ফন্ট সাইজ:
থিম:
The Captive

২য় পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

"মা, তুমি কেন বুঝতে পারছ না? যেই লোকটার সাথে তুমি আমার বিয়ের কথা ভাবছ, হি ইজ আ মনস্টার! কিছুক্ষণ আগেই আমি তাকে একটা মার্ডার করতে দেখেছি। এত রুথলেসলি, এত নির্মমভাবে সে একটা মানুষকে শেষ করে দিল, আমি ওমন মানুষের সঙ্গে কিভাবে? মা!”

​" আধা ঘণ্টা আগে একটা নির্মম খুন করে একটা মানুষ এখন এতটা পারফেক্টলি রেডি হয়ে তোকে বিয়ে করতে চলে এসেছে? এটাকি সম্ভব? তুই কি পাগল হয়েছিস, নাকি কোনো সাইকো থ্রিলার মুভি দেখে তোর মাথাটা গেছে? জাস্ট স্টপ দিস ননসেন্স! তহু।”

“কেনো বিশ্বাস করছো না ,আমি মিথ্যা বলছি না।”

​বাহিরে সামিউ বসে আছে, আর বন্ধ কক্ষে তহু নিজের মাকে বোঝাচ্ছে সে বিয়ে করতে চায় না। কিছুক্ষণ আগে যেই লোকটাকে নরপিশাচের মতো খুন করতে দেখলো তাকে কিভাবে ঘণ্টা না যেতেই বিয়ে করে নেবে সে? তবে মায়ের একঘেয়েমি জেদ, ওনার চোখে সামিউ নামের মানুষটা একজন ভীষণ দায়িত্ববান লোক। তহুর কথায় ওনার চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি ফুটেছে। তিনি একটু রুষ্ট হয়ে বললেন,

“তহু, তোর বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে আমি একাই তোকে বড় করেছি। লাইফের প্র্যাক্টিকাল দিকটা তুই এখনো বুঝিস না। আমি চাই তোর লাইফ পার্টনার এমন কেউ হোক, যার পাশে থাকলে তোকে ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিস বা যত্নের অভাব কোনোটা নিয়েই কোনোদিন ভাবতে না হয়। সামিউকে আমি বছর খানেক ধরে চিনি, ওর ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে আমার ক্লিয়ার আইডিয়া আছে। তুই কল্পনা বের হয়ে আস।”

তহুরা হতাশ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মায়ের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে সে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

"তুমি যাকে বলবে আমি তাকেই বিয়ে করে নেবো মা, কোনো আপত্তি করব না। কিন্তু প্লিজ, ওই লোকটাকে না... দয়া করো আমার ওপর! আমি ওর ওই চোখ দুটো দেখেছি, যার ভেতরের হিংস্র দৃষ্টিটা একদম একটা রক্তাক্ত হায়নার মতো! ও মানুষ না মা, ও একটা জানোয়ার!”

তহুর আকুল আকুতি শুনে তার মায়ের ভেতরের ভাবটা বোঝা মুশকিল । ওনার চোখ দুটো টলমল করছে। তিনি তো কেবল মেয়ের একটা সুন্দর, নিরাপদ জীবন চান, যা সামিউ এক তুড়িতে দিতে পারবে। বিশাল বাড়ি, অঢেল টাকা, এমনকি ছেলেটা নিজেই এই বিয়ের জন্য আগ বাড়িয়ে এসেছে। এই সমাজে তেমন একটা ক্ষমতাশালী ছেলের ওপর কি আর কারও কথা চলে? একটা মা আর কী-ই বা চায় মেয়ের জন্য! মেয়ের স্বামী যখন এত জোর আর দাপট নিয়ে পাশে থাকবে, তখন মেয়ের ওপর কোনো অন্যায়ের জোর খাটে কী করে? তিনি আলতো করে তহুর গালে হাত রেখে, ক্ষীণ অথচ পাথরের মতো শক্ত গলায় বললেন,

"তহু... তুই সামিউকে বিয়ে করবি, এবং আজকেই করবি। এটাই আমার শেষ কথা। আমার বয়স হয়েছে বিয়ে করে কাধ হালকা করে দে।”

​তিনি কথার সমাপ্তি করেই কক্ষের দরজা খুলে বের হতে যান। মায়ের এমন আচরণে মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয় অষ্টাদশীর কোমল হৃদয়। পেছন থেকে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় ডেকে ওঠে তহু,

"যদি নিজের কাঁধটাই হালকা করতে চাও, তবে অন্যের কাঁধ কেন ভারী করছ? তার চেয়ে ভালো আমাকে কবর দিয়ে দিও। মরে যাবো আমি, তাও ওই নরপিশাচকে বিয়ে করবো না।”

মেয়ের মুখে মৃত্যুর কথা শুনে চলতি পা থমকায় মহিলার। তিনি ধীর পায়ে পেছন ফিরলেন। তহুরার চোখের দিকে বড় বড় নেত্রে তাকিয়ে রইলেন ক্ষণকাল। যে মেয়ে ওনার প্রতিটা সিদ্ধান্ত এতোগুলো বছর ধরে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এসেছে, সে কিনা আজ এমনভাবে মুখ ফেরাচ্ছে যে তার কাছে মরণটাও সহজ লাগছে? ওনার পায়ের গোড়ালি তিরতির করে কাঁপছে। এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না আর, কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন বিনা বাক্যে। দরজাটা বন্ধ হতেই বিছানার একটা কোনায় ধপ করে বসে হো হো করে কেঁদে উঠে তহুরা। মায়ের কাঁধে কি সে আসলেই এমন এক বোঝা হয়ে উঠেছে? সবে তো আঠারোতে পা রেখেছে সে। আর একটু সময় পেলে, নিজেকে কিছুটা সবল করার সুযোগ পেলে সে তো নিজেই যোগ্যতা রাখত নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার। তবে কেন এত তাড়া? কেনো ওই জানোয়ারটার সঙ্গেই তাকে বেঁধে দিতে চান?

–

​সোফায় বসে গাম্ভীর্য বজায় রেখে ফোন স্ক্রল করছে সামিউ। চোখে-মুখে তার উপচে পড়া আভিজাত্য। গায়ের রঙ চাপা হলেও চোখ-নাকের খাঁজ ও গড়ন বেশ অসাধারণ। এমন একজন ছেলেকে শুধু মনগড়া কল্পনার ওপর ভিত্তি করে প্রত্যাখ্যান করাটা যে তার মেয়ের জন্য চরম আফসোসের হবে, সেটা বুঝতে বাকি থাকে না। তবে পাশে বসে থাকা বাকি দুজন অভিভাবকের সঙ্গে সামিউর তুলনা করাই বৃথা, তার এই অহংকার ও রাজকীয় স্বভাবের বিন্দুমাত্র গুণ নেই তাদের মাঝে। দেখলে মনে হয়, কেবল পরিবার দেখানোর জন্যই এরা পাশে বসে আছে, আসলে এরা তার কেউ নয়। ​তহুরার মা সামিউর দিকে এগিয়ে গিয়ে স্থির হলেন। সামনে ওনার অবয়ব দেখামাত্রই ফোনটা লক করে চোখ তুলে তাকায় সে। ভদ্রমহিলা হয়তো মনে মনে কিছুটা ইতস্তত করছিলেন, তবে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

“সামিউ, কথা ঘুরিয়ে তো কোনো লাভ নেই।”

​সামিউ ওনার দিকে স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে। শান্ত গলায় বলো

“জি, বলুন।”

​এবার নিঃসংকোচ হয়ে কথাটা বললেন ভদ্রমহিলা,

“তহু সিদ্ধান্ত দিয়েছে, ও কোনোভাবেই তোমাকে বিয়ে করতে চায় না। জানি না রাস্তায় ও এমন কী দেখেছে, তবে ওর মানসিক হেলথ বড্ড খারাপ। আমরা দুটো দিন সময় নিয়ে কথা?”

নড়েচড়ে বসে এক চিলতে শীতল হাসে সামিউ। তারপর উঠে দাঁড়ায় ওনার ঠিক সামনে, একদম টানটান হয়ে। ঘাড় সামান্য কাত করে, একটু ঝুঁকে বিষাক্ত নরম গলায় বলল,

“আন্টি, বলেছিলাম তো আমাকে আপনার বাড়ি আসা থেকে যতদিন আটকে রাখতে পারবেন, আপনার মেয়ে ততদিনই আপনার। এখন যখন আমি নিজে বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছি, তখন আপনার মেয়ে শুধুই আমার।”

​বলেই একটা চরম বিরক্তি আর ক্লান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে। যেন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে, এমন ভঙ্গিতে হাত ঝেড়ে অবহেলায় হাঁক ছেড়ে বলে,

“কোথায় আমার ডার্লিং LED? চারপাশটা আঁধার হয়ে যাচ্ছে ডার্লিং, আমাকেও একটু আলো দাও!”

“সামিউ আমার কথা শোন ও রাজি হবে না এভাবে তুমি বরং আর কিছুদিন অপেক্ষা করো।”

______

ঠাস ঠাস

হঠাৎ একটা বিকট গুলির শব্দ! হাঁটুর ওপর থেকে চট করে মুখ তুলেই কেঁপে উঠে তহুরার পুরো শরীর। ক্রন্দনরত মুখটা তুলে দরজার দিকে তাকায়। বন্ধ দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। বাইরের হালকা আলোয় একটা বিশালদেহী অবয়ব তার দিকেই এগিয়ে আসছে। পায়ের বুটে এবারেও তাজা রক্তের দাগ, তবে সকালের চেয়ে দৃশ্যটা কিছুটা ভিন্ন, তখন ছিল পিচঢালা পথ, আর এখন ঘরের ধবধবে টাইলস করা ফ্লোর। তার হাতের পিস্তলটা থেকে এখনো ধোঁয়া উড়ছে, তাই গুলিটা যে ওই করেছে, সেটা বুঝতে তহুরার বিন্দুমাত্র সময় লাগে নি। ​ভয়ে কোমর টেনে টেনে পেছনে পিছিয়ে যাচ্ছে সে, কাঁপছে থরথর করে। শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা যেন জানান দিচ্ছে, এখনই তার প্রাণপাখি উড়ে যাবে। চোখে উপচে পড়ছে রাজ্যের ভয়, যা লুকানোর সব চেষ্টাই বৃথা। কাঁপা গলায় সে প্রশ্ন করে,

“আপনি... আপনি আবার খুন করেছেন? কাকে?”

​সামিউ তপ্ত শ্বাস ফেলে। ধীরপায়ে তার একদম কাছে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে মেঝেতে। নিজের শক্ত হাত বাড়িয়ে অষ্টাদশীর ক্রন্দনরত চোখ দুটো আলতো করে মুছে দিল। সেই খুনে হাতটা শরীর ছোঁয়া মাত্রই তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় রমণী। তা দেখে সামিউ আরও কাছে এগিয়ে যায় একদম ওর কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,,

“ডার্লিং, কেন রাগাও আমাকে? শেষমেশ তো 'কবুল' বলবেই, তবে অহেতুক এসব নাটক করে লাভ কী? এতে তোমারও সময় নষ্ট, আমারও সময় নষ্ট!”

চোখ টিপে, তীব্র ঘৃণায় তার হাতটা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দেয় তহুরা। ভয়ে ভেতরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে, তবুও এবার সে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে পাষাণ লোকটার ওপর,,

“আমি মরে যাব, তবুও আপনার মতো নরপিশাচকে বিয়ে করব না!”

​তার কথা শুনে সামিউ ফিক করে হেসে উঠে। পরক্ষণেই তহুরার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মুখটা আবার কঠিন করে, রাগে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ধরেছে। ক্রোধে যেন কিলবিল করে উঠছে তার মস্তিষ্কের প্রতিটি শিরা-উপশিরা। বসা থেকে আচমকা উঠে দাঁড়ায়। জুতোয় লেগে থাকা রক্ত মেঝেতে ছিটিয়ে ঘর থেকে হনহন করে বের হয় যায়। ​খুব বেশি সময় নিল না, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসেছে আবার। হাতে একটা স্টিলের শিশি, যাতে ভরা কোনো এক পানীয়। ফ্লোরে ঠিক তহুরার সামনে সশব্দে শিশিটা রাখে সে, আর তার ঠিক পাশেই নামিয়ে রাখে হাতের কালো পিস্তলটা। একবার চোখ ঘুরিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকায় সামিউ, চোখের চাউনি আরও কঠিন ও শীতল হয়ে উঠছে তার। এবার ঘরের বিশাল আলমারিটা টেনে সেখান থেকে একটা ওড়না বের করে। কয়েকটা পেঁচ দিয়ে একটা নিখুঁত ফাঁসির ফাঁদ তৈরি করে সেটির পাশে রাখে, ​ প্রতিটা জিনিস তহুরার ঠিক সামনে সাজিয়ে রেখে সামিউ সোজা হয়ে দাঁড়ায়, পাশ থেকে সুন্দর ছেলে কাঠের চেয়ার এগিয়ে দেয় তার বসার জন্য। সে চেয়ারটায় পায়ের ওপর আরেক পা তুলে আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসে, যেনো অনেক ক্লান্তির কাজ শেষ করেছে।চোখে এখন অদ্ভুত এক হিংস্র আগুন জ্বলছে। এত সময় অপচয় করার মতো ধৈর্য বা সময় কোনোটাই আর তার নেই। কেবল এই একটা পুঁচকে মেয়ের জন্য এত সময় নষ্ট হচ্ছে তার। ভারী শ্বাস ফেলে, গলার স্বর চেপে একদম হিংস্র গলায় সে বলে,,

"ডার্লিং, এখানে তিনটা কাস্টমাইজড অপশন আছে তোমার জন্য। যেটা পছন্দ হয় ঝটপট বেছে নিয়ে মরে যাও। মরলে আমার সামনেই মরো, আর না মরলে আজকেই তুমি এই নরপিশাচের বউ হচ্ছ। চয়েস ইজ ইয়োরস!”

​নিথর, শীতল ভয়ের স্রোত বয়ে যাচ্ছে তহুরার শরীর জুড়ে। তার সামনে এখন স্রেফ মৃত্যুর দুটো পথ খোলা, আর সামনে বসে আছে এক হিংস্র পশু। যেকোনো একভাবে আজ তাকে মরতেই হবে। হয় এই জানোয়ারের সঙ্গে তিলে তিলে নয়ত আত্মহত্যা করে এখনই। কিন্তু এই জানোয়ারটার হাতে তিলে তিলে শেষ হওয়ার চেয়ে, একবারে মরে যাওয়াটাই কি শ্রেয় নয়? ​সেটাই করল সে। কাঁপা হাত বাড়িয়ে পিস্তলটা তুলে নিয়েছে নিজের মুঠোয়। ভয়ার্ত মুখে সমস্ত সাহস পুঁজি করে নলটা ঠেকায় নিজের কপালে। পাষণ্ড লোকটা তবুও তাকে আটকাচ্ছে না। বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নিষ্ঠুর হাসি ফুটিয়ে বলে

“ডার্লিং, তোমার কপালে ফাঁসি নয়তো বিষ, কিছু একটা তো ছিলই। তুমি গুলি কেনো তুললে? এত চালাকি করো কেন বলো তো, বোকা মেয়ে? আমি তো তোমাকে বেশ চালাক ভাবতাম।”

​বলেই বসা থেকে একটু কোমর তুলে তহুরার দিকে ঝুঁকে । একদম কাছে, যাতে রমণীর ভয়ার্ত আর্তশ্বাসটুকুও সে তার কান দিয়ে শুষে নিতে পারে। পিস্তলের ধাতব স্পর্শে তহুরা ততক্ষণে ভয়ে কাঁপছে। সামিউ তার একটা হাত পিস্তলের ওপর রাখে অন্য হাতে স্লাইডটা শক্ত করে পেছনের দিকে টেনে ছেড়ে দিল। খটখট শব্দের সাথে সাথে হিসহিসিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে বলল,

“এবার এটা প্রস্তুত, কারো প্রাণ নেওয়ার জন্য।”

​আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসেছে আগের মতোই স্থির, হিংস্র চোখ দুটো আটকে আছে তহুরার মুখের ওপর। মেয়েটা কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে নিয়েছে। সে জানে, আজ এই সিদ্ধান্ত না নিলে আজীবন তাকে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। আর কোনো দ্বিধা না রেখে সে ট্রিগারে আঙুল ছোঁয়ালো। ভয়ে শক্ত হয়ে আসা গলা দিয়ে ঢোক গিলতেই কন্ঠনালীটা ওপর-নিচ হয়। শরীর বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে তার। নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে ট্রিগারটা চাপতেই যাবে, ঠিক তখনই কানে আসে অতি পরিচিত আকুল স্বর,

“তহু, থেমে যা মা!”

মায়ের সেই আকুল আকুতি আর কম্পিত কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদে চট করে চোখের পাতা মেলে তাকায় তহু। পরমুহূর্তেই তার চোখের সামনে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে! প্রিয় নারীর একটা বাহু আর পায়ের গোড়ালি বেয়ে ধুমসে রক্তের স্রোত বইছে। তার হাতের পিস্তলের পাকড়াও কিছুটা আলগা হয়ে আসে, মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য উঠতে যায় তরিঘরি করে। কিন্তু সে এগোনোর আগেই সামিউ বসা থেকে উঠে তার লম্বা খোলা চুলগুলো শক্ত মুঠোয় পেঁচিয়ে ধরে। হেঁচকা টানে মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,,

"কানে কথা যায় না তোমার? প্লিজ ডার্লিং, তাড়াতাড়ি মরে যাও। আর, তুমি মরে গেলে তোমার মা একা একা এই স্বার্থপর দুনিয়ায় কী করবে বলো? ওনারও মরে যাওয়া উচিত!"

​মায়ের এই করুণ অবস্থা দেখে অষ্টাদশীর বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে মূহুর্তে। অশ্রুসিক্ত নয়নজোড়া আরও রক্তিম হয়ে উঠেছে, চোখের জলের ধারা যেন বাঁধ মানতে নারাজ। সে ডুকরে কেঁদে উঠে আকুতি ভরা ব্যকুল গলায় বলে,

"প্লিজ, ওনাকে হসপিটালে নিয়ে যান! অনেক রক্ত ঝরছে, দয়া করুন ওনার ওপর... মা!"

​সামিউ তহুরার চুলে নিজের গ্রিপ আরও শক্ত করে ধরলো, ঝটকা দিয়ে মেঝেতে ছুড়ে মারে তাকে। নিচু অথচ বরফশীতল কঠিন গলায় বলে,

"তুমিই যখন থাকবে না, তখন ওনার আর একা একা কষ্ট করে বেঁচে থাকার কোনো দরকার নেই।"

​কথাটার শেষ করে হাতের পিস্তলটা তুলে সরাসরি তহুরার মায়ের দিকে তাক করে। ঠোঁটের কোণে একটা হিংস্র, শীতল হাসি চোখে স্পষ্ট রাগ আর চরম বিরক্তি। তহুরা কেবল ডুকরে কাঁদছে। মা জ্ঞান প্রায় হারিয়েছেন, প্রাণ যায় যায় অবস্থা। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া রক্তের স্রোত স্পষ্ট বলে দিচ্ছে,চিকিৎসা না পেলে ওনার প্রাণপাখি আর বেশিক্ষণ টিকবে না। সামিউ ফের তহুরার কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলে,,

"জাস্ট একটা সাইন আর মুখে একটাবার 'কবুল', ডার্লিং! ব্যস, আমরা বাসর ঘরে যাবো আর তোমার মা হসপিটালে প্রোপার ট্রিটমেন্ট পাবে। প্লিজ ডার্লিং, আমি কিন্তু নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারছি না। অন্তত তোমার মায়ের দিকটাও তো ভাবো? ভদ্রমহিলা কত কষ্টই না পাচ্ছেন!”

নিস্তেজ মায়ের হাতটা ধরে কোনক্রমেই টেনে ধরে রেখেছে একটি মহিলা গার্ড। তহুর চোখের কোণ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে মেঝের রক্তের স্রোতের সঙ্গে। মায়ের এই করুণ অবস্থার সামনে নিজের সব জেদ, সব সত্যি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মুছে যাচ্ছে সকালের ভয়ানক দৃশ্য। এক বুক হাহাকার নিয়ে ভাঙা গলায় হার মানে সামিউর নিকট,,

"আমি রাজি! বিয়ে করব আমি। ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যান আগে। আমি মরব না.."

​তহুরার অসহায়ত্ব সামিউর ঠোঁটে এক বিজয়ীর হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলেছে। যা তহুরার ঝাপসা চোখজোড়া দেখলো না রয়ে গেলো আড়াল। পলকেই সে রেজিস্ট্রি কাগজ তহুরার সামনে মেলে ধরে,,

"ব্যস, এবার ফার্স্ট থিং ফার্স্ট! সাইন করো এখানে।"

​মায়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে তহু, বুক ফেটে কান্না গলা দিয়ে স্বর ফুটছে না। সামিউ নিচু স্বরে তার কানের কাছে তাগিদ দিয়ে বলল,,

"টিক টক ডার্লিং! ওনার শরীরের প্রতিটা ফোঁটা রক্ত কমে যাওয়া মানে ওনার আয়ু কমে যাওয়া। সাইন ইট কুইকলি!"

​ তহুর আর এক মুহূর্তও ভাবার সময় নেই। কাঁপানো হাতে মাথা নেড়ে তড়িঘড়ি করে পরপর দুটো কাগজে সই বসিয়ে দিয়েছে। ওপাশে দরজার আড়াল থেকে বডিগার্ড কাজির কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে ঘরের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ঢোকায়, লোকটায় ভয়ে কাঁপছেন প্রচন্ড। সামিউ ধীরেসুস্থে কাগজ দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নেয়, ওটার ওপর হাত বুলিয়ে অদ্ভুত নেশাগ্রস্ত গলায় বলে,

"এই প্রথম কাগজটা আমাদের অফিশিয়াল বাসরের সার্টিফিকেট, ডার্লিং। আর এই দ্বিতীয়টা হলো একটা ডিল তোমার মায়ের বেঁচে থাকার গ্যারান্টি, আর আমার কাছে তোমার আজীবনের দাসত্ব!”

এবার সামিউকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে দেয় সে। ঝটকা দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বসে, নিজের পরনের শাড়ির আঁচলটা দাঁতে টেনে ছিঁড়ে রক্তাক্ত ক্ষতস্থানটায় চেপে ধরে, রক্ত থামানোর চেষ্টা করছে। অর্ধ-অচেতন মহিলাটি নিস্তেজ হয়ে হেলে পড়লেন মেয়ের পায়ের ওপর। ডুকরে কেঁদে উঠো তহুরা

"অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন এবার! দয়া করে তাড়াতাড়ি করুন!"

​সামিউর চোখের ইশারা পেতেই দুজন গার্ড এসে তহুরার কোল থেকে তার মাকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়েছে, সামিউ এগিয়ে অষ্টাদশীর কবজিটা নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করে। গার্ডরা তার মাকে চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তহু চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ছে, অসহ্যনীয় আর্তনাদ,,

"আমি যাবো! আমি মায়ের সঙ্গে যাবো!"

​হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করছে সে। কিন্তু বাঘের মতো হিংস্র সেই থাবা থেকে বেরিয়ে আসা কি এতই সহজ? সামিউর গায়ের শক্তির সঙ্গে না পেরে উঠে তহু সজোরে কামড় বসিয়ে দিল তার কালো হাতটায়। আচমকা কামড়ে সামিউর হাত আলগা হতেই তহু মায়ের দিকে দৌড় দেয়। মূহুর্তে পরপর দুটো তীক্ষ্ণ ‘ঠাস ঠাস’ শব্দে বুলেট এসে বিঁধল মায়ের বুকে!

​মুহূর্তে থমকে গেল তহুরার চারপাশের সম্পূর্ণ পৃথিবী। স্তব্ধ নেত্রে সে শুধু দেখছে মায়ের দেহটা নিষ্প্রাণ হয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ছে। নড়ার শক্তি হারিয়ে সে নিজেও যেন একটা নিথর পাথরে পরিণত হলো। মায়ের নিস্পন্দ শরীরটা মেঝে ছুঁয়ে যেতেই, তহু নিজেও জ্ঞান হারিয়ে ধপ করে পড়তে নেয়। শেষবারের মতো শুধু অনুভব করল, সে কারও শক্ত বাঁধনে আটকে আছে। তার অচল মস্তিষ্ক শেষ মুহূর্তে কেবল এটুকু ধারন করলো, সে আজ বড় অসহায়... এতটাই অসহায় যে নিজের জন্মদাত্রী মায়ের খুনির হাতেই সে বন্দি হয়ে গিয়েছে। সামিউ তার গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে ডাকার চেষ্টা করছে, তবুও কোনো সাড়া দিচ্ছে না অষ্টাদশী।

চলবে...

#the_captive

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ২

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন