায়-কানায় জমে থাকা জল টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে।

হালকা বাতাস কাব্যের শরীরে লাগতেই প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। পার্কের এক বেঞ্চে অনেকক্ষণ ধরে নিঃশব্দে বসে রয়েছে সে। কিন্তু কোথাও ইলিজার খোঁজ নেই। ইলিজা ফোন ব্যবহার করে না, তাই যোগাযোগেরও উপায় নেই। একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, বেলা ৪টা ২৭ বাজে। অথচ ইলিজা তো বলেছিল, সাড়ে তিনটার মধ্যেই এসে পড়বে। সময়ের এই বিলম্বে মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে অবচেতনেই পা নাড়াতে শুরু করল। হঠাৎ কি ভেবে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ল। কণ্ঠে ধরা পড়ল কম্পিত সুর, "আমার কি তবে ওকে আসতে বলা ঠিক হইলো না? যদি কিছু হয়ে যায়... ধুর, চিন্তা তো সরছেই না। হে আল্লাহ, আমার ইলিজাকে রক্ষা করো।"

হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন চোখের সামনে সেই ভয়াবহ দিনটির প্রতিটি দৃশ্য ধরা দিল। OWL-দের তাড়া করা, ইলিজার আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শরীর, ঝোপের আড়ালে প্রাণপণে লুকিয়ে থাকা, আর সেই শেষ মুহূর্তের অলৌকিক রক্ষা—আল্লাহ যেন নিজ হাতে ওদের টেনে এনেছিলেন বিপদের কিনার থেকে।

এইসব স্মৃতির স্রোত মাথায় ঝাঁপিয়ে পড়তেই কাব্যের বুকের ভেতর ভয় চেপে বসল। "মিস ইলির কিছু আবার... শিট শিট, আমি ম'রেই যাব! এমন কিছু যেন না হয়! ওর কিছু হইলে... ওর সাথে আমার প্রানটাও নিয়া নিও, আল্লাহ! না না, কি সব ভাবছি আমি! উফফ উফফ, মাথাটা ঠান্ডা হ!"

ঠোঁট চেপে ধরে দাঁত দিয়ে অধরে কামড় বসাল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ পড়ল সামনের দিক থেকে এগিয়ে আসা আবছা এক অবয়বে। এত দূর থেকে দেখে অন্য কেউ হলে হয়ত চিনতেই পারত না। কিন্তু কাব্য তো আর অন্য কেউ নয়। তার হৃদয়ের সমস্ত স্নায়ু চিৎকার করে বলে উঠল—ইলিজাআআআ!

ইলিজার পরনে আজ কালো গোল দীর্ঘ এক জামা, গলায় আলতোভাবে মেরুন ওড়না ঝুলে রয়েছে, আর হালকা বাতাসে চুলের বর্ণচ্ছটা দুলছে।

তাকে দেখা মাত্রই কাব্য দৌড়ে গিয়ে ইলিজার সামনে পৌঁছে গেল। ইচ্ছে হলো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, বুকের গহিন থেকে উঠে আসা অস্থিরতা মুছে ফেলে প্রশান্তির আশ্রয়ে ঢেকে দেয় মুখটাকে। কিন্তু পারল না, কারণ এই অনুভব প্রকাশের অনুমতি এখনো তার হয়নি।

শেষমেশ হাঁপাতে হাঁপাতে ইলিজার হাত ধরল। ঝাঁকি দিয়ে বলল, "এই..."

তারপর আরও কিছু মুহূর্ত নিশ্বাস নিতে নিতে স্বর গভীর করল, "এই আপনি এত দেরি করলেন কেন, হ্যাঁ? কত চিন্তা হচ্ছিল বুঝতে পারেন?"

ইলিজা নির্বিকার। সে তো সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রাণবন্তই আছে, তবে কাব্য এমন আতঙ্কিত কেন?

হালকা হেসে সে বলল, "আরে, আম্মু বৃষ্টি দেখে আসতে দেয় নাই। চলুন, গিয়ে বসি।"

ওরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। ইলিজা ঠিকই টের পেল, তার হাতটা একটানা কাব্যের তালাবদ্ধ আঙুলে জড়িয়ে আছে। কিন্তু সে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে হেঁটে চলল। না, এই অনাহুত স্পর্শে সে বিরক্ত নয়; বরং ভিতরে কোথাও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এমন অনুভব তার জীবনে নতুন, একেবারেই নতুন। তবুও সে চুপ থাকল।

অবশেষে রাস্তার একপাশে ছায়াবৃত বেঞ্চে এসে দুজন বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ইলিজা কৌশলে তার হাতটা কাব্যের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। কারণ সে চায় না কাব্য হঠাৎ অনুধাবন করুক, যে সে ভুল করে এমন কিছু করে ফেলেছে। তেমনটা হলে কাব্য হয়তো সঙ্গে সঙ্গে গুছিয়ে ফেলবে দুঃখিত দুঃখিত বাক্যগুচ্ছ, সেসব বলেই সে সময়টাকে শুধু শুধু নষ্ট করবে। আর ইলিজার হাতে এখন সময়ের তাড়া; সন্ধ্যার আগেই তাকে ঘরে ফিরতে হবে।

কাব্য তখনো চুপচাপ। তার চোখ স্থির। সে বুঝতে পারল না, কী উচ্চারণ করে কথোপকথন শুরু করা যায়! অথচ ইলিজা এক নজরেই আজ কাব্যকে পড়ে ফেলেছে।

প্রতিদিনের ছেলেমানুষি বা এলোমেলো চেহারার ভীড়ে আজকের কাব্য যেন অন্যরকম। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টে তার উপস্থিতি আজ পরিপক্ব, পরিণত। আজ প্রথমবার সে তাকে এমন পরিপাটি রূপে দেখল।

তবে একটি বিষয় তার চোখে আলাদা করে ধরা দিল। সেটা হলো কাব্যের চোখে একজোড়া চশমা। না, সেটি কোনো আড়ম্বরপূর্ণ ফ্যাশন নয়, বরং প্রয়োজনীয়তার খাতিরে পড়েছে। আজকের শ্যামবর্ণ, একটুখানি ক্লান্ত, একটুখানি অস্বস্তিতে মোড়া কাব্যকে দেখতে ভালোই লাগছে। মনটা বলে—এই হাতটা ওর হাতে রেখে বহুক্ষণ বসে থাকতে, ওর চোখের দিকে একটানা চেয়ে থাকতে।

কিন্তু এমন কিছু প্রকাশ করলে কাব্য হয়ত আরও লজ্জায় পড়ে যাবে। কারণ আজ সে অদ্ভুত রকম সংকোচে ডুবে আছে। চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না। কিন্তু তার কীসের এত সংকোচ, ইলিজা জানে না।

ইলিজার মন ভার হয়ে আসল। কখন থেকে বসে আছে তারা, কিন্তু কোনো কথা নেই। সে বুঝল, এই নীরবতা তাকেই ভাঙতে হবে। তাই অভ্যস্ত ভঙ্গিতে গলায় হালকা কাশির শব্দ করল।

এই সামান্য শব্দটিতেই কাব্যের ঘোর ভাঙল। সে চমকে তাকিয়ে বলে উঠল, "কিক-কি হয়েছে? পানি খাবেন?"

ততক্ষণে ইলিজার ঠোঁটে নরম হাসি খেলে গেল, যার উষ্ণতায় কাব্যের বুকের ভেতর শিহরণ জেগে উঠল। সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ইলিজার মুখপানে—এই মুখ তো বহুবার দেখেছে সে, অথচ প্রতিবারই প্রথমবার মনে হয়।

কাব্য গলাটাকে একটু পরিষ্কার করে নিতে নিতে চোখ নামিয়ে ফেলল। ইলিজা মুচকি হেসে বলল, "কি ব্যাপার বলুন তো? আজ হঠাৎ যেন নতুন মনে হচ্ছে আপনাকে।"

কাব্য এক ঝটকায় চোখ তুলে প্রশ্ন করল, "দেখতে কি ভালো লাগছে না?"

ইলিজা মাথা নেড়ে বলল, "খারাপ না, বরং একটু বেশিই ভালো লাগছে। এভাবে পরিপাটি থাকলেই তো পারেন। তা না, উল্লুকের মতো থাকবেন।"

কাব্য লাজুক হাসল। হঠাৎ ইলিজার চোখ সরু হয়ে এলো, কৌতূহলে ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করল, "পেছনে কি লুকিয়ে রেখেছেন, মিস্টার?"

সেই মুহূর্তে কাব্য ঘোর থেকে জাগল। তার হাতের পেছনে ছোট্ট একটা বুকে আঁকড়ে ধরেছিল, অথচ তার মনেই ছিল না। বুকেটা রঙিন কাগজে মোড়া, যেখানে কোনো দামি গোলাপ কিংবা অর্কিড ছিল না; ছিল রাস্তার ধারে জন্ম নেয়া কিছু সাধারণ ফুল, যাদের সৌন্দর্য চোখে পড়ে না অধিকাংশের। তবে সে জানত, ইলিজার চোখ সেই সাধারণতায় অসাধারণতা খুঁজে নিতে পারে।

কাব্য আস্তে করে বুকেটা ইলিজার দিকে এগিয়ে দিল। ইলিজার চোখ বিস্ফোরিত হল। শিশুর মতো হেসে তাড়াতাড়ি সেটা কাব্যের হাত থেকে টেনে নিল। ইলিজা তো প্রায় নাচতে শুরু করবে, এমন ভাব করল।

কাব্য মাথা নীচু করে বলল, "আপনাকে ওত টাকা দিয়ে দামি ফুল কিনে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। তাই নিজের মতো করে বানিয়ে..."

কিন্তু ইলিজা তাকে আর বলতে দিল না। বাধভাঙ্গা আনন্দের অনুভূতি নিয়ে বলল, "আল্লাহ! মনে হচ্ছে আজ আমি চাঁদ হাতে পেয়েছি। এত খুশি লাগছে! এত সুন্দর ফুলগুলো! জানেন, এগুলো আমার কত পছন্দের ফুল! ইশ, কত্তগুলা ফুল!"

এটা শুনে কাব্য তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তার মুখ আজ বিকেলের শেষ আলোর চেয়েও বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। কাব্যের হৃদয়ে শুধু একটাই আশা—এই মেয়ে যেন এভাবেই সারাজীবন হাসতে থাকে।

কাব্য জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আলতো হেসে বলল, "হাঁটবেন?"

"চলুন।"

এরপর দুজন ধীরে ধীরে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল। ইলিজা খুশিতে এতটাই আত্মহারা হয়ে ছিল যে মাঝেমধ্যে পায়ের তাল কেটে যাচ্ছিল। কাব্য মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাল, তার এই প্রাণবন্ত মুখ দেখে নিজের অজান্তেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তবে মুহূর্ত পরে লজ্জা বা দ্বিধায় আবার চোখ নামিয়ে নিল সে।

হঠাৎ করেই ইলিজা বলে উঠল, "আপনার সেই পাগ'লা সিঙ্গার বন্ধুর কি খবর?"

শব্দগুলো কাব্যের আনন্দের আবরণ ছিঁড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনোজগতে নামল হতাশার স্তব্ধতা। সে তো এসেছিল ইলিজার সঙ্গে কয়েকটি নিরালা মুহূর্ত কাটাতে, যেখানে শুধু দু’জনার কথোপকথন থাকবে। খুব বেশি সময় তো নেই, একটু পরেই তো ইলিজাকে চলে যেতে হবে। এই স্বল্প সময়েও শুভ্রর প্রসঙ্গ না উঠালেই হতো না?

কাব্যের থমথমে মুখে একরাশ অপ্রকাশিত ক্ষোভ দেখা গেল। তার দিকে তাকিয়ে ইলিজা নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "কি হলো?"

কাব্য কিছু না বলে চুপ রইল। ইলিজা চোখ রাখল তার চেহারায়, কপালে একটু ভাঁজ ফেলে বলল, "আরে, কি হয়েছে বলবেন তো?"

কাব্য মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল, "আমার খবর তো জিজ্ঞেস করলেন না, আমি কেমন আছি, সেটা তো জানতে চাইলেন না। কিন্তু ওর খবর নিতে ঠিকই ভুললেন না আপনি।"

ইলিজা এবার খিলখিল করে হেসে উঠল।

"ওমা! আপনি আবার রাগও করেন নাকি?"

"রাগ না, অভিমান। আর একবার যদি আমার রাগ দেখাই... আপনি হয়ত আমার সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারবেন না।"

"একটা প্রশ্ন করব?"

"কেন নয়?"

"আপনি হঠাৎ চশমা পড়া শুরু করলেন কবে থেকে?"

"বহুত কষ্টের ইতিহাস। সারারাত কোডিং করতে করতে চোখের বারোটা বেজেছে। ঝাপসা দেখি এখন সবকিছু।"

ইলিজা কিছু বলল না। কেবল চোখ নামিয়ে হেঁটে চলল। আপনমনে বলল, "তবে যাই বলেন, চশমাতেও আপনাকে ভালোই লাগছে।"

একটু চুপ থেকে কাব্য নিজেই বলল, "আপনার কি কোনো ছেলেকে ভালো লাগে, মিস ইলি?"

ইলিজা চোখ গোল করে বলল, "লাগে তো! কোরিয়ান ছেলেরা আমার সব পছন্দ।"

কাব্যের কণ্ঠ হঠাৎ গভীর হয়ে উঠল, "অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটে হৃদয় ক্ষয় করবেন না; ধরাছোঁয়ার বাইরের ফিকে কল্পনায় ডুবে থাকা শুধু ক্লান্তি ডেকে আনবে। হৃদয়ের মরীচিকায় নয়, কিংবা ক্ষণস্থায়ী বিভ্রমে নয়, বরং ভালোবাসা দিন তাকে—যে বাস্তব, যে নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে আপন হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।"

তার কথা শুনে ইলিজার মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে গেল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল; হয়ত বুঝতে পারল কাব্য কী বলতে চাইছে।

ঠিক তখনই পাশ দিয়ে এক আচারওয়ালা হেঁটে যাচ্ছিল। কাব্য হঠাৎ তাকে দেখে হাত তুলে চিৎকার করল, "ওই মামা! দাঁড়ান!"

ইলিজা ডাক শুনে চোখ তুলে তাকাল। ততক্ষণে কাব্য এগিয়ে গেছে। ইলিজা বলতে চেয়েছিল, ‘না থাক, লাগবে না। আমি খাবো না।’

কিন্তু বলতে গিয়েও থেমে গেল, হাতটা সামান্য উঠিয়েও আবার নামিয়ে ফেলল।

কাব্যকে আটকাতে চেয়েছিল, কারণ জানত তার পকেট প্রায়শই ফাঁকা থাকে, চেয়েছিল ছেলেটির কষ্টকে আর না বাড়াতে। কিন্তু মুহূর্তকালেই এক অলক্ষ্যে সে সেই চিন্তা ত্যাগ করল। আপনমনে বলল, "থাক, প্রয়োজন নেই আটকানোর।"

তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। কারণ সব মুহূর্ত তো টাকায় মাপা যায় না। কিছু মুহূর্ত উপভোগ করা জরুরি, না-হলে জীবনের স্বাদটাই মাটি হয়ে যায়।

অল্প কিছুক্ষণ পর কাব্য হাতে আচার, চানাচুর, জলপাই আর তেঁতুলের ছোট প্যাকেট নিয়ে ফিরে আসল। হাসিমুখে ইলিজার হাতে সেগুলো ধরিয়ে দিল।

ইলিজা খেতে খেতে হাঁটতে থাকল। কাব্য এবার নরম গলায় বলল, "বাংলাদেশি কোনো ছেলেকে ভালো লাগে আপনার?"

ইলিজা আচার চিবোতে চিবোতে মৃদু হেসে বলল, "লাগে। তার চোখে একধরনের মায়া আছে, যেটা আমাকে খুব টানে।"

এ কথা শুনে কাব্য এক লাফে ইলিজার সামনে এসে দাঁড়াল। উৎকণ্ঠায় তার গলাটা কেঁপে উঠল, "কা-কাকে?"

ইলিজা কাব্যের উসখুসে মুখ দেখে চুপিচুপি হাসল। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে বলল, "সে বুয়েটের স্টুডেন্ট। আপনারই ব্যাচমেট।"

শুনেই কাব্যের মুখ ভার হয়ে আসল। এক মুহূর্তেই তার পৃথিবীর সব রং ফিকে হয়ে গেল। মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল, "শুভ্র?"

কাব্যের ভারী মুখ দেখে ইলিজা এবার আর হাসিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না। "সে তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।"

এক নিমিষেই কাব্যের ভিতর আনন্দের ঝড় বয়ে গেল। বহু কাঙ্ক্ষিত সেই মিস ইলির মনে আজ একটু জায়গা করে নিয়েছে সে। তবুও মুখে এসব উত্তেজনা ফুটাল না। শুধু ঠোঁটে হাসি চেপে ধরে রেখেছিল।

সে পাশে এসে হাঁটতে থাকল আবার। ইলিজা চানাচুরের প্যাকেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। কাব্য এক মুঠো তুলে মুখে পুরে খেতে খেতে হাসল।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটল।

এরপর কাব্য হঠাৎ বলল, "আপনাদের বাসার আশেপাশে কোনো ব্যাচেলর টু-লেট লাগাইছে নাকি?"

"জানা নেই। কেন বলুন তো?"

"মনে হচ্ছে রুমটা ছাড়তে হইবে। হা*রামজাদা বাড়িয়ালার চামচাটায় কখন কি কইরা বয়, ওরে আমার বিশ্বাস নাই।" গালাগাল করেছে বলে একটু থেমে বলল, "সরি, কিছু মনে করবেন না আবার।"

ইলিজা কিছু একটা বলতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ গলায় কাশি উঠে গেল। কাব্য আঁতকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পাশের দোকানের দিকে চলে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতে একটি পানির বোতল নিয়ে ফিরে আসল। দ্রুত ঢাকনা খুলে ইলিজার সামনে ধরল। ইলিজা এক নিশ্বাসে পানি খেয়ে নিল। গলায় একটু আরাম লাগতেই বোতলটা ফেরত দিতে যাবে, এমন সময় তার চোখ পড়ল বোতলের গায়ে লেখা কিছু শব্দে। ‘মিস ইলি, সারাংহে।’ কোরিয়ান ভাষায় যার মানে, 'মিস ইলি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।' যেহেতু ইলিজার কোরিয়ান পছন্দ, সেজন্যই কাব্য তেমন ভাবেই প্রস্তাব দিয়েছে।

ইলিজা স্তব্ধ হয়ে গেল। পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকল বোতলের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে কাব্যের মুখের দিকে তাকাল। একটা অজানা আবেগ বুকের ভেতর দিয়ে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। হৃৎস্পন্দন এলোমেলো হয়ে উঠল। এমন সরাসরি অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব পেতে পারে, ইলিজার কল্পনাতেও ছিল না।

কাব্য তার দিকে চেয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, "আপনার উত্তর দেওয়ার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, মিস ইলি। সময় নিন আপনি। একদিন, একমাস এমনকি গোটা জীবন যদি লাগে, তবুও আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। কারণ আমি আপনাকে ছাড়া কোনো জগৎ কল্পনা করতে পারি না। আমার সমস্ত সত্তা, হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন কেবল আপনাকেই চায়। আপনাকে ছাড়া আমার কোনো সকাল নেই, নেই কোনো স্বপ্নের রং। আপনি আমার অস্তিত্বের এমন গভীরে গেঁথে আছেন, যেখান থেকে সরানো অসম্ভব। এই ভালোবাসা শব্দে ধরা পড়ে না, এটা কেবল অনুভবের বিষয়। যেমন আপনি শুধু অনুভব করার মতো।"

ইলিজার ঠোঁটের কোণ কাঁপল, নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। কাঁপা হাতে বোতলটা শুধু তুলে ধরে রাখল। সে কিছুটা সময় নিয়ে ভাবলো। মনে হচ্ছিল, এক ঝলক সাহস বুকের ভেতর থেকে উঠে আসছে। সে গভীর নিশ্বাস নিয়ে ঠোঁট খুলে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ বৃষ্টির ধারা নেমে এলো। কাব্য তৎক্ষণাৎ ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে ইলিজার মাথার ওপর ধরে দাঁড়ালো।

বৃষ্টির প্রথম শীতল ফোঁটাটা ইলিজার গায়ে পড়ায় তার শরীরটা কেঁপে উঠল। সে জামার হাতা গুটিয়ে নিয়ে নিজের কাঁধ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকল।

কাব্য চুপচাপ তার পাশে এসে দাঁড়াল। ছাতাটা এমনভাবে এগিয়ে ধরল, যেন আর একটাও ফোঁটা ইলিজার গায়ে না পড়ে। ছাতার উপর টপটপ করে ঝরে পড়া বৃষ্টিধ্বনি দুই হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করল।

বৃষ্টিভেজা নরম রাস্তায় দুজন হাঁটতে থাকল। বৃষ্টির হালকা ছিটে গায়ে লাগছে বলে ইলিজা নিজেকে একটু গুটিয়ে নিল কাব্যের দিকে। আর ঠিক তখনই, দুই হাত ও কাঁধ অনিচ্ছায় একে অপরকে ছুঁয়ে গেল।

তাদের কাছে সে স্পর্শ যেন বিদ্যুতের মতো মনে হলো। শরীর থেকে মনের গহীনে একটা শিহরন ছড়িয়ে গেল। ইলিজার হাতটা ঠান্ডা, আর কাব্যের হাতটা উষ্ণ;

এই দুই বিপরীত তাপের সংস্পর্শে মুহূর্তের জন্য দমবন্ধ হয়ে আসল। হৃৎপিণ্ড ভুলে গেল তার স্বাভাবিক ছন্দ।

ইলিজা চমকে চোখ পিটপিট করল। তার গালজুড়ে লজ্জার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে।

কাব্য বিব্রতভাবে নিজ হাত সরিয়ে নিল। পরিস্থিতির ভারসাম্য ফেরাতে গলা খাকরিয়ে বলে উঠল, "উঁহুঁ... ঠিক আছেন তো আপনি?"

ইলিজা কাঁপা কণ্ঠে জবাব দিল, "হ্যাঁ... মানে, ঠিক আছি।"

কাব্যের ঠোঁটে তখন একফালি হাসি খেলে গেল। তারপর আচমকা ছাতাটা ইলিজার হাতে তুলে দিয়ে নিজে এক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ইলিজা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, "এই কাব্য, কী করছেন কি আপনি? ভিজে যাবেন তো!"

কাব্যের ভিজে চুল গাল বেয়ে নামছিল। চোখের পাতা থেকে বিন্দু বিন্দু বারিধারা পড়ছিল। কাব্যের শুভ্র পোষাকের কিছু অংশ ভিজে গেছে, যার ফলে তার দেহের অন্তর্নিহিত গঠনের আবছা রেখাচিত্র স্পষ্ট হচ্ছিল। গঠন ততটা সুঠাম নয়, একজন সাধারণ যুবকের মতোই, তবে শীর্ণ কিংবা স্থূলও নয়। শ্যামবর্ণ চেহারাটা বৃষ্টিতে ভিজে আরো সুদর্শন, আরো আকর্ষণীয় লাগছিল। ইলিজা সবকিছু দেখেও অস্বস্তি বোধ হওয়ায় চোখ ফিরিয়ে নিল। এদিকে কাব্য পকেট থেকে ভাঙা স্ক্রিনের ফোনটা বের করে ক্যামেরা চালু করল। "এই মুহূর্তটাকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে চাই, বুঝলেন ম্যাডাম?"

ইলিজা সামান্য কপাল কুঁচকে বলল, "বাহ রে! ছবি তোলার জন্য কেউ নিজেকে এভাবে ভিজায় নাকি? আপনি এদিকে আসুন তো।"

কাব্য তার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে বলল, "আপনি যে এত সুন্দর করে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন নিখুঁত একটা মুহূর্ত যদি ক্যামেরায় বন্দি না করি, তাহলে আত্মাকে কেমন যেন পাপী মনে হবে, মিস ইলি।"

ইলিজা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। কি মারাত্মক তার চাহনি!

ওদিকে কাব্য ক্যামেরাটা নিজের শুভ্র শার্টের কিনারা দিয়ে মুছে নিল। এরপর ইলিজার ছাতা ধরা ক’টা ছবি তুলে নিল। ইলিজা হালকা হাসল। তবে তার স্বভাবের সঙ্গে এমন হাসি বেমানান। উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে কোমর দুলিয়ে, হাত-পা ছুঁড়ে পোজ দেওয়ার সময় সে পার করে এসেছে। অর্থাৎ সেই দুষ্টু ইলিজাটাও আজ অনেকটা বড় হয়ে গেছে।

কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে, অবশেষে নরম কণ্ঠে ইলিজা বলল, "আপনার ছবি তোলা শেষ হলে এবার ছাতার নিচে আসুন। এত বৃষ্টিতে ভিজলে পরে ঠান্ডা লেগে যাবে তো।"

কাব্য ম্লান হাসি মুখে ইলিজার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। চোখ নামিয়ে একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল, "দেখুন তো, কোন ছবিটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে? যদিও ফোনটা পুরোনো, ছবি খুব একটা ঝকঝকে আসে না। কিন্তু আমার পরম সৌভাগ্য এই যে, দিনের আলোতেও চাঁদমুখ বন্দি করেছি আমি।"

ইলিজা লাজুক হেসে ছবিগুলো দেখতে দেখতে বলল, "সবগুলোই অসম্ভব সুন্দর।"

"না না। একটা সিলেক্ট করুন। ওয়ালপেপারে দিবো।"

ইলিজা চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল, "ওমা! কেন? কেউ দেখলে কি বলবে?"

কাব্য এক পা এগিয়ে এলো। গলায় আবেশ আর চোখে স্থিরতা নিয়ে শুধালো, "কে কী বলবে, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি শুধু এটুকু জেনে রাখুন, আপনি শেখ আরভিন কাব্যের ভবিষ্যৎ সঙ্গিনী। একদিন যদি আপন মন খুলে সম্মতি দেন, হয়ত সোনার সিংহাসন দিতে পারবো না, কিন্তু আমার হৃদয়ের অমর সিংহাসনে আপনি হবেন চিরদিনের রাজরানি।"

এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ইলিজার মনে হলো—এখানেই আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে মাটিতে ঢলে পড়া উচিত, নতুবা এক দৌড়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া উচিত। সপ্তদশীর অন্তঃপ্রকোষ্ঠে একে একে অনুরাগের রঙিন পল্লবিত প্রস্ফুটন ঘটতে থাকল। কাব্যের চোখে যে অনড় প্রত্যয় ছিল, তা দেখে ইলিজা লজ্জা আর অভিব্যক্তির উত্তেজনায় দৃষ্টি নামিয়ে নিল। জীবনে বহুবার প্রস্তাব পেয়েছে সে, কিন্তু এমন কাব্যময় আবেদন সে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।

তবে সেই অপূর্ব মুহূর্তেও ভাগ্য একটা খেলা খেলতে ভুলল না। সম্মুখ থেকে দ্রুতগতির একটি গাড়ি ছুটে এলো। কাদা ছিটকে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে কাব্য ইলিজাকে এক টানে নিজের বুকের সামনে নিয়ে এলো। ইলিজার শরীর এসে ঠেকল তার বুকে।

কাদাজল ছিটকে ইলিজার কালো কুর্তায় লেগে গেল। ইলিজার এ অবস্থা অবলোকন করে কাব্যের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। তবে হাসিটা চেপে রেখেছে সে।

ইলিজা স্তব্ধ হয়ে গেল। কটমট করে বলল, "আপনি এটা কেন করলেন? কেউ কি এমনভাবে অপরকে কাদায় মাখামাখি করিয়ে নিজেকে বাঁচায়?"

কাব্য মাথা নাড়িয়ে বলল, "আমি আসলে ছাতাটাই টানতে চেয়েছিলাম। ভুল করে আপনি সামনে এসে পড়েছেন। সত্যি বলছি, ইচ্ছাকৃত ছিল না। ভেবেছিলাম ছাতা খুলে আপনার সামনে ধরব, কিন্তু ভুল করে আপনাকে টেনে ফেলেছি।"

তবু ইলিজা ভ্রূকুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল। কাব্য আবার বলল, "আ'ম এক্সট্রিমলি সরি। বিশ্বাস করুন, ইচ্ছা করে করিনি।"

এবার ইলিজা হঠাৎ করেই হেসে ফেলল। কাব্য বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। ইলিজা বলল, "হয়েছে, এত সরি বলতে হবে না। এমনিতেই আমাদের সম্পর্কটা অঘটনের মধ্যে দিয়েই শুরু। তাই দু-একটা অঘটন না হলে কি আর জমে?"

তারপর সে আবার হেসে উঠল। অথচ কাব্য অপলক তাকিয়ে রইল। কতটা নিখুঁত সেই হাসি, কতটা মায়াবী সেই চোখ, দেখে মনে হয়, একে জীবনভর একটানা দেখলেও তৃষ্ণা যাবে না।

কাব্য কিঞ্চিৎ হেসে বলল, "এদিকে আসুন।"

ইলিজা মাথা নাড়িয়ে তার পিছু নিল। একটু হাঁটার পর তারা এক লেকের ধারে এসে দাঁড়াল। কাব্য বলল, "আপনি উপরে দাঁড়ান। আমি একটু পানি নিয়ে আসি।"

"আচ্ছা।"

কাব্য নীচে নেমে সেই ফাঁকা বোতলে পানি ভরে আনল। তারপর মাটিতে বসে আলতো করে ইলিজার পায়ের উপর জল ঢেলে হাত দিয়ে কাদা পরিষ্কার করতে লাগল। প্রথমবার কোনো পুরুষ তার পায়ে হাত রাখছে, এই অনুভবে ইলিজা দু কদম পিছিয়ে গেল।

সে জানে, এই স্পর্শে কোনো লালসা নেই, কেবলই কোমল ভালোবাসা আছে। তবুও শরীরটা কেঁপে উঠল। ওদিকে কাব্য একটু থমকে গেল। মনে মনে বলল, "কিছু ভুল করে ফেললাম না তো?"

সংকোচে চোখ নামিয়ে বলল, "স-সরি। আপনি যা ভাবছেন, আমি সেরকম কিছু ভাবিনি। শুধু পা ধোবার জন্যই হাত দিয়েছি। আল্লাহর কসম, আমার মনে কোনো খারাপ ইচ্ছা ছিল না। আপনি যদি নিজেই ঝুঁকতেন, ভিজে যেতে পারতেন বা পা পিছলে পরে যেতেন, এই ভেবেই...স-সরি, মিস ইলি।"

কিন্তু ইলিজা চুপ করে মাথা নামিয়ে রাখল। তার নিশ্বাসের গতি বেড়েই চলেছে।

কাব্য আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলল, "আপনি প্লিজ চুপ থাকবেন না। আপনি চুপ করে থাকলে আমার নিজেকে অনেক অপরা..."

এর মধ্যেই ইলিজা হেসে বলল, "এখনো তো ধোয়া শেষ করেননি। তাড়াতাড়ি শেষ করুন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমাকে ফিরতে হবে তো।"

কাব্য এবার একটা প্রশস্ত, প্রশান্ত হাসি দিল। তারপর আবার মন দিয়ে খুবই যত্নে পায়ের কাদা ধুতে শুরু করল। সে পা যেন পা নয়, কোনো চকচকে সোনা। ইলিজা মুচকি হেসে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

পা ধুতে ধুতে কাব্য একবার চোখ তুলে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঢোক গিলে বলল, "এই সময়টা যদি আরেকটু দীর্ঘ হতো!"

ইলিজা কিছু বলল না। কিন্তু তার অন্তরের ভেতরেও একই প্রার্থনা চলছে, "সত্যিই, এই সময়টা যদি একটু দীর্ঘ হতো!"

কিছুক্ষণ পর পা ধোয়া শেষ হলে কাব্য ইলিজার হাত ধরে লেকের সিঁড়ি বেয়ে তাকে উপরে নিয়ে এলো।

ইলিজা বলল, "তাহলে এবার আসি। মা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।"

"হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনার গাড়ি কোথায়?"

"ওই যে, পার্কের ওই পাশে।"

"আচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ। সাবধানে যাবেন।"

"জি।"

ইলিজা হেসে সামনে পা বাড়াল। একটু ঘুরে একবার পেছনে তাকাল। দেখল, কাব্য এখনও তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি সহ্য করা কঠিন। তাই সে আবার ঘুরে হাঁটতে লাগল। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই পেছন থেকে ডাক এলো, "ও ইলিজা..."

সেই পরিচিত গম্ভীর, মিষ্টি, স্পর্শসঞ্জাত কণ্ঠস্বর—যেটা শুনলে ইলিজার ইচ্ছে করে, ছুটে গিয়ে কাব্যের বুকে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সম্পর্কের বৈধতা নেই, বাস্তবতা আছে, লজ্জাও আছে। তাই চেয়েও এসব পারল না।

তবু ইলিজা সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

কাব্য হেসে বলল, "আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকব।"

ইলিজা ঠোঁট চেপে হেসে আবার হাঁটতে লাগল।

গাড়িতে উঠে সে পিছনের কাচের ফাঁক দিয়ে আবারও একবার কাব্যের দিকে তাকাল। কাব্য এখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

গাড়ি এগিয়ে চলল, কিন্তু ইলিজার বুকের ভেতর সেই অনুভূতির ঢেউ থামল না। সে অনুভূতির নাম নেই, গন্তব্যও জানা নয়, তবু এক অলৌকিক উচ্ছ্বাসে মন ভেসে যায়।

_______

এই কয়েকদিনে মিরার পায়ের অবস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই উন্নত হয়েছে। ব্যান্ডেজ খুলে ফেলা হয়েছে, সে এখন ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করতে পারছে। তবুও যন্ত্রণার সম্পূর্ণ অবসান ঘটেনি।

টেক্সাসের বিকেলের সূর্যরশ্মির স্নিগ্ধতা ঘরের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছে। পর্দার ফাঁক গলে আসা আলো মিরার গায়ে পড়ে অপার্থিব কোমলতা সৃষ্টি করেছে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো পেছনে কাঁকড়া ক্লিপে বাঁধা, কিন্তু কপালের কিনারে ছোট কেশরাশি বাতাসে ক্ষীণভাবে দুলে উঠছিল।

জানালার বাইরে চোখ মেললে যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু সবুজের বিস্তার আর ফাঁকা মাঠের সমারোহ। আশপাশে কোনো জনবসতির চিহ্নমাত্র নেই।

কারান সবসময় কেন এমন জনমানবশূন্য একাকী জায়গায় তার বাসস্থান নির্মাণ করে; মিরা জানে না, জানতেও চায় না। হয়ত এর পেছনে কোনো অতীত-নির্ভর ব্যাখ্যা আছে, কিংবা নিছক নিস্তব্ধতার প্রতি তার আকর্ষণ রয়েছে।

বাতাসের হালকা শীতলতায় মিরা একটু কেঁপে উঠল, ঠিক তখনই পায়ের ধ্বনি কানে আসতেই কারানের উপস্থিতি অনুভব করল। আজ সে কালচে নীল ট্রাউজার আর সাদা টি-শার্ট পরেছিল। সে পেছন থেকে মিরার কাঁধে মাথা রাখল। সেই পরিচিত নিশ্বাস যখন গলার কাছ দিয়ে স্পর্শ করল, মিরার ঠোঁটে অজান্তেই এক চিলতে হাসি খেলে গেল। তবুও সে পিছনে ফিরে তাকাল না।

কারান ক্লান্তিকর কণ্ঠে বলল, "তুমি এখানে দাঁড়িয়ে, আর আমি ভাবছিলাম কোথায় গেলে!"

মিরা কিছু বলল না। কেবল জানালার বাইরের বিস্তীর্ণ নীরবতায় দৃষ্টি মেলে রাখল। তবে কারানের উপস্তিতিতে মনজগতে প্রশান্তি নেমে এসেছে।

কারান কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকে মিরার এক পাশের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকল। কয়েক মুহূর্ত পর সে তার চুলের কাঁকড়া ব্যান্ডটা খুলে নিয়ে, নিজের শার্টের বুকচৌকাঠে গেঁথে দিল। মিরার খোলা চুলের এলোমেলো প্রবাহ ঘাড় বেয়ে নিখুঁত বিশৃঙ্খলায় নেমে আসল।

মিরা ভ্রূ কুঁচকে পিছন ফিরে শীতল স্বরে বলল, "কি করছো?"

"কিছু করিনি এখনো, তবে করবো।"

"কি?"

কারান এবার তার হাত নিজের হাতের বাঁধনে নিয়ে এক পা এগিয়ে আসল। "চলো, বিছানায় বসো।"

দুজনেই বিছানায় বসল। কারান মিরার পেছনে গিয়ে ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। আফসোস নিয়ে বলল, "দেখেছ, আমার প্রিয়তমার প্রিয় চুলগুলোর কী দশা করেছো তুমি!"

মিরা হালকা হাসল। "কি করেছি?"

"এই ক'দিনে একবারও চুলের যত্ন নাওনি, সুইটহার্ট। জট পড়ে গেছে একেবারে। বসো, আমি তেল দিয়ে দিই।"

মিরা মাথা একটু নোয়াল। কারান পাশে রাখা ওলিভ-গ্রিন টেবিল থেকে কাচের তেলের বোতলটা তুলে, সেটা থেকে তেল নিয়ে মিরার চুলে আঙুল বোলাতে শুরু করল। চুলের প্রতিটি গোড়ায় আদরময় পরশে তেল দিয়ে দিল।

এরপর কারান ধীরে ধীরে চুলগুলো আঁচড়াতে থাকল। প্রতিটি আঁচড় যেন মিরাকে আচ্ছন্ন করে রাখল, এমনকি সে নিজেও টের পেল না, কখন ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্ট হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।

মিরা আস্তে করে বলল, "কারান..."

"বলো, বেগম।"

কণ্ঠে আবেশ মিশিয়ে মিরা বলল, "What food do you enjoy the most, honey?"

"আইদাহ আহসান মিরা।"

এই উত্তর শুনে মিরা ঘাড় ঘুরিয়ে চুমু দিতে গেল, কিন্তু কারান ঠোঁটের কোণে মৃদু টান দিয়ে বলল, "ঘুরো না। আমি এখনো শেষ করিনি।"

মিরা কারানের নির্দেশ অনুযায়ী ঘুরল না। তবু মিরার ভেতর অস্থির চঞ্চলতা দোলা দিতে থাকল।

কারান এবার জিজ্ঞেস করল, "What’s your favourite fruit, sweetheart?"

পরক্ষণেই মিরা ফিরে বসল। তার দুর্বোধ্য চোখদুটি নিয়ে কারানের দিকে একটু ঝুঁকে এলো। কারানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "Your Adam’s apple."

কিছুক্ষণ চুপচাপ দুজনই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। এদিকে মিরা অকস্মাৎ কারানের গলার কাছে ঝুঁকে তার অ্যাডাম’স অ্যাপলে এক গভীর, মাদক চুম্বন এঁকে দিল। কারান ঢোক গিলল, ফলে তার অ্যাডাম’স অ্যাপল কাঁপতে কাঁপতে একবার উপরে উঠে আবার নেমে গেল। তার শরীরের ভেতর বৈদ্যুতিক আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।

মিরার ঠোঁটে তখন গোপন হাসি খেলা করল। সে আঙুল তুলে সেই অ্যাডাম’স অ্যাপলে আলতো ছোঁয়া বুলিয়ে দিল। মিরার নিশ্বাস কারানের গলায় এসে ধাক্কা দিল।

কারান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ঠোঁট মিরার ঠোঁটের এক ইঞ্চি দূরত্বে এনে ফিসফিসিয়ে বলল, "Please... don’t seduce me, sweetheart. I know your body hasn’t entirely healed yet."

তাদের নিশ্বাস একে অপরের ত্বকে ছুঁয়ে গেল। মিরা এবার তার গালের গায়ে গাল মিশিয়ে উচ্চারণ করল, "I’m fine. And entirely yours."

এটা শুনে হঠাৎ করেই কারান তার গালের কোমল চামড়ায় এক হালকা, শিহরন জাগানো কামড় বসিয়ে দিল। অস্ফুট আর্তিতে মিরা কেঁপে উঠল। তার শিরায় শিরায় আগুন ছড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠে অভিমানসঞ্চারী ঝাঁজ নিয়ে তার বুকে ধাক্কা মেরে বলল, "এই ব্যাটা! সবসময় এমন করে কামড়াও কেন?"

কারান অলস ভঙ্গিতে হাই তুলল। বাঁকা হেসে বলল, "ভালো লাগে।"

"একদিন দাঁতগুলো গুঁড়িয়ে ফেলবো, তখন বুঝবে!"

কারান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, "দাও না। তোমারই জিনিস।"

এবার মিরা মুগ্ধদৃষ্টিতে কারানের চোখে চোখ রেখে, কারানের চুলের মধ্যে আলতোভাবে আঙুল চালাতে থাকল। কারানও বিমোহিত হয়ে তার প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎই মিরা তার দুটি হাতে কারানের গালদ্বয় আবদ্ধ করে কোমল সুরে বলে উঠল, "আমার সুন্দর স্বামী।"

কারান সামান্য হাসল। মিরা এবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "তোমার চোখদুটো আমার ভীষণ প্রিয়, জানো। অনেক বেশি পছন্দের। নীল চোখ, উফফ হ্যাভেন! যেন আকাশের অন্তরীক্ষ থেকে খসে পড়া দুটি নক্ষত্র।"

"ওকেএএ..."

"কিন্তু আমার চোখদুটো আমার নিজের চেয়েও বেশি প্রিয়।"

"হাহ?"

"কারণ এই চোখ দুটো না থাকলে তো তোমাকে দেখতে পেতাম না।"

কারান অতিরিক্ত প্রশংসার ভার সইতে না পেরে ঠোঁট কামড়ে ধরে মিরার কপালে মৃদু একটা টোকা দিল।

মিরা কপাল ডলতে ডলতে বলল, "আহ! কিইই?"

কারান পরম মমতায় মিরার মাথা নিজের দুই হাতে আবদ্ধ করে নিল। ললাটের যেখানে টোকা দিয়েছিল, সেখানে আলতো চুম্বন দিয়ে, ফিসফিস করে বলল, "তুমি এখন আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে ফ্লার্ট করাও শিখে গেছো।"

মিরার ঠোঁটে চাতুর্য খচিত প্রলোভনময় হাসি খেয়ে গেল।

কারান মোলায়েম স্বরে পুনরায় বলল, "ঘুরে বসো এখন।"

মিরা হেসে পিছন ফিরে বসে পড়ল। কারান চুলে আলতো আঙুল চালাতে চালাতে খুব যত্নে বেণি গাঁথতে শুরু করল।

এমন সময় মিরা বলে উঠল, "কারান, আমি পড়তে চাই।"

"ওকে।"

"আমি আমার গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করতে চাই।"

"গুড ডিসিশন। এটা তো আসলে আমারই বলা উচিত ছিল, তুমি আগেভাগেই বলে দিলে।"

"হ্যাঁ, কিন্তু আরও একটা কথা আছে।"

"বলো।"

"আমি জব করতে চাই।"

কারানের আঙুলের তাল শ্লথ হয়ে আসল। ঠান্ডা গলায় বলল, "আচ্ছা, তোমাকে কোম্পানির এমডি বানিয়ে দিচ্ছি।"

"আমি তোমার অধীনে কাজ করতে চাই না, কারান।"

"আমার অধীনে কেন করবে? তুমি তো সিইও থাকবে।"

"না, ধুর! আমি চাই, নিজের যোগ্যতায় কাজটা পেতে।"

কারান পাশ থেকে মাথা বাড়িয়ে গভীরভাবে তার দিকে তাকাল। চোখে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে রাগের দহন। "তাহলে পরপুরুষের আন্ডারে কাজ করতে আপত্তি নেই, কিন্তু স্বামী জব দিলে সমস্যা, তাই তো?"

মিরা ঘুরে বসল। কারানের হিংসা অনুভব করে হেসে বলল, "সবসময় তোমার যত নেগেটিভ চিন্তা।"

কারান ভ্রূ কুঁচকে বলল, "কি জব করতে চান আপনি?

"টিচার হতে চাই। শিশুদের পড়াতে চাই।"

কারান ঠোঁটে চতুর হাসি টেনে বলল, "আমাকে পড়াও, আমিও তো বাচ্চা।"

"হুম, বুড়া বাচ্চা!"

"টিচার হতে পারো, তবে একটা শর্তে, ছেলে বাচ্চাদের পড়ানো যাবে না।"

মিরা বিস্ময় ও তাচ্ছিল্য মেশানো হাসি নিয়ে বলল, "এখানেও জেলাসি?"

"একটুও জেলাস নই আমি।

"কিন্তু আমি তো ছেলে বাচ্চাদেরই পড়াবো।"

কথা শেষ হতে না হতেই কারান কঠোর হাতে মিরার ঘাড় চেপে ধরল। এক ঝটকায় দমবন্ধ হওয়া যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল মিরার মেরুদণ্ড বেয়ে। আতঙ্কে তার দৃষ্টি প্রশস্ত হল, ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিসিয়ে বলল, "কা-কারান... ব্যথা পাচ্ছি!"

কারান দাঁতে দাঁত চেপে, কটমট করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "একদম খেয়ে ফেলবো তোমাকে। তারপর তোমার কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলে, সেটা দিয়ে টেনিস বল বানাবো। এত সাহস কোথা থেকে আসল?"

এবার মিরা চট করে কনুই দিয়ে কারানের পেটে একটা খোঁচা মারল। কারান কুঁকড়ে উঠে মিরার ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে নিল। মিরা ততক্ষণে বিজয়ের বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল, "এই কারানের বাচ্চা, তুমি নাকি জেলাস না?"

কারান নাটুকে ভঙ্গিতে চুলে হাত বুলিয়ে বলল, "ওই বাচ্চার কথা ভুলে যাও। দিদাকে বলেছি, পাঁচ বছরের আগে কোনো বাচ্চা ডাউনলোড করছি না। সবে তো মাত্র ১ বছর ৬ মাস ৫ দিন ১৮ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ২৫ সেকেন্ড হয়েছে।"

মিরা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে কারানের দিকে চেয়ে রইল। মুখটা নিজের অজান্তেই খুলে গিয়েছিল।

কারান মৃদু হেসে মিরাকে নিজের বাহুডোরে টেনে বলল, "তোমার স্বামীটা এখন ভদ্র হয়ে গেছে, মিসেস চৌধুরি। আগে কত কি বলতাম, বলো?"

"তুমি... তুমি এতসব হিসেব রাখো?"

"রাখতে হয়, জান। তুমি যে আমার সময়ের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত।"

______

নিশুতি রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জানালার ফাঁক গলে চাঁদের রুপালি আলো এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘরের দুজন মানুষকে। তারা একে অপরকে এক কম্বলের নিচে আগলে ধরে বাহিরের নিস্তব্ধতার দিকে তাকিয়ে আছে। হালকা বাতাসে তাদের চুলগুলো অকারণে দুলে উঠছে। কারানের বাহুতে আশ্রয় নিয়ে মিরা একটুখানি হাসল, তারপর মাথা নামিয়ে দিল বুকের ওপর। কারানও পিছন থেকে মিরাকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

মিরার খোলা চুলগুলো কখনো কখনো কারানের মুখ ছুঁয়ে গলায় এসে পড়ছিল। সেই চুলে মুখ ডুবিয়ে কারান চোখ বন্ধ করে তৃষ্ণার্ত পাখির মতো ঘ্রাণ নিল। মিরা টের পেল, তার ঘাড়ে কারানের নিশ্বাসের তীব্রতা বাড়ছে। কাঁপুনি লাগল তার শরীরে।

আলতো করে সে সরে বলল, "এই চুলে কি পেয়েছ বলো তো? কি সবসময় মুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ নাও?"

কারান ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে, চোখ বন্ধ রেখেই বলল, "তুমি বুঝবে না, বেগম।"

তার এমন মুগ্ধতা দেখে মিরা এবার একটুখানি দুষ্টুমি করার সিদ্ধান্ত নিল। হঠাৎ করেই বলে বসল, "ভাবছি, চুলটা কেটে ফেলবো এবার। অনেক লম্বা হয়ে গেছে।"

এই কথাটুকু শুনেই কারানের চোয়ালে টান পড়ে গেল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো। ঠোঁট চেপে ধরে খুব নীচু স্বরে বলল, "যে তোমার চুলে হাত দেবে, তার সেই হাতই আমি কে*টে ফেলব।"

মিরা এবার মুখ টিপে হাসল। তারপর নিজেকে সংবরণ করে ঠাট্টার সুরেই বলল, "যদি আমি নিজেই কেটে ফেলি?"

কারান কোনো শব্দ না করে, বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। অভিমানী স্বরে বলল, "আমাকে কষ্ট দিতে তোমার খুব ভালো লাগে, মিরা?"

🍁চলবে?🍁

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_৩_শেষাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

___________________________________________☞

কারানের এমন কথায় এবার মিরা বিছানা থেকে নেমে এলো। এগিয়ে এসে কারানের হাতের নীচ থেকে নিজের হাত বাড়িয়ে ওর বুকটা জড়িয়ে ধরল। তারপর ওর পিঠে মাথা ঠেকিয়ে বলল, "তোমাকে কষ্ট দিতে নয়, রাগাতে ভালো লাগে, জাঁহাপনা।"

কারানের ঠোঁটদুটো কঠিন হয়ে ছিল। "আমাকে রাগিও না, জান। জানো না আমি কে! আমি এমন সব কাজ করেছি, যার গল্প শুনলে তোমার র*ক্ত হিম হয়ে যাবে।" কারান নিজের হাত সামান্য তুলে, সেদিকে তাকিয়ে আপনমনে বলল, "এই হাত থেকে র*ক্ত মুছতে কত রাত কেটেছে, তুমি যদি সেসব জানো, আমার ছায়াকেও ঘৃণা করবে।"

এদিকে মিরা কারানের কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। বরং আরও দৃপ্তভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে অবিচল কণ্ঠে উচ্চারণ করল, "তুমি যদি আগুন হও, তবে আমি সেই আগুনের শিখা। তুমি আমাকে পোড়াতে পারবে না। বরং আমি চাইলে তোমাকে ছাই করে দিতে পারি।"

কারান এবার ধীরে ধীরে পিছন ফিরল। কিছুক্ষণ মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই হঠাৎ মৃদু কণ্ঠে বলল, "তুমি ভয়ংকর। কেন জানি না, কখনো কখনো তোমাকে ভীষণ অপরিচিত লাগে। আমার ভালোবাসাটাকে হারিয়ে দিও না, মিরা। আমি ভেঙে যাব, বড্ড কষ্ট পাবো। হয়ত ম'রে যাব, সত্যিই ম'রে যাব, বেগম।"

মিরা চুপচাপ জড়িয়ে ধরল কারানকে, কিন্তু তার ভিতরে ভিতরে কীসের যেন ভয় হচ্ছিল। নিশ্চয়ই কোনো অনিবার্য ঘটনা দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত। হয়ত কারানের গূঢ় সত্য উন্মোচিত হবে তার সম্মুখে, অথবা মিরার নিজস্ব বিপরীত সত্য উদ্ভাসিত হবে কারানের দৃষ্টিপাতে। মিরা অজান্তেই ঢোক গিলল।

মিরা মুহূর্তটাকে হালকা করতে চাইল, "কারান, দুটো চৌধুরি বাড়ি নিয়েই আমার সন্দেহ হয়। যেন কিছু ব্যাপার আমাদের চোখের আড়ালে আছে। খুব সূক্ষ্ম কিছু, যেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না, অথচ সেটা দেখা এখন সবচেয়ে জরু..."

"একটা আবদার করব?"

মিরা কথা বন্ধ করে, কারানের গলা ছেড়ে তার চোখের দিকে তাকাল। "বলো, জান।"

"সামনের ক’টা দিন শুধু আমাকে দাও, মিরা। এই কয়েকটা দিন আমরা আমাদের ছোট্ট পৃথিবীতে হারিয়ে যাব—যেখানে থাকবে না কোনো দায়িত্ব, কোনো ব্যস্ততা, থাকব শুধু তুমি আর আমি। আমি আবার দুবাই যাব, জানি না কবে ফিরতে পারব বা কবে আবার তোমার মুখটা দেখতে পারব। তাই এই অল্প ক’টা দিন তুমি চৌধুরি বাড়িসহ বাইরের সবকিছু ভুলে যাও। শুধু আমাকে আর আমাদের মূহুর্তগুলোকে মনে রেখো, যেগুলো একদিন বুকে আঁকড়ে ধরে বাঁচব তুমি আর আমি।"

"কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ যেতে হবে!"

কারান মিরার কপালের কাছের চুলগুলো আলতোভাবে সরিয়ে দিয়ে বলল, "বলেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার আগে নিজেদের হারিয়ে ফেলা টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া দরকার।"

কারানের চোখ তৃষ্ণার্থ। সে এই মুহূর্তে মিরাকে দেখে নিজেকে আশ্বস্ত করতে চাইছে। মিরার কপোলে এক হাত রেখে কারান আপনমনে বলল, "আমি জানি না, এই জীবনের ঘূর্ণিতে আবার তোমার কাছে ফিরতে পারব কিনা। কিন্তু আমাকে ফিরতেই হবে। তোমার একটুখানি স্পর্শ, একফোঁটা অনুভব ছাড়া আমি অপূর্ণ। তাই সব বিভাজনের অন্ধকার, বাধার প্রাচীর, নিয়তির নিষ্ঠুর পথ পেরিয়ে আমি আবার তোমার কাছেই আসব।"

মিরা চোখ বন্ধ করে কারানের আলতো ছোঁয়ার শিহরনে ডুবে গেল। তার শরীর জুড়ে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘশ্বাসে জমে থাকা সব ক্লান্তি কোথাও যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল।

একটু পর কারান নরম গলায় বলল, "মিরা, তোমার একটা ইচ্ছে ছিল, আমার কোলে মাথা রেখে ‘নীল দরিয়া’ গানটা শোনার। শুনবে আজ?"

কারানের স্মৃতির এমন গভীরতা দেখে মিরা চমকে তাকাল। এতটুকুও ভুলে যায়নি? দেড় বছর আগের সেই স্মৃতিও মনে রেখেছে? সে কী এতটাই ভালোবাসে তাকে?

তার স্থবির চোখের দিকে তাকিয়ে কারান বলল, "কি হলো?"

"তোমার মনে আছে?"

"তোমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নড়াচড়া; কী বলেছিলে, কীভাবে তাকিয়েছিলে, এমনকি কীভাবে নিশ্বাস নিয়েছিলে—সবই আমার হৃদয়ে অদৃশ্য অক্ষরে লেখা থাকে, বেগম সাহেবা।"

মিরা হেসে মাথা নীচু করল। কারান আবার বলল, "চলুন, আমার কোলে শুয়ে পড়ুন।"

আর কোনো শব্দ না বলে সে মিরাকে নিজের বাহুতে তুলে নিল। বিছানায় বসে মিরাকে নিজের কোলের কাছে বসালো।

মিরা কারানের কোলে ধীরে ধীরে মাথা রেখে দিল। কারান তার চুলে আলতোভাবে আঙুল চালাতে চালাতে, বুকের গহিন থেকে উঠে আসা ব্যথা-বোনা সুরে গাইতে শুরু করল,

"ওরে নীল দরিয়া

আমায় দেরে দে ছাড়িয়া...

বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি, হায়রে

কান্দে রইয়া রইয়া..."

প্রতিটি কথা মিরার হৃদয়ের গভীরে ঢেউ তুলল। তাদের একসাথে পার হওয়া সময়ের স্মৃতি, কষ্ট আর ভালোবাসার মূহুর্তগুলো মনে পড়তে থাকলো।

কারানের আঙুল মিরার মুখাবয়বে গড়িয়ে নামছিল। আর মিরা চোখ বন্ধ করে হাসল। বাহিরের স্নিগ্ধ হাওয়া পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল।

কারান ফের টান দিয়ে গাইতে শুরু করল,

"ওরে নীল দরিয়া...

আমায় দেরে দে ছাড়িয়া

বন্দী হইয়া মনোয়া পাখি, হায়রে

কান্দে রইয়া রইয়া।

ওরে নীল দরিয়া..."

প্রতিটি সুর যেন কারানের গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিল বারবার। তার মুখে হালকা একটা কাঁপুনি খেলে গেল, ঠোঁটের কোণে জমে থাকা ব্যথার রেখাটা গভীর হয়ে উঠল।

কারান গলার খাঁজে একটা ঢোক গিলে নিল। ভিতরের কষ্টটা আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না। তবুও গলার স্বর একটু কাঁপা হলেও টান ধরে আবার গাইতে শুরু করল,

"কাছের মানুষ দুরে থুইয়া...

মরি আমি ধড়-ফড়াইয়া, রে...

কাছের মানুষ দুরে থুইয়া,

মরি আমি ধড়-ফড়াইয়া, রে...

দারুণ জ্বালা দিবানিশি

দারুণ জ্বালা দিবানিশি

অন্তরে অন্তরে।"

মিরা অনুভব করল, এই মুহূর্তে কারান কেবল গাইছিল না, সে নিজেকেই খুলে দিচ্ছিল তার সামনে।

কারানের কণ্ঠে অস্পষ্ট সুর বাজল,

"আমার এত সাধের মনোয়া পাখি হায়রে,

কি জানি কি করে..."

এই শেষ লাইনে কারানের গলা থেমে গেল। কিন্তু মিরা তখনো সেই সুরের রেশে আবিষ্ট হয়ে চোখ বন্ধ রেখেছিল। একসময় অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতায় ধাতস্থ হয়ে চোখ মেলে তাকাতেই মিরার দৃষ্টি পড়ল কারানের দিকে; সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। পর্দার ফাঁক গলে চাঁদের নরম আলো এসে কারানের মুখে পড়ল। সেই আলোয় মিরা অবাক হয়ে দেখল, তার চোখে এক বিন্দু জল ঝুলে আছে। কারানের বিবর্ণ মুখ দেখে মিরার বুকেও ব্যথা হচ্ছিল। এমন রূপ সে আগে কখনো দেখেনি।

এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে যে কোনো গভীর স্মৃতি লুকিয়ে আছে, তা মিরা অনুভব করলেও ধরতে পারল না। গানটি ছিল কারানের মায়ের সবচেয়ে প্রিয়। আজ যখন সে গাইল, তখনই সেই একটি লাইন তার হৃদয় বিদীর্ণ করে দিল, 'কাছের মানুষ দূরে থুইয়া...' শৈশবের আশ্রয় হয়ে থাকা মা আজ আর নেই। গানটার প্রতিটি শব্দ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেই ফেলে আসা মুহূর্তে, যেখানে একটাই মুখের জন্য তার মন কাঙাল হয়ে থাকত। অথচ জানে, সে মুখ আর কখনো ফিরে আসবে না। এ ভারেই তার চোখ ছলছল করে উঠল।

মিরা কোল থেকে উঠে কারানের বুকে মাথা রেখে বলল, "কি হয়েছে, কারান?"

ঠিক সেই মুহূর্তেই দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ শোনা গেল। সহসা ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে এলো। জানালার কাচে টুপটাপ জলবিন্দুর কোনা বেয়ে বেয়ে পড়ছিল।

কারানের চোখ জানালার দিকে ছুটে গেল।

কারান হঠাৎ বলে উঠল, "একসঙ্গে বৃষ্টিবিলাস উপভোগ করবে, প্রিয়তমা?"

"কিন্তু..."

তবে হঠাৎই কারান তার কোমল হাত ধরে টেনে তুলল।

"চলো, মেরি জান," বলেই মিরার বাক্য অসমাপ্ত রেখেই তাকে নিয়ে এলো ছাদের দ্বারপ্রান্তে।

দু’জন দাঁড়িয়ে পড়ল বৃষ্টির ভেজা চৌকাঠে। ছাদের কার্নিশ বেয়ে অবিরাম জলধারা টুপটাপ ছুটছিল, আর এক পর্যায়ে হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মিরার গালে ছুঁয়ে গেল বৃষ্টির নিখাদ জলকণা। মিরা এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠলো।

তারপর হঠাৎ করেই তার ভেজা চুলগুলো অবাধে ছুটে এসে কারানের মুখাবরণে আছড়ে পড়ল। কারানের চোখ বুজে গেল। সে সেই আর্দ্র কেশগন্ধকে টেনে নিল। সেই সুষম সুবাস তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হয়ে তাকে অভিভূত করল।

গভীর স্বরে কারানের কণ্ঠে ঝরে পড়ল, "Let my mornings begin and nights end with your scent, baby."

কারান যখন পাশে দাঁড়িয়ে মিরাকে অনুভব করছে, তখন মিরার মন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে। বৃষ্টি বরাবরই মিরার অতী পছন্দনীয়। সে আর নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। হঠাৎ কারানের হাতছায়া থেকে নিজেকে মুক্ত করে ছাদের মাঝদিকে ছুটে গেল। তার আচরণে কারানের ভ্রূ সামান্য সংকুচিত হলো। কারণ বৃষ্টিসিক্ত হলে মিরার দেহে শীতজনিত ঠান্ডা দেখা দিতে পারে।

কিন্তু সেই বিস্ময়দৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। অপলক দৃষ্টিতে সে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল।

ওদিকে মিরা দু’হাত আকাশের দিকে মেলে ধরল, চোখ বন্ধ করে গভীর আবেশে শ্রাবণের বর্ষাকে আলিঙ্গন করল। তার পরনের শুভ্র বসনটি ত্বকের সাথে লেপ্টে মিরার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। ভেজা কেশরাশি ছড়িয়ে আছে কাঁধের ও গলার উপত্যকায়, প্রতিটি কেশপথ ধরে জলকণাগুলি গড়িয়ে পড়ছিল।

মিরার এমন সৌন্দর্য দেখে কারান শুকনো ঢোক গিলল। তার দৃষ্টি আটকালো মিরার শরীরের ভেজা ভাঁজে। এই মূহুর্তে মিরাকে যেন বারিষা রূপসীর মতো অপূর্ব লাগছিল।

কারান এক পা ছাদের উপর রাখল, মুহূর্তেই আকাশ থেকে ঝরে পড়া শ্রাবণের ফোঁটাগুলো তার দেহাবরণে মেলামেশা করতে লাগল। সে মিরার দিকে এগিয়ে গেয়ে উঠল,

"ও আগে কত বৃষ্টি যে,

দেখেছি শ্রাবণে;

জাগে নিতো এত আশা,

ভালোবাসা এ মনে..."

বৃষ্টি বিলাসে মগ্ন মিরা হঠাৎ করেই গাঢ় পুরুষালি গানের সুর শুনে নিজস্ব জগৎ থেকে সটকে বেরিয়ে এলো। চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকালো কারানের বৃষ্টিতে ভেজা সাদা শার্টের দিকে। যা তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে প্রতিটি মাংসপেশির সূক্ষ্ম রেখা আবির্ভূত করেছিল; কারানের বুকের ভাঁজগুলো যেন হাতে আঁকা এক অনবদ্য আর্টওয়ার্ক। তার উপর তার নেশায় মগ্ন দৃষ্টি উপলব্ধি করে দূর থেকেই মিরার হৃদয় অধিক স্পন্দিত হতে লাগল।

কারান এগিয়ে এসে মিরার সামনে দাঁড়াল। মিরা পিছপা হওয়ার আগেই, সে শক্ত হাতে তার কোমর আঁকড়ে ধরল। টাল সামলাতে না পেরে মিরার মাথা ঠেকল তার বুকে। মিরা মাথা উঁচিয়ে কারানের মুখপানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। অবরত বর্ষণের ধারাগুলি কারানের চুল বেয়ে মিরার বিমুগ্ধ মুখাবয়বে গড়িয়ে পড়তে থাকল। কারান মিরার কোমর ঘিরে ধরে আলতো হাতে দোলাতে শুরু করল। মিরাও কারানের সাথে তাল মিলিয়ে কোমর দোলাতে লাগল।

পুনরায় কারান গেয়ে উঠল,

"সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে,

সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী,

আজ ভিজতে ভালো লাগে,

শূন্য মনে জাগে প্রেমের কামিনী...

সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে,

সামনে এলে হায় ফোটে কামিনী,

আজ ভিজতে ভালো লাগে,

শূন্য মনে জাগে প্রেমের কামিনী..."

কারান বাম হাতে মিরার হাত তুলে ঘুরাতে লাগল। কারানের স্পর্শে তার মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠলো।

এরমধ্যেই ছাদের একপাশে জমে থাকা পানির দিকে দুজনেরই দৃষ্টি পড়ল। মিরা মুহূর্তেই ছুটে গেল। শিশুর মতো পানির মাঝে লাফাতে শুরু করল। ভিন্ন কোনো প্রেক্ষণে হলে কারান হয়ত মিরাকে বকাবকি করত কিংবা তাকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেত। কিন্তু এই মুহূর্তে সেও মিরার পাশে এসে সেই পানির মাঝে লাফাতে লাগল।

কারান হেসে মিরার গালের ভেজা চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিল, কানের লতিতে একটি কোমল চুমু দিলো। চুমুর স্পর্শে মিরা অজান্তেই কাঁপতে লাগল। কারান পূর্ণ আবেগ নিয়ে মিরার কানের কাছে সুর তুলল,

"এলো মেঘ যে এলো ঘিরে বৃষ্টি সুরে সুরে;

সোনায় রাগিণী,

মনে স্বপ্ন এলোমেলো একি শুরু হলো;

প্রেমের কাহিনি...

রিমঝিম এ ধারাতে চাই মন হারাতে,

রিমঝিম এ ধারাতে... চাই মন হারাতে..."

হঠাৎ করেই কারান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে বৃষ্টির ভেতর তাকে ঘুরাতে থাকল। মিরা প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরমুহূর্তে সে কারানের কাঁধ আঁকড়ে ধরে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস নিয়ে হেসে উঠল। তারপর বৃষ্টিভেজা আকাশের দিকে হাত দুটি মেলে দিল।

একটু পর কারান তাকে নিচে নামিয়ে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টির বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ছিল তাদের ললাটে, কপোলে, চোখের কোণে। মিরার বুকের প্রতিটি কোমল স্পন্দন কারানের কঠিন বুকে এসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে উঠল।

তখন কারান তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে উঠল,

"তুমি আমার শ্রাবণের অনুপম অভিসার,

মেঘবিহ্বল গগনে কুজন তোলো অপার।

তুমি বসন্তের কুসুমঘন গোপন অভিমান,

সুরভিত হেমন্তে জাগাও অনিবার্য প্রাণ।

শরতের স্নিগ্ধ নীলিমা; তুমি মনের ঊর্ধ্বে ছায়া,

যেথা মিশে যায় অনন্তের স্বপ্নরাশিমালা মায়া।

চৈত্রের উজ্জ্বল তেজে তুমি দিগন্তপারে দীপ্তি,

তব দৃষ্টিতে জ্বলে ওঠে প্রেমের অন্তহীন নীতি।

বৈশাখি দুরন্ততায় তুমি বিদ্যুতের ইঙ্গিত,

ঝঞ্ঝার মাঝে তোমার বুকে পাই প্রশ্রয়ের সংগীত।

আশ্বিনের কাশফুলের শুভ্রতায় তুমি নিঃশব্দ স্মৃতি,

কার্তিকের কুয়াশা হয়ে আসো মায়াবী প্রভাতবৃত্তি।

তুমি পৌষের রাতের নিস্তব্ধতায় নিবিড় অভ্যর্থনা,

শীতের গহন স্তব্ধতায় তুমি আত্মার গোপন তপস্যা।

তুমি ঋতুচক্রে অনিঃশেষ এক প্রতিচ্ছবি,

প্রেমের ভাষ্যে রচো তুমি চিরন্তন কবি।

ভালোবাসি তোমায়; কালের অতল ছায়াপথে,

যেথা আমার ভাষা বিলীন, তব নাম উচ্চারিত প্রাতে।

তুমি আমার হৃদয়ের অর্ঘ্য, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কাব্য,

নিয়তির অনুচ্চারিত রাগরাগিণীর অন্তর্যামী শ্রব্য।

আমার ভালোবাসার সীমা শব্দে ধরা যায় না, বউ।

সমস্ত শব্দকোষ নিঃশেষ করেও তোমার জন্য যথাযথ ভাষা খুঁজে পাই না আমি৷

অথচ আমার প্রতিটি নিশ্বাসে অনুপম ভালোবাসার মানে হয়ে জেগে থাকো তুমি।"

মিরা অভিভূত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নীরব তাকিয়ে রইল। কারানের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীরতম কুঠুরিতে অমোচনীয় ছাপ ফেলে গেছে। তার চাহনির নিবিষ্ট গভীরতা মিরাকে প্রতিবারই অবিরাম আকর্ষণে বাঁধে। বরং চিরকাল এই দৃষ্টির বন্দিত্বেই থাকতে চায় সে। মিরার মনজুড়ে অনাবিল প্রশান্তি নেমে আসল।

কারানও আঁখি মেলে একই মোহাবিষ্টতায় তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর মিরা অনির্বচনীয় আবেগে বলল,

"নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতায়, যদি শেষবারের মতো তোমার কোলের উষ্ণ আশ্রয়ে মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারি, তবে মৃ*ত্যুও হয়ে উঠবে আমার প্রিয়তম অতিথি। তখন এই জীবনকে আর কিছু চাওয়ার সাহসও করব না। সেই মুহূর্তেই আমার সমস্ত আক্ষেপ, সব না-পাওয়ার যন্ত্রণা; সবকিছু নিশ্চুপ হয়ে যাবে। মৃ*ত্যুকে তখন মনে হবে আশীর্বাদের মতো। কারণ শেষটুকু যে তোমার সান্নিধ্যে শেষ হয়েছে।

তুমি তো শুধু মানুষ নও, তুমি আমার পূর্ণতা। তোমার চোখে আমি নিজেকে নতুন করে চিনেছি, তোমার ভালোবাসায় আমি প্রতিবার পুনর্জন্ম পেয়েছি।

এই ভালোবাসার ঋণ... তা কি কখনো শোধ করা যায়? এ ঋণ তো হৃদয়ের, আত্মার; যেখানে কোনো হিসেব চলে না। আমি শুধু এইটুকু চাই, যদি জন্ম বলে কিছু থাকে পরপারে, তবে প্রতিবারই যেন আমি জন্ম নিয়ে তোমারই ভালোবাসায় ডুবে যেতে পারি।"

কারান মুহূর্তকাল মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরটা দুর্দমনীয় আবেগে টালমাটাল। তার হৃদয় চিৎকার করে বলতে চাইল, 'জড়িয়ে ধরতে চায় তাকে, বিলীন হতে চায় মিরার হৃদয়ে, আর কাঁদতে চায় বুকভরে।'

কিন্তু না, মিরার সামনে ভাঙা মুখ কখনোই তুলে ধরবে না সে।

দুজনেই নীরবতায় মগ্ন। তাদের মন বলে, এই মুহূর্ত যেন অনন্তকাল স্থায়ী হয়; প্রেমের যে কুসুম ফুটেছে, তা যেন কোনোদিন ঝরে না পড়ে।

অনেকটা সময় পর মিরার ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। সে এগিয়ে এসে কারানকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল। কারানও চোখ বন্ধ করে তাকে সেই একই রকম আকুলতায় জড়িয়ে ধরল। একটু পর কারান ফিসফিস করে বলল, "You are my red rose, sweetheart."

মিরা হেসে কারানের গালে একটুখানি আলতো চুমু এঁকে দিল। একটু পরই সেই চুমু সরে এলো ঠোঁটে। একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে, আবেশে তারা ক্রমশ ডুবে যেতে লাগল। চুমুর গভীরতায় দুজনের শ্বাস গাঢ় হয়ে উঠছিল। কখনো ধীরে, কখনো বা বিদ্যুৎগতিতে। মিরার বুক উঠছে-নামছে। তার নখ কারানের ঘাড় আঁকড়ে ধরেছে। আর অন্যদিকে কারানের হাত শক্ত হয়ে জাপটে ধরেছে মিরার কোমর।

কিন্তু এই বৃষ্টিভেজা প্রেমিলতায় কে যেন আছে। একজন তৃতীয় ব্যক্তি, যে চুপচাপ অন্ধকারের গভীরে কোথাও বসে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। তার চোখ শিকারির মতো ঠান্ডা। আর ঠোঁটে ধরা সিগারেট থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার ঘরটায় হালকা কমলা রঙের আলো জ্বলছে। ঘরের এক কোণায় পড়ে থাকা টেডি বিয়ারের চোখ উপড়ে ফেলা রয়েছে।

তার সামনে উন্মুক্ত ল্যাপটপের স্ক্রিনে ঝলমল করছে সেই ছাদের দৃশ্য। সেখানে মিরা আর কারানের আবেশে ভেজা শরীর, মিরার বক্ষের ছন্দোময় ওঠানামা, কারানের গলায় মিরার আঙুলের কামনাবদ্ধ ছোঁয়া, কারানের কোমর আঁকড়ে ধরা, ঠোঁটের গভীরতায় নিমগ্ন দুটি আত্মা, মৃদু নেশাগ্রস্ত হাসি, ঠোঁটের ক্ষণিক কম্পন, দুজনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা— সবই স্পষ্ট দৃশ্যমান। তার পরনে শুধু একটি ট্রাউজারমাত্র।

ল্যাপটপের পর্দায় অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে। তারপর হঠাৎই গম্ভীর, গা-ছমছমে কণ্ঠে বলে উঠল, "And you are my Black Rose, little fire..."

তার ঠোঁটের কোণে পিশাচী হাসি ফুটে উঠল। সিগারেটের জ্বলন্ত আগুনটা আচানক নিজের বুকের বাঁ পাশে ঠেসে ধরল। চামড়ার আস্তরণ উঠে লালচে মাংস বেরিয়ে এসেছে, তবুও তার মুখ নিস্তব্ধ, কোনো ব্যথার ছাপ নেই। মুহূর্ত পর চুলগুলো পেছনে ঠেলে একপ্রকার ব্যর্থ আত্মসংযমের চেষ্টা করল, কিন্তু হাত কাঁপছিল। প্রচণ্ড রকমের ব্যর্থতা তার চোখে-মুখে দেখা গেল। চোয়ালের পেশি এতটা শক্ত হয়ে ছিল যে দাঁত কিঞ্চিৎ ভেঙে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল। চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে একবার শ্বাস নিল।

খুললে দেখা গেল, তার চোখদুটি রক্তাভ, বিকারগ্রস্ত। মনে হচ্ছে, মুহূর্তেই চোখের কোণে সঞ্চিত রক্ত ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়বে। ঘাড়ের পেশিগুলো সংকোচনে ফুলে নীল বর্ণ ধারণ করেছে। হঠাৎ সে ক্ষিপ্রতায় সামনের র*ক্তরঞ্জিত টেবিলের ওপর একের পর এক ঘুসি মারতে লাগল। কাঠের গায়ে ধাক্কা খেয়ে হাত কাঁপছিল, তবু সে থেমে নেই। হাতটা লাল হয়ে নীল, এরপর ধীরে ধীরে র*ক্তাক্ত হলো। হাতের চামড়া ছিঁ*ড়ে, হাড়ের সংযোগস্থলে ফাটল ধরল। ত্বক ছিঁ*ড়ে গিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে এলো। ফোঁটা ফোঁটা র*ক্ত টেবিলের গায়ে গড়িয়ে পড়ছিল। তবু তাতে তার অন্তর্লীন অগ্নিদাহ প্রশমিত হলো না।

পরমুহূর্তে সে চকচকে একটি ছু*রি হাতে তুলে, বা পা-টা চেয়ারের উপর রাখল। হঠাৎই পায়ের ছোট আঙুলটায় ছু*রির ধার বসিয়ে দিল। হাড় ফেটে মাংস ছিঁ*ড়ে গিয়ে কেবল চামড়ার শেষ টুকরোটা ধরে ছিল। একটানে সেটাও ছিঁড়ে ফেলল। আঙুলটা মেঝেতে ছিটকে পড়ে র*ক্তে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে লাফিয়ে উঠল। র*ক্ত সাপের মতো টাইলসের উপর ছড়িয়ে পড়ল।

অথচ তার চোখে না আছে বেদনা, না বিস্ময়। সে নীচু হয়ে আঙুলটা হাতে তুলে নিল। তখনো আঙুলটা ছটফট করছিল। স্থির চোখে সেটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হয়, সে যেন হিপনোটাইজড হয়ে গেছে।

ক্ষণকাল পর ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এলো। সেখান থেকে সুঁই বের করল। সুঁইটার মাথায় শুকিয়ে যাওয়া র*ক্তের ছোপ লেগে ছিল, আগেও হয়ত এটা ব্যবহৃত হয়েছিল। এবার সে সেই আঙুলটা আবার পায়ে সেলাই করতে শুরু করল। ছুঁচটা মাংসের ভেতর ঢুকছিল, আবার বের হচ্ছিল। তবুও সে নির্বিকার। কিন্তু ব্যর্থ হলো। যতই সেলাই করে, আঙুলটা ততই নড়তে থাকল।

রাগে উন্মাদ হয়ে সে ছুঁচটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছিল, চোখ দুটো র*ক্তাক্ত আগুনে জ্বলছিল। তাই সেই কা*টা আঙুলটা মুখের মধ্যে পুরে ফেলল। চোয়াল শক্ত করে চিবোতে শুরু করল। মুহূর্তেই কচকচে শব্দ হলো। চামড়া ছিঁ*ড়ে যাওয়া, হাড় ভাঙার আওয়াজ সমস্ত ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। তার মুখ ধাপে ধাপে কঠিন হয়ে উঠছিল। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই র*ক্ত জিভ দিয়ে চেটে খেয়ে নিল সে। কা*টা আঙুলটার নখটা ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিল, তবে পারল না।

সে উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলল। ভেতরে থরে থরে সাজানো আছে কা*টা মাথা, ছিন্ন ভ্রূ*ণ, নীলচে পু*রু*ষা*ঙ্গ, কাটা স্ত**ন, কিডনি, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড, যৌ*না*ঙ্গ, অ*ন্ড*কো*ষ। সে ঠান্ডা হিমায়িত একটি পা টেনে বের করল।

চেয়ার টেনে বসে সেই পা থেকে ছোট আঙুলটা নিখুঁতভাবে কে*টে নিল। এরপর নিজের পায়ের সঙ্গে সেটি সেলাই করে দিতে দিতে বলল, "তোমাকে জাস্ট একটু সুযোগ দিয়েছি, লিটল ফায়ার। আর তুমি কিনা তার এমন নষ্ট ব্যবহার করছ? তোমার শরীরে কারানের ঠোঁট যতবার পড়েছে, তার থেকে হাজারগুণ বেশি আমার পড়বে। আর প্রতিবার এতটাই গভীরে চুম্বন করব, যেন তোমার আত্মায় চিৎকার ওঠে। কাঁদতে থাকবে তুমি, গলা ফাটিয়ে আমাকে থামাতে চাইবে, কিন্তু আমি... আমি তোমাকে মুক্তি দেব না।"

ব্যান্ডেজ লাগাতে লাগাতে সে গুনগুন করে আবার বলে উঠল, "আর কত খু*ন করাবে তুমি আমার হাত দিয়ে, বলো? এই নিয়ে তোমার নামেই একুশটা লা*শ পড়ল, বেবি। আরো একটা খু*ন করতে চলেছি আমি। কিন্তু এর পরেরটা? এর পরেরটা হবে কারানের।" অকস্মাৎ গলা চিরে শ'য়তানি হাসি বেরিয়ে এলো।

অনেকটা সময় পেরিয়ে, ধীরে ধীরে একে অপরের মুগ্ধ বাহুডোর থেকে মিরা ও কারান বিচ্ছিন্ন হলো। চারপাশে নিবিড় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। বারিধারাও থিতিয়ে পড়েছে খানিকটা, কেবল কারানের সিক্ত শার্টের ভাঁজে মিরার আঙুলের সূক্ষ্ম স্পর্শ, আর বাতাসে উড়ে বেড়ানো তার চুলের মৃদুমন্দ সুগন্ধ তাদেরকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। মিরার অধরে চপল হাসি খেলে গেল। সে মাথা নীচু করে পুনরায় কারানের চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।

স্বর নীচু করে বলল, "স্বামী..."

কারান মিরার কপাল থেকে ভেজা চুলের গোছা সরিয়ে কানের পাশে পরিপাটি করে গুঁজে দিয়ে অম্লান হাসিতে বলল, "জি, বেগম।"

মিরা একরাশ শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে বলে উঠলো, "আমার ইচ্ছেগুলো না সব সিনেমেটিক।"

"হোক, বলো জান। কী ইচ্ছে?"

মিরা ধীরে ধীরে কারানের বুকে আঙুল দিয়ে চাপ দিতে দিতে বলল, "টাইটানিক মুভির ওই সিনটা ট্রাই করি? ওই যে, দুজন হাত ছড়িয়ে দাঁড়ায়..."

"আচ্ছা, যেদিন জাহাজে ভ্রমণে নিয়ে যাব, সেদিন করব। বিশাল নীল জলরাশি, হাওয়ার মাঝে তুমি আর আমি হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুহূর্তটা উপভোগ করব।"

মিরার মুখভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গেল। ভ্রূ কুঁচকে বলল, "না, এখনই।"

"এখন? কীভাবে?"

"ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। ঠিক রোজের মতো হাওয়ার তালে উড়বে আমার ড্রেস। তুমি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর তোমার দুই হাতে আমাকে জড়িয়ে রাখবে। কোনো জাহাজ লাগবে না।"

এবার কারানের মুখাবয়ব গম্ভীর হয়ে উঠল। তার চোখের মাধুর্য মিলিয়ে গিয়ে একরাশ উদ্বেগ জেগে উঠল। ভারী স্বরে বলল, "আমি এত তাড়াতাড়ি ম'রতে চাই না, সোনা। অনেক কাজ বাকি, তোমার সঙ্গে অনেক স্বপ্ন দেখা বাকি।"

"ধুর! ম'রবে কেন? চারপাশে শক্ত টেম্পারড গ্লাসের রেলিং আছে তো, কিচ্ছু হবে না। প্লিজ, চলো না হানি।"

"না, জান। জানোই তো, আমার অ্যাকরোফোবিয়া আছে। কি দরকার জেনেশুনে বিপদে পা বাড়ানো।"

"প্লিজ, কারান।"

কারান কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলল। গলা খানিকটা চড়িয়ে বলল, "তোমার এই বাচ্চামো স্বভাবটা কবে যাবে, মিরা? একটা কথা বললে বোঝো না কেন?"

কারানের মুখভঙ্গি ছিল কঠোর, কথাও কাটা কাটা। যা দেখে মিরার ঠোঁট থেকে হাসি মুছে গিয়ে মুখশ্রীতে একটুকরো অভিমান জমলো। তবুও মিরা থামল না। হঠাৎ করেই সে এগিয়ে এসে কারানের গালে একটা চুমু আঁকল। লাজুক হেসে বলল, "যেদিন আমাদের বাচ্চার আগমন হবে, সেদিন আমার বাচ্চামো শেষ হবে। এবার চলো।"

চোখে দুষ্টুমির ঝলক নিয়ে সে কারানের হাত টেনে হাঁটতে শুরু করল। কারান গভীর নিশ্বাস ফেলে কপাল কুঁচকে বলে উঠলো, "তুমি আমার কথাগুলো সিরিয়াসলি নিচ্ছো না, মিরা।"

কিন্তু মিরা তখন ছাদের দিকে এগিয়ে চলেছে। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসল, "তুমি শুধু উপরের দিকে তাকিয়ে থেকো। আমি তো আছিই, কিছুই হবে না।"

তার চোখে ছিল বিশালতার খিদে, আকাশ ছোঁয়ার অনিঃশেষ স্পৃহা। ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে মিরা দু’হাত বাতাসের দিকে প্রসারিত করল। তার চুলগুলো প্রলয়ঝড়ের মতো হাওয়ায় ছুটে বেড়াল, ড্রেসের প্রান্তগুলো পাখার মতো উড়ছিল।

কারান বুকের গভীর গহ্বর থেকে এক টান দিয়ে শ্বাস নিল। তার পা চলতে চাইল, কিন্তু মনের অতলে হিমস্রোতের মতো ভয় গুঁড়িয়ে দিল সাহসকে। তবুও সে মিরার দিকে এগিয়ে গেল। কারান দ্বিধা নিয়ে পেছনে দাঁড়াল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সজাগ করার চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটি চিৎকার ভেসে এলো, "কারাআআআআন!"

মিরার পা পিছলে গেছে। কারান চোখ মেলে তাকাল। তার হৃৎকম্পন যেন র'ক্তে আগুন ধরিয়ে দিল, মাথার ভেতরে যেন সহস্র গ্রেনেড একসাথে ফেটে পড়ছিল।

ঠিক ততটাই বিভ্রান্ত আর বিস্ময়ে কারানও চিৎকার করে উঠল, "মিরাআআআআ!"

তার চিৎকার ছাদ ভেদ করে আকাশে মিলিয়ে গেল। দূরের রাস্তায় এক কুকুর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। যেন সে-ও বুঝে গিয়েছে, কিছু একটা ভয়াবহ ঘটেছে।

ওদিকে শেফ ঠিক সেই মুহূর্তে পরবর্তী খু*নের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। টেবিলের ওপর সাজিয়ে নিচ্ছিল একেকটি সরঞ্জাম। হাতে একটা চামড়ার দস্তানা পরতে পরতে সে হঠাৎ চমকে উঠল। কারান ও মিরার ভয়ানক চিৎকার ল্যাপটপ স্ক্রিন ছাপিয়ে সরাসরি তার স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করল। শেফ হঠাৎ স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তার চোখ ছানাবড়া, ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেছে। সেও চিৎকার করল, "ব্ল্যাকরোওওওজ..."

_______

কয়েকদিন আগের এক বিকেলের কথা।

থানার দেয়ালের রং বহুদিন আগেই উঠে গেছে। কোনায় লালচে পানের ছোপ আর বিড়ির ছাইয়ের স্তূপ পড়ে ছিল। সিলিং ফ্যান বেকায়দায় ঘুরছিল, অথচ ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া বাতাস একদম নেই। দূরে ডিটেনশন কক্ষে হাতকড়ার ঠকঠক শব্দ ধরা দিচ্ছিল।

ক্লান্তি ও হতাশায় ভারাক্রান্ত শাহানার দেহ ঘামের জলে ভিজে উঠেছে। তার বয়স তেমন বেশি নয়, হয়ত পঁচিশের মুখোমুখি। মুখ শুষ্ক, চোখগুলো ফোলা এবং ঝিমধরা। বোঝা গেল, টানা দু-তিন রাতের অনিদ্রা ও চোখের জল তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। ওড়না শ্লথ হয়ে গলা থেকে সরে গেছে।

থানার এক কোণে দাঁড়িয়ে বারবার অনুনয় করে কাঁপা কণ্ঠে সে বলল, "আমার মালকিনকে খুঁজে দিন, স্যার। উনি গর্ভবতী ছিলেন। আমার মালিক বিদেশে, উনি ফিরে এলে আমাকে আস্ত রাখবেন না। আমার মালকিন রেহেনুমা ফরিদকে খুঁজে দিন। স্যার, দয়া করে খুঁজে দিন। আপনাদের পায়ে পড়ি, খুঁজে দিন ম্যাডামকে।"

পলাশ অনেকদিন ধরে এই দৃশ্যের সাক্ষী। শাহানার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও তার অন্তর আগুনের মতো জ্বলে উঠছিল, কারণ সে এই কয়দিনে শাহানার জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তের কথাগুলো শুনেছে।

গলায় আকুতি নিয়ে প্রতিদিন সে থানায় আসে। কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠস্বরে দম প্রায়ই ফুরিয়ে যায়। চোখের আতঙ্ক প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। অথচ মেয়েটির অসহনীয় আর্তনাদের প্রতিদিনের দৃশ্য আমান দেখেও দেখে না।

আমান ডেস্কে বসা অবস্থায়ই শাহানার দিকে লালসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু নিজেকে কঠিনভাবে সামলে রেখেছে। এই মুহূর্তে তার আঙুলে লেগে থাকা সিগারেটের দাগ ঘষে ঘষে তুলছিল। সামনে রিপোর্ট, তদন্তের দলিলের কাগজ ছড়ানো। আমান হঠাৎ চোখ তুলে বলল, "আজকেও কিছু হয়নি। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে সময় লাগে, বুঝলেন তো? আপনি বরং এখন বাড়ি যান।"

শাহানা তার পানে চেয়ে থাকল। এই মানুষের মুখে কোনও সহানুভূতি নেই, নেই একটুও আশ্বাস।

সেই মুহূর্তে থানার এক কোণে একটা মশা মারার ব্যাট গোঁ গোঁ শব্দ তুলে জ্বলতে থাকল। আমান তখনও নির্বিকার ভঙ্গিতে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। ঠোঁটে সেই চিরচেনা বিদ্রুপের রেখা নিয়ে বলল, "সব কিছু তো নিয়ম মেনেই চলে, তাই না? কেসগুলো তাড়াহুড়ো করলে ভুল হয়। তবে কেউ যদি... একটু কৃতজ্ঞ হয়, কিছু ব্যবস্থা আমি নিজেই দেখে নিতে পারি।"

পলাশ বুঝল, এই লোকটা প্রতিদিনই শাহানার দুঃখকে পুঁজি করে নিজের হাতভরে টাকা নিচ্ছিল। এমন সময় তার মস্তিষ্কে বেমক্কা ঝাঁকুনি দিয়ে ফিরে আসল সেই ভয়ানক সন্ধ্যা।

সেদিন দুপুরে শাহানা এসে থানায় রিপোর্ট দিয়েছিল। আর ঠিক সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে, শহরের এক ফাঁকা গলির ডাস্টবিনে পাওয়া যায় একটা নারীর র*ক্তাক্ত কা*টা যৌ*না*ঙ্গ। কা*টা অংশে র*ক্ত দিয়ে লেখা ছিল OWL।

প্রথমে সবাই ধরে নিয়েছিল, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে হয়ত OWL নামক সেই বিকৃত মানসিকতার সিরিয়াল কি*লার ধরে নিয়ে এমন ভয়াবহ কাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু পরের দিন ফরেনসিকের ডিএনএ রিপোর্টে দেখা গেল, ওই কাটা অংশটি শাহানার মালকিন রেহেনুমারই। খুব সম্ভবত গর্ভস্থ সন্তানসহ তাকে নির্মমভাবে হ*ত্যা করা হয়েছে।

তবু আমান প্রতিদিনই শাহানাকে মিথ্যে আশ্বাসে ফিরিয়ে দিত।

আজও ঠিক তাই করল। তবে আজ আর শাহানা বাড়ি ফেরেনি। সে থানার মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে, হাত পা ছুড়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকারে বলে উঠল, "স্যার! আমার মালকিনকে খুঁজে দিন। দয়া করে খুঁজে দিন। কালকে মালিক রাশিয়া থেকে ফিরে আসবে। আমি মা'রা যাব, স্যার! আমাকে জানে মে'রে ফেলবে। আমি কি করব? হে আল্লাহ, আমি কি করব?"

তার মুখ বিবর্ণ, নাক-মুখে, গলায় কান্নার পানিতে একাকার হয়ে গেছে। চোখের নিচে দগদগে দাগ। অথচ চারপাশে পুলিশ সদস্যরা নীরব, নড়েও না।

অমান বিরক্ত মুখে হাত তুলে এক মেয়ে পুলিশকে ইশারা করল। সে এগিয়ে আসল। তার হাত পড়ল শাহানার কাঁধে। আলেয়া নামের সেই পুলিশ মেয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, "আপনি আপনার স্যারের নামে একটা রিপোর্ট লিখিয়ে বাসায় ফিরে যান। আমরা মিসেস রেহেনুমাকে খুঁজছি। এটা সময়সাপেক্ষ, বুঝতে হবে আপনাকে।"

কিন্তু শাহানা হঠাৎ সেই মেয়ে পুলিশটার পা জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নীচু করে বলল, "ম্যাডাম... আমার মালকিনটা খুব ভালো ছিল। অনেক ভালো ছিল। তাকে খুঁজে দিন, প্লিজ। খুঁজে দিন তাকে..."

আলেয়া অবাক হয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। মুখে শিরশিরে অস্বস্তি খেলে গেল, কিন্তু সে আর কিছু বলল না।

এদিকে শাহানার এমন খামখেয়ালি, অগোছালো অবস্থা দেখে এবার আমান খেপে গেল। ডেস্কের উপর রাখা লাঠিটা তুলে একবার টঙ্ক করে মারল টেবিলে। "ওই মেয়ে, এখান থেকে যাবে নাকি অন্য ব্যবস্থা নিব? থানাকে কি তোমার বাপদাদার বাড়ি ভেবেছো? এখানে বসে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছো কেন? বের হও এখান থেকে! নাহলে তোদের মতো লোকের জায়গায় পাঠিয়ে দিব একদম!"

তার কণ্ঠের রুক্ষতায় শাহানার চোখ কেঁপে উঠল। ওড়নার ভেজা প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

সে থানা থেকে বের হতে উদ্যত হল। কিন্তু শাহানার শূন্য, অস্থির চোখের দৃষ্টি পলাশের চোখে এসে ধরা দিল। শাহানার হেঁটে যাওয়া দেখে বুকের মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কা র*ক্তের মতো চুঁইয়ে পড়ল। ভাঙা টেবিলঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা ছুঁই ছুঁই। এই রাতে শহরের রাস্তায়, যেখানে একের পর এক নারী নিখোঁজ হচ্ছে, সেখানে মেয়েটিকে একা পাঠানো মানে মৃ*ত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। পলাশের বুকের ভেতরটা ধক ধক করে উঠল।

এই মেয়েটির বেদনা এত গভীর যে মধ্যরাতেও তার কান্না থামেনি। সেই বিকেল থেকে শুরু করে অবিরত অশ্রু পলাশের হৃদয়ে অনুরাগের সঞ্চার ঘটালো। তাই আজ আর সে নীরব থাকতে পারল না। সে সামনে এগিয়ে এসে বলল, "স্যার, আমি মেয়েটাকে বাসায় দিয়ে আসি। এই গভীর রাতে একলা গেলে বিপদে পড়তে পারে।"

আমান কটমট করে তাকাল পলাশের দিকে, ঠোঁটে হালকা বিদ্রুপ নিয়ে বলল, "বড় দায়িত্ববান হয়েছেন দেখছি!"

পলাশ চোখ নামিয়ে নীচু স্বরে বলল, "স্যার, যেহেতু থানা থেকে বের হয়েছে, মেয়েটা এখন যদি কোনো বিপদে পড়ে, দায় তো আমাদেরই নিতে হবে। তাছাড়া ইসহাক স্যার কাল আসবেন থানা দেখতে।"

এই নাম শুনে আমান থতোমতো খেল। তারপর দৃষ্টি খোলা দরজার দিকে ফিরিয়ে কটাক্ষ করে বলল, "যান। পৌঁছে দিন। যদিও ও মেয়ে নরকে যাক কিংবা নিজ ঘরে, আমাদের তো কিছু আসে যায় না। এখন নিজেদের বাঁচানোই আসল বিষয়।"

আমানের এমন নিষ্ঠুর, হৃদয়শূন্য রূপ দেখে পলাশের ইচ্ছে হচ্ছিল, এখনই কিছু একটা করে ফেলতে। কিন্তু ক্ষমতার সিঁড়িতে সে এখনো অনেক নিচে। গিলে ফেলতে হল অপমান, রাগ, ক্ষোভ সবকিছু। অগত্যা ঠোঁট কামড়ে স্যালুট ঠুকে বাহিরে বের হয়ে এলো পলাশ। গেট পেরোতেই থমথমে রাতের বাতাসে কেঁপে উঠল সে। থানা চত্বরের করিডোরটা আলোঝলমলে, সিসি টিভির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল কিছু আনমনা পুলিশ।

পলাশ বিড়বিড় করল, "আল্লাহ, হেদায়েত দিন আমান স্যারকে। একটুখানি মায়া দেখালে কি এমন ক্ষতি হতো? র‍্যাংকটা ছোট বলেই কিচ্ছু করতে পারছি না, এই অসহায়ত্বই শেষমেশ মানুষকে ভিতর থেকে গিলে ফেলে।"

এমন সময় তার চোখে পড়ল শাহানা। তার শরীর অবশ, সে ফোপাঁতে ফোপাঁতে ধীরে ধীরে পা ফেলে যাচ্ছে। পলাশ তার কাছে এগিয়ে গেল। গলা নামিয়ে বলল, "চলো মা, আমি তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি।"

শাহানা প্রথমে আঁতকে উঠল। ভয়ে চোখ কুঁচকে পলাশের দিকে তাকালো। তারপর চেহারা চিনে বুকে থু থু দিয়ে বলল, "স্যার, আমার ম্যাডাম কবে ফিরবেন?"

তার কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো অসহায়তা স্পষ্ট বোঝা গেল।

পলাশ দাঁতে দাঁত চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "গাড়িতে ওঠো। যেতে যেতে সব বলছি।"

মেয়েটি উভয় হাতের আঙুলে চোখের জল মুছে পদক্ষেপ নিল। পলাশের অনুগামী হয়ে থানা গেট অতিক্রম করল। বাহিরটা যেন আরও বিভীষিকাময়; বাতি নিভু নিভু জ্বলছে। এক কোণে ছিঁড়ে যাওয়া একটি বিবর্ণ পোস্টার ঝুলছে, তাতে লেখা, ‘গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে তথ্য দিন।’

পলাশ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে চুপচাপ উঠে বসল। তার পাশেই কান্নাভেজা মুখে শাহানা উঠে বসলো। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি অন্ধকার গলির বুকে যাত্রা শুরু করল।

শাহানা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আফসোস নিয়ে বলে উঠল, "জানেন স্যার, বিশ বছর... পুরো বিশটা বছর ম্যাডাম এই বাচ্চার জন্য কষ্ট পেয়েছেন। আর এখন? এখন শেষ মুহূর্তে কেউ জানেও না উনি কোথায়!"

পলাশের গলা শুকিয়ে গেল। চোখ ছলছল করতে লাগল, তবুও শক্ত করে নিজেকে সামলে আপনমনে বলল, "যারা এটা করেছে, আমি শুধু একবার ওদের মুখটা দেখতে চাই। কতটা পশু, কতটা জা*নোয়ার হলে কেউ একটা প্রেগন্যান্ট মাকেও ছাড়ে না!" তারপর গলা আরও নীচু করে বলল, "ওদের মৃ*ত্যু যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মৃ*ত্যু হয়। যেন ওদের বুকে গলগল করে আগুনের লাভা ঢেলে দেওয়া হয়, যেন ওদের আর্তনাদে পৃথিবীর সমস্ত দরজাও কেঁপে উঠে বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ যেন ওদের উপর এমন গজব নামান, যা দেখে সব পাপী যেন ভয় পেয়ে কেঁদে কেঁদে তওবা করে। আমিন।"

অকস্মাৎ গাড়ির বাইরে অন্ধকার গলিতে কোথা থেকে একটা কুকুর ডেকে উঠল। বাতাসটা ঠান্ডা, অথচ ঘামে পলাশের হাত ভেজা। দূর থেকে ভেসে আসছিল কোনো পাগলের অস্পষ্ট আর্তচিৎকার, কিন্তু গায়ের লোম খাড়া করে দেয়।

নীরব রাতের নিরেট নিস্তব্ধতা চিরে তাদের গাড়ি ছুটে চলছিল। আকাশ আজ নিঃচন্দ্র। শাহানা জানালার বাইরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার ফ্যাকাশে ঠোঁট কাঁপছে। মাঝে মাঝে গোঙানির মতো মৃদু শব্দ শোনা গেল।

তবে শাহানা কান্নার মাঝেই কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, তা পলাশও জানে না। সহসা কিছু একটা অবলোকন করে পলাশের ভিতর অস্থির হৃৎকম্পন তীব্র হয়ে উঠল।

দূরে কুয়াশাময় আলোয় তিনটি রহস্যময় অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রথমদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ছায়ামূর্তি, কিন্তু পলাশ নিঃসংশয়ে বুঝে নিল, এরা OWL। সেই দুর্বোধ্য, কালো হুডির নিচে অদৃশ্য মুখ, যেখানে কেবল জ্বলজ্বলে চোখ আর রক্তরঞ্জিত রামদার ঝিলিক দেখা গেল। নিঃসন্দেহে তারা শিকারের খোঁজে এসেছে। OWL-দের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত উপস্থিতি দেখে পলাশের বুকটা খচ করে উঠলো।

একদিকে গলির পাশে সারিবদ্ধভাবে বন্ধ দোকানপাট, অপরদিকে গলির মুখে একটি অর্ধভগ্ন বাতি দপ করে জ্বলে আবার নিভে যাচ্ছে।

পলাশ ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, "না... না, এখানে থামলে আমি ম'রব, মেয়েটাও ম'রবে।"

সে ভাবল গাড়ি চালিয়ে ওদের উপর দিয়েই চলে যাবে। কিন্তু OWL-দের অস্ত্রের ঝলকানি আর তাদের মৃতমানবের মতো ধীর পায়ে এগিয়ে আসা, এই দুটি দৃশ্য তার হাত কাঁপিয়ে দিল। তবে সে ভিতরে ভিতরে কাঁপলেও মনোবল শক্ত রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু অকস্মাৎ সে ঘামতে শুরু করল। ভিতরে ভিতরে কেমন যেন অতীতের ভাবনা গুলো কয়েক সেকেন্ডে ফিরে আসল।

আলী আবসার স্যারের ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীর, তার স্ত্রীর চোখ থেকে দেহের সবকিছু উপড়ে নেওয়া মৃ*তদেহ, তার সন্তানের গুম হয়ে যাওয়া—সব যেন ভয়াবহ সিনেমার দৃশ্য হয়ে তার চোখে ভেসে উঠল।

তার গলা শুকিয়ে এলো। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বিড়বিড় করে বলল, "আলী আবসার স্যারের মতো একজন ট্যাকটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের চিফ যদি না বাঁচেন, তাহলে আমি আর কি? হে আল্লাহ, আজ আমার শেষ রাত নয় তো?"

মনোবল শক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল পলাশ, তবু বুকের ভিতর ধুকপুকুনি কাজ করছিল। জীবনে অসংখ্য অপরাধী দেখেছে সে; খু*নি, ধ*র্ষক, চাঁদাবাজ এমন অভাব নেই। কিন্তু এই চক্রটা আলাদা।

আগেও পুলিশ ফোর্সের মধ্যে কানাঘুষা চলেছে, 'OWL' নামে একটা গ্রুপ শহরের কিছু নির্জন এলাকায় সক্রিয়। কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি, কেউ দিতে গিয়েও নাকি চাকরি খুইয়েছে, বদলি হয়েছে হঠাৎ করেই। এই কেসের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার পর তদন্তকারীর পরিবারকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, এমনকি নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনাও এক-দুইবার ঘটেছে।

এসব কারণেই আমান তাদের নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন না। তার এক কথা, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম।’

শুরুতে সরকার বেশ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যখন একজন সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার আলী আবসার সেই অভিযানে গিয়ে তার স্ত্রী ও মেয়েকে হারান, তখন তদন্ত একপ্রকার থেমেই যায়। তখন থেকেই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেন। হয়ত আরও কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে আজ পরিস্থিতিটা অন্যরকম হতো, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার লোকই নেই। থাকবেই বা কি করে, ভেতরে ভেতরে তো দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের সম্ভার।

পলাশ ভেবেছিল সে নিজে থেকেই একটু খোঁজখবর নেবে, কিন্তু এখন বোঝে, ওদের কাছাকাছি যাওয়া মানেই বিপদ।

এখন যেভাবে একা বেরিয়ে পড়েছে, সেটাও বোকামি ছিল। সে গাড়ি ঘুরিয়ে চলতে শুরু করল। তার মোবাইলটার চার্জও তখন প্রায় শেষের পথে।

তবু দেরি না করে একটানে মেসেজ টাইপ করতে লাগল, "হুমায়ুন, যদি আর ফিরতে না পারি, দয়া করে মিডিয়াকে জানিয়ে দিও, OWL চক্রের লোকজন আবার সক্রিয় হয়েছে। আজ রাতে এক মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে আমি পথে নেমেছি। কিন্তু এখন আর বসে থাকা চলবে না। মেয়েটাকে ওরা নেবে। থানায় তথ্য পাঠিয়ে দিব, জানি কিছু লাভ হবে না। ওদেরও ভয় লেগে যায় OWL-এর নাম শুনলে। কিন্তু আমি চুপ করে থাকব না। তুমি অন্তত চেষ্টা করো যেন আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে নিভে না যায়। তোমার উপর ভরসা রইল।"

সে টেক্সট পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন ইউনিট ৫-এ রেডিও কল করল।

"আমি কনস্টেবল পলাশ। ৩৫ নম্বর সোনাপুর সড়কে সন্দেহভাজন OWL স্পটেড। অবিলম্বে ব্যাকআপ দরকার; জরুরি অবস্থা। গাড়ির নম্বর DHA-28-0077, লোকেশন পাঠাচ্ছি। দ্রুত আসুন, দেরি করবেন ন..."

কিন্তু বাক্য শেষ হওয়ার আগেই গুলির শব্দ ছিন্নভিন্ন করে দিল নিশুতি। গাড়ির সামনের বাম চাকা মুহূর্তেই উড়ে গেল, ধাতব ছিন্নাংশ চারদিকে ছিটকে পড়ল। গাড়ি প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ভারসাম্য হারিয়ে একপাশে হেলে পড়ল। পলাশ দু’হাতে স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরল।

শাহানা চোখ দুটোতে জমাট ভয় নিয়ে জেগে উঠল। আতঙ্কিত স্বরে বলল, "কিক-কি হয়েছে, স্যার?"

এদিকে অন্ধকার বিদীর্ণ করে OWL-এর সদস্যরা একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। কারও হাতে শীতল লোহার রড, কারও হাতে ধারালো চাপাতি। কারো আদল খোলা, কারো মুখাবয়ব অন্ধকারে ঢেকে গেছে। হিংস্রতায় তাদের চোখ দুটো জ্বলছিল।

পলাশ ঢোক গিললো। ভিতরের ধুকপুক শব্দটা চাপা দিয়ে ভাবল, যদি আজ তার ফেরা না হয়, হুমায়ুন যেন থেমে না যায়। কিন্তু আবারও কি একটি নারীর জীবন নিঃশেষ হতে যাচ্ছে? নাকি নিয়তির অন্ধকার এই বৃত্তে এবার ছেদ পড়বে? এই রাত কি আবারও শুধু শোক হয়ে ফিরবে, নাকি উন্মোচিত হবে প্রতিশোধের উন্মত্ত সকাল?

🍁চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন