ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক অবেলায় তুমি এলে

৯ম পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম তালুকদার বুশরা

#এক_অবেলায়_তুমি_এলে

#পর্ব_৯

#কলমে_তাসনিম_তালুকদার_বুশরা

হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫

সেই ঘটনার পর নিঃশব্দেই কেটে গেল টানা তিনটি দিন। তিনটি দিন যার প্রতিটি মুহূর্ত যেন আহিয়ানের কাছে অসহনীয় দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। কলেজের ব্যস্ত করিডোর, শ্রেণিকক্ষের কোলাহল, শিক্ষার্থীদের আনাগোনা সবকিছুই আগের মতো ছিল। শুধু একটি মুখের অনুপস্থিতি যেন সমগ্র পরিবেশের রঙই বদলে দিয়েছিল।তিতলি কলেজে আসেনি। প্রথম দিন আহিয়ান ভেবেছিল, হয়তো শরীরটা খারাপ। দ্বিতীয় দিন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, হয়তো কোনো পারিবারিক কারণে আসতে পারেনি। কিন্তু তৃতীয় দিনেও যখন তিতলির কোনো দেখা মিলল না, তখন তার বুকের ভেতরে অজানা এক অস্থিরতা বাসা বাঁধতে শুরু করল। বাইরে থেকে যতই নিজেকে কঠোর দেখাক না কেন, অন্তরে জমে থাকা অপরাধবোধ তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছিল। অবশেষে নিজের অস্বস্তিকে আর উপেক্ষা করতে না পেরে সে সুযোগ বুঝে সাথীকে ডেকে দাঁড় করাল। সাথী প্রথমে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। কারণ গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো সে মোটামুটি জানত। তবুও আহিয়ানের প্রশ্নের উত্তরে শান্ত স্বরে বলল,

— “স্যার, সত্যি বলতে আমিও ঠিক জানি না। তিতলি কিছুই বলছে না। ও আমার ফোনও খুব একটা রিসিভ করছে না। কী হয়েছে, সেটাও আমাকে খুলে বলেনি।”

কথাগুলো শুনে আহিয়ানের মুখের গাম্ভীর্য আরও গভীর হয়ে উঠল। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না।

শুধু মৃদু স্বরে “আচ্ছা” বলে সেখান থেকে সরে গেল। নিজের কেবিনে ফিরে এসে চেয়ারে বসতেই এক অদ্ভুত ক্লান্তি তাকে গ্রাস করল। দুই হাতের আঙুল দিয়ে কপাল চেপে ধরে চোখ বন্ধ করল সে। মনের ভেতর বারবার ভেসে উঠতে লাগল সেই রাতের দৃশ্য তিতলির ভেজা চোখ...তার কাঁপতে থাকা কণ্ঠ...আর সেই অবাধ্য রাগের বশে নিজের হাত তুলে বসার মুহূর্তটি। স্মৃতিগুলো যেন তাকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে চলেছে। নিজেরই আচরণের কথা মনে হতেই গভীর অনুতাপ গ্রাস করল তাকে।

মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

“আমার ওভাবে করা উচিত হয়নি... একদমই উচিত হয়নি।”

কিন্তু এখন ক্ষমা চাইতে গেলেও সাহস পাচ্ছে না।

কোন মুখে যাবে ও? যে মেয়েটার চোখে সে একদিন নিরাপত্তার প্রতীক ছিল, সেই মেয়েটার চোখেই আজ সে আঘাতের কারণ। গত তিন দিনে বহুবার তিতলিকে ফোন করেছে আহিয়ান।প্রথমবার ফোন বেজেছে, কিন্তু ধরেনি। দ্বিতীয় বারও একই অবস্থা। তৃতীয়বার কল করতেই ফোনের ওপাশ ব্লক করে দিয়েছে। সে আর যোগাযোগ করতে পারবে না। মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। অদ্ভুত এক অসহায়ত্ব তাকে ঘিরে ধরল।

রাগ করে দূরে সরে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন সেই মানুষটির বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা আজ যেন সে বিষয়টি নির্মমভাবে উপলব্ধি করতে পারল আহিয়ান।

কেবিনের বড় কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল সে। আকাশে মেঘ জমেছে।ঠিক তার মনের মতোই ভারী, নীরব, আর অনুশোচনায় আচ্ছন্ন।

~~

বিকেলের শেষ প্রহর। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক চারটা স্পর্শ করেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে। কলেজের কাজ শেষ করে আহিয়ান সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে কয়েক রাতের নির্ঘুম অনুশোচনার ছায়া। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত একটি কণ্ঠ,

— “আহিয়ান, একটু শুনে যা।”

পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল, আজমীর খান তার দিকে এগিয়ে আসছেন। আহিয়ান থেমে শান্ত স্বরে বলল,

— “জি, আম্মু?”

আজমীর খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— “তুই কি জানিস, তিতলি নাকি বিদেশে পড়তে যেতে চাইছে?”

কথাটি শুনে আহিয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল,

— “বিদেশে?”

— “হ্যাঁ। দুপুরে ওর মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। উনি বললেন, তিতলি নাকি গত তিন দিন ধরে একরকম জেদ ধরেই বসে আছে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করবে। সেই কারণেই নাকি কলেজেও যাচ্ছে না। আমি বললাম, বিয়েটা আগে হোক, তারপর না হয় উচ্চশিক্ষার জন্য যাক। কিন্তু শুনলাম, মেয়েটা নিজের সিদ্ধান্তেই অটল।”

প্রতিটি শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো এসে আঘাত করল আহিয়ানের মনে। বিদেশ...! শব্দটি বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল তার কানে। তার বুকের ভেতর হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো। যেন মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত পৃথিবী তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। “তিতলি চলে যাবে?” “এত দূরে?” “আমাকে ছেড়ে?” ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে।প্রায় দৌড়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে আজমীর খান কয়েকবার ডাকলেন,

— “আহিয়ান! কোথায় যাচ্ছিস?”

কিন্তু আহিয়ানের কানে যেন কোনো শব্দই পৌঁছাল না। গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে এক ঝটকায় স্টার্ট দিল সে। ইঞ্জিনের গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের অস্থিরতাও যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল।

রাস্তা জুড়ে ছুটতে ছুটতে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—“এই মেয়েটা সত্যিই চলে যাবে?” “আমাকে কিছু না বলেই?”“এত সহজে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দিতে পারবে?” স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে সে গতি আরও বাড়িয়ে দিল। মনের ভেতর অনুশোচনা, ভয়, অস্থিরতা সবকিছু একাকার হয়ে গেছে।কিছুক্ষণ পর বাইক এসে থামল শেখ বাড়ির সামনে। এক মুহূর্ত দেরি না করে গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করল আহিয়ান।ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো বাগানের এক কোণে। তিতলি। হালকা রঙের একটি সাদামাটা পোশাক পরে সে নিঃশব্দে ফুলগাছে পানি দিচ্ছে। বিকেলের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে। বাতাসে উড়ে আসা কয়েকটি চুল বারবার মুখের ওপর পড়ছে, আর সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে সেগুলো কানের পাশে সরিয়ে নিচ্ছে।দৃশ্যটি দেখে আহিয়ান থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়েই রইল। মনে হলো, কত যুগ পর সে তিতলিকে দেখছে। গত কয়েক দিনের অদেখা, না-বলা, না-পাওয়া সমস্ত আকুলতা যেন এক দৃষ্টিতেই মিটিয়ে নিতে চাইছে সে। তার চোখে তখন কোনো রাগ নেই, নেই কোনো অহংকার শুধু গভীর আকুলতা আর অপরাধবোধ।

এদিকে তিতলি নিজের কাজেই ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ বাতাসে ভেসে এলো এক চেনা পারফিউমের সুবাস। সেই গন্ধটি তার অচেনা নয়। হাতের ঝাঁঝরিটি থামিয়ে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাতেই চোখে পড়ল আহিয়ানকে। মাত্র এক পলকের জন্য তাদের দৃষ্টি এক হলো। পরক্ষণেই তিতলি নির্বিকার ভঙ্গিতে চোখ ফিরিয়ে নিল। মনে হলো, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির অস্তিত্বই তার কাছে অর্থহীন। সে আবার আগের মতোই ফুলগাছে পানি দিতে শুরু করল। এই নিঃশব্দ উপেক্ষা আহিয়ানের বুকের ভেতর ছুরির ফলার মতো বিঁধল। তবুও সে নিজের অনুভূতিকে সংযত করল। ধীরে ধীরে কয়েক কদম এগিয়ে তিতলির সামনে এসে দাঁড়াল। কণ্ঠে ক্লান্তি, উদ্বেগ আর চাপা ব্যাকুলতার মিশ্রণ নিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

— “শুনলাম... তুমি নাকি বিদেশে পড়তে যেতে চাও?”

তিতলি কোনো উত্তর দিল না। শুধু গাছের গোড়ায় ধীরে ধীরে পানি ঢেলে যেতে লাগল। আহিয়ান একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তারপর আরও নিচু স্বরে বলল,

— “আমাকে... একবারও জানানো প্রয়োজন মনে করলে না?”

তিতলি একবারও আহিয়ানের দিকে তাকাল না।

হাতে ধরা ঝাঁঝরিটি থেকে ধীরে ধীরে ফুলগাছের গোড়ায় পানি ঢেলে যেতে লাগল। যেন তার সমস্ত মনোযোগ সেই ছোট্ট বাগানটুকুতেই সীমাবদ্ধ। অথচ বুকের ভেতরটা যে কী প্রবল ঝড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছে, তার সামান্যতম প্রকাশও মুখে ফুটে উঠতে দিল না সে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু বরফশীতল কণ্ঠে বলল,

— “আজব! আপনি কে?”

প্রশ্নটি শুনে আহিয়ান যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

তিতলি আবার বলল,

— “আমি কোথায় যাব, কী করব, কোথায় পড়তে যাব সেসব আপনাকে জানাতে হবে কেন? আর একটা কথা মনে রাখবেন... আপনার সম্মানের কথা ভেবেই আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বলিনি যে আপনি আমার গায়ে হাত তুলেছিলেন। কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি, এই কথাটা যদি বাড়ির মানুষ জানতে পারে, তাহলে এক মিনিটও লাগবে না আমাদের বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে যেতে।তবে সত্যি বলতে কী... সেই সম্পর্কটা ভেঙে গেলে আমারও কোনো আপত্তি নেই।

আহিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তিতলি ধীরে ধীরে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। চোখদুটি লাল, কিন্তু সেখানে কান্নার চেয়ে আত্মসম্মানের দীপ্তিই বেশি স্পষ্ট,

— “আপনিই সবাইকে বলে দেবেন যে এই বিয়েতে আপনার মত নেই। কারণ সত্যিটা তো সেটাই, তাই না?”

সে তিক্ত হেসে বলল,

— “আপনি কোনোদিন আমাকে নিজের ইচ্ছায় একসেপ্ট করেননি। শুধুমাত্র আপনার মায়ের ইচ্ছার সম্মান রাখতেই আমাকে নিজের জীবনে স্থান দিতে চেয়েছিলেন। এখন আমি নিজেই সরে যেতে চাইছি। আশা করি এতে অন্তত আপনি স্বস্তি পাবেন।”

বিকেলের বাতাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল যেন। তিতলির প্রতিটি শব্দ নিঃশব্দ অস্ত্রের মতো বিদ্ধ করছিল আহিয়ানকে। সে আবার বলল,

— “হয়তো আপনি আমাকে তাদের মতোই ভেবেছেন, যাদের আত্মসম্মান বলে কিছু নেই। কিন্তু আপনার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি। তিতলি শেখের আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত প্রবল। হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে আমি শিশুসুলভ আচরণ করেছি। কারণ আমি ভেবেছিলাম, আপনি আমার ফিউচার হাসব্যান্ড হবেন। আপনার সামনে নিজেকে বারবার মেপে মেপে চলতে হবে না। অভিমান করব, রাগ দেখাব, আবার নিজের মতো করেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

তার ঠোঁটে ফুটে উঠল বিষাদমাখা এক হাসি"

— “কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। খুব বড় ভুল। আমি বুঝে গেছি, আপনার কাছে সবার আগে আপনার শিক্ষকসত্তা, আপনার আদর্শ, আপনার নিয়ম। সেখানে আমার অনুভূতির কোনো স্থান নেই।”

চারপাশে নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হলো।

তিতলি শান্ত গলায় বলল,

— “তাই আর কোনো জটিলতার প্রয়োজন নেই। বিয়েটা না হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমি নিজেই আম্মুকে সব বুঝিয়ে বলব। তারপর বিদেশে চলে যাব। একবার চলে গেলে আর এই দেশে ফেরারও কোনো ইচ্ছে থাকবে না।”

শেষ কথাগুলো বলতে বলতে তার গলায় আবারও কান্না জমে উঠল। কিন্তু সে কোনোভাবেই চোখের জল গড়িয়ে পড়তে দিল না। আহিয়ানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,

— “আপনি আপনার আদর্শ, আপনার শিক্ষা আর আপনার নিয়ম নিয়েই থাকুন। আর আমি না হয় আপনার ভাষায় সেই অবাধ্য, বেয়াদব, অসভ্য মেয়েটাই হয়ে রইলাম।”

কথাগুলো শেষ করেই তিতলি আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। ঝাঁঝরির সরু মুখ দিয়ে টুপটাপ করে পানি পড়তে লাগল ফুলগাছের গোড়ায়। পাতার গায়ে জমে থাকা জলের বিন্দুগুলো বিকেলের শেষ আলোয় ক্ষণিকের জন্য মুক্তোর মতো ঝলমল করে উঠছিল। চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এলো, যেন প্রকৃতিও দু'জন মানুষের ভাঙতে বসা সম্পর্কের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আর আহিয়ান...সে ঠিক আগের জায়গাতেই নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, তিতলির প্রতিটি বাক্য কোনো সাধারণ অভিযোগ নয় বরং তার নিজের ভুলের নির্মম প্রতিফলন। প্রতিটি শব্দ নিঃশব্দে এসে আঘাত করছিল তার বিবেককে। এতদিন ধরে নিজের অহংকার আর কঠোরতার আড়ালে যে মানুষটি অনুভূতি লুকিয়ে রেখেছিল, আজ সেই মানুষটিই নিজের সামনে সম্পূর্ণ অসহায়। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর অবশেষে সে গভীর শ্বাস নিল। কণ্ঠস্বর আর আগের মতো দৃঢ় নেই। বরং তাতে স্পষ্ট ফুটে উঠল অনুতাপের ভার,

— “আমি... ভুল করেছি, তিতলি। আমি জানি, যা করেছি তার কোনো যুক্তি নেই। রাগের মাথায় নিজের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমাকে কি এই একবারের জন্য ক্ষমা করা যায় না?”

তিতলি কোনো উত্তর দিল না। সে আগের মতোই গাছের গোড়ায় পানি ঢালতে থাকল।

আহিয়ান আবার বলল,

— “আমি কথা দিচ্ছি... জীবনে আর কোনোদিন তোমার প্রতি এমন আচরণ করব না। কোনো পরিস্থিতিতেই তোমার গায়ে হাত তুলব না। শুধু... আমাকে এভাবে শাস্তি দিও না, প্লিজ।”

তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে আরও ভেঙে এলো,

— “বিদেশে যেও না...!”

এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে গিয়েই যেন তার সমস্ত আত্মসম্মান ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। প্রথম বারের মতো সে নিজের সমস্ত অহংকার সরিয়ে রেখে শুধুই একজন অনুতপ্ত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তিতলি ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। চোখে পানি নেই। বরং ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তীক্ষ্ণ, তাচ্ছিল্যমিশ্রিত এক হাসি তারপর স্বরটি অদ্ভুত শান্ত করে বললো,

— “কেনো? আপনার মায়ের জন্য এত কিছু?”

প্রশ্নটি শুনে আহিয়ান যেন ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। সে দ্রুত মাথা নাড়িয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো,

— “না... সেদিন আমি ভুল কথা বলেছিলাম। রাগের মাথায় এমন কিছু বলে ফেলেছিলাম, যা বলা উচিত ছিল না। বিশ্বাস করো, আর কখনোই এমন কথা বলব না।”

তিতলি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। সেই হাসিতে ছিল না আনন্দ, ছিল কেবল গভীর ক্লান্তি,

— “তার সুযোগ আর পাবেন না, মিস্টার আহিয়ান খান আর্য।”

মিস্টার সম্বোধনটি আহিয়ানের বুকের ভেতর তীব্র ব্যথার মতো বিঁধল। যে মেয়েটি একসময় তাকে আপন মানুষ ভেবে ডাকত, সেই মেয়েই আজ তার নামের আগে দূরত্বের দেয়াল তুলে দিয়েছে।আহিয়ান শেষবারের মতো তার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

— “আমাকে... আর একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”

তিতলির উত্তর এল এক নিঃশ্বাসে,

— “না।”

একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই একটি শব্দেই যেন অসংখ্য দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল। আহিয়ান আর কোনো কথা বলল না। ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। তার চোখেমুখে তখন স্পষ্ট অসহায়ত্ব, অনুশোচনা আর গভীর শূন্যতার ছাপ। কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে নিঃশব্দে ঘুরে দাঁড়াল সে। তার পদক্ষেপগুলো আর আগের মতো দৃঢ় নয় প্রতিটি কদম যেন অদৃশ্য এক ভার টেনে নিয়ে চলেছে। বিকেলের ম্লান আলোয় তার দীর্ঘ ছায়াটাও অস্বাভাবিক নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছিল। ধীরে ধীরে গেটের দিকে হাঁটতে লাগল আহিয়ান।

একবারও আর পেছন ফিরে তাকাল না।

এদিকে তিতলি...সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

হাতে ধরা ঝাঁঝরিটি অনেক আগেই থেমে গেছে, অথচ সে খেয়ালই করেনি। আহিয়ানের দূরে সরে যাওয়া অবয়বটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে। ঠোঁট বলছিল—“না।” কিন্তু হৃদয়ের গভীরে কোথাও এক অদৃশ্য যন্ত্রণা নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ করে চলেছিল।

চলবে....??

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন