আদিত্যের সামনে ভয় ও লজ্জায় মাথা নিচু করে কাদা মাটিতে বসে আছে ফারিহা খান তিথি। এমন এক অবস্থায় আছে না পারছে দৌড়ে চলে যেতে না পারছে নিজের মুখ টা কোথাও লোকাতে।
কিছুক্ষণ আগে...
অনেকক্ষন ধরে বৃষ্টিতে ভিজে, বৃষ্টি থামার পর মনের আনন্দে তিথি আর স্নেহা কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরছিলো। বাড়ির গেটের ভিতর ঢুকতেই তিথির পায়ের নিচে কাদার স্তরটা বুঝতে না পেরেই পা স্লিপ করে গেলো। পর মুহূর্তেই ধপাস করে সে পড়ে যায় একেবারে ভেজা কাঁদা জলে।
আর ঠিক তখনই সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো আদিত্য। হাতে সিগারেট, গম্ভীর মুখে ফোনে কাউকে কিছু একটা বলছিলো বোধহয়। তিথির পড়ে যাওয়ার ধাক্কায়, কাঁদা জল ছিটকে এসে তাঁর লাইট এ্যাশ কালার এর শার্টটি কাঁদা জলে লেপ্টে যায়।
আদিত্য নিজের বেহাল অবস্থা দেখে রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে।সে আড়চোখে তিথিকে একপলক আপাদমস্তক পরখ করলো।
অতঃপর তিথিকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আকস্মিক কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়, তার নরম তুলতুলে গালে। শক্ত পোক্ত হাতের থাপ্পড় টা এতো টাই জোরে ছিলো যে তিথি তাল সামলাতে না পেরে আবার সেই কাঁদা মাটির পানিতে গিয়ে পড়ে গেলো।
তার পুরো জামা কাপড় এখন কাঁদা মাটিতে পুরো লেপ্টে আছে। সে গালে হাত দিয়ে মুখ গোমড়া করে ফেলে। এই বুঝি তার চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়বে। স্নেহা এটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে আসলো। তারপর তিথি কে দাঁড় করিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে যায়।
আদিত্য তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
" অসভ্য মেয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে শরী'র দেখিয়ে দেখিয়ে আসছে।"
____
তিথি দের বাড়ি " খান মঞ্জিল " একদম প্রাসাদ এর মতো দেখতে , ঠিক শতাব্দীর আমলের বাড়ি গুলোর মতো। প্রাচীন দেয়ালে ঘেরা, চারিদিকে গাছ-গাছালিতে ভরা। বাড়ির ঠিক সামনেই একটা সুন্দর ফুলের বাগান।
তিথির বাবারা তিন ভাই ,এক বোন। বোনকে অনেক আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিথির বড় চাচা মোঃ তুর্য খান ও তার স্ত্রী জুঁই খান। তুর্য খান ও জুঁই খান এর একটি মাএ ছেলে। যে এখন আমেরিকায় জব করে। তিথির মেজো চাচা মোঃ ইকবাল খান ও মেজো চাচি সুফিয়া খান।
তাদের ও একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। এবং সবশেষ তিথির বাবা মোঃ রিপন খান ও তিথির মা বেলা খান। তাদের একটি মেয়ে তিথি আর একটি ছেলে আবরার খান।
ফাবিহা খান স্নেহা আদিত্যর ছোট বোন। সেও তিথির সাথে একই ক্লাসে পড়ে। বলতে গেলে তারা বোন কম বান্ধবী বেশি।
মাহাদি খান আদিত্য - তিথির মেজো চাচার ছেলে। বয়স ২৮ এর পৌঁছেছে বোধহয়, দেখতে ফর্সা, গাল ভর্তি চাপ দাড়ি, চোখের মণি গুলো বিড়ালের চোখের মনির মতো।
দাপদাড়ির গালে হালকা করে ডিম্পল পড়ে। ডান কান ফোঁড়ানো তার মধ্যে সুন্দর করে একটা সোনার এয়ার রিং পড়া।
দেখতে সুন্দর হলেও তার চরিত্র একদম ফুলের মতো পবিত্র নয়। বখাটের মধ্যে চলাফেরা করে, সিগারেট খাই, রাস্তায় রাস্তায় মারপিট করে, কোন টাকা-পয়সা ইনকাম করে না । রাস্তার ছেলে পুলেদের সাথে সারাক্ষণ ঝগড়া মারামারি লেগেই থাকে ।
মাস্টার্স কমপ্লিট করছে সেই বহুবছর আগে কিন্তু এখনো পর্যন্ত একটা জব করে না। সারাদিন বখাটের মতো ঘুরে ফিরে। আর রাতে প্রচুর কার রেসিং করে। মুলত আদিত্যর কার রেসিং একটা বাজে নেশা। পুরো গ্রামে আদিত্য কে সবাই বখাটে মাস্তান বলে ডাকে।
___
তিথি মেয়েটা ভীষণ চঞ্চল দেখতে হলুদ ফর্সা, চুল গুলো কোমড় পর্যন্ত। হালকা বাদামি রঙের, চোখে যেন রাজ্যের মায়া। গোলাপি পাতলা ঠোঁট ।
তিথি ভীষণ ভাবে ভয় পায় তার বখাটে আদিত্যেকে কেননা একটু পান থেকে চুন খসলেই আদিত্য তিথিকে যখন তখন থাপ্পড় মেরে দেয়।
তিথি আদিত্যেকে ভয় পেলেও কোথাও না কোথাও তিথির সপ্ত হৃদয়ে বসবাস করে সেই বখাটে আদিত্যটি।
- - - - - -
ডাইনিং টেবিলে খান মঞ্জিল পরিবারের সবাই জড়ো- সড়ো হয়ে বসে আছে।
যেই না আদিত্য ভিতরে প্রবেশ করেছে তখন আদিত্যের বাবা মোঃ ইকবাল খান বললেন,
-" আদিত্য দাঁড়াও, তুমি আমার তিথি মাকে মেরেছো কেন ?"
সদর দরজার আদিত্যের পা থমকে গেলো। সে তার বাবার দিকে একপলক তাকিয়ে আবার পরিবারের সবার দিকে তাকায়। তখন আবারো ইকবাল খান গর্জে উঠে বললেন,
- " তোমার সাহস কি করে হয় ওকে থাপ্পড় মারার? সারাদিন তো পারো বখাটে গিরি করতে। ভাদ্দাইমার মতো ঘুরে বেড়াও আর রাস্তায় যাকে পাও তাকে ধরে মারো।
কোন জন্মের পাপের ফল তুমি আদিত্য আমি জানি না।
তোমাকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। বাড়ির মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছি আদিত্য?"
কে শুনে কার কথা!উনার কথায় আদিত্য এইবার মহা বিরক্ত বোধ হয়ে বললো,
" আমি কাকে মেরেছি কী মারি নি সেটার কইফিয়ত আমি কাউকে দিবো না আব্বু।
আমি সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয়। "
কথাটি বলেই সে গট গট করে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে যাই।
পরিবারের সবাই এতক্ষন বাপ-ছেলেকে দেখছে কেননা এই দুই বাপ- ছেলে দু'জনেই ভীষণ পরিমাণ এর রাগী ও জেদী। যেমন বাপ তার তেমন ছেলে। কেউ কারো থেকে কম না।
-
-
-
রাতে অনেক্ষণ ডাকাডাকির পরেও আদিত্য নিচে আসে নি খেতে। তাই আদিত্যের মা সুফিয়া খান নিজের স্বামীকে বলছে,
- " হলো তো এইবার? ছেলেটা সকাল থেকে কিছু না খেয়ে আছে। আপনার শান্তি মিললো তো? এইভাবে না বলতেও পারতেন।"
ইকবাল খান তখন একটু ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলতে থাকে,
" সে যেমন কাজ করেছে তার তেমন ব্যবহার পেয়েছে। একদিন না খেলে কিছু হবে না। খিদে পেলে নিজেই খেয়ে নিবে।"
তখন তিথির মা বেলা খান _
সুফিয়া খান এর কথায় সম্মতি জানায়,
" হ্যাঁ ভাইজান, আজকে ছেলেটাকে এইভাবে না বললেও পারতেন। আর আমাদের আদিত্য কাউকে বিনা দোষে মারে না। হয়তো তিথির কোন দোষ ছিলো"
পাশে তিথি ছিলো তাই তিনি এই কথাটা ওর দিকে চোখ রাঙিয়েই বলে।
তখনই কথার ফোড়ন কেটে স্নেহা তার ছোটমা কে বললো,
"ছোট মা, মোটেও তিথির দোষ ছিলো না। ও কী দেখেশুনে কাঁদা পানিতে পা দিছিলো নাকী? আদিত্য ভাইয়া শুধু শুধু রেগে তিথিকে চড় টা মারলো। এখানে তিথির কোন দোষ নেই।"
তখন বেলা খান মুখের ভেংচি কেটে সুর টেনে শুধায়,
" হয়ে....ছে, আর নিজের বোনের নামের গুণগান গাইতে হবে না তোকে। "
তিনি এইবার তিথি কে ডেকে উঠলো,
"তিথি এইদিকে আয়। "
তিথি সামনে আসতেই তার হাতে খাবারের প্লেট ধরিয়ে দিয়ে বলে,
– খাবারটা যেভাবে হোক আদিত্যেকে খাইয়ে আসবি। নয়লে আজকে কিন্তু
তোর খাওয়া বন্ধ। তোর জন্য ছেলেটা এখনো পর্যন্ত কিছুই না খেয়ে আছে। যা তাড়াতাড়ি আদিত্যের রুমে খাবার টা দিয়ে আয়।
তখন তিথি মুখ ফুলিয়ে বলে,
" আম্মু আমি কেন? স্নেহা কে বলো না দিয়ে আসতে। বাঘের ডেরায় পাঠাচ্ছো কেন আমাকে। এখানে আমার কী দোষ? "
"সব তোরই দোষ বিয়াদপ মেয়ে, যা তাড়াতাড়ি খাবার দিয়ে আয়। "
পাশ থেকে তখন সুফিয়া খান নরম কন্ঠে বললো,
" আহ্ কি করছিস কি ছোট। মেয়েটাকে আবার ওর কাছে পাঠাচ্ছি'স কেন? স্নেহাকে দিয়ে পাঠিয়ে দে।"
" না ভাবী, তিথি নিয়ে যাবে। "
এবং আদেশের সুরে বেলা খান তিথি কে চোখ রাঙিয়ে বলেন,
" তিথি নিয়ে যা খাবারটা আদিত্যর রুমে।"
তিথি আর কোন উপায় না পেয়ে, শেষ মেষ খাবার টা তাকে উপরে নিয়ে যেতে হচ্ছে। সে ভয়ে ভয়ে দু'কদম এগিয়ে আদিত্যের রুমে উঁকি দিলো। দেখলো উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে আদিত্য। তাই দরজা টা হালকা ঠেলে গলা খাঁকরি দিয়ে রুমের দরজা কাছে দাঁড়িয়ে বলে,
- " আসবো?"
রুমের ভিতর থেকে একটা গম্ভীর ডিপ গলায় ঘুম ঘুম কন্ঠে আদিত্য বলে
" কী চাই? "
তিথি জবাব দেয়,
- "আম্মু আপনার জন্য খাবার পাঠিয়েছে।"
আদিত্য ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দেয়-
"খাবো না,নিয়ে যা।"
তিথি ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকলো এবং টেবিলের উপর খাবার রেখে এক পলক আদিত্যের দিকে তাকালো,
" খেয়ে নিন। আপনি না খেলে আম্মু বলছে আজকে আমাকেও খেতে দিবে না। আমার জন্য নাকী আপনি খাবার খাচ্ছেন না।"
সঙ্গে সঙ্গে আদিত্য ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেলে এবং চোখ কচলাতে কচলাতে শুয়া থেকে উঠে বিছানায় খেলান দিয়ে বসে বলে,
" আমি কী কাউকে বলছি? তোর জন্য আমি খাবার খাচ্ছি না?"
তিথি নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দেয়,
" আমি এতো কিছু জানি না। আপনি খাবারটা খেয়ে নিন। সকাল থেকে নাকি আপনি খাবার খান নি। প্লিজ খাবার টা খেয়ে নিন।না হলে আম্মু আমাকে প্রচুর বকবে। "
আদিত্য আর কিছু না বলে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। এবং বিছানায় বসে হাতে প্লেটটা তুলে খাবার মাখতে থাকে , এক লোকমা মেখে তিথির মুখের সামনে তুলে ধরে বলে,
"হা কর।"
তিথি ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে আদিত্যর দিকে। তখন আদিত্য আবার বলে,
-" তাকিয়ে না থেকে হা কর।"
তিথি মুখটা একটু হা করতেই আদিত্য মুখে খাবার তুলে দেয় এবং নিজেও এক লোকমা খায়। এইভাবে খেতে খেতে হঠাৎ করে তিথি জিজ্ঞাসা করে
" আপনি তখন আমাকে মারলেন কেন? আমি ইচ্ছে করে কিন্তু কিছু করি নি। ভুলবশত হয়ে গেছে।"
আদিত্য জবাবে বললো,
- " আমি কেন মেরেছি এটা তোকে আমি কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নয়। "
এইভাবে করে শেষ লোকমার ভাতটুকু তিথির মুখে পুরে দেয় আদিত্য। এরপর হাত ধুয়ে এসে তিথির উদ্দেশ্য বলতে থাকে
" যা প্লেট'টা নিচে গিয়ে দিয়ে আয়। শোন,আর কখনো কলেজ থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি আসলে ভিজে ভিজে আসবি না। মনে থাকবে?"
তিথি বাধ্য মেয়ের মতো শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায় এবং প্লেট নিয়ে নিচে চলে যায়।
**
স্নেহা ,তিথি রেডি হচ্ছে কলেজ এ যাওয়ার জন্য। তারা দুজনেই ( চুয়েট স্কুল এন্ড কলেজ) এ পড়ে। তারা একসাথে বাপ - চাচাদের সাথে বসে সকালের নাস্তা খাচ্ছে।
তিথির ভাই আবরার কে বেলা খান খাইয়ে দিচ্ছে। সকালে খাবার টেবিলে সবাই থাকলেও কখনো আদিত্য থাকে না।
সে সাতসকালে বেড়িয়েছে তার ওই বখাটে গিরি করতে, এই আর নতুন নয় ।
তিথি স্নেহা কে তাড়া দিয়ে বলে উঠে ,
– " স্নেহা চল তাড়াতাড়ি লেট হয়ে যাচ্ছে ।"
এরপর দুজনেই বেরিয়ে যাই। তারা কখনো নিজেদের গাড়ি ইউজ করে না। সবসময় ট্যাক্সি বা বাস এ যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
রাস্তায় কিছুদূর যেতেই তিথি দেখতে পায় আদিত্যেকে। পড়নে আকাশী রঙের শার্ট,কালো প্যান্ট, চুল গুলো অগোচালো আর সবচেয়ে তিথির ভালো লাগে বিড়ালের মতো ভাসা ভাসা চোখ গুলো।
আদিত্য তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে বসে আড্ডা ও নিকোটিন এর ধোঁয়া উড়াচ্ছে।ওরা সবাই মিলে কিছু একটা বলছে আর গা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।
তিথিরা আরেকটু এগুতেই ওদের হাসি বন্ধ হয়ে যাই। রাস্তা পার করতে করতে তিথি ঘাড় ঘুরিয়ে আদিত্যের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে,
" উনি এমন নাহলেও তো পারতো।কিন্তু এমন কেনো উনি?পুরোই বখাটেদের মতো।"
রাস্তা পার হয়ে সে আবারো পিছনে ফিরে একবার তাকায় এবং দেখলো,
আদিত্য বাইকে হেলান দিয়ে তাদের যাওয়ার দিকে উদাসীন ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে গেলো তাদের। তিথি তাকানো'তেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় আদিত্য ।
চলবে....
📌তিথি আর আদিত্য কে নিয়ে পড়ুন ইবুক "চেরিফ্লেম"
👇
https://link.boitoi.com.bd/flwaB