#প্রেম_আমার♥
#পার্ট-৬৩♥
#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥
.
🌺
.
---- হেই ব্রোস! আর কতোক্ষণ এভাবে হাত পা উঠিয়ে কাকড়ার ঠ্যাং বগের ঠ্যাং নাচবো বলো তো ? (রুশো)
---- আরে ব্যাটা চুপচাপ নাচতে থাক নয়তো এই ভাঙা টেপ রেকর্ডার আবারও ভ্যা ভ্যা করে মরা কান্না জুড়ে দেবে। (অগ্নি)
---- লাইক সিরিয়াসলি! একজন ড্যান্সার কে দিয়ে এরকম বিশ্রী নাচ নাচানো হচ্ছে! আগে জানলে শালার পার্টি ফার্টি বোম্ব মেরে উড়িয়ে দিতাম। (নীবিড়)
---- আবে এ এতো হাইপার হোস না। বাচ্চা মানুষ তো! চুপ থাক! নয়তো আবারও সেই কান ফাটানো কান্না করলে কিন্তু বিশ্বাস কর আমি ছাদ থেইকা লাফ দিমু!
---- কি ব্রো...নাচতে নাচতে ল্যাংগুয়েজের চেঞ্জ করে ফেলছো কেনো? হুয়াই হুয়াই?
---- আবে রাখ তোর ভাষা! এদিকে জীবন যায় যায় অবস্থা.....
.
রুশোর প্রশ্নের জবাব স্বরূপ অগ্নি আরোও কিছু বলবে তার আগেই ধিক্কার জানানো হাত তালির তীক্ষ্ণ শব্দে চুপ হয়ে গেলো তিনজনই। তবে মেয়েটি থেমে নেই, এখনো ওদের কেন্দ্র করে গোল গোল ঘুরেই চলেছে সে।
.
না চাইতেই চোখ দুটো ভরে আসছে আমার। আজ এই দিনটাও দেখার বাকি ছিলো তবে? ভাইয়ারা বেগানা মেয়েকে নিয়ে রং-তামাশায় মেতেছে, এমনকি নীবিড় ভাইয়াও! যাকে নিয়ে দুঃস্বপ্নেও এমন কিছু কল্পনা করি নি শেষে কিনা তিনিই এরকম, এতোটা জঘন্য কাজ করতে পারলো? উনার কি একটুও বিবেকে বাধা দিলো না? এতো বড় একটা ধোঁকা দিতে পারলেন উনি আমায়?
পা দুটো কেমন যেনো আসার হয়ে আসছে। বল পাচ্ছি না৷ যেনো এক্ষুনি নেতিয়ে পড়বে মেঝেতে। তবে নিত্য আপু আর রাত্রি থেমে নেই। তাদের হবু জামাইদের কৃতি-কলাপ দেখে হাত তালি দিতে দিতে এগিয়ে গিয়েছে তারা ভাইয়াদের নিকটে।
.
আমাদের দেখে ভাইয়াদের মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গিয়েছে, যেনো আমরা এখানে আসবো তার বিন্দুমাত্রও সম্ভাবনা কল্পনা করে নি তারা।
---- বাহ বাহ বাহ, দারুণ তো! হোয়াট আ ব্যাচেলর পার্টি, আরে সাথে আবার whiskey, Vodka ও আছে দেখছি! গ্রেট! হ্যাটস অফ টু ইউ গাইস.....! (নিত্য)
অগ্নি নিত্যর এভাবে না জেনে রিয়াক্ট করায় চিন্তায় পড়ে গেলো। আজ নিজের গাধামোর জন্য এতো বিশ্রী অপবাদ তাকে নিত্যর থেকে পেতে হবে দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি সে। অগ্নি নিত্যকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে মাথা ডানে-বামে নাড়িয়ে "নিত্য তুমি ভুল বুঝছো...." এটুকু বলতেই হাত মেলে থাময়ে দিলো তাকে নিত্য। রাত্রি ক্ষেপে গিয়ে নিজের এটম বোম্ব রূপে কনভার্ট হয়ে সোজা নাক বরাবর ঘুষি মেরে দিলো রুশোর। রুশো তৎক্ষণাৎ নাক চেপে ধরে ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলো। রাত্রি আবারও মারতে যাবে তার আগেই রুশো কয়েক হাত দূরে গিয়ে নাক চেপে ধরে বলে উঠলো,
---- হেই এটম বোম্ব ট্রাস্ট মি, আমরা শালীকে এখানে আসতে বলিনি! শি.....
আর বলা হয়ে উঠলো না রুশোর। এবার নাকের বদলে তার পিঠে কিল বসানো শুরু করে দিলো রাত্রি।
রেগেমেগে দাঁতে দাঁত চেপে সে বললো,
---- শয়তান, ফাজিল ছ্যাড়া! এখন এক ঠ্যালায় ভাড়া করে আনা মেয়েকে শালী বানায় দিলি? তোরে ভালোবাসার এই দাম দিলি আমায়? তুই এরকম আগে জানলে তো দিদার ভাইয়াকেই বিয়ে করে নিতাম অামি। ইউ ব্লাডি বিচ!
.
বলেই একনাগাড়ে রুশোকে উত্তম-মধ্যম প্রহার করতে করতে তার অবস্থার দফারফা করে ফেলছে। রুশোর আকুতিভরা কন্ঠে তাকে থামতে বলা বাক্যগুলো কানে তুলছে না রাত্রি। এদিকে নিত্য অগ্নিকে একের পর এক কথা শুনিয়েই যাচ্ছে অগ্নি এতোবার বলছে তার কথাটা শুনতে বাট না সে তাকে কিছু বলার সুযোগই দিচ্ছে না। মাঝখান থেকে চিপায় পড়েছে নীবিড়। নারী শক্তির হাত থেকে অগ্নি-রুশোকে বাচানোর জন্য সে ছোটাছুটি করছে স্রেফ।
.
আর সামলাতে পারলাম না নিজেকে ধপ করে হাটুতে ভর করে বসে পড়লাম আমি। সবকিছু কেমন যেনো ঘোলাটে লাগছে আমার। চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করে দিয়েছি আমি। আমায় এভাবে গা ছেড়ে দিতে দেখে দৌড়ে এলেন নীবিড় ভাইয়া, আমায় নিজের বুকে টেনে নিয়ে গাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলতে লাগলেন,
---- হেই অনন্যা, গেট আপ! কি হয়েছে তোমার?
শিট.....! নিত্য.....অগ্নি....পানি নিয়ে আয় ফাস্ট! (চেঁচিয়ে)
.
উনার শেষের কথা গুলো আর কানে পৌঁছালো না আমার। অন্ধকার হয়ে এলো সবকিছু, চোখ দুটো বন্ধ করে নিয়ে নিস্তেজ শরীরটা নেতিয়ে পড়লো উনার বুকেই।
নীবিড়ের ডাকে নিত্য থেমে গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই ঘোমটার আড়ালে থাকা মেয়েটা প্রকান্ড চিৎকারে উচ্চস্বরে কান্না করতে শুরু করে দিলো। মেয়েটির কান্নায় রাত্রি রুশোকে মারতে মারতে হুট করে থেমে গিয়ে অস্ফুট কন্ঠে আনমনেই বলে উঠলো,
---- রিমি....!
.
🍂
.
জ্ঞান ফিরে পেয়ে আধো আধো করে চোখ দুটো খুলতেই আবারও মাথায় সেই তীক্ষ্ণ চিনচিনে ব্যথাটা অনুভব হলো আমার। কপালে ভাঁজ ফেলে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিতেই বুঝলাম আমি আমার ঘরেই শুয়ে রয়েছি। আমার পাশেই ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ দুটো বন্ধ অবস্থায় এক হাতে কপালে স্লাইড করছেন নীবিড় ভাইয়া। আমার বা পাশে নিত্য আপু আর অগ্নি ভাইয়া চিন্তিত ভাব নিয়ে বসে আছে।
রুশো ভাইয়া চেয়ার টেনে বিছানার পাশে বসে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার মুখখানায়, তার পাশেই অপরাধীর দৃষ্টিতে ছলছল চোখে মাথা নিচু করে রয়েছে রাত্রি।
আমায় জ্ঞান ফিরে পেতে দেখেই সবার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। রুশো ভাইয়া আমার হাতটা নিজের মুঠোয় ধরে মৃদু হেসে বলে উঠলো,
---- ছুটকি!
"ছুটকি" ডাকটা কানে পৌঁছোতেই কপাল থেকে হাত নামিয়ে চটজলদি আমার মুখপানে হেলে পড়লেন নীবিড় ভাইয়ার। আমায় উঠিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে জোড়ে জোড়ে বার কয়েক শ্বাস নিয়ে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে কাঁপাকাঁপা গলায় উনি বলে উঠলেন,
---- তু...তুমি ঠিক আছো অনন্যা? জানো কতোটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি? এতোটা উইক কেনো তুমি বলতে পারো? একটুতেই সেন্সলেস হয়ে যাও কি করে?
আমি উনার কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিলাম না। একটা সময় উনার এই বুকের মাঝেই সব থেকে বেশি প্রশান্তি খুঁজে পেলেও আজ আমি অনুভূতি শুণ্য! বারবার সেই ছবিটাই ভেসে উঠছে আমার দুচোখের সামনে।
উনার থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিতে লাগলাম উনাকে। উনার হাতের বাঁধন আলগা হতেই মুখ ফিরিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে গেলাম আমি। মৃদুস্বরে চোখ দুটো বুজে নিয়ে ভারী গলায় বলে উঠলাম,
---- প্লিজ আপনি যান এখান থেকে। আমায় একা থাকতে দিন! আপনার ঐ পার্টির মেয়েটার কাছে গিয়ে মজ-মাস্তি করুন। কিচ্ছু বলবো না আপনাকে অামি।
আমার কথায় নিমিষেই সবার মুখভার হয়ে এলো, নিত্য আপু আর রাত্রি আমায় কিছু বোঝাতে মুখ খুলবে তার আগেই ওদের থামিয়ে দিয়ে আমার দুবাহু চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন নীবিড় ভাইয়া। চোখদুটো যেনো রক্তবর্ণ ধারণ করেছে উনার। তার থেকে নিসৃত হচ্ছে রক্তিম আভা। উনার চোখের দৃষ্টি স্থির। যেনো কতশত অভিযোগ লুকায়িত রয়েছে সেই দৃষ্টিতে। সেই চোখে তাকানোর ইচ্ছে বা সাহস কোনোটাই এই মুহুর্তে কাজ করছে না আমার। উনার চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিতেই আরোও শক্ত করে চেপে ধরলেন উনি আমায়। দৃঢ় কন্ঠে উনি বলে উঠলেন,
---- কি বললে তুমি? আমি কোনো মেয়ের সাথে মজ-মাস্তি করেছি? হ্যা? ইউ স্টুপিড! কোনো কিছু না জেনে শুনে জাজ করো কিভাবে তুমি? এই বিশ্বাস তোমার আমার ওপর? কি মনে হয় আমাকে, আমি ক্যারেক্টর লেস?
.
উনি যে খুব ভালো মতোই ক্ষেপে গিয়েছেন এটা স্পষ্ট কিন্তু উনি ক্ষেপছেন কোন হিসেবে? সব সময় বুঝি রাগ দেখিয়ে আমায় চুপ করিয়ে রাখবেন? এমন কি যেখানে অন্যায় উনি করেছেন সেখানেও? কিন্তু না, আমি এই অন্যায় মুখ বুজে সইবো না। অন্যায় যে করে এবং অন্যায় যে সহ্য করে দুজনেই সমান অপরাধী!
এই প্রবাদটাকেই ধার্য করে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আমি। তা দেখে রুশো ভাইয়া আমায় কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই আমায় ধাক্কা মেরে বিছানায় ফেলে দিয়ে বড়বড় পায়ে হাটা ধরলেন উনি ছাদের উদ্দেশ্যে। হৃদয় টা মোচড় দিয়ে উঠলেও মুখ ফুটে একটা টু শব্দও করলাম না আমি। স্টাচুর মতো বসেই রইলাম স্রেফ।
.
---- এটা কি করলি তুই অনু? সবটা না জেনেই ছেলেটাকে হার্ট করলি?
.
অগ্নি ভাইয়ার কথায় ভ্রু কুঁচকে এলো আমার। এমনটা তো নয় যে ভাইয়াও অপরাধ করে নি। নীবিড় ভাইয়ার মতো সেও একই অপরাধের অপরাধী। সেই হিসেবে ভাইয়ার দিক থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিলাম আমি। রাত্রি রুশো ভাইয়ার পাশ থেকে আমার কাছে এসে দু বাহু ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো,
---- অনন্যা...! তুই আসলেই একটা স্টুপিড। আমরা নাহয় ভুল ভেবে নিয়েছিলাম বাট আমাদের একসাথে দেখেও কি তোর মনে হলো না যে মামলাটা সেটা নয়?
রাত্রির কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি কিছুই বলতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকয়েই রইলাম স্রেফ। রাত্রি আবারও একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলো,
---- ওটা অন্য কোনো মেয়ে ছিলো না অনন্যা। ওটা রিমি ছিলো। ভুল করে Vodka খেয়ে নয়ে মাতাল হয়ে পড়েছিলো। আর রুশোদের ঘিরে নাচ করছিলো। রশোরা ওকে থামাতে অনেক চেষ্টা করেছে বাট কোনো কাজ হয়নি বরং ও তিনজনকেই নাচিয়ে ছেড়েছে। না নাচলে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে।
রাত্রির কথার মাঝেই রুশো ভাইয়া মুখ ফুলিয়ে বললো,
---- এন্ড দ্যটস হোয়ায়, আমরা ওকে থামিয়ে রাখার জন্য হাত পা উঠিয়ে ওরকম কাকড়ার ঠ্যাং বকের ঠ্যাং নাচছিলাম। আর ওসব whiskey, vodka আমরা আনাই নি। ডেলিভারিতে রেস্টুরেন্ট থেকেই গন্ডগোল হয়েছিলো। কোল্ড ড্রিংকস এর বদলে ওসব ভুল করে দিয়ে দেওয়ায় ব্রো বাইরে গিয়েছিলো কোক আনতে।
একটু থেমে ভাইয়া মুখ কালো করে আবারও বলা শুরু করলো,
---- আর তোরা তো না বুঝেই.....ইনফ্যান্ট এতো মার আমাকে আব্বুও মারে নি ছোটতে যতটা না এটম বোম্ব আজ মেরেছে। আই ওয়াস ট্রাইং টু সে দ্যট শি ইজ মাই সিসটার ইন ল! বাট এটম বোম্ব ভেবেছে আমি বাজে ভাবে মেয়েটাকে "শালী" বলেছি!
কথাগুলো বলেই রাত্রির দিকে অভিমানে ভরা নজরে এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো রুশো ভাইয়া। অগ্নি ভাইয়া নিত্য আপুর দিকে একবার তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
---- তোদের আমাদের ওপর বিশ্বাস দেখে আমি জাস্ট মুগ্ধ রে অনু। কি করে ভাবলি তোরা আমরা এরকম লো মাইন্ডেড কাজ করবো? এই চিনলি তোরা আমাদের? জানিস তুই সেন্সলেস হয়ে যাবার পর নীবিড় কি পরিমাণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলো? বারবার একটা কথাই বলছিলো "আজ যদি এই পার্টি না করতাম তবে আমার অনন্যা অসুস্থ হয়ে পড়তো না!"
পুরো পাগলদের মতো বিহেব করছিলো ছেলেটা। আমরা অনেক কষ্টে ওকে বুঝাই যে তুই জাস্ট সেন্সলেস হয়েছিস নাথিং এলস। মুখে পানি ছিটা দিলেই জ্ঞান ফিরবে। কিন্তু না নীবিড় মানতেই চায়নি। ওর ধারণা এতোকিছুর জন্য জাস্ট ও ই দায়ী। একবার ভাব কতোটা ভালোবাসে ও তোকে। তুই ওর মনে কতোটা আঘাত দিয়েছিস ভাবতে পারছিস?
নিত্য আপু বুঝলো ভাইয়া কথাগুলো শুধু আমাকেই নয় আপুকেও মিন করে বলেছে। যার দরুন আগের থেকেও মুখটা ছোট হয়ে এলো আপুর। টলমলে চোখে আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আপু বললো,
---- আমাদের দেখায় ভুল ছিলো অনন্যা। সবসময় আমরা যা চোখে দেখি তাই সত্যি হয়না। আবার দূর থেকে না দেখেও অনেক কিছুই বিশ্বাস করে নেওয়া যায় যা কিনা সত্য। আসলে আমিও বুঝতে পারছি তোমার মনের পরিস্থিতি। আকস্মিক এমন একটা ঘটনা চোখে দেখে আমরা কেউই নিজেদেরর সেন্সে ছিলাম না। নিজের সব থেকে কাছের মানুষকে এরকম জঘন্য কাজ করতে দেখলে কারোরই মাথা ঠিক থাকে না এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদেরও ভুল রয়েছে যথেষ্ট। আমরা কেউই ভাইয়াদের এক্সপ্লেইন করার সুযোগ দেইনি।
দেড়ি করো না অনন্যা! ভাইয়ার রাগ সম্মন্ধে তোমার ধারণা থাকার কথা, কিন্তু এটা রাগ নয় যে তা ঠান্ডা করতে পারবে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে। ভাইয়া অভিমান করেছে অনন্যা! ভাইয়ার কাছে যাও ভাইয়াকে বোঝাও। গো ফাস্ট.............
.
আমি আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালাম না। এতোক্ষণ ধরে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলগুলো মুছতে মুছতে ছুট লাগালাম ছাদের উদ্দেশ্যে। নিজের ওপর অাজ বড্ড ঘৃণা হচ্ছে আমার। কিভাবে ভাবতে পারলাম আমি উনাকে এরকম? ভুল হয়ে গিয়েছে আমার। বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে। নিজের গালে নিজেকেই থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করছে। ছিঃ সেম অন ইউ আনানয়্যা....!
.
🌹
.
ছাদে পা রাখতেই আৎকে উঠলাম আমি। টেবিলে রাখা রকমারি খাবার, প্যান্ডেল, মরিচ বাতি সবকিছু বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। টেবিলটাও আগের মতো নেই ভেঙে উল্টে পড়ে রয়েছে সেও। নিঃসন্দেহে এসব নীবিড় ভাইয়ারই কাজ। উনি ব্যতীত কেউই এসব ভাংচুর করবে না এ বাড়িতে।
ছাদের রেলিং ধরে দৃষ্টি দূর আকাশে ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন নীবিড় ভাইয়া। উনাকে দেখে ভয়টা আরোও শতভাগ বেড়ে গেলো আমার। উনার কাছে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? রাগের মাথায় ছাদ থেকে ফেলে দেবেন না তো উনি? না না ফেলে দেবেন না। কারণ উনি তো রাগ করেই নেই, উনি তো করেছেন অভিমান। উফফফ বাঁচা গেলো। কিন্তু উনার অভিমান আবার কি রকম? আমার মতোই কি অভিমান করলে চুপ করে থাকেন উনি? নাকি দু-চারটে থাপ্পড় বসিয়ে ক্ষান্ত হবেন উনি? এতো মহা চিন্তার বিষয়! বিয়ের দিন কণের গালে পাঁচ আঙুলের দাগ দেখলে লোকে কি বলবে? আবার উনার কাছে না গেলেও তো নয়। হয়তো পরিশেষে দেখা যাবে বিয়েটাই ভেঙে ফেলেছেন উনি? না না আমি বিয়ের আগেই ডিভোর্সি হতে পারবোনা। বিয়ে করতে হলে ভয়কে জয় করতেই হবে আমায়।
এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই পা টিপেটিপেটিপে এক পা দুপা করে এগোতে লাগলাম আমি। দোয়া-দরুদ পড়ে বুফে ফু মেরে নিয়ে আল্লাহ কে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে চললাম নিঃশব্দে। তবে ভাগ্য আমার, ধোঁকা তো দেবেই! তিন কদম এগোতেই আগের মতো আকাশ পানে চেয়ে থেকেই উনি কড়া গলায় বলে উঠলেন,
---- ভালোয় ভালোয় এখান থেকে চলে যাও অনন্যা! আমার কাছে এসো না।
উনার গম্ভীর গলায় শান্ত নিষেধাজ্ঞায় হৃদপিন্ড বার কয়েক কেঁপে উঠলো আমার। ঠোঁট কামড়ে ধরে আগাবো নাকি পেছাবো ভাবতে ভাবতেই আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলাম আমি। আজ এখান থেকে ভীতুর মতো লেজ গুটিয়ে পালানো মানে তীরে এসে তরী ডুবে, যাওয়া! মনে মনে খানিক সাহস সঞ্চার করে আবারও এগিয়ে গেলাম আমি।
আমায় পেছানোর বদলে এগিয়ে যেতে অনুভব করে কপালে ভাজ ফেলে ধমকে উঠবেন তার আগেই আমি উনার বুকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। উনাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অস্ফুট স্বরে ভয়ে ভয়ে বলে উঠলাম,
---- কে...কেঁচো! ও.... ওখানে কেঁচো আছে। প্লিজ বাঁচান আমায়......
আমার কথায় যেনো সাত আসমান থেকে ধুপ করে মুখ থুবড়ে পড়লেন উনি। ভ্রু কুঁচকে ফ্লোরের দিকে তাকাতেই কপালের ভাজটা আগের থেকেও দৃঢ় হয়ে এলো উনার। কিছুক্ষণ সেদিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ কেঁপে উঠতে লাগলেন উনি। উনার শরীরে কম্পন সৃষ্টি হওয়ায় অবাক হলাম আমি। ভয়ের নানি-দাদি ফেলে উনার বুক থেকে মুখ তুলে তাকালাম আমি।
উনি হাসছেন! রাতের অন্ধকারে মরিচ বাতির আধো আধো আলোয় উজ্জ্বল উনার হাস্যজ্বল মুখখানা সোজা এসে বিধলো আমার বুকের বা পাশটায়। উনার মন খোলা হাসির ঝংকার কানে সুমধুর স্রোত হিসেবে বইতে শুরু করলো আমার। উনার স্নিগ্ধ হাসি দেখে অজান্তেই মুখে মুগ্ধতার হাসি ফুটে উঠলো আমারও। উনি হাসতে হাসতে " ওহ মাই গড, চাওমিন কে শেষমেশ কেঁচোর উপাধি দেওয়া হলো!" বলেই আবারও হাসতে লাগলেন উনি। পরম আবেশে আমায় নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে কপালে নিজের নরম ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করিয়ে হাল্কা স্বরে বলে উঠলেন,
----- "পাগলি একটা!"
.
.
.
.
চলবে.................💕