ফন্ট সাইজ:
থিম:
হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে বিয়ে

৪র্থ পর্ব

লেখক: সিনথিয়া ইসলাম

#হ্যান্ডসাম_ছেলের_সাথে_বিয়ে (পর্ব ৪)

#সিনথিয়া_ইসলাম 
লিমা আরিশের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে ঢুকবে কি ঢুকবে না। আরিশ সবে গোসল করে বের হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল। লিমা দরজায় একবার টোকা দিতেই আরিশ পিছনে না তাকিয়ে বলল,
— আসো।
 ভেতরে ঢুকে আরিশের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো লিমা। আরিশ পিছন ফিরতেই দু’জনের ধাক্কা লাগে। লিমা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে আরিশ দ্রুত তার কোমর জড়িয়ে ধরে ফেলে। ভেজা চুল থেকে টুপটাপ করে পানি পড়েছে লিমার মুখের উপর । আরিশের চোখ স্থির হয়ে আছে লিমার মুখে। আর লিমার নিঃশ্বাস যায় যায় অবস্থা।
আরিশ শান্ত কন্ঠে বলল,
— আমার রুমে কেন আসে ছিস?
লিমা কোন উত্তর দিতে পারল না। অস্বস্তিতে হাত কচলাতে লাগল।নিচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে।আরিশ তার এমন অবস্থা দেখে মুচকি হাসে।
আরিশের কিছু একটা ভেবে গভীর কণ্ঠে বলল,
— কেন এসেছিস ?
লিমা আঙুল কচলাতে কচলাতে বলল,
— ভাইয়া… আসলে আমি না… ওই… আর কি …
আরিশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
— জানা নেই তোর এই ছোট্ট মনটায় কার বসবাস।
কথাটা শুনে লিমা অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল আরিশের দিকে। আরিশের ঠোঁটের কোণে তখন মুচকি হাসি বিদ্যমান। 
আরিশ নরম স্বরে আবার বলল,
— আচ্ছা, তোর চোখে আমি কেমন?
লিমা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। আরিশের প্রতিটা কথা তার বুকের ভেতর কাঁপন তুলছে। শরীর কাঁপা শুরু করছে রীতিমতো।
আরিশ কিছুটা কাছে এসে মৃদু হেসে বলল,
— জানিস, আমি আর তুই একসাথে একদম পারফেক্ট কাপল লাগি।
লিমা এবার অবাক এর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তার হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। কী বলবে, কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।তাই সে দৌড়িয়ে রুম ত্যাগ করলে।
আরিশ মলিন মুখে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" তুই আমার হবি কখন রে...?"
লিমা নিজের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। বুকের ভেতরটা এখনও কাঁপছে। আরিশ আজ যা বলেছে, তাতে স্পষ্ট সে তাকে ভালোবাসে।কথাটা ভাবতেই লিমার ঠোঁটে অজান্তে হাসি ফুটে উঠছে। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ থাকলে না।“বাড়ির মানুষ জানলে কী বলবে...?”এই এক চিন্তাই মুহূর্তে তার সমস্ত খুশি দুংখে রুপান্তরিত হলো।রাইসা বারবার দরজায় নক করছে। কিন্তু লিমা দরজা খুলছে না।
রাইসা বিরক্ত হয়ে বলল,
—" নন্দিনী, কী ব্যাপার? কিসের এত রাগ? দরজা খোলো, একটা সুখবর আছে।"
লিমা নিজকে স্বাভাবিক করে দরজা খুলতেই রাইসা তাকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
— জানো? কাল তোমার ভাইয়া আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে বলেছে!
লিমা মৃদু হেসে ধীর গলায় বলল,
— "আচ্ছা..."
রাইসা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কী হয়েছে তোমার? মন খারাপ কেন?
লিমা গিয়ে বিছানায় বসলে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম স্বরে বলল,
— "আচ্ছা ভাবি... তুমি কি ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসো?"
রাইসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
— "ভালোবাসি তো... "
লিমা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
— ভাবি... আরিশ ভাইয়াও আমাকে ভালোবাসে। জানো, আজকে ভাইয়া আমাকে ইনডাইরেক্টলি প্রপোজ করেছে।
কথাটা শুনে রাইসার চোখ চকচক করে উঠলো। রাইসা খুশি হয়ে বলল,
— "বাহ! ননদ থেকে এবার জা হয়ে যাচ্ছো তাহলে!"
লিমা মাথা নিচু করে বলল,
— না ভাবি... আমার ভালোবাসা হয়তো পূর্ণতা পাবে না। দাদি আর আহসান ভাইয়া শুনলে তো আমি শেষ।
রাইসা লিমার কাঁধে হাত রেখে বলল,
— আরে শান্ত হও। তেমন কিছুই হবে না। আমি আছি তো।
কথাটা শুনেই লিমা রাইসাকে জড়িয়ে ধরলো। যেন বুকের ভেতরের ভয় একটু হলেও কমে গেছে।ঠিক তখনই আহসান রাইসাকে ডাকতে এসে দরজার সামনে থেমে গেল। ভিতরে উঁকি দিতেই দেখল, লিমা শক্ত করে রাইসাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
আহসান মনে মনে বলল,
— "এই মেয়ে স্বামীকে ছেড়ে সারাক্ষণ ননদের পিছনেই পড়ে থাকে। আল্লাহ মাবুদ, এই মেয়েকে একটু বুদ্ধি দাও!"
লিমা আহসানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
— ভাইয়া, ভিতরে আসে বসে।
রাইসা আহসানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
আহসান শান্ত কণ্ঠে বলল,
— না, বসবো না। তোর ভাবিকে ডাকতে আসছি।
লিমা ছোট করে বলল,
— আচ্ছা।
রাইসা নিঃশব্দে আহসানের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। চারপাশে এক ধরনের নীরবতা।রাইসা একটু হলেও এই লোকটাকে ভয় পাই।
হঠাৎ আহসান গভীর কন্ঠে বলে উঠল,
— লিমাকে তুমি চিনো কতটুকু?
রাইসা শান্ত কন্ঠে বলল,
— লিমা পুরোই আমার মতো।
আহসান মুচকি হেসে বলল,
— ভুল। লিমা তোমার মতো সাহসী না, তোমার মতো এত শয়তানিও করে না। আমার চাচাতো বোন, আমি ওকে ভালো করেই চিনি।
—" বলতে টা কি চাইছেন?"
আহসান গভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
— আমি এটাই বলতে চাইছি, তুমি আরিশ আর লিমার বিষয় থেকে দূরে থাকো। ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দাও।
রাইসা কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
— কি করেছি যে এভাবে বলছেন?
আহসান ছোট করে বলল,
— আমি তোমাকে ভালো করেই চিনি। তুমি কি করার চিন্তা করছো, সেটাও জানি।
রাইসা চুপ হয়ে গেল। রাইসা চিনতে পারছে না এই মানুষটাকে ।এক মূহুর্তে ভালোবাসে আরেক মূহুর্তে অপমান করে।
***
জানলার ধারে মন খারাপ করে বসে আছে রাইসা। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমান।বাতাসে তার খোলা চুলগুলো বারবার উড়ে গিয়ে মুখ আছড়ে পড়ছে।আহসান ফোনটা টেবিলের উপর রেখে এক দৃষ্টিতে রাইসার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটাকে যতবার দেখে, ততবারই তার মন বলে,ওর প্রেমে পড়ে ধ্বংস হয়ে যা।
রাইসা আহসানের দিকে তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমানের ছাপ।আহসান কিছু না বলে সোফায় গিয়ে বসে পড়লে। তারপর ল্যাপটপ খুলে কাজে মন দিল। যেন কিছুই হয়নি।রাইসা মনে মনে ভাবতে লাগল,এই মানুষটা এত অদ্ভুত কেন? আমি যে রাগ করে আছি, দেখতে পাচ্ছে না? আমার রাগ ভাঙাচ্ছে না কেন? আমাকে একটা চকলেট দিলেই তো আমি খুশি হয়ে যেতাম। ধুর বাল, ভালোই লাগে না!
ঠিক তখনই আহসানের ডাকে তার ধান ভাঙলো ।
— রাইসা, এই নাও। তোমার জন্য আমি চকলেট এনেছি।
রাইসার মুখ মুহূর্তেই উজ্জল হয়ে উঠল। খুশি হয়ে চকলেটটা হাতে নিয়ে বলল,
— ধন্যবাদ।
আহসান মুচকি হেসে বলল,
— এবার তো খুশি?
রাইসা ঠোঁট চেপে ছোট করে বলল,
— হুম।
জানলার বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। বাতাসে হালকা ঠান্ডা ভাব, আর সেই সঙ্গে এক অদ্ভুত শান্ত অনুভূতি।
রাইসা চকলেটটা হাতে ধরে বলল,
— আমরা বন্ধু হতে পারি।
আহসান রাইসার দিকে তাকালো। তার চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত গভীরতা নেমে এলো। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,
— ভালোবাসার পর বন্ধু হওয়া যায় না।
রাইসা একদৃষ্টিতে আহসানের দিকে তাকিয়ে রইল। বোঝার চেষ্টা করছে, মানুষটা সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে বলছে। আহসানের চোখ-মুখ দেখে বোঝা মুশকিল তার মনে কি চলছে।
আহসান মৃদু হেসে বলল,
— তুমি ছোট মানুষ, এত কিছু বুঝবা না। যাও, চকলেট খাও গা।
রাইসা রেগে বলল,
— আমি মোটেও ছোট না।
— আচ্ছা, তাহলে তুমি বুড়ি।
রাইসা রাগি দৃষ্টিতে আহসানের তাকিয়ে বলল,
— মোটেও না।
আহসান হাসতে হাসতে বলল,
— তার মানে তুমি ছোট।
রাইসা চুপ করে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছে না। যা-ই বলছে, তাতেই উল্টো ফেঁসে যাচ্ছে।সে বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল, ধুর! এই লোকটার সাথে কথায় পারা যায় না।
আহসান রাইসার দিকে তাকিয়ে ভাবলে, "ভালোবাসি তোমায় অনেক ভালোবাসি রাইসা।"
রাইসা চকলেটটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আহসানের গভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
— "কোথায় যাচ্ছো?"
রাইসা পেছনে তাকিয়ে বলল,
— লিমার কাছে। একসাথে চকলেট খাবো।
— আচ্ছা, যাও।
রাইসা খুশি মনে রুম থেকে বের হয়ে গেল।আহসান বিছানায় গিয়ে বসলো। তারপর ফোন বের করে রাইসার ছবি বের করে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। তার চোখে এমন এক কোমলতা, যা হয়তো সে কাউকে দেখাতে চায় না।এদিকে আরিশ কয়েকবার ডাকলেও সে খেয়াল করেনি।
শেষে আরিশ এসে আহসানকে হালকা ঝাঁকিয়ে বলল,
— ভাইয়া!
আহসান চমকে উঠে বলল,
— হ্যাঁ, বল।
— ভাইয়া, কাল কখন ঘুরতে যাবা?
আহসান ছোট করে বলল,
— সকালে রওনা দিবে।
— আচ্ছা।
বলেই আরিশ চলে যেতে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই আহসান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
— কোথায় যাস? আয়, আমার পাশে বস।
আরিশ এসে আহসানের পাশে বসলো। দুই ভাই টুকটাক গল্পে করছে। তাদের আর আগের মতো কথা হয়না।বলতে গেলে আরিশই দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে আহসানের থেকে।তার ও কারণ আছে।আরিশ মনে করছে আহসান তার আর লিমার বিয়ের বিপক্ষে। কিন্তু এমন কিছুই না। আহসান শুধু চাই আরিশ নিজ থেকে বলুক ।
অন্যদিকে, রাইসা আর লিমা পাশাপাশি বসে চকলেট খাচ্ছে। বাতাসে জানলার পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছে।
রাইসা চকলেট খেতে খেতে বলল,
— তোমার ভাই ভালা মানুষ না। কেমন অদ্ভুত।
লিমা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাবি, ভাইয়ার দেওয়া চকলেট খাচ্ছেন আর ভাইয়াই দুর্নাম করছে!
রাইসা মৃদু হেসে বলল,
— আমি তো আমার স্বামীর দেওয়া চকলেট খাচ্ছি, আর তোমার ভাইয়ের দুর্নাম করছি।
লিমা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমার ভাই আপনার কে হয়?
রাইসা দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
— তুমি তো জানো। তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছো কেন!?
লিমা হেসে বলল,
— এমনি।
তারপর দুজনেই হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে পুরো ঘর জুরো বাজছে।
****
রাত গভীর হয়ে এসেছে। জানলার বাইরে কালো আকাশে আধো চাঁদের আলো মৃদু হয়ে ঝলমল করছে।মিষ্টি ফোনটা সামনে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। তার চোখেমুখে দ্বিধা স্পষ্ট। সে বারবার ভাবছে, তার কি আকাশকে ফোন করা উচিত হবে?অনেকক্ষণ নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর অবশেষে সাহস করে ফোন দিল।কয়েকবার রিং হওয়ার পর আকাশ ফোন ধরে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— হু, বলো মিষ্টি।
মিষ্টি বুঝে পাচ্ছে না কি বলবে।কি জিজ্ঞাসা করবে।কি বলা উচিত আর কি বলা উচিত না কিছুই তার মাথায় আসছে না।সে তো শুধু জানতে চাইছিল আকাশ এখন কেমন আছে।ছেলেটার জন্য তার বড্ড মায়া লাগে আজ কাল।
আকাশ আবার বলল,
— রাইসা কেমন আছে?
মিষ্টি ধীর কণ্ঠে বলল,
— রাইসা তো ভালো আছে। তুমি কেমন আছো?
আকাশ কিছু বলল না। কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে নীরবতা চলো। 
মিষ্টি ছোট্ট করে বলল,
— ভুলে যাও রাইসাকে। Move on করো।
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল সে।আকাশ ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে শূন্যতা। যে মেয়েটাকে সে প্রথম দেখায় ভালোবাসে ফেলেছিল।তাকে ভুলা যাও তার পক্ষে এতো তাও সহজ না।আসলে কাউকে ভালোবাসে move on করা যায় না।বলা সহজ কিন্তু করাটা না।
আকাশ ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,
— "এতই কি সহজ কাউকে ভুলে যাওয়া?"
আকাশের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল একটা কথাই ভেবে, কেন সে আগে রাইসাকে নিজের মনের কথা বলেনি?
আর একটু সাহস করে যদি আগে বলে দিতো, তাহলে হয়তো আজ রাইসা অন্য কারও নয়, তারই হতো।দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে আকাশ মাটিতে বসে পড়লো। বুকের ভেতরটা অসহ্য ব্যথায় মোচড় দিচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে, ছেলেদের কাঁদতে নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে আকাশের খুব ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে।
এমনভাবে কাঁদতে, যেন বুকের ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসে। হয়তো তাহলে ব্যথাটা একটু কমবে। হয়তো নিঃশ্বাস নিতে এত কষ্ট হবে না।অন্যদিকে, মিষ্টি বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। তার চোখে ঘুম নেই। মাথার ভেতর বারবার ঘুরে ফিরে আসছে আকাশের মুখটা।ছেলেটা সত্যিই অনেক ভালো। রাইসাকে কতটা ভালোবাসে, সেটা তার চোখ দেখলেই বোঝা যায়। অথচ রাইসা এখন মিস্টার আহসান খানের।
 এই সত্যিটা আকাশ কেন মেনে নিতে পারছে না? কেন নিজেকে এত কষ্ট দিচ্ছে?আকাশের জন্য এত খারাপ লাগছে কেন? শুধু কি সে ভালো মানুষ বলেই?নাকি এই অনুভূতির পেছনে অন্য কোনো নাম না জানা কারণ লুকিয়ে আছে?ভাবতে ভাবতেই একসময় মিষ্টি ঘুমিয়ে পড়লো।সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে রাইসাকে ফোন করেছিল। ওপাশ থেকে রাইসা হেসে বলেছিল, তারা আজ ঘুরতে যাচ্ছে। কথাটা শুনে মিষ্টির মনটা কেমন যেন হয়ে গেল, যদিও সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন।
কলেজে এসে একা একা বসে ছিল সে। চারপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও তার কাছে সবকিছু নির্জন লাগছিল। ঠিক তখনই আকাশ এসে তার সামনে বসলো।
মিষ্টি কিছুক্ষণ চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার চোখের নিচে স্পষ্ট কালো দাগ পড়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে বহুদিন ঠিকমতো ঘুমায়নি। মুখে ক্লান্তির ছাপ, অথচ চোখে এখনো একটা অপেক্ষা রয়ে গেছে।
আকাশ শান্ত কণ্ঠে বলল,
— আচ্ছা, রাইসা কি আহসানকে অনেক ভালোবাসে?
প্রশ্নটা শুনে মিষ্টি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো ।তারপর ধীর গলায় বলল,
— হয়তো… বা জানা নেই।
মিষ্টির কথাটা শুনে আকাশের ভেতরে যেন একটা আশার আলো জ্বলে উঠল।রাইসা যদি সত্যিই আহসানকে ভালো না বাসে, তাহলে এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো একদিন সে রাইসাকে নিজের করে পাবে।
আকাশ দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
— রাইসা কোথায়?
মিষ্টি ছোট্ট করে উত্তর দিল,
— ঘুরতে গেছে।
কথাটা শুনেই আকাশ আর কিছু বলল না। চুপচাপ উঠে চলে যেতে লাগল।মিষ্টি তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। হঠাৎ করেই তার খুব ইচ্ছে করল আকাশকে থামাতে। বলতে, “আরেকটু বসো… আরেকটু কথা বলো…”
কিন্তু কিছু ইচ্ছা মানুষ চাইলেও প্রকাশ করতে পারে না।
তাই মিষ্টি শুধু নীরবে তাকিয়ে রইল, আর আকাশ ধীরে ধীরে তার চোখের আড়াল হয়ে গেল।
*****
রাইসা, লিমা, আরিশ আর আহসান চারজন মিলে রওনা দিয়েছে আহসানের নানীর বাড়ির উদ্দেশ্যে, রাজশাহীতে।
পুরো পথজুড়ে রাইসা জানালার পাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে ছিল। কখনো মাথা কাঁচের গায়ে ঠেকে যাচ্ছিল, আবার কখনো আস্তে করে দুলে উঠছিল। কিন্তু তার কোনো খেয়ালই নেই।পেছনের সিটে লিমার পাশে বসে আছে রাইসা। সামনে ড্রাইভিং সিটে আহসান, আর তার পাশে আরিশ। গাড়ি চালাচ্ছে আহসান, কিন্তু তার মনটা রাইসার কাছে। বারবার আয়নার দিকে তাকাচ্ছে, শুধু রাইসার দিকে নজর রাখছে।মাঝেমধ্যে অকারণে গাড়ি থামাচ্ছে।
 আবার স্টার্ট দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই তার ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করছে। রাইসার এমন গভীর ঘুম তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।রাইসা এমনভাবে ঘুমাচ্ছে, যেন পৃথিবীতে কী ঘটছে তার কিছুই জানা নেই।
আরিশ একসময় আহসানের অবস্থা দেখে বলল,
— ভাইয়া, আমি গাড়ি চালাবে? তুমি ভাবির পাশে গিয়ে বসো।
আহসান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ছোট করে বলল,
— হুম।
গাড়ি থামতেই সে দ্রুত গতিতে পেছনের সিটে চলে গেল। রাইসার পাশে বসে তার কপালে হাত রাখল।
রাইসাকে কয়েকবার আস্তে করে ডাকল,
— রাইসা… এই রাইসা…
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।আহসানের বুকটা ধক করে উঠলো। ভয় এসে চেপে ধরল তাকে। তার হাত কাঁপা শুরু করছে।সে আবার ডাকল,
— রাইসা!
তবুও রাইসা নড়ল না।এইবার আহসানের ভেতরের অস্থিরতা ভয়ে রূপ নিল। মনে হলো, কোনো অজানা আশঙ্কা তাকে ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে।
আহসান আরিশকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— আশেপাশে কোনো হাসপাতাল থাকলে ওখানে চল।
আরিশ আর দেরি করল না। গাড়ি ঘুরিয়ে পাশেই একটা ছোট হাসপাতালের সামনে আসে থামাল।গাড়ি থামতেই আহসান কোনো কথা না বলে রাইসাকে কোলে তুলে নিল। রাইসার শরীরটা একেবারে নির্জীব, গভীর ঘুমে ডুবে আছে সে। আহসানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভয় চেপে বসেছিল তখন।সে দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে গেল। তার পেছনে দ্রুত পায়ে লিমা আর আরিশও ঢুকল।
ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো রাইসাকে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার শান্ত গলায় বলল,
— চিন্তার কিছু নেই। ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কারণে এমনভাবে ঘুমিয়ে আছে।
কথাটা শুনে আহসান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
ঘুমের ওষুধ?তার ভেতরে প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে লাগল। রাইসা কেন ঘুমের ওষুধ খাবে?হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল, রাইসা সকালে মাথা ব্যথার ওষুধ খুঁজছিল। ব্যথার ওষুধের পাশেই ছিল ঘুমের ওষুধের পাতা।সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল তার ।মানে, রাইসা ভুল করেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছে।আহসান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। ভয়টা ধীরে ধীরে কমে গেলেও মাথার ভেতর অস্থিরতা থেকে গেল।
আহসান রাইসার দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,
— "এই মেয়েকে নিয়ে আমার শান্তি নেই…"
আহসান হাসপাতালের করিডোরে বসে আছে।হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।ফোনটা কানে দিতেই ওপাশ থেকে তার মামার কণ্ঠ ভেসে এলো,
— কখন আসবা তোমরা ?
আহসান শান্ত স্বরে জবাব দিল,
— রাস্তায় অনেক জ্যাম, আসতে আরও এক-দুই ঘণ্টা লাগতে পারে মামা।
ফোন রেখে সে লিমা আর আরিশকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— তোরা থাক, আমি একটু আসছি।
কথা শেষ করেই দ্রুত বাইরে চলে গেল সে।লিমা আর আরিশ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরো ব্যাপারটাই যেন তাদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছে না তারা।
 আরিশ লিমাকে জিজ্ঞাসা করলো,
— ভাইয়া আর ভাবির কি কোনো বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল নাকি?
লিমা মাথা নাড়ল,
— কই না তো…
তারপর আবার নীরবতা। দুজনেই চুপচাপ বসে রইল। যেন কারও কাছেই কোনো উত্তর নেই।কিছুক্ষণ পর আহসান ফিরে এলো। তার হাতে জুস আর চিপসের প্যাকেট।সে ধীরে ধীরে রাইসার পাশে গিয়ে বসলো। তারপর আলতো করে তার হাতটা ধরে নরম গলায় ডাকল,
— "রাইসা… এই রাইসা…"
রাইসা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
—" আর একটু ঘুমাই…"
আহসান শান্ত কন্ঠে বলল,
— উঠে পড়ো। মামার বাড়ি যেতে হবে তো।
রাইসা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। মুখ ধুয়ে নেওয়ার পর ঘুমের ঘোরটা কিছুটা কেটেছে।গাড়িতে বসে জুস খাচ্ছিল রাইসা। এরই মধ্যে তারা পৌঁছে গেল আহসানের মামার বাড়ি।আহসানের একমাত্র মামা ঈশান রহমান। মামি তুলি রহমান। তাদের বড় ছেলে আদিল রহমান অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ে, আর ছোট মেয়ে হিয়া রহমান সদ্য কলেজে উঠেছে।
দুপুরের খাবার খেতে খেতেই বিকেল চারটা বেজে গেছে। খাওয়া শেষ করে সবাই গল্পে মেতে উঠলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর রাইসা লিমার কাঁধে মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।তুলি রহমান অবাক হয়ে আহসানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— রাইসা মা কি অসুস্থ নাকি?
আহসান শান্ত গলায় বলল,
— না মামি, দূর থেকে এসেছে তো… ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে।
তুলি রহমান মাথা নেড়ে বললেন,
— আচ্ছা।
আজ তাদের রাজশাহী শহর ঘুরে দেখার কথা ছিল। বিকেলের আলোয় শহরটা দেখার জন্য সবাই কত পরিকল্পনা করেছিল।কিন্তু রাইসার অসুস্থতার কারণে আর কোথাও যাওয়া হলো না।
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন