পর্ব ০১
রাত তখন প্রায় ১২ টা ছুঁই ছুঁই। অফিসের আলো একে একে নিভে গেছে, শুধু করিডোরের শেষ প্রান্তে একটা টিমটিমে বাতি নিভু নিভু হয়ে জ্বলতেছে। যেকোনো সময় সে আলো নিভে যেতে পারে।আমির গাড়ির চাবি শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরলো। বসকে কতবার বলেছিলো যে --"স্যার একটু আগে যেতে দিন--" কিন্তু শেষ মূহুর্তে কাজের পাহার চাপিয়ে দিলো। কাজ করতে করতে সাড়ে এগারোটা।
এখন এই গভীর রাতে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে ড্রাইভ করতে হবে ---ভাবতেই বিরক্ত আর অস্বস্তি একসাথে বুকের ভেতর চেপে বসলো।
অভিস ভবনের বাইরে পা দিতেই এক ধাক্কায় অন্য এক জগতে ঢুকে পড়ার অনুভুতি হলো। চারপাশ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। শহরটা যেন হঠাৎ করেই প্রাণ হারিয়েছে। দূরের রাস্তায় সারি সারি ল্যাম্পপোস্ট দাঁড়িয়ে আছে,কিন্তু তাদের আলো কেমন ফ্যাকাশে,হলদেটে,অসুস্থ। সেই আলো কুয়াশার পাতলা চাদরে আটকে গিয়ে রাস্তার উপর ছড়িয়ে পড়েছে ছোপ ছোপ ছায়া।
রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা। না কোনো গাড়ির শব্দ, না মানুষের হাঁটার আওয়াজ। শুধু দূরে কোথাও কুকুরের দীর্ঘ, টানা ডাক __যেটা শুনলে মনে হয় অন্ধকারে কেউ উত্তর দিচ্ছে।
আমির গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসল। দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে "ঠাস" শব্দটা অদ্ভুদ রকমের জোরে প্রতিধ্বনি হলো, যেন পুরো শূন্য রাস্তা সেই শব্দ গিলে নিয়ে আবার ফেরত দিলো। ইঞ্জিন স্টার্ট সামনে হেডলাইটের আলো সরু দুইটা ধারালো রেখার মতো অন্ধকার কেটে এগিয়ে গেলো।কিন্তু সেই আলোতেও সবকিছু স্পষ্ট নই --- বরং মনে হয় আলো যতদূর যায় অন্ধকার ঠিক ততটাই ঘন হয়ে পিছন থেকে ঘিরে ধরছে।
গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তায় নামলো। চাকা ঘোরার শব্দটাও কেমন অস্বাভাবিক লাগছে, খালি জায়গায় সে শব্দও যেন আরোও বড়, আরোও ভারি। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, কিন্তু সেই ঠান্ডায় একটা স্যাতস্যাতে গন্ধ--- পুরনো ধুলা, ভেজা মাটি আর অচেনা কিছু একটা মিশে আছে।
হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা ছায়া নড়ল মনে হলো।আমিরের হাত স্টিয়ারিংয়ে কেঁপে উঠল। ভালো করে তাকিয়ে দেখে কিছু নেই।শুধু বাতাসে দুলছে একটি শুকতো গাছের ঢাল।তবুও বুকের ভেতর কেমন ধুকধুকানি শুরু হলো। মনে হলো এই ফাঁকা রাস্তাটা আসলে ফাঁকা নই। কোথাও কেউ আছে,দেখছে,অপেক্ষা করছে।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগোচ্ছিলো। হেডলাইটের আলো অন্ধকার চিরে সামনের পথটুকু কষ্টে স্পষ্ট করে দিচ্ছিলো। হঠাৎ সেই আলোর ভিতর একটা অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠলো। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ।
আমিরের কপাল কুঁচকে গেলো।
"এতো রাতে,,এই ফাঁকা রাস্তায় "।
অবয়বটা দু হাত তুলে ইশারা করছে গাড়ি থামানোর অনুরোধ। মুহুর্তেই আমিরের বুকের ভেতর অস্বস্তি জমাট বাঁধলো। এই সময়, এই জায়গায় কারো থাকার কথা নই। মাথার ভেতর সতর্কতার ঘন্টা বেজে উঠলো।সে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরল, গতি না কমিয়ে পাশ কেটে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
ঠিক তখনই-----
অন্ধকার কেটে ভেসে এলো এক নারীকণ্ঠ
"হ্যাল্প,,,,,হ্যাল্প,,,,,"
কন্ঠটা তীক্ষ্ণ নই,ভাঙ্গা নই --বরং কেমন করুন, কাঁপা কাঁপা। যেন ভয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শেষ ভরশা দিয়ে ডাকছে।
আমিরের পা নিজে থেকেই ব্রেকে চেপে ধরলো।গাড়ি ধীরে ধীরে থেমে গেল।ইঞ্জিন চালু, হেডলাইট জ্বলছে। কিন্তু সে দরজা খুললো না।কাঁচের ওপার থেকে তাকিয়ে রইলো।
অন্ধকারের ভিতর থেকে তরুণীটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। তার চুল এলোমেলো,গায়ে হালকা রঙের পোশাক,যেটা রাতের আলোয় প্রায় ফ্যাকশে সাদা মনে হচ্ছে। হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু কেমন অদ্ভুত এক স্থিরতা।
সে এসে গাড়ির জানালার সামনে দাঁড়ালো। হেডলাইটের আলো তার মুখে পড়ে এক অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে আভা তৈরি করলো।চোখ দুটো বড়,গভীর। তবে সেই গভীরতায় যেন কোনো উষ্ণতা নেই।
সে কোমল সুরে বলল,"আমাকে একটু সাহায্য করবেন? জানি রাত অনেক...... আপনাকে বিরক্ত করতে চাইছি না। কিন্তু রাস্তা পুরো ফাঁকা... কেমন যেন ভয় লাগছে। যদি সামনে আমার বাড়ির পাশ দিয়ে নামিয়ে দিতেন,,তাহলে খুবই উপকার হতো"
তার কন্ঠে বিনয়ের ছোঁয়া, কিন্তু শব্দগুলো কেমন যেন বাতাসে ভেসে না থেকে সরাসরি আমিরের কানে এসে আঘাত করলো। চারপাশে আবার সেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো, অস্বাভাবিক, চাপা।
দূরে কোথাও বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ হলো।রাতটা হঠাৎ করেই আরও গভীর হয়ে উঠলো।
কিছুক্ষণ দ্বীধায় থাকার পর মানবতার খাতিরে দরজা খুলে দিলো।
চলবে,,,,,,