পর্ব ০৭
মায়া ধীরে দাঁড়িয়ে দুজনের দিকে তাকালো।তার চোখে এবার অদ্ভুত কোমল দীপ্তি।ঠোঁটে শান্ত, প্রায় স্বাভাবিক একটুখানি হাসি।ঘরের বাতাস ভারী নয়, অস্বাভাবিক শান্ত।সে একধাপ এগিয়ে আমিরের সামনে থামলো।
“মূল্য জানতে চেয়েছিলে, মনে আছে?”
কণ্ঠে কোনো ফিসফিস নেই, স্বচ্ছ স্বর।অভ্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সতর্কভাবে।আমিরের বুকের ভেতর কাঁপন উঠলো আবার।মায়া ধীরে হাত বাড়িয়ে বললো নরমভাবে।
“মূল্য খুব কঠিন কিছু নয় আমির।”
তার আঙুল হালকা ছুঁয়ে গেলো আমিরের হাত।স্পর্শ উষ্ণ, কাঁপা, একদম মানবিক অনুভূতি। আমির শ্বাস নিতে ভুলে গেলো মুহূর্তে।মায়া চোখ নামিয়ে আবার তুললো ধীরে।
“আমাকে বিয়ে করবে তুমি, আমির।”
কথাটা এত স্বাভাবিকভাবে উচ্চারিত হলো যে, ঘরের ভেতর নীরবতা জমাট বেঁধে রইলো।
অভ্র বিস্ময়ে প্রায় পিছিয়ে গেলো।
“কি বললে তুমি?” কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলো।
মায়া শান্ত মুখে তাকিয়ে রইলো।
“এটাই আমার শর্ত, একমাত্র মূল্য।”
তার চোখে অনুরোধ নয়, দৃঢ়তা স্পষ্ট।আমির অনুভব করলো বুক ভারী হয়ে উঠছে।ভয়ের সাথে অদ্ভুত টান জন্ম নিচ্ছে।
মায়া মৃদু হেসে চারদিকে তাকালো।
“ভয় পেও না তোমরা কেউ।”
সে ধীরে হাত তুলে দেয়াল ছুঁলো।
“এটা মায়া ভিলা, এই বাড়ি আমার।”
কণ্ঠে অদ্ভুত গর্বের সুর ভেসে উঠলো।
“এই বাড়ির প্রতিটি কোণে শুধু আমি।”
তার কথায় প্রতিধ্বনি হলো নিঃশব্দে।
অভ্র গলা শক্ত করে প্রশ্ন করলো।
“তোমার পরিবার কোথায় এখন?”
মায়ার চোখের ভেতর ছায়া নেমে এলো।ঠোঁটের হাসি ধীরে মিলিয়ে গেলো।
“তারা নেই, সবাই মারা গেছে।”
কথাগুলো অস্বাভাবিক শান্ত স্বরে বলা।ঘরের বাতাস আবার একটু ঠাণ্ডা হলো।অভ্র বিরক্ত স্বরে বললো দৃঢ়ভাবে।
“এভাবে রহস্য করে কথা বলো কেনো?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অস্বস্তির ছাপ।
“আমরা ভয় পাচ্ছি তোমার আচরণে।”
মায়া মাথা কাত করে তাকালো ধীরে।
“ভয় তো তোমাদের মনেই থাকে।”
তার চোখ এবার সরাসরি আমিরের দিকে।আমির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো স্তব্ধ।সে বুঝতে পারছে না কি অনুভব করছে।ভয়, কৌতূহল, নাকি গভীর মায়া।মায়ার চোখে জল চিকচিক করলো ক্ষীণ।
“আমি একা, অনেকদিন ধরে একা।”
কণ্ঠে এবার মানুষের ক্লান্তি স্পষ্ট।আমিরের বুকের ভেতর ব্যথা জাগলো।সে অজান্তেই এক পা এগিয়ে গেলো।অভ্র অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইলো দুজনের দিকে।
“তুমি কি বুঝছো সে কি বলছে?”
অভ্রর প্রশ্ন বাতাসে ঝুলে রইলো।মায়া ধীরে আমিরের হাত ধরলো আবার।স্পর্শ এবার আরো দৃঢ়, উষ্ণ, জীবন্ত।
“তুমি থাকলে কেউ হারাবে না।”
তার কণ্ঠে অদ্ভুত নিশ্চয়তার সুর।
“আমি কাউকে কষ্ট দেবো না আর।”
দেয়ালের ছায়াগুলো যেন স্থির হয়ে গেলো।ঘরের পরিবেশ প্রায় স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।মায়া আমিরের চোখে গভীরভাবে তাকালো।
“শুধু আমাকে ছেড়ে যেও না।”
তার কথায় কষ্টের ভার স্পষ্ট।আমিরের হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো।ভয়ের জায়গায় জন্ম নিলো করুণা।সে যেন তাকে রক্ষা করতে চায়।অভ্র হাত বাড়িয়ে আমিরকে টানলো।
“ভাবিস না, এটা স্বাভাবিক নয়।”
কিন্তু আমির শুনছে না পুরোপুরি।তার চোখে এখন কেবল মায়ার প্রতিচ্ছবি।মায়া ধীরে মাথা নামিয়ে দাঁড়ালো।
“উত্তর আজ দাও, সময় কম।”
বাতাসে আবার হালকা ফুলের গন্ধ।দূরে কোথাও অদৃশ্য দরজা বন্ধ হলো।ঘরের আলো স্থির হয়ে জ্বলছে নীরবে।মায়া আবার নরম হাসি হাসলো।
“ভয় পেও না, আমি মানুষই।”
কথাগুলো এত বিশ্বাসযোগ্য শোনালো।
আমিরের ঠোঁট কাঁপছে উত্তর দেওয়ার আগে।অভ্রর চোখে বাড়ছে গভীর শঙ্কা।মুহূর্তটি ঝুলে রইলো নিস্তব্ধতায়।রাত যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।আমির নীরবতা ভেঙ্গে বললো, "তুমি হঠাৎ আমাকে
বিয়ে করতে চাও কেন??"
মায়া হাসলো-অদ্ভুদ লাগলো হাসি টা আমিরের কাছে, কোনো উত্তর দিলো না মায়া,আমির আবার প্রশ্ন করলো,"তুমি কে তোমার আসল পরিচয় কি?"
মায়া হেসে বললো," হঠাৎ আমার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হওয়ার কারন কি? "
আমির সাথে সাথে বলে উঠলো, "তোমার চোখ আমার বড্ড পরিচিত, প্রথম দিন দেখা হওয়ার পর থেকেই আমি অনেক ভেবেছি তোমার চোখ আমার এতো পরিচিত লাগলো কেনো,পরে ভেবে দেখলাম,
অভ্র সাথে সাথে আমিরকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো," উল্টা পাল্টা কথা বলবি না।"
এমন অবস্থা দেখে মায়া হাসলো।
আমির কৌতূহল নিয়ে বলল," তুমি ভীষণ রহস্যময় কন্যা মায়া,,মায়া আবারো হাসলো,
আমির মায়ার হাসি দেখে বললো,"তোমার হাসি রহস্যজনক।"
অভ্র আমিরের দিকে তাকিয়ে বললো," কি বলছিস
এসব,কি হইলো আবার তোর,, "
মায়া বলবো,' আমিরের কিছু হয়নি,আমার মায়ায় পড়ে এসব বলছে।"
অভ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,"আমিরের মেয়ের অভাব নাকি যে তোমার মায়ায় পড়বে,,"
মায়া হেসে বললো,"আমি মায়া,আমার মায়ায় সবাই পড়তে বাধ্য সবাই।"
অভ্র হেসে বললো," থাক থাক ভালোই জোকস শোনালে,আমি তো পড়লাম না, তোমার মায়ায়।"
মায়া হেঁসে বলল," আমি চাইনি তাই পড়ে নি?"
অভৃর কথার অর্থ বুঝতে পারলো না।
তখন ই আমির বলে উঠলো,"আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি।"
অভ্র অবাক হয়ে বলল," কি বলছিস এসব,আমার কথার জবাব দে,, "
আমির অভ্রের দিকে তাকিয়ে বললো," আমি মায়ার মায়ায় পড়ে গেছি,তারে না বিয়ে করলে,জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।"
অত্র রেগে বলল," যারে চিনিস না জানিস না,তাকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে গেলি কেনো,তোর হাব ভাব আমার ভালো ঠেকতেছে না আমির,,
আমির অভ্রের কথার জবাব দিলো না।মায়া হাসলো।অভ্র ভীষণ বিরক্তবোধ করলো,,
আমিরকে টানা শুরু করলো,আর বলতে থাকলো," আমির চল,দ্রুত
এখানে থাকলেই বিপদ। "
মায়া পিছন থেকে হাসতে শুরু করলো,অভ্র আমিরকে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসলো।অভ্র আমিরকে বাইরে এনে বার বার ঝাকালো জোরে জোরে। আর বলল,"আরে কি হয়েছে কথা বল।"
আমির ফ্লুট করে বাড়ির বাইরের রাস্তার মাঝ খানে বসে বললো,"আমি এসে গেছি,আমার মায়ার টানে এসেছি।"
অভ্র অবাক হয়ে গেলো আমিরের কথায়,
অত্রঃ" কি বলছিস এসব, তোর কথা কিছু বুঝলাম না,কি হয়েছে তোর কথা বল।"
আমির চোখ তুলে তাকালো অভ্রের দিকে। আমিরের চোখ দেখে অভ্রের শরীর কেঁপে উঠলো।
অভ্র পিছিয়ে গেলো, চোখ সরাতে পারলো না।আমিরের চোখে অদ্ভুত নীলচে আভা জ্বলছিলো।সে ধীরে হাসলো, কিন্তু কণ্ঠ অচেনা।
“আমি ঠিক আছি,” বললো অস্বাভাবিক শান্তভাবে।
অভ্রর বুকের ভেতর ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেলো।রাস্তার বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।দূরে কুকুরগুলো অকারণে চিৎকার শুরু করলো।আকাশে মেঘ জমলো চাঁদ ঢেকে গেলো।মায়া ভিলার জানালায় আলো জ্বলে উঠলো।উপরতলার পর্দা নড়ে উঠলো নিঃশব্দ বাতাসে।অভ্র কাঁপা গলায় ডাকলো আমিরকে আবার ডাকলো।আমির ধীরে মাথা কাত করলো অস্বাভাবিকভাবে। তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছিলো বাড়ির ছায়া।
“সে একা নয়,” ফিসফিস করে বললো আমির।
অভ্র বুঝলো কথাটা তার উদ্দেশ্যে নয়।মায়ার হাসি ভেসে এলো বাতাস চিরে। বাড়ির দরজা নিজে থেকেই খুলে গেলো।ভেতর থেকে ফুলের গন্ধ তীব্র হয়ে উঠলো।আমির উঠে দাঁড়ালো ধীরে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে।
অভ্র হাত চেপে ধরলো শক্ত করে।
“ফিরে চল,” অনুনয় করলো আতঙ্কিত অত্র।
আমির ধীরে হাত ছাড়িয়ে নিলো নিঃশব্দে।
“আমার ঘর ওখানে,” বললো স্থির কণ্ঠে।
অভ্র স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো অবিশ্বাসে।বাড়ির ছায়া যেন লম্বা হয়ে এলো।
রাস্তার আলো একে একে নিভে গেলো।মাটির নিচে হালকা কম্পন অনুভূত হলো।অভ্রর শরীর অবশ হয়ে এলো ধীরে।মায়ার অবয়ব দরজায় স্পষ্ট দেখা গেলো।সে হাত বাড়িয়ে আমিরকে ডাকলো নরমভাবে।আমির পা বাড়ালো অদ্ভুত আকর্ষণে বাঁধা।অভ্র চিৎকার করলো কিন্তু শব্দ বেরোল না।সময় যেন ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছিলো।হঠাৎ আমির থেমে পিছনে তাকালো।তার চোখে ক্ষণিক মানবিকতা ঝিলিক দিলো।
“আমাকে থামা,” ফিসফিস করলো কষ্টভরা স্বরে।
মায়ার মুখে হাসি মিলিয়ে গেলো ধীরে।বাতাস হঠাৎ তীক্ষ্ণ শীতল হয়ে উঠলো।জানালার কাঁচ ফেটে গেলো শব্দহীনভাবে।আকাশ চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠলো আকস্মিকভাবে।
পরের মুহূর্তে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলো।অভ্র নিজেকে একা দাঁড়িয়ে পেলো।রাস্তা ফাঁকা, বাড়ি নেই কোথাও।মায়া ভিলা যেন কখনো ছিলো না।মাটিতে পড়ে আছে আমিরের ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে আটটা পঁয়তাল্লিশে।অভ্র কাঁপা হাতে তুলে নিলো ঘড়িটি।পেছন থেকে ফিসফিস শব্দ ভেসে এলো।
“মূল্য এখনো পরিশোধ হয়নি,” কণ্ঠ পরিচিত।
অভ্র ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো আতঙ্কে জমে।তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমির।কিন্তু তার চোখ সম্পূর্ণ কালো।ঠোঁটে মায়ার সেই একই রহস্যময় হাসি।অভ্র বুঝলো সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।সিঁড়ির অন্ধকার হঠাৎ আরও গভীর হয়ে উঠলো।ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো নিচ থেকে।অভ্র স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো আতঙ্কে।আমিরের চোখে আবার অদ্ভুত ঝিলিক।হঠাৎ পেছনের বাতি নিভে গেলো সম্পূর্ণ।চারপাশ গ্রাস করলো ঘন কালো অন্ধকার।সেই অন্ধকারেই ভেসে এলো ধীর কণ্ঠ।
“অবশেষে তোমরা দরজায় পৌঁছেছো আজ।”
কণ্ঠ পুরুষের, কিন্তু অস্বাভাবিক শান্ত।অভ্রর বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো তীব্রভাবে।সিঁড়ির নিচে ছায়া নড়লো ধীরে।কালো পোশাকে আবৃত এক অবয়ব উঠলো।মুখ দেখা যাচ্ছে না স্পষ্ট আলোহীনতায়।শুধু চোখ দুটি ঠাণ্ডা স্থির জ্বলছে।সে থামলো শেষ ধাপের কাছাকাছি এসে। আমির অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেলো হঠাৎ।অভ্র ফিসফিস করে বললো, “তুমি কে?”
অবয়ব হালকা মাথা কাত করলো নীরবে।
“আমি শুধু দর্শক নই,” বললো স্থির স্বরে।
“খেলার পরিচালক আমিই বরং।”
বাতাসে আবার পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।
-চলবে,,,,,,,,