বাড়ি থেকে সেই কখন থেকে কল আসছে! আমাকে নাকি দেখতে আসবে ছেলেপক্ষের লোক। মায়ের উৎসাহিত গলায় আমি বারবার ভরকে গিয়েও কলগুলো এড়িয়ে যেতে পারছি না। চারপাশে বাসের কোলাহল। কখন থেকে একটা রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছি! প্রয়োজনীয় কাজে মার্কেটে এসেছিলাম, কিন্তু যানজটের জন্য অটো রিকশাও পাচ্ছি না।
অবশেষে অনেক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে একটি অটো রিকশা চোখে পড়ল, মনে হলো ফাঁকা। জ্যামের জন্য আটকে পড়ে আছে। এতখানি পথ হেঁটে যাওয়ার চেয়ে মনে হলো ধীরস্থিরভাবে রিকশা করেই যাই। আমাকে কোন প্রধানমন্ত্রীর তারেক জিয়ার ছেলে বিয়ে করতে আসবে? তাদের একটু অপেক্ষা করানোই যায়, নয় কি?
ভাগ্য তবে নিঃসঙ্গ আমার! উঁকি দিয়ে দেখলাম, ভেতরে একটা সুন্দর লোক বসে আছে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে লোকটা। বৃষ্টির জন্য ঠান্ডা হাওয়া বইলেও লোকটার শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে জলাশয়ের মতো। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ আমি পেলাম না। হঠাৎ একটা ধা/রালো, চকচক করতে থাকা রা/মদা চোখের সামনে দিয়ে এসে মাঝপথেই অটোতে ঢুকে পড়েছে, আর ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে সুন্দর মুখাবয়বের সেই ভয়ার্ত লোকটাকে।
ঘটনায় পুরো রাস্তার লোকগুলো ছুটোছুটি আরম্ভ করে দিয়েছে। চালক তো বোধহয় চোখের পলকে উধাও! আমি কাঁপছি, নড়তে পারছি না। মনে হচ্ছে পায়ের মধ্যে কেউ শিকল বেঁধে দিয়েছে। সবাই যেখানে পালাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে, আমি সেখানে তাকিয়ে এই নির্ম/ম দৃশ্য দেখেই যাচ্ছি। মনে হচ্ছে চারটে আঙুল দিয়ে আমার ছোট ছোট চোখ দুটো কেউ আটকে রেখেছে, এই দৃশ্য যেন আমার জন্যই তৈরি হচ্ছে, আর এটা আমার দেখতেই হবে। আমি বাধ্য। গলার শব্দগুলো হারিয়ে গিয়েছে কোথাও।
আরে, আমার পরিচয় তো জানাই হলো না! এই ন/রপিশা/চের মতো লোকটা যতখন ওই সুন্দর লোকটাকে কয়েকশত টু/ক/রো করছে সেই ফাঁকে আমি আমার পরিচয়টা দিয়ে দেই। কারণ নড়ার শক্তি তো একদম নেই। আমি তহুরা, মা আমাকে তহু বলে ডাকে। একমাত্র মেয়ে আমি তার। বাবা নেই, এই তো—সিঙ্গেল একটা মায়ের ঘাড়ে বিরাট বোঝার মতো টিকে আছি।
ভয়ে আরও একটু কুঁকড়ে গিয়েছে আমার শরীর, দেখলাম স্পন্দনরত কলিজাটা লোকটা হাতে নিয়ে কেমন অদ্ভুত পৈশাচিক হাসি দিচ্ছে। এক দলা থুতু ছিন্নভিন্ন মৃ/তদেহটার ওপর ছুড়ে দিয়ে চে/রা কলিজাটা আবারও রেখে দিল যথাস্থানে, যেন এটা একদম সাধারণ বিষয়! লোকটার মুখ ঢাকা, কিন্তু চোখের লম্বা লম্বা পাপড়িগুলো র/ক্তে ভেজা। তবুও আমি একশ পার্সেন্ট শিউরিটি দিতে পারব—এই চোখ আমি ভুলব না কোনোদিন। সে বিশাল, ধারালো, চকচকে দা-টা আমার পায়ের কাছে ছুড়ে মারতেই ঝনঝন শব্দে হোশ ফেরে আমার। ধড়ফড়িয়ে উঠে অস্পষ্ট স্বরে খোদাকে ডাকতে ভুলে যাইনি,
“ইয়া রব।”
র/ক্তে ভেজা মুখের কাপড়টা এক হাতে মুছে ফেলল অমা/নুষটা, যেন র/ক্ত নয়, তার শরীরের ঘাম ঝাড়ছে। আমার নিকট দাঁড়িয়ে ভারী গলায় বলে,
“পানি আছে?”
নড়েচড়ে পেছালাম আমি। এতে তার চোখে বিরক্তি ফুটল, হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট দেখলাম। আরও একটু চেপে বলে সে,
“পানি চেয়েছি।”
মাথা দোলালাম দুই পাশে। এত বড় কলিজা আমার নেই যে তর্ক করে তার হাতে নিজের কলিজা ধরিয়ে দেব! ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে হাফ লিটারের একটা বোতল এগিয়ে দিলাম তার দিকে। কাঁপাকাঁপা পায়ে চলে যেতে নিলে দুটো লোক পথ আটকে ধরেছে আমার। লোকটা মুখ ধুয়ে, হাত ধুয়ে সামান্য পানিসমেত বোতলটা এগিয়ে দিল আমার দিকে। বোতলের গায়ে শিশিরগুলো কেমন যেন লাল হয়ে আছে, পানিতে মিক্স হয়ে র/ক্ত পাতলা হয়ে গিয়েছে। আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম,
“ল... লাগবে না, আমি বাড়ি যাব।”
সে আমাকে আপাদমস্তক দেখে নেয় নীরব চোখে। তার ভেজা পাপড়ির টলমলে চোখ দুটো স্থির হলো আমার ভয়ার্ত নয়নযুগলে। মেকি গলায় সে আমাকে বলে,
“দ্যা মেইন আই উইটনেস! যে সব দেখেছে নিজের চোখে। এলইডি লাইটের মতো চকচকে। এগুলো পাপি চোখ, কিন্তু যে চোখ পাপ দেখে, তা উপড়ে ফেলাই তো নিয়ম। অন্ধের জবানবন্দি কে নিবে?”
এমন উপহাস আমার জীবনে প্রথম কেউ বোধহয় করল! আমি ভয়ে সিটিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম। সেই ভয়ানক চোখে তাকানোর সাহস দ্বিতীয়বার করলাম না। খুবই স্থিরভাবে, মিনমিন করে বললাম,
“আমি কাউকে বলব না।”
ক্ষীণকায় হাসির শব্দ পেলাম লোকটার মুখ ঢাকা কাপড়ের আড়াল থেকে। কানের কাছে চলে এলো সে আমার। তার গরম, পশুর মতো শ্বাস আমি অনুভব করছি। হিসহিস করে বলল,
“বুদ্ধিমান সে, যে চোখ থেকেও অন্ধ। আই থিংক তুমি বুদ্ধিমতী নারী। উপস!”
বলেই আফসোসের ধ্বনি বের করল মুখ দিয়ে, যেন ভুল বলেছে। তারপরই সে আমাকে একটা নাম দেয়,
“এল-ই-ডি।”
কম্পিত আমি এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে যতটুকু কথা বলেছি, সেটাই বাহবা দেওয়ার জন্য অনেক। তাই আর কিছু বলার সাহস হলো না। মাথা দুলিয়ে তার কথায় সম্মতি দিয়ে দিলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করলাম প্রাণ বাঁচানোর জন্য।
লোকটার পা সরে যাচ্ছে, বুটের তলায় র/ক্তের ছাপ রেখে যাচ্ছে পিচঢালা সড়কে। আমি মাথা নিচু রেখেই আড়চোখে দেখার চেষ্টা করলাম। লোকটা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার গাড়ি দূরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু সেই চোখ আমার মস্তিষ্ককে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যেন তার চাউনি আমাকে হুমকি দিচ্ছে সে আমার ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। একটা ভুল, আর নিজের নয়ন হারাব।
-----
বাড়িতে এসেছি আমি, ঘণ্টা পার হতে চলল। বাথরুমে ঝরনার নিচে বসে আছি। হাত দিয়ে কচলে কচলে পুরো শরীর ধুয়ে নিচ্ছি, তবুও মনে হচ্ছে আমার পুরো দেহ যেন র/ক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। কোনোভাবেই মস্তিষ্ক থেকে সেই নির্ম/ম দৃশ্য মুছে যাচ্ছে না। মায়ের ডাক এসেছে কয়েকবার, কিন্তু সাড়া দেওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। কী দেখলাম আমি আজকে! আমি খুব একটা সরল বা দুর্বল মেয়ে নই, তবে এমন ম/র্মান্তিক দৃশ্য দেখে ভয় না পেলে নিজেকে মানুষ নয়, পশুই মনে হতো। চারপাশ কেমন ঝাপসা লাগছে।
মায়ের এবার কঠোর গলার চেঁচানিতে আমার ভাবনার ছেদ ঘটে
“তহু, কী হয়েছে মা? বের হ, ওরা চলে আসবে তো!”
আমি কাঁপাকাঁপা পা দুটো ভেজা বাথরুমের ফ্লোরে রেখে দেয়াল চেপে ধরে কোনোমতে দাঁড়াই, পা দুটো খুব অবস লাগছে। দরজা খুলতেই মায়ের চিন্তিত ও কাতর মুখটা নজরে পড়ে আমার। উনি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড্ড বেশি চিন্তা করেন। এই চিন্তার কারণেই এর মধ্যে দু-দুবার ওনার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, তৃতীয়বার এমন হলে স্মৃতি হারানোর সম্ভাবনা অনেক, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাই ওনার কথা ভেবেই চেপে গেলাম, আমি ঢোক গিলেমায়ের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে শুধালাম,
“আজকে ওনাদের আসতে না বলে দিলে হয় না মা? আমার খুব অসুস্থ লাগছে।”
মায়ের মুখে এবার কাঠিন্য ফুটে। তিনি আমার কপালে হাত উল্টেপাল্টে জ্বর মেপে দেখলেন। তারপর রুষ্ট গলায় ধমকে উঠলেন,
“তোর এই বাহানায় তাদের আসার ডেট পিছিয়ে আজ প্রায় এক মাস হলো! আজকে আর বাহানা দিয়ে আমার নাক কাটাস না, তহু। বিছানায় তোর জন্য একটা শাড়ি রেখেছি, চটপট পরে নে সোনা মা আমার।”
ওই কথার পেছনে কাঠিন্য ও শাসন থাকলেও, একজন দায়িত্বশীল মায়ের আদর আর আকুতিও আছে, যা আমাকে সব সময় গুছিয়ে রাখ। তাই নিজের ভয়গুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে সম্মতি দিলাম। আমি ভেজা পায়েই বের হব ভেবে মা আমার ব্লাউজসহ শাড়িটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“ঘর সবে পরিষ্কার করেছি, বাথরুম থেকেই পরে আয়।চটপট করবি।"
লাল টকটকে শাড়িটা দেখে মনে হলো ওনার হাতে র/ক্ত মাখামাখি হয়ে আছে! আমি একটু দ্বিমত করে বললাম,
“এই রঙের না মা, অন্য রঙের কোনো শাড়ি দাও।”
“কী বলিস? এটা আমি আজকের জন্যই কিনে ইস্ত্রি করে রেখেছি। এটায় ওরা তোকে দেখলে আজকেই নিয়ে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাবে। আর জ্বালাস না আমায়, নে, পরে নে।”
এবারেও হার মানলাম ওই লক্ষ্মী আদলের শাসন আর আল্লাদের কাছে। এই মানুষটার চোখে আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী, তবুও সাজসজ্জা নিয়ে কত শত বাহানা তার, আমি যা পরি, তা-ই নাকি সুন্দর লাগে। নিজে বাছাই করে আমার জন্য সব কাপড় আনেন তিনি।
মা রুম থেকে যেতেই শাড়িটা পরে বের হলাম। বিছানায় বসে ছোট আয়নায় নিজেকে দেখে একটু লিপস্টিক দিলাম। আজ একটুও সাজতে ইচ্ছে করছে না। মায়ের বকা একটু খেতে হবে, ওটা কোনো বিষয় না। কিন্তু সকালের ওই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার পর সাজগোজ করলে নিজেকেও ওই কালো পোশাকের লোকটার মতো অ/মানুষ মনে হবে।
এভাবে আরও একটা ঘণ্টা কেটে গেল। বাইরের মানুষের গলার আওয়াজ বেড়েছে অনেকক্ষণ আগেই। মা এলেন আমাকে নিতে। ওনার মুখে চওড়া হাসি। এই হাসিটা সচরাচর দেখা মেলে না, তিনি স্বভাবগতভাবেই বেশ গম্ভীর আর কঠিন প্রকৃতির মানুষ। আজকে এত খুশি দেখে আমি নিরানব্বই পার্সেন্ট শিওর যে আমার বিয়ে এখানেই হবে। তিনি আমার এমন মিইয়ে থাকা মুখ দেখে ধমকালেন,
“একটু সাজলে কী এমন হতো, তহু? চল, আর সাজতে হবে না, আমার মেয়ে এমনিই সুন্দর।”
তিনি একটা বিশাল ঘোমটা টেনে দিলেন আমার মাথায়। মাথা নিচু করে আমরা ঘর থেকে বের হই। একটা চাপা গন্ধ পুরো ঘরজুড়ে ম ম করছে, এই গন্ধ আমি আগে এ বাড়িতে কখনো পাইনি, তবে কেন যেন চেনা চেনা লাগছে।
মা আমাকে নিয়ে একজন লোকের ঠিক সামনে বসালেন। এবং খুবই খুশি ও আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন,
“সামিউ কিন্তু এদিক দিয়ে বেশ বুদ্ধিমান আর ধূর্ত ছেলে। আর ভীষণ দায়িত্বশীল।”
বুঝলাম, আমার বিয়ের কথা সামিউ নামের এই ছেলেটার সাথেই হচ্ছে। লোকটা আমার মায়ের কথার উত্তরে ক্ষীণস্বরে হাসে। সেই হাসির শব্দটা আমার শরীরে একটা শীতল শিহরন বয়ে নিয়ে যায়, এত চেনা স্বর?। এবার আমি আরও বেশি চমকে উঠলাম লোকটার গলা শুনে
“তহুর মায়াবী আদলখানাই বলে দেয় আন্টি, সে বড্ড বুদ্ধিমতী আর থিতু একটা মেয়ে। আপনার মতন।"
আমি আতঙ্কে লাজ-লজ্জা সব ভুলে তৎক্ষণাৎ চোখ তুলে তাকালাম। চোখ মিলল সেই ভেজা নয়নের সাথে! এই কণ্ঠ, এই চোখ—যা আমাকে সারা জীবনের মতো একটা ভয়ানক স্মৃতি দিয়ে দিয়েছে। আমি ভুল হতেই পারি না, এটা সেই নর/পিশাচের চোখ! আমি বসা থেকে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পিছিয়ে গিয়ে বলে উঠি,,
“আপনি?!”
লোকটার চোখ আমার দিকে স্থির, কিন্তু তাতে কোনো পৈশাচি/কতার ছোঁয়া নেই। চোখ দুটো এক হলেও যেন মানুষটা একদম ভিন্ন। সে-ও আমার সাথে উঠে দাঁড়ায়। কিছুটা বিব্রত হয়ে আমাকে প্রশ্ন করে,
“আমাকে চেনেন আপনি?”
আমার মা আমার বাহু ধরে থামাতে চাইলেন, কিন্তু আমি থামলাম না। বরং তৎক্ষণাৎ তোতলামি গলায় জবাব দেই,,
“স... সকালে র... রাস্তায় আ... আপনি! রক্ত... রামদা! মা?”
বলেই মায়ের গায়ের সাথে সিটিয়ে মিশে গেলাম। ভীষণ ভয় করছে আমার। আমি বরাবরই মায়ের কাছে ছোট বাচ্চা, যেমন আল্লাদে থাকি, তেমনি যত্ন আর শাসন পাই।
সামিউ আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বললেন,,
“মানে? আমি তো আপনাদের এলাকায় এবারই প্রথম পা রাখলাম। যদিও আসার কথা ছিল আরও আগে, কিন্তু আন্টির নিষেধাজ্ঞা থাকায় তখন আর আসা হয়নি। বাই দ্য ওয়ে... আর ইউ ওকে? প্লিজ বসুন, রিল্যাক্স হোন। আপনি হয়তো আমাদের একটু বেশিই টাফলি নিয়ে নিয়েছেন। উই আর ফ্যামিলি নাও, সো জাস্ট রিল্যাক্স।”
আমার মা তো বিয়েতে সরাসরি সম্মতি দিলো না, আর নিজেকে আমার ফ্যামিলি দাবি করছে? অদ্ভুত কথা! আমি ভুল হতেই পারি না। যে কণ্ঠ আমি হাজার বছরেও ভুলব না, সে আমাকে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে অপরিচিত প্রমাণ করতে চাইছে? সেই কালো গায়ের রঙ, চোখের মোটা ও ঘন পাপড়ি। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল দেহ, যার কাঁধ পর্যন্ত সমান হওয়ার মতো উচ্চতাও আমার নেই। আর সেই হুমকি দেওয়া ভারী পুরুষালি কণ্ঠ! আমি শতভাগ শিওর এটাই সে। আমি তাকে জবাবদিহি করতে চাইলাম, কিন্তু পেছন থেকে মায়ের হাতের চাপ আমার বাহু যেন ছিঁড়ে ফেলছিল।
মা পরিস্থিতি সামাল দিতে বললেন,
“পড়ার কত চাপ যায় মেয়ের ওপর! হয়তো তোমার মতো কাউকে দেখেছে রাস্তায়, সেটাই মনে করে বলছে। কিছু মনে করো না বাবা।”
“না না আন্টি, আমি বুঝি। উনি হয়তো একটু নার্ভাস হয়ে আছেন। আ... আমি কি ওনার সাথে একটু একান্তভাবে কথা বলতে পারি?”
পাশেই দুজন মুরুব্বি বসে আছেন, কিন্তু সামিউর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তার কথায় আবেদন আর আদেশের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। যেন তার কথাই চূড়ান্ত, অভিভাবকেরা তো নামমাত্র! আমার মায়েরও তার সাথেই কথোপকথন বেশি। মা সম্মতি দিলেন।
আমি আমার কক্ষে আসলাম এবং এক কোণে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে পরি চুপটিকরে। তবে এখন সাহস করাটা খুব জরুরি। সে হেঁটে হেঁটে আমার ঘরের সাজগোজ দেখছে। পরিপাটি রুমটায় আমার আর আমার মায়ের ছবিগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে, এতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে খুব। অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে, আমি তার পেছনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে এক শ্বাসে বলেই ফেললাম,
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না।”
একদমে কথাটা বলেই চোখ মেললাম। সে আমার দিকে ফিরে আমার লিপস্টিকটা হাতে নিয়ে রেখেছে। ওটার ক্যাপ খুলে এমনভাবে শুঁকছে, যেন আমার কথা তার কানেই যায়নি! লিপস্টিকের গন্ধটা অদ্ভুতভাবে শুঁকতে শুঁকতে বলল,
“এইটা ব্যবহার করা যাবে না। ঠোঁটে আমি কোনো প্রলেপ চাই না।”
লিপস্টিকটা পাশে রেখে সে আমার দিকে চোখ রাখে, আমি আবার কিছু বলে ওঠার আগেই, আমার ঠোঁটের ওপর নিজের লম্বা আঙুল চেপে ধরে আমার কথা থামিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল,
“এমন একটা টেন থাউজেন্ড লুমেন্সের LED লাইটের মতো আই উইটনেস আমি কীভাবে ছেড়ে দেব? আমি তোমাকেই বিয়ে করব, এবং আজকেই করব। লাভ ইউ, ডার্লিং।”
আমি স্তব্ধ হয়ে আছি। এবার শতভাগ নিশ্চিত হলাম, এটাই সেই অমানুষ, যার অফিশিয়াল নাম সামিউ। আমার মস্তিষ্ক আঁচ করতে পারল যে এখানে আর ভয় বা সরলতা দেখালে চলবে না। কিন্তু আমি তো ভেতরে ভেতরে ভীষণ কাঁপছি, সকালের সেই মর্মান্তিক দৃশ্য আমাকে কাবু করে রেখেছে। আমি বললাম,
“আমি তো বলেছি কাউকে কিছু বলব না। আর মাকেও তো কিছু বলিনি, তাহলে কেন এসেছেন?”
সামিউ মুচকি হাসে। আমার দিকে ঝুঁকে, একদম কাছে এসে হিসহিস করে বলল,
“আমি আপনার কালাচাঁদ, আর আপনি আমার হাজার ওয়াটের এলইডি লাইট। বেস্ট কম্বিনেশন মেলাতে এসেছি। লাভ ইউ, ডার্লিং।”
তার শ্বাস আমি শুনতে পারছি, হয়ত সেও আমার ভেতরে ভয়টা বুঝতে পারছে। কারন আমার কলিজা লাফাচ্ছে জাম্পিং বলের মতো। দরজায় ঠকঠক শব্দ হতেই আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না, আসলে বন্ধ ঘরে আমার দম আটকে আসছিল, তাই তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। গিয়ে সোজা মায়ের পেছনে ঘাপটি মেরে দাঁড়ালাম।
বন্ধ ঘরে লোকটার এক রূপ, আর মায়ের সামনে তার আরেক রূপ দুটো রূপই আমি আজ দেখেছি। তার সেই স্থির, শীতল চোখ যা আমার মায়ের মতো কঠোর মনকেও গলিয়ে মোম করে দিয়েছে। সে কি কোনো বড় মাপের ম্যানিপুলেটর? নয়তো কীভাবে আমার মাকে এত সহজে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল? মুহূর্তেই আমার জীবনটা বদলে দিল মায়ের সেই দায়িত্বশীল রূপ, যিনি আমাকে একজন 'যোগ্য ও দায়িত্ববান' পুরুষের হাতে তুলে দিয়ে শান্তিতে শ্বাস ফেলতে চান। আর ওনার চোখে সামিউ সেই দায়িত্বশীল পুরুষ।
সামনাসামনি বসে আমি আতঙ্কে শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছি। লোকটা গম্ভীর গলায় আমার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
“আন্টি, আপনার এলইডি লাইটটার কিন্তু অনেক পাওয়ার! আমার কালো মুখটা একদম চকচক করছে। আই নিড ইট।”
#the_captive
#স্বর্ণালী_ইসলাম