ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ১)

৫৫তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥

#পার্ট-৫৫♥

#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥

.

🌺

.

বিগত ১৫ মিনিট যাবৎ হেচকি তুলে চলেছি আমি। কি এক অদ্ভুত হেচকি যে গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েও কোনো কাজেই দিচ্ছে না। ঠিক এই জন্যেই অসম্ভব রকমের ভয় পাই আমি এই হেচকি নামক কন্টিনিউয়াসলি জ্বালাতন করা প্যারাটাকে।

আমার হেচকি হয় দুটো কারণে। তার প্রথম কারণ হলো : মাত্রাতিরিক্ত হাসার ফলে, এন্ড নাম্বার টু হচ্ছে : অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কাহিনি শুনার পর। যদিও কাহিনী টা শুনিনি শুধু কাহিনীর নামটাই শুনেছি তবুও হেচকি আমায় হ্যালো হায় বলে ঠিকই চলে এসেছে।

.

তখন আংকেলের বলা প্রোপোজাল শুনে বিষম খেয়ে ফেলেছিলাম আমি, তারই সলিউশন হিসেবে পানি খাইয়ে দিয়েছিলো রুশো ভাইয়া। ব্যাস, বিষমের সাথে পানির বিক্রিয়ায় প্রভাবক হিসেবে উপস্থিত ছিলো এক বড় সড় ঝাটকা, অবশেষে উৎপাদ হিসেবে পেলাম ভূমিকম্প সৃষ্টিকারী হেচকি!

আবার এই হেচকিকে প্রশমিত করার জন্য গলায় আবারও জল ঢালতে শুরু করে দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু আফসোস হেচকির সাথে পানির বিক্রিয়ায় ফলাফল এলো "No Reaction"!

তখন হেচকি তুলতে তুলতে বড়দের আলোচনার পরিবেশের ব্যাঘাত সাথে নিজের সম্মান রক্ষায় মুখ চেপে ধরে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে আসি আমি।

.

বর্তমানে আমার ঘরে উপস্থিত রয়েছে ভাইয়ারা সাথে নিত্য আপুও। রুশো ভাইয়া আমার ননস্টপ হেচকি দেখে মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়ে বললো,

---- লে হালুয়া!

বিবাহিত ছুটকির,

বিয়ের নাম শুনেই এলো হেচকি!

.

অগ্নি ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে আইডিয়া বলেই মুখটা হঠাৎ গম্ভীর করে ফেললো। আমার পাশে বসে মাথা নামিয়ে ভয়ংকর গম্ভীরতা ধারণ করে থম মেরে রইলো ভাইয়া। ভাইয়া ঠিক কি করতে চাইছে তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা আমি। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই থেকে হঠাৎ ভূতের মতো মুখের বিকৃতি বানিয়ে " ভাউউউ" বলে চেঁচিয়ে উঠলো অগ্নি ভাইয়া। অগ্নি ভাইয়ার হঠাৎ এমন করায় কিঞ্চিৎ চমকে উঠলেও ভয়ের বিন্দুমাত্র ছিটেফোঁটাও পড়লো আমার ওপর। বরং আবারও মৃদুস্বরে হেচকি তুলে কেঁপে উঠলাম আমি। অগ্নি ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে চোখেমুখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পরে রাগী গলায় আমায় উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

.

---- কি রে তুই? ভয় পাস না কেনো?

.

আমি বোকার মতো আবারও হেচকি তুলে পাল্টা প্রশ্ন করে বসলাম,

---- কেনো? তোকে আবার ভয় পাবো কেনো? অার ভয় পেলে কি হবে?

.

অগ্নি ভাইয়া এবার নিজের ডান হাত দিয়ে কপাল চাপড়াতে শুরু করলো। কপাল চাপড়াতে চাপড়াতেই চোখ মুখ উল্টে বলে উঠলো,

---- কি আর হবে? তোর এই ভূমিকম্প সৃষ্টিকারী হেচকিটা অন্তত থামবে রে মাথামোটা।

.

অগ্নি ভাইয়ার কথা শুনে নীবিড় ভাইয়া সচেতন চোখে তাকিয়ে বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠলেন,

---- ভয় পেলে হেচকি থেমে যাবে?

.

নিত্য আপু অগ্নি ভাইয়ার জবাব দেওয়ার আগেই বলে উঠলো,

---- মেডিকেল সাইন্সে তো এমন কিছু বলা নেই।

.

অগ্নি ভাইয়া আবারও কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলে উঠলো,

---- সব জায়গাতেই সাইন্স খুঁজে লাভ হয় না গো। ছোট থাকতে আমার হেচকি উঠলে আব্বু হঠাৎ কোনো না কোনো ভাবে ভয় দেখাতো আমাকে। ভয়ে আঁতকে উঠে কখন যে হেচকি চলে যায় টের পাওয়াই যায় না।

.

নীবিড় ভাইয়া অগ্নি ভাইয়ার সলুউশন শুনে এক হাতে তুড়ি বাজিয়ে বলে উঠলেন,

---- আরে আগে বলবি তো! আমি তো জাস্ট তুড়ি বাজিয়েই ওর হেচকি থামিয়ে দিতে পারতাম।

.

বলেই আমার সোজাসুজি এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন উনি। আমার দুই সাইডে নিজের দুহাত রেখে ঠোঁটে বাকা হাসি ঝুলয়ে ক্রমশই ঝুঁকে পড়তে শুরু করলেন সাথে বাড়িয়ে দিতে লাগলেন আমার হৃদস্পন্দন! আমি চোখ বড়বড় করে উনার দিকে চেয়ে রয়েছি। আমি জানি উনি আমায় ভয় দেখানোর জন্যই এমনটা করছেন কিন্তু তবুও ভয় লাগতে শুরু করে দিয়েছে আমার। উনি আমার কাছে আসতে আসতেই বাকিদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,

.

---- চোখ বন্ধ কর তোরা, নায়তো রুশোর মতো ফুটো হয়ে যাবে।

.

উনার কথাটা বলার সাথেসাথেই ভাইয়ারা সাথে নিত্য আপু উল্টো দিকে এক লাফ মেরে ঘুরে চোখ বন্ধ করে নিলো নিজেদের। রুশো ভাইয়া উল্টো দিকে ঘুরেই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলো,

---- ইয়া আল্লাহ, বাঁচালো মেরে ছুটকি কো...!

.

সাথেসাথেই আমার আবারও হেচকি উঠলো, যা দেখে নীবিড় ভাইয়ার দৃষ্টি আগের থেকে আরোও তীক্ষ্ণ হয়ে এলো। উনি আমার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে শীতল কন্ঠে বলে উঠলেন,

---- এখনোও যায় নি? ওয়েট, লেট মি ডু ওয়ান থিংক।

.

বলেই আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে যেতে লাগলেন উনি। এদিকে আমি চোখ বড়বড় করে উনাকে আটকানোর চেষ্টা করে চলেছি। কিন্তু না উনি কি অার আমার কথা শুনার পাত্র? কোনো কালেই নন, তাইতো আমার কানের লতিতে হাল্কা করে নিজের দাঁত দিয়ে কচ করে কামড় দিয়ে বসলেন উনি। সাথেসাথে আমার পুরো শরীর জুড়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেলো যেনো। আনমনেই মৃদু স্বরে চাপা আর্তনাদ নিসৃত হলো আমার ওষ্ঠদ্বয় দ্বারা।

উনি আমায় ছেড়ে সোজা হয়ে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এদিকে আমি ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করেই রেখেছি। উনি কিছুক্ষণ আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন,

.

---- কি হেচকি চলে গিয়েছে তো?

.

আমি চোখ বন্ধ করেই নিজের গলায় হাত বুলাতে লাগলাম। আরে আসলেই তো আর হেচকি আসছে না আমার। যেখানে উনার আমার কানে কামড় দেবার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত হেচকি উঠা কন্টিনিউ ছিলো সেখানে উনি আমায় ভয় খাইয়ে দেওয়া মাত্রই চলে গেলো! হাহ!

হেচকি আর আসছে না বুঝতে পেরে আমি খুশিতে এক লাফ করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দু হাত উপড়ে তুলে ঘুরতে ঘুরতে বলতে লাগলাম,

.

---- ইয়েএএএ......! হেচকি হ্যাজ গন

হইচই ইজ অন.....!

.

আমার কথা শুনে বাকিরা আমাদের দিকে ঘুরে চোখ মেলে তাকালো। রুশো ভাইয়াও খুশিতে আমার সাথে লাফাতে শুরু করে দিলো।

আমাদের দুই ভাই বোনের এমন কান্ড দেখে হু হা করে হেসে ঘড় কাঁপাতে শুরু করে দিলো নীবিড় ভাইয়া,অগ্নি ভাইয়া আর নিত্য আপু। তাদের হাসির ঝংকার দেয়ালে দেয়ালে বাঁধা পেয়ে প্রতিধ্বনির আলোড়ন সৃষ্টি করে পুরো ঘর জুড়ে বিচরণ করতে শুরু করে দিলো।

.

🍂

.

দেখতে দেখতে কেটে গেলো ৫ টা মাস.........!

আমাদের ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়েছে আজ তারই ফল প্রকাশ সাথে আমার বারো ছেড়ে তেরো অবস্থা হবার কথা।

ওদিকে অগ্নি ভাইয়াদেরও ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়েছে ১ সপ্তাহ হতে চললো। কত্তো সুন্দর রিল্যাক্স করে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করছে ভাইয়া। ভাইয়ার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে তিনিই একমাত্র যে কি না মাস্টার্স ফাইনলান এক্সাম দিয়েছে যার দরুন ভীষণ ক্লান্ত তিনি। তাই অফিসেও যেতে চাইছে না এই এক সপ্তাহ ধরে।

আর এদিকে একেবারেই তুচ্ছ আমি। রুশো ভাইয়া যদিও আমায় এনকারেজ করে চলেছে কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। আমার ভয় বাড়ির কাউকে নিয়ে নয়। ভয় তো শুধুমাত্র আমার এক্সিডেন্টলি হাজবেন্ড সাদা বিলাই কে নিয়ে। কারণ গতকাল রাতেই উনি ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন যদি ৪.০০ এর নিচে কোনো ভাবেই পয়েন্ট আসে তবে আমার কপালে শনি গ্রহের থেকেও বড় কোনো শনি রয়েছে।

.

রাত্রি তো একদম ফিলিং চিল মুডে রয়েছে। আন্টিকে ও ভয় পেলেও আন্টি বলেছে ৩.৬৫ আপ হলেই উনি খুশি। আর আংকেল কে ম্যানেজ করা তো ওর এক চুটকির খেল। শুধু মাঝখান থেকে চিপায় পড়েছি আমি। ভয়ে ভার্সিটিও যাই নি আমি। যা দেখার রাত্রি দেখে নিয়ে আমায় জানাবে।

অগ্নি ভাইয়াও যেখানে আম্মু আব্বুর মতো এবার রেজাল্ট মোটামুটি হলেও কিছু বলবে না সেখানে সাদা বিলাইয়ের বাচ্চা থুক্কু উনি তো মেল ভার্সন বাচ্চা কোথায় থেকে আসবে? হোয়াট এভার সাদা বিলাই আমার, না মোটামুটি রেজাল্ট মানবেন আর না চিকন-মাঝারি। উনার একটাই কথা ৪.০০ তো ৪.০০ ই। সাথে মার্কস ও দেখবেন উনি। জীবনটাকে একদম শুকনো মরুভূমির মতো লাগছে আমার।

.

এসব ভাবতে ভাবতেই কানে জাস্টিন বাইবার এর লেট মি লাভ ইউ সং এর টিউন ভেসে আসতে লাগলো। সাথেসাথেই ভেতরটা ধক করে উঠলো আমার। কারণ এটা বর্তমানে কোনো গানের টিউন নয় এটা আমার ফোনের রিংটোন যা জানান দিচ্ছে রেজাল্ট পাবলিশড হয়ে গিয়েছে সাথে আমি ডাব্বাও মেরে গিয়েছি। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনে বড়বড় অক্ষরে রাত্রির নামটা ভেসে উঠলো যা দেখে আমার মুখে হাসি ফুটে ওঠার বদলে এই প্রথম এক পালা কালো মেঘ এসে জমাট বাঁধলো। এভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেই না রিসিভ করবো ওমনি লাইন কেটে গেলো। শেষ মুহূর্তে এসে কল রিসিভ করতে এলে যা হয় আরকি। ঠোঁট উল্টে ফোনটা সাইডে রেখে "বাঁচা গেছে" ভেবে কেটে পড়তে যাবো তার আগেই আবারও রাত্রি কল করে বসলো। ইচ্ছে তো করছে দু-তিনটে থাপ্পড় বসিয়ে দেই শাঁকচুন্নিটাকে।

.

তবুও আপাতত রাগটাকে কন্ট্রোল করে প্রচন্ড নার্ভাস নেস নিয়ে রিসিভ বাটন সোয়াইপ আপ করে ফোনটা নিজের কানে ধরলাম আমি।

রাত্রি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হাসি হাসি ভাব নিয়ে বলতে লাগলো,

---- এই কল রিসিভ করতে এতো দেড়ি করলি কেনো? জানিস আমি ৩.৮৩ পেয়েছি। আজ আমি হেব্বি খুশি ট্রিট দিবো বাসায় যাই আগে।

.

ওর কথার মাঝেই আমি আতংকিত হয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

---- আর আমি?

.

সাথেসাথেই হাসি থামিয়ে মুখি ভার করে ফেললো রাত্রি। যেনো অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে কিছুটা এমন ভাব নিয়েই রাত্রি বললো,

---- আসলে অনন্যা, তোর রেজাল্ট টা আশাজনক হয় নি রে। আমি ভাবিও নি তুই এরকম রেজাল্ট করবি। টেনশন হচ্ছে বাসায় কি বলবি তুই!

.

রাত্রির কথায় গলা আগের থেকেই দ্বিগুণ শুকিয়ে এলো আমার। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ ফেলে জিহবা দ্বারা ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলাম,

---- তাও ক...কতো? ফেইল টেইল করেছি নাকি রে?

.

ওমনি রাত্রি এক চিৎকার দিয়ে আমার কানের পর্দা ফাটিয়ে বললো,

---- ৪.০০ পেয়েছিস তুই অনুউউউউ.....! আমি জাস্ট মজা করছিলাম। ট্রিট তো আমি নেবো ওয়েট কর আসছি আমি।

.

বলেই লাইন কেটে দিলো রাত্রি। আমি এখনো মুখ হা করে বসে রয়েছি। আমি যেনো নিজের কান কেও বিশ্বাস করতে পারছিনা। আমি ৪.০০ এর মধ্যেই ৪.০০ পয়েন্ট ই পেয়েছি। এও সম্ভব?

রুশো ভাইয়া আমায় হা করে থাকতে দেখে ঘাবড়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকে চিন্তিত মুখে ভাইয়া বললো,

.

---- কিরে ছুটকি, রেজাল্ট জেনেছিস? কি বললো এটম বোম্ব?

.

আমি রুশো ভাইয়ার প্রশ্নের কোনো জবাবই দিতে পারলাম না। মুখ হা রেখেই হাতের চারটে আঙুল মেলে ইশারায় বুঝালাম যে আমি ৪.০০ পয়েন্ট পেয়েছি। আমার ইশারা দেখে রুশো ভাইয়া চোখ বড়বড় করে দুহাতে মুখ ঢেকে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

.

---- নেহিইইইইই! চার টে সাবজেক্টে ফেইল....! না না আমি মানি না। তোর ভার্সিটির টিচার্সদের সাথে আমি দেখা করবো। ওরা ঠিক করে খাতা কাটতে জানে না। আমার ছুটকি চার চারটে সাবজেক্টে ফেইল করার মতো স্টুডেন্টই না।

.

বলেই চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো রুশো ভাইয়া। ততক্ষণে ভাইয়ার চিৎকারের আওয়াজ কানে পৌঁছায় আম্মু আব্বু আর ভাইয়াও আমাদের কাছে চলে এসেছে। রুশো ভাইয়া কোন কথার কোন মানে বুঝলো এটা! আমার তো মাথা ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে। রুশো ভাইয়াকে এখন না আটকালে তুলকালাম কান্ড বাঁধিয়ে ফেলবে তাই চটজলদি ভাইয়ার সামনে দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।

আম্মু তৎক্ষণাৎ এসে ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো। সাথে প্রশ্ন শুরু করলো আব্বু আর অগ্নি ভাইয়াও।

.

---- আরে কি হয়েছে রুশো? চেচালি কেনো?(আম্মু)

.

---- কিরে চুপ করে আছিস কেনো?(আব্বু)

.

---- এইরে, অনুর রেজাল্ট শুনে চেঁচালি নাকি? তাহলে শিওর ডাব্বা মারছে। (অগ্নি)

.

আমি সবাইকে থামতে বলে কিছু বলতে যাবো তার আগেই ওদের কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রুশো ভাইয়া আমায় থামতে ইশারা করে বললো,

---- না ছুটকি আমাকে আটকাস না। ওরা পঁচা করে খাতা কেটে পঁচা পঁচা নম্বর দিবে আর আমার ছুটকি বকা শুনবে? না তা হতে পারে না।

.

রুশো ভাইয়ার কথা শুনে অগ্নি ভাইয়া নিজের কপালে হাত দিয়ে চাপড় মেরে বললো,

---- কিহ? অনু ফেইল করছিস তুই? আমি তো জাস্ট মজা করে আস্ক করছিলাম আর সেটাই সত্যি হয়ে গেলো?

.

এবার আর আমার সহ্য হলো না। নিজের শরীরে যতটো শক্তি বিদ্যমান তার সবটা দিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি,

---- স্টঅঅঅঅঅঅপপপ......!!!!

আমি ফেইল করি নিইইই.....! আমি পুরো ৪.০০ পয়েন্টই পেয়েছি। ৪ সাবজেক্টে গোল্লা খাইনি।

.

আমার চিৎকারে সবাই একসাথে চুপ হয়ে গেলো। মন দিয়ে আমার বলা বাক্যটির অর্থ বুঝতে পেরে একে অপরের দিকে এক পলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়া দুজনে একসাথে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো,

---- হুউউররররেএএএ!

.

রুশো ভাইয়া নিজের জিহবায় নিজেই কামড় মেরে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলে উঠলো,

---- ইশশসরে সরি ছুটকি একচুয়ালি তোর টেনশন দেখে আমিও টেনশন করতে শুরু করে দিয়েছিলাম যার জন্য তোর দেখানো হাতের চার আঙুল দেখে চারটা সাবজেক্ট ফেইল ভেবে নিয়েছিলাম।

.

আমি ঠোঁট উল্টে ভ্রু কুঁচকে মুখ ফুলিয়ে রুশো ভাইয়ার দিকে তাকাতেই ভাইয়া এক হাত দিয়ে কান ধরে "সরি" বলে করুন চোখে ভাইয়া তাকালো আমার দিকে। আমি রুশো ভাইয়ার এমন অসহায় ফেইস দেখে ফিক করে হেসে ফেললাম। ভাইয়ার নাক টেনে দিতেই ভাইয়া আমায় ধরে খুশিতে লাফাতে শুরু করলো। এদিকে আম্মু-আব্বু এতোক্ষণে খুশিতে মিষ্টি বের করে আমাদের খাইয়ে দিলো। আব্বু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠলো,

.

---- এভাবেই মন দিয়ে পড়াশুনো কর! অনেক বড় হ মা।

.

আমি চোখের ইশারায় সম্মতি জানালাম। এর মাঝেই নীবিড় ভাইয়া-নিত্য আপু সাথে রাত্রি সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো। নীবিড় ভাইয়া দুহাত পকেটে গুঁজে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলেন,

.

---- পরিশ্রম করে রোজ রাতে পড়ালাম আমি আর ক্রেডিট নিচ্ছে এই স্টুপিড টা?

.

উনার আমায় এভাবে ভেঙিয়ে বলাতে নিমিষেই মুখ ফুলিয়ে ভ্রু কুঁচকালাম আমি। মানলাম শেষের কয়েক মাস উনি আমায় পড়িয়েছেন যেহেতু আমি অগ্নি ভাইয়াকে ভয় পাইনা বলে ওর কাছে পড়ি না। কিন্তু তাই বলে কি সব ক্রেডিট উনার? হাহ! উনি যতই ভালো পড়াক আমি না পড়লে কি আদৌ এতো ভালো রেজাল্ট করতে পারতাম? অবশ্যই না।

আম্মু এগিয়ে গিয়ে নীবিড় ভাইয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

---- এটাও ঠিক। আমাদের বাবুই না পড়ালে এতো ভালো রেজাল্ট হতোই না।

.

আম্মুরও উনাকে সাপোর্ট করায় ফোলা মুখটা আরোও দ্বিগুণ ফুলে উঠলো আমার। নাকে ডান হাত দিয়ে ঘোষা মেরে দাত কটমট করে বললাম,

---- এখনই যদি কয়েক সাবজেক্ট এ ফেইল করতাম তখন ঠিক উল্টো টা বলতে যে " বাবুই এতো ভালো করে পড়ালো অথচ মেয়ে আমার তাকে ফাঁকি দিতে যেয়ে নিজেই ফেইল করে বসলো!"

.

---- আহহা! এরকমটা হওয়ার চান্স ০% ও নেই। কজ আমি পড়িয়েছি, পড়া না করিয়ে কখনো ছাড়ি নি তোমায়। হোয়াট এভার, মার্কস খুব একটাও ভালো হয়নি। নেক্সট টাইম প্রত্যেকটা সাবজেক্টে ৯৫% মার্কস আমি দেখতে চাই।

.

বলেই সোফায় গা এলিয়ে দিলেন উনি। নিত্য আপু আমায় কংগ্রাচুলেশনস বলে বসে পড়লো উনার পাশেই।

রাত্রকে উনাদের সাথে দেখে আমি প্রশ্ন ছুড়লাম,

.

---- তুই আপুদের সাথে আসলি কিভাবে?

.

রাত্রি আমার মাথায় আস্তে করে চাটি মেরে দিয়ে বললো,

---- গেইটের বাইরেই আমার রিক্সা আর ভাইয়ার বাইক দুটোই দু দিক থেকে এসে একসাথেই থেমেছে। হোয়াট আ কোইন্সিডেন্ট না?

.

আমি মুখ বাঁকিয়ে বললাম,

---- হোয়াটএভার।

.

🌸

.

রাত ১১ টা বেজে ১৬ মিনিট......

পা টিপেটিপে নিঃশব্দে রুশো ভাইয়ার ঘরে প্রবেশ করলাম আমি। রুশো ভাইয়া রকিং চেয়ারে আরাম করে বসে বা হাতে ডায়েরি নিয়ে তাতে ডান হাত দিয়ে কলম ঘুরিয়ে কিছু একটা লিখছে।

বর্তমানে ভাইয়ার ঘরে এমন চোরের মতো চুপিচুপি ঢোকার উদ্দেশ্য ভাইয়া ডায়েরিতে ঠিক কি লিখছে তা দেখা।

যেহেতু ভাইয়া জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে রকিং চেয়ারে বসে রয়েছে সেহেতু আমি পেছন থেকে নিঃশব্দে গেলে ভাইয়ার টের পাবার কথা নয়। সেই হিসেবেই চুপিচুপি ভাইয়ার পেছনে গিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম আমি। উঁকি ঝুঁকি মেরে বোঝার চেষ্টা চালাতে লাগলাম ঠিক কি লিখছে ভাইয়া ডায়েরিতে।

.

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ডায়েরির পাতার ভাঁজে চোখ বুলাতেই আমার চোখ একেবারে ছানাবড়া।

রাত্রি লাল রং এর একটা কামিজ পড়ে চোখেমুখে বিরক্তির রেশ ফুটিয়ে নিজের অবাধ্য চুলগুলো হাতখোপা করছিলো ঠিক তখনকারই ছবি ডায়েরির পাতায় বসানো। আজকেই রাত্রি এই ড্রেসটা পড়ে এসেছিলো। আর যতদূর সম্ভব এটা দুপুরের খাবারের আগ মুহুর্তে ছবি।

তার ঠিক নিচেই সামান্য স্পেস রেখে কিছু বাক্য লিখছে রুশো ভাইয়া। অবাক করা বিষয় এই প্রথম রুশো ভাইয়াকে আমি ইংলিশ, থাই, স্প্যানিশ ইত্যাদি ভাষা ব্যতীত শুদ্ধ বাংলায় লিখতে দেখছি। আর একটু ভালো করে উঁকি ঝুঁকি মারতেই লেখাগুলো দৃশ্যমান হলো আমার।

.

"তার অবাধ্য চুলের বাহার

যেনো হৃদয় মাঝের গড়ে তোলে তীব্র হাহাকার!

তার অবিশ্রান্ত চোখের ঘায়েল করা দৃষ্টি,

যেনো বুকের মাঝে ঝড়ায় হাজারো প্রেমে বৃষ্টি!

একি তবে ভালোবাসা?

লুকায়িত শতশত সুপ্ত আশা!

বলতে কি পারবো কভু

মুখ ফুটে তুমি শুধু,

ভালোবাসা আমার...!

তুমিই যে প্রেম আমার....!"

---- (আয়ানা জাহান নুসরাত 💕)

.

রুশো ভাইয়ার লেখনী দেখে আমি পুরাই শকড। নিশ্চয় ভাইয়াকে ভূতে ধরেছে। নাহলে এরকম লেখা কিনা ভাইয়ার দ্বারাও লেখা সম্ভব? ভাইয়া স্টোরি লেখে তবে রোমান্টিক স্টোরি না, বিশেষ করে একশন অথবা রহস্য টাইপ স্টোরি। কিন্তু ভাইয়া যে প্রেমে পড়ে এবার রোমান্টিক কবি হয়ে গিয়েছে তা আমি আজ এসে জানলাম?

উত্তেজনা এতোটাই হাই লেভেলের হয়ে গেলো, যার দরুন মুখ থেকে অটোম্যাটিকালি বেরিয়ে গেলো,

.

---- ইয়া আল্লাহ! একি দেখলাম আমি?

.

পেছন থেকে আমার কন্ঠস্বর কানে পৌঁছায় হকচকিয়ে ডায়েরি বন্ধ করে এক লাফ মেরে উল্টো দিকে ঘুরে দাড়িয়ে পড়লো রুশো ভাইয়া। আমায় দেখে চমকে উঠে ভাইয়া বললো,

.

---- ছুটকি!!!! তুই..! কখন এলি?

.

আমি নিজের বোকামির জন্য নিজেই নিজের মাথায় চাটি মেরে দিলাম। কিন্তু ধরা পড়ে যাবার পরও মিথ্যে বলাটা নিছক বোকামি বলে দাঁত কেলিয়ে বললাম,

.

---- হেহে, দেখে ফেলেছি......!

.

রুশো ভাইয়া চোখ বড়বড় করে বললো,

---- কি দেখে ফেলেছিস?

.

আমি আবারও দাঁত কেলিয়ে দিয়ে বিছানায় বসতে বসতে বলে উঠলাম,

---- আমার কাছে লুকিয়ে আর কি হবে? যা দেখার দেখে ফেলেছি আমি। এখন বলো প্রোপোজ কবে করছো আমার বেস্টুকে?

.

ভান্ডা ভালো মতোই ফুটে যাওয়ায় হতাশ হয়ে মুখ কাচুমাচু করে আমার পাশে বসে পড়লো ভাইয়া। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে করুন চোখে ভাইয়া বললো,

---- ও আমায় ভালোবাসে না রে ছুটকি!

.

আমি ভাইয়ার জবাবে বোকা বনে গেলাম। ভ্রু কুঁচকে বললাম,

---- ওমা এ আবার কেমন কথা? ভালোবাসে না তো কি হয়েছে বিয়ে হলে অবশ্যই বাসবে। তুমি বিয়ের প্রপোজাল সময় থাকতেই দিয়ে দাও ভাইয়া। নাহলে দেখবে অন্য কারো সাথে টুপ করে বিয়ে হয়ে যাবে রাত্রির।

আর কাল তো রাত্রির বার্থডে! প্রোপজ করার জন্য পার্ফেক্ট একটা ডে। আমি তো হাল্কাফুল্কা সারপ্রাইজ প্লানিং করেই রেখেছিলাম বাকিটা নাহয় তুমিই করে নাও।

.

আমার কথায় ভাইয়ার মুখে খুব কাছের কিছু হারিয়ে যাবার ভয় দেখা দিলো। ভাইয়া একরাশ ভয় নিয়ে বললো,

---- সত্যি বলছিস তুই? কিন্তু যদি আবার নাক ফাটিয়ে রিজেক্ট করে দেয়?

.

.

.

চলবে...................💕

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন