#ছায়াবৃত_রোদ্দুর
#আয়রা_ইবনাত
২৭.
বৃষ্টিভেজা রাতের পর শহর জেগে উঠেছে নতুন সাজে। আকাশের ধূসরতা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে নরম আলো ছড়িয়ে গিয়েছে চারদিকে। রাস্তার পাশের গাছগুলো ধোয়া সবুজে ঝলমল করছে, পাতার ডগা থেকে টুপটাপ করে এখনো জল পড়ছে। ঘরের ভেতরেও সেই সকালের স্নিগ্ধতা নীরবে ঢুকে পড়েছে। জানালার কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো রোদের সোনালী আলোয় চিকচিক করছে। হালকা বাতাস পর্দাকে দুলিয়ে দিচ্ছে।
বিলাসবহুল ঘরটি সাজানো অত্যন্ত পরিপাটি করে সাদা মার্বেলের মেঝে, নরম কার্পেট। বড় বিছানার উপর সাদা চাদর, তাতে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে ইরা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা, চোখে অবসন্নতা, গায়ের উপর দুতিনখানা কম্ফোর্টার জড়িয়ে দিয়েছে ইলহাম। একপাশে বসে তার হাতটা শক্ত করে ধরে আছে সে। তার দুর্বল আঁখি টেনে খোলতে কষ্ট হচ্ছে অবুও ক্লান্তি যেন কাবু করতে পারছে না তাকে। জ্বরের ঘোরে থেকেও সে প্রেয়সীর যত্নে তৎপর। অপর পাশে বসে ইরাকে চেক আপ করছেন ডক্টর রশিদ। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আয়ুশ, তার থেকে কিছুটা দূরে একে একে দাঁড়িয়ে আছে বাকি তিনজন। তাদের পাশে থেকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে সার্ভেন্ট। এসেছে থেকে তাদের নেত্রীর রাগ ডাক আর গালিগালাজ শুনলো। এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেনি কখনো। মেয়েটাকে এভাবে দেখে খারাপ লাগলো তার, তাদের ইরা আফাকে এতো নিস্তেজ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা মানায় না।
কাল রাতে অসময়ে বৃষ্টিতে ভেজার ফলে গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে দুজনের। ঠান্ডায় গলা জমে গেছে। সর্দি বাধিয়ে শুধু নাক টানছে দুজন।
জ্বরের ঘোরে দুজন দুজনাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে ঘুমিয়ে ছিলো বেলা দশটা পর্যন্ত। এতো বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাদের কারো খোঁজ নেই। সন্দেহের বসে যখন ডাক পারলো দরজায় তখনও কারো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। প্রায় পাঁচ দশমিনিট ডাকার পর ঢুলুঢুলু ইলহাম দরজা খোলে দিয়েছিলো। দুজনের এমন নাজুক অবস্থা দেখে জরুরিভিত্তিতে ডাক্তার ডেকেছে আয়ুশ।
ডক্টর রশীদ ইরাকে চেক আপ করে ইলহামের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ছেলেটা কেমন দুর্বল। আধখোলা চোখদুটো লালছে বর্ণ ধারন করেছে। ফর্সা গাল মুখ লাল হয়ে আছে। মায়া লাগলো তার, ভদ্র গম্ভীর এই ছেলেটাকে এভাবে কখনো দেখেননি। তিনি কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন
“স্যার, আপনার অবস্থা তো ভালো না। আপনি মেডিসিন নিন”
বিরক্ত হলো ইলহাম, তার কাছে এসব আলগা পিরিত লাগলো। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে মৃসুস্বরে ধমক দিলো সে
“আপনি কি আমাকে দেখতে আসছেন? ওর কি অবস্থা সেটা বলেন। অবস্থা কি ক্রিটিকাল? হসপিটালে নিতে হবে নাকি মেডিসিন নিলেই সারবে?”
পরক্ষণে কি মনে করে নিজেই বলে উঠল
“আপনাকে আমার ভরসা নেই। আমি ওকে হসপিটালে নিয়ে যাবো”
থতমত খেলেন তিনি, তার এতো বছরের অভিজ্ঞতা আর ছেলেটা নাকি বলছে তাকে ভরসা নেই? তাকে কিছু বলার সময় না দিয়ে ইরাকে পাজাকোলা করে তুলতে নিলে থামিয়ে দিলেন তিনি। ব্যস্ত কন্ঠে বললেন
“আরে আরে কি করছেন, আপনি নিজেইতো ঠিক নেই উনাকে নিয়ে পড়ে যাবেন তো। আর উনাকে হসপিটালে নিতে হবে না। আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি এনে খাইয়ে দিন আর পারলে ভেজা কাপড় দিয়ে গা মুছিয়ে দিবেন”
ইলহাম শুনলো তার কথা। ইরাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে, কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা পরখ করে নিলো আরেকবার। ডক্টর রশীদ চলে গেলে আয়ুশকে ঔষধ আনতে পাঠালো সে, তারপর ব্যাস্ত কন্ঠে তাড়া দিলো সার্ভেন্টকে খাবার দিতে। স্ত্রীর জন্য এতো ব্যাস্ত হলো যে নিজের অসুস্থতার কথা সে ভুলে যাচ্ছে। ইরহাম এগিয়ে গিয়ে কাধে হাত রাখলো তার, আগুনের চ্যাক লাগলো যেনো তার হাতে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে অথচ দেখো মানুষটা কত নির্বিকার।
“ভাইয়া, তোমার শরীরের অবস্থা ভালো নেই, ভাবির সাথে তুমিও খাবার খেয়ে মেডিসিন নাও। শরীর টা একবার মুছে নাও। না হয় তোমরা শুয়ে থাকো আমরা জলপট্টি দিচ্ছি তোমাদের”
ইরহামের কথায় বিরক্তির ভাজ পড়লো তার কপালে, তার বউয়ের সেবা করতে সে থাকতে অন্য কেউ লাগবে কেন? কন্ঠে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে কঠোর আদেশ দিলো
“লাগবে না তোরা যা এখান থেকে, ডিস্টার্ব করিস না আমাদের”
মীরা আর ইনায়া না চাইতেও ঠোঁট টিপে হাসলো, এই কষ্টের সময় তারা হাসছে এটা দেখলে নিশ্চয়ই তার ভাইয়েরা জুতোপেটা করবে। কিন্তু তার এই ভাই যে এতো বউ পাগলা সেটা ভাবতেই হাসি পাচ্ছে।
______
লিভিং রুমের মাঝখানে রাখা বিশাল সোফাসেটে গাঢ় ক্রিম রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা ছোট কুশন কোলে নিয়ে বসে আছে মীরা। তার পাশে বসেছে ইনায়া, তাদের ঠিক অপজিট পাশে বসে আছে ইরহাম। এক পা ভাজ করে বসে হাতের নখ খোটছে দাত দিয়ে, তাকে দেখে মনে হবে সে গভীর চিন্তায় বিভোর। সেই সুযোগে ইরহাম মন ভরে দেখছে তার রোজকে। অনেক্ষণ কেটে যাওয়ার পর খানিকটা বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো ইনায়া
“তখন থেকে তুমি কি ভাবছো আমায় বলবে মীরা? এমন স্টেচু হয়ে বসে আছো কেন?”
তার প্রশ্ন শুনে নড়ে বসল মীরা, তাতে বিরক্ত হলো ইরহাম। কত সুন্দর দেখছিলো এই পুতুলের মতো মেয়েটাকে, দিলো তো তার বোন ব্যাঘাত ঘটিয়ে। বিরক্তিতে মুখে ‘'চ’’ সূচক শব্দ তুলে বলল
“তোর সমস্যা কি? তোর ইচ্ছে হলে তুইও ভাবতে থাক শুধু শুধু আমার বেয়াইনকে ব্যাগড়া দিচ্ছিস কেন?”
ইরহাম তাকে প্রস্রয় দিলো কিন্তু মীরা উল্টো মুখ বাকালো তাকে। তার দিকে মন না দিয়ে ইনায়াকে বলল
“আচ্ছা আপু, ওরা দুজন একসাথে জ্বর বাধালো কি করে?”
ঠোঁট টিপে হাসলো ইরহাম। ইনায়া কিছু বলার আগে সে বলে উঠল
“তুমি একটা গর্দভ বেয়াইন, কাল কতো রোমান্টিক ওয়েদার গেলো নিশ্চয়ই ভাই ভাবি একসাথে বৃষ্টি বিলাস করেছে। এই সিম্পল বিষয়টি কেন বুঝতে পারছো না?”
বিস্ময়ে দুপাশে মাথা নাড়লো মীরা। প্রতিবাদি কন্ঠে চেচিয়ে বলল
“অসম্ভব, আমার আপু আর ভাইয়ার সাথে বৃষ্টি বিলাস এটা হতেই পারে না। আপু তো ভাইয়াকে সহ্যই করতে পারে না”
বেখেয়ালি কথাটা বলে দিতেই নিজের মুখ চেপে ধরলো সে। অসময়ে ভুল জায়গায় ভুল কিছু বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে, অসহায় চোখে তাকালো। ইনায়া আর ইরহাম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তারা খেয়াল করেছে ইলহাম আর ইরার মধ্যে তেমন কথা বা ভাব বিনিময় হয়না। যেহেতু ইরা গম্ভীর স্বভাবের তাই এটাকে তারা স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলো কিন্তু এখন মীরার কথায় খটকা লাগলো। ইরহামের আগে ইনায়া প্রশ্ন করে ফেলল
“এসব তুমি কি বলছো মীরা? ভাইয়াকে সহ্য করতে পারে না মানে? তাহলে ওদের বিয়ে হলো কি করে?”
বিষয়টি এখন চেপে যাওয়া যাবে না বুঝতে পেরে সবকিছু বলে দিলো সে। বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলিয়ে বসে রইলো দুজন। এক বিয়ের পেছনে এতো কাহিনি থাকতে পারে এটা না শুনলে হয়তো বুঝতেই পারতো না। নিজেদের সংসয় দূর করতে ইরহাম জিজ্ঞাসা করলো
“তবে তাদের দুজনের অমতে বিয়ে হয়েছে? কিন্তু ভাইয়াকে তো দেখলাম ভাবির প্রতি অনেক কেয়ারফুল। এই যে কিছুক্ষণ আগেই তো দেখলে না?”
“আসলে ইলহাম ভাই আপুকে আগে থেকে পছন্দ করতো। বিয়েটা হয়তো ভাইয়ার জন্য ভালো ছিলো কিন্তু আমার আপু তো অনেক কাঠখোট্টা, ভাইয়াকে মেনে নিতে পারেনি”
কিছুক্ষণ নিরবে বসে রইলো তিনজন। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল ইরহাম
“আরে এসব ব্যাপার না, আমার ভাইয়া এসব সামলে নিতে পারবে। আমার তো মনে হচ্ছে কাল সারারাত দুজন বৃষ্টিতে ভিজে রো.. উহুম যাইহোক। এটা আমার মনে হয়না এ ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত নাহলে দুজনের একসাথে এভাবে অসুস্থ হওয়া অসম্ভব।”
এবার আর কেউ কিছু বলল না। এ ব্যাপারে তাদেরও ধারণা একই, এমনটা ছাড়া এভাবে একসাথে জ্বর বাধায় কিভাবে?
_____
বিছানার শিয়রে দন্ডায়মান খাটের উঁচু মাথার সাথে ইরাকে হেলান দিয়ে বসিয়েছে ইলহাম। কিছুক্ষণ পূর্বে আয়ুশ ঔষধ দিয়ে অফিসে গিয়েছে, বলে গেছে কোনো প্রয়োজন হলে তাৎক্ষনিক ফোন করতে। নিরবে সম্মতি দিয়েছে ইলহাম।
ইরাকে হাতে তুলে খাইয়ে মেডিসিন দিয়েছে। এক প্লেট থেকে অল্প একটু খেয়ে নিজেও মেডিসিন নিয়েছে। অসুস্থ বউয়ের সেবা করতে হলে নিজেকে তো সুস্থ থাকতে হবে। একদিনের জ্বরে বেঘোরে পড়ে কাতরাচ্ছে ইরা, ইলহাম যতটা পারছে শক্ত আছে কিন্তু ইরার অবস্থা নাজেহাল।
সর্বদা কাজে ব্যাস্ত ক্লান্ত দেহ হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হয়তো এমন দুবর্ল হয়ে পড়েছে। ইরা অনুভব করতে পারছে ইলহামের স্পর্শ কিন্তু চোখ খোলে তাকাতে পারছে না।
কিছুক্ষণ আগে ইরহাম ইনায়া মীরা এসেছিলো দেখতে, তাদের বের করে দিয়েছে ইলহাম, ওরা থাকলে বউয়ের ঘুমে ডিস্টার্ব হবে।
উত্তপ্ত ললাটে কিছুক্ষণ পরপর ভেজা কাপড় চেপে ধরছে ইলহাম। ঠান্ডা ভেজা কাপড়ের টুকরো মিনিটের মধ্যেই গরম হয়ে যায়। আর দেরি করলো না সে, ভেজা কাপড় আর পানি একপাশে রেখে ধীরে ধীরে মুছে দিতে লাগলো ইরার শরীর। বিরবির করলো ইরা, ইলহাম খানিকটা ঝুকে শোনার চেষ্টা করলো। বুঝতে পারলো না, খানিক বাদে পুনরায় বিরবির করলে ডেকে উঠলো ইলহাম, ইরার গালে হালকা চাপড় দিয়ে ডেকে বলল
“কষ্ট হচ্ছে মুনলাইট? হসপিটালে নিয়ে যাবো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো?”
দুপাশে মাথা নাড়লো ইরা, কন্ঠের জোর অল্প একটু বাড়িয়ে বিরবির করে কিছু বলল। ইলহাম তার মুখের কাছে কান নিয়ে শুনলো, সে বিরতিহীন বলে যাচ্ছে
“মাকে দাও, মা মুছে দিক। তুমি দিও না আমার সব দেখে ফেলবে”
ইলহাম জানে ইরা হুশে নেই তবু না চাইতে হেসে ফেলল, তার বিয়ে করা বউ তার সাথে একাধিক বার রোমান্স করার পর আজ বলছে তুমি আমার সব দেখে ফেলবে। পরক্ষণে কিছু খেয়াল হতে মুখটা মলিন হয়ে আসলো তার, ইরা কি তার মাকে খুব মিস করছে? সেই ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে ছিলো তারপর থেকে নিশ্চয়ই মায়ের আদর পায়নি কখনো। সে তো চায় তার মুনলাইট সবদিকে সুখি হোক কিন্তু এই মায়ের অভাব সে কি দিয়ে পূরণ করবে? ইলহাম জানে রাখিয়া ফারুকি অনেক মমতাময়ী ইরাকে মেয়ের মতো আগলে নিতেন কিন্তু তিনি তো রাজনীতি পছন্দ করেন না সেখানে ইরা মেয়ে হয়ে এসব করছে আবার ইরার যে কঠিন স্বভাব সেও নিশ্চয়ই তার মাকে এতো সহজে মানিয়ে নিতে পারবে না? তবুও সে চেষ্টা করবে, নিজের সবটুকু দিয়ে হলেও তার ইরাকে একজন মা উপহার দেওয়ার।
#চলবে