ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ১)

৫৬তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥

#পার্ট-৫৬♥

#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥

.

🌺

.

পশ্চিম আকাশে সূর্যের ডুবি ডুবি ভাব। হাল্কা হাল্কা মেঘের বুক চিরে কিরণ ছড়িয়ে দিচ্ছে রক্ত রাঙা সূর্যটা। আর বেশি সময় নেই হয়তো বা ২০ কি ১৫ মিনিটের মাথায় অস্ত যাবে সে।

রুশো ঘড়ি দেখছে, এখন সময় ৬ টা বেজে ৪০ মিনিট। এতোক্ষণে তো তার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির চলে আসা উচিত ছিলো। লেইট করছে সে। আধাঘন্টা কি এক ঘন্টা লেইট করলেও কোনো সমস্যা ছিলো না রুশোর। কিন্তু সেখানে ২ ঘন্টা পেড়িয়ে যাচ্ছে অথচ রাত্রির কোনো খবরই নেই। তবে কি সে আসবে না?

আচ্ছা একটা ফোন করে তো দেখাই যায়, কিন্তু আফসোস রুশোর কাছে তো রাত্রির নম্বর টাও নেই। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে কোলের ওপর থেকে আধফোলে বেলুনগুলো সরিয়ে ফোনটা হাতে নিলো রুশো। উদ্দেশ্য অনন্যাকে ফোন করে রাত্রির খোঁজ জানা। সেই ২ ঘন্টা আগে অনন্যারা তাকে এই ক্যাফেতে বসিয়ে ডেকোরেশনে হেল্প করে শপিং মলে গিয়েছে। পরের মাসের প্রথম সপ্তাহেই অগ্নি-অনন্যার, নিত্য-নীবিড়ের সাথে বিয়ে। তাই কেনাকাটাও রয়েছে বেশ।

.

দুবার কল করতেই ওপাশ থেকে অগ্নি ফোনটা রিসিভ করে বলে উঠলো,

---- কিরে রুশো, প্রোপোজ করলি? কি বললো রাত্রি?

আর অনু শাড়ি দেখছে তাই আমি রিসিভ করলাম।

.

অগ্নি কথার জবাবে ঠিক কি বলবে, তা রুশোর জানা নেই। হ্যা বললে সেটা হবে মিথ্যে আবার না বলতে গেলেও কথাটা গলায় জট পাকিয়ে আটকেই যাচ্ছে। ওষ্ঠদ্বয় কাঁপছে তার। নিজেকে সামলে নিয়ে রুশো বললো,

---- ন...না ব্রো। ও আসে নি।

.

রুশোর এই ছোট্ট কথাটাই অগ্নিকে চরমভাবে হতাশ করতে সক্ষম ছিলো। তাই তো নিমিষেই হাসিমাখা মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো তার। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো অগ্নি,

---- তার মানে কি রুশো? আমরা তোকে ২ ঘন্টা আগে ক্যাফেতে ছেড়ে এসেছি। এতোক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিস তুই? একবার জানাবি তো! অনু নাহয় খোঁজ নিয়ে জানিয়ে দিতো!

.

অগ্নি চিন্তা করছে রুশোকে নিয়ে, যেটা এই মুহুর্তে একদমই ভালো লাগছে না রুশোর। অগ্নির তো এখন হাসি খুশি থাকার কথা। বিয়ের শপিং বলে কথা, নিত্যর গায়ে শাড়ি ধরে ঠোঁট কামড়ে ভ্রু কুঁচকে একের পর এক শাড়ি দেখে চুজ করবে। সেই জায়গায় কিনা তার মুখে হতাশার চিহ্ন। না, এতো শোভা পায় না মোটেই। তাই রুশো তৎক্ষণাৎ হাসার চেষ্টা করলো, তাতে সফল ও হলো বটে। হাসিমুখেই সে বললো,

.

---- ছুটকি কে জানিয়ো না ব্রো! যদি জানতে পারে ওর ডাকে রাত্রি আসে নি তবে কষ্ট পাবে ও। আর মজার কাহিনী কি জানো? আমি এতোক্ষণ অপেক্ষা করার বদলে স্টোরি লিখতে বসেছিলাম, টেরই পাই নি যে ২ ঘন্টা পেড়িয়ে গেছে। আমি আসছি ব্রো তুমি একদম টেনশন করো না।

.

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললো অগ্নি। সে জানে এই মুহুর্তে রুশো নাটক করে হাসছে। এই হাসি কৃত্রিম। এতে প্রাণ নেই। এই হাসি নির্জীব, বড্ড স্বাদহীন! রুশোর প্রাণ খোলা হাসি চেনে অগ্নি। রুশো আর যাই পারুক তার কাছে মিথ্যে বলতে পারে না। মিথ্যে বললেও ঠিকই সে ধরে নিতে পারে। যার কারণে সেই ছোটতেই বকার খাবার ভয় না পেয়ে মিথ্যে বলাই ছেড়ে দিয়েছে অগ্নির কাছে রুশো।

অগ্নি নিজেকে সামলে নিলো ছোট্ট করে "আয় তবে!" বলেই ফোনের লাইন কেটে দিলো। তার মতে রুশোকে মনমরা হয়ে থাকাটা একেবারেই মানায় না। ওর মুখভার হলে যেনো মনে হয় তার আশেপাশের সবকিছুই প্রাণহীন। তার প্রানবন্ত ছন্দময় আচার আচরণ হাসতে বাধ্য করে সবাইকে। আর আজ তারই কিনা মন খারাপ?

.

🍂

.

সাথে করে আনা ভ্যানিলা কেকটার দিকে একবার ঝুঁকে তাকালো রুশো। কি সুন্দর জ্বলজ্বল করছে "এটম বোম্ব" লেখাটা! অনন্যা বলেছিলো এই লেখাটা দেখে নাকি নির্ঘাত তার নাক আবারও ফাটিয়ে টমেটো বানিয়ে দেবে রাত্রি। তখন রুশো হেসে বলেছিলো "ওর স্পর্শটা যে ফ্রি ফ্রি পাচ্ছি এটাই কি অনেক নয়? হোক সেটা ঘুষি কিংবা অধরের স্পর্শ!"

কথাটা মনে পড়েতেই দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো রুশো। চোখ দুটো বুজে জোড়ে একটা শ্বাস নিয়ে ডায়ামন্ড রিংটা পকেটে পুরে উঠে দাঁড়ালো সে। রিংটা তার এটম বোম্বের পছন্দ হবে কি না এই নিয়ে কত ডিপ্রেসড ছিলো সে, অথচ রিংটা দেবার সুযোগই হলো না তার।

কেকটা আবারও তার পূর্বের স্থানে রেখে তার সাজানো ব্যানার আর বেলুনগুলোয় একবার হাত বুলিয়ে হাটা ধরলো সে বাহির পথের উদ্দেশ্যে। গ্লাসের তৈরি দরজাটা টেনে খুলতে নিলেই থমকে গেলো রুশো। ওইতো সে আসছে, তার প্রিয়, তার এটম বোম্ব আসছে। কিন্তু একি আজ তার প্রিয়তম শাড়ি পড়েছে! আজ কি শুধুই জন্মদিন বলেই শাড়ি পড়েছে নাকি অন্য কিছু?

প্রশ্নটা বার কয়েক মনের মাঝে আওড়ে নিয়ে উল্টো পা ফেলে পিছিয়ে এলো রুশো। আবারও তার আগের জায়গায় ফেরত এসে কেকটা বের করে ক্যান্ডেল গুলো প্যাকেট থেকে বের করে কেকের চারিপাশ দিয়ে লাগিয়ে দিলো সে। এর মাঝেই দু জোড়া পায়ের প্রবেশ ঘটলো ক্যাফেতে। রুশো তৃষার্ত দৃষ্টিতে রাত্রির দিকে তাকিয়ে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। যেনো এতোক্ষণের সাধনার ফল এই মাত্রই পেলো সে। অথচ তার প্রিয়তম'র সাথেই যে আরো একজনও এসেছে তার খেয়ালই রাখেনি রুশো। রাত্রি ব্লু কালারের জরজেট শাড়ি তার সাথে ব্লু পাথরের সেট পড়েছে। চুলগুলো এক সাইডে এনে রাখা। এতোটুকু পর্যবেক্ষণ করতেই রুশোর সামনে এসে দাড়ালো রাত্রি। রুশোকে দেখে অবাক হয়ে সে বললো,

.

---- আপনি যে! অনন্যা কোথায়?

.

রাত্রির প্রশ্নের কোনো জবাব দিতেই পারলো না রুশো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে একই ভাবে চেয়ে রইলো সে রাত্রির ওই উজ্জ্বল মুখখানায়। রুশোর কোনো জবাব না দেওয়ায় রাত্রি আবারও প্রশ্ন করবে তার আগেই পাশে থাকা ব্যক্তিটি রাত্রির দিকে প্রশ্ন ছুড়লো,

.

---- রাত্রি কে ও?

.

পাশে থাকা ব্যক্তিটির উপরোক্ত প্রশ্নে টনক নড়লো রুশোর। বার কয়েক ছেলেটির দিকে তাকিয়ে তাকে চেনার চেষ্টা করে অবশেষে ব্যার্থ হলো সে। রাত্রি হাসিমুখে পরিচয় করিয়ে দেবার খাতিরে বললো,

---- উনি হচ্ছে অনন্যার কাজিন রুশো আহমেদ! আর রুশো ভাইয়া, ইনি হচ্ছেন আমার কাজিন দিদার কাবির। কালই ঢাকা থেকে রাজশাহী এসেছেন। উনার সাথেই ছিলাম এতোক্ষণ তাই লেইট হয়ে গিয়েছে। আসলে আমার ফোনটা হঠাৎ কাজ করছে না তাই অনন্যাকে জানাতে পারিনি।

.

রুশো ব্যাপারটা গায়ে মাখালো না, হাসিমুখেই দিদারের সাথে হ্যান্ডশেক করে কুশল বিনিময় করে বসতে বললো তাদের।

রাত্রি আবারও রুশো বাদে কাউকে দেখতে না পেয়ে প্রশ্ন করলো,

---- বাকিরা কোথায়?

.

রুশো কিছুক্ষণ কি বলবে ভেবে নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,

---- আসলে এটম বোম্ব! অনেকক্ষণ ধরেই ছিলো সবাই। তুমি আসছো না, কোনো খোঁজ নেই তাই কাজ থাকায় মলে গিয়েছে। আর যেহেতু আমার কোনো কাজ ছিলো না তাই আমাকেই তোমার অপেক্ষা করতে বলেছে সাথে সেলিব্রেশনও।

.

রুশোর মুখে "এটম বোম্ব" ডাক শুনায় ভ্রু কুঁচকালো দিদার, রুশো সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বললো,

---- মে আই এটম বোম্ব? অনন্যা কিন্তু খুব সাধ করে সবটা সাজিয়েছে৷ ওর মন ভেঙোনা প্লিজ।

.

রুশোর করুন গলায় করা রিকুয়েষ্ট ফেলতে পারলো না রাত্রি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আজ রাজি হলো সে। অন্য সময় হলে হয়তো সোজাসুজি না বলে বসতো কিন্তু এতোসব এরেঞ্জমেন্ট দেখে বিবেকে বাঁধা দিলো রাত্রির। হাজার হোক তার জন্যই এতোকিছু করেছে অনন্যা, এখন সে যদি এসব ফেলে চলে যায় তবে বড্ড কষ্ট পাবে মেয়েটা। সাথে এতোকিছুর অপচয়ও হবে।

.

🌹

.

---- ওহ শাট আপ অনন্যা, বিয়েতে কেউ ব্লাক কালারের শাড়ি পড়ে না। ব্লাক বাদে আদার্স কালার নাও। দেখো ব্লু আছে, গ্রিন আছে, রেড আছে, গোল্ডেন আছে....

.

---- আহহা কিন্তু আমি তো ব্লাকই পড়বো! নাহলে বিয়েই করবো না। ভাইয়ায়ায়া....! তোর এই পঁচা বেস্টু কম ভাই বেশি সাদা বিলাইকে বল যাতে আমায় বিয়েতে ব্লাক শাড়িই পড়তে দেয়। নাহলে আমি বিয়েই করবো না।

.

এতোক্ষণ ধরে শাড়ি চুজ করার বদলে কালার নিয়েই তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে ফেলায় অতিষ্ঠ হয়ে সেলসম্যান মাথায় হাত রেখে ধপ করে বসে পড়েছেন শাড়ির পাহাড়ের ওপরই। নিত্য আপু পাশের মলে গিয়েছে আম্মুদের সাথে। এদিকে অগ্নি ভাইয়া কি করবে ভেবে কূল পাচ্ছে না। অনেক ভেবে সামনে থেকে একটা ডিপ রেড বেনারসি হাতে নিয়ে ভাইয়া বললো,

.

---- ওহ ওয়াও অনু! এই শাড়িটা দেখে। এটা পড়লে একেবারে কুইন লাগবে তোকে।

.

আমি ভাইয়ার হাত থেকে টান মেরে শাড়িটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বললাম,

---- দরকার নেই কোনো কুইন টুইন হওয়ার। ব্লাক পড়লে যদি আমাকে (witch) ডাইনীও লাগে তাও আমি ব্লাকই পড়বো। তুইও এই সাদা বিলাইয়ের মতোই পঁচা। রুশো ভাইয়াকে আসতে দে খালি, ভাইয়া ঠিকই আমায় নির্দ্বিধায় ব্লাক পড়তে বলবে।

.

একটু থেমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে পড়ায় চটজলদি অগ্নি ভাইয়ার দিকে প্রশ্ন ছুড়লাম আমি,

---- এই ফোন টা দে। রুশো ভাইয়া কি কল করেছিলো? রাত্রিকে প্রোপজাল দিয়েছে কি রুশো ভাইয়া? রাত্রি কি বললো বিনিময়ে? নিশ্চয়ই এক পায়ে খাড়া হয়ে রাজি হয়ে গিয়েছে তাইনা?

.

আমার প্রশ্নে নিমিষেই মুখে ঘন কালো মেঘ এসে ভিড় জমালো ভাইয়ার। ভাইয়া জানে আমার কাছে কিছু লুকিয়ে পার পাবে না তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে জোড়ে একটা শ্বাস টেনে বললো,

---- রাত্রি যায় নি অনু। হয়তো কোনো কাজে আটকে পড়েছে। তুই মন খারাপ করিস না বোন প্লিজ।

.

ভাইয়ার কথায় ঠাস করে হাত থেকে ব্যাগটা পড়ে গেলো আমার। তাহলে এতোক্ষণ ধরে রুশো ভাইয়া কি করলো? রাত্রি তো যায় নি! না জানি কতোটা কষ্ট পেয়েছে রুশো ভাইয়া। আর সময় নষ্ট করা যাবে না, এক্ষুনি যেতে হবে আমায়, এক্ষুনি!

কথাগুলো মনে মনে বলে নিয়ে শাড়ি গুলো রেখে দিয়ে ব্যাগটা হাতে তুলে নিলাম আমি। মল থেকে বেড়িয়ে যেতে লাগলাম তৎক্ষণাৎ। আমার পেছন পেছন ডাকতে ডাকতে ছুট লাগালো অগ্নি ভাইয়া সাথে নীবিড় ভাইয়াও।

.

🍁

.

ক্যান্ডেল নিভিয়ে কেকটা কেটে নিয়ে রুশোর হাতে এক পিস আর দিদারের হাতে এক পিস ধরিয়ে দিলো রাত্রি। এক টুকরো কেক মুখে নিয়ে খেতে লাগলো সে। তার পছন্দের ভ্যানিলা কেকই অর্ডার দেওয়া হয়েছে। চকলেট কেক ততটা খারাপ না লাগলেও ওর ভ্যানিলাই বেশি ভালো লাগে। সেই সুবাদেই হয়তো অনন্যা নিজের চকলেট কেক পছন্দের সত্ত্বেও ভ্যানিলা ওর্ডার করেছে। কিন্তু রাত্রি অবাক হলো কেকের ওপরে "এটম বোম্ব" লেখাটা দেখে। এটা যে রুশো ছাড়া আর কারোও কাজ নয় তা খুব ভালো করেই জানে সে। কিন্তু পাবলিক প্লেসে তাও আবার কাজিনের সামনে রুশোর নাকটা ফাটানো পসিবল না। তাই চুপ করেই রইলো সে।

.

রাত্রি আজ রুশোর ব্যবহারে বেশ অবাক হচ্ছে। কোনো লাফালাফি নেই, শয়তানি ফাজলামি নেই। কি সুন্দর শান্ত হয়ে রয়েছে সে। কেমন যেনো অদ্ভুত লাগছে রুশোকে আজ তার। এই স্বভাবটা রুশোর সাথে যেনো বড্ড বেমানান। ওকে তো বাচ্চামিতেই মানায়।

.

রুশো মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করে যাচ্ছে। আজ যে করেই হোক তাকে নিজের মনের কথাটা বলতে হবে রাত্রিকে। এমনিতেই অনেক দেড়ি হয়ে গিয়েছে আরও দেড়ি হয়ে গেলে হয়তো শেষমেশ হারিয়ে ফেলতে হবে তার ভালোবাসাকে। তাই নিজেকে শক্ত করে জোড়ে একটা শ্বাস টেনে আচমকাই রাত্রি হাত ধরে বসলো সে। হঠাৎ এভাবে হাত ধরায় চমকে উঠলো রাত্রি। এদিকে ভ্রু কুঁচকে এলো দিদারের।

রুশো কারো দিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে রাত্রির সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়লো। কাঁপাকাঁপা গলায় সে বললো,

.

---- এটম বোম্ব! তোমায় আমার অনেক জরুরী কিছু বলার আছে।

.

রুশোর থেকে খুবই সাবধানে হাতটা ছুটিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাত্রি বললো,

---- কি বলবেন বলুন! আর এভাবে হাটু গেড়ে বসলেন কেনো?

.

রুশো নার্ভাসনেসের বশে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। বার কয়েক "আমি তোমায় ভালোবাসি!" বাক্যটা মনের মধ্যে আওড়ে নিয়ে বুক ফুলিয়ে জোড়ে একটা শ্বাস টানলো সে। আমতা আমতা করে সে বললো,

.

---- je t'aime...! (France)

.

রাত্রি রুশোর বলা উদ্ভট বাক্যটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো কিন্তু মানেটা বুঝলো না সে। এরকম কোনো শব্দ ভোকাবুলারিতে আজন্মেও পরেছে কিনা সন্দেহ রাত্রির। অতঃপর কোনো অর্থ বুঝতে না পেরে রাত্রি বললো,

---- মানে?

.

রুশো জিহবায় কামড়ে ধরলো । নিজের বোকামির জন্য বড্ড লজ্জিত সে। সে তো জানে রাত্রি ফ্রেঞ্চ ভাষা বুঝবে না। আর ঠিক সেই জন্যই নার্ভাসনেসের ফলে যে বাংলা বাক্যটা মুখেই আসতে চাইছে না তার, কিভাবে বোঝাবে সে এই কথাটা রাত্রিকে? মনে মনে "ইউ ক্যান ডু ইট রুশো!" বলে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে আবারও বলে উঠলো রুশো,

---- ti amo....! (Italian)

উপসস সরি! আই মিন, Te quiero! (spanish) আরে ধ্যাত..! কি বলছি আমি?

.

বলে নিজেই নিজের মাথায় চাটি মেরে দিলো রুশো। এদিকে রাত্রি আর দিদার একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। তারা রুশোর কান্ড কারখানার কোনো মানেই খুঁজে পাচ্ছে না। না বাংলা, না হিন্দি আর না ইংলিশ! কোনো ভাষার সাথেই মিল পাচ্ছেনা তারা রুশোর বলা বাক্যগুলোর। রুশোর এরকম উল্টোপাল্টা উদ্ভট ভাষায় বলা দুর্বোধ্য বুলিগুলোয় চরম বিরক্ত হয়ে গেলো দিদার। সাথে রাত্রির চোখেমুখেও বিরক্তি স্পষ্ট। একটু জোড়েই এবার সে বললো,

.

---- কখন থেকে উল্টোপাল্টা কথা বলে যাচ্ছেন। কি বলছেন বলুন তো? রাত হয়ে এসেছে। যেতে হবে আমাদের।

.

রাত্রির ধমক খেয়ে বুকটা ধক করে উঠলো রুশোর। কি করবে ভেবে না পেয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। এবার যে তাকে বলতেই হবে, যে করেই হোক বলতেই হবে। কিন্তু রাত্রির চোখের দিকে যে তাকাতেই পারছে না রুশো। আর কোনো পথ খুঁজে না এয়ে হুট করেই রাত্রিকে জড়িয়ে ধরলো সে। রাত্রির হাইট রুশোর প্রায় কাধ পর্যন্ত হওয়ায় সহজেই রুশোর হৃদপিন্ডের ডিবডিবে ধ্বনি কানে আলোড়ন সৃষ্টি করলো তার। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেলো সে।

রুশো বার কয়েক জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো,

.

---- আমি জানি না তুমি এর প্রতিউত্তরে কি বলবে কিন্তু এটাই সত্যি, আ...আমি তোমায় ভালোবাসি। প্রথম দিন তোমায় দেখেই এই অনুভূতি মনের কোণে নাড়া দিয়েছে আমার। কিন্তু বুঝতে পারে নি। শুধুমাত্র ভালোলাগা ভেবে এড়িয়ে চলে গিয়েছি সেই অনুভূতি। কিন্তু না সেটা শুধুমাত্র ভালোলাগা ছিলো না, ধীরে ধীরে গ্রাস করেছে আমায় সেই অনুভূতি, খুবই তীব্রভাবে গ্রাস করেছে আমায় সেই প্রথম প্রেমের অনুভূতি।

যতোই দিন বেড়েছে ততই তোমার প্রতি দূর্বল হয়ে পরেছি আমি। একটা সময় বুঝতে পেরেছি আমি ভালাবাসা নামক অনাকাঙ্ক্ষিত মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছি, নিজের অজান্তেই নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছি আমি তোমায়। আমি জানি না তুমি আমায় ফিরিয়ে দেবে নাকি জড়িয়ে নেবে। শুধু এতোটুকু জানি ভালোবাসি। বড্ড বেশি ভালোবাসি তোমায় আমি এটম বোম্ব। বড্ড বেশি.....!

উইল ইউ বি মাইন রাত্রি? ফরএভার?

.

কথা শেষ হতেই কেউ রুশো-রাত্রিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো। তারা নিজেদের সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষটিকে দেখার জন্য সচেতন চোখে তাকালো। রুশোর চোখে এখনও জল টলমল করছে। রাত্রিকে কথাগুলো বলার সময় বার বার গলায় দলা পাকিয়ে যাচ্ছিলো তার।

দিদার রাগে ফুঁসছে। হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরে ঝাঁঝালো কন্ঠে রুশোকে উদ্দেশ্য করে দিদার বললো,

.

---- হাউ ডেয়ার ইউ! তুমি আমার ফিয়ন্সিকে আমার সামনেই প্রোপোজ করছো? রাত্রি এই সব দেখানোর জন্য আমায় নিয়ে এসেছো তুমি? তোমায় বার্থডে সারপ্রাইজ তো আমি দিলামই তারপরও কেনো আসতে জোড় করলে? দেখলে তো কি হলো....! আর এক মুহুর্তও এখানে থাকবে না তুমি চলো আমার সাথে।

.

বলেই রাত্রির হাতটা টেনে নিয়ে যেতে লাগলো দিদার। কিন্তু বাঁধা দিলো রাত্রি। দিদারকে চোখের ইশারায় একটু থামতে বলে, রুশোর সামনাসামনি গিয়ে দাড়িয়ে পড়লো সে। রুশো এখনোও ঘোরের মধ্যে রয়েছে। দিদাদের বলা "ফিয়ন্সি" শব্দের অর্থটা খুব সহজ হলেও ভারী লাগছে তার কাছে, বড্ড ভারী।

রাত্রি রুশোর দিকে তাকিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে বলতে শুরু করলো,

.

---- ভুল করেছেন আপনি আমায় ভালোবেসে। আম সরি। আমি ভালোবাসি না আপনাকে। আপনার সেটা জানার কথা। তাছাড়া বাড়ি থেকে আমার বিয়ে ঠিক করেছে দিদার ভাইয়ার সাথে। সামনে মাসে আমাদের বিয়ে। এই কথাটাই অনন্যাকে জানাতে দিদার ভাইয়াকে সঙ্গে করে এনেছিলাম আমি। কিন্তু এমন একটা সিনক্রিয়েট হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি।

মাফ করবেন আমায়। দোয়া করি আপনার জীবনে অনেক ভালো কেউ আসুক। যার সাথে ভালো থাকবেন অাপনি, আসছি....!

.

কথাটা বলেই উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো রাত্রি। দিদারকে চোখের ইশারায় "চলুন" বলেই বড়বড় পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলো সে।

দিদার-রাত্রি যেতেই রুশো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো। সামনে থাকা টেবিলে সজোড়ে একটা লাথি মেরে দিয়ে বলতে শুরু করলো,

---- আমি তো জানতাম রাত্রি আমায় ভালোবাসে না তাও কিভাবে এক্সপেক্ট করলাম? আমি তো ব্রো না যে প্রোপোজ করার পর নিজের ফিয়ন্সি থাকা সত্ত্বেও সে ছুটে আসবে আমার কাছে। হাও ষ্টুপিড আই এম!

.

বলেই ব্যানার-বেলুন গুলো দেয়াল থেকে ছিড়ে ছুড়ে ফেলে দিলো রুশো। ক্যাফের একজন ওয়েটার রুশোকে এসব করতে দেখে দৌড়ে এসে আটকিয়ে বললো,

---- হোয়াট হ্যাপেন্ড স্যার! আপনারাই তো সাজালেন এখন নষ্ট করছেন কেনো?

.

রুশো কিছু বললো না। মানিব্যাগ থেকে ৫০০০৳ একটা নোট বের করে ওয়েটারের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে যেতে হাটা ধরলো সে।

.

🌸

.

কার থেকে নেমে একপ্রকার দৌড়ে ক্যাফের সামনে গেলাম আমি। আমার পেছন পেছন ভাইয়ারাও দৌড়ে এলো তৎক্ষণাৎ। ক্যাফের গেট খুলে ঢুকতে যাবো তার আগেই দরজা ঠেলে বেড়িয়ে এলো রুশো ভাইয়া। চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে একদম। চুলগুলোও কেমন এলোমেলো। শার্টের এক দিকের ইন খুলে গিয়েছে। রুশো ভাইয়াকে এরকম অবস্থায় দেখে আমি চমকে উঠে কিছু জিজ্ঞেস করবো তার আগেই ভাইয়া এক ছুটে এসে আমায় শক্ত জড়িয়ে ধরে ফোপাঁতে লাগলো। ফোপাঁতে ফোপাঁতে ভাইয়া বললো,

.

---- ও..ও ভালোবাসে না আমায় ছুটকি! ও...আমার হবে না। কোনোদিনো হবে না। তুই না বলেছিলি ও আমায় ভালোবাসবে কিন্তু না ও আমায় ভালোবাসবে না রে ছুটকি! বিন্দুমাত্রও না!

.

.

.

চলবে...................💕

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন