ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৫৯তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৫৮

গতরাতে আয়াশ সত্যি থাকেনি, আর সে কোথাও বেশিক্ষণ স্থির থাকতেও পারে না। অতিরিক্ত বাছবিচার আর শুচিতাবায়ুগ্রস্ত মেজাজ নিয়ে চলাফেরা করা কঠিন কোথাও থাকা যায় না! অন্তিহার দিকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে ডেবডেব করে তাকিয়েই ছিল। একদম অন্য রকম দৃষ্টি! আর অন্তিহা? আড়চোখে কয়েকবার সে-ও দেখে নিয়েছিল আয়াশকে। তবুও মুখ ফুটে একটা কথাও বলেনি। পরিবারের সবাই বারবার অনুরোধ করেছিল একটু কথা বলতে। হ্যাঁ, দুজনকে একটা রুমে পাঠালও সবাই। কিন্তু বন্ধ কক্ষে প্রবেশ করতেই হঠাৎ বাঁধ ভাঙে অন্তিহার কান্নার। ​স্তব্ধ আয়াশ কেবল দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা সেই কান্নার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থেকেছে। পুরোটা সময় সে বাকরুদ্ধ। তবুও সে একপা এগিয়ে আসেনি, অন্তিহার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করেনি আদৌ এই বিয়েতে সে খুশি কি না! কিংবা নিজের ইচ্ছায় সে এই সম্পর্কে জড়িয়েছে, নাকি নেপথ্যে কেউ তাকে বাধ্য করেছে?

​দীর্ঘ সময় পর যখন অন্তিহার কান্না থামে আয়াশ দরজার লক খুলে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। আর অন্তিহা ক্লান্তিতে তখনই ঘুমে তলিয়ে পড়েছিল। সকাল থেকে অন্তিহার ফোনে অনবরত কল আসছে। কিন্তু ফোনটা রিসিভ করার মতো মানসিক শক্তি বা সাহস কোনোটাই তার নেই। আজ আর সাফওয়ানকে ধমক দেওয়ার সাধ্যও যেন মনের ভেতরে খুঁজে পাচ্ছে না সে। তাই কলগুলো বারবার বেজেই কেটে যাচ্ছে।

​ঘুমের ঘোরে কানে হালকা টুকটাক শব্দ আসতেই আড়মোড়া ভাঙে অন্তিহা। নিভু নিভু চোখ দুটো বন্ধ রেখেই গায়ের এলোমেলো জামাটা ঠিক করতে গিয়ে হঠাৎ স্তব্ধ হয় সে। পূর্ণরূপে চোখ মেলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পুরুষালী অবয়বটা দেখে তার গলা চিরে তীব্র চিৎকার বের হয়ে আসে

‘আআআহ!’

​তড়িঘড়ি করে নিজের জামাকাপড় সামলাতে শুরু করে সে। বুকের ওপর জামার প্রায় সবকটি বোতাম খোলা, ফলে ভেতরের ইনার পোশাক স্পষ্ট উন্মুক্ত! তার চিৎকারে আয়াশ হঠাৎ নজর ফেরায়। এতক্ষণ ছেলেটি তার দিকে তাকায়নি, কিন্তু এই আকস্মিক চিৎকার শুনে না তাকিয়ে উপায় কই। আয়াশের গাঢ় চোখজোড়া অবুঝের মতো পর্যবেক্ষণ করছে লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠা অন্তিহার আদলখানা।

​আয়াশ অত্যন্ত সাবলীল ও নিচু কন্ঠে বলল,

“এত বেলায় ঘুম থেকে উঠতে হয় না, মাই বিউটিফুল মনোহারিণী এতে শরীরের টোন আর চেহারার গ্লো দুটোই নষ্ট হয়।”

​বিছানা থেকে ঝাড়া দিয়ে নেমে পড়ে অন্তিহা। সে সত্যি বুঝতে পারে না এই লোকটার মানসিক সমস্যাটা ঠিক কোথায়! কাল পর্যন্ত যে 'অন্তি' বলত, সে আজ হঠাৎ মনোহারিণী ডাকার নাটক করছে? শুকনো ঢোক গিলে মরুভূমির মতো শুকিয়ে আসা গলাটা ভিজিয়ে নেয় সে। চরম বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করল,

“এত সকালে আপনি এখানে?”

​আয়াশ একটু নড়েচড়ে বসে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“দুপুর ১২টা বাজে। এটাকে আর যাই হোক, ‘সকাল’ বলে না, মনোহারিণী।”

​আবারও সেই উদ্ভট ও গায়ে-পড়া সম্বোধন! অন্তিহার বিরক্তির পারদ চড়চড় করে চড়তে লাগল। কথার আর কোনো উত্তর না দিয়ে সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। একটা দীর্ঘ শাওয়ার নিয়ে যখন হলো, মনটা কিছুটা রিফ্রেশ লাগছে। বিছানার এক কোণায় আয়াশ তখনো বসেফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে। অন্তিহা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করতে করতে আয়নার প্রতিবিম্বে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“হঠাৎ এখানে আসার কারণ?”

​আয়াশ ফোনটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসে। ভেজা টাওয়াল দিয়ে চুল ঝাড়তে থাকা মেয়েটাকে আজ সত্যি ভীষণ নিজের নিজের লাগছে। তবে আয়াশ ভেতরের অনুভূতির প্রকাশ কখনই বাইরে ঘটায় না। তাই নির্লিপ্ত গলায় বলল,

“সারারাত কলের জ্বালাতনে একফোঁটা ঘুমাতে পারিনি। আব্বু ছোট চাচ্চুকে আমাদের বিয়ের খবরটা জানাল, আর তারপর থেকেই একের পর এক ফোন। ভাবলাম তোমার সাথে একবার দেখা করে আসি... আফটার অল, তুমি তো আমার আমার কম্ফোর্ট জোন।”

​অন্তিহা টাওয়ালটা রেখে চুলে চিরুনি চালায়, চুল আঁচড়ানোর সময় ফ্লোরে টপটপ করে বিন্দু বিন্দু পানি ঝরে পড়ছে। সে কটাক্ষের সুরে বলল,

“বাহ্! এক রাতেই একদম পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে নিলেন? আপনার এই ভালোবাসা একটু থামান প্লিজ। হঠাৎ আপনার এমন উথলে ওঠা বালোভাজা সহ্য হবে না, দেখা যাবে কিডনি অ্যাটাক করে মরেই যাব আমি।”

​আয়াশ ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসে। কোনো বাদানুবাদে না গিয়ে বেশ অসিপ্রান্ত মেজাজে বলে,

“হেয়ার ড্রায়ার নেই? ওয়াশরুম থেকে চুল পুরোপুরি ড্রাই করে বের হতে পারো না? ফ্লোরে ড্রপ ড্রপ পানি ফেলছ কেন? আর প্রপারলি ড্রেসড না হয়ে বিছানায় অমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শরীর দেখিয়ে ঘুমাও কেন? আমি আগেও একদিন খেয়াল করেছি। এভাবে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে জামাকাপড় পরারই বা দরকার কী? ঘুমানোর সময় কি বিছানার সাথে যুদ্ধ করো নাকি? তোমার মতো একটা মেয়ের থেকে এমন আনহাইজেনিক হ্যাবিট আমি এক্সপেক্ট করিনি, অন্তি। প্লাস, তোমার পা দুটো এখনো ভেজা...।”

​ঝপঝপ!

​আয়াশের কথা শেষ হওয়ার আগেই অন্তিহা আচমকা এক গ্লাস পানি এনে ঠিক আয়াশের পায়ের কাছে ফ্লোরে ঢেলে দিল! নিমেষেই ফ্লোর ভিজে একাকার। চরম অস্বস্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে আয়াশ। এক ধরনের বিশ্রী অনুভূতিতে তার পুরো শরীর শিউরে উতছে। অন্তিহা মেকি হেসে কটাক্ষের স্বরে ধমকে উঠল,

“শুনুন মিস্টার স্যানিটাইজার, আপনার মতো করে এভাবে আমার রুমে কেউ হুটহাট ঢুকে পরেনি কখনো। মাঝরাতে হুজুর ডেকে বিয়ে করার শখটা আপনার ছিল, আমার নয়। আর এই যে জ্ঞান ঝাড়ছেন এগুলো একজন নরমাল হিউম্যান বিহেভিয়ার। সো, আমার সাথে সংসার করতে হলে এসব ন্যাকামো ছাড়তে হবে। নয়তো স্যানিটাইজারের বোতল বগলে চেপে সোজা দরজার ওপারে হাঁটুন!”

​অন্তিহা বিড়বিড় করতে করতে আবার নিজের কাজে মন দেয়। ​আয়াশ চোখ পিটপিট করে তাকায়। ফ্লোরের পানি আর অন্তিহার চুল থেকে খসে পড়া দুটো আলগা চুল সেই পানিতে ভাসতে দেখে তার গা গুলিয়ে উঠে। তার স্নায়ুগুলোতে এক অজানা কম্পন তৈরি হলো। সে এবার পাল্টা কটাক্ষের সাথে জবাব দিল,

“অপরিষ্কার থাকলে প্রবলেমটা কার হবে? এই যে রাগ দেখিয়ে ফ্লোরে পানি ফেললে, এটা তোমাকেই পরিষ্কার করতে হবে! তাহলে এই ইম্যাচিউর রাগটা কাকে দেখালে, ওয়াইফি?”

​হাতের চিরুনিটা বিকট শব্দে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে অন্তিহা আয়াশের দিকে তীব্র রাগী চোখে তাকায়। একেতো বাঁচালের মতো বকছে লোকটা তার ওপর থেকে একবার মনোহারিণী আবার এখন ওয়াইফি! গরম শ্বাস ফেলে চটজলদি এগিয়ে এসে আয়াশের ঠিক সামনে, মস্তিষ্ক কিছু একটা ক্যাচ করতেই মুখ কুঁচকে বলে,

“ওয়েট ওয়েট ওয়েট.. আগেও দেখেছেন মানে? আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে আপনি সেদিন এসব দেখেছেন? সিরিয়াসলি আয়াশ? আপনাকে ভালো ভদ্রলোক জানি আমি ছোট থেকে। সাফওয়ান যে সারাক্ষণ পেছনে পরে থাকে সেও কখনো এসে না বলে জানালায় উকি দেয় নি আমার। সাফওয়ান তো তাহলে…।”

বলতে বলতে থামে অন্তিহা, আয়াশ তীব্র রাগ নিয়ে এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। শুকনো ঢোক গেলে অন্তিহা। আয়াশ তো তার হাসবেন্ড তার সামনে সাফওয়নের প্রসংশা করা কি ভুল হয়েছে? পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সে আয়াশের হাত ধরে হেঁচকা টান দেয়। আয়াশ কোনোমতে তার মোজা দুটোকে ভেজা ফ্লোর থেকে রক্ষা করে। অন্তিহা তাকে ঘরের বাইরের দিকে ঠেলতে ঠেলতে বলল,

“বের হন রুম থেকে! আমি রেডি হয়ে বের হচ্ছি, পাশে বসে বসে আমার মগজ চিবানো বন্ধ করুন!”

​আয়াশ ধাক্কা খেয়ে দরজার মুখে দাঁড়িয়েই আদেশের সুরে বলল,

“দুদিনের প্রিপারেশন নিয়ে রেডি হও। গিয়ে ওখানে থাকতে হবে।”

​আয়াশকে বের করে দিয়ে দরজা আটকে দিয়েছে অন্তিহা। হতাশাময় শ্বাস ফেলে রুমের দিকে তাকা। সত্যি, পানিটা এখন তাকেই মুছতে হবে!

____

​সকাল সকাল অহীন ও অন্তিক বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। গতরাতে আশা ও অন্তিহা এক রুমে ছিল, আর অহীন শুয়েছিল ড্রয়িং রুমে। ফ্ল্যাটটা সম্ভবত এবার বদলানো দরকার, পরিবার তো আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। অহীন আর অন্তিককে নাস্তা করিয়ে দিয়েছে কুহেলিকা।

​এদিকে আয়াশের হঠাৎ আগমনে আশার আরামের ঘুমটা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। তাকে চলে আসতে হয়েছে কুহেলিকার ঘরে। এখানে এসে হাতমুখ ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা মেকআপ করছে সে। বহু মাস পর আজ মনটা বেশ হালকা ও ফুরফুরে লাগছে। সব জটিলতা আর ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটেছে আজ। চোখের নিচে গাঢ় কাজলের টানে রেখা আঁকতে আঁকতে সে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,

“কাজল দিলাম দুই নয়নে...

সুন্দর যদি লাগে!”

​ওর গানের সুর শেষ হতেই পেছন থেকে এক পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,

“চুপিচুপি তোমায় আমি...

দেখব সবার আগে।”

​আশা আয়নার প্রতিবিম্বে তাকায়। দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অহীন। ঠোঁটে তার একচিলতে তৃপ্তির হাসি চোখে জোড়ায় রাজ্যের ক্লান্তি। গরমে ঘেমে ভিজে উঠেছে অহীনের চওড়া বুক। আশা হালকা হেসে হাত দুটো পেছনে নিয়ে হেলেদুলে অহীনের দিকে এগোতে এগোতে গাইল,

“ভালোবাসার কোন রঙেতে..

আমায় রাঙাইলা?”

​অহীনের একদম কাছাকাছি আসতেই অহীন তার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে। আশার হাইলাইট করা নাকের ডগায় নিজের আঙুল ছুঁইয়ে ফিসফিস করে গাইল,

“তুমি ছাড়া হায়...

এখন প্রাণে বাঁচা দায়!”

​আশা খিলখিল করে হেসে উঠে,

“ফুপি দেখলে তো তোমাকে এমনিতেই প্রাণে বাঁচা দায় করে দেবে!”

​আজ সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে! হয়তো ভেতরের আনন্দটাই চেহারায় ঠিকরে বের হচ্ছে। অহীন আদরে তার গাল দুটো একটু শক্ত করে টেনে লাল করে দিয়ে বলল,

“হুম, জীবনটা কিন্তু এখন আর অতটা খারাপ লাগছে না, তাই না? মনে হচ্ছে আমরা চুরি করে প্রেম করছি!”

​আশা নিজের সামান্য ফুলে থাকা পেটে হাত রেখে নিচু গলায় বলল,

“হুম... সব ঠিক হয়ে যাবে এবার।”

​অহীন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আদেশের ভঙ্গিতে বলল,

“পাশের রুম থেকে আমার কাপড়গুলো নিয়ে আয় তো, সোনা। একটা হট শাওয়ার নেব। তারপর খাবার বেড়ে রাখিস, ভীষণ খিদে পেয়েছে।”

​আশা হেলেদুলে রুম থেকে বের হয় । তার মাথায় বড় করে ওড়নাটা জড়াতে জরাতে দেখে আয়াশ ড্রয়িং রুমে বেশ বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। সামনে রকমারি ফল রাখা, কিন্তু একটাতেও হাত দিচ্ছে না। আশাকে দেখে আয়াশ কৃত্রিম হাসির রেখা টেনে বলল,

“পুতুল, প্লিজ একটু দেখো না অন্তির আর কতক্ষণ লাগবে? লেট হয়ে যাচ্ছে তো।”

​আশা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ অন্তিহার রুমের দিকে যায়। দরজাটা সামান্য ভেজানো। ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই থমকায় আশা। ​ভেজা লম্বা চুলগুলো বারবার অন্তিহার মুখের ওপর চলে আসছে, আর সে বারবার তা কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে। সে হাত দিয়ে ফ্লোরে লেগে থাকা পানি টিস্যু দিয়ে মুছছিল। দরজা খোলার শব্দে অন্তিহা মাথা তুলে। নির্ঘুম রাতের কারণে চোখ দুটো ফোলা ও লালচে হয়ে আছে। অন্তিহা কিছু বলার আগেই আশা লজ্জা পাওয়ার ভান করে ঠোঁট চেপে ধরে। অন্তিহা বিব্রত বোধ করতেই আশা তার ভেজা চুলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দুষ্টুমির সুরে বলল,

“মানছি ফার্স্ট টাইম বিয়ে করেছিস তোরা, তা বলে দিনের বেলাতেই? আয়াশ এমন?! বিয়ের পরের দিন সকালেই একদম চড়াও হলো? মামি কবে হচ্ছি?”

​হতবিহ্বল অন্তিহা ডেবডেব করে তাকিয়ে বলল,

“কী বকছিস তুই?”

​আশা এগিয়ে এসে অন্তিহার বাহু ধরে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ওর ফোলা চোখের দিকে আঙুল তুলে বলল,

“এই যে ফোলা ফোলা চোখ... ১২টা পর্যন্ত ঘুমালে চোখ এমন ফোলে না, অন্তু। তার মানে আয়াশ আসার পর থেকে তোকে এক ফোঁটা ঘুমাতে দেয়নি, রাইট?”

​অন্তিহা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই আশা তাকে বেশ রোমান্টিক কায়দায় ঘুরিয়ে আয়নার সাথে চেপে ধরে। তারপর তর্জনী দিয়ে অন্তিহার গালে আলতো করে ছুঁইয়ে গাঢ় গলায় ফিসফিস করে বলল,

“আর এই অবেলায় শাওয়ার নেওয়া, বেডশিট ক্লিন করা... আমি অতটাও অবুঝ নই, ডার্লিং।”

​অন্তিহা চট করে আশার কব্জি চেপে ধরে তাকে সরিয়ে দেয়। মেকি হেসে বলল,

“তুই অবুঝ না, তুই আস্ত একটা ড্যামনি!”

​আশাকে সরিয়ে দিয়ে অন্তিহা আলমারি থেকে ট্রলি ব্যাগ নামাতে নামাতে বলল,

“আমি কি তোর মতো নির্লজ্জ? তোর মতো নোংরা থট আমার মাথায় আসে না!”

​আশা গিয়ে অন্তিহার হাত থামিয়ে হেসে বলল,

“তোর আলমারি খুললে অর্ধেকটা সেন্সর্ড ডার্ক-রোমান্স নভেলে ভরা থাকে, মিসেস আয়াশ খন্দকার! আর তুই আমাকে নোংরা বলছিস? তোর ভাই আমাকে নষ্ট করেছে, নয়তো আমি একবারে ইনোসেন্ট একটা মেয়ে ছিলাম!”

​“হাঁ, তুই একটা আলু!”

​দুই সখীর মধ্যে হাসাহাসি আর জামাকাপড় গোছানোর এই হালকা মুহূর্তটা বেশ জমজমাট লাগছে। আশা একটু এগিয়ে এসে অন্তিহার হাতের সাথে হাত মিলায়। ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল,

“সরি অন্তু... আমার ভুলের জন্য তোকে এত কিছু ফেস করতে হচ্ছে। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝিস না। আয়াশকে আমি একটা সময় হয়তো চাইতাম, কিন্তু অহীন... অহীন একদম আলাদা। ওর ভালোবাসা অন্যরকম। আগে বুঝিনি, কিন্তু এখন জানি আমি অহীনের এই বাঁধভাঙা ভালোবাসাই চাই। যে আমাকে আমার মতো করে ভালোবাসবে, আমার ছেলেমানুষিতেও হেসে আমায় আগলে রাখবে। আমি আয়াশকে নিয়ে আর ভাবি না, কখনো ভাববও না। জানিস অন্তু? আয়াশ যেদিন আমায় জিজ্ঞেস করেছিল তুই কাকে ভালোবাসিস, আর আমি যখন বললাম তাকেই, তখন ওর মুখে আমি এমন একটা স্যাটিসফাইড হাসি দেখেছিলাম, যা ছোটবেলা থেকে দেখিনি। ওসব অতীত! প্লিজ নিজেদের মাঝে কোনো দেয়াল তুলিস না। পছন্দের মানুষকে না পাওয়ার কষ্ট সাময়িক, কিন্তু পাওয়ার পর হারানোর যন্ত্রণাটা সহ্য করা যায় না। বিচ্ছেদের ব্যথায় অহীন রোজ একটু একটু করে মরছে... আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তাই বলছি, তোর লাইফটা এভাবে এলোমেলো হয়ে গেলে আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।”

​কথাগুলো বলতে বলতে ফোঁপাতে শুরু করে আশা। অন্তিহা বিচলিত হয়ে আশাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়,। নরম গলায় বলল,

“কাঁদিস না , আমার সন্টু-মন্টুর কষ্ট হবে! শোন পাগলী, তোর ওপর আমার রাগ নেই এটা বললে মিথ্যা বলা হবে। কারণ তুই পৃথিবীর সবচাইতে সেলফিশ একটা মেয়ে। কিন্তু তাই বলে তুই আমার পর হয়ে যাসনি। তুই আমার ফ্রেন্ড, কাজিন, এক্স-ভাবি আর আমার সন্টু-মন্টুর মা । তুই ভাবিস না তোর আর আয়াশের পাস্ট নিয়ে আমাদের মাঝে প্রবলেম হবে। আমি জেনে-বুঝে আগুনে পা দিয়েছি, পুড়লে দায় আমার। আর আমি আয়াশকে এটুকু অন্তত বিশ্বাস করি যে সে আর তোকে নিয়ে ওভাবে ভাববে না।”

​আশা চোখ মুছে বলল,

“ তবুও সরি... আই লাভ ইউ!”

​অন্তিহা হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“আই ডোন্ট লাভ ইউ। আমি শুধু আমার জামাইকে ভালোবাসি!”

​আশা চোখ টিপে বলল,

“তোর জন্য তো চিন্তা হচ্ছে! এত এত রোমান্টিক বই পড়ে তোর কী লাভ হলো? তোর জামাইয়ের যে ওভার-হাইজেনিক স্বভাব, রোমান্সের আগে হাত ধুতে ধুতে তোর হট মুডের রোস্ট হয়ে যাবে।”

​ওদের কথার মাঝেই বাইরে থেকে অহীনের হাঁক ভেসে আসে,,

“এই পেঁচি! কখন থেকে গিয়েছিস? তাড়াতাড়ি আয়! খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে! ইসসস... একটা পারফেক্ট বউ দরকার, যে না চাইতেই সামনে খাবার গুছিয়ে রাখবে!”

​আশা তড়িঘড়ি করে জামাকাপড় নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অন্তিহা গভীর দৃষ্টিতে কিছু সময় দরজার দিকে চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর লাগেজ গুছিয়ে বাইরে আসে।

​কুহেলিকা ব্যস্ত হয়ে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। আয়াশকে উদ্দেশ্য করে বলছে,,,

“এত তাড়াহুড়ো কিসের আয়াশ? কাল রাতে বিয়ে হলো, আর আজ সকালেই নিয়ে যেতে চাচ্ছ? এমন করলে মেয়ে পাঠাতে মন চায়?”

​আয়াশ সোজা হয়ে বসে শান্ত গলায় বলল,

“আব্বু তো পারমিশন দিয়েই গেলেন, আম্মু। আর কাল আমার কাজিনের বিয়ের অনুষ্ঠান, এই সুযোগে অন্তি ফ্যামিলির সবার সাথে একটু পরিচিত হতে পারবে। ওখান থেকে ঘুরে এসে না হয় বড় করে আয়োজন করে দেবেন? আর সত্যি বলতে, আমি জানি না ওই গ্রামের পরিবেশে আমি দুদিনও থাকতে পারব কি না। সো ডোন্ট ওয়ারি, হয়তো বিকেলেই ওকে নিয়ে ব্যাক করব।”

​কুহেলিকা অন্তিহাকে টেনে এনে চেয়ারে বসায় প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলল,

“সবার সাথে মিষ্টি করে কথা বলবি। আয়াশের দাদুর সাথে একদম তর্ক করবি না, গ্রাম্য স্বভাবের প্রবীণ মানুষ অনেক কথা বলবে, সব গায়ে মাখবি না। কোনো আনকমফোর্টেবল সিচুয়েশন হলে আয়াশকে বলবি। নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই, নতুন জায়গায় একটু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবি দুইদিন তারপর আর কেউ নেই কেবল আয়াশ আর তুই। তাই ঝামেলা দরকার নেই..।”

​অন্তিহা মায়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে হেসে বলল,

“আম্মু, প্লিজ রিল্যাক্স! আমি কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চা নই যে হারিয়ে যাব!”

______

​গাড়ি ড্রাইভ করছে আয়াশ, আর পাসের সিটে চুপচাপ বসে আছে অন্তিহা। শহর ছেড়ে তাদের গাড়ি এগোচ্ছে। দুজনের কেউই কোনো কথা বলছে না। সাদামাটা একটা থ্রি-পিস পরা সত্ত্বেও কেন যেন অন্তিহার দিক থেকে আয়াশ বারবার চোখ ফেরাতে পারছে না। ঠোঁটে কোনো লিপস্টিক নেই, অথচ কী এক স্বাভাবিক আবেদন ছড়িয়ে আছে সেই অধরে! আয়াশ শুকনো ঢোক গিলে নিজের গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে একটু গাঢ় গলায় বলে,

“ওয়েডিং ফাংশনের জন্য কিছু শপিং করে নাও। আমার প্রেসটিজ ইস্যু নতুন বউকে পুরোনো পোশাকে মানায় না।”

​অন্তিহা বাইরে তাকায়। জনমানবহীন ফাঁকা রাস্তা ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান নয়। সে কিছুটা বাঁকা হেসে বলে,

“এখানে কি রাস্তার পাশে গাছগাছালির পাতা দিয়ে ড্রেস বানিয়ে বিক্রি করে আয়াশ? মানে, সামনের দু-তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শপিং মল আছে বলে তো মনে হচ্ছে না!”

​আয়াশ হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটাকে একটা সরু গলির দিকে নিয়ে যায়। সংক্ষেপে বলল,

“শর্টকাট। সামনেই একটা ভালো শোরুম আছে।”

​“ওহ্! জঙ্গলের ভেতরের সিক্রেট রুট সব জানা আছে, আর শহরে গেলেই যত নাটক!”

​কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটি সরু গলি পেরিয়ে একটা সুবিশাল, ঝলমলে শপিং কমপ্লেক্সের সামনে থামে। চারপাশটা বেশ জমজমাট। গাড়ি থেকে নেমে আয়াশ নিজে গিয়ে অন্তিহার পাশের দরজাটা খুলে । আয়াশের এমন ওভার-জেন্টলম্যান আচরণে অন্তিহা বেশ অস্বস্তি বোধ করছে। যে লোকটা কথায় কথায় মুখ বাঁকায়, তার এই অহেতুক কেয়ারিং ভাবটা হজম করা কঠিন! তারা কমপ্লেক্সের থার্ড ফ্লোরে যায়। জায়গাটা যেন আয়াশের হাতের তালুর মতো চেনা। আয়াশকে দেখা মাত্রই শোরুমের ম্যানেজার প্রায় দৌড়ে এগিয়ে এসেছেন। অন্তিহাকে একপাশে দাঁড় করিয়ে আয়াশ ম্যানেজারের সাথে নিচু স্বরে কথা বলল। ম্যানেজার ভেতরে চলে যেতেই আয়াশ এসে অন্তিহার পাশে দাঁড়ায়। সেন্ট্রাল এসি চলা সত্ত্বেও অন্তিহা যেন কিছুটা নার্ভাস হয়ে ঘামছে। আয়াশ নিচু স্বরে বলল,

“যা ভালো লাগে চুজ করে নাও। গ্রামে যাওয়ার পর কিন্তু আমি তোমাকে ঘরের বাইরে যেতে দেব না।”

​“আগে ভেতরে ঢুকতে তো দিন!”

​মিনিট পাঁচেকের মধ্যে শোরুমের ভেতরের বাকি কাস্টমারদের বেশ ভদ্রভাবে বের করে দেওয়া হলো। ম্যানেজার নিজে এসে ওদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। প্রকাণ্ড কাঁচের দেয়াল, মেঝেটা চকচক করছে আর বাতাসে অসাধারণ দামী পারফিউমের সুবাস ঠিক যেমনটা আয়াশের ব্যক্তিগত যায়গা গুলোতে থাকে! আয়াশ একটা চেয়ারে স্যানিটাইজার স্প্রে করে খুব কায়দা করে বসে। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

“যা ইচ্ছা পিক করো।”

​অন্তিহা এক ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“যদি লাক্সারিয়াস বা লাখ টাকার ওপরের কোনো ড্রেস চুজ করি?”

​আয়াশ একচিলতে মুচকি হেসে মাথা নাড়ে,,

“২-৪ টা ড্রেস অনায়াসে নিতে পারো। মাই ওয়াইফ হিসেবে ওখানে আমার স্ট্যাটাসের সাথে ম্যাচ করতে গেলে ওটা কিছুই নয়।”

​অন্তিহা এবার হেসে ফেলে। পাশে দাঁড়ানো ম্যানেজার ভদ্রভাবে হেসে বললেন,

“ম্যাম, আপনি যা ইচ্ছে সিলেক্ট করুন। এই শোরুমে আপনার জন্য ১০০% ডিসকাউন্ট রয়েছে!”

​অন্তিহা আয়াশের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়,

“আপনার নিজের শোরুম নাকি?”

​আয়াশ পলক ফেলে আলতো করে ‘হ্যাঁ’ সূচক সায় দেয়। অন্তিহা বিস্ময়ে আয়াশ আর পুরো শোরুমের দিকে আরেকবার তাকায়। পুরো কমপ্লেক্সের মধ্যে এটা সবচেয়ে প্রিমিয়াম ও এক্সপেন্সিভ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কাস্টমার তেমন নেই। হয়ত এক্সপেন্সিভ দেখেই। আয়াশের দিকে তাকিয়ে অন্তিহা রসিকতা করে খোঁচা দিল,

“ওহ্! তাই তো ভাবি গাড়িতে বসে এত ফুটানি মারছিলেন কেন ‘ভালো শরুম’! নিজের ঢোল নিজেই পেটানো অভ্যাস, স্যানিটাইজারের প্যাকেট একটা!”

​অন্তিহা ভেতরে ঢুকে ড্রেস দেখছে। শোরুমের গায়ে 'ডন্ট টাচ' ব্যানার ঝুলছে—অন্তিহার হাসি পেল, কেমন অদ্ভূত শোরুম! কেউ না ছুঁলে কিনবে কীভাবে? অবশ্য ওর জন্য কোনো নিষেধ নেই। একটা একটা করে ড্রেস গায়ে জড়িয়ে দেখছে সে। পাশে থাকা ফিমেল স্টাফটি একটানা তার রূপের আর চয়েসের প্রশংসা করে চলেছে মালিকের বউকে পাম দেওয়ার কোনো সুযোগই ছাড়ছে না!

​শেষমেশ অন্তিহা হালকা কাজের মধ্যে ৫টি ড্রেস পছন্দ করে আয়াশের সামনে এনে রাখে,

“দুদিনের জন্য এখান থেকে দুটো সিলেক্ট করে দিন।”

​আয়াশ সামান্য ঝুঁকে ড্রেসগুলোর প্রাইস ট্যাগ উল্টে দেখে, তারপর বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,

“সবগুলো মিলিয়েও তো ওয়ান লাখ পূর্ণ হলো না! ফাংশনে আমাকে কি এভাবে ছোট করতে চাও? চলো আমার সাথে...।”

​আয়াশ নিজ হাতে অন্তিহার কব্জি ধরে তাকে ভেতরের সেকশনে নিয়ে যায়। একটা একটা করে ড্রেস তুলে অন্তিহার গায়ের সাথে ধরে ধরে দেখতে থাকে কোনটা বেশি সিডাক্টিভ আর এলিগ্যান্ট লাগে। মেয়েটা স্বামীর দোকান ভেবে কম দামি কাপড় দেখছে, নিজের বলেই কি লুটে নেবে নাকি? কিন্তু আয়াশ খন্দকার অহংকারী লোক ফুটোনি না দেখালে হয়ত চলে না! বেশ কয়েকটি অতি দামী ড্রেস প্যাক করার অর্ডার দেয় সে।

​ট্রায়াল দেখতে দেখতে অন্তিহা ততক্ষণে বেশ ক্লান্ত। ভেবেছে এবার অন্তত বসার সুযোগ পাবে, তাই সরে যেতে চায়। কিন্তু আয়াশ চট করে আবার তার হাত চেপে ধরে। গভীর চোখে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“ওগুলো নেবে না?”

​অন্তিহা প্রশ্নাতুর চোখে তাকাল,

“কোনগুলো?”

​আয়াশ কপালে হাত দিয়ে সামান্য বিরক্ত প্রকাশ করে বলল,

“নাম জানি না... মেয়েদের ড্রেসগুলো?”

​অন্তিহা শুকনো ঢোক গিলে, সব তো নিলো আর কি বাকি? সে রুক্ষতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করে,

“কোনগুলোর কথা বলছেন?”

​আয়াশ কোনো রকম আগাম সংকেত ছাড়াই একপা এগিয়ে আসে। অন্তিহার পাতলা ড্রেসের কাঁধের অংশটা ঈষৎ সরিয়ে দিয়ে ভেতরের ইনারের চিকন ফিতাটা ধরে সামান্য টান দিয়ে ধরে

“এগুলো... যা তুমি সব সময় পরে থাকো। বিকিনি বলো এটাকে?”

​ঠিক তখনই পাশ থেকে দুজন ফিমেল স্টাফের হালকা ফিসফিস আর মুচকি হাসির শব্দ কানে আসে! আয়াশ অপ্রস্তুত হয়ে সেদিকে তাকাতেই হাতের টানে টেনে ধরা সেই চিকন স্ট্র্যাপটা সশব্দে গিয়ে অন্তিহার ফর্সা চামড়ায় আঘাত করে! ​চমকে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল অন্তিহা,

“আহহহহহহহ...!”

​ফিতাটা চামড়ায় গিয়ে আছড়ে পড়তেই অন্তিহা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে আয়াশের কাছ থেকে ছিটকে দূরে সরে যায়। কাঁধের ওপর হাত চেপে ধরে চোখ দুটো ছানাবড়া করে তাকায় সে। রাগে, লজ্জায় আর চরম অস্বস্তিতে তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে! ​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে স্টাফটি ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়ে একহাতে ঠোঁট চেপে ধরে কোনোমতে হাসি আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। আয়াশ রমনীর চিৎকার শুনেই আবার তার দিকে ফিরে ব্যথা পাওয়া স্থানে আবার হাত নিয়ে যায় দেখার উদ্দেশ্যে,

“সরি সরি আমি বুঝতে পারিনি, বেশি লেগেছে? এসব না পড়লেও চলবে। এসব আর পড়তে হবে না। একটএ টান পরলেই এত ব্যথা? উফফ।”

লজ্জায় চরম বিব্রত হয়ে অন্তিহা আঁটসাঁট করে চোখ দুটো বন্ধ করে। আয়াশের মুখটা নিজের দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে, গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,

“চুপ করুন! স্টাফরা আছে।”

​আয়াশ ড্যাবড্যাব করে নিষ্পাপের মতো তাকিয়ে আছে। লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠা অন্তিহার গাল দুটো রক্তিম আভায় ফুটে উঠেছে। আয়াশের হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল। সত্যি বলতে, এসবের নাম বা প্রকারভেদ সম্পর্কে আয়াশের কোনো ধারণাই নেই। সেদিন প্রথম অন্তিহার গায়েই সে এমন পোশাক দেখেছে, এর আগে কখনো এসব জানার প্রয়োজন মনে হয়নি। যেহেতু পরপর দু-একদিন অন্তিহাকে এভাবে দেখেছে, তাই অতি-বিশ্লেষণী মন নিয়ে সে ধরে নিয়েছে এটা হয়তো অন্তিহার নিত্যপ্রয়োজনীয় পোশাকের অংশ। আর সেই সরল হিসাব থেকেই ভাবে মানুষের সামনে পুরনো কাপড় পরে ঘুরে বেড়াবে? ​নিজের মুখ থেকে অন্তিহার হাত সরে যেতেই আয়াশ পাশের স্টাফ মেয়ে দুটোর দিকে রক্তচক্ষু দিয়ে তাকায়। ওর কঠোর চাহনির ইশারা পেতেই স্টাফরা বেশ চটজলদি সেখান থেকে কেটে পড়ে। ​আয়াশ পকেট থেকে ব্র্যান্ডেড হ্যান্ডকারচিফ বের করে নিজের ঠোঁট জোড়া আলতো করে মুছে নেয়। তারপর গলা ঝেড়ে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,

“হুম... চলো, ওদিকের সেকশনে আছে।”

​কথাটা বলেই সে ফের অন্তিহার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। শোরুমের এক সুসজ্জিত কর্নারে শুধু মেয়েদের বিভিন্ন লাক্সারিয়াস আন্ডারগার্মেন্টস অন্তর্বাসের কালেকশন রাখা। আয়াশ সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজে থেকেই বলতে শুরু করল,

“একচুয়ালি শোরুমের ফুল ইনভেস্টমেন্ট আর ওনারশিপ আমার হলেও এটা মম-ই হ্যান্ডেল করে। কখন কী স্টক লাগবে, কোন প্রডাক্টের চাহিদা বেশি সব মমের ডিসিশন। আর আমার এক কাজিন আছে, সে মমকে ব্যাক এন্ডে হেল্প করে। আজকে তার সাথে তোমাকে মিট করাব। অ্যান্ড প্লিজ অন্তি, সেভ মি ফ্রম দ্যাট অ্যানোয়িং গার্ল!”

​কথা বলতে বলতেই আয়াশ নিজের পছন্দমতো একটা সাইন শাইনিং, ওয়াইন-কালারের সেক্সি লেইস ড্রেস তুলে সরাসরি অন্তিহার গায়ের সাথে ধরে মাপতে শুরু করে! হঠাৎ নিজের ভাবনায় আয়াশের গাল গুলো নিজ থেকেই লাল হয়ে যাচ্ছে। জ্বীব দিয়ে ওষ্ঠ ভিজিয়ে নিলো। আকস্মিক এই কাণ্ডে লজ্জায় অন্তিহার মুখ রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠে, সে এক ঝটকায় আয়াশের হাত থেকে কাপড়টা কেড়ে নিয়ে যথাস্থানে ফিরিয়ে রাখে। তারপর আয়াশের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে টেনে বাইরের দিকে নিয়ে আসতে আসতে বলল,

“আয়াশ! আমার এসবের কিচ্ছু লাগবে না! দয়া করে চলুন এখান থেকে!”

​আয়াশ নিজের হাতটা ওর থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বিস্ময় প্রকাশ করে বলে,

“হোয়াট দ্য হেল অন্তি! আই জাস্ট স দ্যাট, ওটা তোমাকে মারাত্মক কমপ্লিমেন্ট করবে! ডার্ক ওয়াইন শেডটা তোমার ফেয়ার স্কিনটোনে একদম পারফেক্ট... আই জাস্ট ইমাজিনড ইট!”

​অন্তিহা চরম অস্বস্তিতে চোখ দুটি খিঁচে বন্ধ করে ফেলে।মানে আয়াশ তাকে ইতোমধ্যে কল্পনাও করে নিয়েছে আর এক মুহূর্তও না! আয়াশের হাত ছেড়ে দিয়ে সে সোজা হনহন করে শোরুম থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে।

​আয়াশ চোখ বন্ধ করে একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। অন্তিহা এখন যেটা পরে আছে, সেটার চেয়ে তো তার চুজ করা ওয়াইন কালারের ড্রেসটা অনেক বেশি সেক্সি আর স্টাইলিশ ছিল! ফর্সা ত্বকে বৈপরীত্য তৈরি করে রঙটা তো চমৎকার ফুটত, তবুও মেয়েটা অযথা ন্যাকামো করে চলে গেলো। পরেই তো থাকে সারাক্ষণ তাহলে তার সামনে ঢং করার কি আছে?

​আয়াশ এক ফিমেল স্টাফকে ডাকে। মেয়েটি সামনে এসে বিনীতভাবে দাঁড়াতেই সে সেই ড্রেসটা প্যাক করার নির্দেশ করে। বিলিং কাউন্টারে ম্যানেজারের হাতে প্যাকেটটা তুলে দিয়ে বেশ রাশভারী গলায় নির্দেশ দেয়,,

“ডেলিভারিটা দু-তিন দিন পর আমার পার্সোনাল রেসিডেন্সে পার্সেল করে পাঠিয়ে দেবেন। আর…।”

আয়াশ আঙুল তুলে সেই কর্ণারের দিকে ইশারা করে বলে,

“ওদিকের স্টক আরো ইউনিক এবং এক্সপেন্সিভ দেখতে চাই নেক্সট টাইম। আর একটু লম্বা হয় না ড্রেস গুলো? এত ছোট কেনো? একটু লং গুলো আনবেন।”

আয়াশের এমন বেকুবের মতো কথায়, কেবল হ্যাঁ সূচকে মাথা দোলায়। মালিকের সঙ্গে কি তর্কে কেউ যায়? সে চলে যেতেই ম্যানেজার কল করে লিজার কাছে। বেশ সম্মানের সহিত বলে,

“ম্যাম আয়াশ স্যার এসেছিলেন ওনার ওয়াইফকে নিয়ে।”

গাড়িতে উঠেও অন্তিহার গালের লালচে ভাব কমেনি একটুও। লজ্জায় আর রাগে রিফাইনড টিস্যু দিয়ে নিজের মুখ মুছতে মুছতে সে আয়নায় দেখে, আয়াশ হাতের শপিং ব্যাগগুলো পেছনের সিটে রেখে ড্রাইভিং সিটে বসছে। ​আয়াশ গাড়ি স্টার্ট দিতেই অপ্রত্যাশিতভাবে অন্তিহার নজর চলে যায় রাস্তার এক কোণায় থাকা একটি ফুলের দোকানে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত অবয়বটাকে দেখা মাত্রই তার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল,

“সাফওয়ান…!”

​আয়াশের তীক্ষ্ণ কানে নামটা পৌঁছাতেই সে কোনো কথা না বলে আচমকা এক্সিলারেটরে চাপ দেয়। ইঞ্জিন শব্দ করে গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে। কিছুটা দূর গিয়ে একটা নির্জন রাস্তার পাশে আচমকা ব্র্রেক কষে গাড়ি থামায় আয়াশ। তারপর অন্তিহার দিকে ঘুরে গাঢ় ও গম্ভীর গলায় বলল,

“অন্তি, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড... তোমার ফোনটা একটু দেওয়া যাবে?”

​হঠাৎ ফোন চাওয়ায় অন্তিহা কিছুটা বিব্রত ও দ্বিধান্বিত হয়, তবুও কোনো রকম সংকোচ না করে ফোনটা বাড়িয়ে দেয়, আয়াশ কিছু সময় নিস্তব্ধ থেকে অতঃপর অন্তিহার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অতীব দৃঢ় কন্ঠে বলল,

“আই অ্যাম ইউর হাসবেন্ড নাও, রাইট? তোমার জীবনের সবকিছুর ওপর আমার রাইট আছে তো?”

​অন্তিহা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,

“আছে, কিন্তু হঠাৎ এ কথা কেন?”

​অন্তিহার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই মনে করল না আয়াশ। সে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে ফোনটা সোজা বাইরের দিকে ছুড়ে ফেলে দিল! রাস্তার পাশের একটা খোলা নিচু জমির হাঁটু-সমান কাদা-পানিতে ছপাস করে গিয়ে পড়ে সেটা।

​ফোনটার করুণ পরিণতি দেখে আঁতকে উঠে অন্তিহা! ফোনটা বাঁচানোর অহেতুক চেষ্টায় সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আয়াশের চওড়া বুকের ওপর,,

“আয়াআআশ...!”

​কিন্তু শেষ রক্ষা হওয়ার আগেই তো তলিয়ে গেছে তার শখের ফোনটা! রাগে-ক্ষোভে অন্তিহার শরীর রিরি করে উঠে। আর কোনো কিছু না ভেবে 'ঠাস' করে এক চড় বসিয়ে দিল লোকটার গাল বরাবর! আয়াশের মুখটা ডানদিকে হেলে পড়েছে। অন্তিহা চিৎকার করে উঠল,

“কী করলেন এটা?! সবকিছুতে অধিকার আছে বলেই ফোনটা ফেলে দিলেন? এক দিনও পার হয়নি আয়াশ আমাদের সম্পর্কের, অথচ এখনই আমার মগজটা খেয়ে নিচ্ছেন আপনি! সকাল থেকে এখন পর্যন্ত আমাকে রীতিমতো পাগল বানিয়ে ছেড়েছেন! নিজেকে কী মনে করেন আপনি, হ্যাঁ?!”

​আয়াশ এক ফোঁটাও বিচলিত হলো না, কিংবা কোনো পাল্টা চিল চিৎকারও করল না। সে গ্লাভস বক্স থেকে অ্যাপলের একদম লেটেস্ট একটা প্রিমিয়াম আইফোনের প্যাকেট বের করে অন্তিহার দিকে বাড়িয়ে দেয়। বক্সটা দেখে অন্তিহার রাগ যেন আরও দ্বিগুণ চড়ে ! আয়াশ কোনো কথা না বলে নিজের সিটবেল্ট আনলক করে। তারপর অন্তিহার দুটো বাহু অত্যন্ত শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে তাকে আবার নিজের সিটে বসিয়ে দিল। অন্তিহা তখন রাগে বিষধর গোখরো সাপের মতো ফুসছে। ​আয়াশ এবার চরম শান্ত, অথচ বরফের মতো ঠান্ডা ও কঠিন গলায় বলল,

“অন্তি, আজ সকাল ৬টায় আমি তোমার বাড়িতে ঢুকেছি। তোমার বিছানার পাশে বসেছিলাম। তখন থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত তোমার ফোন স্ক্রিনের দিকে আমার চোখ ছিল। একটা পলকের জন্যও চোখ সরাতে পারিনি! আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, একটা লোক প্রতি মিনিটে তোমাকে ২ থেকে ৩টা করে কল দিয়ে যাচ্ছে! আর তুমি ঘুমের ঘোরে কখনো কল কাটছ, কখনো সাইলেন্ট করছ। একটু কি বিরক্ত হও না? আমি সামনে থেকেও তোমার থেকে এতটুকু প্রায়োরিটি পাই না..!”

​অন্তিহা আয়াশের চোখের দিকে চোখ রেখে পাল্টা গর্জে উঠল,

“আমাদের সম্পর্কের একদিনও হয়নি আয়াশ! সাফওয়ান লোকটা জানেই না যে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে! জানলে পাগল হয়ে যাবেন। আপনার মতো সহজ হবে না ওনার মুভ অন করা। উনি নেশাগ্রস্তের মতো পরেছিলেন আমার অপেক্ষায়। আপনি আমাকে ওকে বলার মতো পর্যাপ্ত সময় দেননি! সময় দিলে অবশ্যই সে বুঝত! আপনি একটা দিনেই কিসের অধিকারের কথা বলছেন?!”

​আয়াশ একদম সোজা হয়ে বসে। আইফোনের বক্সটা অন্তিহার কোলের ওপর রেখে শীতল কন্ঠে বলল,

“নতুন ফ্ল্যাগশিপ হ্যান্ডসেট, ভেতরে ডাবল সিম ইনসার্ট করা আছে। ফ্রান্সেরটা আর বাংলাদেশেরটা দুটো নাম্বারই চেঞ্জ হবে আজকেই। বিকজ আই অ্যাম ইউর হাসবেন্ড, অ্যান্ড আই হ্যাভ এভরি সিঙ্গেল রাইট ওভার ইউ!”

​অন্তিহা নিজের কোলের ওপর রাখা দামী ব্র্যান্ড নিউ ফোনটার দিকে একবার তাকায়। তারপর এক চিলতে বিষাক্ত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

“অধিকার? ওহ্, আচ্ছা! তাহলে তো আমারও এখন থেকে আমার অধিকারের হিসাব চাওয়া শুরু করে দেওয়া উচিত... ডিয়ার হাসবেন্ড?”

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন