ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণবীনা

১ম পর্ব

লেখক: লামিয়া ইসলাম স্বর্ণালী

গল্পঃ #প্রণবীনা

কলমেঃ #লামিয়া_ইসলাম_স্বর্ণালী

পর্ব সংখ্যাঃ ১

ডিসেম্বরের প্রায় শেষের দিকে। কনকনে শীতে শরীরটা যেন কেঁপে ওঠে। রাতটা সে বিশাল বড় মনে হয়, শেষই হয় না। তবে শেষ না হতে চাওয়ার ইচ্ছেটাও বেশি। চোখ খোলার জন্য কত যে নিজেকে বোঝাতে হয়, খোদা মালুম। সময়টা যাচ্ছে আমার ছুটির। মাত্র সেমিস্টার পরীক্ষার ছুটি পেলাম। আহ সুখ। তবে দুঃখও আছে বটে কিছুটা। এই যেমন, বাবা বাড়ি থেকে বের হতে দেয় না। যদিও অভ্যেস হয়ে গিয়েছে আমার। বাড়ির সবার ছোট আমি, তেমন সুন্দরী নই, তবে অত খারাপ দেখতেও বলা চলে না। স্কুল জীবন থেকে বড় ভাইদের নজর আর করা শাসনে বড় হয়েছি। বোরকা পরে থাকিনি, তবে উশৃঙ্খলও ছিলাম না। আমার তো নানুবাড়িতেও যাওয়ার অনুমতি নেই।

সেই ক্লাস নাইনে ছিলাম, আমার সিনিয়র এক ভাইয়া ফুল দিয়ে বলেছিলেন ভালোবাসে আমাকে। আর সে কি অনুভূতি! প্রথম প্রেম নিবেদন। কিন্তু প্রেম আর হলো কই? আমার বড় চাচার মেঝো ছেলে নাম আবিদ, বখাটে ধরনের, সারাদিন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। ওই সিনিয়র ভাইয়াকে ধরে যে কি মার দিলো! আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা। উফ, অতীত নিয়ে স্বপ্নটাও দেখতে দেবে না এই নানুর মেয়েটি শীতের সকালে ডাকাডাকি শুরু করে দিলো,

"সৌরভী, ওঠ তোর মামি কল দিয়েছে, নানুবাড়ি যাবি না?"

শরীর ঝাড়া দিয়ে ঘুমটাকে টাটা বাই করে দিতে হলো এই সকাল সকাল, বিছানার কোণে বসে একটু ঘ্যান ঘ্যান করেই বললাম আম্মুকে আমি,

"কি হবে গিয়ে? সেই তো সন্ধ্যার আগেই টেনে টুনে নিয়ে আসবে আমাকে। তুমি না আনলে বড় ভাইয়া আনতে চলে যাবে। তার চেয়ে বরং আমি ঘুমাই।"

"তাছুর খালাতো বোনের বিয়ে, তোর মামি আমাকে সকাল থেকে কল দিচ্ছে তোকে নিবে বলে। তাছনুবা নাকি জেদ ধরেছে তোর জন্য।"

"আব্বু কি যেতে দেবে? আর ভাইয়ারা?"

"সবাইকে অনেক বলে বুঝিয়ে রাজি করালাম আমি।"

"কত দিনের জন্য?"

"২ দিন এক রাত।"

"কখন যাবো?"

"রাতে হলুদের অনুষ্ঠান আছে, তাই এখনই যেতে বলল তোর মামি।"

প্রফুল্লচিত্তে হাসলাম আমি, মা আমার বেস্ট। আজকে তো আম্মুকে ধরে কষে একটা চুমু দিতে ইচ্ছে করছে খুব। আম্মু এতটুকুই বলে চলে গেলেন কক্ষ ছেড়ে। আমি চোখের ঘুম সরালাম জোরপূর্বক। জীবনের প্রথম আমাকে স্বাধীনতা দিচ্ছে বাবা ভাইয়ারা। আমি সুযোগ ছাড়বো না, যেতেই হবে। তারাতাড়ি করে নেমে গেলাম। সাজতে পারবো না জানি আমি, কারণ সাজলেই বাড়ির সবাই জেঁকে ধরবে, যেতে দেবে বলে মনে হয় না।

একটা শপিং ব্যাগে করে ২ দিনের জন্য ৩ সেট জামা নিয়ে নিলাম। হলুদের জন্য আকাশি রঙের একটা শাড়ি। আমরা আবার গরীব, এক জোড়া জুতাতেই সব অনুষ্ঠান পার করতে হয়। সিক্রেট বলি, আবার বেশি জিনিস নেয়াটা অলস লাগছে খুব। কখনো কোথাও যাইনি আমি, খুব এক্সাইটেড। প্যাকিং শেষ হলো, আমিও রেডি হলাম। এর মধ্যে রুমের বাইরে থেকে ধমক আর চেচামেচির শব্দ আসছে। বুঝতে বাকি নেই কে এসেছে। দৌড়ে গেলাম। সেই আদিব ভাই,

"চাচি, একা একা এলাকার বাইরে দিবেন ঠিক আছে, তাই বলে রাতে থাকতে হবে? ছোট মানুষ, আমাদের বুড়ি।"

আম্মুকে দেখলাম বুঝিয়ে বলল,

"মেয়েটা সব সময় বাড়িতে থাকে, কলেজ থেকে বাসা, বাসা থেকে কলেজ। একটু বেড়াতে যাওয়ার প্রয়োজন আদিব।"

বুঝলো আদিব ভাইয়া। না না, সে ঝগড়া করছে না। তার কণ্ঠই এমন, সুন্দর কথা বললেও মনে হয় মেরে দেবে গুলি করে। আমাকে দেখে ধমক দিলেন,

"সৌরভী, যাচ্ছিস যা, তবে ভালো করে থাকবি, তারাতাড়ি আসবি, পরশু বড় আপা আসবে, তার আগে বাসায় চাই তোকে।"

মাথা দুলিয়ে কাছে গিয়ে বললাম,

"আমি ভালো করেই থাকবো ভাইয়া।"

আব্বু ছিলেন সামনেই, একটু কঠিন করে বললেন,

"হুম, মামার ফোন থেকে কল দিও।"

মাথা দুলিয়ে চলে গেলাম নিজের কক্ষে। ছোট ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে আসলাম। আমার ভাই সৌরভ আমার থেকে ৪ বছরের বড়, সে দিয়ে আসবে আমাকে। বাসা থেকে বেরিয়ে একটা রিকশা করে নিলাম আমরা। সৌরভ ভাইয়া পুরোটা রাস্তা আমাকে বলল, সাবধানে থাকতে, সমস্যা হলেই যেন কল দিই। নানুবাড়ির সামনে এসে থামে রিকশাটা। ভাইয়ার কাজের জন্য আর ভেতরে গেল না। আমি গেলাম। নানুবাড়ির সমতল রাস্তা, অনেক দিন পর আসা হলো। এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সোজা তাছুদের ঘরে ঢুকলাম আমি। হাতের ব্যাগটা রেখে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তাছু তখন তৈরি হচ্ছিল। সাজসজ্জায় ত্রুটি নেই তার। মামা রেডি, মামানি রেডি। আমি উঠে একবার সবার সাথে দেখা করে নিলাম। আমার তিন মামা, যার সাথে যাচ্ছি সে মেঝো। আর নানু-নানা নেই। তবুও মামা-মামি আমার আম্মু-আব্বুকে এখনো দেখি নতুন আত্মীয়ের মতো সমাদর করেন। এসে দেখলাম সবাই রেডি।

সেদিনটা আমার জন্য অনেক সুন্দর মনে হচ্ছিল। তবে জানতাম না, এই দিনটা আমার জীবনের রং পাল্টে প্রণবীনার সুর তুলবে।

একটা সিএনজি করে সবাই রওনা হলাম মামানির বোনের মেয়ের বিয়ের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে থাকার সময়ের বর্ণনা যদি দিই, গ্রামের রাস্তা আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বিশাল জমিতে কি সুন্দর ফসল করা। আমার কাছে নতুন নয়, তবুও শীতল এক অনুভূতি আমাকে টানছে খুব। তাছু আমার পাশেই বসে ছিল, কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল,

"খুব সুন্দর তাই না? ওনাদের বাসাটা আরো সুন্দর। গ্রাম হলেও শহরের মলিন ছোঁয়া সুর, তুই ফিদা হয়ে যাবি।"

হাসলাম আমি কিঞ্চিৎ করে। ওর সাথে দুষ্টু স্বরে বললাম,

"তাহলে তো না যাওয়াই উত্তম, পাগল হলে বিয়ে হবে না আমার।"

"কেন কেন? তোর আদিব ভাইয়া আছে তো, সারাদিন তোকে সামলাতে!"

"ছিঃ তাছু, আমরা নিজেদের ভাইদেরকে আপনই ভাবি। যেমন সৌরভ ভাইয়া, বাকিরাও তেমন। এগুলো আর বলবি না, শয়তান মেয়ে।"

কথার সমাপ্তি হলো, সিএনজি এসে থামে একটি বাড়ির সামনে। নেমে আমরা মামা-মামির পেছনে যাই। ভেতরের দিকে যত যাচ্ছি, পরিবেশ পাল্টাচ্ছে। বিয়েবাড়ির ঝাঁকঝমক পরিবেশ। লাইটিং করা হচ্ছে। বাড়িতে যেতেই সবাই আমাদের সাথে কথা বলে নেয়। সবার সাথে মিষ্টি হলেও আমাকে চিনলো না কেউ। মামানির বোন এগিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

"আয়েশা! এটা কে?"

মামানি নির্বিকার হয়ে উত্তর করলেন,

"আমার ননদের ছোট মেয়ে।"

মহিলাটি আমার সাথে কথা বললেন অনেক। কথায় বুঝতে পারলাম, বেশ বুদ্ধিমতী তিনি। উনি আমাদের নিয়ে একটা কক্ষ দিয়ে বললেন, আরাম করতে। শান্ত হয়ে বসলাম। মামা-মামি দুজনেই বাইরে কথায় ব্যস্ত। তাছু আর আমি রুমে। নিছানায় অনেক সময় বসে ছিলাম। তাছু ওয়াশরুমে চলে যায়। বিছানায় পিঠ ঢেকিয়ে শুয়ে পড়লাম আমি। ক্লান্ত লাগছে খুব। তাছু ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। আমাকে নিয়ে বাইরে আসে। এসে তো আমরা অবাক, মামা-মামি নেই? মামানির বোনকে দেখলাম, একটি মহিলার সাথে অনেক তর্ক করছে। বুঝলাম মহিলা চালাক, বুদ্ধিমান, সাথে একটু ঝগড়ুটে। ওনার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম মামানির কথা। বললেন, অনুষ্ঠান নাকি অন্য বাড়িতে হবে। এখানে লাইটিং করেছে কারণ এটাই ছেলের বাড়ি। মেয়েটির কাজিনের সাথে বিয়ে। একজন ছেলেকে ডেকে দিলেন তিনি আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য।

তাছু আর আমি ছেলেটির পিছু নিলাম। তাছু ছেলেটিকে মামা বলছে। সম্পর্কে তাহলে এটা মামা, এটাই বুঝলাম। একদম হেঙ্গলা পাতলা ছেলেটা। আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। গ্রামে বিশাল জমিগুলো পার হলাম পায়ে হেঁটে আমরা। বিছিয়ে পড়ে থাকা সবজিগুলো কত সুন্দর লাগছিল, বলার মতো নয়। গ্রামের স্নিগ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে শান্তি লাগছে।

চলে এলাম আমরা গন্তব্যে। এখানে এসে প্রপার বিয়েবাড়ি মনে হচ্ছে। বিশাল বড় মাটির উঠোনে প্যান্ডেল করা হচ্ছে। তার পাশেই কাটাকুটি করা হচ্ছে, মশলা রেডি করা হচ্ছে। তাছু আমি হাত ধরাধরি করে ওই দিকে গেলাম, প্যান্ডেলের মাঝ দিয়েই। দেখলাম ওখানে একটি ছেলে খুব চেঁচামেচি করছে,

"এই মামা, ফুল ওই দিকে কেন দিচ্ছেন? ডান পাশে গাঁদা ফুল দিবেন, আপনারা গোলাপ দিচ্ছেন? গোলাপ হবে মাঝে।"

তাছুর দিকে তাকাতেই তাছু বলল,

"এটা হচ্ছে যার বিয়ে, তার বড় ভাই, এমনি ভালো, তবে বদমেজাজি।"

আমি আবার তাকালাম, ঘামে ভিজে আছে, গায়ে পরে থাকা কালো গেঞ্জিটা। গিয়ে বসলাম মামানির পাশে। সাথে সাথে আপ্যায়ন শুরু হলো আমাদের। শরবত ও বিভিন্ন ফল দেয়া হলো সামনে। চোখটা কেন জানি বারবার সেই প্যান্ডেলের দিকেই যাচ্ছে আমার। শরবতটা একটু খেয়ে রেখে দিলাম। ওয়াশরুমে যাবো আমি। তাছুকে নিয়ে উঠে চলে গেলাম। অনেকটা সময় পর এসে দেখি, চেয়ারটাতে সেই ছেলেটা। হাতে আমারই আধখাওয়া শরবতের গ্লাসে শেষ চুমুক দিলো। চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ালাম মামানির পাশে। মামানির সাথে ছেলেটি কথা বলছিল হেসে হেসে। বেশ দারুণ হাসিটা। হঠাৎ দূর থেকে সেই মহিলার চেঁচানোর শব্দ কানে আসে,

"অর্ণব, তোর কি কাণ্ডজ্ঞান নেই? তোর বোনকে নিয়ে যাবি পার্লারে, দেরি হচ্ছে, এখনো বসে আছিস?"

ধমক খেয়ে তাকায় সে আমার দিকে। আমি মিটমিট করে হাসছি একটু। তখন জানলাম, ছেলেটির নাম অর্ণব। মায়ের ধমক খেয়ে স্থান ত্যাগ করে অর্ণব। মহিলাটি এগিয়ে এসে তাছুকে ধমক দিয়ে বলেন,

"তাছনু, তোরা যাবি না পার্লার?"

তাছু আমার দিকে তাকায়, আমি নরম স্বরে বলি,

"না রে, সিম্পল সাজ সুন্দর, আমি যাবো না।"

মামানি বা তাছু জোর করলো না আমাকে। তাছু চলে যায় অর্ণবের পেছনে। দূরে যেতেই দেখলাম, দু’জনের কি হাসি! কেন জানি না, ভালো লাগলো না এটা। মামানির পাশে গিয়ে আবার বসে পড়লাম।

সারাটা দিন আমার এমনই বড়দের সাথে কাটলো। আসর নেমেছে, মেহমান বাড়ছে। দেখলাম তাছু চলে এসেছে। মেয়েটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো আমার কাছে,

"সুর, তুই শাড়ি আনিসনি? পড়লি না কেন?"

মনটা ছোট করলাম আমি, ঠোঁট উল্টে বললাম,

"জানিস তো, শাড়ি পড়তে পারি না।"

তাছু আমার হাত ধরে বলল,

"চল, আমি পরিয়ে দেবো।"

আমার হাত ধরে হাঁটছে তাছু। মামানির কাছে গিয়ে জানতে পারি, আমার কাপড়ের ব্যাগ ওই বাড়িতেই রয়ে গিয়েছে। ভাগ্যক্রমে মামানির বোনও যাচ্ছিলেন। ওনার সাথেই আমরা গেলাম। আগের মতোই জমির রাস্তা, এখন এর দৃশ্যটা আলাদা। এখন সন্ধ্যা নামছে আকাশে। উনি যেতে যেতে প্রশ্ন করলেন আমাকে অনেক, যেমন কি করি, কোথায় থাকি, বাসায় কে কে আছে, ভাই-বোন কতজন এগুলো। বলতে বলতে চলে এলাম বাড়ির সামনে। ওনার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছি আমি। দরজায় হালকা ঠকঠক শব্দ করে ডাকলেন,

"অর্ণব, দরজা খোল।"

বেশ কয়েকবার ডাকার পর দরজাটা খুলে যায়। যা দেখলাম আমি, প্রস্তুত ছিলাম না এর জন্য। চোখজোড়া নামিয়ে চিৎকার দিয়ে পেছন ফিরলাম আমি। তাছু পাশে থাকায় দেখেনি কিছু। মায়ের সামনে এত বড় দামড়া ছেলে এমন করে শার্ট-প্যান্টে আসে? মহিলাটির এতে কিছুই যায় আসে না। ভেতরে চলে গেলেন। তাছু আগাতে নিলে তাকিয়ে দেখি ছেলেটি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু রুষ্ট নাটকীয় স্বরে বলল,

"মিস, আপনারা পরে আসুন।"

আমার কেন জানি রাগ হলো। বললাম,

"তারাতাড়ি করুন প্লিজ, এখানে দুটো রুম, আমাদের জন্য একটা ছেড়ে দিন।"

পেছন থেকে তার বন্ধুরা ডাকছে, বুঝলাম ভেতরে ছেলে আছে আরো। সে দরজার আড়াল থেকে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো,

"মিস, জানেন না? এটা এখন আমাদের পার্সোনাল পার্লার। মেয়েদের পার্লারে যেমন ছেলে ঢোকা নিষেধ, তেমন এখানেও আপাতত ৩০ মিনিট মেয়ে ঢোকা নিষেধ।"

"এত কিছু জানেন, এটা নিশ্চয়ই জানেন যে, লেডিস পার্লারে মেয়েরা এমন করে কাউকে সিডিউস করে না?!"

"মিস, সিডিউস হচ্ছেন?"

কথা আসলো গলায় তবুও আর কে গেলো। বললাম না আমি। সে দরজা লক করে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে বন্ধুরা মিলে বের হয়ে আসে। আসার সময় অর্ণব অনেকটা গা ঘেঁসে গেলো আমার তবে ছুঁতে পারলো না। ভেতরে আমরা সেই আগের রুমটাতে গেলাম। আমার ব্যাগটা বিছানার একটা কোনায় তুলে রাখা। তাছু কাপড়গুলো বের কর ব্লাউজ, পেটিকোট দিয়ে বলল,

"সুর তুই গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে আয় বোন।"

তাছুর মুখে একটু বিরক্তি, হওয়ার কথায় তার কাজিনের বিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হবে আর আমি ওকে আটকে রেখেছি। কিছু সময় নিয়ে বেরিয়ে আসলাম আমি ওয়াশরুম থেকে। দেখলাম সে কাপড় ও মেকআপ নিয়ে বসে আছে। এগিয়ে যেতেই একগাদা মেকআপের প্রলেপ আমার মুখে দিতে উদ্বিগ্ন হয়। তবে এত সাজগোজ কখনোই করতে দেওয়া হয়নি আমাকে। আর আমার অভ্যেসও নেই। তাই তার কথা মানলাম না। সাজলাম নিজের মতো করেই— একটু ফেস পাউডারের ওপর হালকা রঙের আইশ্যাডো। লিপস্টিকটা ছিলো বেবি পিঙ্ক। তাছুকে বললাম এবার শাড়িটা পরিয়ে দিতে। তাছু এসে শাড়ি দুটো পেচ দিতেই দরজায় কেউ নক করে তাছু জিজ্ঞেস করে,

"কে?"

পরিচিত কিন্তু অপরিচিত একটা কণ্ঠ, কিছু সময় আগেও তর্ক করলাম সেই ছেলেটা,

"তাছনু দরজা খোলো, আমার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ রয়ে গিয়েছে।"

ইসস! মাত্রই তো শাড়িটা গায়ে জড়ালাম। আঁচল বিছানার এক কোনায়, আমি রুমের এক কোনায়। তাছু চেঁচিয়ে বলে,

"একটু পর নিলে হয় না?"

"না, এখন লাগবে আপু, খোলো দরজাটা।"

মেয়েটি আমাকে শাড়ির খোলা আঁচল দিয়ে পেঁচিয়ে দিলো। এ যেন মিশরের মমি বানাচ্ছে। ভেবলার মতো চেয়ে রইলাম বুকের দিকটায় হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি আমি। সে রুমে প্রবেশ করলো। আমাদের চোখাচোখি হয় আবার। সেদিন তার ঠোঁটে একটু হাসি দেখেছিলাম আমি। বুঝেছিলাম, হাসিটা আমাকে এমন বিব্রত দেখেই। জানি না কী এমন প্রয়োজন ছিলো তার। গায়ে পারফিউম মেখে বেড়িয়ে যায়। তাছু দরজা লক করে আবার আমার কাছে আসে। শাড়ির কুঁচি তুলছিলাম দু'জন, দরজার বাইরে আবারও পরিচিত স্বর,

"তাছনু আপু, একটু দরজাটা খুলবে? আর একটা জিনিস মনে পড়েছে। ওটা বেশ ইম্পর্টেন্ট।"

তাছু ‘চ’ করে আঁচল দেয় আমার বুকে দরজা খুলে দেয়। ঠোঁটজোড়া গোল করে শিস বাজাতে বাজাতে প্রবেশ করে হাতে কয়েকটা কাঠগোলাপ। অর্ণবের দিকে আর চোখ গেলো না, ফুলগুলো দারুণ ছিলো। সে এসে মানিব্যাগ তুলে পকেটে নেয়। একটা ঘড়ি হাতে দেয়। আয়নায় আমার দিকে তাকাচ্ছে বারবার। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি আমি একটি কোনায়। সে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায় আবার। তাছু আমাকে আমার শাড়ি পরাতে থাকে। দরজায় আবারও খটখট শব্দ হয়, আমার হাসি পেলো খুব। তাছু ধমক দিয়ে কান্নারত স্বরে,

"ভাইয়া আবার কী?"

অর্ণব গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়, সামান্য হাসি লেপ্টে আছে ওই ঠোঁটে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, এক গালে টোল। থুতনির নিচেও টোল। হাসিটা সুন্দর লাগলো আমার। সে হাতের কাঠগোলাপগুলো দরজার সাথেই সোফায় রেখে বলল,

"তাছনু, অরিণের জন্য ফুলগুলো নিয়ে ছিলাম। তবে বেশি হয়েছে। ওনার তো শাড়ির সাথে ভালো লাগবে, পরিয়ে দিও।"

বলেই দরজা বন্ধ করে দেয় আবার। তাছনু সত্যি ফুলগুলো আমার কানে গুঁজে দিলো। আমার চুলগুলো অত লম্বা নয়, এই তো কোমর পর্যন্ত খোলা চুল। আকাশি রঙের শাড়ি। রেডি হয়ে বের হতে হতে অনেক সময় হলো। সন্ধ্যা হয়ে এলো। এই বাড়িটা প্রায় ফাঁকা, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন মামাটা। ওনার সাথেই গেলাম বিয়েবাড়িতে।

__

ঝাঁকঝমক পরিবেশ, রাত হওয়াতে আরও সুন্দর লাগছে। স্টেজে বসে আছে বউ, ফটোশুট করছে। আমি গিয়ে গিয়ে একদম সামনে বসলাম তাছুর সাথে। পাশে দুই-তিনটে ছেলে। মামা, তার দুই বন্ধু। স্টেজে গান আপাতত কোনো কারণে বন্ধ। তাছু বাকিরা কথা বলছে, আমি কাউকেই তেমন চিনি না। আর না, প্রথম দেখায় বেশি কথা বলতে পারি না, তাই চুপ করে ছিলাম। কথায় কথায় তাছুর মামা আমাকে জিজ্ঞেস করে,

"সৌরভী, রিলেশন করো?"

চোখের পলক পরপর কয়েকবার ঝাপটে উত্তর দেওয়ার আগেই বলল তাছু,

"মামা তুমি কী যে বলো! সুর প্রেম করবে? ওর ডিপজলের মতো ৬-৭ টা ভাই, রীনা খানের মতো ৪-৫ টা বোন। এদের জন্য কখনো আমাদের বাসায় আসতে পারে না। তুমি জানলে অবাক হবে, ওর বাসার বাইরে এটা প্রথম রাত ফুপুকে ছাড়া।"

পাশের ছেলেটি বলল,

"রায়ান, মেয়েটা চুপচাপ দেখে বুঝিস না, ইন্ট্রোভার্ট। কথাই বলতে পারে না, প্রেম?"

আমি তখন বললাম আস্তে করে,

"না, তেমন নয়। আমি প্রথমেই সবার সাথে মিশতে পারি না। কখনো এত লোকের ভিড়ে যাইনি তো তাই।"

"কথা বাদ, রায়ান চল একটা গান বল।"

রায়ান মামার দিকে চোখ যায় আমার, মানুষটা সারাদিন আমাদের পেছনে অনেক ঘুরেছে, ভালো লেগেছিলো। বয়সও আমাদের মতোই হবে, বড়জোর ২-৩ বছর বড় হবে। তিনি খুবই সুন্দর একটা গানে সুর তুললেন,

Tu aati hai seene mein

Jab jab saansein bharta hoon

Tere dil ki galiyon se

Main har roz guzarta hoon

Hawa ke jaise chalti hai tu

Main ret jaise udta hoon

Kaun tujhe yoon pyar karega

Jaise main karta hoon

আমি চেয়ে রইলাম, সে কী সুর ছিলো! ওনার ব্যবহারের মতো কণ্ঠ মোলায়েম, সুন্দর। সবাই হাততালি দিলাম, ওনার গানের প্রশংসা করলাম। বসেই ছিলাম চুপ করে, কোথা থেকে হুট করে একটা বাতাসের মতো অর্ণব চোখের সামনে চলে এসে, দুটো তর্জনী আঙুল ক্রস করে দেখিয়ে চোখের সামনে বলল,

"হলো তো ইকুইল ইকুইল?"

হতভম্ব আমি থ মেরে চেয়ে আছি, এখনো ওই ঠোঁটজোড়ায় হাসি, ভ্রু নাচিয়ে আমার দিকে চোখ মারে। ভ্রম থেকে বের হতেই তাছু জিজ্ঞেস করলো,

"কিরে, অর্ণব ভাইয়া কি তোকে আগেও কিছু বলেছে? না মানে, প্রেম-ট্রেম এর বিষয়?"

তখন বোধগম্য হলো না কেন এটা বলল সে আমাকে। অর্ণবের মুখ পানে চাইলাম আমি। আমাকে এটা বলে ছেলেটা নিজের বোনের কাছে চলে যায়। ফুলে সাজানো স্টেজটায় বসে আছে সুন্দরী বউ সাজে মেয়েটি। পেছনে বড় করে লেখা "অরিণ এর হলুদ সন্ধ্যা।" বুঝলাম, এই মেয়েটির জন্যই ফুল এনে বেশি হয়েছিলো। মৃদু হাসি নিজ থেকেই আসলো, আমার হাতটা আপনা-আপনি কাঠগোলাপ গুলোতে গিয়ে থামে। অরিণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলাম, কাঠগোলাপ মেয়েটি দেয়নি। এমনকি পুরো বিয়েবাড়িতে আমার একাই এই ফুল। চোখগুলো ফিরিয়ে খুঁজতে লাগলাম কাউকে যে হয়তো কাঠগোলাপ পরেছে। কিন্তু না, এই ফুল শুধুই আমার কানে। বিষয়গুলো আমার মনটাকে কেমন উৎফুল্ল করছে। হালকা সাজেও নিজেকে স্পেশাল লাগতে লাগছে।

অনেকটা সময় পর গল্প করছিলাম আমরা, তাছুকে দেখলাম হাঁফাচ্ছে, আমাকে হয়তো কিছু বলতে চায়। স্টেজে এখন নাচ হচ্ছে, আমরা দেখছি। তাছু, মাঝে আমি আর রায়ান মামা দুজন দুই পাশে। তাছু প্রশ্ন করে আমাকে,

"সুর?"

"হুম।"

"তুই কাউকে পছন্দ করিস?"

মনের মধ্যে দ্বিধা হলো, উত্তর নেই আমার কাছে। উত্তর করলাম না। শীতের রাতের গা হিমসিম করা বাতাস লাগছে গায়ে। শাড়িতে শীতটা বেশি লাগছে। তাছু উত্তর না পেয়ে বলল,

"রায়ান মামাকে কেমন লাগে?"

ভেতরে অপ্রস্তুত হলাম আমি, মামা?

"মামা তো মামা, উনি ভালো, ব্যবহার ভালো। ভালোই লাগে।"

"প্রেম করবি?"

"পাগল তুই? আমার চাচাতো ভাইদের কখনো ভাই ছাড়া অন্য কিছু কল্পনা করিনি আমি। আর সে সম্পর্কে মামা হয়।"

"তাতে কি? আপন তো নয়। সে আমার আপন, তোর না। সম্পর্ক হালাল।"

"আজাইরা কথা বলবি না তাছু। আমার কাছে মামা মানে মামা-ই।"

কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারলাম না, পেছন থেকে কারো শক্ত হাতে মাথায় পড়লো আমার ও তাছুর থাপ্পড়, আস্তেই ছিলো। তবুও হঠাৎ হওয়াতে সামান্য ব্যথা পেলাম। চোখ তুলে দেখলাম, রাগে চেচামেচি করছে অর্ণব,

"রাত নয়টা পেরিয়ে জামাইবাড়ি যাবে না? না-কি এখানেই অনুষ্ঠান শেষ করবে?"

রাগে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে বলার জন্য উদ্বিগ্ন হতেই, তাছু হাত ধরে বসিয়ে দেয় টেনে,

"সুর, অর্ণব ভাইয়া রাগি খুব। বাদ দে, রেগে আছে। আর হয়তো বুঝতে পারেনি এটা আমরা।"

"তোর কথা শুনলে মনে হয়, কি জানিস এই ছেলেকে?"

"কি?"

"আসলে ছেলে ভালো, শুধু রাতে একটু খায়।"

রায়ান মামা সহ বাকিরা সবাই হো হো করে হেসে দেয়। আমিও হাসলাম, কারো বিয়েতে এসে ঝামেলা করাটা ভালো দেখায় না। চোখটা ওই দিকে যেতেই দেখলাম, অন্য এক যুবক এ যেনো। অর্ণবের চোখগুলোতে রাগ খুব। আমার দিকেই চেয়ে আছে। হাসিমুখটা বন্ধ হয়ে গেলো আমার। সে অন্য দিকে ফিরে সাউন্ড সিস্টেমের একটি তার ধরে টান দিয়ে ছুটিয়ে দেয়। গান নিজ থেকে বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বলে,

"২০ মিনিটের মধ্যে যদি সবাই বের না হয়েছো, অনুষ্ঠান নষ্ট হবে বলে দিলাম। এখানে কি আড্ডা দেওয়ার সময় এটা? এত কিসের আলাপ?"

কথাগুলো গায়ে বিধলো। কথায় আছে, আমি বলবো যার লাগবে তাকেই উদ্দেশ্য করেছি। সে বললো সবাইকে, তবুও আমার গায়ে লাগলো সুচের মতো। গাল বাঁকিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তরতরিয়ে চলে গেলাম একটা রুমের ভেতরে। ধপ করে বসে পড়লাম বিছানায়। তাছু আর রায়ান মামা এসে বুঝায় আমাকে হাজার খানেক কথা,

"সৌরভী, অর্ণব একটু রাগি, কিছু পছন্দ না হলে এমন করে। যখন রেগে যায়, মাথায় থাকে না কি করবে না করবে। তুমি রাগ করো না।"

রায়ান মামার কথায় বুঝলাম, অর্ণব ছেলেটা রাগি, বদমেজাজি। তবে তখন ‘ইকুইল’ কথাটা বলার কারণ খুঁজে চলেছি আমি মনে মনে। একটু জোর খাটাতেই কিছু তো একটা মাথায় আসলো, আমি তাছুকে বললাম,

"তাছু, যখন শাড়ি পড়ছিলাম আর উনি বারবার আসছিলো, আমার শরীর ভালো করে ঢাকা ছিলো তো?"

"হুম, তোকে আমি মমি বানিয়ে দিয়েছিলাম আর তুই এটা বলিস?"

ওর কথায় সামান্য লজ্জা পেলাম আমি, কেনো পেলাম জানি না। তবে অর্ণবের ‘ইকুইল’ কথার মানেটা বুঝলাম খুব। তাছুকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

"ওনাকে যে মেয়ে বিয়ে করবে, তাকে খুব জালাবে উনি। যেমন রাগি, তেমন ঝগড়াটে। মানুষকে বিব্রত করায় ১০০ তে ১০০ দেওয়া যাবে।"

"তোর কেনো এমন মনে হলো? এই সত্যি বলতো, কি চলছে তোদের মধ্যে?"

রায়ান মামা তাকিয়ে ছিলেন, কথাগুলো শুনছেন আমাদের। আমি বললাম তাছুকে,

"বুঝবি না তুই, পিচ্চি মেয়ে। শুধু মিলিয়ে নিস। উনি আর ওনার বউ হবে ইঁদুর-বিড়ালের মতো। ইঁদুর পালাবে আর বিড়াল পিছু নেবে।"

"তাহলে এটাও বল, কে ইঁদুর আর কে বিড়াল?"

"উনি বিড়াল, আর ওনার বউ ইঁদুর। বেচারি বউটার জন্য মায়া হয়।"

কক্ষে হাসির রোল পড়লো। সে অন্য অনুভূতি। জীবনের প্রথম নিজেকে স্বাধীন পেলাম আমি। সাথে নতুন একজন বন্ধু, রায়ান মামা, মিষ্টি লোকটা অনেক। এমন সময় বাইরে থেকে অর্ণবের আম্মুর ডাক আসলো। সবাইকে বের হতে বলা হচ্ছে। উঠে আমরাও বের হয়ে আসলাম। সেই ধূসর চোখে চোখ পড়ল, রাগটা বোধহয় কমেছে অর্ণব এর।

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন