#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ ৫৭
সন্ধা ৭ টা বাড়িতে সবে পা রেখেছে অন্তিহা, মেজাজটা চরম খিটমিট করছে। ড্রয়িংরুমে বসে কুহেলিকা আর বাকিরা আড্ডায় মশগুল। অন্তিহা ঢোকার মুখে নীল ডাকলেও বেচারির ডাকে সারা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না সে। সোজা নিজের কক্ষে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে। কত অদ্ভুত একটা অনুভূতির মুখোমুখি হলো আজ! সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের জমে থাকা রাগগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে সে। আয়াশ মিথ্যা বলা বা নাটক করার মতো উটকো কাজ কখনো করেনি সে তো বরাবরের মতোই গম্ভীর। তাই একটা ভুল হয়তো মাফ করাই যায়, কিন্তু না! তবুও এ কেমন মজা? এতগুলো মানুষকে এভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলে রাখা?
নিজের মনের সঙ্গেই তর্কে মেতে আছে সে, ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠে। স্ক্রিন দেখার প্রয়োজনবোধ করল না অন্তিহা, অবেলায় কেবল একজনই তাকে এভাবে বিরক্ত করার সাহস পায়। না দেখেই বেশ কড়া গলায় ধমকে উঠল,
“আপনাকে হাজারবার বললেও আপনার মাথায় ঢোকে না, তাই না মিস্টার?”
ওপাশ থেকে অত্যন্ত শীতল ও রাশভারী কণ্ঠ ভেসে এল,
“আর ইউ ইন সেন?”
সাফওয়ানের জায়গায় এক অনাত্মীয় কণ্ঠ শুনে থমকায় অন্তিহা। গত রাতে এত কথা শোনানোর পর লোকটা সামনাসামনি তো দূর, টেক্সটও করেনি। তাই ভাবলো এখন কল দিয়েছে। কিন্তু চেনা এক নারীর কণ্ঠ শুনে নিজের ভুল বুঝতে পেরে কৃত্রিম হাসির ভান করে বলল,
“লিজা চাচিমনি! আই আম এক্সট্রিমলি সরি। আমি অন্য কাউকে ভেবেছিলাম।”
ওপাশ থেকে মৃদু এক চিলতে হাসির শব্দ আসে,
“ইটস ওকে। এই বয়সে ভুল বোঝাবুঝি আর বিরক্তি তো খুব স্বাভাবিক।”
অন্তিহা শুকনো একটু হাসে। লিজা নিজ থেকেই বেশ আবেগপ্রবণ গলায় বলে উঠলেন,
“তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। দেশে থাকলে হয়তো সশরীরে গিয়ে দেখা করতাম। কিন্তু তোমার আঙ্কেলের যা স্বভাব তাঁতে বাইরে বের হওয়াটাই দুষ্কর।”
অন্তিহা পরিবেশটা হালকা করার জন্য রসিকতা করে বলল,
“হা হা, তিতু চাচ্চু তো এখনো বেশ রোমান্টিক!”
লিজা কিছুটা হালকাভাবে হাসলেও, পর মুহূর্তেই তাঁর স্বর গম্ভীর হয়ে আসে, লিজার সঙ্গে অন্তিহার সরাসরি কথা খুব একটা হয় নি কখনো, অন্তিক বা কুহুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সময় হয়তো কদাচিৎ একটু হাই-হ্যালো হয়। তাই আজকের এই বিশেষ ফোনকলের পেছনের আসল কারণটা বুঝতে অন্তিহার কষ্ট হলো না। লিজা নিচু কিন্তু আকুল গলায় বললেন,
“অন্তু, তোমার বাবা-মা দুজনের সঙ্গেই আলাদাভাবে কথা বলেছি। আয়াশ কি এতটাই খারাপ? ও তো তোমাদের সঙ্গেই বড় হয়েছে, তবুও তোমরা ওকে এমন অচেনা মানুষের মতো বিচার করছ কেন?”
অন্তিহা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“না আন্টি, অচেনার মতো কেন ভাবব? আয়াশ অত্যন্ত জেন্টল আর মার্জিত একজন মানুষ, আমি সেটা বিশ্বাস করি।”
লিজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“আয়াশ তোমাকে বিয়ে করতে চায়। ওর নিজস্ব কিছু প্রবলেম আছে, আমি জানি না ওর ফিউচারটা কী হবে। কাউকে নিজের ব্যক্তিগত সীমানায় ঢুকতে দেয় না সে। সামান্য অসুস্থ হলেও একাই সবকিছু সামলায়, হসপিটালে যেতে চায় না, নিজের চিকিৎসা নিজেই করার চেষ্টা করে। নিজের হাতে রান্না করে... গতবার হাতটা অতটা পুড়ে গেল, আমাকে ছুঁতেও দিল না! মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের যন্ত্রণায় নিজেই মলম দিলো ঠোঁটে কত সুন্দর সুক্ষ্ম হাসি তার। যেনো আমি ওর মা বুঝতেই পারব না। কিন্তু সম্প্রতি ওর দাদি বলল ও একমাত্র তোমার উপস্থিতিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তোমাকে ট্রাস্ট করে। অন্তু, তুমি কি রাজী হতে পারো না?”
আয়াশের জীবনের এই সব বিষয় গুলো অন্তিহার জানা, তবুও কথাগুলো শুনে বুকটা ভারী হয়ে উঠছে তার। সে কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলল,
“আন্টি...।”
লিজা তাকে থামিয়ে দিলেন। এবার তাঁর গলায় এক অপরিসীম ব্যাকুলতা, যেন বাঁধভাঙা কান্না চেপে রেখে বলছেন,
“একটা সময় নিজেদের সামলাতে গিয়ে সন্তানকে দূরে রেখেছি, আর আজ চাইলেও ওর পাশে দাঁড়ানোর কোনো অধিকার আমাদের নেই। ওর বাড়িতে রাত কাটানো স্বপ্নের মতই লাগে। ওকে মানসিকভাবে পিষ্ট হতে দেখলে কেবল নিজের অপরাধবোধেই দগ্ধ হই। পাস্ট ভুলে একটা বার কি ভেবে দেখবে অন্তু? ওসব যদি না ঘটত, তবে কি তুমি আয়াশকে এভাবে ফেরাতে পারতে? স্বাভাবিক জীবনযাপন করার অধিকার তো ওরও আছে, তাই না? তুমি সম্মতি দিলে তোমার বাবা-মা কখনোই দ্বিমত হবেন না।”
লিজার কথাগুলো অন্তিহার ভেতরের সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ গুলিয়ে দিচ্ছে। কোনো মতে কথা কাটিয়ে ফোনটা রেখে দেয় সে। দুই চোখের কোণ টলটল করছে। গত দুদিনের এই মানসিক চাপ আর গোলমেলে পরিস্থিতিগুলো যেন মস্তিষ্ক নিতে পারছে না। ফাঁকা বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই ঘরে প্রবেশ করে নীল। মাম্মামের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি সোজা হয়ে বসে অন্তিহা। নীল এসে তার পাশে বসে অন্তিহা তার বুকে মাথা রাখতেই পরম স্নেহে অন্তিহার মাথায় হাত বুলিয়ে শুধাল,
“আয়াশকে দেখে আসলে? কেমন আছে ও এখন?”
কথাটা শুনতেই অন্তিহার রাগটা যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আয়াশের মায়ের প্রতিটি আকুতি বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে। নীলের কোল থেকে ঝটকা দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলে,
“ওর নামও নিয়ো না আমার সামনে! স্যানিটাইজারের প্যাকেট একটা! নিছক সিম্প্যাথি পাওয়ার জন্য অন্ধ হওয়ার অভিনয় করছিল। ইচ্ছে করছিল সত্যি সত্যি চোখে ছুরি ঢুকিয়ে ওকে চিরতরে সত্যি অন্ধ বানিয়ে দিতে!”
মেয়ের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন রাগ দেখে শব্দ করে হেসে ফেলে নীল। অন্তিহার উরুতে হালকা চাপড় মেরে বলল,
“আয়াশ নাটক করছিল এতদিন?”
“হ্যাঁ! সবার অনুকম্পা পাওয়ার জন্য! কিন্তু আজ যখন ভুল করে আমি ওর গায়ের ওপর...”
কথাটা মাঝপথেই আটকে যায় অন্তিহার। এ কী! সে নীলয়ীর কাছে নিজের মাম্মামের কাছে এসব কী বলতে যাচ্ছিল! তাকে হুট করে চুপ মেরে যেতে দেখে নীল মৃদু হেসে বলল,
“সবার সিম্প্যাথি ? নাকি কেবল তোমার?”
অন্তিহা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে নেয়। ঠোঁট উল্টে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ওনার কি আমার করুণার কোনো প্রয়োজন আছে? আমার এমনিতেই মায়া হয়।”
“ঠিক। কিন্তু মায়া বা করুণা তো যেকোনো মানুষের জন্যই হতে পারে, তাই বলে মায়া হওয়া প্রত্যেকটা মানুষকে তো আর বিয়ে করে গলায় ঝুলিয়ে নেওয়া যায় না, তাই না?”
নীলের গলার প্রাজ্ঞ স্বরে ঘরের পরিবেশ হঠাৎ করেই থমথমে হয়ে উঠে। অন্তিহা সোজা হয়ে নীলের চোখে চোখ রাখে। অত্যন্ত দৃঢ় কিন্তু ব্যাকুল গলায় প্রশ্ন করল,
“হঠাৎ এ ধরনের কথা বলছ কেন মাম্মাম?”
নীল স্নিগ্ধ হাতে অন্তিহার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাতাসের মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“দেখ অন্তু, আয়াশ ভালো ছেলে, নো ডাউট। কিন্তু দ্যাট ডাজাজন্ট মিন যে তোকে ওর সাথেই বিয়ে করতে হবে! বাস্তবিক অর্থে, ওর সাথে কারো ফিউচার সিকিউর নয়। শি ইজ সিক... হি ইজ লিটারালি মেন্টালি আনস্টেবল।”
অন্তিহা নীলের হাতটা নিজের মাথা থেকে নামিয়ে দিয়ে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে। সে আয়াশের ওপর অভিমান করেছে সত্যি, হয়তো বিয়েতেও রাজি নয়, কিন্তু তাই বলে আয়াশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এভাবে অপবাদ দেওয়া? যা-ই হোক, আয়াশকে এভাবে ছোট করা অন্তত নীলের মুখ থেকে সে সহ্য করতে পারছে না।
অন্তিহা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“সিক? মেন্টালি আনস্টেবল? তাহলে আশা আর আয়াশের বিয়ের সময় তোমরা এভাবে বাধা দাওনি কেন মাম্মাম?”
“কারণ আশা আর আয়াশ একে অপরকে ভালোবাসত। আর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু তোর ক্ষেত্রে এটা কোনো ভালোবাসা নয়, কেবল একটা কম্প্রোমাইজ হবে। তোর বাবাকে কেউ বোঝাতে পারছে না, উনি আবেগ দিয়ে চিন্তা করছেন।”
অন্তিহা ঢোক গিলে নিজের শুকনো গলাটা ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। নীল বলতে থাকে,
“ধরে নিলাম তুই বন্ধুত্বের খাতিরে সব মানিয়ে নিবি। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি ভাব ইন ফিউচার? একটা মানুষের সেক্সুয়াল ও মানসিক চাহিদা থাকে। আর আয়াশ তো কারো শরীরের উপস্থিতি পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না! আমি বুঝি না, তোর বাবা কেন তোকে এমন একজন মানুষের সাথে বেঁধে দিতে চাচ্ছেন? অন্য কারো মেয়ে হলেও কেউ রাজি হতো না, তাই তোর ঘারে চাপাচ্ছে। আয়াশ একটা পেশেন্ট, অন্তু!”
নীলয়ীর এই শীতল বাস্তবমুখী কথাগুলো অন্তিহার হৃদয়ে প্রকাণ্ড আঘাত করছে, বুকের ভেতর রক্তহিম হয়ে আসছে। চোখ দুটো জলে ভরে উঠে তার। সে এগিয়ে গিয়ে নীলের দুটো হাত নিজের মুঠোয় পুরে গলায় আবেগ দলা পাকিয়ে আসলেও শক্ত হয়ে থেমে থেমে বলল,
“ওসিডি বা শুচিবায়ু কোনো রোগ বা অপরাধ নয় মাম্মাম! এটা একটা সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশন। আয়াশ শুধু একটু সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পছন্দ করে আর নিজেকে হাইজেনিক রাখতে চায়। যাতে অসুস্থ না হয়ে পরে। প্লিজ, ওকে এভাবে অপাংক্তেয় করে বোলো না!”
নীল ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অন্তিহার এই তীব্র প্রতিবাদ তাকে কিছুটা অবাক করছে, মেয়েটার গাল দুটো অভিমানে আর কান্নায় লাল হয়ে উঠেছে। চোখের বাঁধ ভেঙে এবার দু-ফোটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। নিলয়ীর দিকে তাকিয়ে একদম নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে অন্তিহা বলল,
“এতগুলো দিনে বাকিদের হাজারটা কথায় আমি যতটা না আঘাত পেয়েছি, তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেলাম আজ তোমার এই মানসিকতায়, মাম্মাম! আমি ডাক্তার হতে চাই এই কারণে, যাতে আয়াশের মতো মানুষদের ট্রিটমেন্ট করতে পারি। আয়াশই তো আমার পেশাগত স্বপ্নের অনুপ্রেরণা তুমি তো সব জানতে! অথচ আজ আমার সেই স্বপ্ন আর অনুভুতিকেই তুমি এত নিচু চোখে দেখলে?”
নীল তার ভেজা গালটা মুছে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“পেশেন্ট ট্রিট করা আর পেশেন্টের সাথে একই ছাদের নিচে সংসার করা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, অন্তু। এটা কোনো ৮ ঘণ্টার ক্লিনিক্যাল ডিউটি নয় যে চেম্বার শেষে বাড়ি ফিরে আসবি। ওকে বিয়ে করা মানে একটা হাসপাতালকে নিজের বসতবাড়ি বানিয়ে ফেলা। কেউ জেনেশুনে নিজের মেয়ের জীবন এভাবে ভাগ্যের ওপর ছাড়ে না। সন্তানের জন্য যদি আমার মানসিকতাকে তোর কাছে সংকীর্ণ মনে হয়, তবে তাই সই! তবুও আমি চাই না তুই ওর সাথে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করিস।”
মুহূর্তের জন্য লিজা আন্টির আকুল কণ্ঠটা অন্তিহার মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনি তুলে । আভিজাত্য আর সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে আয়াশদের পরিবার অনেক উঁচুতে, অথচ সেই আয়াশের মা মানুষটা আজ সন্তানের জন্য কতটা অসহায়ভাবে কেঁদে উঠেছেন! নিজের মা-ও তো আয়াশের এই অসম্পূর্ণতার জন্যই অমত করছে। আর তার বাবা হয়তো কেবল আয়াশের নিখাদ হৃদয়টাকে দেখতে পাচ্ছেন।
সবাই তো নিজ নিজ জায়গা থেকে একদম যুক্তিযুক্ত!
অন্তিহা নিলয়ীর আরও একটু কাছে ঘেঁষে বসে। চোখের জলটুকু আলতো করে মুছে নিয়ে, অত্যন্ত অনুভবী ও পরিপক্ব গলায় বলল,
“মাম্মাম, আয়াশকে যদি ‘অ্যাবনরমাল’ বলে আমরা সবাই এভাবে দূরে সরিয়ে রাখি, তবে দিনশেষে ওর গন্তব্যটা কী হবে? সামান্য ওভারথিংকিং আর মানসিক জটিলতার জন্য একটা মানুষ সারাজীবন একাকীত্বের অভিশাপ বইবে? ওদের কি স্বাভাবিক জীবনের অধিকার নেই? একটু প্রপার মেন্টাল সাপোর্ট আর ভালোবাসা পেলে ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে আমার নিজের একাডেমিক এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলছি। আর রইল ভালোবাসার কথা? ভালোবেসে যদি মানুষ মানিয়ে নিতে পারে, তবে আমিও পারব। কারণ আমি জন্ম থেকেই মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত, এবারও পারব... কারণ আমি ওকে ভালোবাসি, মাম্মাম।”
কথাটা শেষ করে অন্তিহা বসা থেকে উঠে । নিলয়ী যাতে তার স্পষ্টভাষিতায় মনে কোনো ক্ষোভ বা অভিমান পুষে না রাখে, তাই পরম মমতায় নিলয়ীর হাতের উল্টো পিঠে একটা নরম চুমু আঁকল সে।
অন্তিহা কক্ষ থেকে বের হতেই নিলয়ীও তার পিছু পিছু নেয়। বাতাসের বুকে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অন্তিহা ধীরে ধীরে মায়ের কক্ষে প্রবেশ করে। তার চোখে ইতস্তত ভাব, মাথা সামান্য নত। কুহেলিকা তার দিকে প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। অন্তিহা বুক ভরে একটা বড় শ্বাস নেয়, কিন্তু কণ্ঠের ভেতর জমে থাকা হতাশাটুকু কোনোভাবেই গোপন করতে পারল না। অত্যন্ত শান্ত দৃঢ় গলায় বলল,
“আম্মু, আয়াশকে তুমি আমার জন্য চাও না কেনো? এর পেছনে কারণ কি শুধুই এটা যে ও ওসিডির মতো একটা সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? বাকি পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো তুমিও মনে করো যে ওর কোনো ভবিষ্যৎ নেই? কিংবা ওসিডির মতো একটা সমস্যা আছে বলেই ও জীবনের কোনো সুখ বা ভালোবাসা ডিজার্ভ করে না? ওর লাইফে গিয়ে কোন মেয়ে ভালো থাকবে না?”
মেয়ের এমন অভাবনীয় ও ভারিক্কি প্রশ্নে কুহেলিকা বিস্ময় ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। হাতের ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে কড়া গলায় শুধালেন,
“কী বললে তুমি?”
অন্তিহা মায়ের একদম কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। মুখোমুখি হয়ে, চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,
“আম্মু, আমি যদি নিজের সম্পূর্ণ ইচ্ছায় আয়াশকে বিয়ে করতে চাই, তুমি কি তবুও অমত করবে? কারন আয়াশের ওসিডি!”
কুহেলিকার চোয়াল শক্ত হয়। অত্যন্ত রুক্ষ ও গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি ওকে বিয়ে করতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
একান্তই নির্লিপ্ত স্পষ্ট উত্তর তার। কুহেলিকা কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, হয়তো ভাবছে অন্তিহা এখনই নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়ে সরে দাঁড়াবে। বলবে সে আয়াশকে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না বরং অন্তিহা মায়ের উত্তরের অপেক্ষায় একদম শক্ত হয়ে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে। কুহেলিকা তাকে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে, হাতের ফোনটা সামনের দিকে তুলে ধরে লাউডস্পিকার দিয়ে দেয়। তারপর ভারী ও গম্ভীর গলায় ওপাশে থাকা মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“শুনেছ তো? এবার আর সরি সরি করে নিজের গলা আর আমার কান ব্যথা করতে হবে না তোমার।”
ওপাশ থেকে কেবল দ্রুত ও ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। মায়ের এমন অকস্মাৎ আচরণে অন্তিহা ভীষণ বিব্রত হলো। ওপাশে ঠিক কে আছে তা দেখার জন্য উঁকি দিতেই, স্পিকার ভেদ করে আয়াশের অত্যন্ত বিনয়ী মার্জিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
“আম্মু, মেয়েদের নাকি হুটহাট মুড সুইং হয়। তাই শুভ কাজে আর দেরি করার দরকার নেই তারিখটা কালকেই রাখুন, আমি কালকেই ওকে চাই।”
আয়াশের ওই শান্ত কণ্ঠ শোনামাত্রই মাথা চক্কর দিয়ে উঠে অন্তিহার! ধাক্কা খেয়ে শরীরটা দুই কদম পিছিয়ে গেল তার। কুহেলিকা তার কথায় হতবিহ্বলের মতো হেসে ওঠে বলে,
“আম্মু?”
তাদের কথা যেনো সব গুলিয়ে যাচ্ছে অন্তিহার। নিয়লীর বুকে মুখ লুকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠে,
“স্যানিটাইজার দিয়ে আমার মান-সম্মানও তুমি একেবারে অদৃশ্য জীবাণুর মতো ক্লিন করে দিলে! মাগো।”
সামলাতে না পেরে পেছাতে গিয়ে সে নিলয়ীর গায়ে গিয়ে হেলান দিয়ে পড়ে। বেচারি নিলয়ী চোখের সামনে নিমেষের মধ্যে কী থেকে কী হয়ে গেল, তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না! কিছুক্ষণ আগেই যে মেয়ে আয়াশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়ছিল, আর যে মা বিয়ের ঘোর বিরোধী ছিল। আয়াশের ওই এক মিষ্টি কথার জাদুতে কুহেলিকাকে এভাবে গলে যেতে দেখে অন্তিহাকে কিছু একটা বোঝাতে চেয়ে ছিলো সে। কিন্তু তার কথায় উল্টো একটা অসুস্থ ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হলো অন্তিহা। ফোনের ওপাশ থেকে আয়াশের কণ্ঠ ফের ভেসে আসে আবার,
“কোনো আয়োজন করতে হবে না, প্লিজ। আমি কাল বাড়িতে আসব, ওকে সাথে নিয়ে সোজা কোর্টে যাব ব্যাস! আর কোনো ঝামেলা চাই না আমি।”
কুহেলিকা গলা খাকানি দিয়ে বলে,
“বললেই হয়ে যায় না আগামীকাল উইকেন্ড কোর্ট বন্ধ। অন্তুর বাবাকেও তো বলতে হবে।”
“এখন বাড়ি যাবেন না?”
“হ্যাঁ।”
কুহেলিকা কলটা কেটে দিলো অন্তিহা ঠোঁট চেপে লজ্জা আঁটকে রাখার প্রয়াস করছে। সে কিভাবে ভুলো গেলো আয়াশকে তার মা আর বাবা কতটা পছন্দ করে! যতই দ্বিমত করুন আয়াশের মিষ্টি কণ্ঠে যে তার মা গলে যায়। কুহু আদেশের সুরে বলে,
“রেডি হও বাড়ি যাবো।”
_________
রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা পেরিয়ে গেছে। পুরোটা দিন অন্তিকের সাথে নানা কাজে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে অহীন যদিও এই ব্যস্ততার পেছনে কোন অজানা কারণ লুকানো, তা অন্তিকই ভালো জানে। অহীন চেয়েছিল আশাকেও সাথে করে নিয়ে আসতে, কিন্তু বাড়িতে মায়ের অনুপস্থিতিতে তাকে একা নিয়ে আসাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। আগামী কয়েকটা দিন অহীনের অনেক ব্যস্ততা থাকবে, বাবাও বাইরে কাজে ব্যস্ত থাকবেন, তাই এই পরিস্থিতিতে আশাকে বাড়িতে একা রেখে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে অহীনের। বাইকটা পার্ক করে বাবা-ছেলে একসাথেই সিঁড়ি পেরিয়ে ওপরে উঠে । লিফটে চেপে নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে আসতেই দুজনই থমকে দাঁড়ায়। দরজার ফাঁক গলে ভেতরে আলোর স্পর্শ দেখা যাচ্ছে, আর সাথে ভেসে আসছে সুস্বাদু খাবারের মৌ মৌ সুবাস! অহীন অন্তিকের দিকে তাকিয়ে রহস্যের হাসিসহ কলিংবেল বাজিয়ে বলল,
“আম্মু মনে হয় চলে এসেছে!”
অন্তিক হালকা মাথা নেড়ে সায় দিল,
“ হয়তো এসেছে।”
তাদের সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দরজা খুলে দিল অন্তিহা। সারাদিনের ধকল শেষে তার চোখেমুখে একরাশ ক্লান্তি স্পষ্ট। অন্তিক মেয়েকে দেখেই মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে যায়। পরম ভালোবাসায় অন্তিহার এক হাত বাহুতে জড়িয়ে ধরে আলতো করে বলল,
“আমার বাঘিনীর রাগটা কি অবশেষে কমলো?”
বাবার জড়িয়ে ধরা হাতে অন্তিহা ঠিক কামড় দেওয়ার ভঙ্গি করে গর্জন তুলে, “ভাও!”
তাতেই অন্তিক দারুণ ভয় পাওয়ার ভান করে চট করে হাতটা সরিয়ে নেয় তার বাহু থেকে। অন্তিহা নাক-মুখ কুঁচকে কৃত্রিম রাগের প্রকাশ করে,,
“একটা সত্যি সত্যি কামড় বসিয়ে দিলে তবেই রাগ কমবে!”
বোন আর বাবার এই কান্ড দেখে অহীন শব্দ করে হাসে, হাসতে হাসতেই সে অন্তিহাকে হালকা একটা খোঁচা মেরে অন্তিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আব্বু, একে তুমি বাঘিনী কোথায় পেলে বলো তো? এ তো পুরো কুত্তির মতো কামড়াকামড়ি করার মুডে আছে!”
অন্তিহা অবশ্য এত সহজে দমার পাত্রী নয়। সে নিজের ভাব ধরে চুলগুলো পেছনে হেলিয়ে অহংকার মিশিয়ে বলল,
“এক্সকিউজ মি?! তোমার এক্স-ওয়াইফ তোমাকে কুত্তা তাই বলে এই নয় যে আমিও একই স্বভাব পাব! আমি বাঘের বাচ্চা প্রিন্সেস tigress! তাই না, আব্বু?”
অন্তিক তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে যার অর্থ সে তার কথায় সম্মতি জানাচ্ছে। তবে পরক্ষণেই একটু গলা খাঁকারি দিয়ে অন্তিহার একদম কানে কানে নিচু স্বরে হিসহিসিয়ে শুধাল,
“আমার বউ কোথায়?”
অন্তিহা একইভাবে ফিসফিস করে খোঁচা দিয়ে বলপ,
“সকালে দুজন মিলে বাসার কী হাল করে রেখে গিয়েছিলে মনে আছে? আম্মু কিন্তু চরম রেগে আছে!”
অহীন এক চিলতে মেকি হাসি দেয়। তবে পুরো চারপাশটায় আজ এক দারুণ রান্নার সুবাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। অহীন নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়েও হঠাৎ রান্নাঘরের কাছে এসে থমকে যায়। মস্তিষ্কে কী যেন একটা সিগন্যাল দিতেই পা দুটো দুই পা পিছিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল সে।
ভেতরে পরিচিত দুজন নারী তার মায়ের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে কাজ করছে আশা! পরনের হালকা গোল ফ্রকটা তার প্রতিটা চলাফেরার তালে দুলছে। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছোটখাটো গড়নের মেয়েটাকে দেখতে ভীষণ বাচ্চা বাচ্চা লাগছে। অহীন নিজের ঠোঁটের কোণের প্রফুল্ল হাসিটা আর চেপে রাখতে পারল না, ডেকে ওঠে,
“সোনাহ!?”
গাল ভরে হেসে প্রেয়সীকে আকড়ে ধরার জন্য এগিয়ে গেল। তার ডাক শুনে আশাও অহীনকে দেখে সুন্দর করে দাঁত বের করে হেসে উঠে। কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরার ঠিক আগের মুহূর্তেই দুজনে আবিষ্কার করে তাদের চোখের সামনে বাধা হয়ে ঝুলছে গরম ধোঁয়া ওঠা একটা খুন্তি! মুহূর্তের মধ্যে দুজনের পা বরফের মতো জমে গিয়েছে যথাস্থানে। পাশে কুহেলিকা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ কঠিন দৃষ্টিতে অহীনের দিকে তাকিয়ে আছে। অহীনকে আপাদমস্তক এক নজর মেপে নিয়ে ভারী ও গম্ভীর গলায় বলে,
“আগামী পাঁচ মাস যদি কোনো উল্টোপাল্টা আচরণ দেখি, তবে আমি কিন্তু আশাকে সোজা শিকদার বাড়ি পাঠিয়ে দেব!”
অহীন ঢোক গিলে। আশার বুকের ভেতরটা আতঙ্কে ধক করে উঠে, সে চট করে পিছিয়ে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। অহীন আমতা আমতা করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
“আম্মু, আমাদের বিয়ের আগে যেমন সম্পর্ক ছিল, আমরা তো স্বাভাবিকই থাকব। তখন তো একটু-আধটু মজা করে...”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশে দাঁড়িয়ে অন্তিক গম্ভীর গলায় বলে উঠে,
“বিয়ের আগের দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল স্রেফ কাজিনের মতো। কিন্তু এখন আশা তোমার অনাগত সন্তানের মা। এই সত্যটার পরেও কি দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি?”
অহীন মাথা উপর-নিচ দুলিয়ে সায় দেয়, যার মানে, হ্যাঁ, অবশ্যই বদলেছে। কুহেলিকা স্বামীর কথায় সায় দিয়ে নিজের আদেশ করেন,
“তাহলে নিজের এখনের দৃষ্টিভঙ্গিটাও এখন থেকে শুধরে ফেলো। আশা এখানে অন্য কোনো পরিচয়ে নয়, কেবল আমার মেয়ে হয়ে এসেছে। অন্তুর বিয়ে হয়ে গেলে আমি একদম একা হয়ে পড়ব। তাই যেহেতু আশা বা তুমি কেউই দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাও না, তাই ওকে আমি নিজের কাছেই রাখব। সময় যাক, কিছুদিন পর উপযুক্ত সময় দেখে-শুনে আমার মেয়ের অন্য কোথাও আবার বিয়ে দিয়ে দেব। তার আগ পর্যন্ত আশা করি নিজের নজরের সংযম বজায় রাখবে, নয়তো সেই চোখ চিরতরে তুলে ফেলার ব্যবস্থা কিন্তু আমাকেই করতে হবে!”
অহীন মুখটা ভার করে বলল,
“তুমি আমাকে একদম ভালোবাসো না, আম্মু! খালি সুযোগ পেলেই মারো আর বকো!”
কুহেলিকা ছেলের দিকে চোখ বাঁকিয়ে একটু হাসে, তারপর এগিয়ে এসে অহীনের দু’গাল চেপে ধরে আদুরে গলায় ভেংচি কেটে বলল,
“ওওও.লে লে. আমার কোল-বাচ্চাটা বুঝি রাগ কলেতে? ফীডার খাবে? নাকি তোমার জন্য লোডানি বানিয়ে আনব, বাচ্চা আমার?”
মায়ের এমন শিশুসুলভ রসালাপ দেখে রান্নাঘর থেকে আশা আর অন্তিহা খিকখিক করে হেসে উঠে, ফর্সা গাল দুটো টেনেটুনে লাল করে ফেলেছেন কুহু, তবে অহীনের ব্যথার চেয়ে যেন লজ্জাই বেশি লাগছে! ছোটবেলায় সে ওভাবে কথা বলত বলেই হয়তো আজ মা এভাবে খোঁচা দিল। অহীন গা ঝাড়া দিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতে নিলে অন্তিহা পেছন থেকে ডেকে বলল,
“ভাইয়া, আপনাকেই কিন্তু আম্মু সবচাইতে বেশি ভালোবাসে! নয়তো আপনার বাচ্চার জন্য লোডানি বানানোর বয়সে আপনার জন্য ফীডারের চিন্তা করতেন?”
“তুই খা বেয়াদব লোডানি !”
অহীন গজগজ করতে করতে নিজের রুমে ঢুকে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়। অন্তিক আশার খবরাখবর জিজ্ঞেস করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। লোকটার রাগ সচরাচর সহজে ভাঙতে চায় না, আজকেও ব্যতিক্রম কিছু হলো না। কুহেলিকা ভেবেছিল হয়তো স্বামীর ওপর একটু পাল্টা রাগ দেখালেই সব বরফ গলে যাবে, কিন্তু সাহেবের এহেন বরফশীতল ভাব দেখে তিনি নিজেই এবার ফাঁদে পড়েছেন! অন্তিহা আর আশার হাতে রাতের রান্না বাকিটা সামলানোর ভার দিয়ে কুহু অন্তিকের পিছু পিছু ঘরে যায়, আলতো হাতে দরজার লকটা আটকে দেয় সে। অন্তিক বেশ থমথমে মুখে নিজের গায়ের শার্টের বোতাম খুলছে। কুহু চট করে এগিয়ে গিয়ে তার হাতে হাত রাখে, পরম মায়ায় নিজেই একটা একটা করে শার্টের বোতাম খুলে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন গলায় বলে
“আমার দানব আকারের কুত্তাটা কি এখনো রাগ করে আছে?”
অন্তিক নির্লিপ্ত গলায় নাকচ করে বলল,
“উহুঁ, রাগ করার মতো কিছু হয়নি।”
কুহু শার্টটা সরিয়ে দিয়ে দু’হাতে অন্তিকের গলা জড়িয়ে ধরে। গলার স্বর একদম নিচু করে ফিসফিসিয়ে বললেন,
“মেয়েটার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, তাই ওভাবে রাগ দেখিয়ে ফেলেছিলাম, সরি জান।”
অন্তিক একচিলতে মিষ্টি হেসে কুহুর হাত দুটো গলা থেকে সরিয়ে নেয়। শান্ত গলায় বোঝানোর সুর তুলে বলল,
“তাতে কী হয়েছে? কেউ না জানুক আমি তো জানি আমি তোমার। কেউ না জানুক তুমি তো জানো তুমি আমার। পেঁচিটাকে তো আমি তবুও সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসি।”
অভিমানী কুহু চোখ উল্টে বলে
“তাহলে কাল রাতে আমাকে ছাড়া ঘুমালে কীভাবে? এতগুলো বছরের সংসারে তো কখনো আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে দূরে যেতে দাওনি!”
অন্তিক প্যান্ট ছেড়ে টাওয়েল পরতে পরতে একটু ব্যস্ত গলায় বলল,
“তোমাকে কিছুটা পার্সোনাল স্পেস দিতে। কিন্তু ট্রাস্ট মি, তোমার উপস্থিতিতে আমি এতটাই অভ্যস্ত যে পুরোটা রাত আমার চোখেই পাতা এক হয়নি! ঘরের প্রতিটা দেয়াল গুনে গুনে রাত পার করেছি।”
কুহু এক পা এগিয়ে আসে টাওয়েলটা ধরে হালকা টানে অন্তিককে নিজের কাছে টেনে আনে। তারপর পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে অন্তিকের গলার কাছে মুখটা নিয়ে আসে। তাঁর উত্তপ্ত নিঃশ্বাস অন্তিকের চামড়ায় এক অদ্ভুত শিহরণ তুলে দিচ্ছে। কুহু হিসহিসিয়ে বললেন,
“আমি তো সরি বলছি, জান! কাল রাতের সব আক্ষেপ কি আজ পুষিয়ে দিলে হবে না?”
অন্তিক হঠাৎ কুহুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দেয়। আড়চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেয় লক করা আছে কি না। তারপর নিচু হয়ে কুহুর উরুর কাছের শাড়ির আঁচলটা একটু উপরের দিলে তুলে সরাতে সরাতে বলল,
“তাহলে এখনই পুষিয়ে দাও, বিবিজান!”
কুহু সামান্য পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। শক্ত আর বরফশীতল হাতের সেই পরিচিত স্পর্শ তাঁর পুরো অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। কম্পিত গলায় থেমে থেমে বললেন,
“বাচ্চারা এখনো ঘুমায়নি, অন্তিক! ছাড়ুন...”
“ওরা এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। বাবা-মায়ের প্রাইভেসি কীভাবে সম্মান করতে হয়, সেটা ওদের জানা আছে। তোমার এত না ভাবলেও চলবে.. তুমি নিজের কণ্ঠের চিৎকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ করো। আর ভালো স্ত্রীরা স্বামীকে কখনো তৃষ্ণার্ত রাখে না!”
অন্তিক কুহুর দিকে ঝুকে আসে। ঠোঁট দুটো কুহুর গলায় স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তেই সম্পূর্ণ পরিবেশটা ভেস্তে গেল দরজার বাইরে তীব্র কলিংবেলের শব্দে! ‘এত রাতে আবার কে এল?’
কুহু অন্তিকের বুকে হাত দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয়। অন্তিক মারাত্মক বিরক্তিতে ‘চ’ শব্দ করে। তারপর বিছানা থেকে উঠে একপ্রকার গজ গজ করতে করতে বাথরুমে ঢুকে সে। এমন সময় একদম বিরক্তি সহ্য হয় না। এখন ঘুমানোর অপেক্ষা করতে হবে।
কুহু নিজের শাড়িটা দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। অন্তিহা ইতোমধ্যেই দরজার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। তবে দরজা খুলতেই সে একপ্রকার স্তম্ভিত হয়! মুখের ভেতরের সব কথা যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল, আর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তে লাল হয়ে উঠেছে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ! আর তার ঠিক পাশেই টুপি ও পাঞ্জাবি পরা ছোটখাটো গড়নের একজন হুজুর!
দৃশ্যে অন্তিহা শুকনো ঢোক গিলে, পেছন থেকে কুহু এগিয়ে আসে। এত রাতে হুজুরসহ আয়াশকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করল
“এত রাতে তোমরা? কী ব্যাপার, আয়াশ?”
আয়াশ অন্তিহাকে একপ্রকার পাশ কাটিয়ে সটান ভেতরে ঢুকে পড়ে, আয়াশের চোখ যায় দরজায় এলোমেলো হয়ে থাকা জুতো গুলোরর দিকে অভ্যাসবশত ভেতরের অস্থিরতা শিরশির করে উঠলেও সে সেদিকে পাত্তা না দিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, হুজুরকে ভেতরে আসার অনুরোধ জানিয়ে অন্তিহা দরজাটা আটকে জুতো গুলো সব ঠিক করে। পাছে এটা দেখেও বমি করে দেবে। খাটাস।
আয়াশ কুহুর দিকে তাকিয়ে জ্ঞানীর মতো গম্ভীর ভাব নিয়ে দ্রুত বলে
“আসলে চাচি, আপনার সাথে কল কাটার পর পুরো ১০ সেকেন্ড আমি খুব গভীর মন দিয়ে ভাবনায় ছিলাম। আমি অনুধাবন করলাম এই মুহূর্তে কোনো রিস্ক নেওয়া যাবে না, বিয়েটা আজকেই করতে হবে। আমার অন্তি এখন আর আগের মতো নেই, পাল্টে গেছে! আমার কথা আর আগের মতো ভাবে না। কাল সকাল হতে হতে যদি আবার ওর মতিগতি বদলে যায়?”
কুহু কণ্ঠস্বর নিচু করে বেশ চেপে চেপে বলে,
“তাই বলে মাঝরাতে এভাবে হুজুর নিয়ে হাজির হবে? আমি তো এখনো অন্তিক কিংবা তোমার বাবা-মায়ের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথাই বলিনি!”
“চাচ্চু তো আগে থেকেই রাজি! আর আমার মা-বাবা? তারা তো চোখ বন্ধ করে সম্মতি দিয়ে রেখেছেন।”
“তা সত্ত্বেও এভাবে কাউকে কিছু না জানিয়ে? আকাশ, তাশা, নীল ওরাও তো অভিভাবকের অন্তুর, ওদের অন্তত জানানো উচিত ছিল!”
আয়াশ এবার অন্তিহার দিকে তাকায়। অন্তিহা একদম নিস্তব্ধ হয়ে স্থির চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আশা দূর থেকেই আয়াশকে দেখে ইশারায় ‘হাই’ বলে। আয়াশও চোখের ইশারায় তার কুশল শুধে নিয়ে আবার কুহুর দিকে ঘুরে, বেশ নিচু গলায় বিনয়ের সাথে বলল,
“কিন্তু চাচি, আমি যে এত কষ্ট করে হুজুর আঙ্কেলকে নিয়ে এলাম? এত রাতে উনাকে আনতেও তো বেশ বেগ পেতে হয়েছে!”
কুহু কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন,
“আমি হুজুরের সাথে কথা বলছি। কিন্তু আয়াশ, এতটা অধৈর্য হলে চলে? তোমার আর অন্তির কী হলো বলো তো? দুজনেই যেন কেমন খামখেয়ালী হয়ে গেছ! সামান্য ম্যাচিউরিটি নেই তোমাদের মধ্যে। আগে সব কিছু প্রচুর ভেবে চিন্তে করতে। এখন অবুঝের মতো। এসব কী ধরনের পাগলামি? সংসার করতে গিয়েও কি এভাবেই পাগলামি করবে?”
ঠঅন্তিক ঘর থেকে বেরিয়ে কুহুর কাঁধে হাত রেখে তাকে শান্ত করে, তারপর ধীরে গলায় বলল,
“থাক না কুহু, এতে যদি ওর মনের শান্তি হয়! এমন তো নয় যে আয়াশ আমাদের অচেনা কেউ, কিংবা আমরা খুব বড় কোনো ভুল করছি। আপাতত ইজাব-কবুলটা সম্পন্ন হোক না, পরে কোর্ট খুললে আইনি দিক গুলো না হয় সেরে নেওয়া যাবে!”
কুহু তবুও একটু অমত প্রকাশ করে বলে,
“কিন্তু কেউ তো কিছু জানলো না! অহীনের বিয়েতেও কত হাঙ্গামা হলো, আমি কি আমার মেয়ের বিয়েটা অন্তত একটু জাঁকজমক করে উদযাপনের সুযোগ পাব না?”
আয়াশ উৎসুক হয়ে চট করে বলে উঠে,
“চাচি, আমি শুধু ‘কবুল’টুকু বলেই চলে যাব! তারপর আপনারা যেদিন বলবেন, সেদিনই অন্তিকে নিয়ে বড় করে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করব... আমাদের গ্রামের বাড়িতে! পরশু।”
কথাটা শুনে সবাই বেশ অবাক ও বিস্ময় নিয়ে আয়াশের দিকে তাকায়। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আশা অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করে ফেলে,
“গ্রামে? আপনি সত্যিই গ্রামে যাবেন?”
আয়াশ মাথা ওপর-নিচ দুলিয়ে অত্যন্ত নিশ্চিত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, অবশ্যই! অন্তির সাথে যাব।”
আশা কুহুর দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি আব্বুকে কল দিচ্ছি ভিডিও কলে, সবাই থাকব। সব সময় মানুষকে খাইয়ে কী হবে? সেই তো বাম হাতে পাছার সঙ্গে মুখও ধুয়ে ফেলে।”
“ইয়াক! এসব কী কথা বলছ, পুতুল? এসব শুনলে তো একদিনেই ডায়রি… ওয়াক!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই ওয়াক করে গা গুলিয়ে ওঠার শব্দ করে আয়াশ। অন্তিহা এগিয়ে আসে আয়াশের কাছে। আশাকে চোখ-মুখ কুঁচকে শাসায়। তা দেখে ঠোঁট টিপে হেসে ফেলে আশা। অহীন রুম থেকে বের হয়ে এমন হাঁকডাক দেখে বেশ অবাক ও কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এখন সবাই এখানে কেন? আয়াশ, এত রাতে?”
আশা হিসহিস করে বলে,
“অন্তুকে বিয়ে করতে।”
“কীহ্?!”
চেঁচিয়ে ওঠে অহীন। তার গলার আওয়াজে যেন সবাই কেঁপে ওঠে। অন্তিক চোখ রাঙিয়ে বলে,
“নাটক করছ, যেন কিছু জানো না!”
“তাই বলে এখন?”
আয়াশ না চাইতেও এবার খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে,
“যেই সময়টা আপনারা এসব ফ্যামিলি ড্রামা করছেন, ততক্ষণে বিয়েই হয়ে যেত।”
অন্তিক এবার তাড়া দেয়। ফলে আশা এগিয়ে এসে অন্তিহাকে ধরে বসিয়ে দেয়। আয়াশের জন্য একটা পরিষ্কার চেয়ার এনে দিলেও ছেলেটা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ফের সেটা স্যানিটাইজ করে তবেই বসে। অহীন ততক্ষণে ক্যামেরার রেকর্ডিং অন করে নিয়েছে ফোনের। আয়াশ নিচু গলায় অন্তিহাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“এখন আর ‘মিস’ থাকবে না, কেউ ডাকতেও পারবে না মিস বলে। তোমার আগামী সকালটা হবে ‘মিসেস আয়াশ খন্দকার’ পরিচয়ে।”
অন্তিহা নির্বোধের মতো ঝটকায় তাকায় তার দিকে। আয়াশের ওষ্ঠে সূক্ষ্ম হাসি আজকে চাইলেও মেয়েটা কিছু বলতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগেও তো মনে হচ্ছিল সব স্বাভাবিক, তাহলে এখন কেন এত ভয় করছে? এটাই কি তবে একটা মেয়ের ‘কবুল’ বলার ঠিক আগমুহূর্তের গা-হিম হয়ে আসা সেই তীব্র অনুভূতি? ওমনি সবার মাঝে অহীন ঢুকে পড়ে। হুজুরের পাশে বসে বেশ বড় ভাইয়ের মতো হাবভাব নিয়ে বলে,
“দেনমোহর কোটিতে রাখবেন। আমি মধ্যবিত্ত হয়েও কোটিতে বউয়ের দেনমোহর রাখি, আর এ তো পুরো সুগার ড্যাডি, গোল্ড ডিগার!”
আশা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে এগিয়ে আসে,
“ওলে বাবারে! বলে কে দেখো না! দেনমোহরওয়ালা সাহেব, আমারটা শোধ করেছেন?”
অহীন দাঁতে জিব কাটে। চোখ পাকিয়ে মিনমিন করে বলে,
“ওটা পরে! দেনমোহর কোটিতে থাকলে রাজকীয় একটা ভাব আসে, বুঝলি না?”
তাদের কথার মাঝে অন্তিহা প্রায় অনেকটা সময় পর মুখ খোলে। অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলে,
“আর পাঁচটা স্বাভাবিক বিয়ের মতোই করুন। যে রাখার, সে এমনিতেই রাখবে।”
মেয়ের এমন পরিণত কথায় খুশি হলো অন্তিক। এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তার। পাশে বসা হুজুরের প্রতিটা শব্দ অন্তিকের চোখে পানি এনে দিচ্ছে। ক্ষণিকের জন্য মনে হচ্ছে, যেন কেউ তার কলিজাটা কেটে নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে করে। আকাশের অনুভূতিও কি এমন ছিল আশার বিয়ের সময়? না, তা হতে পারে না। কারণ আশা তো তাদের সঙ্গেই আছে। কিন্তু অন্তু? বিয়ের পর কানাডা নয়তো ফ্রান্সে সেটল হতে হবে আয়াশের জন্য আয়াশের কর্মজীবন আর পরিবার তো সব ওখানেই। সে কি তবে ভুল করল রাজি হয়ে? ঠিক এই মুহূর্তে কেন এসব মনে হচ্ছে? হুজুর ততক্ষণে নিজের খাতায় খসখস করে সব লেখা শেষ করলেন। অতঃপর চোখ তুলে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন
“মোছাঃ অন্তিহা শিকদার... মোঃ অন্তিক শিকদারের একমাত্র কন্যা আপনি। আপনাকে তিতাশ খন্দকারের পুত্র আয়াশ খন্দকারের সাথে পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্যে এই বিয়েতে প্রস্তাব করা হচ্ছে। আপনি কি এই প্রস্তাবে রাজি আছেন?”
পুরো ঘরজুড়ে যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। অন্তিহার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের শব্দগুলো আজ বড্ড স্পষ্ট, তীব্র! কিন্তু সেই স্পন্দন ঠিক কী বার্তা দিতে চাইছে, তার ভাষা কি এত সহজে বোঝা যায়? অন্তিহার জলছোঁয়া ঝাপসা চোখ দুটি সামনে বসা আয়াশের ওপর গিয়ে থমকায়। আয়াশের চোখের শান্ত, শীতল দৃষ্টি আজ গভীর মনোযোগ দিয়ে অন্তিহার ওই ভেজা চোখ দুটোকেই পড়ছে। যেন সে বুঝতে চাইছে একজন পরনারীকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার শুরুর এই অনুভূতি একজন পুরুষকে ঠিক কতটা তীব্রভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে!
ঘরের সেই নীরবতা চিরে হুজুরের গম্ভীর কণ্ঠ আবার ভেসে এল,
“মা, সম্মতি থাকলে ‘কবুল’ বলুন।”
অন্তিহা নিরবধি আয়াশের চোখের দিকেই তাকিয়েই রইল। সেদিন সে দেখেছে, কীভাবেআয়াশ পরম ভরসায় ওর হাতটা চেপে ধরেছিল আশার। আস্থা দিয়েছিলো পাশে আছে বলে। তাহলে আজ কেন এই নিঃশব্দ মুহূর্তে সে কেবল নির্লিপ্ত চোখে তাকে পরখ করছে? সে কি পারছে না অন্তিহার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আবার একটিবার বলতে ‘অন্তি, তুমি আমার হয়ে যাও’? তার এই দীর্ঘ নীরবতায় হুজুর আবার শুধালেন,
“বলুন মা, ‘কবুল’?”
অন্তিহার এই হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যাওয়াটা কি ভেতরে ভেতরে আয়াশকে চুরমার করে দিচ্ছে না? একটা সামান্য ‘কবুল’ উচ্চারণ করতে এত দ্বিধা, এত কিসের অপেক্ষা? অন্তিহা কি শেষ মুহূর্তে এসে বলে উঠবে যে সে এই বিয়েতে রাজি নয়? অজানা এক আশঙ্কায় আয়াশের হাত দুটি আজ প্রথমবারের মতো কেঁপে উঠছে একজন নারীর অসম্মতির মুখোমুখি হওয়ার তীব্র ভয় তাকে পেয়ে বসেছে! ঠিক তখনই অন্তিহা ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠার লক্ষ করে সে। একদম নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে অন্তিহা বলে উঠে,
“কবুল।”
“আবার বলুন, মা...”
“কবুল।”
“শেষবার বলুন...”
আয়াশ এবার আর নিজের সমস্ত ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। কিছুটা অধৈর্য ও অস্থির গলায় বলে উঠে,
“আর কতবার বলবেন? দেখতে পাচ্ছেন না মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে? এবার আমার অংশটা শুরু করুন, প্লিজ!”
আয়াশের এমন আকুলতায় অন্তিকের ভেজা চোখে মৃদু একচিলতে হাসি ফুটে। আশা আর অহীনও শব্দ করে হেসে ফেলে। অহীন হাসতে হাসতেই আয়াশকে ক্ষ্যাপানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“কাম অন ইয়ার! এখন তো বউ তোরই হতে যাচ্ছে, এত আনকন্ট্রোলড হলে চলে? বাসর রাতের তাড়া আছে বলেও তো মনে হচ্ছে না, তাহলে এত খ্যাপছিস কেন?”
আয়াশ মারাত্মক বিরক্ত হয়ে অহীনের দিকে তাকাতেই অহীন চট করে ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করে । হুজুর মৃদু হেসে বললেন,
“তিনবার স্পষ্ট করে বলাটাই নিয়ম আর সুন্নাহ, বাবা। সূচনাটা যত সুন্দর হবে, শেষটাও ইনশাআল্লাহ ততটাই বরকতময় হবে।”
আয়াশ আবার অন্তিহার দিকে তাকায়। মেয়েটাকে জীবনে প্রথমবার এভাবে অনুভূতির তোড়ে কাঁপতে দেখছে সে। না, এটা কোনো ভয় বা কষ্টের থরথর কাঁপুনি নয় এটা সম্পূর্ণ এক অনাস্বাদিত, নতুন অনুভূতির কম্পন! অন্তিহা বারবার ঢোক গিলছে, তার শ্বাস ঘন হয়ে আসছে, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু।
অবশেষে নিয়ম মেনে অন্তিহাকে দিয়ে তিনবার ‘কবুল’ বলানো শেষ হলো। এবার হুজুর আয়াশের দিকে ঘুরে একই নিয়মে প্রশ্ন করলেন,
“মোঃ আয়াশ খন্দকার, মোঃ অন্তিক শিকদারের একমাত্র কন্যা মোছাঃ অন্তিহাকে আপনি আপনার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছেন?”
আয়াশ অন্তিহার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে হুজুরের দিকে তাকায়। স্বভাবজাত রুক্ষ গলায় বলল,
“অফকোর্স রাজি আছি! সম্মতি আছে বলেই তো এত মাঝরাতে আপনাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসেছি!”
হুজুর হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“সম্মতি থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ‘কবুল’ বলুন, বাবা।”
আয়াশ আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে বলে উঠে,
“কবুল, কবুল, কবুল! একেবারে সুন্নত মেনে ষোলো আনা কবুল!”
_________
বিজন নির্জন কবরস্থান। চারপাশের ডালপালা ছড়িয়ে থাকা গাছগুলোর ফাঁক গলে লাল বাতির একটা ভৌতিক আলো এসে পড়ছে ভেজা মাটিতে। সদ্য খোঁড়া একটা কবরের সামনে একমনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। তার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে শাহেন। বয়সে নেহাতই তরুণ হলেও, আতঙ্কে ও ভেতরের চাপা রাগে ছেলেটার পুরো শরীর রি-রি করে কাঁপছে।
সাফওয়ান আনমনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে এক বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে থাকে,,
“ড্যাড! আই আম নট সরি! আমি তো বাংলাদেশে আসতেই চাইনি, আপনি কেন আমাকে জোর করে নিয়ে এলেন, বলুন? দেখুন, আপনার ওই একঘেয়ে জেদের জন্য আমার সাজানো গুছানো সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল! আমি এখন কী করব, কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারছি না। ও এমনিতেই আমার ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিল, আপনার কারণে এখন আরও রুড হয়ে গেছে!”
এক মুহূর্তের জন্য থামে সাফওয়ান। ভেতরের উগ্র উত্তেজনায় তার ফর্সা হাতের রগগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠে থরথর করে কাঁপছে। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলে,
“আজকে আমি শুধু আপনার জন্যই কিছুটা সময় বের করেছি। কারণ যা-ই হোক, জন্ম তো অন্তত আপনিই দিয়েছিলেন আমাকে! এই একটা মূল্যবান দিন আমি নিজের 'মিস গম্ভীর'-এর কাছ থেকে চুরি করে আপনার উদ্দেশ্যে খরচ করলাম। আপনি এখন খুশি তো, ড্যাড?”
টলমল করে উঠে সাফওয়ানের সেই পৌরুষদীপ্ত চোখ দুটো। একরাশ হাহাকার ও আক্ষেপ নিয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে থাকে,,
“কী এমন ক্ষতি হতো ড্যাড, যদি দেখার এই তৃষ্ণা ভালোবাসার কিছুটা আমার জন্মের সময় আমাকে দেখাতেন? মম অন্তত আমাকে বড্ড মায়া করত! মম চলে যাওয়ার পর ছোট বোন ইশারাকে ঘিরেই ছিল আমার পুরো জগৎ। কিন্তু ইশু তো বড্ড ছোট, আমার ভেতরের কষ্ট বা যন্ত্রণা বোঝার মতো বয়স তার ছিল না। ও কাঁদলে আমি ওকে কোলে তুলে মুখে চুমু দিতাম, ওর কান্না থেমে যেত... কিন্তু আমার বেলা? আমি যখন কাঁদতাম, ও কেবল ফ্যালফ্যাল করে নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে থাকত! ও তো জানত না, কীভাবে তার এই বড় ভাইটার একাকীত্বের কান্না থামাতে হয়!বতারপর স্কুল লাইফে পা রাখতেই কিছু বিপথগামী বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ড্রাগসের দুনিয়ায় ডুব দিলাম। ভালো লাগত... ভেতরের যন্ত্রণাগুলো তীব্র হলেই বিষাক্ত সেই নেশাটা গায়ে মেখে নীতাম। বার, নাইট পার্টি, রাতভর উন্মাদনা ইশারার ওপর থেকেও ততদিনে খেয়াল সরে এসেছে আমার। এভাবেই চলতে চলতে একদিন নারীসঙ্গের চেনা স্বাদটাও বুঝে গেলাম। জীবনের দীর্ঘ ২৭টা বছর যে কীভাবে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে কেটে গেল, আমি নিজেও তা টের পাইনি, ড্যাড!”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই সাফওয়ান থামে। তার ঠোঁটের কোণে এবার ফুটে এক চিলতে একদম মৃদু, আড়ালে ঢাকা ক্ষণিকের হাসি,
“তারপর... হঠাৎ একদিন ক্যাম্পাসের ঠিক মাঝখানটায় অদ্ভুত এক মেয়েকে দেখলাম! শান্ত, চুপচাপ গম্ভীর মুখে কানে এয়ারফোন গুঁজে বইয়ের পাতায় মগ্ন হয়ে আছে। যেন এই গোটা গ্রহে সে আর তার হাতে থাকা ওই বইটা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো অস্তিত্বের প্রয়োজন নেই! হালকা বাতাসে তার খোলা চুলগুলো উড়ছে, ঠোঁট দুটো হালকা কেঁপে উঠছে পড়ার তালে তালে... উফ! সেই দৃশ্য তো শব্দ দিয়ে বোঝানো অসম্ভব!”
বলতে বলতে নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেয় সাফওয়ান। নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে ভেতরের হিংস্র উন্মাদনায় সংযমের প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করে। তারপর নিচু ভীতিকর গলায় বলল,,
“তারপর থেকে প্রতিদিন, কোথাও না কোথাও আমি তাকে দেখতাম। হাসত খুব কম, সর্বক্ষণ ওই গম্ভীর মুখখানা নিয়ে শুধু বইয়ের পাতাতেই ডুবে থাকত সে। আমার অজস্র গার্লফ্রেন্ড যখন আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করত, ওদের শরীর ছুঁতেই আমার ভেতরটা বিরক্তিতে রি-রি করে উঠত! মনের ভেতর এক অদ্ভুত তাড়না অনুভব করতাম এই শরীর আমি চাই না! আমার তো তৃপ্তি কেবল ওই গম্ভীর মুখখানায়! তাকে পাওয়ার নেশা, তীব্র চাওয়া আর দূর থেকে দেখার অদম্য বাসনায় আমি ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছি। অবশেষে একদিন আমি উপলব্ধি করলি শুধু ওই শরীর বা ঠোঁট নয়, আমার আসলে আস্ত মানুষটাকেই চাই! যেভাবেই হোক, যেকোনো মূল্যে... ওই একটা মানুষকেই আমার চাই! সেই মেয়েটা অন্তিহা আমার মিস গম্ভীর।”
শাহেন ধীরে ধীরে ধীরপায়ে তার কাছাকাছি এগিয়ে আসছে। সাফওয়ান শাহেনের দিকে একবার শীতল চোখে তাকিয়ে, আবার কবরের দিকে মুখ করে বলে
“মমকে মেরে আপনি দেশে ফিরে এসেছিলেন, আর আমি ছিলাম ফ্রান্সে। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হতো, কত শান্তিতে ছিলাম আমি! কিন্তু আপনি আমাকে এই দেশে টেনে আনলেন... আর এনেই আমার অন্তিহার গায়ে হাত তুললেন? এসব আমি কোনোদিন মেনে নিতে পারি, ড্যাড? নো, আই আম নট সরি ফর দিস! আপনি যা পাওনা ছিলেন, সেটাই পেয়েছেন।”
সাফওয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে থাকে
“আমি শাহেনের খেয়াল রাখব। কারণ আমার অন্তিহা এতই সুন্দর যেকোনো ভুবনমোহিনী গোলাপের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়! তাকে দেখলে যেকোনো পুরুষের চোখ আটকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি তো আর পৃথিবীর সবাইকে মেরে শেষ করতে পারব না, তাই শাহেনের কোনো ক্ষতি আমি করব না। কিন্তু আপনি? আপনি ওর গায়ে হাত তুলেছেন! আমার কাছে এটা যেকোনো মহাপাপের চেয়েও বড় অপরাধ। যে অন্তিহা নামটা উচ্চারণ করতে গেলে আমার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে, সেই অন্তিহাকে আঘাত করার দুঃসাহস দেখালেন আপনি?”
শাহেন এসে একদম সাফওয়ানের গা-ঘেঁষে দাঁড়ায়। আতঙ্কে তার শরীর হালকা থরথর করে কাঁপছে। এই তো অল্প কিছুক্ষণ আগে নিজের বাবাকে ঠাণ্ডা মাথায় সাফওয়ানের হাতে খুন হতে দেখেছে সে! বয়সই বা কত ছেলেটার? বড়জোর ১৭ কি ১৮! এই বয়সে এমন এক নৃশংস সত্যের সাক্ষী হওয়া সহজ কথা নয়। শাহেন একদম নিচু ও কাঁপাকাঁপা স্বরে বলে,
“ভাই... রাত অনেক হয়ে গেছে। এবার চলুন এখান থেকে।”
সাফওয়ান শেষবারের মতো বাবার নতুন মাটি দেওয়া কবরের দিকে তাকায়। চোখেমুখে এক বিন্দু অনুশোচনা তো দূর, বরং ভয়ংকর হিংস্রতা ফুটিয়ে তুলে বলে,,
“আপনার এই অহেতুক আর বোকামি মার্কা ভুলের জন্য যদি অন্তিহা আমাকে ভুল বোঝে... আই সোয়্যার ড্যাড, আমি আপনাকে রেহাই দেব না!”
চলবে...