ফন্ট সাইজ:
থিম:
Blue Ink & Thorns

১০ম পর্ব

লেখক: Rahmatunnesa

"#‌Blue Ink & Thorns'

লেখিকা রহমাতুন্নেছা 
#পর্ব১০
নিপাকে দেখে পিউ, সারা আর আনিতা ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, তারপরই সবাই একসাথে চিৎকার করে ওর দিকে ছুটে গেল। পিউ আর সারা ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
""তুই একটা আস্ত পচা মেয়ে!"" আনিতা নিপাকে বকা দিতে দিতে বলল, ""এতদিন ধরে তোর কোনো খোঁজ নেই কেন? ফোন দিয়েছি, রিং হয়েছে কিন্তু ধরিসনি। আমরা যে কত টেনশন করেছি তুই জানিস?""
পিউ ওর গাল টিপে দিয়ে বলল, ""সত্যিই তো! দুই বছর ধরে তুই কেমন যেন হয়ে গেছিস। আমাদের এভাবে ভুলে থাকতে পারলি?""
নিপা হালকা একটু ম্লান হেসে নিজেকে সামলে নিল। ওর চোখের নিচের হালকা কালো দাগটা বন্ধুদের চোখ এড়াল না, কিন্তু ও সেটা আড়াল করে বলল, ""আরে না রে, তোদের ভুলিনি। আসলে খুব অসুস্থ ছিলাম কয়েকদিন। আর আমার ফোনটাও হুট করে নষ্ট হয়ে গেছে, তাই কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। সরি রে তোরা!""
সারা নিপার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ""নিপা মুখ ফুটে অসুস্থতার কথা বললেও ওর চোখে যেন অন্য কোনো ভয়ের ছায়া লুকিয়ে আছে।"" 
কিন্তু বন্ধুদের আড্ডার এই খুশির মাঝে ও আর কথাটা বাড়াল না।
এদিকে রোহান যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকে নড়ার শক্তি যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা এখন আরও তীব্র হয়েছে। ক্যামেরার লেন্সের সেই অচেনা, মায়াবী মেয়েটা আজ তার চোখের সামনে, তার নিজের বন্ধুদেরই একজন! রোহানের মনে হলো, পুরো পৃথিবীটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেছে। ওর ভেতরের সমস্ত অনুভূতি যেন এক সুরে গাইছে—""একেই তো আমি খুঁজেছি।""
রোহান কিছুটা এগিয়ে এসে নিপার দিকে তাকাল। ওর চোখে তখন এক আকাশ মুগ্ধতা আর আকুলতা। ও ভাবল নিপা হয়তো ধানমন্ডি লেকের সেই দিনের কথা মনে করে ওকে চিনতে পারবে।
কিন্তু নিপা যখন রোহানের দিকে তাকাল, ওর চোখের দৃষ্টি ছিল একদম শান্ত এবং শীতল। ও রোহানকে চেনা তো দূরের কথা, এমনভাবে তাকাল যেন রোহান এই ক্যাম্পাসের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই একজন অপরিচিত মানুষ। নিপা কোনো কথা না বাড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে আবার সারা আর পিউয়ের সাথে হাসাহাসি করতে লাগল।
নিপার এই 'না চেনার ভান' করাটা রোহানের বুকে তীরের মতো বিঁধল। ওর মনে এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো—একদিকে মায়াবী কন্যাকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র আনন্দ, অন্যদিকে তার এই উদাসীনতায় এক অজানা কষ্ট। 
রোহান মনে মনে ভাবল, ""তুমি কি আসলেও আমাকে চেনোনি, নাকি চিনেও না চেনার ভান করছ? তোমার এই শান্ত চোখের আড়ালে কোন গল্প লুকিয়ে আছে?" রোহান এবার নিপার পোশাকের দিকে লক্ষ্য করল"নিপার পোশাক দেখে রুহানের একটুও ভালো লাগলো না , নিপা ছেলেদের মতন পোশাক পরছে , এটা রোহানের পছন্দ হলো না । একজন নারী তো নারীর মতনই সাজা উচিত সে কেন ছেলেদের মতন পোশাক পড়েছে।
সোহান রোহানের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ""কী রে শান? তুই এভাবে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ছবি তুলবি না?""
রোহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যামেরাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। আজ তার আর ছবি তুলতে ইচ্ছে করছে না। তার মনের ক্যানভাসে এখন কেবল নিপার ওই উদাসীন, মায়াবী মুখটাই ভাসছে।
রোহান নিপার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই কৌতূহল মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল, ""আচ্ছা, ইনি কে? এনাকে তো ঠিক চিনলাম না।""
সারা তখন নিপার কাঁধে হাত দিয়ে হেসে বলল, ""রোহান ভাইয়া, এ হলো নিপা। আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড! ওই যে একটু আগে যার কথা বলছিলাম।""
""ও আচ্ছা..."" রোহান মনে মনে এক মায়াবী ঝংকার অনুভব করল। সে নিপার একটু কাছে এগিয়ে গেল। নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল, ""হাই! আমি শান আহমেদ রোহান।""
রোহান ভাবছিল নিপা হয়তো তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটিতে হাত রেখে আলতো করে 'হ্যালো' বলবে। কিন্তু নিপা তেমন কিছুই করল না। সে রোহানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল ও ছোট করে উত্তর দিল, ""আমি নিপা ইসলাম নদী।""
ব্যাস, এইটুকুই! কথাটি বলেই নিপা হাত না মিলিয়েই সেখান থেকে ঘুরে সারা আর পিউয়ের দিকে চলে গেল। রোহান শূন্যে ভেসে থাকা নিজের হাতটা গুটিয়ে নিল এবং কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। মুহূর্তের জন্য ঘটনাটা রোহানের কাছে বেশ অপমানজনক মনে হলো। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়; সে মনে মনে ভাবল, ""উহ্! মায়াবী কন্যার মন জয় করতে হলে এমন আরও কত অপমান সহ্য করতে হবে কে জানে! বুঝতে পারছি আমার কপালে বেশ দুঃখ আছে।"" তবে সে এই অপমানকে মনে না জমিয়ে মনে মনে একটা জেদ চেপে নিল।
সোহান রোহানের অবস্থা বুঝতে পেরে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল, ""কী হলো রে শান? চল, সবাই আবার বসি।""
সবাই মিলে গোল হয়ে আমগাছতলার বেঞ্চগুলোতে বসে পড়ল। রোহান কায়দা করে এমন একটা জায়গায় বসল, যা ঠিক নিপার সামনাসামনি। সে মূলত নিপার সম্পর্কে আরও কিছু জানার জন্য কথার সূত্রপাত করতে চাইল।
রোহান বলল, ""আচ্ছা, আমরা তো এখানে সবাই সবার বন্ধু, কিন্তু সত্যি বলতে আমরা তো কাউকে সেভাবে চিনি না—শুধু নামটা ছাড়া। চলো না, আজ সবাই নতুন করে সবার একটু বিস্তারিত পরিচয় দিই! এতে আড্ডাটাও জমবে, জানাশোনাটাও বাড়বে।""
সোহান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল রোহান। সোহানও ভাইয়ের মতলব বুঝতে পেরে সায় দিয়ে বলল, ""হ্যাঁ, তুই একদম ঠিক বলছিস শান! আমরা তো শুধু সবার নামটাই জানি, সেভাবে ভেতরের পরিচয়টা জানা হয়নি। চলো, আজ আমরা সবাই সবার সুন্দর একটা পরিচয় দিই।""
সবাই রাজি হতেই রোহান নিজেই প্রথমে বলা শুরু করল। সে সোজা হয়ে বসে নিপার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ""ওকে, ফার্স্ট টার্ন আমার। আমার বাবার নাম আশফাক আহমেদ। আর আমি হলাম শান আহমেদ রোহান—আহমেদ ভিলার সবচেয়ে ছোট ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি আহমেদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অন্যতম ছোট মালিক। যদিও আমার আসল পরিচয় আমি একজন ফটোগ্রাফার!""
রোহানের এমন রাজকীয় পরিচয় শুনে বন্ধুরা সবাই বেশ নড়েচড়ে বসল। এবার সোহানের পালা।
সোহান গিটারটা পাশে রেখে হেসে বলল, ""এবার আমার পরিচয়। আমি আহমেদ ভিলার সেজো ছেলে—সোহান আহমেদ। আমাদের বাবার রাজকীয় বিজনেস বা কোম্পানির আমি ও রোহান দুজনই সমান অংশীদার, অর্থাৎ আমিও আহমেদ গ্রুপের অন্যতম ছোট মালিক। তবে 
বিজনেসের চেয়ে আমার বেশি ভালো লাগে এই গিটারের তারে সুর তুলতে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে।""
আহমেদ ভিলার দুই রাজপুত্রের এমন নিখাদ ও বড় পরিচয় শুনে পিউ আর আরাফ তো হা হয়ে গেল। আর রোহান তখন নিপার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ""এবার তোমার পালা নিপা ইসলাম নদী, দেখি তুমি তোমার পরিচয় কী দাও!""
সোহানের পর এবার বললো আরাফ। আরাফ একটু সোজা হয়ে বসে, নিজের স্বভাবসুলভ হাসিমুখটা বজায় রেখেই বলা শুরু করল, ""ভাইয়া, আপনারা তো আহমেদ ভিলার রাজপুত্র! এবার আমাদের মতো সাধারণ পাবলিকের পরিচয় শুনুন। আমার পুরো নাম আরাফ রহমান শুভ। দেখতে আমি অত সুদর্শন নই, এই একটু শ্যামলা গায়ের রং—যার কারণে কলেজের কোনো মেয়ে আজ পর্যন্ত আমাকে পাত্তাই দিল না!""
আরাফের আত্মপক্ষ সমর্থনের কথা শুনে পিউ ফিসফিস করে বলল, ""বাঁদরকে আবার মেয়ে পাত্তা দেবে কীভাবে!"" 
আরাফ সেটা গায়ে না মেখে বলতে থাকল, ""ঢাকা থেকে একটু দূরে বিক্রমপুরের শিমুলিয়া গ্রামে আমাদের বাড়ি। আমার বাবার নাম মশিউর রহমান আর মায়ের নাম আমেনা বেগম। আমার একটা ছোট বোন আছে, ওর নাম রুহি। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, বাবা-মায়ের অনেক কষ্ট আর স্বপ্ন নিয়ে ডাক্তার হওয়ার জন্য ঢাকায় এসেছি। আমার বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ছোটখাটো একটা চাকরি করেন।""
আরাফের পর পিউ তার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে নিজের পরিচয় দেওয়া শুরু করল, ""আমার নাম পিউ আক্তার নিশি। আমার বাবার নাম আনোয়ার হোসেন আর মায়ের নাম রাজিয়া সুলতানা। আমাদের পরিবারে আমার ছোট ছোট দুইটা জমজ ভাই আছে, ওদের নাম রায়ান আর রিয়ান। আমরা সবাই একসাথেই থাকি। বাবা-মা দুজনেই বেঁচে আছেন আমাদের যৌথ পরিবার, চাচা-চাচিরাও আমাদের সাথেই এক বাড়িতে থাকেন। ধানমন্ডি থেকে আমাদের বাসাটা খুব বেশি দূরে নয়, হাজারীবাগ এলাকায়।"" 
এবার সবার নজর গেল সিয়ামের দিকে। সিয়াম এতক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরিটা বন্ধ করে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করল, ""আমার পুরো নাম সিয়াম রহমান জয়। তবে... আমি আমার বাবা-মায়ের নাম আজ বলব না।""
সিয়ামের মুখে এই কথা শুনে আড্ডার সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। আনিতা আর সারার হাসিমুখটাও ম্লান হয়ে গেল। সিয়াম সবার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে একটা ম্লান মুচকি হাসি দিয়ে আবার বলা শুরু করল, ""আমার বাবা-মা দুজনেই বেঁচে আছেন, কিন্তু তারা আলাদা থাকেন। তাদের এখন নিজস্ব আলাদা সংসার আছে। আর সেই সংসারে তাদের অন্যান্য ছেলে-মেয়েরাও আছে। তারা তাদের নিয়ে খুব সুখে আছেন। তাই আমার নিজের নামের সাথে তাদের নাম না জড়ালে বোধহয় চলবে। ওনাদের নাম না জানলেও তোদের কোনো ক্ষতি হবে না।""
সিয়ামের এই কঠিন সত্যটা শুনে পুরো আড্ডার পরিবেশটা এক মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল। সবার মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। এত প্রাণবন্ত একটা ছেলের পেছনে যে এত বড় একটা কষ্টের গল্প লুকিয়ে আছে, তা কেউ ভাবেনি।
সিয়াম সবাইকে এভাবে চুপ হয়ে যেতে দেখে হালকা হেসে পরিবেশটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল, ""আরে, তোরা ওভাবে মন খারাপ করছিস কেন? আমি তো একা নই তোরাও তো আমার পরিবার তাই না। আমি আমার নানুর কাছে থাকি। এই যে আরাফ দেখছিস না? আমাদের বাসা একদম পাশাপাশি। আমার নানু অনেক কষ্ট করে নিজের জমানো টাকা আর ছোটখাটো কাজ করে আমাকে আজ এতদূর পড়াশোনা করাচ্ছেন। আমি যেন একজন ভালো ডাক্তার হতে পারি, এটাই ওনার জীবনের শেষ ইচ্ছা।""
রোহান এতক্ষণ নিপার দিকে তাকিয়ে থাকলেও সিয়ামের কথা শুনে সে বেশ অবাক হলো। সে জিজ্ঞেস করল, ""তাহলে তোমরা দুজনে একদম এক জায়গায় থাকো?""
সিয়াম মাথা নেড়ে বলল, ""জ্বী ভাইয়া, আমাদের বাসা পাশাপাশি। আমরা দুজনেই একই গ্রামে থাকি আর ঢাকায় এসেও একি মেসে থাকি এবং একই রুমে থাকি।""
রোহান বলল, ""ও আচ্ছা! খুব ভালো তো।""
সিয়াম তখন রোহানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ""রোহান ভাইয়া, আর একটা কথা বলি। তোরা সবাই তো ২০ বছর বয়সে থার্ড ইয়ারে পড়ছিস, কিন্তু আমার বয়স কিন্তু ২২ বছর।""
কথাটা শুনে এবার রোহানসহ বাকি সবাই সিয়ামের দিকে গোল গোল চোখে তাকাল। আনিতা অবাক হয়ে বলল, ""মানে? তুমি আমাদের চেয়ে দুই বছরের বড়?""
সিয়াম একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে স্মৃতির পাতায় ফিরে গেল, ""হ্যাঁ । আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে, অর্থাৎ আমার যখন মাত্র ৮ বছর বয়স—তখন বাবা-মা যখন আমাকে একদম একা ফেলে যে যার মতো চলে গেল, তখন নানু আমাকে ওনাদের ওখান থেকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। ওই মানসিক ধাক্কায় আমার দুই-তিনটা বছর নষ্ট হয়ে যায়। আমি তখন আর একদমই পড়াশোনা করতে চাইনি, সব ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার নানু হাল ছাড়েননি। তিনি জোর করে আমাকে আবার প্রথম থেকে নতুন স্কুলে ভর্তি করিয়ে পড়াশোনা শুরু করান। নানুর এই ত্যাগের জন্যই আজ আমি এই মেডিকেল কলেজে বসার সুযোগ পেয়েছি, নইলে হয়তো আজ কোনো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম।""
সিয়ামের জীবনের এই করুণ আর অবিশ্বাস্য অতীত শুনে আড্ডার সবাই একদম হাঁ হয়ে গেল 🥺। সারা আর আনিতার চোখ জোড়া পানিতে টলমল করে উঠল। রোহান আর সোহান দুই ভাই সিয়ামের দিকে এক গভীর শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যে ছেলেটার জীবনে এত বড় ঝড় গেছে, সে কীভাবে প্রতিদিন এত সুন্দর করে হাসে, এটা ভেবে সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। আর নিপা? সে সিয়ামের কষ্টের কথা শুনে নিজের ভেতরের কোনো এক গোপন কষ্টের সাথে মিল খুঁজে পেয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
সিয়ামের জীবনের গল্প শুনে আমগাছতলার পরিবেশটা যখন বেশ ভারী হয়ে উঠেছিল, তখন আনিতা পরিবেশটা হালকা করার জন্য একটু সোজা হয়ে বসল এবং নিজের পরিচয় দেওয়া শুরু করল।
""এবার আমার পালা,"" আনিতা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল। ""আমার পুরো নাম আনিতা রহমান মিম। সিয়াম আর আরাফদের গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামটা আর একটু বেশি দূরে, তবে একই জেলায়। আমাদের পরিবারে আমার একজন বড় বোন আর একটি ছোট ভাই আছে। আমার বড় বোনের নাম তানিয়া আর ছোট ভাইয়ের নাম রাফি। আমার বাবার নাম খলিলুর রহমান আর মায়ের নাম জাহানারা বেগম।""
আনিতা যখন তার মায়ের নাম বলছিল, তখন তার চোখে এক পলকের জন্য একটা সুপ্ত কষ্ট ভেসে উঠলেও সে মুখে হাসি ধরে রাখল। 
আসলে সত্যটা হলো, (আনিতাকে জন্ম দেওয়ার সময়ই তার নিজের মা মারা যান। এরপর তার সৎ মা-ই তাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসা আগলে রাখে নেয়, তাকে বিয়ে দিতে চাইছিল এক বুড়ো লোকের সাথে আনিতা মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফিরলো, আনিতা সেই দিনগুলো আর মনে করতে চায়না। তানিয়া আর রাফি হলো তার সৎ মায়েরই সন্তান। কিন্তু আনিতা বন্ধুদের কাছে কখনো তাদের আলাদা করে দেখায় না, তাই সে এমনভাবেই বলল যেন তার মা মারা যাননি এবং এই জাহানারা বেগমই তার আপন মা)।
সোহান আর রোহান মুগ্ধ হয়ে আনিতার কথা শুনল। এবার সবার চোখ গেল সারার দিকে। সারা তার হেলমেটটা পাশে রেখে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হাসল।
""এবার আহমেদ ভিলার রাজপুত্ররা আমার পরিচয় শুনুন,"" সারা তার চিরচেনা চঞ্চল গলায় বলল। ""আমার আর আনিতার বাসা একদম এক জায়গায়, অর্থাৎ আমরা একই এলাকায় পাশাপাশি থাকি। আমার পুরো নাম শারিন সরকার সারা। আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, তাই আমার কোনো ভাই-বোন নেই। আমার বাবার নাম রফিক সরকার আর মায়ের নাম রেহানা পারভীন। ব্যস, এইটুকুই আমার ছোট্ট পরিচয়!""
সারার পরিচয় দেওয়া শেষ হতেই রোহান নিপার দিকে তাকাল। বন্ধুদের প্রায় সবার পরিচয় জানা শেষ, এবার কেবল বাকি রয়েছে সেই মায়াবী কন্যার আসল পরিচয় জানার। রোহানের বুকের ভেতর আবার নতুন করে ধুকপুকানি শুরু হলো, সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল নিপার মুখ থেকে তার নিজের জীবনের গল্প শোনার জন্য।
রোহান এবার নিপার দিকে সরাসরি তাকিয়ে কিছুটা নরম আর উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করল, 
""আপনার পরিচয়টা দেবেন না মিস নিপা?""
নিপা এক পলকের জন্য মাথা তুলে সোজা রোহানের চোখের দিকে তাকাল। রোহানের সেই গভীর চোখের দৃষ্টিতে যেন এক অদ্ভুত মায়া আর মুগ্ধতা লুকিয়ে আছে। সেই চাউনিতে কী ছিল—ভালোবাসা, আকুলতা নাকি অন্য কিছু—তা নিপা বুঝতে পারল না। কিন্তু ওই চোখে চোখ সে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। এক অজানা অস্বস্তিতে নিপা সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখ সরিয়ে নিল। সে মাটির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, 
""আমার পরিচয়টা নেওয়া কি খুবই জরুরি?""
রোহান একটু হেসে বলল, ""অবশ্যই মিস! 
এখানে সবাই সবার এত সুন্দর সুন্দর পরিচয় দিল, আপনি কেন বাদ থাকবেন?""
নিপা আর না করতে পারল না। সে মাথা নিচু করে খুব শান্ত গলায় নিজের পরিচয় দেওয়া শুরু করল, ""আমার পুরো নাম নিপা ইসলাম নদী। আমার বাবা নেই, আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখনই বাবা মারা গেছেন। আমার মা-ই আমাকে অনেক কষ্ট করে ছোট থেকে একা মানুষ করেছেন। ব্যস, এইটুকুই।""
নিপা শুধু এইটুকু বলেই চুপ হয়ে গেল। সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি—অর্থাৎ দুই বছর আগে যে তার বিয়ে হয়েছে, সেই বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে গেল। বন্ধুদের আড্ডায় সে তার বিয়ের ব্যাপারে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। আসলে এই ভার্সিটির আর কোনো ছাত্র-ছাত্রী বা শিক্ষক নিপার বিয়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না, কেবল তার এই পাঁচজন ক্লোজ ফ্রেন্ড ছাড়া। আর আজ তার বন্ধুরা সাধু বশেই এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলল না বা মাথা ঘামাল না। তারা জানে নিপা নিজের বরের ব্যাপারে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, আর সবার সামনে এই নিয়ে কথা উঠলে হয়তো সে লজ্জা পাবে বা গুটিয়ে যাবে। 
বন্ধুদের এই নীরবতার কারণে রোহান বিন্দুমাত্র টের পেল না যে তার চোখের সামনে বসে থাকা এই মায়াবী কন্যাটি আসলে অন্য কারও খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছে। সে কি কখনো জানতে পারবে এই নির্মম সত্যটা? কি জানি, সে উত্তর হয়তো সময়ই বলে দেবে!
ভারী হয়ে যাওয়া পরিবেশটা হালকা করতে সারা এবার রোহানের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ""রোহান ভাইয়া, আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ! আপনি যদি আজ এভাবে সবার পরিচয় জানতে না চাইতেন, তবে তো আমরা এতদিনের বন্ধু হয়েও কেউ কারও পেছনের এত সুন্দর আর কষ্টের গল্পগুলো জানতেই পারতাম না।""
পিউ আর আনিতাও একসাথে সায় দিয়ে বলল, ""হ্যাঁ ভাইয়া, সত্যিই! আপনার জন্যই আজ আমরা সবার সম্পর্কে কত কিছু জানতে পারলাম। আপনাকে অনেক থ্যাংকস! আমরা প্রতিদিন একসাথে আড্ডা দিই ঠিকই, কিন্তু কেউ কখনো কারও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে ওভাবে ঘাঁটাঘাঁটি করিনি।""
রোহান তখন নিজের ভেতরের সব তোলপাড় লুকিয়ে মুখে একটা অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বলল, ""আরে না না, এতে ধন্যবাদের কী আছে! সমস্যা নেই। বন্ধুদের একে অপরকে পুরোপুরি জানাটা তো দরকার, তাই না?""
মুখ দিয়ে এ কথা বললেও রোহানের মন তখন নিপা নামের ওই শান্ত মেয়েটার ভেতরেই আটকে রইল। ও জানত না, এই চঞ্চল বন্ধুত্বের আড়ালে সবার অজান্তেই কোন নিয়তি অপেক্ষা করছে।
চলবে,,,",,,,,,
আমার এই গল্পটি হবে একটু রোমান্টিক একটু কষ্ট এবং মজার ফানি থাকবে এই গল্প আমার গল্পর পাশে থাকবেন এবং জানাবেন কেমন হয়েছে ধন্যবাদ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন