#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
২৬.
আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি নেমেছে ঝুম ঝুম শব্দে। ব্যাস্ত নগরীর মানুষ জন সব ছুটে যাচ্ছে একটু খানি আশ্রয়ের খোঁজে। সেই শীতল পানির স্পর্শ থেকে রক্ষা পাওয়াই এখন প্রধান কর্ম। ছাউনির নিচে যাদের আশ্রয় হয়নি তারা ব্যাগ, ছাতা, ফাইল যে যা পারছে মাথায় দিয়ে ছুটছে গন্তব্যের দিকে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভিজে ছুপছুপ অবস্থা ইলহাম ও ইরার। তাতে বিন্দু মাত্র লক্ষ্য নেই কারো। ইরা ভীতিকর চোখে পরখ করে ইলহামকে, ছেলেটার কপালে লেপ্টে থাকা দুই ইঞ্চি সমান লম্বা চুল গুলো ছুইয়ে ছুইয়ে পড়ছে বরফ শীতল পানি। সেই পানি ছুয়ে দিচ্ছে তার সরু নাকের ডগা গোলাপ রাঙা ঠোঁট। চোয়ালের একপাশে ফুলে উঠেছে কিছুটা, হয়তো প্রণয়ের করা আঘাত ধেবেছে। থুতনির পাশে খানিকটা ছিলে গেছে যা ফর্সা চামড়ায় স্পষ্ট চোখে লাগছে। আচড় লেগেছে হয়তো! জ্বলছে নিশ্চয়ই।
ঠান্ডায় কাঁপন ধরলো ইরার গায়ে। দুহাত আড়াআড়ি করে দু বাহু চেপে বৃথা প্রয়াস চালালো শীত নিবারন করার। ধপাধপ পা ফেলে এগিয়ে গেছে ইলহাম। সাদা শার্ট ভিজে শরীরে প্রতিটি ভাজ উন্মুক্ত। শরীর বেয়ে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে পায়ের নিচে। দরজা খোলে ইরাকে রেখেই পা বাড়িয়েছে নিজের কক্ষে। বিকট শব্দে দরজায় লাথি বসিয়েছে। কেঁপে উঠলো ইরা, চোখ দুটো জ্বলে উঠলো, বৃষ্টির পানিতে অনেক্ষন ভিজেছে এই কারনে নাকি মানুষটার এমন আচরণে কষ্ট পেয়ে বুঝতে পারলো না। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো নিজের ঘরে। শীত লাগছে অনেক, ভেজা কাপড় ছাড়তে হবে।
বিছানার এক কোনে ধম মেরে আছে ইরা, ভেজা কাপড় ছেড়ে পরিপাটি হয়েছে অনেক্ষন আগে। রাত বারোটা বাজতে চলল প্রায়। বাসার কেউ আর জেগে নেই। হয়তো তারা ফেরার আগেই যে যার কক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এসেছে থেকে কারো নড়চড় নেই। পেটে খুব ক্ষিধে, কিন্তু মস্তিষ্ক জুড়ে ইলহামের বিচরণ। অনেক্ষন তো হলো, কোনো সাড়া শব্দ পাচ্ছে না। কি করছে, না করছে সেটাও বুঝতে পারছে না। অন্য দিন হলে সে বাসায় আসার পর খাবার নিয়ে রুমে আসতো। আজ তো খেতে ডাকবে না। নিজেও খায় নি নিশ্চয়ই।
প্রায় মিনিট পাঁচেক চিন্তা ভাবনা করার পর দরজা খোলে ইলহামের ঘরের দিকে উঁকি ঝুকি দিলো। দরজা হাট করে খোলা। ঘরে ডুকার সময় যেভাবে লাথি বসিয়েছিলো ঠিক সেভাবেই আছে। ভ্রু কুঁচকে আসলো ইরার, ঘরে বসে কি করছে ও?
পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলো সে, ইলহামের দরজায় দাঁড়িয়ে আবার উঁকি দিলো ভেতরে। না কোথাও নেই। গেলো কোথায়? কথা বলতে ভয় হচ্ছে তার, কেন যেনো মনে হচ্ছে সে এখনো রেগে আছে। ভেতরে প্রবেশ করে এদিক ওদিক তাকালো, জহুরি চোখে পরখ করে কোথাও না পেয়ে মিনমিন করে ডেকে উঠলো
“ইলহাম আছেন? কোথায় আপনি?
কোনো প্রতিত্তোর আসলো না। ঘাবড়ালো ইরা, রেগে গিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো নাকি? সেদিন তো নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলো। ওয়াশরুমের দিকে চোখ পড়তে এগিয়ে গেলো সেদিকে, দরজায় ঠুকা দিয়ে গলার জোর খানিকটা বাড়িয়ে পুনরায় ডেকে উঠলো
“ইলহাম শুনছেন? আপনি ওয়াশরুমে?”
“এখান থেকে যাও ইরা। আমাকে ডিস্টার্ব করো না”
থমকালো ইরা, কেন যেনো ইলহামের মুখে ইরা ডাকটা পছন্দ হলো না। লোকটা তো তাকে যখন তখন ইরা বলে ডাকে না। তার গম গমে স্বরের আওয়াজটা বেলকোনির দিক থেকে এসেছে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো সে। রকিং চেয়ারে বসে দুলছে ইলহাম, চোখ দুটো বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে দুলছে। একহাত আড়াআড়ি করে কপালের উপর রাখা। গায়ে তার ভেজা কাপড় রয়ে গেছে, ঠিক ভেজা বলা যায়না। গায়ে থেকেই খানিকটা শুকিয়ে এসেছে প্রায়। ইরা বুঝতে পারলো ঘরে এসেই এখানে ঘাপটি মেরে বসেছে। গলা ঝেড়ে মিনমিন করে বলল
“চেইঞ্জ করেন নি কেন? ঠান্ডা লাগবে তো”
“লাগুক”
থতমত খেলো ইরা, এ কেমন কথা। এই কথার প্রেক্ষিতে সে আর কি বলতে পারে বুঝে উঠতে পারলো না। তবুও গাইগুই করে বলল
“খাবেন না?”
“না”
হাত পা ছড়িয়ে কাদতে ইচ্ছে হলো ইরার, লোকটার এমন নির্লিপ্ত ভাব মোটেও সহ্য হচ্ছে না। মানুষটাকে নিরবতায় মানায় না। কেন যেনো তার করা পাগলামো গুলো খুব মনে পড়ছে এখন। সে ধম মেরে বসে থাকবে আর লোকটা তাকে বিরক্ত করবে এমনটাই যেনো চাইছে তার অযাচিত মন।
“এখানে কি চাই? বলেছি না এখান থেকে চলে যেতে”
আকস্মিক ইলহামের ধমকে কেঁপে উঠলো ইরা। কিন্তু সরে গেলো না। কয়েক সেকেন্ড নিজেকে ধাতস্থ করে ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে গেলো ইলহামের নিকটে। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে বলল
“আপনার তো কাল ডিউটি আছে ইলহাম, এভাবে বসে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তখন…”
“আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। ঠিক আছি আমি।”
আটকে গেলো ইরা, কিছু বললেই কেমন চ্যাত করে উঠছে। কি করবে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। জীবনে তো কখনো কারো রাগ ভাঙায়নি, এমন এক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে তার জন্য সন্যাসী জীবনটাই বেস্ট ছিল। ফুস করে নিশ্বাস ছেড়ে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো ইলহামের ভেজা চুল। কেমন অস্বস্তি হচ্ছে নিজে থেকে করা এটাই তার প্রথম স্পর্শ। ভেজা চুলের বাজে হাত চালিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। গুনগুন করে বলল
“ইলহাম, আমি আসলে বুঝতে পারিনি ও এভাবে টাচ…”
“তাহলে কি করছিলি ওর সাথে এখানে? বল আমাকে? এই রাতের বেলা ফাঁকা এক ঘরে ওর সাথে কি এতো কাজ তোর?”
ইরার পেলব হাত খানি ছুড়ে ফেলে দেয়ালের সাথে চেপে ধরেছে তাকে। শান্ত বিড়াল ছানার মতো পড়ে রইলো ইরা। চোখ দুটো তার ইলহামের পানেই নিবদ্ধ। রাগে কেমন ফুস ফুস করছে সাপের মতো। শান্ত কন্ঠে পুনরায় বলতে লাগলো ইরা
“ওর সাথে আমার কিছু নেই ইলহাম। কাজের সুত্রে দুয়েকটা কথা হয় এতোটুকুই। কিন্তু আজকের ঘটনাটি অপ্রত্যাশিত ছিলো। আমি জানিনা ও কেন এমন করলো। ওর শাস্তি তো ওকে দিয়েছো তবে কেন এমন করছো?”
ইরাকে ছেড়ে পিছু ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইলহাম। দুহাত কোমড়ে রেখে বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে। এলোমেলো হাতে চুলগুলো বার বার ঠেনে ধরছে। রাগান্বিত কন্ঠে চেচিয়ে বলল
“ও তোমার থেকে সুযোগ লুঠতে চাইছে তুমি কেন বুঝতে পারছো না ইডিয়েট।”
ছলছল চোখে তাকালো ইরা, সে তো বুঝতে পেরেছিলো কিন্তু এতো বেশি হয়ে যাবে সেটা তো বুঝেনি। কন্ঠ খাদে নামিয়ে মিনমিন করে বলল
“আর কথা বলবো না ওর সাথে।”
এই একটা কথা শুনার জন্যই বুঝি ইলহাম এতো অস্থির হয়েছিলো? কথাটা শুনা মাত্রই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো ইরাকে। শক্ত বুকের ভাজে পেলব দেহখানি চেপে ধরলো সর্বশক্তি দিয়ে। যেনো ছেড়ে দিলেই পালিয়ে যাবে। দুর্বল কন্ঠে বার বার বলতে লাগলো
“ও কেন তোমাকে টাচ করবে? অন্য কেউ কেন তোমাকে টাচ করবে? তুমি শুধু আমার মুনলাইট। তুমি শুধু আমার।”
ইরার কি হলো, টুপ করে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কপোল বেয়ে। একেই বুঝি ভালোবাসা বলে? প্রিয় মানুষটাকে অন্য কারো সংস্পর্শে দেখলে বুঝি অনুভুতিগুলো এমন বিষাক্ত হয়? তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় আঁকড়ে ধরে? তবে তার বাবা কেন তার মাকে এভাবে ঠকালো তবে কি তার বাবা কখনো ভালোবাসেনি তার মা কে?
ইরার কান্নারত মুখশ্রী দুহাতের আজলায় নিয়ে পাগলের মতো বলতে লাগলো ইলহাম
“তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেনা তো মুনলাইট? বলো আমাকে ছেড়ে যাবে না কখনো। তুমি তো আমাকে ভালো বাসো না। যদি অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলো তখন আমার কি হবে? আমি যে খুব বাজে ভাবে তোমাতে আসক্ত হয়ে গেছি মুনলাইট। তোমাকে ছাড়া আমি কি করে বাঁচবো? বলো ছেড়ে যাবে না কখনো?”
চোখের অবাধ্য জলগুলো বাধ ভেঙে গড়িয়ে পড়ছে, কেন আজ এতো কষ্ট হচ্ছে তার? এই মানুষটাকে এভাবে দেখে মন পুড়াচ্ছে খুব। বুকের ভেতর কোথায় যেনো চিনচিন ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে নমনীয় কন্ঠে বলে উঠল সে
“যাবো না”
ললাটে ভালোবাসার স্পর্শ একে দিলো ইলহাম। পুনরায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। পুড়ে যাওয়া বুকে শান্তির বাতাস বইছে। ঠোঁট এলিয়ে হাসলো ইরা, তার স্পর্শে সায় দিতে দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরলো ভেজা শার্ট। ইলহামের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। এতো ঝড় ঝঞ্জাট পায়ে ঠেলে অবশেষে বউয়ের থেকে একটুখানি ভালোবাসার ছোঁয়া পাচ্ছে। বউ যদি তাকে নিজে থেকে আগলে নেয় তবে প্রতিদিন এমন শখানেক প্রণয় পেটাতে প্রস্তুত সে। তবে হ্যাঁ, তার বউকে কেউ টাচ না করলেই হলো।
#চলবে