#আনাস্তাসিয়া
#লেখিকা_সামিয়া
#পর্ব :৮
আহমেদ ভবনের তৃতীয় তলার দ্বিতীয় ফ্লোরে অফিস কক্ষে নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। আমান তার বোনকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রেখেছে আর আনাস্তাসিয় কখন থেকে কেঁদেই চলেছে। তার কান্নার কারণ সে জানে না। অজানা এক অনুভূতি তার মনে বারবার ভর করছে। সে জানে না তার এমন কেন হচ্ছে তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু একটাই নাম তা হলো আদ্রিয়ান। সেকি আদ্রিয়ান কে ভালোবাসে ফেলেছে। ভালোবাসার মানুষ মানে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও নিরাপদ আশ্রয় কোনো কারণ ছাড়াই প্রিয়জনের উপস্থিতিতে মন শান্ত হওয়া এবং তাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হিসেবে মেনে নেওয়াই হলো ভালোবাসা। প্রকৃত ভালোবাসায় সব কথা মুখে বলতে হয় না প্রিয় মানুষের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত স্বপ্নের মতো মনে হওয়া এবং তাদের নীরবতাও খুব সহজেই বুঝতে পারাটাই ভালোবাসার আসল সৌন্দর্য। ভালোবাসার মানে এই নয় যে জীবনে কোনো কষ্ট থাকবে না বরং, প্রিয় মানুষের পাশে থেকে তার দুঃখকে গলিয়ে দেওয়া এবং তার হাসিতে নিজের সব কষ্ট ভুলে যাওয়াটাই ভালোবাসার সার্থকতা। ভালোবাসা মানে শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, বরং একই দিকে একসঙ্গে তাকিয়ে এগিয়ে চলা।প্রিয় মানুষের মাঝে নিজের জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পাওয়াই হলো এই অনুভূতির আসল গভীর। আর আনাস্তাসিয়া সে ভালোবাসার এই গভীরতাকেই বুঝতে পারছে না। আমান আনাস্তাসিয়ার এই অবস্থা দেখে শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
__" তুই কি আদ্রিয়ানকে ভালোবেসে ফেলেছিস"?
আনাস্তাসিয়া কথাটি শুনা মাত্রই চমকে গেল। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইল একি ভাবে। সে কি সত্যি আদ্রিয়ানকে ভালোবেসে ফেলেছে? কিন্তু এটা কি করে সম্ভব সে তো কাওকে ভালবাসতে পারে না। তার জন্য তো ভালোবাসা নিষিদ্ধ, কাওকে ভালোবাসা মানে তার প্রতি দুর্বল হয়ে পরা। আর আনাস্তাসিয়া তার তো দুর্বল হলে চলবে না। সে কিছু তেই কাওকে ভালবাসতে পারে না তার দুর্বলতা থাকতে নেই। তাহলে শত্রুরা তার দুর্বল জায়গায় আঘাত করে তাকে শেষ করে দিবে। তার আসে পাশের মানুষদের ক্ষতি করে ফেলবে তারা। তাই তো নিজের ভাইকে সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছে, কাওকে জানতে পর্যন্ত দেয় নি আমান তার ভাই হয় আপন রক্তের ভাই। শুধু মাত্র তার ভাইয়ের ক্ষতি করে ফেলবে আর তাকে ক্ষতি করার ব্লেকমেইল করে তাদের দিয়ে খারাপ কাজ করাবে নয়তো তাদের মেরে ফেলবে। তার তো এখন মরলে চলবে না, তার মা বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ যে নিতে হবে। তাদের কাওকে সে ছাড়বে না সবাইকে তিলে তিলে মারবে। তাই সে ভালোবাসতে পারেনা, না, না, না সে ভালোবাসতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে চোখের পানি দুই হাত দিয়ে মুছে বলে,
__" না আমি কাওকে ভালোবাসি না, ভালোবাসাতে পারি না"।
বলেই উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে নিলে আমান তার হাত ধরে টেনে পুনরায় বসিয়ে দিয়ে তার দুই হাত দিয়ে আনাস্তাসিয়ার গান আলতো করে চেপে ধরে বলে,
__"বোন আমার, ভালোবাসা মানেই যে সবসময় চোখের সামনে ভেসে থাকা কোনো ছবি, তা কিন্তু নয়। যখন কারো সুখেই তোর মুখে হাসি ফোটে, তার ছোট ছোট কষ্টগুলো তোকে কাঁদায়—তবে বুঝবি এটাই নিখাদ ভালোবাসা। এই অনুভূতিটা হঠাৎ করেই কোনো ঝড় বা ভূমিকম্পের মতো আসবে না, বরং গাছের পাতার মতো আস্তে আস্তে তোর হৃদয়ে ডালপালা মেলবে। তুই হয়তো তোর মনের মানুষের মাঝে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিস না। মনে হচ্ছে, তুই হয়তো কাউকে ভালোবাসতেই পারছিস না। এটা খুব স্বাভাবিক। নিজেকে সময় দে, জোর করে কোনো অনুভূতি তৈরি করা যায় না। সময় হলে ঠিকই বুঝতে পারবি, তোর মনের দরজা কার জন্য অপেক্ষা করছে। যার কথা তুই ভাবছিস, তার সাথে ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভালোবাসায় ভুল হওয়া বা কিছুটা দ্বিধায় থাকাটাও জীবনের একটা অংশ। নিজের মনকে শান্ত কর, সময়কে সুযোগ দে। তোর এই সুন্দর মনের মানুষটিকে ঠিক সময়ে ঠিক মানুষটিই চিনতে পারবে, এ বিশ্বাসটুকু রাখ। তুই যদি কখনো নিজেকে খুব একা মনে করিস, তবে ভুলে যাস না যে তোর পাশে আমি আছি। তোর প্রতিটি হাসিতে যেমন আমি আনন্দিত, তেমনি তোর যে কোনো সমস্যায় আমি ঢাল হয়ে দাঁড়াব। তোর ভালোবাসার অনুভূতিগুলোকে আমি তোর চেয়েও বেশি সম্মান করি।"
একটু থেমে আবার বলে,
__"আদ্রিয়ানকে নিয়ে তোর মনের দ্বিধা ও ভয় আমি খুব ভালো করেই বুঝি। পরিবার বা পারিপার্শ্বিকতা দিয়ে একটা মানুষকে পুরোপুরি মাপা যায় না, এটা সত্যি। কিন্তু আমি খুব কাছ থেকে আদ্রিয়ানকে দেখেছি। সে কতটা ভালো, সৎ এবং দায়িত্বশীল— তা ওর ব্যবহারে তুই-ই তো প্রতিদিন দেখিস।মানুষ তার নিজের পরিবার বা জন্মের পরিচয় চাইলেও বদলাতে পারে না। কিন্তু সে নিজে কেমন মানুষ, সেটা তার নিজের হাতে। আদ্রিয়ানের ভেতরের মনটা অনেক পবিত্র। তার চিন্তা-ভাবনা, সততা এবং তোকে আগলে রাখার ইচ্ছা দেখে আমার মনে হয়, সে ওর পরিবারের বাইরের একটা সুন্দর পৃথিবী। তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড যেমনই হোক, তার নিজের আচরণ ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে সে নিজেকে অনেক উঁচুতে রেখেছে।আমি ওর ওপর পূর্ণ ভরসা করি। তুইও যদি ওকে মন থেকে ভালোবাসিস, তবে ওর এই ভালো দিকগুলোর ওপর ভরসা রাখ। বাইরের পৃথিবী বা পরিবার নয়, আদ্রিয়ান নিজের যোগ্যতায় তোকে সুখে রাখার ক্ষমতা রাখে। পরিবার নয়, মানুষটিই আসল, একটা গাছের শিকড় খারাপ হতে পারে, কিন্তু ফুলটি তো সুন্দর ফুটতে পারে। আদ্রিয়ান ঠিক তেমনই একটি সুন্দর ফুল, যাকে তার পরিবার দিয়ে বিচার করা অন্যায় হবে। আমি ওর [আদ্রিয়ান] সততা এবং তোকে দেওয়ার কমিটমেন্ট নিয়ে ১০০ ভাগ নিশ্চিত। সে তোকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে এবং সম্মান করে। আমাদের জীবনে চারপাশের মানুষ বা পরিবেশ অনেক কিছু বলবে। কিন্তু দিনশেষে তুই কার সাথে সুখে আছিস, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের চারপাশে অনেক শত্রু বা প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে, এটা সত্যি। কিন্তু এই নেতিবাচকতা বা শত্রুদের বাইরেও আমাদের একটা নিজস্ব সুন্দর জীবন আছে। আমি সবকিছুর ঊর্ধ্বে চাই তুই ভালো থাকিস, শান্তিতে থাকিস এবং জীবনে সঠিক ভালোবাসার মানুষটিকে পাশে নিয়ে সুখে জীবনটা উপভোগ করিস।
তুই কি ভেবেছিস প্রতিশোধের এই আগুনে পুড়ে তুই নিজেকে শেষ করে দিবি আর আমি চুপ করে দেখব? না, আমি থাকতে সেটা হতে দেব না। তুই যদি তোর নিজের ভালো না বুঝতে পারিস, তবে জোর করে হলেও আমার কথা তোকে মানতেই হবে। কারণ, তুই আমার বোন। তুই নিজের অনুভূতিগুলো আর যার কাছ থেকেই লুকাস না কেন, আমার কাছ থেকে কোনোদিনও লুকাতে পারবি না; আমি তোর চোখের দিকে তাকালেই সব বুঝতে পারি।"
শেষের কথা গুলো একটু জোর খাটিয়ে বলে আমান। আনাস্তাসিয়া এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে আমানের বলা প্রতিটি বাক্য শুনছিল। সে বুঝল তার ভাই যা বলছে সব ঠিক বলছে। তাই সে আর নিজের অনুভূতি গুলোকে দমিয়ে রাখবে না। সে আদ্রিয়ানকে নিজের করে নিবে। এতো দিন নিজের অনুভূতি গুলোকে বুঝতে না পেরে অনেক কষ্ট পেয়েছে আর না। আদ্রিয়ান তার তাই সে নিজের সম্পর্কে ছেড়ে দিবে না। আনাস্তাসিয়া কিছু ক্ষণ চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে ওঠে দাঁড়ালো। অতঃপর আমান এর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলে,
__" ঠিক বলেছ ভাইয়া, নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে রেখে কোন লাভ নেই, আমার এবার নিজের কথা ও ভেবে দেখা উচিত"।
অতঃপর একটু থেমে বলে,
__" পেপার্স রেডি করো ভাইয়া আজকের মধ্যেই"।
আমান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে উঠে দাঁড়ায়। অতঃপর দুজনে একসাথে বেরিয়ে পরে নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। নিচে নামতে দেখতে পেল আদ্রিয়ান আর লেনি দরজা দিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করছে। কেবলি তারা বাহিরে থেকে আসলো। আদ্রিয়ান আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকালো। তা মুখ কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকলো তার কাছে। আনাস্তাসিয়া ড্রয়িংরুমে আসতেই কেউ একজন ঝড়ের গতিতে ছুটে এসে তাকে আচমকাই জড়িয়ে ধরল। আগন্তুক ব্যাক্তি তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। আকংশিক ঘটনায় সকলে হকচকিয়ে গেল। হঠাৎ এমন ঘটনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলনা তাই কিছুক্ষণ এর জন্যে কেউ বুঝতে পারলো না যে কি ঘটলো। অতঃপর যখন ঘটনা বুঝতে পারলো তখন সকলে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই দিকে।
আর আনাস্তাসিয়া সে আচমকিক ঘটনায় চমকে গেল। সে এক মুহূর্তে বুঝতে পারলো না যে তার সাথে কি হলো। তাই সে কিছুক্ষণ স্থির ভাবে দাড়িয়ে রইল। অতঃপর যখন বুঝল আগন্তুক ব্যাক্তিটি কে তখন হতবাক হয়ে গেল। সে চিন্তায় পড়ে গেল হঠাৎ ব্যাক্তিটির এমন ব্যাবহার এর কারণ। তাই সে চিন্তিত কন্ঠে ব্যাক্তিটিকে নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,
__"হোয়াট হ্যাপেন্ড, এথেরিয়ন? হোয়াই আর ইউ অ্যাক্টিং লাইক দিস?"
আনাস্তাসিয়া তাকে ছাড়াতে চাইলে সে আরো শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে। তার মনের ভেতর এই মুহূর্তে যেন ঝড় চলছে।চারপাশের পৃথিবীটা অর্থহীন মনে হচ্ছে তার কাছে। মন ও মস্তিষ্ক যেন কোনো কিছু মেনে নিতে চাচ্ছে না, এক অদ্ভুত অসাড়তা কাজ করছে তার মধ্যে। তার আর আনাস্তাসিয়ার এক সঙ্গে কাটানো পুরোনো স্মৃতি গুলো বারবার মনে পড়ছে তার এবং নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। কেন এমন হলো?"—এই প্রশ্নটি বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার। নিজের অজান্তেই নিয়তি, পরিস্থিতি বা নিজের ওপর রাগ জমতে থাকে। আনাস্তাসিয়ার কণ্ঠস্বর, হাসিমুখ, কাটানো মুহূর্তগুলো বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠছে। এই মুহূর্তে তাকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হচ্ছে তার মাঝে। সে এই মুহূর্তে সব কিছু ভুলে গিয়ে শুধু তাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে চায়। সে আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে হিতাহিত জ্ঞেন শূন্য হয়ে বিরবির করে বলতে লাগল,
__"প্লিজ, আমাকে এভাবে ছেড়ে যেয়ো না। তুমি ছাড়া আমার এই জীবনটা একদম অর্থহীন। আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না, বিশ্বাস করো!আমাদের এত সুন্দর স্মৃতিগুলো এভাবে মুছে ফেলো না। তোমার ওই একটুখানি অবহেলা বা দূরত্ব আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। প্লিজ, ফিরে এসো।আমি জানি মাঝেমধ্যে আমার কিছু ভুলত্রুটি তোমাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু আমার ভালোবাসা কখনো মিথ্যা ছিল না। আমাকে আর শাস্তি দিও না, প্লিজ চলে যাওয়ার কথা আর মুখে এনো না।তোমার হাতটা ধরেছিলাম সারাজীবন পাশে থাকার জন্য। আজ মাঝপথে এভাবে হারিয়ে গেলে আমি নিজেকে কখনোই ক্ষমা করতে পারব না। প্লিজ, আমাকে ছেড়ে যেও না"।
এথেরিয়নের কথা যেন কেউ বুঝে উঠতে পারলো না। সে কাকে উদ্দেশ্য করে বলছে এসব কথা? কে ছেড়ে যাবে তাকে। আর এইদিকে লেনি এসব দেখে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেনা। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা যে এথেরিয়ন আনাস্তাসিয়াকে এভাবে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। সে কখনো এথেরিয়নকে এভাবে কান্না করতে দেখেনি। নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারোর জন্য চোখের জল ফেলতে দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মনের ভেতর অজানা ভয়েরা উঁকি দিচ্ছে, এথেরিয়নকে হারিয়ে ফেলার ভয়। মনের ভেতর একটা প্রশ্ন জাগলো তার - আদেয় কি এথেরিয়ন তার ছিল? হয়তো না, কারণ সে কখনো নিজের অনুভূতি গুলোকে কারোর সামনে প্রকাশ্য হতে দেয়নি। আজ সে বুঝলো তার ভালোবাসা এক পাক্ষিক ছিল। এথেরিয়ন তাকে কখনো ভালোবাসেনি সে তো আনাস্তাসিয়াকে ভালোবাসতো। কিন্তু আনাস্তাসিয়া সে তো বিবাহিত তার তো স্বামী আছে আদ্রিয়ান এর সাথে তার বিয়ে হয়েছে। তাহলে এথেরিয়নের কি হবে আনাস্তাসিয়া তো তাকে ভালোবাসে না। মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকলো তার। এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো নিজের অজান্তেই। মনের ভেতর পাথর চাপা যন্ত্রণা নিয়ে তাকিয়ে থাকলো সামনের দিকে।
এদিকে এথেরিয়ন আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরায় আদ্রিয়ান এর প্রচন্ড রাগ হলো। রাগে পুরো শরীর রিরি করে উঠলো। সে রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেই তার হাতের রগ গুলো ফুলে ফেঁপে উঠল। সে আর সয্য করতে না পেরে সামনে এগিয়ে গিয়ে এথেরিয়নকে আনাস্তাসিয়ার থেকে টেনে সরিয়ে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিয়ে রাগে চিৎকার করে বলে,
__" "হাউ ডেয়ার ইউ টাচ মাই ওয়াইফ?"
আকংশিক ধাক্কা এথেরিয়ন কিছুটা দূরে সরে যায়। অতঃপর আদ্রিয়ান এর কথা কর্নগোচন হতেই থমকে গেল সে। 'ওয়াইফ' শব্দ টা যেন তার ভেতর আরো বড় ঝড় তুলে দিলো। তার ভালোবাসার মানুষ এখন কারোর হয়ে গেছে। যাকে সে নিজের নামে লিখে নিতে চেয়েছিল আমূত্যু অব্দি সে এখন অন্যকারো নামে লিখিত। তার প্রিয়শী এখন অন্য কারোর ওয়াইফ সে আর তার কোন দিন হবেনা। এথেরিয়ন এর ভাবনার মাঝে আনাস্তাসিয়া রাগি কন্ঠে বলে,
__""হোয়াই আর ইউ বিহেভিং লাইক দিস, আদ্রিয়ান?"
আদ্রিয়ান তার কথায় পাত্তা না দিয়ে পুনরায় বলে,
__" লুক, তুই আমার ওয়াইফ এর ফ্রেন্ড বলে তোকে আজ ছেড়ে দিচ্ছি, নেক্সট টাইম আমার ওয়াইফ এর থেকে দূরে থাকবি, নয়তো আমি কি করবো তা আমি নিজেও জানি না"।
__" সেট আপ আদ্রিয়ান, এবার বল এথেরিয়ন তোর কি হয়েছে এমন করছিস কেন তুই "।
প্রথম কথাটা আনাস্তাসিয়া আদ্রিয়ানকে উদ্দেশ্য করে জোরে চেঁচিয়ে বললেও শেষের কথা এথেরিয়নের দিকে তাকিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে শান্ত কন্ঠে বলে।
এথেরিয়ন আদ্রিয়ান এর আনাস্তাসিয়াকে নিজের ওয়াইফ বলে দাবি করা আর তার প্রতি অধিকার দেখানোটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। মনের ভেতরে কষ্ট গুলো যেন আর দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। তাই সে আর এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে আরোর কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেল এখান থেকে। এথেরিয়ন এর চলে যেতেই, লেনি আর এক মুহূর্ত ও এখানে থাকলো না, সে ছলছল করা অশ্রু চোখ মুছতে মুছতে এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে, দরজা আটকে দিয়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বালিশে মুখ গুজে কাঁদতে লাগলো। তার মানে এখন কষ্টের ঝড় চলছে। আদ্রিয়ান আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তার ফোন বেজে উঠল। সে বিরক্তি নিয়ে ফোন রিসিভ করতেই থমকে গেল, অতঃপর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আনাস্তাসিয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে বাহিরে যাওয়ার দিকে পা বাড়াল। কিছু দূর যাওয়ার পর পুনরায় ঘার ঘুরিয়ে একবার আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে চলে যায় নিজ গন্তব্যে। আনাস্তাসিয়া আর আমান আবাক হয়ে শুধু দাঁড়িয়ে রইল। এই কিছু মুহূর্তের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেল তাঁরা দু'জনের কেউই বুঝতে পারলো না।
_____________>>>>>>>>>>>_____________
পুরো রুম জুড়ে অন্ধকার ছেয়ে আছে, শুধু বেডের পাশে ছোট একটি টেবিল লাইট জ্বলছে। সেই আলোতেই রুমে ভেতর হালকা হালকা আলো ছড়িয়ে আছে। রুমের ভেতর কারো কোন শব্দ নেই শুধু কারোর ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রুমের ভেতর হালকা শীতল হাওয়া বইছে যার দরুন রুমে আবহাওয়া ভারি হয়ে আছে। রুমের ভেতর জ্বলন্ত টেবিল লাইটের হালকা আলো বিছানায় পরছে । সেই আলোতেই দেখা গেল যে লেনি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ গুজে ফুঁপাচ্ছে। তার মনের ভেতর পাহাড় সমান কষ্ট চেপে রেখেছে সে। তার বুকের ভেতর প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে, কেনই বা হবে না নিজের ভালোবাসার মানুষ যখন তাকে না ভালোবেসেছি অন্যকে ভালো বাসে তখন যে যন্ত্রনা হয় তা বলে বুঝানো যায় না। যাকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসলো সেই তাকে ভালোবাসে না। নিজের ভালোবাসার মানুষকে যখন অন্য কারোর জন্য কষ্ট পেতে দেখলো তখন যেন এক মুহূর্তের জন্য তার দুনিয়া থমকে গেছিল।এথেরিয়নকে যখন আনাস্তাসিয়ার জন্য কষ্ট পেতে দেখছিল তখন তার ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠছিল। পৃথিবীর জঘন্যতম অনুভূতি এটা যে নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারোর জন্য কষ্ট পেতে দেখা। লেনির মনে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিল সে নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করলো- আমার ভালোবাসায় টি কোন কমতি ছিল, যে সে আমাকে ভালোবাসল না।এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে জানা নেই। অতঃপর সে কান্না জড়িত কন্ঠে এথেরিয়নের উদ্দেশ্য করে বললো,
__কখনো কি ভেবেছিলাম, আমার সবটুকু ভালোবাসা আর বিশ্বাসের বিনিময়ে তুমি আমাকে এতটা শূন্যতা উপহার দেবে? আমার চেয়েও অন্য কাউকে তোমার বেশি আপন মনে হলো, অথচ আমি চেয়েছিলাম তোমার সুখের একমাত্র কারণ হতে।""আমার অনুভূতিগুলোকে এত সহজে অবহেলা কী করে করলে? যদি অন্য কাউকেই ভালোবাসতে হবে, তবে কেন আমার জীবনে এতটা জায়গা দখল করেছিলে? তোমার এই 'অন্য কারও' হয়ে যাওয়াটা মেনে নেওয়া আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন শাস্তি।""তুমি হয়তো ভুলে গেছ আমাদের কাটানো সুন্দর মুহূর্তগুলো, কিন্তু আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে এখনো শুধু তোমারই স্মৃতি। এত ভালোবাসার পরও কেন তুমি আমার হলে না, এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনোই পাব না।"
যার সুখের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিলাম, সেই সুখের ঠিকানায় কেন আমার কোনো জায়গা হলো না?""বিধাতা যদি আমাদের ভাগ্যেই দূরত্ব লিখে রেখেছিলেন, তবে কেন এত গভীর ভালোবাসা দিয়ে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন?ৎআমার সবটুকু ভালোবাসা, সব যত্ন কি তবে এতটাই কম ছিল যে, এত সহজে তুমি আমাকে ছেড়ে অন্য কারো হয়ে গেলে?""আজও শূন্য ঘরে তোমার ছায়া খুঁজি। এত স্মৃতি রেখে গেলে, অথচ শুধু তুমিই আমার হলে না!""আমার গল্পের প্রতিটি পাতায় তুমি আছো, কিন্তু তোমার গল্পের কোথাও আমি নেই—এই সত্যিটা মেনে নেওয়া আমার জন্য সবচেয়ে বড় কষ্ট।হয়তো আমার ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি ছিল, না হয় তোমার চাওয়ায় আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।"
অতঃপর সৃষ্টি কর্তার উদ্দেশ্যে বলে,
__"হে খোদা,আমি যাকে চেয়েছিলাম তাকে পেলাম না, আর সেও তার ভালোবাসার মানুষকে পেল না। কেন এমন নির্মম খেলা তোমার? তবে কি এটাই আমাদের নিয়তি ছিল?এই না পাওয়ার বেদনায় আজ আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। কিন্তু আমি জানি, তোমার কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই এর আড়ালে লুকিয়ে আছে। আমাদের এই অপূর্ণতা হয়তো আমাদের জন্য আরও বড় কোনো রহমত বা পরীক্ষা। তুমি ছাড়া তো আমাদের আর কোনো আশ্রয় নেই, প্রভু!তোমার কাছেই আমার প্রার্থনা—আমাকে এই গভীর শূন্যতা ও কষ্ট সহ্য করার মতো ধৈর্য ও শক্তি দাও।আমার মনের সব হাহাকার দূর করে আমাকে শান্তিতে পূর্ণ করে দাও।সে যাকে ভালোবাসে, তাকে না পেলেও যেন তুমি তাকে জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ভালো রাখো, তাকে সুখ ও শান্তি দান করো।
এসব বলতে বলতে আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। এভাবে অনেক খোন কান্না করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে সে।কখনো কখনো আমাদের জীবনে এমন কিছু ঘটে, যার তাৎক্ষণিক অর্থ আমরা বুঝতে পারি না। হয়তো এর পেছনে সৃষ্টিকর্তার কোনো উত্তম পরিকল্পনা রয়েছে, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কল্যাণকর। পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, "তোমরা যা পছন্দ করো না, হতে পারে তাতেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২১৬)। হয়তো আপনার এবং তার জন্য এর চেয়েও সুন্দর কোনো ভাগ্য অপেক্ষা করছে।
_____________>>>>>>>>>>>_____________
রাত ৮:৩৫ মিনিট আদ্রিয়ান বেড রুমের কাউচের উপর বসে অফিসে কাজ করছে। নতুন একটা প্রজেক্ট এসেছে সেটারি বিষয় নিয়ে প্রচুর ব্যাস্ত সে। তার উপর দুপুরের ওই ঘটনার জন্য তার মেজাজ আজ সারাদিন বিগরে ছিল। সে গম্ভীর মুখে মনোযোগ দিয়ে তার কাছে ব্যাস্ত। তার এই ব্যাস্ত তার মাঝে হঠাৎ করে কেউ একজন তার সামনে কিছু কাগজ ধপ করে রেখে দিল। সে বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে সামনে তাকাতেই দেখলো আনাস্তাসিয়া তার সামনে চেয়ার টেনে এনে আরাম করে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়লো। আদ্রিয়ান তার দিকে তাকাতেই চোখের ইশারায় কাগজ গুলো চেক করতে বললো। আদ্রিয়ান বিনা বাক্যে কাগজ গুলো হাতে নিয়ে চেক করতেই অবাক হয়ে গেল। সে এক ভ্রু কুঁচকে আনাস্তাসিয়াকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করে,
__" এসব কি"?
__" কেন তুমি কি অন্ধ দেখতে পারছো না"?
আদ্রিয়ান মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
__" দেখতে তো পাচ্ছি, কিন্তু এর মানে কি"?
__" মানে টানে কিচ্ছু না, কাগজে স্পষ্ট ভাবে লেখা আছে আজ এবং এখন থেকে তুমি পুরোপুরি আমার। তোমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস মরা বাঁচা সব কিছু এখন থেকে আমার অধিকারে। আমি না চাইলে তুমি আমার থেকে কোন দিন ও মুক্তি পাবে না। আমি বিনা অন্য কোন নারীর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবেনা। যদি তাকাও তো ওই চোখ দুটো আমি নিজের হাতে উপড়ে ফেলবো। আমি ছাড়া তুমি কোন নারীর আসে পাসে ও ঘেঁসতে পারবে না। যদি ঘেঁষ তাহলে সেদিন তোমার পৃথিবীতে শেষ দিন হবে। তোমার মন মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু আমার বসবাস থাকবে আর অন্য কারোর না। তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না, ছেড়ে যাওয়া তো দূর ছেড়ে যাওয়ার কথা ও ভাবতে পারবে না। যদি কখনো ছেড়ে যাও তাহলে তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার হাতে তোমার প্রাণ সঁপে দিবা। তুমি কখনো আমার অবাধ্য হবেনা, আমি তোমাকে ভালো না বাসলেও তুমি আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসবে। একদম তেলাপোকার মতো, আমি তোমাকে যতই জুতো মেরে তাঁরাই না কেন তুমি উড়ে এসে আমার গায়েই বসবে"।
একটু থেমে আবার বলল,
__" আর শুনো আমি কিন্তু তোমাকে ভালো টালো বাসি না ওকে, তাই তাড়াতাড়ি কাগজে সাইন করে দেও আমার হাতে সময় নেই "।
আদ্রিয়ান শুধু তার দিকে তার কথা গুলো শুনে বাঁকা হাসলো। সে বেশ বুঝতে পেরেছে তার বউ ও তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। শুধু মুখে শিকার করছে না। তাই সে বিনা সাইন করে দিয়ে তার দিকে কাগজ গুলো বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে,
__" তাই ম্যাডাম আপনি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন না"।
__" না"।
__" একটুও না"।
__" হুম, আর শোন ছেলে তোমার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। একদম পছন্দ না তুমি আমার। কিন্তু আমার অবাধ্য মন তুমি তুমি। তাই তাকে তুমিই রাখো আমার চাইনা এই অবাধ্য মন। আর না চাই তোমাকে"।
কথা গুলো যে ধাঁচে বললো সে ধাঁচেই গটগট করে চলে গেল আনাস্তাসিয়া। অর্ধেক রাস্তায় যাওয়ার পর মনে পরলো এই ছেলেকে দিয়ে বিশ্বাস নেই তাকে ছেড়ে যেতে বারণ করা সত্তেও যদি ছেড়ে যায়। তাই যে ধাঁচে এসেছিল সে ধাঁচেই সঙ্গে সঙ্গে আবার বিরক্তি নিয়ে উপস্থিত হলো আদ্রিয়ান এর সামনে। এবার দ্বিগুন বিরক্তি নিয়ে তিরস্কার কন্ঠে বলে,
__"উফ! তোমাকে বললাম না সত্যি সত্যি আমার ইন্টারেস্ট নেই তোমার প্রতি। কোন ভালো টালো বাসিনা না তোমাকে আমি। তারপরও কথা শুনো না। সেই আবার আমাকে নিয়ে আসলে। শুনো ছেলে! তুমি আমার এক নাম্বারের অপছন্দের তালিকায় আছো। তাই তোমাকেও দেখবো না আমি আর। কিন্তু সমস্যা একটাই ! শুধু তোমাকে ছাড়া আমি নিঃশ্বাসটা নিতে পারি না। আমার সুস্থ নিঃশ্বাসের প্রয়োজন তাই তোমার এখান থেকে কোথাও যাওযা ক্যান্সেল। যদি আমার অবাধ্য হও তাহলে মাথায় তুলে এক আছাড় দিব।
কথাগুলো বলে পুনরায় চলে যেতে নিলে হঠাৎ করে তার ফোন বেজে উঠে। রিসিভ করে ওপাশ থেকে যা শুনলো তাতে সে চমকে গেল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল আতঙ্কে, কয়েকটা শুকনো ঢোঁক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় আসছি বলে ফোন কেটে দিল। আনাস্তাসিয়া ফোন কাটতেই আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
__" কি হয়েছে"?
__" এথেরিয়ন কার এক্সিডেন্ট করেছে এখন
হাসপাতালে ভর্তি আমাদের এখনি যেতে হবে"।
__" দাঁড়াও আমি ও যাব"।
বলেই উঠে দাঁড়িয়ে ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে আসলো। অতঃপর দুজনে একসাথে বেরিয়ে পরলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
______________>>>>>>>>>>>>___________
বটকিন হাসপাতাল (S.P. Botkin Clinical Hospital): এটি মস্কোর অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। প্রায় ২০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই হাসপাতালটি ক্যান্সার সার্জারি, নিউরোসার্জারি এবং রোবোটিক সার্জারিতে তাদের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য সেরা ক্লিনিক হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত। বটকিন হাসপাতালে নিচ তলা থেকে শুরু করে পনের তলা অব্দি মানুষের হাহাকার কারো খুশিতে কান্নার শব্দ, মানুষের কোলাহল শুনা যাচ্ছে। কেউ কেউ বা অপারেটিং থিয়েটারের সামনের বেঞ্চে বসে আপন জনকে ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করছে তো কেউ জীবন্ত লাশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সকল বিষয়কে উপেক্ষা করে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে এগিয়ে চলেছে চার জন মানব মানবী। তাদের কারোর চোখে মুখে চিন্তার ছাপ তো কারোর কাওকে হারানোর ভয় তো কে স্বাভাবিক ও গম্ভীর। করিডোরে দিয়ে এগিয়ে এসে VIP কেবিনের সামনে এসে থামলো আনাস্তাসিয়া লেনি আদ্রিয়ান আর আমান। তাঁরা এসে VIP রুমের দরজার কাছে এসে দাড়াতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একজন মাঝবয়সী ডাক্তার। সে বেরিয়ে এসে আনাস্তাসিয়া দের দেখে স্বাভাবিক ভাবে রাশিয়ান ভাষায় জিজ্ঞেস করে,
__"Кто вы?( আপনারা কারা)
__"Семья пациента"। (রোগীর পরিবার)
তখনি লেনি অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
__"How is Aetherion now, Doctor?"
লেনির প্রশ্নে ডক্টর তার দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে জবাব দেয়,
__""He is fine now. You can take him home with you if you want. Although he was driving under the influence, fortunately he wasn't involved in any major accident. He also didn't suffer any severe injuries; he only has a head wound and some broken bones in his arms and legs. That's why he had been unconscious for so long. He regained consciousness a little while ago. If you want, you can meet the patient now."
ডাক্তার এর কথা শুনে সকলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। ডক্টর এর কথা শেষ হতে না হতেই লেনি হুরমুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে এথেরিয়নকে দেখেই থমকে যায়। তার মাথায় আর দুই পায়ে ব্যান্ডেজ করা। শরীরে জায়গায় জায়গায় রক্তের দাগ লেগে আছে। তা দেখে লেনি ব্যাথা তুলব নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এথেরিয়ন লেনিকে দেখে খুব ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
__" লেনি তুমি এখানে"?
__" শুধু লেনি নয় আমরাও এসেছি"।
আমান এর কথা শুনতেই এথেরিয়ন চমকে মাথা তুলে সামনে তাকালো। সামনে তাকাতেই দেখল আমান আনাস্তাসিয়া আদ্রিয়ান এক সাথে তার কেবিনে প্রবেশ করল। আনাস্তাসিয়া আর আদ্রিয়ানকে এক সাথে দেখে তার বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্ট পুনরায় জাগ্রত হলো। তাই সে সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে সামনে তাকিয়ে রইল।সে তাদের একসাথে সহ্য করতে পারছে না, সে চায়না তাঁদেরকে নিজের কষ্ট দেখাতে। এথেরিয়ন মুখ ঘুরিয়ে নিতেই আনাস্তাসিয়া রাগি কন্ঠে বলল,
__" আর ইউ ক্রেজি এথেরিয়ন? তুই কি জানিস আজ তোর কত বড় ক্ষতি হতে পারতো, তুই আজ মরেও যেতে পারতিস, ড্রিংক করে কেউ ডাইভ করে, কত বড় একটা এক্সিডেন্ট হতো পারত তোর, আজ তুই প্রাণ নিয়ে নাও ফিরতে পারতিস"।
আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে এথেরিয়ন মনে মনে বললো, আমি তো মরতেই চাই এই যন্ত্রনা যে আর সহ্য করতে পারছি না, মরে গেলেই বোধহয় ভালো হতো নিজের চোখের সামনে এভাবে তোর সাথে অন্য কাওকে দেখতে হতো না।এথেরিয়নকে কোন কথা বলতে না দেখে আমান এবার রেগে গেল।
__" এই তো কি হয়েছে বলতো, তুই আমাদের সাথে কোন কথা বলছিস না কেন, দুপুর থেকে দেখছি তোকে এজ অন্য রকম লাগছে, কি হয়ে তোর বলবি আমাদের"।
__" ওর যাই হয়ে থাকুক বাসায় গিয়ে সব শুনব এখন ও আমাদের সাথে বাসায় যাবে, আদ্রিয়ান হসপিটালের সকল ফর্মালিটিজ পুরোন করে ওর ডিসচার্জ করিয়ে আনো"।
আনাস্তাসিয়া শেষের কথাটি আদ্রিয়ান এর উদ্দেশ্য করে বলতেই সে কোন বাক্য ব্যায় না করে বেরিয়ে যায়। আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে এথেরিয়ন চমকে উঠে তার দিকে তাকিয়ে নাকোচ করে বলে,
__" না আমি তোদের সাথে যাব না, আমি আমার বাসায় যাব, তোদের আমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করতে হবে না"।
__" আমি এক কথা দ্বিতীয় বার বলতে পছন্দ করি না এথেরিয়ন, যখন বলেছি তুই আমাদের সাথে যাবি মানে যাবি, তোর আর একটা কথাও আমরা শুনবো না"।
অতঃপর আমান এর দিকে তাকিয়ে বলে,
__" আমান ওকে নিয়ে আসো আমি নিচে যাচ্ছি"।
বলেই আর এক মুহূর্ত ও না দাঁড়িয়ে চলে গেল। এথেরিয়ন ও আর কিছু বলতে পারলো না। সে চুপ চাপ শুধু বসে রইল। আমান আর লেনি তাকে ধরে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিল। অতঃপর তাকে নিয়ে বেরিয়ে পরলো হাসপাতাল থেকে। আদ্রিয়ান ও হাসপাতালের সকল ফর্মালিটিজ পুরোন করে গাড়ির সামনে আসতেই দেখতে পেল আমান আর লেনি এথেরিয়নকে ধরে গাড়িতে বসালো। এসব দেখে সে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। সকলে বসে পরতেই গাড়ি চললো নিজ গন্তব্যে উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ এর মধ্যে বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই সকলে নেমে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। ভেতরে আসতেই আনাস্তাসিয়া এথেরিয়নের সব দায়িত্ব লেনির কাঁধে দিয়ে দিলো। লেনি শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে এথেরিয়নকে তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে নিয়ে গেল আমান আর লেনি। দুজনে তাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে তার গায়ে ব্লেংকেট জড়িয়ে দিয়ে লাইট অফ করে বেরিয়ে গেল। এথেরিয়ন ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পরলো।
______________>>>>>>>>>>>____________
সকালে সূর্য ধরণীতে পরতেই চারিদিকে আলোকিতো হয়ে পরলো। সেই আলো জানালার ফাঁক দিয়ে পর্দা ভেদ করে এসে পরলো আনাস্তাসিয়ার মুখে। সে বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। অসয্য ও বিরক্তিতে পাশ ঘুরতে চাইলো কিন্তু পারলো না। তার পুরো শরীর ব্যথায় চিনচিন করছে। তার পুরো শরীর ভারী হয়ে আছে, মনে হচ্ছে শরীরের ওপর ভারী কোনো পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে কেউ। সে এবার পুনরায় ঘুরতে চাইলো কিন্তু কিছু একটা বাঁধা দিচ্ছে তাকে। তাই সে প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে পিটপিট করে চোখ খুললো। চোখ খুলে নিজের দিকে তাকাতেই দেখল আদ্রিয়ান তাকে উপর উঠে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে মুখ গুজে ঘুমিয়ে আছে। এসব দেখে হঠাৎ কি মনে করে সে মুচকি হাসলো। আলতো করে তার হাত আদ্রিয়ান এর চুলে বুলিয়ে দিল। আদ্রিয়ান ঘুমের মাঝে নরেচরে উঠে তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আনাস্তাসিয়া কিছু ক্ষণ এভাবেই থেকে অতঃপর আদ্রিয়ানকে ডাকতে লাগলো। আনাস্তাসিয়ার ডাকে আদ্রিয়ান নরেচরছ উঠে ওভাবে থেকেই ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে,
__" উহু বউ আরেকটু এভাবে থাকতে দাও, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে"।
__" তুমি ঘুমাও কিন্তু আমাকে উঠতে দাও আমার অফিসে যেতে হবে লেট হয়ে যাচ্ছে"।
আদ্রিয়ান এবার পিটপিট করে চোখ খুলে মাথা তুলে একবার আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে টুপ করে তার গায়ে একটা শব্দ করে চুমু খেয়ে একি ভঙ্গিতে বলে,
__" আরেকটু এভাবে থাকি না বৌ"।
আনাস্তাসিয়া এবার ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলে,
__" এই শরো তো আমার উপর থেকে, কি ভারী শরীর তোমার আমার পুরো শরীর ব্যথায় চিনচিন করছে"।
__" লোড নিতে শেখ বউ ভবিষ্যতে কাজে লাগবে"।
বলেই উঠে আনাস্তাসিয়ার শরীরের উপর থেকে উঠে তার পাশে বসলো। আদ্রিয়ান সরতেই আনাস্তাসিয়া উঠে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। কিছু ক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে একে বারে অফিসের জন্য রেডি হয়ে বের হয়ে এসে আদ্রিয়ান এর দিকে তাকিয়ে বলে,
__" আমি দুই দিন বাসায় আসবো না"।
কথাটি শুনে আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
__" কেন? কোথায় যাবে তুমি"।
__" ইন্টারনেট একটি মিশন আছে তাই দেশের বাহিরে যাচ্ছি"।
বলেই আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে গেল সে। আনাস্তাসিয়া যেতেই আদ্রিয়ান ও অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হতে চলে গেল।
_____________>>>>>>>>>>>>____________
আজ কিছু দিন ধরে পুরো আহমেদ ভবনের ফাঁকা পরে আছে। দুই দিনের বদলে আজ বেশ কিছু দিন ধরে আনাস্তাসিয়া দেশের বাহিরে।ফাঁকা বলতে কিছু দিন ধরে না আমান আছে ভবনে আর না আনাস্তাসিয়া, আদ্রিয়ান ও নেই। শুধু ফাঁকা ভবনটিতে আছে গার্ড ও লেনি আর এথেরিয়ন। মূলত এথেরিয়নের দেখভাল করার জন্যই তার থাকা, নয়তো সে ও থাকতো না। অন্ধকার করিডোর দিয়ে হেঁটে চলেছে লেনি। মূলত সে এখন ছাদের দিকে যাচ্ছে একা কিছুটা সময় কাটাতে। এই কিছু দিনের মধ্যে এথেরিয়ন ও বেশ সুস্থ হয়ে গেছে। সে এখন নিজেরাই হাঁটাচলা করতে পারে। তাই তার এখন আর কোন কাজ নেই। মনের ভেতর চাপা দীর্ঘশ্বাস দূর করতে সে এই মুহূর্তে ছাদে যাচ্ছে। ছাদের সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই ভেসে এলো কিছু মুগ্ধ করা শুর। সে ভ্রু কুঁচকে সেই শব্দ অনুসরণ করে ছাদে উঠতেই থমকে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল। সেখানে এথেরিয়ন গিটার হাতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে গান গাইছে। তার মনের ভেতরের সকল বেথা গানের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। তাই লেনি সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে তার গান শুনতে লাগলো। অনুভব করতে লাগলো তার ভেতরের যন্ত্রণা নিজের মধ্যে। এথেরিয়ন পুনরায় গানের শুর তুললো গিটারের টুংটাং শব্দ করে। অতঃপর গলা ছেড়ে গান ধরল,
__"কি কর গয়া অ্যায় মেরে নাল,
কিট্টা অ্যায় মেরা বুরা হাল... (২)
হোও... ওওও... হোও...
তু মেরা থা, কিউ না রাহা?
ইয়া তো কার দে মুঝকো রিহা
ইয়া तुझको আতা হি নেহি হ্যায় করনা পেয়ার
হাঁ করনা পেয়ার... (২)
কি কর গয়া অ্যায় মেরে নাল,
কিট্টা অ্যায় মেরা বুরা হাল...
তু মেরি ইয়াদান লেজা,
মেরে সাহারে লেজা
জিন্নো মেঁ দার্দ সেহ লয়ে
এক পল লয়ী তু ভি সেহ জা... (২)
কি কর গয়া অ্যায় মেরে নাল,
কিট্টা অ্যায় মেরা বুরা হাল...
তু মেরা থা, কিউ না রাহা?
ইয়া তো কার দে মুঝকো রিহা
ইয়া तुझको আতা হি নেহি হ্যায় করনা পেয়ার
হাঁ করনা পেয়ার... (২)
কিছুক্ষণ থেকে পুনরায় নতুন গান ধরে।
__"তোর লাগিয়া এই জীবনে
কত যে সয়েছি,
তুই কেন আমার হইলি না
রে বন্ধু, তুই কেন আমার হইলি না।
আমার যত ভালোবাসা
ফিরায়ে দিলি তুই,
আমার চোখের জলেতে আজ
ভাসাইলি তুই।
সুখের আশায় বুক বাঁধিয়া
রেখেছিলাম কত আশা,
সবকিছু আজ ভেঙে চুরমার
মিথ্যা তোর ভালোবাসা।
তোর লাগিয়া এই জীবনে
কত যে সয়েছি,
তুই কেন আমার হইলি না
রে বন্ধু, তুই কেন আমার হইলি না।
মিথ্যে ছিল তোর সে হাসি
মিথ্যে অভিনয়,
আজ আমার এই বুকভাঙা কান্না
শুনবে না তো কেউ।
আমি এখন কার কাছে যাই
কার বুকে মাথা রাখি,
সব হারিয়ে নিঃস্ব আমি
ফুলের মতো ঝরা পাখি।
তোর লাগিয়া এই জীবনে
কত যে সয়েছি,
তুই কেন আমার হইলি না
রে বন্ধু, তুই কেন আমার হইলি না।
এথেরিনয় নিজের গান শেষ করতেই অনুভব হলো তার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে তাকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাই সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল লেনি দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। সে ভ্রু কুঁচকে বলে,
__" লেনি তুমি এই সময় এখানে"?
এথেরিনয় এর কথায় ধ্যান ভাঙ্গে তার সে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
__" হ্যাঁ একটু ছাদে হাওয়া খেতে এসেছিলাম"।
(চলবে....)