এয়ারপোর্টের পিচঢালা রাস্তা, সন্ধ্যার আগের সূর্যটা আকাশে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। কিছু মানুষের কাছে সময়টা অসম্ভব সুন্দর হলেও যার জীবন সম্পূর্ণ এলোমেলো তার চোখে ঠেকবে না। এয়ারপোর্টের বাইরে বিধ্বস্ত হয়ে ছুটছে এক যুবক। মনে হয় প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় মত্ত সে। পরনের সাদা শার্টটি ফর্সা ত্বকের সাথে ঘামে লেপ্টে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে দুলছে। আরে বিদেশ ভ্রমণে তো মানুষ কত ঠাটবাট নিয়ে চলে। কিন্তু ছেলেটি বিদেশ থেকে এইভাবে আসছে? ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে, অস্পষ্ট স্বরে বিরবির করে বলছে,
"পেঁচি, এটা করিস না। সরি সরি, এত বড় শাস্তি নিতে পারবো না।"
"অহীন থামো, গিয়ে কোনো লাভ নেই আশার নিজেরও জীবন আছে।"
"জানি না, আমার আশা আমার পেঁচি।"
পেছন থেকে অনবরত পুরুষালি কণ্ঠে ডাক পড়ছে। তবুও তাকানোর সময়টুকু তার নেই। ঢাকার শহরের রাস্তায় নেমে কপালে হাত দিয়ে ক্লান্ত গলা ঢোক গিলে ভিজিয়ে নেয় অহীন। চারপাশে তাকিয়ে বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে সে? পকেট হাতড়ে নিজের ফোনটা খুঁজে। তা তারাহুরো করে ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে এসেছে। নিজের একটা কাপড়ও নেয়ার সময় সে পায়নি। মনে থাকে কোথায় এগুলো? হয়তো ফোনটা বাড়িতে বা ট্যাক্সির কোনো এক কোনায় পড়ে আছে খুবই অযত্নের সাথে। পেছন ফিরে দৌড়ে যায় সেই লোকটির কাছে। নিজেই লোকটির স্যুটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। শ্যামলা মুখটা ক্লান্তিতে লাল হয়ে গিয়েছে, অহীনের এমন কাজে প্রশ্ন করে,
"কি খুঁজছো?"
"পাপি তোমার ফোন দাও, বাইক বাইক লাগবে।"
সৃজন কিছু বলার আগেই ফোনটা বের করে নিলো অহীন, ছুটে কাউকে কল করতে করতে এয়ারপোর্টের বাইরে রাস্তায় পৌঁছায় সে। সৃজন ওর পিছু, এতগুলো বছরে মুখের একটুও পরিবর্তন ঘটেনি তার। ঘটবেই বা কী করে? জেইনের পরম যত্নের পুরুষ যে সে। একটা বোতল পানিতে চুমুক দেয় সৃজন, গলা দিয়ে নামতে সময় দিলো না। বাতাসের গতিতে একটা বাইক এসে থামে তাদের সামনে, অহীন সময় নষ্ট করলো না। বাইকে বসে পড়ে। মুখের পানি মুখে রেখেই ছুট লাগায়, গিয়ে অহীনের শার্ট ধরে বলে,
"আরে পাঠার বাচ্চা নিয়ে যা আমাকে।"
কোনো প্রকার গলা দিয়ে পানিটা নামিয়ে সৃজন বাইকের পেছনে বসে। বাইক আবারও বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে। সৃজন অস্পষ্ট স্বরে অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,
"এই বয়সেও আমাকে তোমার পেছনে ছুটতে হয়। আমার সাথে থেকে তুমি অন্তিকের সম্পূর্ণ গুণ কি করে পেতে পারো?"
"সাট আপ পাপি, তুমি বুঝতে পারছো না, আমার দুনিয়া অন্য কেউ নিয়ে যাচ্ছে।"
"সে টা এখন তোমার নেই, অহেতুক মরিচিকার পিছু নিচ্ছো তুমি।"
সৃজনের গভীর কথায় পাত্তা সে দিলো না। বাইক চালককে তাড়া দিয়ে বলল,
"ব্রো প্লিজ ফাস্ট।"
বাইকের স্পিড আরো বাড়লো, অহীনের চোখগুলো লাল হয়ে আছে, গালগুলোও লাল ধবধবে হয়ে আছে। সৃজন বুঝতে পারে হয়তো সুগার ফল হচ্ছে। পকেট থেকে একটা ট্যাবলেট এগিয়ে ওর মুখের সামনে ধরে। তবে ছেলেটি গ্রহণ করলো না। হতাশার শ্বাস ফেলল সৃজন। সে জানে এই শ্রম, এই জার্নি সব অহেতুক যা হবার হয়ে গিয়েছে। তবুও অহীনের জন্য আসতে হলো।
___________
জীবনের বিরাট সিদ্ধান্ত নিয়ে এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে, গায়ে খুবই হালকা কাজের একটা লাল শাড়ি, আর লাল লিপস্টিক। দেখে আন্দাজ করা যায়, কোনো জাঁকজমকপূর্ণভাবে নয় বরং খুবই সাধারণভাবে বিয়ে হচ্ছে মেয়েটির। জানালার বাইরে অধীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে। শ্যামলা সেই মুখটা মলিন হয়ে আছে। পেছন থেকে ডাক পড়তেই হুশে ফেরে মেয়েটি,
"আশা?"
"হুম।"
হকচকিয়ে তাকায় আশা তার সামনে, তার সবচেয়ে প্রিয় নারীটি দাঁড়িয়ে আছে। ইস কি মিষ্টি এই মুখ, আশার চোখে জল থৈথৈ করে ওঠে। এগিয়ে এসে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়,
"ফুম্মি, তোমার মতো হওয়া কঠিন খুব। এলোমেলো করে দিলো তোমার ছেলে আমার জীবনটা।"
আশার পিঠে ধপধপ করে কয়েকবার আদুরে থাপ্পড় দিয়ে কুহু নরম স্বরে বলে,
"না আশু, জীবন এলোমেলো নয় তোর, আয়াশ আছে তো তোকে গুছিয়ে দিতে।"
মুখ তুলে কুহুর পানে একটু তাকায় আশা, কি অদ্ভুত মানুষটা নিজের ছেলের বিপক্ষে তার জন্য। অবশ্য মেয়েটাও তাদেরই। কুহেলিকা ওর হাত ধরে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে দেয়। চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ এই তো সবাই আছে সামনেই বসে, কারো মনে বিষণ্ণতা নেই, কত আনন্দ মেয়ের বিয়ে বলে কথা। আয়াশ অপরূপ সুদর্শন এক যুবক, কতগুলো দিন গুনেছে তাকে পাওয়ার আশায়। কোঁকড়ানো চুল, নিচের অধরে দৃশ্যমান একটি লাল তিল, অহীনের মতো ফর্সা না হলেও নিঃসন্দেহে সে অপূর্ব অহীনের চেয়ে বেশি। আশাকে তার পাশেই বসিয়ে দেয়া হলো। সবার দৃষ্টি আশা এবং আয়াশের দিকে। স্বল্প বছর আগেও এই দু’টো মানুষের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো, তবে বন্দীখানায় সব ওলটপালট করে দিয়ে গেলো একটি ঝড় এসে। তাশার মন ভালো নেই, দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। আশা চারপাশে দেখে নিলো মন দিয়ে। কুহেলিকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
"অন্তু কই?"
আয়াশের মুখ মলিন হয়, আড়চোখে আশার দিকে তাকায় সে। কুহেলিকা অল্প হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
"ওর কথা বাদ দে, রুমে আছে হয়ত ঘুমিয়ে।"
"ঘুমাবো কেনো? নিজের চাচাতো বোনের বনাম এক্স ভাবির বিয়ের জন্য সাজলাম।
পেছনে একটি কক্ষের দরজার সামনে ভারী মেকআপের প্রলেপ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা এক মেয়ে, দু’টো ভাইবোন অন্তিকের সাথে গায়ের রং হুবহু মিল। কথার সমাপ্তি হলো, কুহেলিকা গুরুত্ব দিলো না অন্তিহার কথার। আয়াশের পরিবার থেকে তেমন কেউ নেই, লিজা তিতাশ বরাবরই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে, দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। একজন বৃদ্ধা হয়তো আয়াশের দাদু হবে। মাথাটা নিচু করে বসে আছে আশা। একটি হাত বাড়িয়ে আশার হাতের উপর রেখে শান্ত চোখে আস্থা দিয়ে বিরবির করে বলে আয়াশ,
"চিন্তা করো না পুতুল, তোমার সব সিদ্ধান্তে পাশে আছি তো আমি।"
মনের ভেতর একটু তো তৃপ্ততা আয়াশের আছে, ছোট থেকে একে অপরকে ভালোবেসে এসেছে যে তারা। আজ পূর্ণতা পাবে তাদের সম্পর্ক। কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন।
__________
বুকের মাঝে ঝড়ের মতো ধকপুকগুলো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, বাইকটি অতি পরিচিত একটি বাড়ির সামনে এসে গতি কমে আসে। কিন্তু থেমে যাওয়ার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময়টুকু অহীনের নেই। ঝাঁপ দিয়ে নেমে ছুটে যায় বাড়ির ভেতর। সৃজন নেমে কিছু টাকা পরিশোধ করে ভেতরে প্রবেশ করে। বাহিরে নেমপ্লেটে বড় বড় করে লিখে রাখা "শিকদার বাড়ি"। এত বড় যে বাড়িটির আকারে বেশ পরিবর্তন হয়েছে। দৌড়ে দরজা ঠেলে প্রবেশ করতেই অহীনের যেই প্রথম শব্দটি কর্ণপাত হয় সেটা আশার মুখ থেকে পড়া খুবই ছোট বাক্য,,
" আলহামদুলিল্লাহ কবুল.।"
দরজায় ঠাঁই স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ে অহীন, ধপাস করে একটি শব্দ হলেই সবার খেয়াল ওই দিকে ফিরে, বিয়ের আনন্দিত আমেজ ক্ষণঘুম করে ওঠে, দরজার থেকে সামান্য দূরত্ব রেখে অন্তিক বসেছিলো। ছেলেকে দেখে উঠে যায় বাহুতে ধরে মায়া করে সুধায়,
"অহীন তুমি হঠাৎ? তোমার তো দুই দিন পর বিয়ে ছিলো জেসির সাথে।"
করুণ সেই চাহুনি যেটা কয়েক বছর আগে নিজের মধ্যেও পেয়েছিলো। অহীনের চোখজোড়া আশার দিকে স্থির হয়ে আছে। আশার চোখে আজ অনুভূতি বলতে নেই। চোখের দিকেও তাকাচ্ছে না অহীনের। অহীন অন্তিকের দিকে তাকিয়ে স্বল্প স্বরে বলে,
"ওকে কেনো বিয়ে দিচ্ছো? জানো না ও আমার, শুধুই আমার।"
মস্তিষ্ক অহীনের প্রতি রাগ তৈরি করছে তবুও অন্তিক শান্ত স্বরে বলে,
"রুমে যাও অহীন, যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে।"
পেছন থেকে সৃজনের হাত পড়ে অহীনের কাঁধে, তবে সেটাও যেন তাকে শান্ত করতে পারলো না। ঝাঁপিয়ে উঠে আসে আশার কাছে। কুহেলিকা আর আয়াশ আশাকে আড়াল করলো নিজেদের পেছনে। তবে কে বুঝে? আয়াশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আশার হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে বলতেই যাবে কিছু, অমনি মায়ের নরম হাতের কঠিন থাপ্পড় তার গালে,
"অহীন নিজের সীমা অতিক্রম করবে না, মনে রেখো শিকদার বংশের মেয়ে আর তার স্বামীর মান এতটাও তুচ্ছ হয় নি যে তুমি আয়াশকে ধাক্কা দেবে।"
মায়ের হাতের থাপ্পড় খেয়ে বড় বড় করে তাকায় সে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সৃজন এগিয়ে এসে ধমকের গলায় বলে,
"কুহেলিকা তুমিও কেনো ভুলে যাও? অহীন এ বাড়ির ছেলে।"
"সেটা ভোলা যায় না সৃজন, যতই হোক বংশের টান ধরেই এসেছে।"
তবুও একটু নড়লো না অহীন, এগিয়ে মাকে উপেক্ষা করে আশার বাহুতে ধরে ঝাঁকিয়ে বলে,
"এই মুখের জবান কেনো উপরওয়ালা কেড়ে নিলো না যখন অন্য কারো নামে দ্বিতীয়বার কবুল বললি?"
"ছাড়ো অহীন লাগছে, আমার জীবন ডায়রির পাতার মতো নয়, যে ব্যবহার করার পর মূল্যহীন হবে। আমারো অন্য পাঁচটা মেয়ের মতো সংসার করতে ইচ্ছে হয়। আর যদি হয় আয়াশের মতো কেউ যে আমাকে আগলে নেবে?"
আশার নরম গালে অহীনের পুরুষালী শক্ত হাতটা পড়ে, পর মুহূর্তে আয়াশ এগিয়ে আসতে চায়। তবে পারলো না, সৃজনের জন্য। সৃজন তার আগেই অহীনের গালে থাপ্পড় দেয়,
"এই শিক্ষা পেয়েছো? সাহস কে দিয়েছে ওকে মারার? তুমি দোষ করেছো তার শাস্তি পেতে হবে। আশারও বাঁচার অধিকার আছে"
হুংকার ছেড়ে বলে ওঠে অহীন,,
"কিসের বাঁচার অধিকার? আমি নেই মানে ওর বিয়ে করে নিতে হবে? আমার আম্মু থাকেনি বাবাকে ছাড়া তিন বছর? তাহলে ও কেনো পারে না?"
"পারে না কারণ তোমাদের সম্পর্ক আর তোমাদের বাবা-মায়ের সম্পর্ক এক নয়। ভিন্ন সকল পরিস্থিতি।"
"জানি না আমি কিছু, আশা আমার আমার আমার। কেনো করবি তুই এমন কাজ? আশা তুই আমার আমার পেঁচি, বাবা যেমন নিজ পেঁচিকে এতগুলো বছর আগলে রেখেছে আমিও চাই।"
চিৎকার কেমন ধীরে ধীরে কান্নায় পরিণত হলো, গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল, একটু কান্না করে অহীন আসে পাশে তাকিয়ে ছুটে যায় আকাশের পায়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে,
"ছোট বাবা কেনো করলে এটা? তুমি তো বলেছিলে আশার দায়িত্ব আমার! তাহলে? এসব কি করছো?"
অতঃপর তাশার পায়ের কাছে,
"ও ছোট আম্মু তুমি তো সবসময় আমার পক্ষ নাও আজ কেনো চুপ করে আছো? আমার কান্নাগুলো কি তুমি এবার সহ্য করে নিলে? তার মানে তোমার মন এবার পাথরের মরিচিকায় আবদ্ধ হয়েছে?"
কি বলবে তারা? নিজের মেয়ের জীবন নষ্ট করবে? আশার যে অহীনের সাথে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কত কষ্টে আয়াশের সাথে রাজি করালো তাকে। পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। আজ আকাশ মুখ খুললে যে সবার মন ভাঙবে। অহীন ওদের মনের ভেতরে পাথরের প্রাচীর নড়াতে না পেরে আশার কাছে যায় আয়াশ বাধা দিলে করুণ স্বরে বলে,
"প্লিজ একটু কথা বলবো।"
আশার গালগুলো নিজের দিকে তুলে ধরে, মেয়েটির চোখগুলো টলটল করছে। কাজল লেপ্টে গিয়েছে। করুণ স্বরে অহীন বলে,
"কেনো বললি কবুল? একটা জীবন কি আমার জন্য থাকা যেতো না? দূরত্ব রেখে কি ভালোবাসা যায় না? তুই আমি না হয় দূর থেকে আ জীবন ভালোবেসে যাবো। আমাদের না হয় দূরত্বের প্রণয় হলো!"
"তুমিও তো জেসিকে বিয়ে করতে সামনের সপ্তাহে।"
"ভুল ছিলো আমার। তুই তো সংশোধন করার ক্ষমতা রাখিস।"
"ভুল দু'জনের ছিলো। এর মাশুল যে একটাই, শুধুই দূরত্ব।"
"পারবি আমার হাতে অঙ্কিত এই দেহে অন্যের রং ছোঁয়াতে? আমি তোকে অনেক আদর করেছি আশু, ওমন করে অন্য কারো আদর গ্রহণ করে নিবি?"
"আমি পেছনে তাকাই না ফিরে, এটা তো ভালো করেই জানো। অহীন তুমি যদি পারো আমিও পারবো। আর রইলো দেহ? সেটা পুরোনো পৃষ্ঠা। নতুন করে অন্য কেউ অঙ্কন করে নেবে।"
চেঁচিয়ে ওঠে পাগলের মতো করে অহীন,
"চুপ চুপ চুউউউপ। তোর কলিজা হাতে নিয়ে নেবো শুয়োরের বাচ্চা, তুই আমার। তোকে অন্য কারো সাথে ভাবতে আমার কেমন লাগে জানিস? মরে যাবো আমি।"
রাগে শরীরের পশমগুলো জানান দিচ্ছে বরাবরই অন্তিকের রাগ বেশি। এগিয়ে এসে অহীনের কলার ধরে টেনে একটি কক্ষের দিকে আগাতে আগাতে বলে,
"বিয়ে সম্পূর্ণ করুন, ও পাগল হয়েছে। ওর কথার কোনো মূল্য নেই এই বিষয়ে।"
"বাবা প্লিজ, পাপি কিছু বলো না। ছোট আব্বু তুমি তো বলো। আশু মরে যাবো খোদার কসম যদি তোকে অন্য কেউ ছুঁয়ে দেয়।"
রুমে নিয়ে বন্ধ করে দিতেই, আশার কান্নার বাঁধ ভাঙে, হো হো করে কেঁদে দিলো, তাশা কুহেলিকা জড়িয়ে ধরে সামলে নিলো আশাকে। আয়াশ এগিয়ে ওর মাথায় হাত রাখতেই চোখে চোখ রাখে আশা। এই তাকানোটা অনেক ভয়ংকর লাগে আয়াশের কাছে। নিষিদ্ধ আবদার করার সময় আশা এমন করে তার দিকে তাকায়।
✔️⭕[অতীত] [গল্পটা অতীতের ওপরেই লেখা, কেনো এসব হচ্ছে অহীন কেনো এতটা অস্থির হয়ে আশার জন্য ছুটে আসছে সমস্ত কথা অতীতে দেখানো হবে।]⭕✔️
উইকেন্ডের একটা দিন সবার বাড়িতেই ছোটখাটো আনন্দের ধুম পড়ে, শিকদার বাড়িতেও হিতে বিপরীত কিছু নয়। আকাশ, তাশা, রোমানা বেগম বসে আছে গোল হয়ে ড্রয়িং রুমে কারো অপেক্ষায়, হাসির সাথেই কথা বলছেন। অন্তিক কুহেলিকার সাথে। মিষ্টি একটা পরিবার, যদিও অন্তিক কুহেলিকা নিজেদের ফ্ল্যাটেই থাকে এখনো। তবে এখানে আসা হয় প্রায় সময় তাদের। অন্তিহা আর আশা যে এখানেই থাকে। কথার মাঝে সিঁড়ি দিয়ে ধপ ধপ পা ফেলে দৌড়ে নামার শব্দ, অন্তিক উপরে তাকায়—বয়সের একটি যুবক ছুটে আসছে ঠোঁটে মৃদু হাসি, গায়ের রং হলুদের মতো মসৃণ। হাতে ট্যাব, কারো সাথে কথা বলছে। কথা বলতে বলতে নিচে নেমেই অন্তিকের সামনে এগিয়ে দেয় ট্যাবটি,
"নাও অহীন কথা বলো।"
অন্তিক আগাবে কি হাত—তার আগেই রোমানা বেগমের হাত চলে গেলো ফোনে। আগের কালের মানুষ নাতিদের জন্য আলাদা মায়া থাকাটাই স্বাভাবিক নয় কি?
"কি বুবুকে ভুলে গেলে অহীন?"
"তোমাকে কি ভোলা যায় পাখি?"
"ভুলে না গেলেই বুঝি তাইয়ানকে কল দাও? তোমার বুবুর কাছেও একটা ফোন আছে তুমি কি নাম্বারটা ভুলে গিয়েছো?"
"কিযে বলো পাখি, তোমার নাম্বার তো জান দিয়ে সেভ করা।"
আর কিছু বলার আগেই তাশা ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো ফোনটা,
"ফ্রান্স থাকো বলে কি এখানে একটা পরিবার আছে ভুলে যাবে?"
"ভুলি নি ছোট আম্মু।"
ওপারের ছেলেটার মুখ অপূর্ব সুন্দর, সুন্দর বলতে ধবধবে সাদা, কিন্তু অন্তিকের মতো সুদর্শন বলা মুশকিল। তবে কম কিছু নয়। একটা কক্ষে বসে আছে অল্প অন্ধকার রুমটা, হয়তো বাতি ঘুম দেবে। অহীন কথা বলতে বলতে খেয়াল করে তাশার পেছন থেকে অতীব সুন্দরী নারী হেঁটে আসছে দু’টো। তবে গুরুত্বহীন ভেবেই হয়তো চোখ ফেরালো। আশা আর অন্তীহা হাতে নাস্তার ট্রে নিয়ে এসে হাসিমুখে সবার সামনে রাখে। প্রতি সপ্তাহে এদের এই কাজ ফোনে বিভিন্ন আইটেম দেখে রান্না করে খাওয়াবে। অন্তিক আকাশ তো আয়েশ করে খায়। অহীন অন্তীহা না আশার সঙ্গে কথা বললো না। কলটা কেটে দিতে নিলে রোমানা বেগম ছো মেরে নিয়ে বলে ওঠে, "তোরা দুই জন কি বিয়ে করবি না? বয়স হতে তো কম হলো না অহীন-আশা।"
আশার স্নিগ্ধ বাতামি চোখ এবার ফোনের সাদা কভারে পড়লো, অহীন হেসে উত্তর করে,
"জেসি তো লেখা-পড়া করছে বুবু।"
"পরের মেয়ে কতটুকুই বা মানবে তোর মা-বাবাকে? আমাদের আশু কি কম সুন্দর...?"
বাকি করতে পারলো না, আশা-অহীন একই সাথে ধমক দিয়ে ওঠে,
"বেশি কথা বলার স্বভাব গেলো না তোমার।"
থতমত খায় রোমানা বেগম, সবাই ফোস করে শ্বাস ফেলে, ওনার আগ বাড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্ত চাপানোর স্বভাব গেলো না। অহীন ওপাশ থেকে রাশ ভারি কণ্ঠে বলে,,
"বুবু সারাজীবন বিয়েহীন কুমার থাকবো তবুও ওই পেঁচিকে বিয়ে করবো না। এমনিতেও ওকে ওর টাইপের আয়াশ না ফায়াশ ও বিয়ে করবে।"
রাগ হলো গরম এক কাপ চা ছুড়ে মারলো ট্যাবের মধ্যে, চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
"তোর জেসি বেশ ভালো টাইপের? সারাদিন তো পারলে উলঙ্গ হয়ে ঘোরে। কুত্তা।"
হকচকিয়ে যায় সবাই এত দামের ট্যাবে মধ্যে গরম চা ফেলেছে, চোখ বন্ধ করে নেয় অহীন, রোমানা বেগমের হাতে একটু ছিটে পড়তেই ফেলে দেন ওটা হাত থেকে, ধমক দেয় তাশা,
"পুরে যেতে পারতো খালামনির হাত।"
"তো? ওর সাহস হলো কী করে আয়াশকে নিয়ে বলার?"
"ও এতটাও ভালো না, জেসি তো ছোট জামা পড়েও আমার সাথেই থাকে, তুই এসে দেখ তোর আয়াশ ছোট জামা পড়া মেয়েদের সাথেই চলাফেরা করে।"
ফোনের ওপাশ থেকে ঝিরিঝিরি শব্দে অহীনের কথাটা বেশ স্পষ্টভাবেই বুঝলো সবাই। আশা এগিয়ে গিয়ে ট্যাবটা তুলে বললো,
"কুত্তা তুই কল দিবি না আমার ফোনে।"
"আমি দেইনি, তোর ভাই দিয়েছে, ওকে বল।"
"হারামজাদা।"
"হারামজাদ.....।"
সুইচ স্টপ হয়ে গেলো ট্যাবটা। তাইয়ানকে কয়েক ঘা থাপ্পড় দিতে ভুললো না আশা, অন্তিক কুহেলিকা একে অপরের দিকে চোখাচোখি করে হাসে। এমনই ছিলো তারা, অবশ্য এখনো এমনই। কিন্তু অহীনের আশার ভবিষ্যৎ আলাদা।
_______
ফোন কেটে যেতেই নিজেও আছাড় দেয় একটা ফোনে। একটা কোনায় গিয়ে পড়ে হয়তো উপরের গ্লাসে ফাটল পড়েছে সামান্য। ঘুমানো আর হলো না, রুম থেকে একটা টি-শার্ট গায়ে দিয়ে বের হয়ে এসেই চেঁচাতে লাগলো,
"মাম্মাম, বাহিরে গেলাম।"
রান্নাঘর থেকে তারাহুরো করে জোনাকি হাজির হলো, হাতে খুন্তি, এমন সময়ে কে রান্না করে ভাই? অহীনকে দেখে রুষ্ট কণ্ঠে বলে,
"কোথায় যাও? এদিকে এসো আমি একটা জিনিস রান্না করেছি, খেয়ে বলো কেমন হয়েছে।"
চোখ উল্টে ছানাবড়া হলো, কে জানে কী টেস্ট করাবে। সব হয়েছে ওই পেঁচির জন্য, এবার দেশে গেলে ওর কপালে দুঃখ আছে খুব। জোনাকির খুন্তির আগায় একটু ঝোল নিয়ে অহীনের সামনে ধরে। জিহ্বা দ্বারা ওষ্ঠ ভিজিয়ে একটু আঙুলে করে মুখে দেয়। বিস্বাদে মুখ ভরে যাওয়ার সত্ত্বেও হাসি দিয়ে বলল,
"উফফ মাম্মাম কী করে করো এত সুন্দর রান্না? আর তোমার মেয়ে একটা কফি বানালে বমি চলে আসে।"
"ও চিন্তা তোমাকে করতে হবে না, ওকে ঠিক আমার মতো রান্নায় পারদর্শী করিয়ে দেবো। তুমি বস, তোমাকে প্লেটে দেই খেয়ে বের হও।"
মাথায় বাজ পড়লো কথাটা শুনে, বাঁচার একটা উপায় তো পেতে হবে, কিছু না বলেই বসে পড়ে, কপালে হাত দিয়ে আশাকে গালি দিলো কতগুলো হিসেব ছাড়া, চোখ তুলতেই দেখে সৃজনকে, দুষ্টু হেসে হাঁকছারে, "পাপি এদিকে এসো, মাম্মাম এত মজার একটা রেসিপি বানিয়েছে, তুমি খেলে পাগল হয়ে যাবে।"
এই তো পানির জন্য এসেছিলো লোকটা, কিন্তু কে জানতো এখন এমন প্যাঁচে পড়বে? রান্নাঘর থেকে শব্দ আসে,
"সৃজন বসুন আপনাকেও দেই।"
"মাম্মাম তোমার রান্নাটা দারুণ হয়েছে বুঝলে? একটু খেয়ে আমার মাথা ঘুরে গেলো। বেশি খেলে পাগল হয়ে যাবো। তুমি বরং পাপিকে পাগল করো। আমার এখনো সুস্থ মস্তিষ্কে বিয়ে-বাসর করা বাকি।"
বলতে বলতে হাওয়া হয়ে গেলো অহীন, জোনাকি কি তাকে পায়? ফেঁসেছে তো সৃজন। এই মেয়ের অতিআদরে থেকে পেট বেড়ে যাচ্ছে। কোন দুঃখে যে সে এর সাথে সারাজীবন ঠিক করে থাকার কথা ভেবে ছিলো। আল্লাহ মালুম। জোনাকি এসে ওর প্লেটে খাবার তুলছে আর বক বক করে করে বলছে,
"আমার মতো বউ পেতেন আপনি? কত রকম রান্না আমি পারি আর কেউ পারে?"
এক মেয়ের মা হয়েছে, মেয়েটির বাচ্চামো যায়নি এখনো। আর এর সঙ্গ দেয়ার জন্য অহীনের জেসি তো আছেই। সৃজন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসে। সত্যি ভালোবাসাই যে বড় তা নয় মায়াও হয়তো হয়। সেদিন না মেনে নিলে হয়তো জেইন কিছু করে বসতো। নিজে তো নিজের ভালোবাসার ভালোবাসা পেলো না। জেইনকে না হয় একটু নাটকের সাথেই খুশি রাখলো। তাতে তো এমন কিছু হবে না। আর আজ এই মেয়েই সারাদিন কথায় কাজে ব্যস্ত রাখে। ফোন স্ক্রিনটা জ্বলে ওঠে, সৃজনের দু’টো মেসেজ একই সাথে এসেছে, "কলেজ বন্ধ ডেড। বাসায় আসছি। মমকে বলবে না সারপ্রাইজ দেবো।"
"পাপি দেশে যাবো পাসপোর্ট জমা দিতে যাচ্ছি, মাম্মামকে বলে দিও না রাগ করবে।"
জোনাকি তো সামনেই ছিলো, দু’টো মেসেজই দেখলো। মেয়ের আসার কথায় খুশি হয়েও পারলো না অহীনের যাওয়ার কথাটায়। মন খারাপ করে নিলো। সৃজন টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিলো আলতো করে, বুকে টেনে নিয়ে আদুরে স্বরে বলে,
"জোনাকি কষ্ট কেন পাচ্ছ? অহীন কি তার বাবা মায়ের কাছে যাবে না? ছেলে তো আমাদেরই বেশি ভালোবাসে, কিন্তু জন্ম দিয়েছে যারা, তাদের উপরও হক আছে।"
"চিন্তা হয় সৃজন, যদি সারাজীবনের জন্য থেকে যেতে চায়?"
"আসবে, জেসি আছে তো।"
সত্যি কারো মায়ার পরে যাওয়া বিরাট কঠিন, সৃজনকে কথা দিয়েছিলো জোনাকি অহীনকে নিজের সন্তান ছাড়া দ্বীচোখে দেখবে না। সৃজনের প্রতি ভালোবাসা এতটাই ঘরোয়া যে কথার বরখেলাপ দূর, তার চেয়ে অতি আদরে রেখেছে অহীনকে। এটাই হয়তো কারণ অহীনকে নিজের কাছে রাখার। জন্মদাত্রীর চেয়ে পালনকর্ত্রীর মায়া বরাবরই বেশি হয়। দুজনই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
✔️⭕বর্তমান[ এখানে বর্তমানের সামান্য দৃশ্য শেষ বারের মতো দেখানো হলো। বাকিটা গল্পের সাথে আগাবে।]✔️⭕
দরজায় অনবরত আঘাত করার পরও যখন দরজা খুলে দিলো না, অহীন গড়িয়ে নিচে বসে পড়ে।চোখের পানি গুলো নিচে পরছে। গায়ে লেপ্টে আছে ঘামে জর্জরিত শার্ট টি। আর্তনাদ করতে করেই চলেছে,,,
"আশা সত্যি মরে যাবো এমনটা করিস না জান আমার। জানি অহেতুক ও বেহায়ার মতো আবদার কিন্তু তবুও সহ্য হচ্ছে না।আমি সারাজীবন তোর খেয়াল রাখবো।"
ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি শব্দ আসে,
"ভাইয়া কান্না করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অন্তীহার গলা শুনে বার কয়েক বলল দরজা খুলতে, তবে দরজায় যে তালা। তাই অসহায় হয়ে বলতে থাকে, "জানিস অন্তু? আমি সব সহ্য করতে পারি, ওর পাশে অন্য কাউকে না। আমাদের জীবন টাও সুন্দর হতে পারতো। ভুলের মাশুল কি করে এত ভয়ংকর হতে পারে?"
অন্তীহা চুপ থাকে কিছুটা সময়,কখনোই অহীনের সাথে তেমন জমেনি তার। এই প্রথম হয়ত নিজের মনের কথাটা বললো অহীন আশাকে। কথা না হওয়ার কারন একটাই,অন্তীহা না আসলে তার ছোট বেলাটা এমন করে কাটতো না,যতই হোক মায়ের বুক সবাই চায়। অন্তীহা ভাবছে কথা গুলো। অমনি ভেতর থেকে সুন্দর ও কাতর স্বর ভেসে আসে,,
আমি তোমার সাথেই আমাকে খুঁজে পাই
এখনও যত্ন করে যাই
যদিও তুমি বহুদূরে....
আমি আজও পাগল তোমারি ওই প্রেমে
গেছি হারিয়ে রাতের আকাশে
তবে কি কাহিনী শেষ আমাদের
আমি ভাবি, যদি আবার
ছুঁতে পারতাম তোমাকে
সত্যি বা, স্বপ্নই হোক
এ দূরত্ব শেষ হয়ে যেত যে
ভালোলাগা, ভালোবাসার
তফাৎ কি যে হয়, জানতাম না
তবে কি আজ, সব দোষটা আমার
দেরি করেছি বুঝতে, তবু ভয়
ভয় পেও না, আমি আছি, তোমারই পাশে
দূরে যেও না, রাখবো আমি, জড়িয়ে তোমাকে...
#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
#সূচনা_পর্ব...........
চলবে.......