ফন্ট সাইজ:
থিম:
Blue Ink & Thorns

১১তম পর্ব

লেখক: Rahmatunnesa
‌Blue Ink & Thorns'
লেখিকা রহমাতুন্নেছা 
পর্ব১১

সোহান গিটারের তারে শেষ একটা মৃদু টোকা দিয়ে হেসে বলল, ""আচ্ছা, সবার জীবনের পরিচয় তো জানা গেল। চলো, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। সবার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে একটু জানা যাক। এখানে কারোর মনে কোনো বিশেষ পছন্দ বা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে নাকি?""

আরাফ সাথে সাথে সায় দিয়ে বলল, ""ভাই, আপনি একদম ঠিক কথা বলছেন! এই খবরটা জানা তো সবচেয়ে বেশি জরুরি।""
সোহান সবার দিকে তাকিয়ে একটু রহস্যময় হেসে বলল, ""তবে শুরুটা আমিই করি। বর্তমানে আমার পছন্দের বা রিলেশনের কেউ নেই ঠিকই, কিন্তু... আমি একজনকে ভীষণ পছন্দ করি।""
রোহান সোজা হয়ে বসে চোখ বড় বড় করে বলল, ""কী বলিস সোহান! তুই কাউকে পছন্দ করিস আর আমি জানি না?""
সোহান এবার সত্যি সত্যিই একটু লজ্জা পাওয়ার ভান করে মাথা চুলকে বলল, ""হুম...""
সোহানের মুখ থেকে এই কথা শোনা মাত্রই সারা, পিউ আর আনিতা একসাথে ""ওহোওও!"" বলে চেঁচিয়ে উঠল। পুরো আমগাছতলা যেন ওদের চিৎকারে কেঁপে উঠল।
রোহান কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ""তা সেই লাকি মেয়েটি কে? সে কি জানে তুই তাকে পছন্দ করিস?""
সোহান একটু মাথা নিচু করে ম্লান হাসল, তারপর বলল, ""না, সে এখনো জানে না। তবে জানবে, খুব শীঘ্রই জানবে।"" কথাটি বলার সময় সোহান আড়চোখে একবার আনিতার দিকে তাকাল। আনিতা সেটা খেয়াল করে আবার মাটির দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটতে লাগল।
এবার আরাফ বুক ফুলিয়ে বলল, ""ভাইয়া, আপনার তো শুধু পছন্দ, আর আমার জীবনে একদম পাকাপোক্ত ভালোবাসা আছে!""
সবাই এবার আরাফের দিকে একযোগে ঝুঁকে পড়ে চিল্লিয়ে বলল, ""কীইই! কে সে? জলদি বল!""
আরাফ দুই কানে হাত দিয়ে বলল, ""আরে বাপুরে, তোরা একটু চুপ করবি? কানের পর্দা তো ফাটায় দিলি! বলতে তো দে আগে... আমার ভালোবাসা আর কেউ না, আমার ওই সাধের লাল পালসার বাইকটা!""।
আরাফের কথা শুনে সবার উত্তেজনায় জল পড়ে গেল।
পিউ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ""ও আচ্ছা! বাইক? তাই তো বলি! এই কালাচাঁদকে আবার দুনিয়ায় কোন মেয়ে ভালোবাসবে!""
আরাফ দাঁত কটমট করে পিউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ""কেন? তুই বাসবি?""
পিউ মুখ ভেঙচিয়ে বলল, ""বয়ে গেছে আমার তোকে ভালোবাসতে! তোকে ভালোবাসার চেয়ে আমি সারাজীবন সিঙ্গেল থাকব। তাছাড়া, আমি অলরেডি অন্য একজনকে ভালোবাসি।""
পিউয়ের এই আকস্মিক বোমা ফাটানো কথায় আড্ডার সবাই এবার চোখ মোটা মোটা করে ওর দিকে তাকাল।
সারা পিউয়ের হাত চেপে ধরে বলল, ""কী বলছিস তুই পিউ? তুই প্রেম করছিস আর আমরা তোর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও কিচ্ছু জানি না?""
পিউ এবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঢোক গিলল। ও একটু আমতা আমতা করে বলল, ""আরে... তোরা যেভাবে ধরছিস! রিলেশনটা তো মাত্র একদিন হলো।""
আনিতা বলল, ""একদিন হোক আর এক ঘণ্টা, জলদি বল কে সে? কাকে ভালোবাসিস তুই?""
পিউ তখন বেশ লজ্জা পাওয়ার ভান করে, দুই হাতে মুখ ঢেকে বলল, ""ওর নাম আরিয়ান। ফেসবুকে আমাদের পরিচয় হয়েছিল মাস ছয়েক আগে। তারপর কথা বলতে বলতে কাল ও আমাকে সামনাসামনি দেখা করে প্রপোজ করেছে, আর আমিও না করতে পারিনি।""
আনিতা এবার আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল, ""ওরে বাবারে! তুই এত দূর চলে গেলি অথচ আমরা বিন্দুমাত্র জানতে পারলাম না? ও আল্লাহ, উপর থেকে একটা দড়ি পাঠাও, এই মেয়েটাকে বেঁধে ঝুলিয়ে দিই!""
বন্ধুদের মাঝে যখন পিউ আর আরিয়ানকে নিয়ে তুমুল হাসাহাসি আর খুনসুটি চলছিল, তখন টেবিলের এক কোণে বসা আরাফের মুখটা হঠাৎ করেই কেমন যেন কালো হয়ে গেল। সে আর আগের মতো হাসছিল না, বরং পিউয়ের লজ্জামাখা মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। পিউ আসলেও অন্য কারও হাত ধরে ফেলেছে, এই সত্যিটা যেন আরাফ কোনোভাবেই হজম করতে পারছিল না।
আরাফের হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়াটা সারার চোখ এড়াল না। সারা একটু অবাক হয়ে ভাবল, যে ছেলে সারাক্ষণ পিউয়ের সাথে ঝগড়া করে, সে আজ পিউয়ের প্রেমের কথা শুনে এমন পাথর হয়ে গেল কেন? তবে সারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পিউয়ের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলল, 
""ঠিক আছে, আরিয়ান ভাইয়াকে একদিন আমাদের ক্যাফেতে ট্রিট দিতে বলবি, নয়তো এই রিলেশন আমরা মঞ্জুর করছি না!""
পিউ হেসে বলল, ""আচ্ছা বাবা, দেব। ও তোদের সবাইকে ট্রিট দেবে বলেছে।""
সবাই যখন হাসাহাসি করছে, আরাফ তখন জোর করে মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, ""ভাইয়া, আমার একটু কাজ আছে। লাইব্রেরি থেকে একটা বই নেওয়ার ছিল, আমি আসি।"" 
বলেই আরাফ কারও উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল। পিউ একবার আরাফের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকাল, ওর মনে হলো আরাফের আচরণটা আজকে একটু অন্যরকম।
সোহান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ""আচ্ছা, অনেক আড্ডা হলো। আমাদের আবার একটু আহমেদ গ্রুপে যেতে হবে, বড় ভাইয়া একা সব সামলাচ্ছে। শান, চল।""
রোহান নিপার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। নিপা তখনো নিজের খেয়ালে মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। রোহান মনে মনে বলল, ""আজ চললাম মায়াবী কন্যা, কিন্তু আমাদের গল্পটা এখানেই শেষ নয়।"" দুই ভাই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
বিকেলের দিকে সারা আর আনিতা যখন ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে স্কুটির দিকে যাচ্ছে, তখন আনিতা সারাকে ফিসফিস করে বলল, ""সারা, একটা জিনিস খেয়াল করেছিস? রোহান ভাইয়া কিন্তু সারাক্ষণ নিপার দিকে ওভাবে তাকিয়ে ছিল কেন বলতো?""
সারা স্কুটির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ""আরে, রোহান ভাইয়া তো ফটোগ্রাফার। সুন্দর মানুষ দেখলে ওনাদের নজর ওদিকেই যায়। কিন্তু তুই সোহান ভাইয়ার কথা চিন্তা কর! উনি যখন বললেন 'আমি একজনকে পছন্দ করি', তখন কিন্তু সরাসরি তোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন! এই আনিতা, বল তো কাহিনী কী?""
আনিতা সারার পিঠে একটা কিল মেরে বলল, ""ধুর! কী যা তা বলিস! উনি আহমেদ ভিলার মেজো ছেলে, ওনার পছন্দের মেয়ে কত হাইফাই হবে। আমার দিকে কেন তাকাবেন?"" আর তুই তো সব জানিস তাহলে এমন কেন বলছি, 
সারা হাসতে হাসতে বলল, ""আহা! আমাদের আনিতা মিম কি কম নাকি? 
আমি সব জানি বলেই তো এতো দুশ্চিন্তা, 
কিছু বললি
না উঠে বস
এদিকে আহমেদ গ্রুপের আলিশান কেবিনে তখনো বিষাক্ত সাপের মতো ফুঁসছে ইশতিয়াক আহমেদ ইমন। টেবিলের ওপর সেই লবণের কফির কাপটা এখনো রাখা। ইমনের রাগ যেন কিছুতেই কমছে না। সে তার চেয়ারে হেলান দিয়ে কানের লতির তিলটা চুলকাতে চুলকাতে ডায়েরিতে বড় বড় অক্ষরে লিখল— ""শারিন সরকার সারা: সাজা স্থগিত রইল, বাতিল নয়।""
ঠিক তখনই আয়ান কেবিনে ঢুকে ফাইলপত্র রাখতে রাখতে বলল, ""ভাইয়া, এখনো ওই লবণের কফির রাগ কমেনি? আচ্ছা, মেয়েটার কিন্তু সাহস আছে বলতে হবে। রিল্যাক্স ভাইয়া!""
ইমন আয়ানের দিকে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ""আয়ান, এই মেয়েটার পুরো ডিটেইলস আমার চাই। ও কোথায় পড়ে, কী করে, সবকিছু। ও ভেবেছে আহমেদ পরিবারের ছেলেকে মাঝরাস্তায় গেঞ্জি পরিয়ে আর অফিসে এসে লবণের কফি খাইয়ে পার পেয়ে যাবে? এই ইমন কে ও এখনো চেনেনি।""
আয়ান মনে মনে হাসল। ও জানত, ওর এই রাগী বড় ভাইয়া মুখে যতই রাগের কথা বলুক না কেন, ওই চঞ্চল মেয়েটা ইমনের পাথরের মতো জীবনে একটা বড় তোলপাড় সৃষ্টি করে ফেলেছে। আয়ান বলল, ""ওকে বস, আজ বিকেলের মধ্যেই সব ইনফরমেশন আপনার টেবিলে চলে আসবে।""
গল্পের সুতোগুলো যেন ক্রমশ এক জায়গায় এসে জড়ো হচ্ছিল। একদিকে রোহান-নিপার মায়াবী নীরবতা, অন্যদিকে ইমন-সারার এই টক-ঝাল-মিষ্টি যুদ্ধ। আগামী দিনগুলোতে এই আহমেদ ভিলার রাজপুত্রদের জীবনে যে বড় কোনো ঝড় আসতে চলেছে, তার পূর্বাভাস যেন ঢাকার এই মিষ্টি বাতাসেই মিশে ছিল।
  সোহান আর রোহান যখন আহমেদ গ্রুপের বিশাল কর্পোরেট অফিসের কাঁচের তৈরি মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল, পুরো অফিসের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সেখানে উপস্থিত রিসেপশনিস্ট থেকে শুরু করে ফাইল হাতে হেঁটে যাওয়া বড় বড় কর্মকর্তারা—সবাই কাজ ভুলে একযোগে দুই ভাইয়ের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। আসলে ওদের রূপ আর ব্যক্তিত্বই এমন যে, কেউ চাইলেও চোখ সরিয়ে নিতে পারে না। ঢাকার বুকে সত্যি যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে দুই রাজকুমার!
সোহানের পরনে ছিল হালকা নীল রঙের লিনেন শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো, আর চোখে এক জোড়া অভিজাত চশমা। মুখে সেই চিরচেনা শান্ত, মৃদু হাসি যা যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দিতে পারে। অন্যদিকে, ছোট ভাই রোহান পরে ছিল একটা কালো ক্যাজুয়াল ব্লেজার আর সাদা শার্ট। পিঠে তার প্রিয় ক্যামেরার ব্যাগ আর চোখে এক অদ্ভুত চঞ্চল মায়া। দুই ভাইয়ের এমন চমৎকার মেলবন্ধন আর রাজকীয় উপস্থিতি অফিসের মেয়ে কর্মচারীদের বুকে রীতিমতো ঝড় তুলে দিল।
করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দুই বান্ধবী টেবিলের আড়ালে ফিসফিস করতে লাগল, ""ওরে বাপরে! সেজো স্যার আর ছোট স্যার একসাথে অফিসে এলে মনে হয় কোনো সিনেমার শুটিং চলছে। একেকজন যেন গ্রীক গড!""
আরেকজন টেবিল থেকে ঘাড় উঁচিয়ে বলল, ""সত্যি রে! বড় স্যার তো সবসময় রাগে ফুঁসতে থাকেন, কিন্তু এই দুই ভাই যেন একদম পারফেক্ট। বিশেষ করে ছোট স্যারের ওই চোখের চাহনি দেখেছিস? কী মায়াবী!""
সোহান আর রোহান সবার এই মুগ্ধ চাউনিকে অভ্যাসবশত পাত্তা না দিয়ে সোজা ইমনের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার সামনে আসতেই দেখল মিস রিতা এখনো কেমন যেন গম্ভীর মুখে ফাইল গোছাচ্ছেন। সারা একটু আগে যে কড়া জবাব দিয়ে গেছে, সেই রাগটা ওনার মুখ থেকে এখনো নামেনি।
রোহান রিতাকে দেখে একটু হেসে বলল, ""হাই মিস রিতা! ভাইয়া কি ভেতরে?""
রিতা দুই রাজপুত্রকে দেখে চট করে মুখে পেশাদার হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ""হ্যাঁ ছোট স্যার, বড় স্যার ভেতরেই আছেন। তবে... ওনার মেজাজটা আজ সকাল থেকেই বেশ খারাপ।""
সোহান আর রোহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় হাসল। ওরা খুব ভালো করেই জানে বড় ভাইয়ার মেজাজ খারাপ হওয়ার আসল কারণটা কী। কফির কাপে লবণের সেই স্বাদ ইমন যে এখনো ভুলতে পারেনি, সেটা ওরাও বোঝে।
সোহান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, ইমন চেয়ারে হেলান দিয়ে ফাইলের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু ওর মনোযোগ অন্য কোথাও। ইমনের ফর্সা কপালে চিন্তার ভাঁজ আর কানের লতির সেই ছোট তিলটা রাগে যেন এখনো লাল হয়ে আছে।
রোহান কেবিনে ঢুকেই সোফায় আরাম করে বসে বলল, ""কী খবর ভাইয়া? অফিসের পরিবেশ তো বেশ গরম দেখছি। তা লবণের কফি খাওয়ার পর মেজাজটা কি একটু নোনতা নোনতা হয়ে গেছে?""
ইমন ফাইল থেকে চোখ তুলে দুই ভাইয়ের দিকে কড়া চোখে তাকাল। কিন্তু নিজের ছোট ভাইদের ওপর সে বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখতে পারে না। সে গম্ভীর গলায় বলল, ""তোরা এতক্ষণ কোথায় ছিলি? তোদের কি অফিসের কাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?""
সোহান ইমনের টেবিলের সামনে গিয়ে ফাইলটা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ""আরে ভাইয়া, রাগ করছ কেন? আমরা তো একটু ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আর সত্যি বলতে, আজ আড্ডাটা যা জমেছিল না!""
সোহানের কথার সূত্র ধরে রোহানের চোখের সামনে আবার নিপার সেই শান্ত, মায়াবী মুখটা ভেসে উঠল। যে মেয়ে হাত না মিলিয়েই চলে গেল, তার সেই উদাসীনতা যেন রোহানের মনে আরও বেশি করে দোলা দিচ্ছে।
ইমন দুই ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, ওদের মনেও আজ নতুন কোনো হাওয়া লেগেছে। সে ফাইলটা  বন্ধ করতে করতে মনে মনে ভাবল, ""তোরা হাসছিস হাস, কিন্তু ওই বেয়াদব মেয়ে শারিন সরকার সারাকে আমি কীভাবে শায়েস্তা করি, সেটা তোরা শুধু দেখ।"" অফিসের সেই রাজকীয় কেবিনে তিন ভাইয়ের এই নীরবতা আর হাসির আড়ালে যেন নতুন এক গল্পের সূচনা হচ্ছিল।
ইমনের কেবিন থেকে বেরিয়ে রোহান আর সোহান সোজা চলে গেল আয়ানের কেবিনে। আয়ান তখন ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে অফিসের কিছু কাজ করছিল। দুই ভাইকে একসাথে ঢুকতে দেখে সে কাজ থামিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
মুখে চওড়া হাসি নিয়ে আয়ান বলল, ""আরে , ছোট ভাইয়েরা! এসো এসো, বসো।""
তিন ভাই সোফায় মুখোমুখি বসতেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিল।  আয়ান ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ""কী রে রোহান? বড় ভাইয়ার কেবিনের যে অবস্থা, তোর হাতের কাজ কতদূর এগোল?""
রোহান একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললো। ""কাজ একদম ১০০ পার্সেন্ট হয়ে গেছে! 
আসল কাহিনী আয়ান রোহান আর সোহান কাছে ফোন দিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু খুলে বলল এবং ভিডিওটা পাঠিয়ে দিল তার ছোট ভাইদের কাছে 
তোরা জাস্ট দেখ বড় ভাইয়াকে আজ পার্কিং লটে কোন লেভেলের কুপোকাত করা হয়েছে সেটা দেখ শুধু।""
এই বলে আয়ান রোহান আর সোহানের ফোনে পাঠিয়ে দিল ভিডিওটা। স্ক্রিনে ভেসে উঠল পার্কিং লটের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ভিডিও—যেখানে ইমন সারাকে গাড়ির সাথে চেপে ধরে দুই পাশে হাত দিয়ে আটকে রেখেছে, সারার মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিচ্ছে, আর সারা চোখ বন্ধ করে শিউরে উঠছে।
ভিডিওটা দেখা শেষ হতেই রোহান আর সোহান দুজনেই হা হয়ে গেল! ওদের সেই পাথর হৃদয়ের, কড়া মেজাজের বড় ভাইয়া একটা মেয়ের এত কাছে গিয়ে এভাবে ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে, এটা ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি।
এরপর আয়ান যখন সারার সেই লবণের কফি বানানোর 
আর রাস্তায় শার্ট খুলে নেওয়ার এবং অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পুরো কাহিনীটা খুলে বলল, দুই ভাই হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়ার দশা হলো।
সোহান চোখ কপালে তুলে বলল, ""ওরে বাপরে! এই মেয়ে তো আস্ত একটা আগ্নেয়গিরি! বড় ভাইয়ার অহংকার তো ও একদম গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়েছে।""
আয়ান তখন দুই ছোট ভাইকে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ""আইডিয়াটা কেমন বল তো? এই মেয়েটাকেই আমি বড় ভাইয়ার বউ বানাব! তোরা দুজন কী চাস, বল?""
রোহান আর সোহান এক মুহূর্তও সময় নিল না,  ফোনের ও পাশে থেকে। দুজনেই একসাথে হাত তুলে সানন্দে চিৎকার করে উঠল, ""আমরা এক পায়ে রাজি! এই মেয়ে ছাড়া বড় ভাইয়াকে সোজা করার ক্ষমতা আর কারও নেই।""
আয়ান ওদের এত দ্রুত রাজি হতে দেখে বেশ অবাক হলো। সে কপাল কুঁচকে বলল, ""আরে, তোরা কোনো পরামর্শ না করেই, এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলি? মেয়েটার ব্যাপারে তো কিছুই জানিস না এখনো!""
রোহান এবার মুচকি হেসে বলল, ""জানব না কেন? ও তো আমাদেরই বান্ধবী, 
""কীহ্! তোদের বান্ধবী মানে?""
সোহান হাসতে হাসতে বলল, ""হ্যাঁরে ভাই, ও আমাদের মেডিকেল কলেজেরই বান্ধবী। ওর পুরো নাম শারিন সরকার সারা।""
আয়ান তো খুশিতে চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল, ""বলিস কী! তাহলে তো মেঘ না চাইতেই জল! ও আমাদের ঘরের বউ হলে তো পুরো আহমেদ ভিলা সবসময় জমজমাট থাকবে। তা, ওনার সম্পর্কে আর কী কী জানিস তোরা? ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন?""
সোহান একটু ম্লান হেসে মাথা নাড়ল, ""সত্যি বলতে, আমরা তেমন কিছুই জানি না। আজ পর্যন্ত শুধু নামটাই জানি।""
আয়ান অবাক হয়ে বলল, ""এতদিন ধরে একসাথে পড়িস, অথচ কিচ্ছু জানিস না? তাহলে এতদিন পড়াশোনা করে কি করলি?""
তুমি কি বলতে চাচ্ছ আমরা কি মেয়েদের পরিচয় খোঁজ করার জন্য ভার্সিটিতে আসি 
একটি মেয়ের পরিচয় জানিস না একসাথে থাকিস আবার বড় বড় কথা বলিস
রোহান তখন রহস্যের হাসি দিয়ে বলল, ""আইডিয়া বুদ্ধি পেয়েছি থামো তোমরা তোমরা কি বাচ্চা নাকি? আয়ান ভাই তুমিও ওর সাথে কি শুরু করলে। 
কি বুদ্ধি পেয়েছিস বল 
এসে জানাবো বলে কল কেটে দিল রোহন
ভার্সিটির আমগাছতলায় আজকে সবার পরিচয় পর্ব নিয়ে যে কাহিনীটা হলো, সেটার মূলে ছিল এই সারাই! 
ভাইয়া আরো একটি রহস্য আছে, মুচকি হেসে রোহান বললো ,
আয়ান বলল, কি রহস্য
সারা ভাইয়াকে যে শাট দিছে ওই শাট টি ভাইয়ের শাট নয়
মানে 
ওর দাম ৩০০ টাকা 
কিআআআআআ 
সবকিছু খুলে বললো রোহান 
সব শুনে আয়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো তারপর হু হা করে হাসতে থাকলো হাসতে হাসতে চিয়ার থেকেই পড়ে গেল তারপরেও হাসি থামছে না 
হাসতে হাসতে পেট চেপে বলল,, কিরে ভাই এটা কোন গ্রহের প্রাণী এটা কি আসলেই মেয়ে নাকি এলিয়েন আল্লাহ ইশতিয়াক আহমেদ ইমন কিনা 300 টাকার শাট পড়বে, কি আর দেখতে হবে গো আল্লাহ 
রোহানার সোহানা হাসতে থাকো
ও আজকে ইমনের শার্ট পোড়ানো আর ৩০০ টাকার শার্ট গছিয়ে দেওয়ার গল্পটা বলছিল  সব রোহান সোহান শুনে ফেলছে।""
সারার বুদ্ধির তারিফ না করেও পারল না।
আয়ান টেবিল চাপড়ে বলল, ""তার মানে, মেয়েটা শুধু চঞ্চল আর সাহসীই না, ও পুরো গ্রুপের একটা শক্তির কেন্দ্র। ভাই, তোরা যেভাবেই হোক ওর সাথে যোগাযোগ আরও বাড়া। বড় ভাইয়া অলরেডি ওর সব ডিটেইলস খোঁজ করার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে। ইমন ভাইয়া ভাবছে ও বদলা নেবে, আর আমরা এই সুযোগে ওনাদের বিয়ের সানাই বাজানোর ব্যবস্থা করব!""
তিন ভাই মিলে কেবিনের ভেতরেই ইমনের অজান্তে এক মহা চক্রান্তের জাল বুনতে শুরু করল, যার মূল চরিত্র আর কেউ নয়—দুষ্টু বুদ্ধির খনি শারিন সরকার সারা!
আয়ান বলল, একটি প্রতিজ্ঞা করো"" 
সোহানা রোহান বলল কি প্রতিজ্ঞা 
যতদিন না বড় ভাইয়ের বিয়ে দিতে পারছি আমরা কেউ প্রেমও করব না 
সঙ্গে সঙ্গে রোহানো সোহানের মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো
আয়ান সন্দেহ চোখে তাকিয়ে বলল কি হয়েছে তোদের মুখ অন্ধকার কেন 
রোহান আর সোহান আমতা আমতা করে বলল কোথায় অন্ধকার 
তাহলে প্রতিজ্ঞা করো 
তোমার সিঙ্গেল হওয়ার মরার ইচ্ছা আছে আমাদের নাই 
এখানে সিঙ্গেল হওয়ার মরার কি আছে রে 
উফ সোহানও ভাইয়া তোমরা থামবা আচ্ছা ঠিক আছে আমরা প্রতিজ্ঞা করছি 
তোমার ছখিনার নামে প্রতিজ্ঞা করছি 
ভাইয়াআর যতদিন না বিয়ে হবে 
আয়ান তখন চিৎকার করে উঠে বলল থাম তোরা প্রতিজ্ঞা করা লাগবে না তোরা আমার বউটাকে মেরে ফেলবে নাকি 
কেন তোমার বউটাকে মেরে ফেলবো কেন আমরা তো প্রতিজ্ঞা করতেছি তাইনা রোহান 
রোহান মুচকি সে বলল হুম ভাইয়া আমরা তো প্রতিজ্ঞা করছি 
থাক বাবা তোদের প্রতিজ্ঞা করার দরকার নাই তোরা মিথ্যা কথা বললে তাহলে আমি আমার বউকে পাওয়ার আগেই বউ পটল তুলবে তখন আমি বিধবা হয়ে যাব 
ভাইয়া তুমি এত বউ পাগল কেন তুমি কি জানো তোমার বউ ছখিনা হবে কি অন্য কেউ তারপরও তুমি এত পাগল
যা বের হ কেবিন থেকে তোদের প্রতিজ্ঞা করার দরকার নাই অকালে আমি বউ হারাতে চাই না 
সোহান তখন দুষ্টুমি করে বলল,, ভাইয়া আমরা কিন্তু প্রতিজ্ঞা করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি করতে দাও নি, পরে কিন্তু কিছু বলতে পারবা না বলো,, চোখ টিপ দিয়ে কেবিন থেকে বের হল,
আয়ান তো আর জানেনা দুই রাজকুমার একসাথে এক ঢিলে দুই পাখি মারা জায়গায় তারা তিন পাখি মেরে থুয়ে এসেছে ,,
আয়ানের কেবিন থেকে বেরিয়ে  রোহান আর সোহান নিজেদের গাড়ির দিকে যায় এবং চোখের সানগ্লাস পরে দুটোকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল অ্যাটিটিউড এর ডিব্বা , তখন দুজনেই বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিল। তিন ভাইয়ের গোপন মিশন এখন একটাই—ইমন আর সারাকে এক সুতোয় বাঁধা।
গাড়িতে উঠে ড্রাইভ করার সময় সোহান বলল, ""শান, আমাদের মিশন তো শুরু হলো, কিন্তু তুই সিয়াম আর নিপা কথাগুলো একবার ভাব। কারোর জীবনটাই আসলে বাইরে থেকে যেমন দেখায়, ভেতরটা তেমন মসৃণ নয়।""
রোহান জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের সামনে তখন কেবল ভেসে উঠছে নিপার সেই নিস্পৃহ, শীতল মুখটা। সে নিচু স্বরে বলল, ""হ্যাঁ  ভাই, সবার জীবনেই একটা গল্প আছে। কিন্তু নিপা... ও কেন নিজের ব্যাপারে সবটা লুকিয়ে গেল? ওর চোখ দুটো যেন অন্য কিছু বলছিল।""
সোহান ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, ""ধৈর্য ধর ভাই। সময় সব সত্যি সামনে নিয়ে আসবে।""
এদিকে ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল পাঁচটা ছুঁইছুঁই। সারা আর আনিতা ভার্সিটি থেকে ফিরে নিজেদের বাড়ির গলির মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সারা তখনো স্কুটির ওপরে বসে বাতাসে পা দোলাচ্ছে, আর আনিতা ব্যাগ থেকে চাবি খুঁজছে।
ঠিক তখনই সারার ফোনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এল। সারা ভ্রু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করে কানে দিতেই ওপাশ থেকে অত্যন্ত গম্ভীর আর চেনা এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
""শারিন সরকার সারা।""
নামটা শোনা মাত্রই সারার পিঠের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। এই কণ্ঠস্বর সে খুব ভালো করেই চেনে। এটা আর কারও নয়, আহমেদ গ্রুপের সেই খিটখিটে অহংকারী বস—ইমন!
সারা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ত্যাড়ামি করে বলল, ""ওমা! ডাস্টবিন... আই মিন, ইমন সাহেব যে! তা আমার নাম্বার কোত্থেকে জোগাড় করলেন? আর বিকেলে কি আবার লবণের কফি খেতে ইচ্ছে করছে?""
ওপাশ থেকে ইমন একটুও হাসল না। তার গলার আওয়াজ আরও কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে গেল, ""তোমার সাহস তো কম নয় সারা! প্রথমে আমার শার্ট নষ্ট করে ৩০০ টাকার সস্তা কাপড়ের একটা জঞ্জাল আমাকে ২৫ হাজার টাকার ট্যাগ লাগিয়ে গছিয়ে দিলে, আর তারপর অফিসে এসে ওই বিষাক্ত কফি খাওয়ালে? কি ভেবেছো ইশতিয়াক আহামেদ ইমন তোমাকে ছেড়ে দেবে  এভাবে পার পেয়ে যাবে?""
সারা এবার আসলেও একটু ভয় পেয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, ""ধুর ছাই! ব্যাটা শার্টের আসল রহস্য ধরে ফেলেছে নাকি, এই বেটা বারবার তার পুরো নাম কেন বলে? আমি মনে হয় জানিনা তার নাম, এত বড় নাম শুনলে এমনিই ভয় লাগে! 
আনিতাকে তো তখনই বলেছিলাম আয়রনটা ভালো করে করতে।"" কিন্তু মুখে সে নিজের চঞ্চলতা বজায় রেখে বলল, ""আরে, ৩০০ টাকার শার্ট মানে কী? ওটা তো একদম খাঁটি ব্র্যান্ডের শার্ট! আপনি বুঝতে পারেননি।""
ইমন একটা শীতল হাসি দিয়ে বলল, ""কাল সকাল ঠিক দশটায় তুমি আমার অফিসে আসবে। যদি না আসো, তবে তোমার এই মেডিকেল কলেজের ক্যারিয়ার আমি এক তুড়িতে ধ্বংস করে দেব। মনে রেখো, আমি যেটা বলি, সেটা করেই ছাড়ি।""
কথাটা বলেই ইমন কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে খট করে ফোনটা কেটে দিল।
সারা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হা হয়ে রইল।
আনিতা চাবি দিয়ে দরজা খুলতে খুলতে বলল, ""কী রে সারা? কার ফোন? মুখটা এমন শুকিয়ে গেছে কেন?""
সারা আনিতার হাত চেপে ধরে কাঁচুমাচু মুখে বলল, ""রেণু! আমার মনে হয় এবার সত্যি সত্যিই আমার দফারফা হতে চলেছে। ওই হিটলার ব্যাটা জেনে গেছে শার্টটা ৩০০ টাকার ছিল! কাল আমাকে ওনার অফিসে ডেকে পাঠিয়েছে, না গেলে নাকি ক্যারিয়ার শেষ করে দেবে!""
আনিতা চোখ কপালে তুলে বলল, ""ওরে বাবারে! তোকে তো আমি আগেই বারণ করেছিলাম আগুন নিয়ে খেলতে না। এখন কী করবি?""
সারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর তার চেনা শয়তানি হাসিটা আবার মুখের কোণে ফিরে এল। সে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল, ""কী আর করব? বাঘের খাঁচায় যেহেতু ডেকেছে, তখন বাঘের মাসি হয়েই যাব। দেখি ব্যাটা কী করতে পারে!""
চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন