#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
#পর্বঃ২
বিকেল গিয়ে রাত হয়েছে বেশ, শিকদার বাড়ি শান্ত হয়ে গিয়েছে সেই কখন। মন থেকে এখনো রোমানা বেগমকে ক্ষমা করতে পারে নি। অন্তিককে যে পছন্দ তাও বলা যায় না। নিজের সবচেয়ে মূল্যবান যে ছিলো মনি। বাড়িটায় পা দিলে এক রাশ হতাশা ঝাঁকে মনের মাঝে। রাত হতেই নিজেদের বাসায় চলে যায় তারা, অবশ্য এখন আরেকটা বাড়ি করেছে নিজের টাকায়, কিন্তু নিজেদের স্মৃতি ও ভালোবাসার জন্যই হয়তো ফ্ল্যাটেই থাকে। তারা সবাই চলে যেতেই আশা টিভির সামনে বসে। নিজের রুমে চলে যেতো কিন্তু তার যে টেবিলটা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। টিভির সামনে মিনিট পাঁচও বসতে পারলো না মেয়েটা, সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে এসে ওর মুখের সামনে ফোন ধরে তাইয়ান,
"নে আয়াশ ভাইয়া।"
টিভিতেই ছিলো চোখ তার, ভিডিও কলে লোকটাকে হুট করে চোখের সামনে কে ধরে? লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঠিক মতো মাথাটা আঁচড়ায় নি সে, এই ছেলের কি আক্কেলজ্ঞান লোপ পেলো নাকি? ফোনের ওপাশ থেকে ভারী পুরুষালী কণ্ঠে আয়াশ বলে,
"আমার দিকে তাকাচ্ছো না কেনো পুতুল?"
মিনমিন করে আশা বলে,
"পাগলের মতো বসে আছি আমি, দেখলে ভয় পেয়ে কল না কেটে দেন সেই জন্য।"
"তুমি সব রকম সুন্দর, ও পুতুল এবার ফোনটা নিয়ে আপনার চাঁদ মুখটা প্রদর্শন করে আমার ক্লান্তি দূর করবেন কি?"
পাশ ফিরে তাইয়ানের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে স্বল্প সময়ের জন্য মিউট করে ধমক দিয়ে বলে,
"তোকে কি সবাই বেতন দিয়ে রেখেছে, কেউ কল দিলে রিসিভ করে হুট করে এনে দেয়ার জন্য ছাগল ভাগ।"
"ও হ্যালো আয়াশ ভাইয়া, সন্ধ্যা থেকে ৫০টা কল দিচ্ছিলো। না হলে আমার কোনো ঠেকা তোর কাছে আসার?"
আশা মাথায় বড় করে ঘোমটা টেনে নেয়। বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজের দুই হাতে মুখ কচলে। ক্লান্তি ও মুখের চিটচিটে ভাবটা দূর করার বৃথা চেষ্টা করে নেয়। ফোনের স্ক্রিন সামনে এনে মৃদুস্বরে বলে,
"কেমন আছেন? এত দিন পর মনে পড়লো আমায়?"
প্রিয় মানুষটির কথায় হয়তো ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, সত্যি এটা, ব্যস্ততার জন্য কল করতে না পারলেও আশার সাথে কথা বললে প্রশান্তি হানে অন্তরে। তৃপ্ত শ্বাস ফেলে বলল আয়াশ,
"মনে পড়ে তো রোজ, তাই তো বলি চলে আসুন, এখানে এসে আপনিও একটা ডিগ্রি নিয়ে নিন।"
"যাবো তো অন্তুর অপেক্ষায় আছি শুধু, ও কলেজ শেষ করুক এক সাথে যাবো।"
"অন্তুর কলেজ শেষ হলে ও আসতে পারবে, তুমি চলে আসো, কতগুলো বছর তোমায় দেখি না পুতুল। দেশে এসে বিয়ের কথা বললেও তোমার নানান বাহানা।"
"বললেই হয় না, অহীন আমার বড় ও বিয়ে করলো না, আমি করে নেবো?"
"আমিও অহীনের বড়, আমার আগে অহীন করে নেবে?"
"আপনি আর অহীন কি এক হলেন?"
"তো আমাকে কি ফ্যামিলির বাইরে রেখেছো?"
কথার উত্তর করতে পারলো না আশা, তার আগেই পেছন থেকে ভেসে এলো এক রুষ্ট বৃদ্ধা কণ্ঠ,
"তো তুমি কি আমাদের পরিবারের নাকি?"
চোখ টিপে বন্ধ করে নেয় আশা বিরক্তিতে, পেছনে রোমানা বেগমকে দেখে তরতর করে উঠে যায় সিঁড়ির দিকে, চোখের ইশারায় আয়াশকে সরি বলে দিলো। আয়াশকে ছোট থেকেই পছন্দের কাতারের বাহিরে রেখেছেন রোমানা বেগম, কারণ অহীনের সাথে কখনোই জমতো না আয়াশের, আয়াশ শান্ত প্রকৃতির হলেও বদমেজাজি, একঘেয়ে, মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ার অহংকার আছে বলতে গেলে। প্রায় সময়ই অহীনের সাথে মারামারির দরুন একে-অপরকে আহত করতো। তবে সময়ের সাথে সাথে আশার প্রতি সামান্য দুর্বলতার জন্য নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টাই তার মোক্ষম কাজ। আশাকে উপরে যেতে দেখে রোমানা বেগম বলতে থাকলেন,
"এই মেয়ের জীবন অকালে ধ্বংস হবে। এমন বদমেজাজি ছেলের সাথে কথা বলে। আকাশ আর তাশাকে যে কি বশ করলো এই ছেলে আল্লাহ মালুম। আফসোস করবে ঠিক, অহীন কি খারাপ? আর ওই কুহু নিজের কোন ভাজতিকে আনতে চায়। যে মেয়ে বিদেশ থেকে পারলে উলঙ্গ ঘোরে।"
এর পরেও হয়তো কত কথাই বলেছে, কিন্তু এগুলো আশা বা তাইয়ান কানে তোলে না। ওনার রোজকার করা কাজের মধ্যে এগুলো রুটিন, কাউকে ধরতে পারলে ধুয়ে দেয় মন মতো। হয়তো নিজের ছেলে মেয়েদের কথা শোনাতে না পারারই রাগ। নিজের কক্ষে গিয়ে ফোনের ক্যামেরা অফ করে কানে চেপে ধরে, আয়াশ হেঁসে দিয়ে বলে,
"আমি কিন্তু সত্যি খুব বদমেজাজি, সহ্য করতে পারবে তো?"
"যদি বলি... না?"
"তাহলে ভালো হয়ে যাবো।"
____________=__=_=_
নিরব ফ্ল্যাটে রাত গভীর, জানালার পর্দাগুলো বাতাসে জোরে জোরে উড়ছে, হয়তো ঝড়ের আগাম বার্তা দিচ্ছে। দরজার লক খুলে রাগে বকতে বকতে প্রবেশ করে কুহেলিকা,
"এই লোকটাকে এত করে বললাম জানালাগুলো বন্ধ করে বের হতে হলো না। আর একটু দেরি হলে সব ভিজত।"
এক বিন্দু রাগ–জেদ কমেনি তার, কমার কথাও নয়, সঙ্গী যে তারই মতো জেদি। অন্তিক আর তার একার সংসার সবসময়ই, অন্তীহা বেশিরভাগ সময়ই নিলয়ীর কাছে থাকে। কুহু দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকার সময়টা নিলয়ীই তো রেখেছিলো তাকে। কুহুর এত কথার মাঝে অন্তিক কি কম যায়? সে পাল্টা বলতে শুরু করে,
"বিয়ে করেছিলাম কি এগুলো আমি করার জন্য? প্যাঁচা স্বামী হই তোর বয়স হতে কম হলো না, তোর ব্যবহারে কি পরিবর্তন ঘটবে আদৌও কোনোদিন?"
জানালা দু’জনই মিলে বন্ধ করে দেয় সবগুলো। তবে ফোঁস করে শ্বাস তুলে কুহু অন্তিকের দিকে এগিয়ে যায়,
"আমাকে কাজ করানোর জন্য নিশ্চয়ই বিয়েটা করো নি?"
"তুই কোন কাজ করিস আমার? উল্টো তোর সব কাজ আমাকে দিয়ে করাস।"
"চুপ আর একটা কথা বলবে না।"
"চুপ আমি তোর বড়।"
"তুই বা* বুড়ো।"
তেতে গেলো অন্তিক, হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে যায় কুহুর কাছে চোয়াল ধরে বলে,
"বেয়াদবি করবি না পেঁচি।"
ফিক করে হেসে দেয় কুহেলিকা, দাঁত বের করে হাসতে দেখে অন্তিকও হেঁসে দেয়। ওর চোয়াল ছেড়ে দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বিরাট ভাব নিয়ে বলে,
"বুড়ো বলবি না, বয়স কত আমার? এখনো একটা ক্রিকেট টিম বানানোর এনার্জি আছে। শুধু তোর জন্য চিন্তা হয়।"
"দুই বাচ্চার বাবা হয়ে এগুলো বলো? ছিঃ। বুড়োকে বুড়ো বলবো না? ভাগ্য তোমার ভালো আমার মতো একটা জোয়ান বউ পেয়েছিলে।"
বলেই খিলখিল করে হেসে দেয় কুহু। কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে অন্তিক ওর মুখের দিকে তাকায়, দুই হাতে আলতো করে ধরে বলে
"তা ঠিক তুই এখনো দেখতে হেব্বি জোস কচি মা*। তোকে দেখলে মনে হয় আবার বিয়ে করে বাসর করি।"
"ছিঃ দানব একটা।"
"এসব কি কথা পেচি? আমি চাইলেই সেটা করতে পারি, আফটার অল আ'ম স্টিল ভার্জিন। দেখতে চাস?"
লজ্জা পেলো বোধহয় কুহু, গলা খাঁকারি দিয়ে সরিয়ে দিলো, অন্তিককে সরিয়ে নিজে গিয়ে আলমিরার কাছে কাপড় নিতে থাকে, পেছন থেকে অন্তিক জড়িয়ে ধরে, গলায় মুখ রাখে। কুহু অল্প স্বরে বলে,
"আমার ভালো লাগে না, দু'টো বাচ্চাই দূরে, অহীনকে বলো তারাতাড়ি বিয়ে করে জেসিকে নিয়ে আসতে। তারপর অন্তুর বিয়ে ঠিক করবো।"
"হু বলবো, ও এবার আসুক। তবে সে বাহিরের পরিবেশে অভ্যস্ত থাকবে এখানে?"
"জানি না, এত বড় ফ্ল্যাট, এত বড় বিল্ডিং থেকে কি লাভ যদি ওরা না থাকে?"
"সময় পাল্টেছে যুগ পাল্টেছে, সবাই নিজের জীবন নিজের মতো করে কাটায়, ওদের কেনো চাপ দেবো? তোর একাকিত্ব দূর করার একটা উপায় আমি দিতে পারি, নিবি?"
ভ্রু কুঁচকে নেয় কুহু, ওর দিকে ঘুরে দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কি উপায়?"
অন্তিক এগিয়ে যায়, কুহুর কোমর ধরে টেনে আবারো দূরত্ব মিটিয়ে নেয়, হিসহিস করে বলে,
"তুই একটা যুবতী মেয়ে, আমিও স্টিল ভার্জিন। চল বাসর করি, আর একটা বাচ্চা আসলে তোর সময় কেটে যাবে।"
দুই হাতে বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে হাঁসফাঁস করে রাগে বলতে থাকে,
"দুই বাচ্চার বাপ এখনো ভার্জিন। তোমার যৌবনে ঠাটা পরবে, এমন জলজ্যান্ত মিথ্যা বললে। কুত্তার উত্তেজনা কমে না।"
হেসে দেয় অন্তিক, এই তো চলছে একা বাসায় নিজেদের মধ্যে সল্প ঝগড়া, তর্ক, ভালোবাসা, লজ্জা নিয়েই ঘর। কিন্তু সবার থেকে একদম আলাদাই তাদের সংসার, ছেলে সন্তানের ঝামেলা নেই। অন্তীহা আসে কম, অহীন আসে কম। তবু দূর থেকেও একটা টান আছে সবার।
________
ফ্রান্সে সময়টা সন্ধ্যা, হালকা লালচে আলোতে শহরটা দারুণ মোহময়ী লাগছে। বাসা থেকে বের হয়েছিলো সেই দুপুরের সময় অহীন, হালকা ক্লান্তি নিয়ে বাড়ির দরজায় কলিং বেল চাপে সে। সব সময় সৃজনের সাথে তার থাকা হয় না, মাঝেমধ্যেই থাকা হয়। কিন্তু রোজ দেখা হয় তাদের। অহীন আসবেই যেমন করেই হোক। দরজাটা সামান্য সময় নিয়ে খুলে, জোনাকির ঠোঁটে অল্প হাসি, অহীন পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। অল্প আলো করে রাখা বাড়িটায় গিয়ে সুইচ বোর্ড খুঁজে চাপতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। অবাক হওয়ার মতো নয়, তবুও স্তব্ধ সে। সামনে অতিব সুন্দরী নারী দাঁড়িয়ে আছে, পড়নে শোর্ট স্কার্টটা উরুর নিচে পরলেও টপসের ফাঁক গলে পেট খানিকটা দৃশ্যমান। চোখজোড়া হালকা হাতে আর্ট করা, দেখেই বোঝা যায় বাংলাদেশের কালচার বলতে নেই। ছোট থেকে এসব দেখে অভ্যস্ততার জন্য এগুলো তেমন চোখে ঠেকলো না অহীনের। এক গাল হাসি দু'জনের ঠোঁট জুড়ে। তবে নিরবতা ভেঙে মেয়েটি অভিমানী আচরণ করে বলে,
"তোমার সাথে কথা নেই, কি করে পারলে তুমি আমাকে রেখে চলে আসতে? আর,, আর তুমি দেশে যাবে তাও বলো নি।"
অহীন এক গালে হাসে, দুই পা এগিয়ে যায় এক ভ্রু তুলে, জেসি পিছিয়ে যায়, পেছনে যে জোনাকি দাঁড়িয়ে আছে সেই দিকে কি খেয়াল আছে? এবার মেয়েটার অভিমান গেলো গোল্লায়, লজ্জায় শ্যামলা মুখটা লাল হয়ে এলো। অহীন খুক খুক করে কেশে বলে,
"উহু উহু,, কথা বলবে না? সিউর? তোমাকে কেনো বলে আসবো? তুমি তো বান্ধবীদের সাথে বিজি ছিলে। ভার্সিটিতে আমার কথা মনে থাকে তোমার? আজকে বাসায় আসলে আমাকে বলেছো?"
"আম… আমি ত তো সারপ্রাইজ দিবো বলে…"
"উহুম উহুম আমি এখানেই, সেমলেসগুলা।"
অহীন ফিক করে হেসে সরে আসে, হাত দিয়ে নাক ঘষে বলে দুষ্টু স্বরে,
"হুম হুম জানি, এমনিতেও তোমার মেয়েকে ভয় দেখাই, এমন সারপ্রাইজ যেনো আমাকে আর না দেয় বলে দিও। পরে আমি সারপ্রাইজ দিলে সইতে পারবে না।"
বলেই চলে যাওয়ার সময় জেসির মাথায় একগুচ্ছ বাদামী চুল এলোমেলো করে দেয়। দরজার ভেতরে গিয়ে আবার বের হয়ে বলে,
"ওয়েট, পাপি বলে দিয়েছে আমি দেশে যাবো?"
জেইন ঠোঁট কামড়ে রাগ দেখায়, জেসি চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অহীনের এমন করে কাছে আসার পর লজ্জায় আর তাকানো সম্ভব নয় তার দিকে। অহীনের মস্তিষ্কে কথাটা আসতেই আবার জেইনের কাছে চলে আসে। জেইনকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। অভিমান জমেছে মনে, কারণ তাকে জানাতে নিষেধ করা হয়েছে। অহীন ছেড়ে একটু ঝুঁকে নরম স্বরে নাকমুখ কুঁচকে বলে,
"সরি মাম্মাম, তুমি মন খারাপ করে থাকবে তাই বলতে না করেছিলাম, দেশে যাওয়ার আগে তোমার মনমরা মুখটা দেখতে ভালো লাগে না। সরি।"
"এখন বেশ খুশি আছি আমি?"
"এটার জন্য পাপির খবর নেবো আচ্ছামতো।"
"কত দিনের জন্য যাবে?"
অহীন জিহ্বা দ্বারা ওষ্ঠ ভিজিয়ে নেয়, সোজা হয়ে জেসিকে দেখে দেখে নেয় একটু। তারপর বলে,
"আমার অফিস আর ভার্সিটি বন্ধ এখন, আমি বেশি না ২০–২৫ দিন থাকবো। বেশিও হতে পারে। আয়াশও দেশে যাবে, সম্ভবত আশার বিয়ে এর মধ্যেই হবে।"
জেইন মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বলতেই অহীন হাসি দিয়ে চলে যায়, যাওয়ার সময় জেসিকে কফি দিতে বলতে ভুললো না। জোনাকি বসে পড়ে নিজের মতো করে কাজে লেগে যায়। জেসি গুটিগুটি পায়ে হেসে কফি মেশিনের সামনে যায়। জোনাকি ধমক দিয়ে বলে ওঠে,
"ও বলেছে তোর হাতে বানানো কফি খাবে, অসভ্য। গ্যাস অন কর গিয়ে।"
জেসি ধমকে হাবড়ে যায়, তরতরিয়ে গ্যাস অন করে। জোনাকি অল্প হাসে, এই মেয়েকে বোঝানো মুশকিল। অহীনের জন্য প্রচুর মায়া হয়। তবে কখনোই ভাবেনি অহীন জেসির প্রতি দুর্বল হবে। জেসির সাথে বিয়ে হয়ে গেলে তাদের সম্পর্কটা শক্ত হবে একটু।
_______
কাঁথার নিচে নিজেকে লুকিয়ে হিসহিস করে কথা বলছে কারো সাথে একটি মেয়ে। কাঁথার বাহিরে ফোনের আলো আসছে সামান্য। অন্ধকার কক্ষে একটু জ্বলছে কাঁথার উঁচু অংশটি। অল্প করে আকাশি রঙের কক্ষটি, সিলিং পর্যন্ত রঙ করা। সাদা দরজাটা ঠেলে কেউ প্রবেশ করে, পুরোটা রুমে বাহিরের আলো এসে পড়ে সেই কাঁথাটির উপর। মুখে বিরক্তি ও রাগ নিয়ে এগিয়ে আসে একটি মেয়ে। শরীরের গঠন তো তাই বলে একটি যুবতী মেয়ে। কিন্তু আদৌও কি তাই। গায়ে গোল ফ্রক, গলায় ঝুলানো ওড়না। শ্যামলা মুখে রাগ স্পষ্ট, ধমক দিয়ে কাঁথাটা টান দিয়ে সরিয়ে বলে,
"বেয়াদব মেয়ে, তোমায় কত করে বলতে হবে? এত রাতে বান্ধবীদের সাথে কথা বলবে না। মুখের কি অবস্থা তোমার? নিজেকে দেখেছো? মাত্র ২২ এই বুড়ি হয়ে যাচ্ছো তুমি অন্তু।"
অন্তীহা ধরফরিয়ে ওঠে, ফোনটা নিজের পেছনে লুকিয়ে মেকি হেসে বলে,
"আসলে মামানি, ওরা কল দিলো তাই।"
নীল রেগে লাল, মেয়েটার মুখের হাল হয়েছে কি—রাত জেগে তবুও জেগে থাকে। একটু ঝুঁকে পেছন থেকে ছো মেরে ফোনটা নিয়ে নেয়। হাতে তুলতেই দেখে কয়েকটা মেয়ে ভিডিও কলে হাসাহাসি করছে। তাদেরও বকার বাকি রাখলো না নীল,
"এই তোমাদের ঘুম নেই? মা-বাবা কোথায়? একেকজনের মুখের কি অবস্থা, কেউ বলবে তোমরা ২০–২২? বলবে ৪০ হয়ে বুড়ি হয়ে গিয়েছো, ঘুমাও। আর যদি অন্তুকে কল দাও তো খবর আছে, বলে দিলাম।"
কথা শেষ করে কল কেটে দিলো, তবে রাগের যেনো শেষ নেই তার। কল কাট করতেই স্ক্রিনে নিজের অপছন্দের কারো মুখ দেখতে পায়। অন্তীহার দিকে রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, অন্তীহা চোখ নামিয়ে নেয়। নীল ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
"যেটা তুমি পাবে না সেটার জন্য কিসের এত অপেক্ষা? আমি আকাশ ভাইয়ার সাথে কথা বলবো, আশার বিয়েটা হলেই অন্তিক ভাইয়াকে বলবো তোমার বিয়ের কথা।"
অন্তীহা চুপসে গেলো, অল্পও শব্দ করলো না। নীল বিছানায় ফোনটা ছুড়ে মারে, বাতাসে শ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে ওর মাথায় হাত রেখে বলে আদুরে স্বরে,
"যা বলছি ভালোর জন্যই বলি তোমার। যা তোমার না তা চেয়ে কষ্ট বেশি পাবে। তুমি ছোট নও অন্তু।"
নীল কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়, বিছানার একটি কোণায় কাঁথার নিচে ফোনটা অর্ধ আড়াল হয়ে আছে। ওই দিকটায় চোখ যেতেই সামান্য একটু দেখা যায় কোনো পুরুষের ঠোঁট, লাল তিলটা ঝলমল করছে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে সে।
অন্তীহার কক্ষ থেকে বের হয়ে রাহাতের কাছে গিয়ে পাশে শুয়ে পড়ে। ওপাশ থেকে ফিরে নীলকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে সুধায়,
"অন্তু বাচ্চা না নীল, ওকে কেনো এত ধমকান আপনি?"
"ছোট হলে ধমকাতাম না রাহাত, ও ভুল পথ অনুসরণ করছে। আমাদের উচিত ওকে সঠিকটা বোঝানো।"
"মনের বিরুদ্ধে যাওয়া যায় না। আর কুহু আর অন্তিক আছে তো, আপনি আরাম করুন।"
নীল মলিন করে নিজের মুখশ্রী, ভাব-রাহাতের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দূরে চলে আসে। মন খারাপ বুঝে রাহাত আবার ছুঁয়ে যেতেই নীল ফুঁপিয়ে বলে ওঠে,
"আপনি তো আমাকে একটুও ভালোবাসেন নি কখনো। আর না আমার কোনো সন্তান আছে। কত বলে কয়ে অন্তুকে নিজের কাছে রাখি। ওকে কি আমি নিজের সন্তান ভাবি না? ওকে কুহু–অন্তিকের জন্য ছেড়ে দেবো বলতে পারলেন?"
রাহাত কি উত্তর দেবে বুঝে পায় না। সত্যি কুহু অন্তুকে নেওয়ার খুব জোর করেছে, তবে নীল ওকে দিতে রাজি নয়। অবশেষে এখন অন্তু সবার কাছেই থাকে। অন্তুর যখন যেখানে ইচ্ছে, সেখানে। রাহাত নীলের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলে,
"হুম, আপনিই ঠিক। এবার ঘুমান। অন্তু ঘুমিয়েছে?"
"সেই রোজ রাতের মতোই বান্ধবীদের সাথে কথা বলছিলো ওই ছেলের বিষয়।"
"বাদ দিন, ছোট মানুষ। আশার বিয়েটা হোক, ও আর একটু বড় হোক, ঠিক হয়ে যাবে।"
"হুম।"
_________
লাইটের ঝলমলে আলোতে পুরোটাই কক্ষ আলো হয়ে আছে। ওয়াশরুম থেকে একটা কোমরে টাওয়েল পেঁচিয়ে বের হয়েছে অহীন। গায়ে সাদা শার্ট জড়িয়ে নিতেই দরজায় নক করার শব্দ পায়। বুঝতে বাকি নেই কে,
"আসুন মিসেস তাসনিম।"
জেসি হাতে কফির কাপ নিয়ে প্রবেশ করে, অহীনকে এমন ভাবে দেখে চোখ নামিয়ে নেয়। অহীনের তেমন প্রতিক্রিয়া নেই। একটা প্যান্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। চেঞ্জ করে এসে দেখতে পায় জেসি বসে আছে তারই অপেক্ষায়। অহীন দুষ্টু ভাব নিয়ে এগিয়ে যায়, একদম জেসির সামনে গিয়ে ঝুঁকে আসে, জেসি লজ্জায় চোখ বন্ধ করতেই অহীন ফু দিয়ে হেসে দেয়। গাল ফুলিয়ে জেসি বলে ওঠে,
"স্টুপিড, তোমার সাথে কথা নেই, দেশে যাবে একটি বার বললে কি এমন হতো?"
"আরে বোকা মেয়ে, আজকেই আব্বুর সাথে কথা বললাম। তোমাকে না বলে যেতে পারি?"
জেসি মুচকি হেসে কাপটা এগিয়ে দেয়। জেসির পাশে বসে চুমুক দিয়ে, প্রশংসায় আত্মহারা হলো অহীন,
"উহুহু তোমার হাতের কফি? এত টেস্ট দেশে গেলে কই পাবো বলো তো। তুমিও চলো এবার আমার সাথে, একদম শুভ কাজ সেরে আসবো?"
"খালামনির হাতের রান্না তো তুমি খুব পছন্দ করো আর তোমার পেঁচির হাতে চা কফির তো তুলনাই হয় না।"
"পেঁচিকে কেনো টানছো? ওর হাতের খাবার খাই না আমি কখনো। আমার জন্য করবে ও রান্না?"
দাঁত বের করে হেসে দেয় জেসি, কিছু সময় পর মুখ মলিন করে বলে,
"আমি আসলাম আর তুমি চলে যাচ্ছো। কই দুজন ঘুরবো, তা আর হলো কই?"
হাতের কাপটা পাশে রেখে, জেসির দিকে ঝুঁকে আসে একটু, অল্প হেসে বলে,
"তোমরা তো যাবে আশার বিয়ে হলে, তখন আম্মু আব্বুর সাথে কথা বলে নেবো কেমন? তারপর যেখানে যাবো তোমাকে নিয়ে যাবো।"
"ওখানে গিয়ে পাল্টি খেও না শিকদার, ভুলে যেও না আমায়। তোমাকে নিয়ে যে অনেক স্বপ্ন।"
অহীনের চোখের দৃষ্টি গভীর হলো। মন দিয়ে জেসির দিকে তাকিয়ে দেখলো, মেয়েটা চেঞ্জ করে এসেছে, বাঙালিদের মতো জামা পরে। এখন মায়া লাগছে বেশ, একদম চিকন, হালকা গালে টোল পড়ে, বড় বড় চোখ, অনেকটা সৃজনের মতো আবার হঠাৎ জেইনের মতো লাগে। অহীন ওর গালে আলতো করে হাত রাখে এসে দু'জনের গাল লাল হয়ে ওঠে। অহীন গভীর স্বরে বলে,
"তোমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য যে বিশেষ কিছু প্রয়োজন আদৌও কি তেমন কিছু আছে? তুমি যে আমার জীবনের শান্ত বাতাস। তোমার সান্নিধ্যে এলে ইচ্ছে করে পৃথিবী থমকে দিয়ে শুধুই তোমাকে দেখি।"
জেসির মনটা প্রফুল্ল হলো, অনেক আশা বুনেছে মনের মাঝে অহীনকে নিয়ে সে। কত মিষ্টি অহীনের কথা, চোখের গভীর চাহনিগুলো তাকে ঘায়েল করে দেয় নিমিষেই।
চলবে....