#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
১১.
সকাল আটটার দিকে ইরা সমাবেশে গেছে, ইলহাম আয়ুশ দুজনে বেরিয়েছে কিছুক্ষন পূর্বে তাদের সাথে নাস্তা সেড়ে এখন টেলিভিশনের সামনে বসে আছে মিরা। তার জানামতে এতোবড় ফ্লাটে এখন শুধু সে আর একজন সার্ভেন্ট আছে। একা সময় কাটছে না তাই বান্ধবীকে ফোন করে কিছুক্ষন কথা বলেছে, একা একা সময় কাটানো খুবই বিরক্তিকর লাগে, সামনে টেলিভিশন অন রেখে মোবাইলে গেইমসে মনযোগী হলো সে।প্রায় সাত আট মিনিট পর মাথায় কারো অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে চমকে উঠলো মিরা। এক অপরিচিত ছেলে এসে বসেছে তার পাশঘেষে, সে'ই তার মাথায় চাটি মেরেছে। সামনে চলমান টেলিভিশনে চোখ স্থির তার, পাশ থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে জিজ্ঞাসা করলো
"কি রে পুচকি কথা বলছিস না কেন? বাচ্চাদের মতো কি দেখছিস এসব?"
চোখ দুটো গোল করে তাকিয়ে আছে মিরা, এই অচেনা ছেলে কোথা থেকে আসলো সেটাই বোধগম্য হচ্ছে না তার। এমন ঘুমোট নিরবতায় বিরক্ত হলো ইরহাম,পাশ ফিরে কিছু বলতে যাবে তৎক্ষনাত চমকে উঠলো। ইনায়া তো নয় কে এই অপরূপ সুন্দরী মেয়ে তার পাশে? দুধে আলতা গায়ের রঙ, কালো রঙের থ্রি পিছ পরনে সৌন্দর্য যেন আরও ফুটে উঠেছে। টানা টানা দুই চোখ, গোলাপের পাপড়ির ন্যায় লালছে দুই ঠোঁট, সরু নাক যেন স্রষ্টার নিপুন হাতে গড়া। আনমনেই মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো প্রশংসা বাক্য
"মাশা আল্লাহ"
"খালা গো ও খালা কোথায় আপনি বাসায় চুর এসেছে চুর"
আচানক মিরার এমন চেচামেচিতে ভড়কালো ইরহাম। তাকে দেখতে কি চুরের মতো লাগছে? ইতিমধ্যে মিরা ছুটে গেছে সার্ভেন্টের কাছে আপাতত তিনি ছাড়া কেউ নেই যার কাছে সাহায্য চাইবে। ইরহাম ছুট লাগালো তার পেছন পেছন যেই চিৎকার চেচামেচি শুরু করেছে কখন না জানি পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষ এসে গণপিটুনি দেয় তাকে। সার্ভেন্ট রিতা খালা চুর দেখতে ছুটে আসবেন তখন মাঝপথে মুখোমুখি হলেন ইরহামের। এমন পরিপাটি একজন অল্পবয়সী ছেলেকে দেখে অপ্রস্তুত হলেন তিনি অনেকটা দেখতে তার বড় স্যার ইলহামের মতো। মনে পড়লো তখন সকালে ইলহাম রান্না করার সময় বলেছিলো খাবার যেন দুজনের জন্য বাড়িয়ে রান্না করেন তার ভাইবোন এসেছে। সেই মুহুর্তে অগুছালো চুল এলোমেলো পরনের কাপড় আর গলায় প্লাজু ঝুলিয়ে ছুটে এসেছে ইনায়া সেও অবিরত চেচিয়ে যাচ্ছে
"চুর চুর চুর"
চুর দেখার জন্য মুখিয়ে আছে সে। আশে পাশে তাকিয়ে উৎসুক জনতাকে জিজ্ঞাসা করলো
"কোথায় চুর?"
অসহায় চোখে তাকালো ইরহাম। এমন একটা পরিস্থিতে পড়বে কে জানতো। রিতা খালা তখন জিজ্ঞাসা করলেন
"আপনারা কি বড় স্যারের ভাই বোন?"
"জ্বি, আমরা ইলহাম ফারুকির ভাই বোন"
ইরহামের মুখে এমন কথা শুনে চুপসে গেলো মিরা। বাসার মেহমানকে এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতে ফেলে দিলো সে। কাচুমাচু করে তাকালো ইরহাম আর ইনায়ার দিকে পরপর তাকালো রিতা খালার দিকে তিনিও তাকিয়ে আছে তার মুখপানে। অপ্রস্তুত মিরা ইতস্তত করে বলল
"স্যরি আমি আসলে বুঝতে পারিনি। হঠাৎ দেখেছি তো তাই"
"কিন্তু তুমি কে?"
"উনি ম্যাডামের বোন"
ঠোঁট কামড়ে হাসল ইরহাম, সম্পর্ক তবে রসালো। পাশে তাকিয়ে দেখলো তার বোন উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। আদুরে কন্ঠে বোনকে বলল
"রুমে যা ইনু, ফ্রেশ হয়ে আয়। ক্ষিধে পেয়েছে"
ইনায়া চলে গেলো রুমের দিকে, ফের সার্ভেন্টকে কাজে পাঠিয়ে বাকা হাসল ইরহাম। তাচ্ছিল্য করে হেসে মিরাকে বলল
"তো বেয়াইন, আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ কিন্তু মনে রাখার মতো"
লাজুক হাসল মিরা, এভাবে একটা লজ্জাজনক কান্ড বাধিয়ে দিলো। এখন তো তার সাথে কথা বলতেই লজ্জা করছে। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল সে
"স্যরি আসলে আমি বুঝতে পারিনি"
"আমাকে আসলেই চুরের মতো লাগে বেয়াইন?"
দুপাশে মাথা নাড়লো মিরা, হাসল ইরহাম
"তবে কেমন লাগে?"
লাসুজ হেসে নত মস্তকে মিনমিন করলো সে
"ভালোই"
"তবে কি দেখে চুর অপবাদ দিলে বেয়াইন?"
"আসলে হঠাৎ দেখেছি তো তাই যা মাথায় এসেছে বলে দিয়েছি"
"কিডন্যাপার বলতে পারতে সেটা মেনে নেওয়া যেতো কিন্তু চুর? মান ইজ্জত ফালুদা করে দিলে তো"
খিলখিল করে হেসে উঠলো মিরা, হাসির সাথে উঁকি দিচ্ছে বাকানো এক দাত। যা তার হাসির যৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বুকে হাত রাখলো ইরহাম। বুক চেপে ভনিতা করে বলল
"ইশ এভাবে হেসো না বেয়াইন বুকে লাগে"
লাজুক হেসে কানে চুল গুজলো মিরা,নিচু কন্ঠে প্রশ্ন করলো তাকে
"ফ্লার্ট করছেন?"
"উহুম প্রেমে পড়েছি"
হাসি হাসি মুখটা মুহুর্তেই চুপসে গেলো।
অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো মিরা। সে তো ইরহামকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলো। কিন্তু এ তো দেখছে খুবই ফাস্ট মানে প্রথম দেখাতেই প্রেম? সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন করলো সে
"মজা করছেন?"
"উহুম সত্যি বলছি"
"আপু যদি জানতে পারে আপনাকে সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে রাখবে"
"ওরে! আপু যদি ঝুলিয়ে রাখে, তুমি কিন্তু নিচে দাঁড়িয়ে ধরবে। পড়ে গেলে দোষ তোমার!"
মুখ বাকালো মিরা
"হুহ ঠেকা পড়ছে আমার"
"প্রাইম মিনিস্টারের বোন নাকি তুমি?"
হেসে উঠলো মিরা, মুখে হাত চেপে হাসতে হাসতে বলল
"ভাবি সম্পর্কে না জেনেই বিয়াইনকে লাইন মারছেন?"
"জানার সময় হলো কই তুমি জানিয়ে দাও"
"অপেক্ষা করেন ধীরে ধীরে সব জানতে পারবেন"
"কি কথা হচ্ছে তোমাদের?"
ইনায়ার কন্ঠ পেয়ে পাশ ফিরে তাকালো দুজন। ইরহাম ডাইনিংয়ের দিকে যেতে যেতে রিতা খালাকে ডেকে বলল খাবার দিতে। মিরা প্রানবন্ত হেসে ইনায়াকে বলল
"হাই, আমি মিরা"
"আমি ইনায়া"
"আমি তো ভেবেছিলাম বাসায় একা একা বোর ফিল করবো আপনাদের পেয়ে ভালো লাগলো"
"আমরা তো সেইম এইজ মনে হচ্ছে আমাকে আপনি করে বলতে হবে না তুমি করে বলতে পারো"
"কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?"
"এডমিশন নিবো ঢাবিতে চান্স হয়েছে"
"ওমা সিনিয়র আপু"
খিলখিল করে হেসে উঠলো মিরা। ইনায়া হাসল তার অনুরূপ। ইরহাম আড়চোখে তাকিয়ে আছে মিরার দিকে। মেয়েটা আসলেই মারাত্মক সুন্দর। সে অধীর অপেক্ষায় আছে ইনায়া প্রশ্ন করবে আর মিরা তার সম্পর্কে বলতে শুরু করবে। সেটাই হলো ইনায়া প্রশ্ন করলো
"তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?"
"দ্বাদশ প্রথম বর্ষে আছি"
"ওরে পিচ্চি"
শব্দ করে হেসে উঠলো ইরহাম। নাক ফুলালো মিরা
"একদম পিচ্চি বলবেন আমায় আমি অনেক বড়"
হাসল ভাই বোন দুজন। ইরহাম তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল
"হ্যাঁ তা তো দেখতেই পাচ্ছি তখন গোপাল ভাড় দেখছিলে না? আর এই যে এখন নাক মুখ ফুলিয়ে রেখেছো এসব তো বড়রা করে"
কাদো কাদো মুখে ইনায়ার পানে তাকিয়ে নালিশ দিলো মিরা
"দেখেছো আপু? তোমার ভাই আমাকে অপমান করছেন"
হাসল ইনায়া, ইরহামের কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলল
"আরে ছাড়ো তো, ওদের কাজই এসব। তোমার বোন জামাই তো আরও তিন ধাপ এগিয়ে"
"ভাইয়া অনেক ভালো উনার মতো না"
তাচ্ছিল্য করে হাসল ইনায়া
"এখনও বুঝো নি বেহনা নতুন তো সময় হোক সব বুঝতে পারবে"
"শাকচুন্নি"
"ভাইয়া!"
শব্দ করে হেসে উঠলো ইরহাম। ইনায়া গাল ফুলিয়ে বসে আছে। কিছু খেয়াল হতে প্রশ্ন করলো মিরাকে
"ভাবি কোথায়?"
"আপু তো সমাবেশে"
"সমাবেশে মানে?
ইরহাম আর ইনায়া একে অপরের দিকে তাকালো। মিরা বুঝতে পারলো তারা কিছু জানে না
"আপু আমাদের জেলার সভানেত্রী। মানে রাজনীতিতে তার ভালো একটা পজিশন আছে। সেই সুবাধে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে যেতে হয়"
আশ্চর্য নয়নে তাকালো দুজন। মেয়ে হয়ে এসব রাজনীতি? তাদের মা কি এসব স্বাভাবিক ভাবে নিবে? তিনি তো এমনিতেই রাজনীতি মারামারি ঝামেলা এসব পছন্দ করেন না।
"ক'বছর হলো?"
"পাঁচ ছয় বছর হবে"
"তাই তখন বোনের ভয় দেখিয়েছিলে?"
হাসল মিরা। তার অনুরূপ ইরহামও হাসলো। ইনায়া তাকালো দুজনের দিকে, কি নিয়ে কথা হচ্ছে তার বোধগম্য হলো না। ইরহাম মৃদু হেসে প্রশ্ন করলো
"তুমি করো এসব?"
"না আমার পছন্দ না"
"তাহলে বোনকে মানা করছো না কেন?"
"আপু কি আমার কথা শুনবে? আপু কারো কথা শুনে না"
"ভাইয়া বললে শুনবে?"
শব্দ করে হেসে উঠলো মিরা। হাসতে হাসতে মুখে ওড়না চেপে নিজের কক্ষের দিকে যেতে যেতে বলল
"সেটা নাহয় আপনার ভাইকে জিজ্ঞাসা করে নিয়েন"
ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত করে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো ইরহাম। ঘাড় বাকিয়ে তাকালো বোনের পানে। সেও তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে, তার ভাবি কোন সাধারন মেয়ে নয়। আর তাদের তো এখনও এটাও জানা হয়নি যে তার ভাইয়ের বিয়েটা হলো কি করে।সবকিছু কেমন রহস্যজনক লাগছে!
#চলিত