#প্রণবীনা
#লামিয়া_ইসলাম_স্বর্ণালী
#পর্বঃ৩
কনকনে করতে থাকা শীতের সকাল, মানুষ এর সকাল সকাল উঠে কাজ করা, আর জোরে চেঁচিয়ে কথা বলা না হলে কোনো ভাবেই বিয়ের গ্রামের বাড়ি মনে হয় না। এটাই যেনো অন্য রকম প্রশান্তি ছড়ায় মনের ভেতর। বিশাল হলুদ কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম আমি, কানে এত এত শব্দ আসে ভেসে। ছুটির দিন কখনো ভোরে ঘুম থেকে উঠে অভ্যস্ত নই। তবে বাহিরের শব্দগুলোকে অদেখা করলেও রুমের ভেতরের শব্দগুলো অদেখা করতে পারলাম না। কম্বলের নিচ থেকে মুখটা বের করে পিটপিট করে তাকাতেই দেখলাম অর্ণবের আম্মু। আলমারির নিজের তাক থেকে কিছু নিচ্ছেন। মহিলাটি যতটুকু সম্ভব শব্দ কম করার প্রয়াস করে চলেছে। আর মোড়া ভেঙে শোয়া থেকে উঠে বসলাম আমি। আমাকে বসতে দেখে হাতের কাজ দ্রুত ও শব্দ করেই করতে লাগলেন তিনি। বুঝলাম এত সাবধানতা আমার জন্যই ছিলো। তিনি মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন,
"ঘুম ভেঙেছে তাহলে? যাও গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নাস্তা করে নাও।"
"কয়টা বাজে আন্টি? আর তাছু কোথায়?"
"সবে ৮ঃ৩০, তাছু বাথরুমে আছে।"
কথাটা শেষ করতেই তাছু বের হয়ে আসে। ইস এমন কনকনে শীতে মেয়েটি সকাল সকাল গোসল করেছে। কম্বলটা সরিয়ে নেমে গেলাম বিছানা থেকে, ঠান্ডা এসে গায়ে লাগার আগেই আন্টি আমার গায়ে সেই অর্ণবের দেওয়া রাতের হুডিটা পেছন থেকে এগিয়ে দিলেন। "এটা পরে নাও সৌরভী, নাস্তা খেয়ে গোসল করে নিও।"
অবাক লাগলো, গতকাল ওনাকে দেখলাম কত রাগী, মনে হলো ঝগড়ুটে, আজ কত কিউট লাগছে, ফোলা ফোলা গাল, মিষ্টি স্বর মায়া হলো খুব। ইতস্তত স্বরে বললাম আমি,
"আন্টি এটা তো অর্ণব ভাইয়ার, আমার লাগবে না। একটি রোদে দাঁড়ালে ঠিক হয়ে যাবে।"
মহিলাটি একটি ফোঁস করে রাগ নিক্ষেপ করে বললেন, "অর্ণবের তো কি হয়েছে? ওকে ভয় পেও না, আমার ওপর কথা নেই। অরিনের আলমিরা তালা দেওয়া না হলে ওর কাপড় দিতাম। দুই ভাইবোন এক ধাঁচের।"
হাসি পেলো আমার, পাবেই তো। নিজের সন্তানদের নামে কত কথাই না বলল। এই পর্যায়ে সরল মনে হলো ওনাকে। হাতমুখ ধুতে চলে গেলাম। যেহেতু দিনের আলোতে তাদের বিশাল বারান্দাটা দেখলাম প্রথম। কি সুন্দর বারান্দা দিয়েই উপরের দিকে সিঁড়ি গিয়েছে, বড় লোহার গেট তালা দেওয়া। মানুষজন নেই ওখানটায়, এটা বাড়ির পেছন সাইড। হাতমুখ ধুয়ে বের হয়ে দেখলাম বিছানা গোছালো আর দুই প্লেট খিচুড়ি রাখা। তাছুর সাথে বসেই খাবারটা শেষ করলাম। বাসা থেকে বের হয়ে দাঁড়াতেই কয়েকজন মহিলা এমন করে তাকাচ্ছে আমার দিকে যেনো ভূত। তাছুর হাত ধরে ওর কানের কাছে হিসহিস করে আমি প্রশ্ন করি,
"তাছু এমন করে দেখার কি আছে?"
"বাঘের গুহা থেকে বাঘের খালের হুডি জড়ানো, লোকে তো অবাক হবেই।"
বিরক্তির চ বলেই আমি হাঁটতে থাকি বাড়ির পেছন দিকে। একটা ছোট নদী দেখা যায়। বাড়ি থেকে বেশ ঢালু। উপরের দিকে বাঁশের ঝুলন্ত সাঁকো। এসব আমি খুব কমই দেখা। দেখেই মনটা কেমন উড়চণ্ডীর মতো মেতে ওঠে। ভাগ্য করে রায়ান মামা ছিলো ওই পারে। তাছুকে বলাতে সে চেঁচিয়ে রায়ান মামাকে বললো আমরা ও পাশে যেতে চাই। তিনি রাজি হয়ে এই পাশে আসলেন। তাছুর হাত উনি ধরে আছেন আর তাছু আমার হাত। জীবনের প্রথম এমন অদ্ভুত অনুভূতি। সামান্য কৌতূহল, ভয়, আবার ভালো লাগা কাজ করা মনে। তিনজন মাঝে আসতেই তাছু আমার হাত ছেড়ে ধরিয়ে দিলো বাঁশে। থরথর করে ভয়ে কাঁপছি আমি, "তাছু ধর পড়ে যাবো। বোন ভালো ধর, রায়ান মামাআআ।"
শেষে চেঁচানোর কারণটা হলো রায়ান মামা মজা করে বাঁশের সাঁকোটা ঝাঁকাচ্ছিল জোরে জোরে। প্রায় আমি কেঁদেই দেবো, তাই থেমে দু'জন জোরে জোরে হাসতে থাকে। রায়ান মামা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "মেয়ে, তোমার গ্রামে বিয়ে হলে তো তুমি দু'দিন টিকবে না!"
আমি গাল ফুলিয়ে অভিমানী স্বরে বললাম,
"আমাকে ভয় দেখিয়ে আবার খোঁটা দিচ্ছেন?"
"এই যাহ, খোঁটা দেওয়ার সাধ্যি কি আমার আছে?"
কথা বাড়ালাম না, ওপারে আসলাম এবার। মন জোড়ানো দৃশ্য বুঝি একেই বলে? সামনে বিশাল চাষের জমি, কুয়াশা দূরে এখনো আছে হালকা। উঁচু জায়গা থেকে দৌড়ে নেমে গেলাম। রায়ান মামার সাথে আর একজন ছেলে ছিলো। তাছু আমাকে বেশ খোঁচা দিয়েই বললো,
"দেখলি ফুপা আর আদিব ভাইয়ার জন্য কত কিছু মিস করেছিস জীবনে?"
ভ্রুজোড়া কুঁচকে রুষ্ট কণ্ঠে বললাম,
"পরিবার কখনো খারাপ চায় না তাছু, সব কিছুর একটা সময় থাকে। আমি ছোট ছিলাম এতদিন।"
রায়ান মামা আমার রাগ দেখে বললেন,
"সৌরভী, চলো ওই দিকে অনেক সুন্দর, দেখবে মিষ্টি কুমড়ো আর লাউ কি সুন্দর বিছিয়ে আছে।"
উৎফুল্ল হয়ে তাছু আর আমি হাত ধরে হাঁটছি। শীতের সকালের বাতাস গায়ে লাগছে। আফসোস হলো সকাল সকাল উঠতে না পারার। বেশ অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে আমরা আবারও বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। এই সময়টুকু রায়ান মামা আমার দিকে তাকাচ্ছিলো বারবার। তাছু আর রায়ান মামার সম্পর্কটা ভালো লেগেছে, বন্ধুর মতো কত মিল দুজনের। কিছু দূর আসতেই রায়ান মামা বললেন,
"চলো রেস করি, আমরা দৌড়ে সবাই ওই উঁচু জায়গায় উঠবো। যে হারবে সে সবাইকে ঠান্ডা খাওয়াবে।"
"না না, দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না। আমি পারি না এগুলো।"
সবার জোরাজুরিতে অবশেষে রাজি হলাম, একটু রোদ দেখা যাচ্ছে আকাশে। আমারও ইচ্ছে ছিলো কিছুটা। মজা করলাম বেশ অনেক সময়, আমার জীবনে এই দিনগুলো অন্যতম সুন্দর। দৌড়ে জিততে তো পারলাম না আমি, উল্টো বালিতে মুখ থুবড়ে পড়লাম। 'ওমাহ' বলে চেঁচাতেই এগিয়ে আসে রায়ান মামা, তাছুতাছু আমাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। ভাগ্যিস তেমন চোট খাইনি গায়ে।
তবে অর্ণবের হুডিটা বালিতে মাখামাখি হয়ে গিয়েছে কখন। বাসায় এসে নিজের কাপড়গুলো নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতেই দেখলাম গলায় গামছা পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায় অর্ণব। তার হুডিটা আমার গায়ে বালিতে মেখে অবস্থা খারাপ। আমার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়। আমি নিজেই যেচে পরে জিজ্ঞেস করলাম,
"আপনি গোসল দেবেন? আমি পরে যাবো?"
আড়া আড়ি ভাবে আমার দিকে তাকালেন তিনি। গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন,
"তারাতাড়ি করবেন। আম্মু আর এক পাতিল গরম পানি বসাও আমার জন্য।"
আমাকে বলার পর পর নিজের মা কে এটা বললো, আমি দেরি করলাম না, তারাতাড়ি করে গোসল করতে চলে গেলাম। ওনার হুডিটা ভালো করে ধুয়ে দিয়েছি। বের হয়ে দেখি ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। হুডিটা কোথায় শুকাতে দেবো জিজ্ঞেস করতে নিলেও আমাকে পাশ কাটিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলেন। ওনার মা সাথে সাথে পানি নিয়ে আসেন। ওনার হাতেই হুডিটা ধরিয়ে দিয়ে রুমে চলে যাই। নিজের জন্য নেওয়া কালো চুড়িদার আর সাদা কানের দুল পরেছি। সাজ সেই আগের মতোই। চুলগুলো খোলা কেননা ওটা ভেজা।
বেলা প্রায় ১১টা, বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই অর্ণব বের হয়ে আসে। পরনে লুঙ্গি, মাথায় গামছা দিয়ে রাব করে করে মুছতে মুছতে। আমার দিকে তাকায় সে, দু'জনের চোখ মিলতেই আমি হাসলাম ভদ্রতার খাতিরে। সে মাথা নিচু করে সরির দিকে যেতে যেতে বললো,
"তাছু ছাঁদে যেতে চাইলো, আসতে পারো।"
তাছু আমার হাত ধরে কোনো ক্রমে তার পিছু নেয়। ওর এত বেশি এক্সাইটমেন্টের কারণ আমি বুঝলাম না। ছাঁদে পা রাখার মুহূর্তটা আরো এক চমকের সাথে হলো। চার পাশে ফুলের গাছ। একটি সাইডে সে হয়তো ওয়ার্ক আউট করে, তার কিছু সরঞ্জাম। তাছুকে নিয়ে ছাঁদের একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ালাম। রোদে চুলগুলো মেলে দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে বড় করে শ্বাস নেওয়া টা শান্তির। অর্ণবের দিকে চোখ যেতেই লক্ষ করি লোকটা আমার দিকে চেয়ে আছে, সেই বেহায়া চাহুনি। আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাতের গামছাটা এগিয়ে ধরে বলল,
"সুর এটা রশিতে ছড়িয়ে দিন।"
"হুম।"
লোকটা কত অদ্ভুত আচরণ করে আমার সাথে ভাবতেই কেমন লাগে। গামছা মেলে দিয়ে চারপাশে তাকিয়ে শীতল করছি মনটা। কিছু সময় পর অর্ণব আবার কাছে আসে আমাদের, তাছু আর আমাকে একই সাথে বলে,
"চকলেট খাবে?"
তাছু বা আমি কথা বললাম না, কে বলে কথা আমাদের উত্তর না পেয়ে সে তাছুর দিকে দু'টো চকলেট এগিয়ে দেয়। আর আমার দিকে একটা। কেনো যেনো ভালো লাগলো না। আমি ফোঁস করে বললাম,
"ওকে দু'টো, আমাকে একটা কেনো?"
সে হাত বাড়িয়ে দেয় মুষ্টিবদ্ধ করে,
"যদি নিতে পারেন আমার হাতে যা আছে সব আপনার, সাথে হাতের মালিক।"
ওনার হাতের দিকে তাকিয়ে গলাটা শুকিয়ে গেলো, শুকনো ঢোক গিলে অন্য দিকে ফিরে আছি আমি। তাছু বারবার বলছে নিতে, তবে কে নেবে? ওনার হাত কে ধরতে যাবে? তাছু বিরক্ত হলো আমার আচরণে, তাই তো চলে গেলো দূরে। আচানক আমার হাতে হেঁচকা টান পড়তেই অর্ণবের দিকে ফিরে যাই। একটি হাত শক্ত করে ধরে আছে আমার সে। প্রথম কোনো অচেনা পুরুষের ছোঁয়ায় শরীরটা শিরশির করে ওঠে। আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে অর্ণব, খুব নিকট ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে। অন্য হাত দিয়ে মুষ্টিতে পুরে রাখা সবগুলো চকলেট আমার হাতে গুঁজে দিয়ে হাস্যস্বরে বলে,
"আমি কখনো কথার খেলাফ করি না, হাতে যা ছিলো সব আপনার, সাথে হাতের মালিক ফ্রি।"
মনের ভেতর রঙিন প্রজাপতিগুলো কেমন বারবার উড়ে বেড়াচ্ছে। হাতটা মুচড়াচ্ছি, তবুও বেহায়া লোক ছাড়তে নারাজ। ছাঁদের রেলিংয়ের সাথে পিঠ ঠেকে যায়। নিচ থেকে মামানির শব্দ আসতেই সে ছেড়ে দিলো আমার হাত, হাঁপাচ্ছি খুব। বুকের ভেতরটা এলোমেলো হয়ে আছে।
"সৌরভী, আবিদ কল দিয়েছে। সকাল থেকে দিচ্ছে, কথা বল। ছেলেটা পাগল হয়ে যাবে এবার।"
অর্ণবকে পাশ কাটিয়ে বের হতেই যাবো, আবারও ছেলেটা হাত চেপে ধরে, তাছুর দিকে চেয়ে বলে, "তাছনু, একটু ফোনটা এনে দাও। লেট হলেও সমস্যা নেই, আমি আছি ওনাকে কোম্পানি দেওয়ার জন্য।"
বেয়াদব মেয়ে চলে গেলো। আর অর্ণব আবারও আমাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়। আমি বারংবার জিভ দিয়ে ওষ্ঠ ভেজাচ্ছি। সে দেখে মৃদু হেসে বলে, "এত ঘাবড়াবেন না, রাতে যেহেতু কিছু করি নি এখন তো দিন। কিছু করার জন্য আমি রাতের অপেক্ষা করবো। এখন একটু কথা বলি?"
"কি বলবেন?"
"আমাকে কিছু ডাকুন সুর, খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে আপনি কি বলে ডাকবেন আমায়।"
"আপনার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক যে ডাকতেই হবে।"
"আমার মনের ভেতরে সুপ্ত প্রণবীনার সুর হবেন?"
ক্ষাণিকটা সময়ের জন্য মস্তিষ্ক শূন্য হলো আমার, চোখগুলো বন্ধ করে নিলাম লজ্জায়। গলা শুকিয়ে কাঠ পানির শূন্যতায় ভুগছি। এত কিছু বুঝতে পারছে না লোকটা, কেমন হাত ধরেই আছে। কর্মকাণ্ড একদম সুবিধার নয় তার। সব কিছু উপেক্ষা করে টেনে নিজের বুকে ফেলল আমাকে, আমার কম্পনরত শরীরটা মূর্তি বনে গেল। খুব নরম করে আমাকে ডাকল সে,
"সুর।"
"হুম?"
"কিছু না। একটু এমন করেই থাকুক।"
একটি হাত দিয়ে আমার মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে রেখেছে সে। ভেতর থেকে তার হৃদপিণ্ডের ধুকধুক শব্দগুলো পাচ্ছি। কতটা ডেস্পারেট সে। আমি নড়ে উঠতেই ছেড়ে দিলো আমাকে। চোখ দু'টো নিচু করে রেখেছি আমি, বড় বড় শ্বাস নিচ্ছি ও তরতর করে কাঁপছি একটু। হাতগুলো এপিঠ ওপিঠ করে কচলাকচলি করছি। নিজ থেকেই সে বলতে থাকে, "আমার একটু সমস্যা আছে। বলতে পারেন পারিবারিকভাবে সবাই এই সমস্যায় ভুগি। কাউকে নিজের জিনিস ধরতে দেই না। আমার দাদু, বাবা, অরিন সবাই এমন। আম্মু ছাড়া কেউ স্পর্শ করলে রাগারাগি হয়ে যায় বাসায়। আমরাও কেউ কারো জিনিস ধরি না। আমার হুডি আপনার গায়ে দেখে বাড়িতে সবাই তাকিয়ে ছিল এমন করে এই জন্যই।"
"আচ্ছা।"
"আজকে চলে যাবেন আপনারা?"
"হুম।"
"ফোন নেই?"
"না।"
"আমি তাছুর কাছে নাম্বার দিয়ে দেবো। ইচ্ছে হলে কল দেবেন।"
কথা বললাম না। তাছু চলে এসেছে আমার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল, "ধর আবিদ ভাইয়া।"
অর্ণবকে পাশ কাটিয়ে একটি কোনায় চলে গেলাম আমি। ফোনটা কানে ধরতেই পরিচিত পুরুষটি অভিমানী স্বরে অভিযোগ করে উঠল, "বুড়ি তুই বড় হয়ে গিয়েছিস, কালকে আজকে একটি বার কি আমার কথা মনে পড়েনি তোর?"
"মনে করবো কি করে? ভুলতেই তো পারলাম না।"
"তাই জন্য বুঝি একটা কল দিলি না আমাকে?"
"ফোন তো চালাতে দাও না। বিয়ে বাড়ি ব্যস্ত সমাবেশ, এখানে কি কারো কাছ থেকে ফোন নেয়া যায়?"
"তবে কি বুড়ির জন্য একটা ফোনের ব্যবস্থা করতে হবে মনে হয়?"
অর্ণবের দিকে চোখটা যায়, আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। রোদের জন্য চোখে ব্যথা, তাকানোই মুশকিল। ওর দিকে তাকিয়েই বলে ফেললাম,
"হুম একটা ফোন এবার নেয়া দরকার।"
"বাসায় আয়, কালকেই চাচা-চাচিকে বলে ফোন নেয়ার ব্যবস্থা করছি। তখন দেখবো অজুহাত কোথায় থাকে।"
কিছুটা সময় চুপ করে তার কথাগুলো শুনলাম, আবিদ ভাইয়া আমাকে আবার ডেকে বললেন,
"সৌরভী আছিস?"
"হুম বলো।"
"বাসায় আসলে তোকে একটা কথা বলবো।"
"এখন বলো।"
"না, বাসায় আয় আগে।"
দু'জনের কথার সমাপ্তি হলো প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে। কলটা কেটে মাথা নিচু করে চলে যেতে নিলে পেছন থেকে অর্ণব আবার ডাকল আমায়, তাছু ওনার দিকে তাকায়, সাথে আমি। নরম মুখটা কেমন অসহায়ের মতো চেয়েছিলো। আমাদের কাছে আবার এগিয়ে আসে। আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে তাছুর হাতে ধরিয়ে আবারও আমাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে সে। তখন এর মতোই চুপ করে আমি তার হৃৎস্পন্দন শুনছি। তাছু নেমে গিয়েছে। মাথায় ক্রমাগত হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে আমার। আমি কাঁপা গলায় বলে উঠলাম,
"এমন করে বারবার জড়িয়ে ধরে আমাকে কেনো ছোট করছেন? আপনার মনে হয় না এটা ঠিক না?"
"জানি না সুর, আমার জন্য বেশি না একটা মাস অপেক্ষা করবেন, আপনার মনের সমস্ত ভ্রান্তি দূর করে নিয়ে আসবো। আপনাকে আমার সমস্ত কিছু ব্যবহার করার অনুমতি দেবো।"
সে আবার বলল, "অপেক্ষা করবেন সুর?"
"হুম।"
আমি খেয়াল করলাম হৃদপিণ্ডের ধুকপুক বাড়ছে, একটা হাত ওনার বুকে রেখে বললাম,
"ছোট থেকে কখনো কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। বেশি অপেক্ষা করাবেন না।"
"সময় নিলাম তো এক মাস, এক মাস হয়ে ঠিক একদিন পর আমার দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিন।"
কিছুটা সময় এমন করেই কেটে গেল আমাদের, আমি ফের বললাম,
"এক দিনের দেখায় কি কেউ কাউকে এত ভালোবাসতে পারে?"
আমার মুখটা নিজের দিকে তুলে, মৃদু হেসে বলে উঠল সে আমাকে,
"আমি কি একবারও বলেছি ভালোবাসি? আমি বিয়ে করে আমার কাজ করাবো। তখন যদি একটু ভালো টালো বাসি তবে দেখা যাবে।"
ঝটকা দিয়ে দূরে সরে আসতে চাইলাম আমি রাগ করে, গালগুলো বাঁকিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছি, ছাড়লো না শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, "বাকিদেরটা জানি না এক দিনে ভালোবাসতে পারে কি না। আমি আর আপনি তো পেরেছি এতেই চলবে। কারো টা জানার প্রয়োজন নেই।"
"আমি বলেছি নাকি ভালোবাসি? এক মাস দেখবো, না হলে অন্য কারো কাজ করবো।"
"ছিঃ সুর, আপনি লোকের বাসায় কাজ করবেন? এই বুঝি আপনি পাপা-মাম্মি-ভাইয়াকি পারী?"
"ধুর।"
______
দুপুর হয়েছে সবাই আবারো বিয়ের প্যান্ডেলে চলে এসেছি। এত কিছুর মধ্যে আমার স্থান হলো মামানির পাশে। মামানি ও অর্ণবের মা আমাকে সাথে সাথেই রেখেছে। ভদ্রমহিলাটি বেশ তর্ক করায় পারদর্শী, আবার মায়া করতে পারেন দারুণভাবে। কারো কথার চুল পরিমাণ ছাড় দেন না। খাবারের জন্য টেবিলে বসলাম সবাই। তাছু আর রায়ান মামা ছিলো সাথে কয়েকজন লোক পরিচিত। মনের ভেতর কেমন দ্বিধা কাজ করছে, কখনো এমন পরিবেশে অভ্যস্ত আমি নই। প্লেটে পোলাও পরতে নিলে আমি কিছু বলার আগেই দূর থেকে শব্দ আসলো,
"ওখানে সাদা ভাত দিন।"
অর্ণব অন্য টেবিলে মেহমানদের খাবার সার্ভ করছিলো। ওখান থেকেই ডেকে বলল কথাটা। এত লোকের সামনে আমি অপ্রস্তুত হলাম একটু। কে বলে এমন করে লজ্জা দিয়ে। লোকে কি ভাববে? আমি তো আস্তে করে মামা বা মামিকে বলতে পারতাম। রায়ান মামার দিকে একটু তাকালাম লোকটার হাত নিজের প্লেটে চোখ আমার দিকে । এত ভেবে কাজ নেই, খাবারে মন দিলাম আমি। খাবার শেষ করে সবাই কিছু সময়ের জন্য একটা বড়ই গাছের নিচে বসেছি। একটু পর চলে যাবো। রায়ান মামা হেসে বললো,
"সৌরভী তুমি কিন্তু তখন হেরে ছিলে, আমাদের ট্রিট কোথায়?"
"এদিকে দোকান কোথায়? চলুন ট্রিট দেই।"
"ট্রিট কি আমি পাবো?"
পেছন থেকে অর্ণবের গভীর স্বরে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালাম, রায়ান মামা বলল,
"তোকে দেবে কেনো? ভাগ। আমাদেরকে দেবে।"
"সমস্যা নেই সবাই চলুন।"
আমার কথায় অর্ণব হাসলো আলতো করে। সবাই মিলে পাকা রাস্তা ধরে একটা দোকানে গেলাম। সবার জন্য যার যার পছন্দ মতো এটা ওটা কিনে দিলাম। এর মধ্যে অনেক কথাই হলো। অর্ণব চোখ মেরে সবার সামনে আমাকে লজ্জা দিতে একটু দ্বিধা করলো না। পাকা রাস্তা দিয়ে দুই পাশে চাষের জমিগুলো কত সুন্দর করে বিছিয়ে আছে, দেখতে দেখতে পথ শেষ হয়ে গেলো কখন বুঝতেই পারলাম না।
বাড়ি এসে দেখলাম মামানি রেডি হয়ে আছে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হলাম আমরা, অর্ণবের মা বেশ অনেক করে আমাকে আদর করে দিলো। এতে অর্ণব মুচকি মুচকি হাসছিলো দূরে থেকে। একটা সিএনজি করে সবাই বেরিয়ে পড়লাম। এই অচেনা পরিবেশ আমার থেকে অনেক মূল্যবান জিনিসটা নিয়ে নিলো। ভেঙে দিলো আমার আটকে রাখা মনের শিকল। কিঞ্চিৎ কষ্ট হচ্ছিল ভেতরটায়। স্থানটার মায়ায় পড়লাম নাকি এই স্থানে বাস করা লোকগুলোর বুঝতে পারছি না। কানে বারবার বেজে চলেছে "আপনি আমার প্রণবীনার সুর হবেন? একটা মাস অপেক্ষা করবেন?" চোখ উল্টে পেছনে দেখার চেষ্টা করলাম হালকা। না কেউ নেই, হয়তো সেদিন আমার মন আশায় ছিলো সে আসবে আমাকে আবার বলতে, তার জন্য অপেক্ষা করার কথাটা।
স্টেশনে এসে সিএনজি থেকে নামতে হলো। নতুন করে গাড়ি চেঞ্জ করতে হবে। অন্য গাড়িতে ওঠার সময় চোখটা নিজ থেকেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাইকে গেলো। স্বল্প পরিচিত লোকটা হেসে হাত নেড়ে নিজের ঘড়ি দেখিয়ে আর হাতের তর্জনী দেখিয়ে বলছে ইশারায় আর একটা মাস অপেক্ষা করুন। হাসি ফুটলো আমার মুখে, হাত নেড়ে বিদায় দিয়ে গাড়িতে উঠে যাই আমি। সামান্য অপেক্ষার সূচনা হলো আমার জীবনে। এই অপেক্ষার শেষটা আমার জীবন পাল্টে দেবে জানি। তবে যাই হোক আমি প্রস্তুত আছি।
চলবে,,