ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক অবেলায় তুমি এলে

২য় পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম তালুকদার বুশরা

#এক_অবেলায়_তুমি_এলে

#পর্ব_২

#কলমে_তাসনিম_তালুকদার_বুশরা

হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫

তিতলি তখনও রাগে ফুঁসছে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান যেন কোনোভাবেই কমার নাম নিচ্ছে না। দ্রুত পায়ে হেঁটে সে কলেজের বিশাল মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বটগাছ টির দিকে চলে গেল। দুপুরের নরম রোদে গাছটির ছায়া যেন পুরো প্রাঙ্গণটাকেই শীতল করে রেখেছে। অন্যদিকে সাথী এক মুহূর্তের জন্যও তাকে একা ছাড়ল না। প্রায় দৌড়ে এসে তিতলির হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তারপর বললো,

— “প্লিজ চল না, জান! ঝালমুড়ি খাই। দেখবি, সব রাগ একদম উড়ে যাবে।”

তিতলি বিরক্ত হয়ে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল,

— “বলেছি তো, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।”

কিন্তু সাথীও নাছোড়বান্দা। তিতলির কথা যেন তার কানে ঢুকলই না। একপ্রকার জোর করেই তাকে টেনে নিয়ে গেল কলেজ গেটের পাশে বহু বছরের পুরোনো সেই ঝালমুড়ির দোকানটিতে।

অগত্যা তিতলিও আর বাধা দিল না। মুখে অনীহা থাকলেও হাতে ধরা কাগজের ঠোঙা থেকে ধীরে ধীরে ঝালমুড়ি খেতে শুরু করল। সাথী মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করেই নানা হাস্যকর কথা বলছিল, শুধুমাত্র তার মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য।

এদিকে আহিয়ান নিজের কেবিনে এসে বসে তিতলির অপেক্ষা করছিল। কয়েক মিনিট কেটে গেল। তারপর আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু তিতলির আসার কোনো লক্ষণ নেই। আহিয়ানের ভ্রূ ধীরে ধীরে কুঁচকে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা কলমটি আঙুলের ফাঁকে ঘোরাতে ঘোরাতে দরজার দিকে একাধিকবার তাকাল। কোথায় গেল মেয়েটা? সে তো স্পষ্ট করেই বলেছিল আসতে। তবুও এল না!

মুহূর্তের মধ্যে বিরক্তি গিয়ে ঠেকল রাগে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই মেয়েটা কি তার কথা অমান্য করল? এটাই প্রথমবার সে তিতলিকে কোনো কথা বলেছে, আর সেই কথারই অবাধ্য হওয়ার সাহস দেখিয়েছে? আহিয়ান ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোখেমুখে কঠোরতার ছাপ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলাল। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো কলেজ মাঠের প্রাচীন বটগাছটির নিচে। সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে গল্প করতে করতে ঝালমুড়ি খাচ্ছে তিতলি আর সাথী। দৃশ্যটি দেখেই আহিয়ানের বুকের ভেতর জমে থাকা বিরক্তি যেন মুহূর্তে কয়েক গুণ বেড়ে গেল। একবার কপালের দু'পাশে আঙুল বুলিয়ে নিজের রাগ সংযত করার ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। তারপর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দৃঢ় পদক্ষেপে তাদের দিকেই হাঁটতে শুরু করল।

এদিকে সাথীর সঙ্গে গল্প করতে করতে তিতলির মনও কিছুটা হালকা হয়ে এসেছিল। কিছুক্ষণ আগের অপমানের দহন এখনও রয়ে গেছে, তবে সাথীর অবিরাম বকবকানিতে তার ঠোঁটের কোণেও ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল।

হঠাৎ তাদের সামনে এসে একটি দীর্ঘদেহী ছায়া থেমে দাঁড়াল।

দুজনেই একসঙ্গে মাথা তুলে তাকাল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আহিয়ান খান আর্য। সাথীর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল তার। কলেজের সবচেয়ে রাগী শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা যে মোটেও সুখকর নয়, তা সে ভালো করেই জানে।

অন্যদিকে তিতলিও আচমকা চমকে উঠল। মনে মনে ঠিক করেছিল, মানুষটার সামনে পড়লে এবার সে-ও রাগ দেখাবে। কিন্তু বাস্তবে চোখাচোখি হতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অকারণ ভয় দানা বাঁধল। মুখে কঠোর ভাব আনার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও তার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা অস্থিরতা আর সংকোচ কিছুতেই আড়াল করা গেল না।

আহিয়ান কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে দু'জনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তাঁর গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে মুহূর্তেই সাথীর বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। শীতল অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে তিনি বললো,

— “সাথী, তুমি ক্লাসে যাও। তিতলি একটু পর আসছে।”

কথাটুকু বলার ভঙ্গিতেই এমন দৃঢ়তা ছিল যে, প্রতিবাদ করার সাহস সাথীর হলো না। বরং যেন মুক্তির পথ পেয়ে গেল। তিতলি কিছু বলার আগেই সে অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— “আমি... আমি যাচ্ছি দোস্ত। পরে দেখা হবে।”

বলেই প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই বটগাছের নিচে নেমে এলো এক অস্বস্তিকর নীরবতা। হালকা বাতাসে শুকনো পাতাগুলো মাটিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। দূরে কলেজ মাঠে কয়েকজন শিক্ষার্থী গল্প করছে, অথচ তাদের দুজনের মাঝখানের নিস্তব্ধতা যেন চারপাশের সমস্ত শব্দকেও গ্রাস করে নিয়েছে। আহিয়ান ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে তিতলির সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর গভীর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল তিতলির মুখে। তারপর কঠিন, সংযত কণ্ঠে বললো,

— “এই অবাধ্য মেয়ে, আমি তোমাকে আমার কেবিনে যেতে বলেছিলাম। যাওনি কেন?”

তিতলি কোনো উত্তর দিল না। দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরল ঝালমুড়ির কাগজের ঠোঙাটা। মাথাটা আরও নিচু হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, একবার মুখ খুললেই হয়তো সব অভিমান অশ্রুর সঙ্গে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তার এই নীরবতাই যেন আহিয়ানের ধৈর্যের শেষ সীমাটুকুও ভেঙে দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে কয়েক মুহূর্ত নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করলো। তারপর আগের চেয়ে আরও গম্ভীর স্বরে বললো,

— “আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি। উত্তর দিচ্ছ না কেন? কলেজে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করবে না, তিতলি। এর পরিণতি তোমার জন্য মোটেও ভালো হবে না।”

এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলল তিতলি। চোখ দুটো এখনও কান্নায় লাল, অথচ সেই চোখের গভীরে স্পষ্ট জেদ আর অভিমান।সে সরাসরি আহিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু কাঁপা কণ্ঠে বলল,

— “কেন যাব আমি আপনার ডাকে?”

এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,

— “ক্লাসের সবার সামনে যেভাবে আমাকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন একবারও কি ভেবেছেন আমার কতটা লজ্জা লেগেছে? সবাই কীভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছিল?”

আহিয়ান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ ব্যঙ্গের রেখা ফুটিয়ে ধীর স্বরে বললো,

— “ওহ... তাই নাকি? মিসেস তিতলির আবার লজ্জাও আছে?”

তিতলি কথাটা শুনে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল,

— “থাকবে না কেন? আমারও সম্মান আছে, আত্মসম্মান আছে।”

আহিয়ান এক পা এগিয়ে এলেন। দৃষ্টি আরও গভীর করে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো,

— “তাহলে ক্লাসের সবার সামনে যখন আমাকে প্রপোজ করলে, তখন তোমার সেই লজ্জা কোথায় ছিলো?”

আহিয়ানের শেষ প্রশ্নটি যেন তিতলির সমস্ত সাহস এক মুহূর্তে নিঃশেষ করে দিল। মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল। এখন মনে হচ্ছে, তখকার সেই জেদ সবই ছিল নিছক এক মুহূর্তের আবেগ। রাগের বশেই তো সে এমন একটা কাজ করে বসেছিল। অথচ আজ সেই ঘটনার কথা মনে হতেই নিজের ওপরই অসহ্য রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে, সময়টাকে যদি ফিরিয়ে আনা যেত নিজের সেই বোকামির জন্য নিজেকেই যেন শাস্তি দিতে মন চাইছে।

তিতলির নীরবতা লক্ষ্য করে আহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখের কঠোরতা আগের মতোই অটুট থাকলেও কণ্ঠস্বর আগের তুলনায় খানিকটা সংযত। গম্ভীর স্বরে বলল,

— “শোনো, মেয়ে... আমি আমার প্রফেশনাল লাইফ আর পার্সোনাল লাইফ কখনোই এক করতে চাই না। বিষয়টা আমার একদমই পছন্দ নয়। কলেজে আমি তোমার শিক্ষক, আর এই পরিচয়টাই সবার আগে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে আমি আমার দায়িত্ব থেকে একচুলও সরে দাঁড়াতে পারব না।”

কিছুক্ষণ থেমে তিতলির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার বলল,

— “আমি তো জানি তুমি একজন মেধাবী ছাত্রী। শুধু ভালো পড়াশোনা করলেই একজন মানুষ পরিপূর্ণ হয় না। কোথায় কীভাবে আচরণ করতে হয়, কোন পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেই বোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবেগের বশে এমন কোনো কাজ করবে না, যাতে তোমার সম্মান কিংবা ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে।”

তার কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল,

— “আজ যা হয়েছে, সেটা আমি দ্বিতীয়বার দেখতে চাই না। ভবিষ্যতে এমন কিছু করলে শাস্তি পাবে। এটা মনে রাখবে।”

এক মুহূর্তের নীরবতার পর আহিয়ানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তিতলির হাতে ধরা ঝালমুড়ির ঠোঙার দিকে। ভ্রু সামান্য কুঁচকে বলল,

— “আর এখন ঝালমুড়ি খাচ্ছো কেন? এই সময় তো তোমাদের ক্লাস থাকার কথা। যাও, ক্লাসে যাও।”

তিতলি কোনো উত্তর দিল না। একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকাল না আহিয়ানের দিকে। বুকভরা পাহাড়সম অভিমান নিয়ে ধীর পায়ে সেখান থেকে হাঁটতে শুরু করল। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন তার মনের কষ্ট আরও ভারী হয়ে উঠছিল। আজ থেকে সে ঠিক করল লোকটার সঙ্গে আর অকারণে কোনো কথাই বলবে না। যে মানুষটা নিজের অনুভূতির চেয়ে নিয়মকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তার কাছে নিজের অভিমান প্রকাশ করেও কোনো লাভ নেই।

আহিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তিতলির দূরে চলে যাওয়া অবয়বের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চারপাশে কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে খুব আস্তে, নিজের সঙ্গেই যেন কথা বলল,

— “শোনো, অবাধ্য মেয়ে... আমাদের সম্পর্কটা গোপন রাখার চেষ্টা করছি শুধু তোমার ভালোর জন্য। এই কলেজে কেউ জানুক, সেটা আমি চাই না। মানুষের কথা, অকারণ অভিযোগ এসবের ভার তোমাকে বইতে হোক, তা আমি কখনোই চাইব না।”

তার ঠোঁটের কোণে একফোঁটা বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠল। খুব নিচু স্বরে আবার বিড়বিড় করে বলল,

— “তুমি এখনও অনেকটাই বাচ্চা তাই হয়তো আমার এই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কারণগুলো বুঝতে পারছ না। একদিন বুঝবে। নিশ্চয়ই বুঝবে.....!”

বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে তার শেষ কথাগুলো যেন মিলিয়ে গেল। দূরে হেঁটে যাওয়া তিতলি আর একবারের জন্যও ফিরে তাকাল না। আহিয়ান পুনরায় বিড়বিড় করে বললো,

#এক_অবেলায়_তুমি_এলে! আগে আসতে পারলে না??”

চলবে ইনশাআল্লাহ...!”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন