ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ১)

৬১তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥

#পার্ট-৬১♥

#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥

.

পদ্মার পাড়ে দুহাত মেলে হিমেল হাওয়া গায়ে মাখছি আমি। আমার দু হাত পেছনে ঘাসের ওপর বসে গালে হাত দিয়ে আমায় পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন নীবিড় ভাইয়া। তবে আপাতত সেদিকে কোনো ধ্যান নেই আমার। প্রকৃতির মাঝেই যেনো ডুব দিয়েছি আমি দিন দুনিয়া ভুলে।

.

রিক্সায় বসে যখন রিক্সাওয়ালা মামা শপিং মলের উল্টো দিকে রিক্সা ঘুরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই হকচকিয়ে উঠি আমি। অথচ নীবিড় ভাইয়া ছিলেন ভাবলেশহীন! যেহেতু আমাদের গন্তব্য শপিং মল সেহেতু উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ায় মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। সেই হিসেবেই আমি চটজলদি চোখ বড় বড় করে আতংকিত কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করি,

.

---- একি মামা, রিক্সা ওদিকে নিয়ে যাচ্ছেন কেনো?

.

রিক্সাওয়ালা মামা রিক্সা টানতে টানতেই জবাব দেন,

---- জে আম্মাজান, আব্বাজান তো এদিক দিয়েই নিয়ে যাবার বলছে, এদিক দিয়াই কাছে হয়!

.

রিক্সাওয়ালা মামার জবাবে ভ্রু কুঁচকালাম আমি। শপিং মল তো এদিক থেকেই আর একটু এগোলেই পাওয়া যাবে। আবার উল্টো কোন পথ দিয়ে নিয়ে যেতে বলেছেন নীবিড় ভাইয়া? প্রশ্নগুলো মাথায় ভোমরার মতো ভনভন করায় বিস্ময়ে উনার দিকে তাকাই আমি। কুঁচকে রাখা ভ্রু যুগল আগের তুলনায় আরো খানিকটা কুঁচকিয়ে জিজ্ঞেস করি,

---- কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় বলুন তো?

.

উনি ভাবলেশহীন ভাবেই গা এলিয়ে দিয়ে হাত দুটো ভাজ করে চুপটি করেই চোখ দুটো বুজে নেন। এতে যেনো আতংক আরো কমার বদলে বেড়েই চলে আমার। প্রশ্নের কোনো জবাব না আসায় চরম বিরক্ত হই আমি, অধৈর্য্য হয়ে উনার হাত ঝাঁকিয়ে অাবারও প্রশ্ন করি,

.

---- কি হলো বলুন কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?

.

উনি চোখ দুটো বুজা অবস্থাতেই কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলেন। চোখ দুটো খুলে আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে রহস্যময় কন্ঠে বলে উঠেন,

---- তোমায় কিডন্যাপ করতে নিয়ে যাচ্ছি,

এখন চুপচাপ বসে থাকো নয়তো রিক্সা থেকে ফেলে দেবো। স্টুপিড!

.

উনার ধমক খেয়ে মুখে আঙুল চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলি আমি। কি দরকার কথা বাড়ানোর? জানিই তো আমার বলা না বলায় উনি থামবেন না বরং বেশি টেরিবেরি করলে উনার ভাষ্যমতে রিক্সা থেকে আমায় ফেলে দেবেন নির্ঘাত!

.

রিক্সা এসে পদ্মার পাড়ে বেশখানিকটা দূরত্ব রেখে থামতেই অবাক চোখে নদীর পানি দেখতে লেগে পড়ি আমি। বর্ষায় নদী যেনো ভরে টুইটুম্বুর! কিনারা কিনারায় পানিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। এর আগেও গ্রীষ্মে এসেছিলাম পদ্মার পাড়ে তবে এদিকটায় না, আরোও বেশ খানিকটা দূরে নদীর ওপাড়ে।

নদীতে আজ এতো পানি দেখে মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেলেও সামান্য ভয়ও কাজ করতে লাগে আমার। সেবার ভার্সিটিতে পুলে পরে হাবুডুবু খাওয়ার কথা ভাবলেই এখনোও গায়ের কাটা শিউরে ওঠে। লোম দাঁড়িয়ে যায় ভয়ে। যেহেতু আমি সাঁতারে আস্ত একটা রসগোল্লা সেহেতু পানি দেখে ভয় পাওয়াটা নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার আমার ক্ষেত্রে।

.

উনি রিক্সার ভাড়া চুকিয়ে আমায় নামিয়ে দিয়ে নিজেও নেমে পড়েন। রিক্সাওয়ালা মামার সাথে কুশল বিনিময় করে আমার দিকে ফিরে তাকান উনি। আমায় হা করে নদীর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠেন,

---- ওভাবে হা করে দেখার কিছুই নেই, এর থেকেই বেশি পানি মেইবি তুমি তোমার পেট নয় আস্ত একটা কূয়োতে প্রতিনিয়ত ধারণ করে থাকো!

.

উনার কথায় নদীর দিক থেকে নজর সরিয়ে চোখ ছোট ছোট করে উনার দিকে তাকিয়ে বলি,

---- কি বললেন আপনি? আমার পানি খাওয়া নিয়ে কি আপনার মজা করা আজীবনেও বন্ধ হবে না?

.

উনি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে কপালে পরে থাকা চুলগুলোয় হাত চালিয়ে ঝাঁকিয়ে ছোট্ট করে বলেন "নেভার!"

.

🍂

.

বর্তমানে আকাশের অবস্থা দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এই মেঘ করছে তো এই উধাও!

সাথে বইছে মন জুড়িয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়া! এদিকটায় মানুষের আনাগোনা খুব কম দেখে বেশ ভালো লাগছে আমার। নাহলে পদ্মার পাড়ে মানুষের ভীড়ে নিজেকে একটা ক্ষুদ্র পীপিলিকা বৈ কিছুই মনে হয়না আমার। এখন নদীর পাড়ের পাশে মানুষদের চলাচলের জন্য "ওয়াক ওয়ে" নির্মাণ করা হয়েছে তাই সহজে হেটে হেটে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

.

বাতাসে নদীতে আজ আনন্দের ঢেউ! নদীতে বেশ কয়েকটা ছোট্ট ছোট্ট নৌকো চলছে। নওগাঁর ওদিকে এগুলোকে ডিঙি নৌকা বলে, এদিকটায় ঠিক কি বলে জানা নেই আমার।

আমার ভাবনার মাঝেই কাধে নীবিড় ভাইয়ার উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠলাম আমি। মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই উনি মুচকি হেসে ভ্রু নাচিয়ে বললেন,

---- কি? এখন আর শরীর খারাপ লাগছে না তো?

.

বিনিময়ে ভাবতে লাগলাম আমি। আরে আসলেই তো আমার শরীর খারাপ লাগছে না আর! বিষন্নতার ছিটেফোঁটাও নেই, ক্লান্তি ভাবটাও একদম চলে গিয়েছে।

উত্তর খুঁজে পেয়ে অসম্মতিসূচক মাথা ডানে-বামে নাড়াতেই হাসলেন উনি। হাত দুটো প্যান্টের পকেটে গুঁজে নদীতে স্থির দৃষ্টি ফেলে বলতে শুরু করলেন,

.

---- ইউ নো হোয়াট বডি এন্ড মাইন্ড রিফ্লেক্টস ইচ অদার! যদি তোমার শরীর খারাপ থাকে দেন ডেফিনেটলি তোমার মনটাও খারাপ হয়ে আসবে। কোনোকিছুতেই ভালো লাগবে না। বরং এই মন খারাপ ভাব থেকে শরীর খারাপটা আরো ক্রমশ বেড়েই চলে! তাই যদি আমার কখনো শরীর খারাপ থাকে তবে আমি কখনোই মনমরা হয়ে বসে থাকি না। সেই ক্লান্ত অবসাদগ্রস্ত শরীরটাকে ভালো রাখতে শুইয়ে রাখার বদলে এখানে চলে আসি। নদীর পানিতে পা ভিজিয়ে জোড়ে শ্বাস টানি! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনের যত আক্ষেপ, বিষন্নতা সব ছড়িয়ে দেই প্রকৃতিতে।

.

খুব মনোযোগ দিয়েই উনার কথাগুলো শুনলাম আমি তবে আমার দৃষ্টি উনার স্নিগ্ধ মুখখানাতেই স্থির! বাতাসে সিল্কি চুলগুলো ঢেউ খেলিয়ে উড়ছে উনার। সূর্যের উজ্জ্বল আভা সোজা এসে পড়ছে উনার মুখে। কি অদ্ভুৎ সৌন্দর্য! ছেলেরাও বুঝি এতো সুন্দর হয়? কিন্তু কেনো? ছেলেদের তো এতো সুন্দর হওয়া সাজে না। একেবারেই সাজে না, নয়তো মানুষ রূপি বহু শাঁকচুন্নির ভয় থাকে আমার মতো ছোট্ট ছোট্ট কলিজার অধিকারীদের।

.

উনি সম্মুখ পান থেকে নজর সরিয়ে আমার মুখ পানে ফিরে তাকালেন। আমায় নিজের দিকে এমন পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন উনি। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুঁলিয়ে নরম গলায় বললেন,

---- ওভাবে তাকিয়ো না, খুন হয়ে যাবো তো আমি!

.

উনার এমন লজ্জা ছুড়ে মারা কথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলাম আমি। নিজের হ্যাবলামির জন্য বড্ড রাগ লাগছে চোখ দুটোর ওপর! কি দরকার এভাবে হ্যাংলার মতো চেয়ে চেয়ে উনাকে দেখা! সেই লজ্জায় পড়তে হলো তো? কিন্তু কিই বা করতে পারি আমি? এতো সুন্দর জামাই থাকলে চোখ তো অটোমেটিক্যালিই শুধু "সাদা বিলাই" "সাদা বিলাই" করতে করতে ছুটে চলে উনাতেই! এতে আমার তো কোনো দোষ নেই! দোষ তো উনার! এভাবে খোলামেলা হয়ে বেড়োন কেনো উনি? মাস্ক পড়ে বুঝি আসতে পারেন না?

.

🌸

.

ছাউনি যুক্ত ছোট্ট নৌকোয় উঠে পানিতে হাত ডুবিয়ে খেলছি আমি। পাশেই নীবিড় ভাইয়া মাঝির সাথে হেসে হেসে এটা ওটা নিয়ে কথা বলছেন। নদীর স্রোতে পানিগুলো হাতের কব্জি পাড় করে উপরে উঠে ভিজিয়ে দিচ্ছে হাতটা। পানির স্পর্শে ঠান্ডা গা হিম করা অনুভূতি নাড়া দিচ্ছে পুরো শরীর জুড়ে।

খড়স্রোতা নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া নৌকোর দ্বারা সৃষ্ট পানির কলকল ধ্বনি সুমধুর ঠেকছে আমার কান দুটোয়।

.

নৌকা নদীর মাঝামাঝি চলে আসতেই কপালে দু-এক ফোটা জলের অস্তিত্ব অনুভব করলাম আমি। বিস্ময়ে আকাশ পানে তাকাতেই আরো কয়েক ফোটা জল আকাশের বুক চিরে টপটপ করে ঝড়ে আবারও চোখে-মুখে পড়লো আমার।

বৃষ্টি! এই অবেলায় সূর্যের উপস্থিতিতেই বৃষ্টি পড়ছে ব্যাপারটা অদ্ভুত! রোদ-বৃষ্টি একসাথে সচরাচর দেখা যায় না তবে দেখা গেলে মন্দ হয় না। রুশো ভাইয়া থাকলে আমায় কোলে বসিয়ে হেলেদুলে বলতো,

---- দেখ ছুটকি! রোদ হয়, বৃষ্টি হয় খেঁকশিয়ালের বিয়ে হয়।

.

আমার ভাবনার মাঝেই হাত ঝাঁকিয়ে ব্যস্তস্বরে নীবিড় ভাইয়া বলে উঠেলেন,

---- অনন্যা, বৃষ্টি পড়ছে তো। ছাউনির নিচে চলো তাড়াতাড়ি।

.

আমি উনার চিন্তিত দৃষ্টিতে পলকহীন ভাবে পরম গভীরতায় চেয়ে বললাম,

---- থাকি না অারো কিচ্ছুক্ষণ! এইটুকুনি বৃষ্টিতে ভিজলে কিচ্ছু হবে না!

.

আমার কথায় নিজের আধভেজা শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে আমার পাশে বসে পড়লেন উনি। জল জমা চুলগুলোয় হাত চালিয়ে ছোট্ট করে বললেন "বেশ তো!"

বলেই আচমকা কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের কোলে বসিয়ে নিলেন আমায়। আমি বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে কিছু বলবো তার আগেই নিজের অাঙুল আমার ঠোঁটে চেপে ধরে শীতলস্বরে "হুউউউশশশশ.....! বলে থামিয়ে দিলেন অামায়। মিষ্টি হেসে উনি বললেন,

.

---- বৃষ্টি বিলাস করি চলো!

.

আমিও স্মিথ হেসে সম্মতি জানালাম। হাত দুটো মেলে বৃষ্টিতে গা ভিজাতে লেগে পড়লাম আমি। উনি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমায় বৃষ্টি উপভোগ করতে দেখে প্রশান্তি মাখা হাসি হাসলেন। আমার ঘাড়ে নিজের থুতনি রেখে মৃদু স্বরে শীতল কন্ঠে বললেন,

---- ভালোবাসি!

.

উনার মুখে " ভালোবাসি" শব্দটা শুনে বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠলো আমার। পুরো শরীর জুড়ে শীতল শিহরণ বয়ে গেলো নিমিষেই! এই প্রথম বোধহয় মুখ ফুটে "ভালোবাসি" শব্দটা সরাসরি আমায় বললেন উনি। নিজের কর্ম দ্বারা প্রতিনিয়ত মনের মাঝের সুপ্ত অনুভুতি বুঝিয়ে দিলেও মুখ ফুটে বলেন নি এর আগে। তাই হঠাৎ এভাবে বলায় বড্ড লজ্জায় পড়লাম আমি। অস্বস্তিতে পড়ে আড়চোখে নদীর একূল-ওকূল চোখ বোলাতে লাগলাম।

এদিকে বৃষ্টি প্রায় থেমে এসেছে, বেগও ছিলো কম। দূর আকাশের সূর্যের ডুবি ডুবি ভাব।

নীবিড় ভাইয়া আমার অস্বস্তিকর অবস্থা বুঝতে পেরে মৃদু হাসলেন। ঘাড় থেকে থুতনি সরিয়ে মাঝিকে বললেন, "চাচা নৌকা কিনারায় নিয়ে গিয়ে থামাও!"

"আইচ্ছা বাবা" বলেই বৈঠা বইয়ে নদীর পাড়ের দিকে এগোতে লাগলেন মাঝি।

.

এতোক্ষণে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। পানির কলকল ধ্বনি হয়েছে ক্ষীণ! মাঝে দুজনের পিনপতন নীরবতা! শ্বাস-প্রশ্বাস আর হৃদপিন্ডের ডিবডিবে আওয়াজ দুটোই পানির ধ্বনিতে মিশ্রিত হয়ে শ্রবণের অগোচর! নীবিড় ভাইয়া আমার অস্বস্তি কাটাতে আকাশ পানে তাকালেন, হঠাৎ কিছু একটা চোখে পড়ায় উনি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন,

.

---- অনন্যা, দেখো রংধনু....!

.

রংধনুর কথা কানে আসতেই চমকে উঠলাম আমি, তড়িঘড়ি করে আকাশের পানে দৃষ্টি ফেলতেই দৃশ্যমান হলো সাতরঙা রংধনুর মনোমুগ্ধকর চিত্র!

অবাক-খুশি হয়ে উত্তেজনায় উনার হাত চেপে ধরে বলে উঠলাম,

---- ওয়াও! কতো সুন্দর রামধনু!

.

আমায় খুশি হতে দেখে হাসলেন উনি। নৌকা পাড়ে গিয়ে ভিড়তেই হাল্কা ধাক্কা অনুভূত হলো নৌকোয়। মাঝি চাচা আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,

.

---- সাবধানে নাইমো তোমরা।

.

নীবিড় ভাইয়া আমায় কোল থেকে নামিয়ে বসিয়ে দিলেন। ছাউনির ভেতরে গিয়ে মানিব্যাগ আর ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েকটা নোট বের করে চাচার দিকে এগিয়ে দিলেন উনি। ভাড়ার তুলনায় অতিরিক্ত টাকা দেখে চাচা কপাল কুঁচকালেন। নীবিড় ভাইয়া মিষ্টি হেসে বললেন,

---- ধন্যবাদ চাচা, এতো সুন্দর একটা দিন উপহার দেওয়ার জন্য! আর না করবেন না প্লিজ! নিজের ছেলে ভেবেই টাকাগুলো নিন।

.

মাঝি চাচার চোখদুটো যেনো ভরে এলো, উনি নীবিড় ভাইয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

---- সুখে থাহো! অনেক বড় হ বাবা! কিন্তু এতো টাকা তো নিবার পারুম না!

.

নীবিড় ভাইয়া আবারও হাসলেন। চাচার অগোচরে বাড়তি টাকা বিছিয়ে রাখা পাটির ওপরে রেখে দিয়ে বাকি টাকা চাচার হাতে দিয়ে "ভালো থাকবেন" বলেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন। চট করে আমায় শূণ্যে তুলে নিয়ে সাবধানে নেমে পড়লেন নৌকা থেকে। হয়তো নৌকায় উঠার সময় আমার কাঁপাকাঁপি অবস্থা দৃশ্যমান হয়েছিলো উনার তাই দ্বিতীয় বার একই রিস্ক নিতে নারাজ উনি।

.

🌹

.

বাসায় পৌঁছোতে পৌঁছোতে আধার ঘনিয়ে এলো। বৃষ্টি খুব কম সময় হবার কারণে একেবারে যে ভিজে চিপচিপে হয়ে গিয়েছি এমনটা নয়। আসার সময় হুড তোলা রিক্সায় নীবিড় ভাইয়া নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ রেখেই নিয়ে এসেছিলেন আমায়। যতটা সম্ভব আড়াল করেই রেখেছিলেন। তাই খুব একটা সমস্যা হয় নি।

তবে বাসায় এসে বাধলো বিপত্তি! তোয়ালা গায়ে জড়িয়ে দিয়ে দু-তিনটে বকা খেতে হয়েছে আম্মুর। আম্মুর আশংকা বিয়ের আগে জ্বর বাধালে জোয়ালা মুখি ফাটিয়ে দেবেন তিনি!

.

ঠোঁট উল্টে বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছি আমি। এতোক্ষণ নিত্য আপু শপিং থেকে ফিরে আমাদের বাসাতেই ছিলো। নীবিড় ভাইয়া এসে শার্ট বদলে কিচ্ছুক্ষণ থেকেই চলে গিয়েছেন আপুকে নিয়ে। তাই বড্ড একা একা লাগছে আমার। দুদিন পরই বিয়ে তাও উনাকে ছাড়া একটা মুহুর্তেও থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে আসছে খুব। মাত্র দুটো দিনো ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারছিনা আমি। অথচ উনি আমার কাছে থাকলেই আবার অস্বস্তিতে পড়তে হয় আমায়। বুঝিনা আমি এতোসব উল্টো-পাল্টা অনুভূতির মানে। যখন উনি কাছে থেকে দূরে যান তখন ইচ্ছে হয় হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলি "থেকে যান না প্লিজ!" আবার উনি থেকে গেলে অস্বস্তিতে মরি! উফফফফ এত্তো ইরিটেটিং কেনো সময়ে সময়ে পাল্টি খাওয়া ফিলিংস গুলো?

.

ভাবনার মাঝেই দরজায় টোকা পড়লো ঘরের। রুশো ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়া মাথা বের করে উঁকি মেরে শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,

---- মে উই কাম ইন?

.

ভাইয়াদের ঢং দেখে মুখ বাঁকালাম আমি। ভেংচি কেটে বললাম,

---- পারমিশন নেওয়ার কি আছে?

.

ভাইয়ারা দুষ্টু হাসি দিয়ে ঘরে ঢুকে পেছনে কিছু একটা আড়াল করে এগিয়ে এলো। রুশো ভাইয়া ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---- ব্রোকে মিস করছিস ছুটকি?

.

আমি চোখ ছোট ছোট করে আবারও ভেংচি কেটে বললাম,

---- মোটেই না।

.

অগ্নি ভাইয়া দাঁত বের করে বললো,

---- আচ্ছা ঠিক আছে বলতে হবে না। আমরাও বুঝি! এখন শুন তোর জন্য দুটো সারপ্রাইজ আছে!

.

সারপ্রাইজের নাম শুনতেই চোখ চিকচিক করে উঠলো আমার। কারণ ভাইয়াদের সারপ্রাইজ মানেই দারুণ কিছু! অগ্নি ভাইয়া আমার খুশি হতে দেখে বললো,

---- সারপ্রাইজটা দেবো বাট তার আগে আমাদের একটা কনডিশন আছে।

.

সারপ্রাইজ দেবে তাতে আবার কনডিশন! ব্যাপারটায় ভ্রু কুঁচকে এলো আমার। চিন্তিত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম,

---- কি কনডিশন?

.

রুশো ভাইয়া দাঁত কেলিয়ে বললো,

---- বেশি কিছু না ছুটকি! শুধু কাল রাতে ছাদে যাওয়া যাবে না তোদের!

.

আমি কিছু না ভেবেই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললাম,

---- আরে এ আর এমন কি? ছাদে তো রাতে যাইই না, এখন ফটাফট সারপ্রাইজ দাও!

.

আমার পজিটিভ উত্তর পেয়ে দুজনেই খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। পেছন থেকে দুটো প্যাকেট বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দুজনেই ধারাবাহিক ভাবে বলতে লাগলো,

---- এটাতে তোর ফেভারিট ব্লাক শাড়ি! (অগ্নি)

.

---- আর এটাতে তোর ফেভারিট চকলেটস! কি সারপ্রাইজ পছন্দ হলো তো? (রুশো)

.

আমি শাড়ি আর চকলেটের বক্সটায় হাত বুলিয়ে "থ্যাংক ইউ সো মাচ ভাইয়া'স" বলেই অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়ার গলা জড়িয়ে ধরলাম। রুশো ভাইয়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

---- আরে মেরে ছুটকি খুশ হো গেয়া!

.

অগ্নি ভাইয়া আমায় চকলেট খেতে খেতে সময় কাটাতে বলে দুষ্টু হাসলো। আমার নাক টেনে দিয়ে দুজনেই দরজা চাপিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে গেলো নিঃশব্দে! ভাইয়ারা যেতেই আমি শাড়ি দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। যেকোনো ব্লাক প্রসাধনীই আমার কাছে অসম্ভব প্রিয়!

.

🍁

.

অনন্যার ঘর থেকে বেড়িয়ে অগ্নি আর রুশো উল্লাসিত হয়ে হাত উঠিয়ে হাই ফাইভ করলো। দুজনেই মিটিমিটি হেসে আড় চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলো। অগ্নি রহস্যময় কন্ঠে রুশোকে বললো,

---- কাল কি হতে যাচ্ছে জানিস তো?

.

রুশো দাঁত কেলিয়ে বললো,

---- ওভিয়েসলি ব্রো!

.

বলেই দুজনেই এক সাথে গলা মিলিয়ে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

---- ব্যাচেলর পার্টি........!

.

.

.

.

চলবে....................💕

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন