স্যার কে ক্লাস চলাকালীন প্রপোজ করেছি বলে ক্লাসে সবার সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে তিতলি কে। শুধু স্যার বললে ভুল হবে তিতলির আমার হবু বর।
যার নাম আহিয়ান খান আর্য। তিতলির মায়ের শৈশবের অন্তরঙ্গ বান্ধবীর একমাত্র ছেলে। গত শুক্রবার দুই পরিবারের সম্মতিতে অত্যন্ত ঘরোয়া আয়োজনে সম্পন্ন হয়েছে তাদের আংটি বদলের আনুষ্ঠানিকতা। সেই মুহূর্তে তিতলির মনে হয়েছিল, তার জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে মানুষটির সঙ্গে সারাজীবন একসঙ্গে পথচলার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে, সেই মানুষটিই যেন তাকে সম্পূর্ণ অচেনা ভেবে এড়িয়ে চলেছে। আংটি বদলের পর থেকে আহিয়ান একবারের জন্যও তিতলিকে ফোন করেনি। এমনকি প্রতিদিন একই কলেজে দেখা হলেও তার আচরণ এতটাই নির্লিপ্ত যে, মনে হয় তিতলি নামে কোনো মেয়ের অস্তিত্বই তার কাছে নেই। ক্লাসে তিনি কেবল একজন টিচার, আর তিতলি সবার মতোই একজন সাধারণ স্টুডেন্ট এর বাইরে যেন তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই।
কিন্তু তিতলির পক্ষে বিষয়টি এত সহজ ছিল না। প্রতিটি মুহূর্তে সে অজান্তেই আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কখনো করিডোরে অকারণে ঘুরে বেড়াত, কখনো টিচার্স রুমের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকত, শুধুমাত্র একবার তার দৃষ্টি নিজের দিকে ফেরানোর আশায়। সেই অস্বাভাবিক পরিবর্তনটি খুব দ্রুতই নজরে পড়ে তিতলির একমাত্র প্রিয় বন্ধু সাথীর। সাথী শুধু বন্ধু নয়, তিতলির সুখ-দুঃখ, অভিমান, হাসি-কান্না সবকিছুরই একমাত্র সাক্ষী। তিতলি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না, যা সাথী জানে না। তাই তিতলি বাধ্য হয়ে আজকে জানিয়েছে ওর সাথে আহিয়ান স্যারের আংটি বদল হয়েছে। কিন্তু সাথী তা বিশ্বাস করে নি। উল্টো বলেছে,
—“অসম্ভব! তুই আমাকে না জানিয়ে আংটি বদল করবি? এটা আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করবো না।”
সাথীর অবিশ্বাস তিতলির আত্মসম্মানে অদৃশ্য এক আঘাত হানে। সে যতই সত্যি প্রুভ করার চেষ্টা করে, সাথী ততই বিষয়টিকে কল্পকাহিনি ভেবে উড়িয়ে দেয়। আর সেই মুহূর্তেই তিতলির মনে এক প্রবল জেদের জন্ম হয়। সে ঠিক করে, প্রুভ করবেই। প্রুভ করবে, আহিয়ান খান আর্য শুধুই তার টিচার না! তিনি তার হবু স্বামীও।”
সেই জেদের বশবর্তী হয়েই আহিয়ান ক্লাসে প্রবেশ করামাত্র সমগ্র পুরো ক্লাসমেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে প্রপোজ করে ফেললো।
ফলাফল?
গোটা ক্লাসের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা।
তিতলির এখন নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হচ্ছে। কেন সে এমন একটা বোকামি করল? কেন সবার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষটাকে প্রপোজ করতে গেল? মুহূর্তের জেদ যে এত বড় অপমান ডেকে আনবে, তা একবারের জন্যও ভাবেনি সে। এখন মনে হচ্ছে, সময়টাকে যদি আরেকবার ফিরিয়ে আনা যেত, তাহলে হয়তো নিজের জিভটাই কামড়ে চুপ করে থাকত। চোখ দুটো জ্বালাপোড়া করছে। কান্না বারংবার গলা পর্যন্ত এসে আটকে যাচ্ছে। তবু সে কাঁদছে না অন্তত শব্দ করে নয়। মাথা নিচু করে দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর নিঃশব্দে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুবিন্দুগুলো। তিতলি পড়াশোনায় বরাবরই মেধাবী। দুষ্টুমি সে কম করে না, তবে সেই দুষ্টুমি কখনোই সীমা অতিক্রম করে না। শিক্ষকদের কাছেও তার পরিচয় একজন ভদ্র, প্রাণবন্ত এবং মেধাবী ছাত্রী হিসেবেই। আজ পর্যন্ত কোনো শিক্ষক তাকে শাস্তি দেননি, পুরো ক্লাসের সামনে কান ধরে দাঁড় করানো তো দূরের কথা। জীবনে এই প্রথম তাকে এমন অপমানের স্বাদ নিতে হচ্ছে। আর সেই শাস্তিটা দিয়েছে এমন একজন মানুষ, যার নামের সঙ্গে তিতলির ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
আহিয়ান খান আর্য।
যেন কিছুই ঘটেনি এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে সে বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে গণিতের জটিল সূত্র ব্যাখ্যা করতে শুরু করলো। কণ্ঠে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য, চোখে কঠোরতার ছাপ। ক্লাসের প্রত্যেকটি স্টুডেন্ট মনোযোগ দিয়ে তার লেকচারা শুনছে। এমনিতেই আহিয়ান কে পুরো কলেজ ভয় পায়। সে অত্যন্ত রাগী, নিয়মানুবর্তী এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল একজন টিচার। তাঁর ক্লাসে সামান্য বিশৃঙ্খলাও কেউ করার সাহস পায় না।
আজকেও সে এমনভাবে পড়িয়ে চলেছে, যেন ক্লাসের এক কোণে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তিতলি নামের মেয়েটির অস্তিত্বই নেই।
একবারের জন্যও সে তার দিকে তাকালো না।
একবারও বললো না, “বসে পড়ো।” সেই অবহেলা টুকুই যেন শাস্তির চেয়েও বেশি কষ্ট দিচ্ছিল তিতলি কে। মাথা নত করে সে দাঁড়িয়েই রইল। অশ্রুগুলো নীরবে গাল বেয়ে ঝরে পড়ছে, কিন্তু সেগুলো মুছে ফেলারও অবকাশ নেই। পুরো ক্লাসের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে যেন এক একটি দীর্ঘ যুগের সমান মনে হচ্ছিল।
অবশেষে ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস শেষ হলো।
স্টুডেন্টরা ধীরে ধীরে নিজেদের খাতা-কলম গুছিয়ে নিতে শুরু করল। ঠিক তখনই আহিয়ান বোর্ড থেকে কলম নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখলো। অতঃপর কোনো দিকে না তাকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,
— “আমার সঙ্গে আসো, তিতলি। তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
কথাটুকু বলেই তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। দীর্ঘ পদক্ষেপে ক্লাসরুম ত্যাগ করলেন।
~~
আহিয়ানের শেষ কথাগুলো তিতলির কানে পৌঁছাতেই যেন জ্বলন্ত আগুনে এক মুঠো ঘি ঢেলে দেওয়া হলো। এতক্ষণের অপমান, অভিমান আর জমে থাকা ক্ষোভ মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে উঠল। বুকের ভেতর রাগে যেন তোলপাড় শুরু হয়েছে। “আমার সঙ্গে আসো, তিতলি। তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
গম্ভীর কণ্ঠের সেই নির্দেশ তিতলির কাছে আদেশ নয়, বরং নতুন করে অপমানেরই পূর্বাভাস মনে হলো। তিতলি আর এক মুহূর্ত ক্লাসে দাঁড়ালো না
দ্রুত নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এল। তার পায়ের শব্দেই যেন জমে থাকা অভিমানের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। ঠিক তার পেছন পেছন তাড়াহুড়ো করে নিজের ব্যাগ তুলে দৌড়ে বেরিয়ে এল সাথীও। করিডোরে এসে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে তিতলির পাশে গিয়ে হাঁটতে শুরু করল সে। ভুরু কুঁচকে কৌতূহলী স্বরে বলল,
— “কিরে দোস্ত! তোকে না স্যার এতক্ষণ শাস্তি দিল? আবার একা ডেকেও পাঠাল! ব্যাপারটা কী? সত্যিই কি স্যারের সঙ্গে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে? তাহলে তোকে সবার সামনে এমন শাস্তি দিল কেন?”
সাথীর প্রশ্নগুলো একটার পর একটা তীরের মতো এসে বিঁধতে লাগল তিতলির মনে। সে হঠাৎ থেমে সাথীর দিকে তাকাল। চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে আছে, অথচ সেই চোখেই এখন রাগের দহন স্পষ্ট।
চোয়াল শক্ত করে, দাঁত চেপে, প্রতিটি শব্দ যেন চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল,
— “সব তোর জন্য হয়েছে। আজ থেকে তুই আমার সঙ্গে কোনো কথা বলবি না। আর ওই লোকটার সঙ্গেও আমি একা দেখা করব না। এত রাগ হচ্ছে আমার... মনে হচ্ছে সামনে যা পাব, সবকিছু ভেঙে চুরমার করে ফেলি!”
কথাগুলো বলে আবার দ্রুত হাঁটতে শুরু করল সে।
সাথী অবশ্য তিতলির রাগ সম্পর্কে ভালোই জানে। এই মুহূর্তে প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে সেটাও বোঝে। তাই গম্ভীর পরিবেশটা হালকা করার উদ্দেশ্যে মুখভরা দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— “আচ্ছা ঠিক আছে, রাগ করিস না। চল, আজ তোকে আমি ফুচকা খাওয়াব। আমার তরফ থেকে ট্রিট। যত খুশি খাস, রাগ সব উধাও হয়ে যাবে।”
তিতলি একবারও তার দিকে তাকাল না। তারপর গম্ভীর, বিরক্ত কণ্ঠে শুধু বলল,
— “লাগবে না।”
একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করেই সে আরও দ্রুত পা বাড়াল। পিছনে পড়ে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সাথী চিৎকার করে উঠল,
— “আরে দোস্ত! আমাকে নিয়েও যা! এভাবে একা একা চলে যাচ্ছিস কেন?”
#এক_অবেলায়_তুমি_এলে
#পর্ব_১
#কলমে_তাসনিম_তালুকদার_বুশরা
হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫
চলবে....??