ফন্ট সাইজ:
থিম:
আনাস্তাসিয়া

৯ম পর্ব

লেখক: Samiya

#আনাস্তাসিয়া
#লেখিকা_সামিয়া
#পর্ব:৯

__" লেনি তুমি এই সময় এখানে"?

এথেরিনয় এর কথায় ধ্যান ভাঙ্গে তার সে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,

__" হ্যাঁ একটু ছাদে হাওয়া খেতে এসেছিলাম"।

__"ওও"।

বলতে বলতে লেনি এথেরিয়নের পাশে এসে দাঁড়ালো। লেনি আকাশ এর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে এথেরিয়নকে উদ্দেশ্য করে বলে,

__" আজকে আকাশের চাঁদটা বেশ সুন্দর লাগছে তাইনা"।

লেনির কথা শুনে এথেরিয়ন ও সে দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

__" হুম"।

অতঃপর দু'জনে নিরবে সেই দিকে তাকিয়ে থাকে। দুজনের মনের ভেতর লুকিয়ে আছে চাপা দীর্ঘশ্বাস। দুজনে মনি ভাঙ্গা তাদের, একজন নিজের ভালোবাসার মানুষকে পায়নি তো একজন জানতে পারে তার ভালোবাসার মানুষ তাকে নয় অন্য কাওকে ভালোবাসে। নিজের চোখের সামনে তাকে অন্যা কারোর জন্য কষ্ট পেতে দেখছে। তাদের কষ্ট পাওয়ার জন্য দোষটা কার? তাদের নাকি নিজেদের।তারা তো কেউ কারোর অনুভুতি একে অন্যের প্রতি প্রকাশ করেনি। তাহলে তাঁরা জানবে কিভাবে যে তাদের কেউ ভালোবাসে। তাদের দুজনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রিয় মানুষকে না বলা অনেক কথা। ভাঙ্গা গড়ার রাস্তায় তারা একি পথের পথিক। তাদের মধ্যে খুব বেশি কথার প্রয়োজন হয় না। তাদের একে অপরের চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছে তাদের ভেতরে কতটা কষ্ট জমে আছে। এই নীরব বোঝাপড়া তাদের এক অদ্ভুত মানসিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিচ্ছে। তারা নিজেকে নিরাপদ মনে করে কারণ তারা জানে, অপরজন তাদের বিচার করবে না বা উপহাস করবে না। এই পারস্পরিক সমবেদনা তাদের যন্ত্রণাকে লাঘব করতে সাহায্য করছে। দুজনের মনেই অতীত হারানোর একটি শূন্যতা কাজ করছে। তারা হয়তো নিজেদের পুরনো সুখস্মৃতি বা কষ্টগুলো নিজেরা মনে করছে, যা সাময়িকভাবে তাদের মন হালকা করতে থেরাপির মতো কাজ করে। দুজনের উপস্থিতিই থাকলেও তাদের মধ্যে একা থাকার অনুভূতিকে কাজ করছে। তারা অনুভব করে যে, এই পৃথিবীতে তারা একা। অনেক সময় এই দুই ভাঙ্গা মনের মিলন একে অপরের জন্য নতুন করে বাঁচার প্রেরণা হয়ে ওঠে পারে। তাদের এই চুপ থাকার মধ্যে লেনি হঠাৎ করে এথেরিয়ন এর উদ্দেশ্য করে বলে,

__" আপনি আনাস্তাসিয়া ম্যামকে ভালোবাসেন তাই না"।

লেনির কথা এথেরিয়ন চমকে তার দিকে ঘুরে তাকায়। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে বলে,

__" তোমাকে কে বললো"?

লেনি এবার মলিন হেসে বলে,

__" আমি কিন্তু তখন দেখেছি যখন আপনি আনাস্তাসিয়া ম্যামকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন তখন আপনার চোখে স্পষ্ট ভালোবাসা হারানোর ভয় ছিল"।

এথেরিয়ন এবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নরম স্বরে বলে,

__" তুমি যখন সব জেনেই গেছ তাই তোমাকে মিথ্যে বলবো না, হ্যাঁ আমি রেড মুনকে ভালোবাসি। একটা কথা কি জানো লেনি ছোট বেলার সে আমাকে বলেছিল যে আমি কি তাকে বড় হয়ে বিয়ে করবো, আমি ও তখন খুশি হয়ে হাসিমুখে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম আমি তাকে বড় হয়ে বিয়ে করবো। সবকিছু ঠিকি ছিল, আমরা বড় ও হলাম, আমি ভেবেছিলাম সে তার বাবা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার পর আমি তাকে আমার ভালোবাসার কথা বলবো। যে আমি তাকে কতটা ভালবাসি, তার পর আমাদের বিয়ে হবে ছোট একটা সংসার হবে।কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস সে আমার হবে বলেও আমার হলো না সে এখন অন্য কারোর নামে লিখিত, সে এখন অন্য কারোর ওয়াইফ"।

__" তার মানে আপনি বলতে চাইছেন ম্যাম আপনাকে ঠকিয়েছে"?

__" না একদমি না, হয়তো সব কিছু ঠিক থাকলে সে আজ আমার হতো। আমাদের কারোর জীবন এমন হতো না আরো সুন্দর হতো। কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনা সব উল্টোপাল্টা করে দিল। সেদিন যদি শত্রুরা আঙ্কেল আন্টিকে না মারতো তাহলে রেড মুন প্রতিশোধ এর আগুনে জ্বলতো না। সে এতোটা হিংস্র ও হতো না, আঙ্কেল আন্টিকে নিজের চোখে সামনে না মরতে দেখলে হয়তো সে মাসিক সমস্যায় ও ভুকতো না। আর না সে মাঝের কিছু স্মৃতি ভুলে যেত। আমি আর আমানি যানি আমরা কি ভাবে রেড মুনকে সুস্থ করেছি। এখন ও সে পুরো পুরি সুস্থ না তাই তার স্মৃতিতে আঙ্কেল আন্টি ছাড়া আমরা সবাই মুছে গেছি। সেদিন এর ঘটনার আগের সব স্মৃতি সে ভুলে গেছে শুধু আঙ্কেল আন্টির সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো ছাড়া। তাই এখানে তার কোন দোষ নেই"।

লেনি মনযোগ দিয়ে সব শুনে, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

__" আপনি এখনো ম্যাম কে ভালোবাসেন? কিন্তু ম্যামকে তো আপনি কখনো পাবেন না। সে এখন আদ্রিয়ান স্যার এর ওয়াইফ"।

এথেরিয়ন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,

__"যে পাওয়ার জন্য ভালোবাসে, সে আসলে কখনো কাউকে পুরোপুরি ভালোবাসতে পারে না। ভালোবাসা এমন হতে হয়, পাবনা জেনেও তাকে আমি ভালোবাসি। যদি পেয়ে যায় তবে সেটা আমার সৌভাগ্য, কিন্তু না পেলেও ক্ষতি নেই। তাকে পাবনা বলে, ভালোবাসবো না, এমনটা নয়। যদি এমন হয় তবে এখানে ভালোবাসার চেয়ে চাওয়া বেশি। স্বার্থ বেশি। কাওকে ভালোবাসলে নিজস্ব কোন শার্থ থাকতে নেই"।

__" আমি যদি বলি আপনি দ্বিতীয় বার কাওকে ভালোবাসেন তাহলে কি আমাকে আপনার মনে জায়গা দিবেন"।

এথেরিয়ন কথাটি শুনে প্রথমে চমকে গেল, অতঃপর আগের নেয় বললো,

__" ভালোবাসা প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হয়না, ভালোবাসা তো সেটাই যার পরে আর কাওকে ভালোবাসা যায় না। তাই বলছি মেয়ে আমাকে ভালোবাসে তুমি নিজের জীবন নষ্ট করোনা। সময় থাকতে ফিরে যাও, ভুলে যাও আমায়"।

__" ভুলে যাবো, ভুলে যাওয়া কি এতোটাই সহজ? তাহলে আপনি কেন ভুলতে পারছেন না তাকে? সে তো আর আপনার কাছে ফিরে আসবে না। আর আপনি আমাকে ভুলে যেতে বলছেন। যার প্রতি একবার ভালোবাসা সৃষ্টি হয় তার জন্য ভালোবাসা অনন্তকাল রয়ে যায়"।

অতঃপর একটু থেমে পুনরায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

__" জানেন আমি মানুষ চিনি না
আমি ভাবতাম, মানুষ চেনা খুব কঠিন কিছু নয়।
হাসি দেখলেই ভাবতাম, এই বুঝি আপন।
আস্তে আস্তে বুঝেছি-
চেহারা নয়, মনটাই ছিল মুখোশে ঢাকা।

যাদের ভালোবেসে বুকের ভেতর জায়গা দিয়েছি,
তারা একে একে শিখিয়ে দিয়েছে-
ভুল মানুষকে বেছে নেওয়াই যেন আমার অভ্যাস।

আজ নিজেকে প্রশ্ন করি- কতবার ভুল করেছি?
-কোনো উত্তর আসে না।
শুধু অভিমান জমে থাকে বুকের কোণে।

আর মাঝে মাঝে মন চায়, কেউ বলুক
“তোমার মতো মানুষকে
কখনোই ভুলভাবে নেওয়া যায় না।”

এতেরিয়নের তার কথা শুনে বুকের ভেতর অজানা এক ব্যাথা শুরু হলো। সেও তো অন্য কাওকে ভালোবাসে তাহলে এই মেয়েকে সে কি করে নিজের মনে জায়গা দিবেন। সে তার রেড মুনকে খুব ভালোবাসে তাকে কি করে ভুলে যাবে। সে এই মুহূর্তে লেনির অনুভূতি গুলো বুঝতে পারলেও তার কিছু করার নেই।

__" আমি আমার রেড মুন এর জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করবো"।

— আপনি কি জানেন,
অপেক্ষা কখন সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে?

— যখন বুঝতে পারি,
যার জন্য অপেক্ষা করছি
সে আর কখনো ফিরে আসবে না।

— তবু মানুষ অপেক্ষা করে কেন?

— কারণ হৃদয়
কখনো যুক্তির ভাষা বোঝে না।

— তাহলে কি সেই অপেক্ষার
কোনো শেষ নেই?

— হয়তো আছে...
কিন্তু তার আগেই
মানুষ সেই অপেক্ষাকেই
ভালোবাসতে শিখে ফেলে।

এথেরিয়ন আর কিছু বলতে পারলো না চুপ হয়ে গেল। তার আর বলার ভাষা নেই কি বলবে সে। সেও তো একি পরিস্থিতিতে পরে আছে। তাই সে আর কিছু বললো না, নিরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে করে যে, সে নিজেও অপরপক্ষের মনে কষ্ট দিচ্ছে, যা সে নিজে সদ্য পেয়ে এসেছে। সে মেয়েটির ভালোবাসার কোনো প্রতিদান দিতে না পারায় নিজেকে অপরাধী ভাবেছে। সে চাইলেও নিজেকে জোর করে কারও প্রেমে ফেলতে পারে না। এই বাস্তবতা তাকে চরম অসহায় করে তোলে, কারণ সে পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে পারে না। একদিকে সে মেয়েটির প্রতি সহানুভূতিশীল, অন্যদিকে নিজের অতীত বা বর্তমান যন্ত্রণার কারণে সে নতুন করে কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে প্রস্তুত নয়। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে। সে নিজে কষ্ট পাওয়ায়, মেয়েটির মনের অবস্থা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে। এই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিলে মেয়েটিও হয়তো তার মতোই কষ্ট পাবে—এই ভেবে তার নিজের ভেতর এক ধরণের নীরব কান্না কাজ করে। সে নিজেকে পরিস্থিতির জন্য দায়ী মনে করে সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায় এবং পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চায়। তাঁরা দীর্ঘ সময় নিরবে দাঁড়িয়ে রইল একে অপরের পাশে। তাদের এই নিরবতা ভেঙ্গে লেনি বলে,

__‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি এথেরিয়ন?’

__‘করো।’

__"আমরা মানুষকে ভালোবাসি কেন?’

__‘কষ্ট পাওয়ার জন্য।’

__‘আরে ধুর! ইয়ার্কি কইরেন না তো।’

__'আমরা ভালোবাসি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।’

__'তাহলে আমরা ভালোবেসেও ভালোবাসা পাই না কেন?’

__"সেটা আমারও প্রশ্ন!’

উত্তর না পেয়ে লেনি মন খারাপ হলো। এথেরিয়ন কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবারও বললো—

__'আমরা তাকে পাব না জেনেও অমর ভালোবাসি!’
লেনি কপাল ভাঁজ করে শুধালো—

__‘পাব না জেনেও কেন ভালোবাসি? এই অদ্ভুত সাহস আমাদের কেন হয়?’

__" এই প্রশ্নের উত্তর আমার ও জানা নেই"।

এথেরিয়ন কিছুক্ষণ চুপ থেকে এক পলক লেনির দিকে তাকিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। অনুভূতি শূন্য বকে ভারী কষ্ট চেপে দরজার দিকে পা বাড়ায়। এথেরিয়নকে যেতে দেখে লেনি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছে তাকিয়ে বলে,

__" পালিয়ে যাচ্ছেন"।

লেনির কথা শুনে এথেরিয়ন এর পা থমকে যায়। সে পিছনে না ঘুরে সামনে তাকিয়েই বলে,

__" যানি না, হয়তো হ্যাঁ আবার হয়তো বা না"।

লেনি তাচ্ছিল্যের একটি হাসি দিয়ে বলে,

__"সব গল্প পূর্ণতা পায় না—
কিছু গল্প অসমাপ্তই রয়ে যায়,
ঠিক যেন আমাদের কথাগুলো
ধুলো জমেছে স্মৃতির পাতায়।
যে হাতটা শক্ত করে ধরে চলার ছিল অঙ্গীকার,
সেই হাতটাই আজ আলগা হয়ে দূরে সরে গেছে বারবার।

হয়তো আমরা একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এখনও,
কিন্তু আমাদের পথগুলো আর মিশবে না কখনও।
অভিমানরা আজ জমাট বেঁধে পাথরের মতো ভারি,
তোমার শহর থেকে তাই আমার চিরতরের আড়ি।
বিচ্ছেদ মানেই কি তবে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া—
নাকি নতুন কোনো একলা পথে নিজেকে ফিরে পাওয়া।
ভালো থেকো তুমি তোমার নিজের সাজানো ভুবনে,
আমি না হয় বেঁচে থাকব তোমার না রাখা কোনো স্মরণে।

__" আমাদের গল্পটাও তাহলে অপূর্ণতারি থেকে যাক"।

বলেই এথেরিয়ন আর এক মুহূর্ত ও না দাঁড়িয়ে চলে গেল। যদি একটি বার সে পিছন ঘুরে দেখতো তাহলে বুঝতে পারতো লেনির মনের কষ্টটা। কিভাবে তাঁর দিকে ব্যথা তুলব দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার যাওয়ার দিকে। এথেরিয়ন চলে যেতেই লেনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। পুনরায় পেছনে ঘুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিরবে চোখের অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকলো। বুকে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে দাড়িয়ে রইল অন্ধকারের মাঝে সেখানে। কেউ তার কষ্ট দেখতে এতো না আর না কেউ তার কাঁধে হাত রেখে তাকে শান্তনা দিল।

____________>>>>>>>>>>>___________

রাশিয়ার মস্কো শহর থেকে বেশ দূরে সোচি নামক শহরটি অবস্থিত।কৃষ্ণসাগরের (Black Sea) তীরে অবস্থিত রাশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় অবকাশ যাপন কেন্দ্র। এখানে ককেশাস পর্বতমালার সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল এবং সমুদ্র সৈকত একই সাথে পাওয়া যায়। সোচি থেকে মস্কো শহরে পৌঁছাতে সময় লাগে আনুমানিক ১৯/২৪ ঘন্টা। সোচির বন জঙ্গলে ঘেরা নির্জন পাহাড়ি রাস্তায় সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো আর লাল রঙের কম্বিনেশনের ল্যাম্বরগিনি। তার পাশেই বিরক্তি মুখে কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে আনাস্তাসিয়া।উপরে হালকা ধূসর (Grey) রঙের ছোট জ্যাকেট/ব্লেজার স্টাইলের আউটার পরা আছে। তার পরনে ভেতরে সাদা রঙের ফিটেড টপ পরা যা নিচে সাদা রঙের হাই-ওয়েস্ট প্যান্ট এর সাথে ইন করা।কোমরে বাদামী (Brown) বেল্ট ব্যবহার করা হয়েছে, যার ধাতব বাকল রয়েছে।গলায় সিলভার চেইন নেকলেস।মুখে কালো রঙের মাস্ক আর সাদা স্নিকার্স পরা আছে। তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে চরম বিরক্তি। সে কালকেই দেশে ফিরেছে, দেশে ফিরে সোচি শহরে এসেছি একটি কাজে। কাজ শেষ করে মস্কো শহরে যাওয়ার জন্য বের হতেই মাঝরাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। তার উপর এখানে ফোনে সিগনাল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কাওকে ফোন করে বলতেও পারছেনা তার জন্য গাড়ি পাঠাতে। তার উপর চারপাশে মানুষের ছায়াও দেখা যাচ্ছে না যে কারোর কাছে সাহায্য চাইবে। তার উপর চারিপাশে বন জঙ্গলে ঘেরা উঁচু উঁচু পাহাড় আর পাহাড় পেরোলেই সমুদ্র। জঙ্গলের ভেতরে অনেক হিংস্র প্রাণী ও বিষাক্ত পোকামাকড় কাছে। চারিদিক থেকে হিংস্র প্রাণীর ডাক ও ভেসে আসছে। আর কয়েক ঘণ্টা পর হয়তো অন্ধকার ও নেমে আসবে। চারিদিক কেমন গা ছমছমে পরিবেশ যে কেউ এখানে একা হক বা অনেক মানুষের সাথে তবুও সে ভয় পেয়ে যাবে এমন পরিবেশ। কিন্তু আনাস্তাসিয়া সে ভয় পাওয়ার মেয়ে না তাই সে রাগে আর বিরক্তিতে গাড়ির দরজায় জোরে একটা লাথি মারলো। কিন্তু তাতেও তার রাগ কমলো না। সে নিজের হাতের ফোনটা নিয়ে উপরে তুলে এদিক ওদিক হেঁটে নেটওয়ার্ক পাচ্ছে কি না চেক করতে লাগলো। এভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার মধ্যে হঠাৎ কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায়। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে চোখ বন্ধ করে 'চ' উচ্চারণ করে। আচমকা ধাক্কা খাওয়ায় তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে একটি শক্তপোক্ত পুরুষালী হাত তার কোমড় জড়িয়ে ধরে। অতঃপর তাকে শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। আনাস্তাসিয়া কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর যখন বুঝলো সে পড়ে না গিয়ে শূন্যে ভেসে আছে, তখন কি হলো ব্যাপারটা বুঝার জন্য পিটপিট করে নিজের চোখ খুললো। চোখ খুলে সামনে থাকা ব্যাক্তিটিকে দেখে চমকে গেল। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না যে ব্যক্তিটি এখন এই মুহূর্তে এখানে থাকতে পারে। আনাস্তাসিয়া ব্যক্তিকির দিকে তাকাতেই সে ভ্রু নাচিয়ে মুচকি হাসলো। আনাস্তাসিয়া তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,

__" আদ্রিয়ান তুমি এখানে"।

আদ্রিয়ান দুষ্টু হেসে তাকে আরেকটু কাছে টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।

__" হ্যাঁ, আমার আদরের বউ টাকে কবে থেকে দেখিনা তাই বউয়ের টানে চলে আসলাম"।

__" তুমি কি করে জানলে আমি এখানে আছি"।

__" তোমার ভালোবাসা আমাকে এসে বললো, আদ্রিয়ান তুই এখানে কি করছিস তর বউ ওখানে একা দাঁড়িয়ে আছে তাই তো আমি চলে এলাম"।

আনাস্তাসিয়া এবার আদ্রিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্তি কন্ঠে বলে,

__" সিরিয়াস টাইমে মজা করা একদম ভালো লাগে না আমার আদ্রিয়ান"।

__" তাহলে কি ভালো লাগে রোমান্স করা"।

বলেই আদ্রিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ভ্রু নাচালো। আনাস্তাসিয়া রেগে আদ্রিয়ানকে ধমক দেয়।

__" আদ্রিয়ান...

আদ্রিয়ান এবার তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলে,

__" আহ্ ব্লাড রোজ এতো রাগ করছো কেন আগে শান্ত হও তারপর বলছি"।

একটু থেমে আবার বলে,

__" তোমার পেছনে আমি আমার লোক লাগিয়ে রেখেছি, তোমি কোথায় যাও কি করো কোথায় আছো কার সাথে আছো এমনকি কাল যে দেশে ফিরেছো সেই খবর ও তারাই দিয়েছে আমায়, তাই তো তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মাঝ রাস্তায় এসে জানতে পারলাম তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো, তাই এখানে চলে আসলাম"।

আনাস্তাসিয়া এবার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করে,

__" তাহলে তোমার কার কোথায় আমরা ফিরবো কি করে এখান থেকে"।

__" আছে ওই তো কিছু দূরে পার্ক করেছি যাতে তুমি বুঝতে না পারো আমি এসেছি। ভাবলাম তোমাকে পিছন থেকে গিয়ে একটু চমকে দেব তাই"।

__" ডিসগাস্টিংগ।

বিরক্তি নিয়ে কথাটি বলে নিজেকে আদ্রিয়ান এর থেকে ছাড়াতে চাইলে সে ছাড়লো না বরং আরো শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে।                   

__"জানো, এই জঙ্গল আর পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা থেমে গেছে।

আদ্রিয়ান এর কথা শুনে আনাস্তাসিয়া এবার বিরক্তি নিয়ে বলে,

__" পৃথিবী থামেনি, তুমি আবার নাটক শুরু করেছ।

__" নাটক না, সত্যি বলছি। এত সুন্দর দৃশ্যের মাঝেও আমার চোখ শুধু তোমাকেই খুঁজছে।

আনাস্তাসিয়া এবার শান্ত হয়ে আদ্রিয়ান এর তালে তাল মিলিয়ে বলে,

__" তাই নাকি? পাহাড়টা কিন্তু আমার চেয়ে অনেক সুন্দর।

__" পাহাড় সুন্দর হতে পারে, কিন্তু আমার হৃদয় চুরি করার ক্ষমতা শুধু তোমারই আছে।

আনাস্তাসিয়া এবার পিছন ঘুরে দুই হাত দিয়ে আদ্রিয়ান এর গলা জড়িয়ে ধরে মুচকি হেসে বলে,

__" বাহ! আজ তো দেখি ডায়লগের বন্যা বইছে।

আদ্রিয়ান দুষ্টু হেসে আনাস্তাসিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে বলে,

__" কী করব? এই ঠান্ডা হাওয়া আর তোমার হাসি দুটোই আমাকে রোমান্টিক বানিয়ে দেয়।

__" তাহলে একটা ছবি তুলি?

__" ছবি কেন? এই মুহূর্তটা তো আমি সারাজীবনের জন্য মনে রাখতে চাই।

__" আচ্ছা, এত ভালোবাসো?

__" এই পাহাড় যত উঁচু, তার চেয়েও বেশি। আর এই জঙ্গল যত গভীর, তার চেয়েও গভীর আমার ভালোবাসা।

কথাটি বলে আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ থেকে কিছু একটা ভেবে ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেসে আনাস্তাসিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

__" বউ তুমি চাইলে আমাদের অপূর্ণ রয়ে যাওয়া কাজটা কন্টিনিউ করতে পারি"।

আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে,

__" মানে"।

__"আমাদের বাসর তো এখনও properly হলো না... so, what if we officially declare this place as our temporary honeymoon spot?"

__"Really? জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে এমন proposal দিচ্ছ?"

__"Why not? চারপাশে nature, সামনে আমার beautiful wife... এর চেয়ে perfect setup আর কী হতে পারে?"

আনাস্তাসিয়া বিরক্তি নিয়ে আদ্রিয়ান মৃদু ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু তখনি একটি বিপত্তিকর ঘটনা ঘটে যায়। আদ্রিয়ান দুই কদম পিছনে গিয়ে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকাতেই দেখতে পায়, সে ঘাড় কাত করে ঠোঁটের কোণে শয়তানি বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে তীক্ষ চোখে এক হাত উঁচু করে তার পেছনে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি উঁচু করা হাতের দিকে যেতেই সে লক্ষ করলো আনাস্তাসিয়ার হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে বুলেট চেপে ধরে আছে। সে আনাস্তাসিয়ার দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে তাকাতেই দেখল অজস্র কালো গাড়ি থেকে নেমে আসসে অস্ত্র হাতে প্রফেশনাল কিলার, গার্ড, স্নাইপার। তাদের মধ্যে একজন যখন আনাস্তাসিয়াকে লক্ষ করে গুলি ছুড়েছিল তখনি সে নিজের হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে তীব্র গতিতে ছুটে আসা গুলিটি ধরে ফেলে। আদ্রিয়ান এর বুঝতে বাকি রইল না লোক গুলো তাদেরি মারতে এসেছে। তাই নিজের কোমরের পেছনে লুকিয়ে রাখা বন্দুকটি বের করে সতর্ক হয়ে দাঁড়ায়। আনাস্তাসিয়া ও তাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে হাতের গুলিটি ফেলে গাড়ির পেছনের ডিকি খুলে একটি লম্বা বাক্স থেকে চকচকে লম্বা একটি তলোয়ার বের করে। তলোয়ার হেন্ড্যালে কালোর মাঝে লাল ডায়মন্ড দিয়ে ডিজাইন করা। সূর্যের আলো ধাতব অংশে পরতেই চকচক করে উঠে বুঝালো তা কতটা ধারালো। আনাস্তাসিয়া তলোয়ারটি হাতে নিয়ে একবার ঘুরিয়ে তাদের দিকে ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো। আনাস্তাসিয়া তলোয়ারটি ঘুরাতেই হাওয়ার মাঝে সাঁই সাঁই করে উঠলো। মনে হলো তলোয়ার দিয়েই বাতাস কেটে ফেলছে। আনাস্তাসিয়া আর আদ্রিয়ান তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে আর চোখে একবার চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে নিল। তাঁদেরকে ইতিমধ্যেই চারিদিক থেকে শত্রুপক্ষ ঘিরে ফেলেছে। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই শত্রুপক্ষ তাদের কাছে চলে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে একজন বলে,

__"Well, well... look who we have here. শহরজুড়ে তোমাদের খুঁজলাম, আর আজ তোমরাই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালে।"

আদ্রিয়ান বাঁকা হেসে বলে,

__"No need to search anymore. আমরা নিজেরাই এসেছি, because we're done running from shadows."

শত্রুপক্ষের লিডার আনাস্তাসিয়ার উদ্দেশ্য করে বলে,

__" The boss is very disappointed. আর তুমি জানো, তিনি disappointment tolerate করেন না।"

__"Then maybe it's time your boss learns that fear doesn't control everyone. আর আনাস্তাসিয়া কখনো কাওকে ভয় পায় না ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড"।

__"Run if you want, hide if you can... but sooner or later, we always find our targets."

আদ্রিয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,

__"We don't run. We don't hide. We stand and fight."

__" তোমাদের মৃত্যু আজ আমাদের হাতেই হবে ফাকিং গার্ল"।

বলেই তারা আক্রমণ শুরু করলো। আনাস্তাসিয়া আর আদ্রিয়ান তাদের আক্রমনৎ এর প্রতিরোধ করতে লাগলো। মূহুর্তে পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তাটি মৃত্যু পীড়িত পরিনত হলো। আনাস্তাসিয়া তলোয়ার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক আঘাতে শত্রুপক্ষের লোকদের দুই আলাদা করে দিচ্ছে। আর আদ্রিয়ান তার হাতের বন্দুক দিয়ে শত্রু পক্ষের বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে তো মাথায় গুলি করে একেবারে শেষ করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে তারা হাত পা ব্যাবহার করেও তাদের মারছে। পুরো রাস্তায় রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। ইট পাথরের রাস্তা রক্তে পুরো লাল হয়ে গেছে। লড়াই করার মাঝে আদ্রিয়ান আর আনাস্তাসিয়া বেশ আহত ও হয়েছে। শরীরে জায়গায় জায়গায় তাদের ক্ষত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু তাঁরা তাতে পাত্তা দিল না সমান তালে লড়ে গেল। ইতিমধ্যেই তাদের পরনের পোশাক রক্তের কারনে লাল হয়ে গেছে। আদ্রিয়ান এর পরনে ছিল কালো ফর্মাল প্যান্ট আর সাদা শার্ট তাও লাল রং ধারণ করেছে। এভাবে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর এক পর্যায়ে তারা হাঁপিয়ে গেল। আনাস্তাসিয়া যখন লড়াই করছিল তখন একজন লোক পেছন থেকে আঘাত করতে আসলে, আদ্রিয়ান তার বাহু ধরে টান দিয়ে নিজের কাছে আনার সময় লোকটির হাতের ছুঁড়ি যে তার বাম হাতের বাহু কেটে যায়।তখনি ভেসে এতো শত্রুপক্ষের লিডার এর কন্ঠ,

__"Game over. এখন তোমাদের fate আমাদের হাতে।"

আনাস্তাসিয়া বাঁকা হেসে বলে,

__"You call it game over. We call it the beginning of your downfall."

আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে হতেই আদ্রিয়ান রাগে গর্জে উঠে,

__" ইউ ফাকিং ব্লাস্টার। শ****বাচ্চা তোর সাহস কি করে হলো আমার ব্লাড রোজাকে আঘাত করার"।

বলেই লোকটির উপর ঝাপিয়ে পড়লো। আবার শুরু হলো তাদের লড়াই। আদ্রিয়ান সেই লোকটিকে তারি ছুঁড়ি দিয়ে পিছপিছ করে কেটে তার কলিজা টেনে বের করেই শান্ত হয়। মূহুর্তেই এই সুন্দর প্রকৃতির সুন্দর আবহাওয়া পরিনত হলো ধ্বংস যজ্ঞে। বাতাসের আবহাওয়ায় মিশে গেল রক্তের ঘ্রাণ। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর শত্রু পক্ষের একজন পেছন থেকে আনাস্তাসিয়ার হাতে আঘাত করে বলে হঠাৎ আঘাত করায় তার হাতের তলোয়ার ছিটকে দূরে পড়ে যায়। তাই সে অস্ত্র ছাড়াই লড়াই করতে থাকে। এভাবে কিছুক্ষণ লড়াই করার পর আনাস্তাসিয়া দেখলো দূর থেকে আরো অজস্র কালো গাড়ি আসছে তাদের দিকে। আনাস্তাসিয়া আরো বড় বিপদের আশঙ্কা করে আদ্রিয়ান এর হাত শক্ত করে চেপে ধরে। তার হাত ধরতেই আদ্রিয়ান তার দিকে তাকাতেই সে চোখের ইশারায় সামনে দেখিয়ে বলে,

__" আমাদের এই মুহূর্তে এখান থেকে যেতে হবে, আমরা এদের সাথে পেরে উঠব না একা"।

আদ্রিয়ান একবার তাদের দুজনের দিকে তাকালো, সত্যিই তারা দুজন অনেক আহত হয়েছে। আর অনেক ক্ষণ লড়াই করার ফলে তাঁরা হাঁপিয়ে পরেছে তাঁদের শরীরে আগের মত শক্তি নেই। আর আনাস্তাসিয়া সে বেশ আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে।তাই সে আনাস্তাসিয়ার হাত শক্ত করে ধরে জঙ্গলের দিকে দৌড় লাগালো। তাদের দৌড়ে পালাতে দেখে শত্রু পক্ষের লোকেরা তাদের পিছু নিল।

পুরো শহর জুড়ে তুষারপাত হচ্ছে। এই সময়ে সবচেয়ে শীতলতম সময় পার করছে পুরো রাশিয়া। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই তাপমাত্রা শূন্যে আছে মাইনাসের কাটায়। সারাবেলা অবিরত তুষার পাতে জমাট বেঁধে পাথর হয়ে রূপ নিয়েছে চারিদিক। মসৃণ পিচঢালা রাস্তা গুলো ঢাকা পড়েছে কয়েক স্তর শ্বেত রঙা বরফ কুঁচির আড়ালে। প্রকৃতির এমন বৈরী আচরণে জনজীবন ব্যাহত। ঠিক মতো রাস্তা চিনে পথ এগোনো মুশকিল, অথচ এমন বৈরী আবহাওয়ার মাঝেই দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে জঙ্গলের রাস্তা ধরে প্রাণপণ ছুটছে আদ্রিয়ান আর আনাস্তাসিয়া। যদিও রাস্তা চেনার উপায় নেই, হাঁটু সমান বরফের মধ্যে দিয়ে কোনোমতে সামনের এগোনোর প্রচেষ্টা বলা যায়।

তবে এই বিস্তৃত জঙ্গলের শেষ কোথায় তা ঠিক জানা নেই আদ্রিয়ান এর । এভাবে উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকলে ধরা পড়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রকট। একবার শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে গেলে এখান থেকে বেঁচে ফিরে যাওয়া তাদের জন্য মুস্কিল হয়ে যাবে। সেই ভেবে শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আরও দ্রুত এগোনোর প্রয়াসে পা চালায় আদ্রিয়ান আর আনাস্তাসিয়া। বরফে ঢাকা জঙ্গলের এলোমেলো পথ দিয়ে ছুটে চলেছে তাঁরা। পথে ভাঙ্গা গাছপালায় লেগে আঘাত পেলেও থামছে না। পেছনে থেকে ভেসে আসছে শত্রুপক্ষের হইচই আর চিৎকার। আনাস্তাসিয়া আর আদ্রিয়ান দৌড়ানোর সময় হঠাৎ আনাস্তাসিয়ার পা ভাঙ্গা ডালের সাথে বেজে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতেই আহহহ করে উঠে। আদ্রিয়ান আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে থাকায় সে পড়ে যেতেই আদ্রিয়ান থেমে যায়। ঘার ঘুরিয়ে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকাতেই সে চমকে গেল। গাছের ভাঙ্গা ডালের শুচালো অংশ আনাস্তাসিয়ার ডান পায়ের প্যান্ট ভেত করে ঢুকে পা লম্বা ভাবে ছিলে গেছে। পায়ের প্যান্ট এর অংশ দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে ফর্সা রক্তাক্ত পা ভেসে উঠে। আদ্রিয়ান আতঙ্কে উঠে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁটা জায়গা দেখতে দেখতে বলে,

__" ব্যাথা করছে ব্লাড রোজ"।

আনাস্তাসিয়া উপর নিচ মাথা নাড়ায়। কিন্তু সে কাঁদে না তার চোখে এক ফোঁটা অশ্রু ও দেখা যায় না। তার মুখ গম্ভীর সে কান খারা করে শিকারি চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে একবার পর্যবেক্ষণ করে নিল। সে গম্ভীর আদ্রিয়ান এর দিকে তাকিয়ে বলে,

__" আমাদের এখনি এখান থেকে যেতে হবে ওরা এই দিকেই আসছে"।

আদ্রিয়ান নিজের সাদা শার্ট এর এক পাশ টেনে ছিঁড়ে আনাস্তাসিয়ার ডান পায়ে পেঁচিয়ে বেঁধে দিতে দিতে বলে,

__" তুমি এই অবস্থায় হাঁটতে পারবে না, আমাদের এখানেই কোথাও লুকিয়ে থাকতে হবে"।

আনাস্তাসিয়া দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,

__" আনাস্তাসিয়া পারে না এমন কোন কাজ নেই, এখান থেকে আর কিছু দূর গেলেই সামনে সমুদ্র আমাদের সেখানে যেতে হবে"।

আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

__" কেন"?

__" এতো কিছু বলার সময় নেই গেলেই দেখতে পাবে"।

বলেই এক পা বাড়াতেই ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে যায়, দাঁতে দাঁত চেপে তা সয্য করে সে। তা দেখে আদ্রিয়ান তাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নেয়। আনাস্তাসিয়া চমকে যায়, সে নামার জন্য ছটফট করে বলে,

__" বললাম তো আমি হাঁটতে পারবো নাম.....

__" চুপ একদম চুপ আর একটা কথা বললে আছাড় মেরে ফেলে দেব"।

আনাস্তাসিয়ার কথার মাঝে আদ্রিয়ান ধমকে উঠে। আদ্রিয়ান এর ধমক শুনে আনাস্তাসিয়া চুপসে যায়। অতঃপর আনাস্তাসিয়াকে কোলে নিয়েই আদ্রিয়ান দৌড়াতে থাকে। কিছুদূর যাওয়ার পর তার পা থেমে গেল, সে কান খারা করতেই শুনতে পেল লোক গুলোর কথা তারা এই দিকেই আসছে। আদ্রিয়ান এদিকে সেদিন তাকিয়ে দেখতে লাগলো লুকানোর কোন যায়গা আছে কি না। এভাবে দেখতেই হঠাৎ তার চোখে পরলো একটি ছোট গুহা। সে আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে সেই দিকেই দৌড়ে গেল। সে কোন কিছু না ভেবেই তার ভেতরে ঢুকে পরে, গুহাটি ছোট হওয়ায় সে আনাস্তাসিয়াকে তার কোলে বসিয়ে তার সাথে চেপে জড়িত ধরে রাখে। গুহার মুখে ভাঙ্গা গাছ পালার ডাল আর লতাপাতা দিয়ে ভালো ভাবে আটকে দেয়। আনাস্তাসিয়া দুই পা দুই দিকে দিয়ে আদ্রিয়ান এর কোমর জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখে। আদ্রিয়ান একবার তার দিকে তাকায়, মেয়েটার মুখে রক্ত আর মাটি লেগে আছে। আদ্রিয়ান তার হাত আনাস্তাসিয়ার গালে আলতো করে রেখে বিদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে হাল্কা স্লাইড করল। অতঃপর আলতো করে তার গালে নিজের উষ্ণ স্পর্শ ছুঁইয়ে দিল। গভীর এক চুমু খেয়ে তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। আনাস্তাসিয়া তার কাঁধে মাথা রাখায় তার গরম নিঃশ্বাস আদ্রিয়ান এর ঘাড়ে এসে পড়ে। আনাস্তাসিয়ার উষ্ণ নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে পরতেই তার শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে,হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। আনাস্তাসিয়া তার সাথে জড়িত থাকায় সে আদ্রিয়ানের বুকের ধুকপুক আওয়াজ শুনতে পায়। আদ্রিয়ান এর হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনে সে তার দিকে তাকাতেই তার চোখ পড়ে আদ্রিয়ান এর অ্যাডামস অ্যাপল এর দিকে। আদ্রিয়ান বারবার ঢোঁক গিলছে যার ফলে অ্যাডামস অ্যাপলটি বারবার উঠানামা করছে। তা দেখে আনাস্তাসিয়ার নিঃশ্বাস ভারী হতে থাকে। তার অবাধ্য মন বারবার ওটাকে ছুঁয়ে দিতে চাইছে। অ্যাডামস অ্যাপলটি যেন তাকে গভীর ভাবে টানছে। তাই সে নিজের ইচ্ছেকে দমিয়ে না রেখে প্রবল আসক্তিতে হাত বাড়িয়ে আলতো করে অ্যাডামস অ্যাপলটি ছুঁয়ে দিল। আনাস্তাসিয়ার ছোঁয়ায় আদ্রিয়ান এর শরীর ঝটকা দিয়ে উঠল। সে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকাতেই দেখল আনাস্তাসিয়া তার দিকে নেশা ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। আর অবাধ্য হাতের স্পর্শ করছে তার গলায় যার ফলে তার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠে। তাঁরা দুজনেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আদ্রিয়ান আনাস্তাসিয়ার অবস্থা দেখে নিজেকে সামলিয়ে বলে,

__" কি করছো এটা"।

__" আই নিড ইউ"।

__"বাট ইউ আর উইক"।

আনাস্তাসিয়া তার কথায় পাত্তা না দিয়ে তার অ্যাডামস অ্যাপলে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে আলতো করে কামড় দেয়। আনাস্তাসিয়ার হঠাৎ এমন কান্ডে সে চমকে যায় তার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। তবুও সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সব সহ্য করে নেয়। কিছুক্ষণ পর আনাস্তাসিয়া তাকে ছেড়ে তার দিকে নেশা তুলব চোখে তাকিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে,

__" আই ব্র্যাডলি ওয়ান্ট টু টেস্ট ইউর লিপস"।

আনাস্তাসিয়ার ঘোর লাগা কন্ঠ শুনে তার দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকায় আনাস্তাসিয়ার নেশা ভরা দৃষ্টির দিকে। সে এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাতেই তার নেশা লেগে গেল। তার নিশ্বাস আরো ভারী হয়ে আসে, সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আনাস্তাসিয়ার গোলাপি অধরে তার ডার্ক রেড চেরি অধর ডুবিয়ে দেয়। আঁকড়ে ধরে নিজের অধর দাঁড়া আনাস্তাসিয়ার অধর। আনাস্তাসিয়া তার দুই হাত দিয়ে আদ্রিয়ান এর গলা পেঁচিয়ে ধরে তার আরো কাছে টেনে নেয়। তারা গভীর চুম্বনে লিপ্ত হয় ডুবে যায় দুজন দুজনের মাঝে, এক সাথে মিলিত হয় তাদের ভারী নিঃশ্বাস। দীর্ঘ চুম্বনের পর ধীরে ধীরে আদ্রিয়ান তাকে ছেড়ে দিতেই জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে দুজনে। আদ্রিয়ান তার অধর ছেড়ে তার গলায় মুখ ডুবিয়ে ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকে তার গলদেহ। এক হাত তার পিছনে রেখে অপর হাত দিয়ে তার সাদা ফিটেড টপটা উপরে তুলতে লাগল। তার ফর্সা মেদহীন পেট উম্মুক্ত করে সেখানে ঠোঁটের আলতো পরশ আঁকতে থাকে। আনাস্তাসিয়া ভারী ভারী নিঃশ্বাস ফেলে দুই হাত দিয়ে আদ্রিয়ান এর চুল শক্ত করে আকড়ে ধরে। আদ্রিয়ান আনাস্তাসিয়াতে মগ্ন থাকার মধ্যে হঠাৎ থমকে যায়। সে দেখল পারলো আনাস্তাসিয়ার শরীর অস্বাভাবিক ভাবে গরম হয়ে যাচ্ছে। সে ভ্রু কুঁচকে তাঁর শরীরে হাতের উল্টো পিঠ ছুঁইয়ে তাপমাত্রা চেক করতেই চমকে গেল। আনাস্তাসিয়া পুরো শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, তার আর বুঝতে সময় লাগলো না পায়ের ব্যথার কারণেই তার শরীরে জ্বর উঠছে। তখনি আদ্রিয়ান এর কানে ভেসে এলো কিছু লোকের কথা,

__" ওই জানু****বাচ্চা দের তাড়াতাড়ি খোঁজ, ওদের না পেলে বস আমাদের আর আস্ত রাখবে না, জানে মেরে ফেলবে"।

__" তোরা ওইদিকে যা আমরা এই দিকে যাচ্ছি ওই মাফিয়া দুটো এখানে আসে পাসে আসে হয়তো, এই জঙ্গল থেকে এতো সহজে ওদের পালানো মুস্কিল"।

আদ্রিয়ান আনাস্তাসিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে একটু চিন্তিত হলো। মেয়েটার মুখ জ্বরে পুরো শুকিয়ে গেছে।

__" ব্লাড রোজ আমাদের এখনি এখান থেকে যেতে হবে, এখানে থাকা আর নিরাপদ নয় আমাদের জন্য"।

__" এখান থেকে আর একটু দূরে সমুদ্র সেখানে নিয়ে চলো জলদি"।

আদ্রিয়ান আর কোন বাক্য ব্যায় না করে আনাস্তাসিয়াকে পুনরায় কোলে তুলে নেয়। তাকে কোলে তুলে গুহার বাহিরে বের হয়ে একবার সতর্ক দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকায়। অতঃপর দৌড়ে সমুদ্রের দিকে যেতে থাকে, সে আনাস্তাসিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কোন দিকে না তাকিয়ে দৌড়াতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে বিশাল সমুদ্রের পাড়ে এসে থামে। পাড়ে এসে আনাস্তাসিয়াকে নামিয়ে দেয়, সে নেমেই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আদ্রিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে,

__" সুইমিং করতে পারো"।

আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে,

__" কেন"।

আনাস্তাসিয়া তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,

__" কারণ আমরা এখন সমুদ্রে ঝাঁপ দিব"।

__" হোয়াই, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ব্লাড রোজ, এসব কি বলছো"।

আদ্রিয়ান চেঁচিয়ে উঠে কথাটি বলে। আনাস্তাসিয়া তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে তার চোখে চোখ রেখে বলে,

__" তুমি আমাকে বিশ্বাস করতো"?

আদ্রিয়ান উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলে,

__" হ্যাঁ"।

__" তাহলে কোন কথা না বলে আমার সাথে চলো"।

আদ্রিয়ান আর একটা কথাও বললো না। সে আনাস্তাসিয়াকে নিজের থেকে ও বেশি বিশ্বাস করে, তাই সে যদি তাকে মৃত্যুর মুখে ও নিয়ে যায় সে যাবে। আনাস্তাসিয়া আর আদ্রিয়ান দু'জনেই সমুদ্রের দিকে এগোলো। অতঃপর দুজনে সমুদ্রে মাঝে ঝাঁপ দেয়। তাঁরা সাঁতরে সমুদ্রের গভীরে আসতেই আনাস্তাসিয়া তার হাত ধরে একটি পাথরের কাছে নামে। অতঃপর আনাস্তাসিয়া নীল চকচকে পাথরটিতে জোরে চাপ দেয়। পাথরটিতে চাপ দিতেই পানির মধ্যে বুদবুদ সৃষ্টি হয়, অতঃপর কিছুক্ষণ এর মধ্যেই তাদের চোখের সামনে ভাসমান হয় চার তলার বিশাল রাজকীয় গ্লাস হাউজ। আনাস্তাসিয়া আদ্রিয়ানকে নিয়ে গ্লাস হাউজ এর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার উপর হাত রাখে।দরজায় উপর তার এক রাখতেই নীল আলোক রশ্মি জ্বলে উঠলো। অতঃপর দরজা খুলে যেতেই তারা ভেতরে ঢুকে পরে, ভেতরে ঢুকতেই দরজা পুনরায় বন্ধ হয়ে যেতেই তাঁরা তাঁদের আটকিয়ে রাখা শ্বাস ছেড়ে নিঃশ্বাস নিল।

( চলবে....)

[উপন্যাসটা ভালো লাগলে সকলে লাইক কমেন্ট করে পেইজটা ফলো দিয়ে যাবেন প্লিজ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন