ফন্ট সাইজ:
থিম:
আনাস্তাসিয়া

১২তম পর্ব

লেখক: Samiya

#আনাস্তাসিয়া
#লেখিকা_সামিয়া
#পর্ব:১২

তুষারপাতের শহরে আজ সূর্যি মামার দেখা মেলা যেন মুসলিম হয়ে উঠেছে। শহরের শেষ প্রান্তে জঙ্গলির গাছপালা আর পাহাড় তুষারপাতে ঢাকা পড়ে আছে। চারিদিকের কেম নিস্তব্ধ হয়ে আছে, অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙে এথেরিয়নের। বিরক্তি নিয়ে এক হাত বাড়িয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে মাথা উঠিয়ে চোখ খুলে চাইলেই মাথা ভার হয়ে আসে, চোখ আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যায়। তার শরীরটা কেমন ভারী হয়ে আছে, শরীর মেচমেচ ও করছে। সে অনেক ক্ষণ চোখ বুজে থেকে তার পর অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা লাগছে, সে ঝাপসা চোখে রুমের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে আস্তে করে উঠে বসালো। উঠে বসার সময় হঠাৎ তার হাতে টান অনুভব করতেই ভ্রু কুঁচকে পাশে তাকালো। পাশে তাকাতেই তার কুঁচকানো ভ্রু আরেকটু কুঁচকে এলো। লেনি তার এক হাত ধরে তার বালিশের পাশে মাথা রেখে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে শুয়ে আছে। এথেরিয়ন লেনির মুখের দিকে তাকাতেই মায়া হলো। কি নিষ্পাপ আর মায়া জড়ানো মুখটা, যে কেউ দেখলে তার প্রেমে পড়ে যাবে। কিন্তু এথেরিয়ন সে কেন তার প্রেমে পড়লো না। এই নিষ্পাপ আর মায়ায় জড়ানো মুখের পেছনে লুকিয়ে আছে এক আকাশ পরিমাণ কষ্ট। লেনির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে উঠল,

__"তুমি আবারও আমার মাথার কাছে এসে ঘুমিয়ে পড়েছো..."

"কত শান্ত লাগছে তোমাকে। মনে হয় যেন পৃথিবীর কোনো দুঃখই তোমাকে ছুঁতে পারেনি। অথচ আমি জানি, তোমার সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ আমিই।

তুমি আমাকে ভালোবাসো—আমি জানি। আর সেই কারণেই তোমার চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় লাগে। কারণ আমি তোমাকে সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারি না।

আমি চেষ্টা করিনি, তা নয়। কিন্তু হৃদয়কে তো আদেশ করা যায় না। যে মানুষটাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, তাকে হারিয়েছি। আর সেই শূন্য জায়গায় কাউকে বসাতে পারিনি—তোমাকেও না।

তবুও তুমি আছো। কোনো দাবি ছাড়া, কোনো অভিযোগ ছাড়া, শুধু নীরবে পাশে।

কখনো কখনো মনে হয়, তুমি এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছো, যে তোমার ভালোবাসার যোগ্যই নয়।

ইশ... যদি হৃদয়টা এতটা জটিল না হতো! যদি ভালোবাসা শুধু সিদ্ধান্তে হতো! তাহলে হয়তো আজ তোমাকে এভাবে কষ্ট দিতে হতো না।

ঘুমাও... অন্তত এই ঘুমের ভেতর তুমি যেন কোনো অপূর্ণতার স্বপ্ন না দেখো। আর যদি পারো... একদিন এমন কাউকে খুঁজে নিও, যে তোমাকে ঠিক সেইভাবে ভালোবাসবে, যেভাবে তুমি ভালোবাসতে জানো।"

কথাগুলো বলেই এথেরিয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নিজের হাতের উপর থেকে লেনির হাত সরাতে গেলেই লেনি একটু নরেচরে উঠে।হঠাৎ এথেরিয়নের নড়াচড়ায় লেনির ঘুম ভেঙে গেল।সে পিটপিট করে চোখ খুলে এথেরিয়নকে সামনে বসে থাকতে দেখে বলে,

— "আপনি... জেগে উঠেছেন?"

বলেই সে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল। কপালে হাত রাখল।

— "জ্বর অনেকটাই কমেছে... মাথা কেমন লাগছে? শরীর ব্যথা করছে? একটু পানি খাবেন? আমি এখনই নিয়ে আসছি।"

এথেরিয়ন আস্তে করে তার হাতটা ধরে ফেলল।

— "একটু দাঁড়াও..."

লেনি থেমে গেল।

— "তুমি... সারারাত এখানে ছিলে?"

লেনি মৃদু হেসে বলল,

— "হ্যাঁ।"

— "একটুও ঘুমাওনি?"

— "ঘুমানোর সময় পাইনি। যখনই জ্বর একটু কমেছে ভেবেছি, আবার বেড়ে গেছে। আপনাকে একা রেখে যেতে মন চায়নি।"

এথেরিয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— "কেন করো এসব?"

লেনি অবাক চোখে তাকাল।

— "কী?"

— "এই এত যত্ন... এত ভালোবাসা... কেন?"

কিছুক্ষণ নীরব থেকে লেনি বলল,

— "কারণ তোমাকে ভালোবাসি।"

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।এথেরিয়ন চোখ নামিয়ে বলল,

— "তুমি তো জানো... আমার হৃদয়ে অন্য একজন আছে।"

— "জানি।"

— "তবুও?"

— "ভালোবাসা তো কারও জায়গা কেড়ে নেওয়ার নাম নয়। ভালোবাসা মানে তার কষ্ট কমুক—এই প্রার্থনা করা।"

এথেরিয়ন গলায় অপরাধবোধ স্পষ্ট।

— "আমি তোমাকে কখনও সেই ভালোবাসা দিতে পারব না।"

লেনি শান্ত গলায় বলল,

— "আমি কখনও আপনার কাছে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইনি।"

এথেরিয়ন বিস্মিত হয়ে তাকাল।

— "তাহলে?"

— "শুধু চেয়েছি আপনি ভালো থাকেন।"

নীরবতা নেমে এল।

বাইরে পাখিরা ডাকছে। অথচ ঘরের ভেতরে যেন সময় থেমে গেছে।

এথেরিয়ন ধীরে ধীরে বলল,

— "তুমি জানো, যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম... সে আমাকে কখনও নিজের করে নেয়নি।"

— "জানি।"

— "তবুও আজও তাকে ভুলতে পারিনি।"

লেনি মৃদু হাসল।

— "হৃদয়কে তো আদেশ করা যায় না।"

— "আর তোমাকে?"

— "আমাকেও না।"

এথেরিয়ন এর চোখ ভিজে উঠল।

— "আমি খুব স্বার্থপর, তাই না?"

— "না।"

— "তাহলে?"

— "আপনি শুধু ভাঙা মানুষ। আর ভাঙা মানুষ কাউকে আঘাত দিতে চায় না বলেই দূরে সরে যায়।"

এথেরিয়ন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

— "তুমি এত ভালো কেন?"

লেনি ধীরে বলল,

— "হয়তো ভালো নই। শুধু আপনাকে ভালোবাসি।"

এথেরিয়ন কাঁপা গলায় বলল,

— "তোমার এই ভালোবাসার প্রতিদান আমি কোনোদিন দিতে পারব না।"

— "সব ভালোবাসার প্রতিদান ভালোবাসা হয় না। কখনও কখনও সম্মানই সবচেয়ে বড় প্রতিদান।"

এথেরিয়ন তার দিকে তাকিয়ে রইল।

— "যদি কোনোদিন আমার হৃদয় আর কাউকে ভালোবাসতে না শেখে?"

লেনি মৃদু হেসে উত্তর দিল,

— "তাহলে আমি দূর থেকেই আপনার ভালো থাকা দেখে খুশি হব। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে নিজের করে পেতে শেখায় না, মানুষটাকে ভালো রাখতে শেখায়।"

এথেরিয়নের চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।লেনি আলতো করে সেই অশ্রু মুছে দিয়ে বলল,

— "কাঁদো না। আপনার চোখে জল দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।"

এথেরিয়ন ফিসফিস করে বলল,

— "যে মানুষটাকে চেয়েছিলাম, সে আমার হলো না... আর যে মানুষটা আমাকে নিজের সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে, তাকে আমি নিজের বলতে পারছি না। এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?"

লেনি ধীরে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

— "শাস্তি নয়... এটা হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা।"

জানালার বাইরে সকালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু ঘরের ভেতরে দুটি হৃদয় এখনও অপূর্ণতার ভার বয়ে বেড়াচ্ছে—একটি হৃদয় হারানো ভালোবাসার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছে, আর অন্যটি নীরবে এমন একজন মানুষকে ভালোবেসে যাচ্ছে, যাকে পাওয়ার কোনো দাবি সে কোনোদিনই করেনি। লেনি এথেরিয়ন এর হাত ছেড়ে বলে,

__" আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন আমি আপনার জন্য নাস্তা নিয়ে আসছি"।

বলেই চলে যেতে নিলে দরজার কাছে গিয়ে এথেরিয়ন এর কথায় থমকে যায়।

__"তুমি মরীচিকার পেছনে ছুটছো। যতই দৌড়াও না কেন, ওটা কোনোদিন তোমার হাতে ধরা দেবে না। শুধু ক্লান্তি বাড়বে, আর হারিয়ে যাবে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। এখনও সময় আছে... ফিরে যাও। যে স্বপ্নের কোনো ঠিকানা নেই, তার জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট কোরো না।"

লেনি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,

__"জানি... ওটা মরীচিকাই। তবুও কিছু পথ আছে, যেখানে গন্তব্যের আশায় নয়—ভালোবাসার টানেই মানুষ হাঁটে। হয়তো আমি কখনো আপনাকে পাব না, তবু ফিরে আসার মতো শক্তিটুকুও আর আমার নেই। কারণ কিছু ভালোবাসা জিতে যাওয়ার জন্য নয়, শেষ পর্যন্ত বয়ে বেড়ানোর জন্য জন্মায়।"

কথাগুলো বলেই কাওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হনহন করে চলে গেল লেনি।লেনি আর একবারও ফিরে তাকাল না। এথেরিয়ন অনেকক্ষণ স্থির বসে রইল। তারপর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুকরো বিষণ্ন হাসি।

__“তুমি বললে, মরীচিকার পেছনে ছুটছো জেনেও থামতে পারছো না...

কিন্তু জানো, সবচেয়ে বড় শাস্তি কী?

যখন কেউ নিজের সমস্ত হৃদয় উজাড় করে তোমার দিকে হাত বাড়ায়, আর তুমি জানো—তার হাত ধরার অধিকার তোমার নেই।

তুমি আমাকে ভালোবাসো... অথচ আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোণ এখনও এমন একজনের স্মৃতিতে বন্দি, যে কোনোদিনই আর ফিরে আসবে না। আমি সেই স্মৃতির বন্দি, আর তুমি আমার অসম্পূর্ণতার।

তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া আমার নিষ্ঠুরতা নয়, আমার অসহায়ত্ব।

কারণ আমি চাই না, আমার ভাঙা জীবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তোমার হাসিটাও একদিন নিভে যাক।

হয়তো একদিন তুমি আমাকে ঘৃণা করবে... বলবে আমি কাপুরুষ ছিলাম। কিন্তু যদি সেই ঘৃণা তোমাকে আমার থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, তবে সেই ঘৃণাকেও আমি আশীর্বাদ মনে করব।

আর যদি কোনোদিন মাঝরাতে আমার কথা মনে পড়ে... তাহলে শুধু এটুকুই ভেবো—একটা মানুষ ছিল, যে তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ভালোবাসার অভাবে নয়, বরং তোমাকে যথেষ্ট সুখী করতে পারবে না বলেই।

ভালোবাসা সব সময় কাছে টেনে নেওয়ার নাম নয়, লেনি...

কখনও কখনও সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা হলো, নিজের সমস্ত ইচ্ছেকে গলা টিপে মেরে প্রিয় মানুষটাকে মুক্ত করে দেওয়া।

ভালো থেকো...

আমার জন্য নয়, নিজের জন্য।

কারণ তোমার চোখে আবার হাসি ফুটুক—এই প্রার্থনাটুকুই হয়তো সারাজীবন নীরবে বয়ে বেড়াব আমি।”

কিছুক্ষণ এভাবে বসে থেকে এথেরিয়ন উঠে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে।

_____________>>>>>>>>>>>>___________

দুপুর ১২টা।
ফোর সিজন হোটেল মস্কো (Four Seasons Hotel Moscow): রেড স্কয়ার এবং ক্রেমলিনের ঠিক পাশেই মানেজনায়া স্কোয়ারে অবস্থিত এই আধুনিক ও বিলাসবহুল হোটেলটি রাশিয়ার অন্যতম আইকনিক হোটেল। এটি ক্লাসিক রাশিয়ান আভিজাত্য এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এক অপূর্ব সমন্বয়। এই হোটেলের ছাব্বিশ তলার একটি বিশাল কক্ষে চলছে রাশিয়ার সব নাম করা ভয়ঙ্কর মাফিয়া বসদের মিটিং।

মস্কোর আকাশে সূর্যের আলো ঝলমল করছে। বাইরে শহর তার স্বাভাবিক ছন্দে চললেও, ফোর সিজন হোটেলের একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত সভাকক্ষের ভেতরে জমে উঠেছে এক ভিন্ন পৃথিবী।

দীর্ঘ কালো মার্বেলের টেবিল ঘিরে বসে আছে রাশিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মাফিয়া বসরা। কারও মুখে হাসি নেই, কারও চোখে ভয়ও নেই। কক্ষজুড়ে শুধু নিস্তব্ধতা—যে নিস্তব্ধতা ঝড়ের আগের মুহূর্তের মতো ভারী।

আজকের বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দু দুটি কিংবদন্তিতুল্য হীরা—ব্ল্যাক অরলভ এবং হোপ ডায়মন্ড।ব্ল্যাক অরলভ এবং হোপ ডায়মন্ড হলো বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং রহস্যময় অভিশপ্ত রত্নগুলোর মধ্যে দুটি। গা ছমছমে কিংবদন্তি, আকস্মিক মৃত্যু এবং ঐতিহাসিক রোমাঞ্চের কারণে এই হীরা দুটি যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে বিস্ময় জাগিয়ে আসছে। কিংবদন্তি অনুযায়ী, ব্ল্যাক অরলভ ভারতের পন্ডিচেরির একটি হিন্দু মন্দিরে ভগবান ব্রহ্মার মূর্তির চোখ হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং একজন সন্ন্যাসী এটি চুরি করার পর এর ওপর অভিশাপ নেমে আসে। ১৯৩২ সালে জে. ডব্লিউ. প্যারিস নামক একজন ডিলার হীরাটি আমেরিকায় আনার পর নিউ ইয়র্কের একটি উঁচু ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন পরবর্তীতে রাশিয়ান রাজকুমারী লিওনিলার গালিতসিন-বারিয়াতিস্কি এবং নাদিয়া ভাইগিন-অরলভ—উভয়েই ১৯৪৭ সালে রহস্যজনকভাবে উপর থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন। হোপ ডায়মন্ড এই হীরাটি এর গাঢ় নীল রঙের জন্য বিখ্যাত। এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় নীল হীরা।১৭ শতকে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের কোল্লুর খনি থেকে এটি উত্তোলন করা হয়। পরে ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী জঁ-ব্যাপটিস্ট ট্যাভারনিয়ার এটি ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই-এর কাছে বিক্রি করেন। কথিত আছে, ভারতের মন্দির থেকে চুরি করার কারণে এটি অভিশপ্ত হয়। ট্যাভারনিয়ারকে নেকড়ে বা কুকুর ছিঁড়ে খেয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পরবর্তী মালিক রাজা ষোড়শ লুই ও রানী মেরি আঁতোয়ানেটকে ফরাসি বিপ্লবের সময় গিলোটিনে মাথা কেটে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া, হীরাটির হাতবদল হওয়া অন্যান্য অনেক মালিকও দেউলিয়াত্ব, আত্মহত্যা বা করুণ মৃত্যুর শিকার হন।

বর্তমানে দুটি হীরাই রয়েছে ভল্কর দখলে। অপরাধজগতের গুঞ্জন, যে এই দুই রত্নের মালিক হবে, সে শুধু অমূল্য সম্পদের নয়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতার ভারসাম্যও নিজের দিকে টেনে নিতে পারবে।

টেবিলের এক প্রান্তে শান্ত মুখে বসে আছে ভল্ক। তার চোখে কোনো উদ্বেগ নেই, তবে দৃষ্টিতে স্পষ্ট সতর্কতা।

অপর প্রান্তে বসে আছে আদ্রিয়ান—রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী মাফিয়া কিং। তার ঠান্ডা দৃষ্টি বারবার স্থির হচ্ছে ভল্কর ওপর। হীরা দুটির প্রতি তার আগ্রহের পেছনে শুধু অর্থ বা ক্ষমতার লোভ নেই; রয়েছে অসমাপ্ত এক ব্যক্তিগত সংঘাত।

কিছুদিন আগে আদ্রিয়ান নিজ হাতে হত্যা করেছে ভল্কর প্রেমিকাকে। সেই ঘটনার পর থেকে তাদের দ্বন্দ্ব আর কেবল ব্যবসায়িক নয়; এটি পরিণত হয়েছে প্রতিশোধের যুদ্ধে। ভল্ক জানে, আদ্রিয়ান কোনোদিন তাকে ক্ষমা চাইবে না। আর আদ্রিয়ানও জানে, ভল্ক স্বেচ্ছায় কখনোই হীরা দুটি তার হাতে তুলে দেবে না।

কক্ষের প্রতিটি মানুষ বুঝতে পারছে—আজকের এই বৈঠকের ফলাফল শুধু একটি চুক্তি নির্ধারণ করবে না; নির্ধারণ করবে রাশিয়ার অপরাধজগতের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার মানচিত্র।

হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের গ্লাসে কারও আঙুলের হালকা টোকা পড়ল।মুহূর্তেই সব চোখ ঘুরে গেল সেই দিকে।

নিস্তব্ধতার অবসান হতে চলেছে। ক্রিস্টালের গ্লাসে আঙুলের টোকা পড়তেই সভাকক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল।

ভল্ক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর লুকিয়ে ছিল অটল আত্মবিশ্বাস।

__"আপনারা সবাই জানেন কেন এখানে এসেছেন। ব্ল্যাক অরলভ আর হোপ ডায়মন্ডের জন্য। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিই—এই দুই হীরা কোনো দুর্বল হাতে যাবে না।"

আদ্রিয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

__"তাহলে শক্ত হাতটা কার?"

ভল্ক বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দিল,

__"যে এগুলোর মূল্য বুঝবে।"

__"মূল্য?"

আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকল।

__"মূল্য আমি দিতেই এসেছি। বলো, কত চাই?"

ভল্ক মাথা নাড়ল।

__"কিছু জিনিসের দাম টাকায় হয় না, আর তুমি কি করে ভাবতে পারছো যে আমি তোমাকে এই মুল্যবান ডায়মন্ড দুটো দিয়ে দেব যেখানে তুমি আমার গার্লফ্রেন্ডকে হত্যা করেছ"।

__"সবকিছুরই দাম আছে। শুধু সঠিক সংখ্যাটা জানতে হয়, আর তুমি তোমার ওই ফাকিং গার্লফ্রেন্ড এর কথা বলছো যে কিনা নিজের স্বার্থে নিজের শরীর বিলিয়ে বেড়ায় হা.......।"

কক্ষে বসে থাকা অন্য মাফিয়া বসরা নীরবে তাদের কথোপকথন শুনছিল।

আদ্রিয়ান আবার বলল,

__"আমি নগদ অর্থ, স্বর্ণ, অস্ত্রের চালান, ব্যবসায়িক অঞ্চল—যা চাইবে তাই দেব। শুধু হীরা দুটো আমার হাতে তুলে দাও।"

ভল্ক মৃদু হেসে উত্তর দিল,

__"আমার কাছে এগুলো বিক্রির জন্য নয়।"

আদ্রিয়ানের চোখ মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল।

__"তুমি ভেবে দেখো। আজ না হলেও কাল এগুলো আমার কাছেই আসবে।"

ঠিক তখনই—

সভাকক্ষের বিশাল দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।ধাতব কবজার ভারী শব্দ পুরো কক্ষে প্রতিধ্বনিত হলো।সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।

কালো লম্বা কোট পরা এক নারী ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন।

তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখে বরফের মতো স্থিরতা।

তার ঠিক এক কদম পেছনে হাঁটছে আমান।কক্ষের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।কেউ উঠে দাঁড়াল না, কিন্তু প্রত্যেকের দৃষ্টি সতর্ক হয়ে উঠল।কারণ প্রবেশ করেছে—

রাশিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর এবং রহস্যময় মাফিয়া কিং, আনাস্তাসিয়া।

তিনি টেবিলের কাছে এসে থামলেন।কোনো অনুমতি না নিয়েই খালি চেয়ারে বসলেন।

তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন,

__"মনে হচ্ছে আমি দেরি করে ফেলেছি।"

কেউ উত্তর দিল না।

কক্ষের নীরবতাই যেন তার প্রতি সবার ভয় প্রকাশ করে দিল।

আনাস্তাসিয়া ধীরে ভল্কের দিকে তাকালেন।

__"হীরা দুটো আমি কিনব।"

আদ্রিয়ান ভ্রু তুলল।

__"ওগুলোর দাম তুমি জানো?"

আনাস্তাসিয়া তার দিকে না তাকিয়েই বললেন,

__"দাম আমি ঠিক করব।"

তারপর তিনি ভল্কের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললেন,

__"চল্লিশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।"

কক্ষে চাপা বিস্ময়ের ঢেউ বয়ে গেল।

একজন প্রবীণ মাফিয়া বস অবিশ্বাসে নিঃশ্বাস টেনে বলল,

__"এত বড় প্রস্তাব..."

কেউ আর তার কথা শেষ করতে দিল না।

আনাস্তাসিয়া আবার বললেন,

__"যদি কেউ এর চেয়ে বেশি দিতে পারে, আমি উঠে চলে যাব।"

পুরো সভাকক্ষে নীরবতা নেমে এল।কেউ কথা বলল না।কারণ সবাই জানত—এটা শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়।

আনাস্তাসিয়ার প্রস্তাবকে চ্যালেঞ্জ করা মানে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

আর সেই সাহস রাশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডে খুব কম মানুষেরই আছে।

ভল্ক স্থির চোখে আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—

একজন কিংবদন্তি মাফিয়া কিং কেন এই দুই হীরার জন্য এত বিপুল মূল্য দিতে প্রস্তুত?

অন্যদিকে আদ্রিয়ানের মুখে কোনো বিস্ময় নেই।

সে শুধু একবার আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকাল।

সেই দৃষ্টিতে ছিল এমন এক অদ্ভুত নীরবতা, যা উপস্থিত কেউ বুঝতে পারল না।ভল্ক কোনো কথা বলল না।

কয়েক সেকেন্ড আনাস্তাসিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা কালো ভেলভেটের বাক্সটি তার দিকে এগিয়ে দিল।

আনাস্তাসিয়া বাক্সটির দিকে তাকালেনও না।

শুধু শান্ত কণ্ঠে বললেন,

__"আমান।"

একটি শব্দ।এর বেশি কোনো নির্দেশের প্রয়োজন হলো না।

আমান এগিয়ে এসে একটি কালো ব্রিফকেস টেবিলের ওপর রাখল। বায়োমেট্রিক লক খুলতেই ভেতরে দেখা গেল এনক্রিপ্টেড ব্যাংক ট্রান্সফারের নথি এবং নিরাপত্তা কোড।

সে ভল্কের দিকে তাকিয়ে বলল,

__"চুক্তি সম্পন্ন।"

ভল্ক নথিগুলো একবার দেখে মাথা নাড়ল।

আমান ভেলভেটের বাক্সটি হাতে তুলে নিয়ে আবার আনাস্তাসিয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

মিটিং শেষ।

একজন একজন করে সবাই সভাকক্ষ ছেড়ে চলে যেতে লাগল।কেউ কথা বলছে না।

কিন্তু প্রত্যেকেই বুঝতে পারছে—আজ শুধু দুটি হীরার মালিকানা বদলায়নি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের শক্তির ভারসাম্যও নীরবে বদলে গেছে।

কিছুক্ষণ পর বিশাল কক্ষে রইল মাত্র তিনজন।

আনাস্তাসিয়া।

আদ্রিয়ান।

আর আনাস্তাসিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমান।

আনাস্তাসিয়া ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে গেলেন।

তার জুতোর শব্দ পুরো কক্ষে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

আদ্রিয়ান স্থির দাঁড়িয়ে রইল।দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব।

তারপর আনাস্তাসিয়া নিচু, বরফ-শীতল কণ্ঠে বললেন,

__"মনে আছে... আমি তোমাকে একদিন সতর্ক করেছিলাম?"

আদ্রিয়ান হালকা হাসল।

__"অনেকেই আমাকে সতর্ক করে।"

আনাস্তাসিয়ার চোখে কোনো পরিবর্তন এলো না।

__"আমি বলেছিলাম... ভল্কের প্রেমিকাকে হত্যা করে তুমি ভুল করছ।"

নীরবতা।

__"তখন তুমি ভেবেছিলে একজন সাধারণ মেয়েকে সরিয়ে দিয়েছ।"

তিনি আরও এক পা এগিয়ে এলেন।

__"কিন্তু তুমি বুঝতে পারোনি... তুমি ভল্কের ভেতরের শেষ মানুষটাকেই হত্যা করেছ।"

আদ্রিয়ানের ঠোঁটের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

আনাস্তাসিয়া ফিসফিস করে বললেন,

__"যে মানুষের হারানোর কিছুই থাকে না... তাকে থামানোর ক্ষমতা পৃথিবীর কারও থাকে না।"

__"তুমি কি ওকে ভয় পাও?"

প্রথমবারের মতো আদ্রিয়ান প্রশ্ন করল।

আনাস্তাসিয়া মৃদু হাসলেন।

__"না।"

__"তাহলে?"

__"আমি শুধু জানি, সে কী করতে পারে।"

তিনি এক মুহূর্ত থামলেন।তারপর এমন একটি বাক্য বললেন, যা আদ্রিয়ানের মুখের রঙ বদলে দিল।

__"ভল্ক হীরা বিক্রি করেনি, আদ্রিয়ান... সে যুদ্ধ শুরু করেছে।"

কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।

আনাস্তাসিয়া ঘুরে দাঁড়ালেন হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আদ্রিয়ান এর কথায় থমকে যায়,

__"ভল্ক নিজেকে নেকড়ে ভাবে, অথচ সে একটা হায়না ছাড়া কিছুই নয়। তার পতনের দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে। আমি তাকে শুধু হারাব না—এমনভাবে ধ্বংস করব, যেন তার নাম উচ্চারণ করতেও মানুষ ভয় পায়।"

কথাটি বলে আদ্রিয়ান বাঁকা হাসলো তারপর স্থির দাঁড়িয়ে রইল।

আনাস্তাসিয়া দরজার কাছে গিয়ে থামলেন।

একবারও ফিরে না তাকিয়ে বললেন,

__"আর একটা কথা, আদ্রিয়ান।"

আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে মুখ তুলল।আনাস্তাসিয়ার কণ্ঠ আগের চেয়েও ঠান্ডা।

__"তুমি একটু আগে ভল্ককে হায়না বলেছিলে।"

এক মুহূর্তের নীরবতা।

__"হায়না মৃতদেহ খায়...,কিন্তু ভল্ক?"

সে এবার ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরলেন।

__"ভল্ক জীবিত শিকারকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাড়া করে।তাই তাকে অপমান করার আগে নিশ্চিত হয়ো... তুমি যেন তার শিকার হয়ে না যাও।"

আদ্রিয়ানের চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।সে বুঝতে পারল—এটা হুমকি নয়।এটা ছিল সতর্কবার্তা।কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর আদ্রিয়ান গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।

__"একটা কথা বলবে?"

__"বলো।"

__"তুমি আজকের মিটিংয়ে আসবে... সেটা আমাকে আগে জানাওনি কেন?"

আনাস্তাসিয়া নির্বিকার।

__"প্রয়োজন ছিল না।"

__"আমি তোমার স্বামী।"

___"তুমি আমার স্বামী—সেটা ঠিক। কিন্তু আমি নিজের সাম্রাজ্যের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কারও অনুমতি নিই না।"

আদ্রিয়ান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

__"এটাই তোমার সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাস।"

__"আর এটাই আমাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।"

ঠিক তখনই আদ্রিয়ানের চোখ গিয়ে থামল আমানের ওপর।আমান আগের মতোই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে।চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।তবু আদ্রিয়ানের মনে অদ্ভুত একটা বিরক্তি কাজ করল।আবারো এই আমান...,যেদিন থেকেই এসেছি, সেদিন থেকেই দেখছি আনাস্তাসিয়ার সাথে চিপকে থাকে।তার মনে হঠাৎ আরেকটি চিন্তা উঁকি দিল।সে কি আনাস্তাসিয়াকে ভালোবাসে?আদ্রিয়ান নিজের মনেই হালকা হেসে ফেলল।দুঃখের বিষয়, সে যতই চাইুক... আনাস্তাসিয়া আমার স্ত্রী।

আমান শুধু সংক্ষিপ্তভাবে বলল,

__"গাড়ি প্রস্তুত, আনাস্তাসিয়া।"

আনাস্তাসিয়া মাথা নাড়লেন।

__"আজ আর তোমার দরকার নেই, আমান।"

__"জি।"

আমান সম্মান দেখিয়ে সরে গেল।

দরজা বন্ধ হতেই বিশাল করিডরে শুধু আদ্রিয়ান আর আনাস্তাসিয়া রইল।আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।তারপর হঠাৎই আনাস্তাসিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

__"চলো।"

আনাস্তাসিয়া ভ্রু তুললেন।

__"কোথায়?"

আদ্রিয়ানের মুখে অনেকক্ষণ পর সত্যিকারের একটি হাসি ফুটল।

__"আজ সারাদিন যুদ্ধ, চুক্তি আর হুমকি শুনেছি।"

__"এবার আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে একটা মুধুর সময় কাটাতে চাই।"

__"কোনো মাফিয়া নয়,কোনো অস্ত্র নয়,কোনো রাজনীতি নয়,শুধু তুমি আর আমি।"

আনাস্তাসিয়া কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।বরফের মতো কঠিন মুখে খুব ক্ষীণ একটি হাসির রেখা ফুটে উঠল।

__এটা কি আদেশ?"

আদ্রিয়ান মাথা নাড়ল।

__"না,অনুরোধ।"

কয়েক সেকেন্ড পর আনাস্তাসিয়া ধীরে নিজের হাতটি তার হাতে রাখলেন।

__" আজ পর্যন্ত আমি তোমাকে অনুরোধ করতে দেখিনি, আমার কি সৌভাগ্য দ্যা গ্যাঁট মাফিয়া কিং আমাকে অনুরোধ করছে এই খুশিতে আমার এক গ্লাস পানিতে ডুবে মরে যেতে ইচ্ছে করছে"।

আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,

__"কারণ পৃথিবীকে আমি আদেশ দিই,কিন্তু তোমাকে নয়।"

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।পেছনে রয়ে গেল আলো-ঝলমলে সভাকক্ষ, কোটি কোটি ডলারের চুক্তি, আর আসন্ন যুদ্ধের ছায়া।

_____________>>>>>>>>>>>____________

মস্কো শহরে নির্জন রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছে এক তরুণী।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো গাড়ি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই হাঁটা শুরু করেছে সে। গন্তব্য এখনও বেশ দূরে, কিন্তু উপায় নেই। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তার বুকের ভেতর অজানা এক আতঙ্ক আরও তীব্র হয়ে উঠছে।হাঁটতে হাঁটতে অচেনা জায়গায় চলে এলো তরুণী। এটা ঠিক কোন জায়গা বুঝতে পারছে না। সে তৎক্ষণাৎ বুঝল কেউ একজন তার পিছু নিয়েছে। হঠাৎ “বাঁ” করে তাকাতেই দেখলো চারজন ছেলেকে দেখে সে চমকে গেল।

__“বেবি ডিডেন্ট ফিক্স মি বাই স্লিপিং !

মেয়েটি ভয় পেয়ে গেল। ছেলেটি এসে ওর হাত শক্ত করে ধরল। মেয়েটি চিৎকার করে উঠল।

__“লিভ মি, সেইভ সাম ওয়ান প্লিজ!”

মেয়েটি জোরে জোরে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে লাগলো আর তার হাত ছাড়ানোর জন্য মচরামুচরি করতে লাগলো।

অপরদিকে রাস্তায় জ্যাম থাকার কারণে বিরক্তিতে বাধ্য হয়ে আমানকে এই নির্জন রাস্তা দিয়ে যেতে হচ্ছে। সে মূলত হাসপাতাল থেকে ফিরছে আনাস্থাসিয়ার রিপোর্ট নিয়ে। আজ সারাদিনের ব্যস্ততার কারণে সকালে রিপোর্ট নিতে না যেতে পারার কারণে বিকেলে যেতে হয়েছে। তার চোয়াল শক্ত আর মুখ গম্ভীর থাকলেও মনে বেশ শান্তি অনুভব করছে।কারণ ডাক্তার জানিয়েছেন আনাস্তাসিয়া সিজোফ্রেনিয়া এবং সাইকোটিক ডিজঅর্ডার যা একটি গুরুতর মানসিক রোগ এ ভুগছিল।  এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি চরম সন্দেহপ্রবণতা, অতিরিক্ত রাগ ও হিংস্র আচরণের পাশাপাশি অসংলগ্ন কথা বলতে বা অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করতে পারে। কিন্তু আনাস্তাসিয়ার সিজোফ্রেনিয়া এবং সাইকোটিক ডিজঅর্ডার রোগটি কমে আসছে এবং সে এখন অনেকটাই সুস্থ।এই রোগের তীব্রতা কমে আসার সময় বা চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার পথে অনেক সময় তাদের মধ্যে শিশুর মতো সরল আচরণ ও দুষ্টুমি লক্ষ্য করা যায়। যা এখন আনাস্তাসিয়ার মাঝে মাঝেমধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা স্বাভাবিক তাই সে তার মানে একটু শান্তি অনুভব করছে। তার এই ভাবনা চিন্তার মধ্যেই হঠাৎ কারো চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো।বেশ কিছু সময় ধরে আওয়াজ ভেসে আসার কারণে সে গাড়ি থামায়। তার পর নিশ্চিত হওয়ার জন্য মনোযোগ দিয়ে শুনলো। না দূর থেকে কোন মেয়ের কন্ঠ ভেসে আসছে। সে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে সোজা হাঁটতে লাগলো। কিছুদূর যেতেই তার কপাল কুঁচকে গেল, দূরে চারজন ছেলে একটি মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার হাত চেপে ধরেছে তার মেয়েটা ছোটার জন্য ছটফট করছে। আনান তাদের দিকে যেতে যেতে চিৎকার করে বলে,

__“হেই লিভ হার!”

পুরুষালী কণ্ঠস্বর শুনে সামনে তাকালো মেয়েটি। ছাই রঙের কোট প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে আমান। পকেটে হাত গুঁজে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে সে। মেয়েটি কাঁপা গলায় বলল,

__“আমাকে বাঁচান, সেইভ মি প্লিজ!”

মেয়েটি নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে, তার মাঝে ছেলেটি চিৎকার করে উঠল—

__“হু দ্যা হেলার ইউ ম্যান?”

__“ইওর ফাদার।”

আমান গর্জে কথাটা বলল। ছেলেটি মেয়েটিকে ছেড়ে আমান এর দিকে এগোতেই আমান এক স্ট্রাইক দিয়ে সজোরে মাথায় আঘাত করল। মুহূর্তেই ছেলেটির নিথর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ছেলেটি কে পড়ে যেতে দেখে বাকি তিন জন ও এগিয়ে এলো মারার জন্য আমান তাদের মুখ বরাবর এক ঘুষি মারতেই এক এক করে তাদের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে গেল। তার পর চোখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকাতেই দেখল মেয়েটি কাঁদছে। তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। মেয়েটির চুল আর চোখ পিচ কালার, গায়ের রং ফর্সা, তার পরনে হলুদ মিনি টপস আর সাদা জিন্স। আমান মেয়েটির সামনে গিয়ে তর পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে,

__"হোয়াটস ইয়োর নেম?

আমান এর কথা শুনে মেয়েটি মাথা তুলে তার দিকে তাকালো। আমান মেয়েটিকে ইশারায় তার হাতের রুমালটি নিতে বললো, মেয়েটি আমান এর দিকে তাকিয়ে থেকে কাঁপা হাতে রুমালটি নিয়ে চোখ মুছে নেয়। আমান মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

__"ডোন্ট বি অ্যাফ্রেইড। অ্যাজ লং অ্যাজ আই'ম হিয়ার, নো ওয়ান ক্যান হার্ট ইউ। নাউ টেল মি, হোয়াটস ইয়োর নেম, অ্যান্ড হোয়াট ওয়ার ইউ ডুয়িং হিয়ার?"

মেয়েটি মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বলে,

__"চে...চে-রিন আহসান নিশা"।

নিশা মেয়েটি মিনমিন করে বলাই আমান তার কথা ভালোভাবে বুঝতে না পেরে কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকে বলে,

__" কি...কি বললে চেরি আহসান নেশা? এটা আবার কারো নাম হয় নাকি? এই সত্যি করে বলো তো তোমার নাম যে রেখেছে সে কি তখন নেশা করে ছিল যে ডিরেক্ট নেশা রেখে দিছে হুঁ "।

আমান এর কথা শুনে নিশা বুঝতে পারলো আমান তার নাম ভুল শুনেছে। তাই সে তাড়াতাড়ি দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,

__" আপনি ভুল বুঝছেন আমার নাম চেরি বা নেশা না আমার নাম চে-রিন আহসান নিশা"।

__" তোমার নাম চেরি নেশা যাই হোক আমার তাঁতে কি, চলো তুমি যেখানে যাচ্ছিলে সেখানে পোঁছে দিয়ে আসি, পরে আবার রাস্তা ঘাটে বিপদে পরলে আমি আসবো না তোমাকে বাঁচাতে"।

কথাগুলো বলে আমান কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল,

__" আর ইউ বেঙ্গলি?

নিশা মাথা উপর নিচ করে 'হ্যা' বলে। আমান আর কোন কথা না বলে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে,

__" ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠো"‌।

নিশা আর কিছু না বলে এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। নিশা গাড়িতে উঠতেই আমান গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি চলতে থাকে নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, গাড়ির মধ্যে দুটো মানুষ পাশাপাশি বসে থাকলেও কারো মুখে কোন কথা নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর আমান সামনের দিকে তাকিয়ে তাদের মাঝের নিরবতা ভেঙ্গে বলে,

__"শোনো, নেশা... ভয়কে নিজের দুর্বলতা বানিয়ো না। এই পৃথিবী দুর্বল মানুষকে করুণা করে না, সুযোগ নেয়। তাই শুধু মেয়ে বলে নিজেকে অসহায় ভাবার কোনো কারণ নেই। সাহস, বুদ্ধি আর আত্মবিশ্বাস—এগুলোই একজন মানুষের আসল শক্তি।

আজ আমি সময়মতো পৌঁছেছিলাম বলেই ওই চারজনের হাত থেকে তোমাকে বাঁচাতে পেরেছি। কিন্তু যদি আমি না আসতাম? যদি কয়েক মিনিট দেরি হয়ে যেত? একবারও কি ভেবেছ, তখন কী হতে পারত? জীবনে প্রতিবার কেউ এসে তোমাকে রক্ষা করবে—এমন আশা করা সবচেয়ে বড় ভুল।

মনে রেখো, তোমার নিরাপত্তার প্রথম দায়িত্ব তোমার নিজের। নিজের ভয়কে জয় করতে শেখো, নিজের মনকে ইস্পাতের মতো শক্ত করো। আত্মরক্ষার কৌশল শেখো, বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখো, আর অন্যায়ের সামনে কখনো মাথা নত কোরো না।

মনে রেখো, সাহসী মানুষ জন্মায় না—সাহসী মানুষ তৈরি হয়। প্রতিটি কঠিন অভিজ্ঞতা তাকে আরও শক্ত করে তোলে। আজকের এই ঘটনাকে দুর্বলতার স্মৃতি বানিয়ো না; এটাকে তোমার শক্তিতে পরিণত করো।

আর একটা কথা... আজ আমি ছিলাম বলে তুমি নিরাপদ। কিন্তু আগামীকাল হয়তো আমি থাকব না। তাই এমন একজন মানুষ হও, যার দিকে বিপদ এগিয়ে আসার আগে দু'বার ভাবতে বাধ্য হয়। নিজের লড়াই নিজেই লড়তে শেখো। কারণ শেষ পর্যন্ত, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রক্ষক তুমি নিজেই।"

নিশা শুরু উপর নিচ মাথা নাড়াল। আমান আর কোন কথা না বলে গাড়ি চালাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর গাড়িটি বিশাল বড় একটি  বিল্ডিং এর সামনে থামে।

__" তোমার বাড়ি এসে পড়েছে এবার নামো"।

নিশা কোন কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে যায়। তার বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে, কিছু দূর যেতেই কিছু একটা মনে করে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। গাড়ির গ্লাসে দুই তিন বার নক করতেই আমান গাড়ির কাচ নামিয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই সে বলে,

__" থ্যাংক ইয়ু আমাকে বাঁচানোর জন্য"।

__" এতে থ্যাংক ইয়ু বলার কিছু নেই আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও এই সেম কাজ টাই করতো"।

আমান আর কিছু না বলে গাড়ির কাচ উঠিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে যায়। নিশা আমান এর যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেও বাড়ির ভেতরে চলে যায়।

(চলবে....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন