আমার রাজ্যে তুমি
পর্ব — ৪
লেখক: মোছাঃ উম্মে হানি
বাইকে করে জারা ও তার ভাই রাফিদ কোচিংয়ের সামনে এসে পৌঁছায়। জারা বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায়। রাফিদও বাইক থেকে নেমে নিজের মাথা থেকে হেলমেটটা খুলে রাখে।
রাফিদ জারার হাত ধরে তাকে একটি বড় কোচিং রুমের মধ্যে নিয়ে আসে। তারপর দ্বিতীয় একটা বেঞ্চে বসিয়ে জারার মাথায় হাত রেখে বলে,
—আমি পাশের রুমে ক্লাস নেব। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। যদিও সবাই জানে তুই আমার বোন, তাই কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। আর কোনো কিছু বুঝতে না পারলে স্যারকে প্রশ্ন করবি।
কথাগুলো বলে রাফিদ সেখান থেকে চলে যায়।
জারা চুপচাপ বসে ভাইয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবতে থাকে, বড় ভাই আছে বলেই হয়তো তার জীবনটা এত সহজ আর সুন্দর হয়েছে। জারার কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখেনি তার বাবা আর রাফিদ ভাই।
জারাকে কোনো কিছু নিয়েই চিন্তা করতে হয় না। যেমন, যেদিন জারার রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছিল, সে নিজে রেজাল্ট দেখার আগেই তার ভাই রাফিদ রেজাল্ট দেখে তাকে মিষ্টি এনে খাইয়েছিল। কোন কলেজে ভর্তি হবে, সেটা নিয়েও তাকে ভাবতে হয়নি। তার বাবার কথা অনুযায়ী, বড় ভাই তাকে একটা ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে।
এই বিষয়টা অনেকের কাছেই মনে হতে পারে, জারার যেন কোনো স্বাধীনতা নেই—নিজের পছন্দ অনুযায়ী কলেজেও ভর্তি হতে পারে না। কিন্তু জারার কাছে বিষয়টা একদমই তেমন নয়। বরং বিষয়টা তার ভালোই লাগে। ছোট-বড় সবকিছুতে পরিবারের মানুষদের খেয়াল রাখা—জিনিসটা জারার খুব পছন্দ।
এখনো ক্লাস শুরু হয়নি। ক্লাসরুমটা অনেক বড় হওয়ায় এক পাশে ক্লাস নাইনের শিক্ষার্থীরা এবং অন্য পাশে জারাদের ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বসে। বিষয়টা জারার তেমন একটা ভালো লাগেনি।
হঠাৎ একটি মেয়ে জারার পাশে এসে বসে মিষ্টি হেসে বলে,
—আপু, তুমি তো খুব মিষ্টি দেখতে! তোমার নাম কী, আপু?
জারাও হেসে বলে,
—আমার নাম জারা রহমান। তুমিও দেখতে খুব মিষ্টি। তোমার কথাবার্তাও খুব মিষ্টি। তোমার নাম কী?
মেয়েটা মুচকি হেসে বলে,
—মেহেরিন খান। তোমাকে আমি ‘মিষ্টি আপু’ বলে ডাকব, ঠিক আছে?
জারা হেসে বলে,
—আচ্ছা, মিষ্টি মেয়ে। মিষ্টি আপুই ডেকো।
এভাবেই কোচিং শেষ হলো। কোচিং শেষে জারা তার ভাই রাফিদের সঙ্গে বাসায় ফিরে আসে। বাসায় এসে পড়াশোনা শেষ করে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে যায়।
পরদিন সকালে জারার ঘুম ভাঙে সাড়ে সাতটায়। সকালে জারাদের বাসায় একজন আন্টি আসে। তিনি ঘরের সব কাজকর্ম সেরে, জারাদের বের হওয়ার আগেই আবার চলে যান।
জারা ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরের দিকে আসে। তার ভাই রাফিদ তখনো ঘর থেকে বের হয়নি।
জারা রান্নাঘরে আসতেই আন্টি তাকে জিজ্ঞেস করেন,
—আপামণি, কিছু লাগবে?
জারা বলে,
—না, আসলে আমি চা বানাব।
আন্টি সঙ্গে সঙ্গে বলেন,
—এক্ষুনি আমি বানিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওখানেই দাঁড়ান।
জারা মৃদু হেসে বলে,
—না, আমি নিজেই বানাব।
এরপর জারা নিজের হাতে দুই কাপ চা বানিয়ে ভাইয়ের ঘরের দিকে যায়। ঘরে ঢুকে দেখে, রাফিদ এখনো ঘুমাচ্ছে।
জারা চায়ের কাপটা সাইড টেবিলের ওপর রেখে মৃদু স্বরে বলে,
—ভাইয়া, ঘুম থেকে ওঠো। আমি নিজের হাতে চা বানিয়েছি।
কথাটা বলেই জারা সেখান থেকে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর দুই ভাই-বোনের আবার খাবার টেবিলে দেখা হয়। দুজন একসঙ্গে খেতে বসে।
রাফিদ জারার দিকে তাকিয়ে বলে,
—তুই রান্নাঘরে গিয়েছিলি কেন? তোকে চা বানাতে বলেছে কে?
জারা অভিমানী কণ্ঠে বলে,
—আমি চা বানালাম, আর তুমি প্রশংসা না করে আমাকে বকা দিচ্ছ!
রাফিদ হেসে বলে,
—চা অনেক সুন্দর হয়েছে। কিন্তু পরেরবার থেকে আর রান্নাঘরে যাবি না।
জারা ভাইয়ের সঙ্গে কলেজে চলে আসে।
আজ ব্রেক টাইমের পর ফিজিক্স ক্লাস। স্যার জারাকে আগেই লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন ইউনিফর্ম পরে আসার জন্য। কিন্তু জারার এখনো ইউনিফর্ম তৈরি হয়নি।
আজ যেন সময়টা খুব তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে। সময় যত এগোতে থাকে, জারার ভয়টাও ততই বাড়তে থাকে।
এখন ব্রেক টাইম। জারা ক্যান্টিনে খাবার খায় না, বাসায় গিয়ে একবারেই খায়। রিমি কিছুক্ষণ আগে ক্যান্টিনে গিয়েছে।
জারা বই খুলে বসে আছে, কিন্তু পড়ায় মন বসাতে পারছে না। মনে মনে ভাবছে, স্যার কি তাকে আবার অপমান করবেন?
হঠাৎ রিমি রুমে প্রবেশ করে। তার সঙ্গে কয়েকজন বান্ধবী, আর হাতে একটি গিটার। 🎸
জারা অবাক হয়ে বলে,
—এটা তোমার গিটার, রিমি?
রিমি জারার পাশে এসে বসে বলে,
—হ্যাঁ, নতুন কিনেছি।
জারা বলে,
—আমারও বাড়িতে গিটার আছে।
রিমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
—তুমি গান গাইতে আর গিটার বাজাতে পারো?
জারা হেসে বলে,
—হ্যাঁ, পারি তো।
রিমি হেসে বলে,
—তাহলে একটা গান গাও।
কথাটা বলেই রিমি জারার হাতে গিটারটা ধরিয়ে দেয়।
জারা গিটারটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে সুর তোলে। তারপর চোখ বন্ধ করে গান গাইতে শুরু করে।
বলো না কবে শুরু যে হবে
প্রেমের আলাপন
তোমার জন্য সাজানো সন্ধ্যে
একা দিন যাপন
বলো না কবে শুরু যে হবে
প্রেমের আলাপন
জুড়ে আছো নিশিদিন
রাখবো বেঁধে চিরদিন
জুড়ে আছো নিশিদিন
রাখবো বেঁধে চিরদিন
তাই ক্ষনে ক্ষনে আনমনে
তোমায় শুধু খুঁজি বারবার
জানতে যদি চাও
কতটা তোমায়
একটু থেকে যাও
এই মনে আমার
চোখ বন্ধ করে গান গাই জারা
জারা যেন গানটার প্রতিটি অনুভূতি নিজের মধ্যে ধারণ করে গাইছে। তার মুখে এক ধরনের প্রশান্তি ফুটে ওঠে। কিছুক্ষণের জন্য সে ভুলে যায় স্যারের দেওয়া লাস্ট ওয়ার্নিং আর নিজের সব চিন্তা।
গান শেষ হলে রিমি জারার দিকে দুষ্টু হাসি দিয়ে তাকায়। তারপর একটু অন্যরকম ভঙ্গিতে বলে,
—এই গানটা তুমি কাকে নিয়ে গাইলে বল তো? 🙃😼
জারা মনে মনে বলে,
‘কেউ নেই... যে একদিন আমার হাসবেন্ড হয়ে আসবে, তাকে নিয়েই তো গাইলাম।’
কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ না করে জারা শুধু মৃদু হেসে বলে,
—হুম... 🥹
রিমি আবার আবদার করে বলে,
—আরেকটু গান গাও, প্লিজ! প্লিজ! প্লিজ! 🥹
জারা মুচকি হেসে আবার গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়ায়। ধীরে ধীরে গিটারের সুরে নিজের কণ্ঠ মেলাতে শুরু করে সে।
হো..... দিন গেল,
মাস গেলো,
গেলো বহু বছর
তবুও যেন শেষ হয় না ভালোবাসার প্রহর
হঠাৎ তাদের কানে আসে,
—এই, স্টুপিড! স্টপ!
স্যারের কণ্ঠ শুনে জারা চমকে ওঠে। গান থেমে যায় মুহূর্তেই।
সবাই পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে, স্যার অনেক আগেই ক্লাসরুমে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। গান আর গল্পে মগ্ন থাকায় কেউই টের পায়নি।
ভয়ে ভয়ে সবাই নিজেদের ঠিক করে বসে যায়। জারার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।
জারা তাড়াতাড়ি সময় দেখে। ক্লাস শুরু হতে এখনো এক মিনিট বাকি।
জারা কিছু বলার আগেই আরহাম বলতে শুরু করে,
—কলেজে গান গাইতে এসেছ, নাকি পড়াশোনা করতে? পড়াশোনা করতে আসো, বুঝেছ?
জারা শান্তভাবে বলে,
—আমি পড়াশোনা করতেই এসেছি। ক্লাস শুরু হতে এখনো এক মিনিট দেরি আছে। তাই আমি এখন গান গাইব নাকি নাচব, সেটা একান্তই আমার বিষয়।
কথাগুলো বলার সময় জারা নিজেও ভীষণ ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই আরহামকে বুঝতে দেয়নি।
আরহামের চোখ জারার দিকে পড়তেই সে খেয়াল করে, জারা আজও সুন্দর একটা পোশাক পরে এসেছে। তার মনে হয়, ছেলেরা আজও জারার দিকে তাকিয়ে থাকবে। এই ভাবনাতেই রাগে আরহামের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে।
তার ওপর জারা এভাবে মুখে মুখে তর্ক করছে—এতে আরহামের রাগ আরও বেড়ে যায়।
আরহাম শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—পড়ালেখা তো করতে আসোই না, ছেলেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আসো। বলেছিলাম ইউনিফর্ম পরে আসতে। ইউনিফর্ম পরলে তো ছেলেরা তোমার দিকে তাকাবে না, সুন্দরও লাগবে না। তাই বুঝি ইউনিফর্ম পরে আসোনি?
কথাগুলো আরহাম খুব শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে বললেও, জারার বুকে তীরের মতো এসে বিঁধে।
কথাগুলো যেন সরাসরি তার আত্মসম্মানে আঘাত করে। জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। মুখে কোনো কথা না থাকলেও, মনের ভেতরটা অপমানে ভারী হয়ে ওঠে।
চরিত্র নিয়ে কথা বলায় জারার রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, গাল দুটোও রাগে লাল হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, টোকা দিলেই রক্ত বেরিয়ে আসবে।
ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সবার চোখের মণি হয়ে, অনেক আদরে বড় হয়েছে জারা। জীবনে কখনো এতটা অপমানিত হয়নি সে। কোনো ছেলের সঙ্গেও কখনো মেলামেশা করেনি। অথচ আজ তার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে!
অপমান আর রাগে জারার চোখেও পানি জমে উঠেছে। সবার সামনে নিজের কান্না প্রকাশ করতে না চেয়ে সে শক্ত গলায় বলে ওঠে,
—আপনার সমস্যা কী? এখানে আরও অনেকে ইউনিফর্ম ছাড়া এসেছে, তাদের তো কিছু বলেন না। শুধু আমাকে নিয়েই আপনার যত সমস্যা!
জারা এক মুহূর্ত থেমে আবার বলে,
—তাছাড়া আমি মার্জিত পোশাক পরেই এসেছি। ছেলেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো কিছুই করিনি। আপনি আমার শিক্ষক। আমি আপনাকে যতটা সম্মান করি, আপনার কাছ থেকেও ততটাই সম্মান আশা করি। কিন্তু আপনি যদি আমার লিমিট ক্রস করেন, তাহলে আমি চুপ করে থাকব না।
আরহাম জারার সম্পূর্ণ গান ও কথোপকথন শুনেছে। এই কারণেই তার এত রাগ হচ্ছে। কিন্তু কেন এত রাগ হচ্ছে, কেনই বা এই মেয়েটাকে নিয়ে তার এতটা অধিকারবোধ কাজ করছে—তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
আরহাম রাগী কণ্ঠে বলে ওঠে,
—মুখে মুখে তর্ক করো, স্টুপিড গার্ল? আমার সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করো? সোজা ক্লাস থেকে বের হয়ে কান ধরে দাঁড়াবে!
এবার জারার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে। জীবনে কখনো এতটা অপমানিত হয়নি সে। আবার প্রচণ্ড রাগও হচ্ছে। নিজের রাগকে আর দমিয়ে রাখতে না পেরে জারা ব্যাগটা নিয়ে উঠে চলে যেতে নেয়।
ঠিক তখনই তার লম্বা বেনিতে টান পড়ে।