জারার সব ক্লাস শেষ, ছুটি দিয়েছে। সে বাইরে এসে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে। তার কাছে কোনো ফোন নেই, তাই ভাইয়াকেও ফোন করতে পারছে না। হঠাৎ বাইকে করে তার ছোট বোন ও ভাইয়া এসে দাঁড়ায়। রাফিদ বলে, “জারা, বাইকে ওঠ।” জারা কোনো কথা না বলে বাইকে উঠে পড়ে।
জারা বলে, “রাইসা, তুই ভাইয়ার সাথে বাসায় থেকে এলি?”
রাইসা বলে, “আমি তো বাসায় যাইনি। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমরা সারাদিন ঘুরেছি। তারপর আমি তোমাকে নিয়ে বাসায় যাব এখন।”
জারা চিল্লিয়ে বলে, “কী! আমাকে ছাড়াই সারাদিন ঘুরেছিস? ভাইয়া, আমাকে না নিয়ে তুমি ওকে সারাদিন ঘুরাতে থাকলা! আমার কথা একবারও মনে হলো না? আমাকে তুমি ভালোই বাসো না। তোমাদের সাথে আমি আর কথা বলব না।”
রাফিদ বলে, “আরে, রাইসা তো কালই বাসায় চলে যাবে। আর আমি তোকে ঘোরাব। তুই যে আমার কাছে থাকবি!”
আবার রাইসা বলে, “না না, যখন ঘুরতে যাবে, তখন আমায় বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে।”
এভাবেই দিনটি পার হয়ে কেটে যায় আরও একটি দিন।
কাল রাফিদ জারাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে রাইসাকে বাসায় রেখে এসেছে। জারা আর রাফিদ একসাথে সকালের নাস্তা করে নেয়। তারপর রাফিদ জারাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে নিজে নিজের ইউনিভার্সিটিতে চলে যায়।
জারা গুটি গুটি পায়ে নিজের ক্লাসরুমে এসে বসে। আগে থেকেই রিমি এসে সেকেন্ড বেঞ্চে বসেছিল। জারা রিমির পাশে গিয়ে বসে। তারপর বলে, “কেমন আছো, রিমি?”
রিমি বলে, “এই তো, কালই আমাদের দেখা হয়েছে। আজ তুমি জিজ্ঞেস করছ, আমি কেমন আছি? বন্ধুত্বের মধ্যে এত কুশল বিনিময় কিসের?”
একটু হেসে বলে।
জারা বলে, “হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ।”
এভাবে দুইটা ক্লাস শেষ হয়। এখন ফিজিক্স ক্লাস হবে।
ফিজিক্স ক্লাসে আরহাম স্যার আসবেন। জারা রিমির কাছ থেকে আগের নোটগুলো নিয়ে নিয়েছে, যাতে স্যার কোনো প্রশ্ন করলে জারা উত্তর দিতে পারে। জারা ফিজিক্সে খুব ভালো স্টুডেন্ট। তবুও সে চায় না তাকে কেউ অপমান করুক। সেজন্যই সকল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
আরহাম স্যার রুমে প্রবেশ করতেই সকলে উঠে দাঁড়ায়। স্যারের কী গেটআপ, যে কেউ দেখলেই ক্রাশ খাবে! কালো কোট, তার নিচে সাদা শার্ট ইন করা, উপরের দুটি বোতাম খোলা। হাতে ঘড়ি আর কালো প্যান্ট। ৬ ফুট ১ ইঞ্চির আরহাম কে খুব বেশিই হ্যান্ডসাম লাগছে।
ক্লাসের সব মেয়েরাই স্যারের জন্য পাগল, শুধু জারা বাদে। প্রথম দিনে জারার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। এ কারণেই জারার আরহাম স্যারকে ভালো লাগে না। নইলে জারাও ছোটখাটো ক্রাশ খেত।
রুমে প্রবেশ করতেই আরহামের চোখ যায় সেকেন্ড বেঞ্চে বসে থাকা জারার দিকে। জারা একটা ডার্ক মেরুন রঙের গাউন পরেছে। গাউনে ছোট ছোট ফুল এমব্রয়ডারি করা। গাউনের সাথে ম্যাচিং করা ডিজাইনের ওড়না আর পাজামা। জারার মাথায় হিজাব নেই। লম্বা চুলগুলো বেণি করা।
আরহামের চোখ কুঁচকে আসে। জারার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা ছেলেটার দিকে চোখ পড়তেই কেন যেন চোখ আরও কুঁচকে যায়।
আরহাম একদম জারার সামনে এসে দাঁড়ায়। জারা ভয়ে কাচুমাচু হয়ে বসে।
আরহাম বলে, “মিস জারা রহমান, স্ট্যান্ড আপ।”
জারা উঠে দাঁড়ায়।
আরহাম বলে, “তোমার ইউনিফর্ম কোথায়?”
জারা অবাক হয়। মনে মনে ভাবে, এখানে কত মেয়ের, কত মানুষের ইউনিফর্ম নেই, শুধু তার দিকেই নজর গেল এই খাটাশ ব্যাটার!
কথায় কথায় ইংলিশ ঝাড়তে থাকে—ইংরেজি একটা!
তারপর জারা আমতা আমতা করে বলে, “আসলে স্যার, আমার ইউনিফর্ম টেইলার্সে বানাতে দেওয়া হয়েছে। এখনো পুরোপুরি রেডি হয়নি।”
আরহাম গম্ভীর কণ্ঠে বলে, “ওকে। কাল থেকে ইউনিফর্ম পরে আসবে।”
তারপর ফিজিক্সের একটি নতুন চ্যাপ্টার শুরু করে। বোঝানো শেষ হলে বলে, “কালকে এই চ্যাপ্টার থেকে সকলকে প্রশ্ন ধরব। সো, বি কেয়ারফুল।”
কলেজ শেষে তার ভাই রাফিদ তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাসায় এসে জারা খাওয়া-দাওয়া করে গোসল করে এসে কোচিংয়ের জন্য রেডি হতে থাকে।
তার ভেজা চুল বাঁধবে, নাকি হিজাব পরবে, নাকি চুলগুলো এমনিই রাখবে—তা বুঝতে পারছে না জারা। ভেজা চুল বেঁধে রাখলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয় জারার।
হাতে ক্লিপ আর খোঁপা নিয়ে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জারা। এমন সময় রাফিদ জারার রুমে আসে। বোনের চিন্তিত মুখ দেখে বলে, “কী হয়েছে, জারা?”
জারা বলে, “ভেজা চুল বাঁধব নাকি এড়িয়ে দেব? না বাঁধলে তো চারদিকে উড়ে বেড়াবে।”
রাফিদ জারার পেছনে এসে দাঁড়ায়। সামনে থেকে জারার চুলগুলো পেছনে এনে বড় ক্লিপ দিয়ে আটকে দেয়।
জারা খুশি হয়ে বলে, “থ্যাংকস ভাইয়া, এবার আর সমস্যা হবে না।”
তারপর হেসে বলে, “তোমাকে বিয়ে করে তোমার বউ জিতবে কিন্তু!”
হঠাৎ রাফিদের ফোন বেজে ওঠে। বাবা ফোন দিয়েছেন। রাফিদ ফোন ধরে সালাম দেয়।
—আসসালামু আলাইকুম, বাবা। সবাই কেমন আছো?
রায়হান রহমান বলেন, “ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমরা সবাই ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?”
—আমরাও ভালো আছি, বাবা।
কিছুক্ষণ পরিবারের সবার খোঁজখবর নেওয়ার পর রায়হান রহমান বলেন, “জারার সাথে একটু কথা বলিয়ে দে তো।”
রাফিদ ফোনটা জারার হাতে দিয়ে বলে, “নে, বাবা তোর সাথে কথা বলবে।”
জারা ফোনটা হাতে নিয়ে সালাম দেয়। এরপর বাবা-মেয়ের মধ্যে কুশল বিনিময় হয়।
রায়হান রহমান জিজ্ঞেস করেন, “জারা, পড়াশোনার কী খবর? কলেজ কেমন লাগছে?”
জারা মুচকি হেসে বলে, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই। পড়াশোনাও ভালো চলছে। এখন আবার কোচিংয়ে যাব।”
“ভালো করে পড়াশোনা করো। নতুন জায়গায় গিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?”
—না বাবা, কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ভাইয়া তো সবকিছু দেখাশোনা করছে।
মেয়ের কথা শুনে রায়হান রহমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। এরপর একে একে দাদি, মা আর রাইসার সাথেও কথা বলে জারা। রাইসার সঙ্গে কথা বলার সময় দুজনের মধ্যে হাসি-ঠাট্টাও হয়।
কথা শেষ করে জারা ফোনটা রাফিদের হাতে দিয়ে দেয়।
রাফিদ ফোন রেখে বলে, “চল, এবার কোচিংয়ে যেতে হবে।”
জারা ব্যাগটা নিয়ে রাফিদের সঙ্গে কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
রাফিদ শুধু জারার ভাইই নয়, ওই কোচিংয়ের একজন শিক্ষকও। পড়াশোনার পাশাপাশি সে পার্টনারশিপে একটি ব্যবসাও করে। নিজের পড়াশোনা, চাকরি আর ব্যবসা—সবকিছুই সে বেশ দায়িত্বের সঙ্গে সামলে চলছে।