ফন্ট সাইজ:
থিম:
My Angry Albatross

২য় পর্ব

লেখক: রুমি ইসলাম

#My_Angry_Albatross

#লেখিকা_রুমি_ইসলাম

#পর্ব_৩

❌ কপি করা নিষিদ্ধ ❌

★ইনায়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ঢুকল। স্কাই-ব্লু রঙের কামিজজুড়ে কাদার ছিটা, চুল এলোমেলো, চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। মনে মনে জোরাভকে একের পর এক গালি দিয়েই চলেছে সে।

বাড়িতে ঢুকতেই টিভির শব্দ কানে এলো। ড্রয়িংরুমের সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন আসিফ মির্জা। এক হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, অন্যদিকে চোখ টিভির পর্দায়। বিটিভির খবর দেখতে দেখতে বিরক্ত গলায় বললেন,

— দেশটার যে কী অবস্থা!

কথা বলতে বলতেই তাঁর চোখ পড়ল ইনায়ার দিকে। মেয়ের অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে গেলেও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হালকা হাসি।

— কিরে, যুদ্ধ করে আসলি নাকি? মুখটা এমন বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস কেন?

ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। গম্ভীর মুখে এসে সোফায় বসে পড়ল।

ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

— আরে মা! এ কী অবস্থা তোর?

আলেয়া খাতুন, ইনায়ার সেই কেয়ারটেকার।

আলেয়া খাতুন দ্রুত এগিয়ে এলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনিই ইনায়াকে মানুষ করেছেন। ইনায়া তাঁকে "মনি" বলেই ডাকে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাঁদের সম্পর্কটা মা-মেয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তিনি বললেন,

— কী হয়েছে মা? কোথাও পড়েছিস নাকি? ব্যথা পেয়েছিস?

ইনায়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

— না মনি, পড়ে যাইনি। একটা আস্ত বজ্জাত লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। চোখে দেখে গাড়ি চালায় নাকি চোখ পকেটে রেখে চালায়, বুঝি না! সব কাদা-পানি এসে আমার গায়ে ছিটিয়ে দিল। আমি প্রতিবাদ করতেই উল্টো আমাকে টাকা দেখাতে লাগল। তুমি বলো তো, আমার আত্মসম্মান কি টাকা দিয়ে কেনা যায়?

কথা শেষ হতেই আসিফ মির্জা গম্ভীর হয়ে গেলেন।

— কে তোকে টাকা দেখিয়েছে? কার এত বড় সাহস?

তিনি উঠে এসে ইনায়ার মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন,

— থাক মা। মন খারাপ করিস না। ছেলেটাকে আমি খুঁজে বের করব। তারপর এমন শিক্ষা দেব, জীবনে আর কোনো মেয়ের সঙ্গে এমন ব্যবহার করার সাহস পাবে না।

ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

— দরকার নেই, বাবা। আমিও ওর জুতাতে কাদা ছিটিয়ে দিয়ে এসেছি। হিসাব বরাবর।

কথাটা শুনে আলেয়া খাতুন হেসে ফেললেন।

— এই তো আমার সাহসী মেয়ে! এবার যা, ফ্রেশ হয়ে আয়। তোর জন্য খাবার বারছি

ইনায়ার মুখেও হালকা হাসি ফুটে উঠল। তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

পরদিন সকাল

রাতের অন্ধকার কেটে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে। জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের নরম আলো এসে পড়েছে ইনায়ার মুখে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৮টা ২৩ মিনিট।

ঘুম ভাঙতেই আর এক মুহূর্তও দেরি করল না ইনায়া। ফ্রেশ হয়ে, তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়ল। গতকালের ঘটনার পর থেকে ওর মন খারাপ। তাই নিজের মন হালকা করতে জারার কাছে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরই সে পৌঁছে গেল চৌধুরী বাড়িতে।

ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন আমিনা চৌধুরী। ইনায়াকে দেখেই মুখভরা হাসি ফুটে উঠল তাঁর।

— আরে ইনায়া মা! কতদিন পর এলি। মাঝেমধ্যে তো একটু আসতে পারিস।

ইনায়া মিষ্টি হেসে বলল,

— পড়াশোনার অনেক চাপ, আন্টি। তাই আসা হয় না। জারা কোথায়?

আমিনা চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন,

— ও এখনো ঘুমাচ্ছে। সারারাত ফোন নিয়ে বসে ছিল মনে হয়। তুই বস, আমি ডেকে দিচ্ছি।

ইনায়া তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।

— না না আন্টি, আমি নিজেই যাচ্ছি।

কথা শেষ করেই সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।

পেছন থেকে আমিনা চৌধুরী বললেন,

— আরে আস্তে যা! তোর পছন্দের আলু পরটা বানিয়েছি, খেয়ে যেতিস।

কিন্তু ইনায়ার কানে তখন কিছুই ঢুকল না। ওর পায়ে যেন হাওয়া লেগেছে।

জারার রুমের সামনে এসে দেখল দরজাটা শুধু ভেজানো। আলতো করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, জারা তখনো গভীর ঘুমে।

ইনায়া গিয়ে বিছানার পাশে বসে আলতো করে জারার কাঁধে ঝাঁকি দিল।

— এই জারা... ওঠ না।

জারা চোখ খুলেই অবাক হয়ে, ঘুমজরানো কন্ঠে বলল

— কী হয়েছে? এত সকালে? আজ তো ভার্সিটিও বন্ধ। কিছু হয়েছে..?

ইনায়া কিছু সেকেন্ড চুপ থেকে,

পারে এক নিঃশ্বাসে গতকালের পুরো ঘটনাটা বলে ফেলল। কাদা-পানি ছিটানো থেকে শুরু করে টাকা দিয়ে অপমান করা—একটাও ঘটনা বাদ দিল না।

সব শুনে জারা রাগে ফুঁসে উঠল।

— হোয়াট! লোকটা তোর গায়ে কাদা ছিটিয়েছে, আবার তোকে অপমানও করেছে? কী অসভ্য! ওকে চিনিস? নাম জানিস?

ইনায়া মাথা নেড়ে বলল,

— না। কালই প্রথম দেখেছি। এর আগে কখনো দেখিনি।

জারা কিছু সময় চুপ থেকে ইনায়াকে দেখলো।

তার পর বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।

— না, এভাবে হবে না। আগে তোর মুড ঠিক করতে হবে। ওঠ!

ইনায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— কোথায় যাব?

জারা দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বলল,

— মুড ঠিক করার একটাই ওষুধ—ডান্স আর মিউজিক!

বলেই টেবিলের ওপর রাখা JBL স্পিকারটা চালু করে দিল।

ফুল ভলিউমে বাজতে শুরু করল একটি হিন্দি গান।

ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৯ টা ১২ মিনিট।

দুই বান্ধবী খাটের উপর দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করল।

ইনায়া প্রথমে নাচতে চাইনি। কিন্তু জারার জোরাজুরির শেষ পর্যন্ত হার মানতেই হলো তাকে।

অন্যদিকে

নিজের রুমে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জোরাভ।

হঠাৎ গানের আওয়াজ কানে আসতেই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল তার।

ঘুমের মধ্যেই দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল।,

-Shut the hell up..."

চোখ খুলে গেল।

বিরক্তিতে কপালের রগ ফুলে উঠেছে।

দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,

— "জারা..."

বিছানা থেকে নেমে এল সে।

গা থেকে চাদরটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিল।

পরনে ব্ল্যাক সিল্ক ট্রাউজার, সাদা টি-শার্ট। এলোমেলো চুল আর সদ্য ঘুম ভাঙা রাগী চোখে যেন আগুন জ্বলছে।

গানের আওয়াজ অনুসরণ করে সোজা জারার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আগেই দরজাটা ঠেলে খুলে বলল,

— "I said turn off the..."

কথাটা শেষ হলো না।

দরজার ঠিক ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটা...

যে গতকাল ওর জোতায় কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিল।

জোরাভের ভ্রু কুঁচকে গেল।

চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।

— "তুমি?"

এদিকে ইনায়া তখনো খাটের ওপর চোখ বন্ধ করে গানের তালে তালে নাচছে।

রুমে আর কেউ ঢুকেছে, সেটা টেরই পেল না।

জোরাভ এবার গলা আরও শক্ত করে বলল,

— "I told you to turn off the box!"

তবুও কোনো সাড়া নেই।

বিরক্ত হয়ে দুই পা এগিয়ে গিয়ে স্পিকারের সুইচ বন্ধ করে দিল।

মুহূর্তেই পুরো ঘর নিস্তব্ধ।

ইনায়া থেমে ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

সামনে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

— "আপনি...?"

জোরাভ ঠান্ডা, তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

— "হ্যাঁ, আমি। কিন্তু তুমি এখানে কী করছ?"

ইনায়া কিছু বলার আগেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো জারা।

জোরাভকে দেখে অবাক হয়ে বলল,

— "ভাইয়া! তুমি এখানে?"

ইনায়া বিস্ময়ে জারার দিকে তাকাল।

— "ভাইয়া মানে?"

জারা অবাক হয়ে বলল,

— "আরে! তোকে বলেছিলাম না জোরাভ ভাইয়া আসবে।ভুলে গেছিস...?

ইনায়া হতবাক হয়ে কিছুটা নিচু গলায় ।

— "আসবে বলেছিলি... কিন্তু এসেছে, সেটা তো বলিসনি।"

জোরাভ এবার জারার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

— "Wait.... এটা কে?"

জারা হেসে বলল,

— "এটা ইনায়া ভাইয়া। তুমি ওকে চিনতে পারোনি, তাই না? চিনবে কী করে? তুমি তো লন্ডনে যাওয়ার পর আর ইনায়াকে দেখোনি।"

জোরাভ আর কোনো উত্তর দিল না।

নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে।

নাচতে নাচতে গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। কোমর ছোঁয়া বাদামি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কাঁধে ছড়িয়ে আছে। পরনে হালকা বেবি পিংক কুর্তি।

কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল।

জোরাভের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।

চোখ সরাতে পারছিল না সে।

ঠোঁট নড়ল খুব আস্তে।

— "আমার... মেঘপরী....?

কথাটা এতটাই নিচু স্বরে বলল যে, নিজের কান ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না।

আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না জোরাভ।

নিঃশব্দে ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা আস্তে করে টেনে বন্ধ করে দিল।

জোরাভ চলে যেতেই ঘরে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এলো।

ইনায়া আর জারা দুজনেই অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইনায়া ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে বলল,

— "এটা... জোরাভ ভাইয়া?"

জারা মাথা নেড়ে বলল,

— "হুম। কেন?"

ইনায়ার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— "কাল... যে লোকটা আমার গায়ে কাদা ছিটিয়েছিল... সে আর কেউ না জোরাভ ভাইয়া ছিল। "

জারা চোখ বড় বড় করে বলল,

— "কী বলছিস তুই?"

★দুপুর ১টা ২৫ মিনিট।

নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে জোরাভ।

দৃষ্টি আকাশে, কিন্তু মন অন্য কোথাও।

দু'হাত শক্ত করে রেলিং আঁকড়ে ধরে আছে।

বারবার চোখের সামনে একটাই মুখ ভেসে উঠছে

"ইনায়া ..."

এত বছর পর...

অবশেষে ওকে আবার দেখল।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

— টক... টক...

জোরাভ ফিরে তাকাল না।

ভেতরে ঢুকল রিদ।

কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

— "কী হয়েছে, ভাইয়া?"

কোনো উত্তর নেই।

রিদ আবার ডাকল,

— "ভাইয়া..."

জোরাভ এবার ধীরে ধীরে বলল,

— "কিছু না। এমনি।"

কথাটা বললেও চোখ সরাল না।

রিদ বুঝে গেল—

ভাইয়া কিছু একটা লুকোচ্ছে।

পরিবেশ বদলাতে জোরাভ বলে উঠলো।

— "কোম্পানির কি অবস্থা.? বাবা বোলছিল কি ডিল নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল।"ঠিক হয়েছে..?

রিদ উত্তর দিতে যাবে, এমন সময় দৌড়ে এলো রোহান।

হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— "ভাইয়া... বড়মা খেতে ডাকছে। সবাই অপেক্ষা করছে।"

জোরাভ ছোট ভাইটার মাথায় হাত রেখে মুচকি হেসে বলল,

— "আচ্ছা। তুই যা। আমরা আসছি।"

রোহান চলে যেতেই জোরাভ আবার একবার ব্যালকনির বাইরে তাকাল।

তারপর ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

দু'ভাই ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।

ডাইনিং টেবিলে তখন বাড়ির সবাই উপস্থিত। আমিনা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরী ব্যস্ত সবাইকে খাবার পরিবেশন করতে। গরম গরম খাবারের সুগন্ধে পুরো পরিবেশটা ভরে আছে।

জোরাভ আর রিদ নিজেদের জায়গায় গিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ সবাই নীরবে খেতে লাগল।

হঠাৎ আজাদ চৌধুরী পানির গ্লাসটা টেবিলে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— "জোরাভ..."

জোরাভ মুখ তুলে বাবার দিকে তাকাল।

— "জি, বাবা।"

আজাদ চৌধুরী কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরস্বরে বললেন,

— "একটা সময় ছিল, তোদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছি। আজ মনে হচ্ছে, সেই হাতেই আমার গড়ে তোলা ব্যবসার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার সময় এসে গেছে।"

টেবিলে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এলো।

তিনি আবার বললেন,

★★চলবে......

★★( “পড়েছেন যখন, হাজিরাটাও দিয়ে যান! 😌❤️”)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন