ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ১)

৬৪তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥

#পার্ট-৬৪♥

#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥

.

🌺

.

ঘড়ির এলার্মের সেই বিরক্তিকর তীক্ষ্ণ আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো আমার। দু হাতে দু কান চেপে ধরে চোখ পিটপিট করে মেলে তাকাতেই অগ্নি ভাইয়াকে আমার কানের কাছে এলার্ম ক্লোক ধরে থাকতে দেখে হকচকিয়ে উঠলাম আমি। এটা নিঃসন্দেহে ভাইয়ার রূপধারী জ্বিন ছাড়া আর কিছুই নয়। নাহলে এতো সকালে অগ্নি ভাইয়া ঘুম থেকে উঠে আমার ঘরে আসবে এ নিতান্তই স্বপ্ন মাত্র। বাস্তবে এর কোনোই অস্তিত্ব ছিলো না যে মিরাকল স্বরূপ আজ থাকবে।

চোখের সামনে জলজ্যান্ত জ্বিন দেখে যে কেউই ভয়ে আঁতকে উঠবে, আবার কেউ কেউ ফিট ও লাগতে পারে। আমিও ব্যতিক্রম নই। মানুষ হিসেবে জ্বিন সামনে আসায় ভয় পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক আমার ক্ষেত্রেও। যার দরুন এক প্রকাণ্ড বাড়ি কাঁপানো চিৎকার করে বিছানা থেকে ধপাস করে ফ্লোরে আছড়ে পড়লাম আমি। আমায় এভাবে ভয় পেয়ে পরে যেতে দেখে ভাইয়া রূপী জ্বিনটা যেনো পৈশাচিক আনন্দ পেলো। ঘর কাপিয়ে হু হা করে ভয়ংকর হাসির ঝংকার তুলে দিলো সে। আমি এদিক ওদিক ভয়ার্ত চোখে তাকে প্রহার করার কিছু একটা অস্ত্র না হোক ছোট একটা বস্ত হলেও খুঁজছি। আদৌ জানি না জ্বিনদের পেটালে তারা ব্যাথা পায় নাকি কিন্তু এর থেকে ভালো উপায় আর চোখে পড়ছে না আমার। আশেপাশে চোখ বোলাতেই আমার টেডিবিয়ার টা দেখতে পেয়ে ঠোঁট উল্টালাম আমি। মনে মনে তাকে বার কয়েক সরি বলে নিয়ে ভাইয়া রূপী জ্বিনের দিকে নিক্ষেপ করতেই ভ্রু কুঁচকালো জ্বিনটি। আমায় ভেঙিয়ে সে বলে উঠলো,

---- ঘুম থেকে উঠেই মারামারি করার শখ জাগছে ভালো কথা, তাই বলে তোর এই ০.০০০১ গ্রাম টেডিবিয়ার দিয়ে মারতে চাইছিস কোন আক্কেলে? লাইক সিরিয়াসলি!

বলেই আবারও হু হা করতে হাসতে শুরু করে দিলো সে। জ্বিনকে হুবুহু ভাইয়ার মতো কথা বলতে দেখে বড্ড অবাক হলাম আমি। কাঁপাকাঁপা হাতে ভাইয়া রূপী জ্বিনের পায়ে একটা চিমটি বসিয়ে দিতেই "আউউউউউ.....!" বলেই চেঁচিয়ে উঠলো সে। পা চেপে ধরেই সে বিছানায় বসে পড়ে বলে উঠলো,

---- ওই শাঁকচুন্নি! এগুলো তোর নখ নাকি কোদাল? সালাম করবি ভালো কথা তাই বলে চিমটি?

এবার আমি আগের থেকেও বেশি অবাক হয়ে পড়লাম। এটা যদি জ্বিন হতো তাও এতোটা অবাক হতাম না কিন্তু এতো আমার ঘুম কাতুরে ভাইয়া! যাকে কিনা ১০ টার আগে ঘুম থেকে পিটিয়েও উঠানো যায় না। সে আজ এতো সকাল সকাল উঠলো কি করে? এবার নিজেই নিজের হাতে চিমটি বসিয়ে দিলাম, উদ্দেশ্য ঘুমের মধ্যেই ঘুম থেকে উঠার স্বপ্ন দেখছি কিনা তা শিওর হওয়া। কিন্তু না ব্যাথা অনুভব হলো তার মানে এটা কোনো স্বপ্ন নয়! এটা সত্য, বাস্তব। এতে কোনো সন্দেহ নেই আর আমার।

ভাইয়া আমায় নিজের হাত নিজেকেই চিমটি কাটতে দেখে কপালে ভাজ ফেললো। হাতে থাকা এলার্ম ক্লকটা বেড টেবিলে রেখে দিয়ে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---- এইরে কাল পুরো তিন গ্লাস দুধ খেয়ে কি পাগল টাগল হলি নাকি? তাহলে তো বেশ চিন্তার বিষয়!

আমি ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ভাইয়ার পাশে বসে পড়ে বোকা বোকা চাহনিতে জিজ্ঞেস করলাম,

---- আরে আমার কথা ছাড়! তুই এতো সকালে উঠলি কিভাবে? আমি তো তোকে জ্বিন ভেবে ফেলেছিলাম চকলেটের কসম।

আমার কথায় হতভম্ব হয়ে গেলো ভাইয়া। চোখ দুটো বড়বড় করে ফেলে টেবিল থেকে ঘড়িটা নিয়ে আমার সামনে ধরতেই আঁতকে উঠলাম আমি। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে জুড়ে দিয়ে ভাইয়ার কানে পর্দা ফাটিয়ে বসলাম অবশেষে।

----- নেহিইইইইইইইইইইইইইই.............!

আমার চিৎকারে ভাইয়া দু কানে দু হাত দিয়ে চেপে ধরে উঠি দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

---- ওই আমার কান কি এতোই সস্তা যে কাল নিত্য ফাটিয়ে ছাড়লো আর আজ তুই! বিয়ের আগেই কি ঠসা বাবা বানিয়ে ফেলতে চাইছিস নাকি?

আমি চটজলদি দাঁড়িয়ে পড়ে কাঁদো কাঁদো ফেইস বানিয়ে বলে উঠলাম,

---- বেলা ১১ টা বাজতে আর মাত্র ৬ মিনিট! আমি এতোক্ষণ ঘুমোলাম কি করে?

অগ্নি ভাইয়া চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠলো,

---- হ্যা তুমি সারারাত জেগে থাকবা আর ঘুম বাবাজি তোমায় টাটা বায় বলে চলে যাবে নাকি?

ডাফার! যা জলদি ফ্রেশ হয়ে নে, গায়ে হলুদের দিন বাড়ি ভর্তি মেহমান আর কণে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে!

বলেই বড়বড় পায়ে শার্টের হাত গুটাতে গুটাতে চলে গেলো অগ্নি ভাইয়া। আমি কিছুক্ষণ থম মেরে থেকেই স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে গতকাল রাতের বিভৎস দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

.

🍂

.

গতকাল...........

---- আপনি কি তাহলে আইসক্রিমের মতো গলে গিয়েছেন? আর রাগ বা অভিমান করে নেই তো আপনি?

আমার কথায় ভ্রু কুঁচকে এলো নীবিড় ভাইয়ার। আমায় নিজের থেকে ছাড়িয়ে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন উনি। প্যান্টের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে স্ট্রেইট হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের সিল্কি চুকগুলো ঝাঁকিয়ে উনি বলে উঠলেন,

---- আ আ আ! এতো সহজে নীবিড় তোমার ওই আইসক্রিমের মতো গলে না সোনা। ভুল যখন করেইছো তার শাস্তি তো পেতেই হবে।

শাস্তির কথা শুনেই ঠোঁট উল্টালাম আমি। হাজার হোক ভুল যে করেছি এটা যেমন সত্য তেমনই ভুলের জন্য শাস্তি পাওয়াটাও কাম্য। তাতে যদি উনি খুশি হন তাহলে যত বড় শাস্তিই দিক না কেনো আমি মাথা পেতে নেবো। সেই ভেবেই একটা শুকনো ঢোক গিললাম আমি। বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে খানিক সাহস সঞ্চার করে নিয়ে মিনমিন করে বললাম,

---- আপনি আমায় যেই শাস্তিই দিবেন আমি তাই মাথা পেতে নেবো। আফটার অল দোষ টা আমার। আমিই আপনাকে ভুল বুঝে, অবিশ্বাস করেছি। শাস্তিটা আমার প্রাপ্য!

আমার জবাবটা বোধহয় বেশ পছন্দ হলো উনার। উনি বাঁকা হেসে আমার কাছে এগিয়ে এসে সামান্য ঝুঁকে পড়লেন। ঠোঁটের কোণে ঘায়েল করা সেই রহস্যময় হাসি হেসে বলে উঠলেন,

---- দ্যটস লাইক আ গুড গার্ল। নাও ফলো মি।

.

বেডরুমের বিছানায় গুটিশুটি মেরে কান্না কান্না ফেইস বানিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে নিক্ষেপ করে বসে রয়েছি সামনে থাকা একটা নয় দুটো নয় পুরো তিন তিনটে দুধের গ্লাসে ওপর। কিন্তু নির্দয় সাদা বিলাইয়ের এক ফোটাও দয়া হলো না আমার ওপর। সামান্য একটু ভুল বুঝার জন্য এমন ভয়ানক শাস্তি দেবেন কল্পনাও করিনি আমি। আগে যদি জানতাম তো না উনাদের ব্যাচেলর পার্টিতে উঁকি ঝুঁকি মারতাম আর না নৃত্যরত রিমিকে পচা মেয়ে ভাবতাম আর না উনাকে ভুল বুঝে এতো বড় পাপ করতাম।

দুধ না খাওয়ার কোনো পথই খোলা রাখেন নি উনি। আমি হয়তো শাস্তি ভোগ করবো বলার পরও দুধ দেখে টেরিবেরি করবো বুঝতে পেরে আগে থেকেই লবণের বয়াম আনিয়ে রেখেছেন উনি। এখন না পারছি গিলতে আর না পারছে দিন দুনিয়া ভুলে যেদিকে চোখ যায় সেদিকে ছুটে যেতে।

নীবিড় ভাইয়া আমার এরকম করুন দশা দেখে বাম সাইডের ভ্রু উঁচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে উনি বলে উঠলেন,

---- বুঝেছি পারবেনা তুমি। ওকে দেন আল্লাহ হাফেজ!

বলেই উল্টো দিকে ফিরে হাটা ধরতে নিলেই দৌড়ে গিয়ে উনার পথ আটকে দাড়ালাম আমি। ভয়ার্ত চোখে একবার দুধের গ্লাস গুলোর দিয়ে চেয়ে অসহায় কন্ঠে বললাম,

---- না...আপনি যাবেন না প্লিজ। আমি একটু সময় নিয়েছি তার মানে তো এই না যে খাবো না।

জাস্ট ২ মিনিটেই শেষ করে আপনাকে দেখিয়ে দিচ্ছি ওয়েট।

বলেই বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে বড়বড় পায়ে এগিয়ে গেলাম টেবিলের নিকটে। নিঃশ্বাস বন্ধ করবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে চোখ খিঁচে নাক চেপে ধরে ঢকঢক করে একের পর এক গ্লাস খালি করতে শুরু করলাম আমি। দুনিয়া উল্টে যাক আমার পেট ফুটবল হয়ে যাক তাও আজ এই অসাধ্য সাধন করতে হবেই আমায়, এই ভেবেই টানা তিন গ্লাস দুধ নাক চেপে সাবার করার পর অবশেষে ক্ষান্ত হলাম আমি।

আমায় এরকম সুপার ফাস্ট স্পিডে একের পর এক গ্লাস খালি করা দেখে বিস্ময়ে চোখ বড়বড় করে ফেললেন নীবিড় ভাইয়া। এতোক্ষণ ধরে বহু কষ্টে চাপিয়ে রাখা হাসির ফোয়ারা ব্লাস্ট করে ঘর কাপিয়ে হু হা করে হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খাওয়া শুরু করে দিলেন উনি।

উনার হাসি দেখে মুখ ফুলিয়ে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খেয়ে নিয়ে দুধের স্বাদ দূর করবার চেষ্টা চালালাম আমি। পেটের অবশিষ্ট বিন্দুমাত্র জায়গাও আর ফাঁকা রইলো না। না জানি আজ রাতে ঘুমোতে পারবো কিনা! নাকি বাথরুমকেই বেডরুম বানাতে হবে সন্দেহ!

বেশ কিছুসময় বিছানায় গড়াগড়ি খাবার পর ক্লান্ত হয়ে উঠে বসলেন নীবিড় ভাইয়া। এদিকে এতোগুলা তরল পদার্থ নিজের ছোট্ট পেট টা তে ধারণ করার ফলে আমার নাজেহাল অবস্থা! উনাকে উঠে বসতে দেখে চোখ ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম আমি। পেট চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলাম,

---- খুব হাসি পাচ্ছে আপনার তাইনা? নিজেই আমায় বিপাকে ফেলে নিজেই মজা নিচ্ছেন! আপনার মনে হয় না এটা নির্যাতন? এতো রীতিমতো বাচ্চা নির্যাতন!

আমার কথায় আমারও ঠোঁট চেপে ধরে ফিক করে হেসে উঠলেন উনি। আমার ফুলিয়ে রাখা গাল দুটো নিজের ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে চুপসে দিয়ে দুষ্টু হেসে বললেন,

---- ইউ নো হোয়াট, তোমায় একদম প্রেগন্যান্ট মহিলাদের মতো লাগছে।

বলেই বিছানা থেকে উঠে দৌড় মারলেন উনি। আমি রেগেমেগে চেঁচাবো সেই সুযোগ টা পর্যন্ত দিলো না ফাজিল পোলা। মনে মনে উনাকে হাজারটা গালি গালাজ করতে করতে নিজের ফুলে উঠা পেট টার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম আমি। বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে হতাশ হয়ে ওভাবেই শুয়ে পড়লাম অবশেষে। আজ সারারাত যে ঘুম বাবাজির নানু দাদুও আমায় কাবু করতে পারবে না তা বেশ বুঝতে পারছি আমি।

.

🌹

.

হঠাৎ রুশো ভাইয়ার ডাক পরায় ভাবনা জগৎ থেকে বর্তমানে ফিরলাম আমি। ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে আবারও আমায় ডেকে বলে উঠলো,

---- কিরে ছুটকি, কোন ভাবনায় ডুব দিয়েছিস? এখনোও ফ্রেশ হোস নি কেনো?

ভাইয়ার ডাকে হকচকিয়ে উঠে চোখ তুলে তাকাতেই থমকে গেলাম আম। হলুদ! রুশো ভাইয়া ইয়েলো এন্ড হোয়াইটের কম্বিনেশনে পাঞ্জাবি পড়েছে। এই কালারটা দেখলেই কেনো যেনো মেজাজ টাই বিগড়ে যায় কিন্তু রুশো ভাইয়া হলুদে দারুণ মানিয়েছে। আমি ভাইয়ার পা-মাথা অবদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে অবাক হয়ে আনমনেই বলে উঠলাম,

---- ওয়াও ভাইয়া! ফাটাফাটি লাগছে তোমায়!

কমপ্লিমেন্ট পেয়ে যেনো হাওয়ায় উড়ে গেলো রুশো ভাইয়া । নিজের ব্রাউন চুলগুলোর মাঝে হাত চালিয়ে ভাইয়া বললো,

---- আরে এটা আজ নতুন কি? আমায় তো অলওয়েজ ঝাক্কাস ই লাগে।

আচ্ছা শুন না তোকে একটা ছোট্ট কাজ করতে হবে, তার বদলে পুরো শপের চকলেটস এনে দেবো তোকে প্রমিজ।

চকলেটের নাম শুনেই চোখ চিকচিক করে উঠলো আমার। খুশিতে গদগদ হয়ে নরম গলায় বললাম,

---- আরে তুমি বলেই তো দেখো, তোমার ছুটকি চুটকি বাজিয়ে চোখের পলকে সব কাজ করে দেবে।

আমার জবাবে মিষ্টি হাসলো রুশো ভাইয়া। আমার গাল দুটো টেনে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,

---- আমি জাস্ট আধা ঘন্টার জন্য বাহিরে যাবো, কেউ আমায় খুঁজলে তুই প্লিজ কিছু একটা বলে চালিয়ে দিস। কেউ যাতে বুঝতে না পারে আমি বাইরে গিয়েছি। ওকে?

গালে হাত দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে খানিক ভেবে ছোট্ট করে জবাব দিলাম,

---- ওকে ডান!

.

ফ্রেশ হয়ে একরাশ অলসতার বশিভূত হয়ে হেলেদুলে ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই চমকে উঠলাম আমি। অগ্নি ভাইয়াও রুশো ভাইয়ার মতো ইয়েলো কালার পাঞ্জাবি আর হোয়াইট পায়জামা পরে ওয়াশরুমের দরজার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক চোখ বোলাচ্ছে। যেনো এতোক্ষণ আমার বেড়োনোরই অপেক্ষায় ছিলো ভাইয়া। কিন্তু নিজের ঘরের ওয়াশরুম ছেড়ে আমার ঘরের ওয়াশরুমে আসার কোনো মানে খুঁজে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকালাম আমি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আমি প্রশ্ন ছুড়লাম,

---- কিরে নিজের ওয়াশরুমে কি তালা লাগিয়েছিস যে আমার ঘরে এসেছিস?

অগ্নি ভাইয়া তৎক্ষণাৎ আমার হাত ধরে ওয়াশরুম থেকে বের করিয়ে এনে খাটে বসিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

---- আরে তোর ওয়াশরুমে ঢুকতে যাবো কোন দুঃখে? আমি তো তোর বেড়োনোর অপেক্ষা করছিলাম। আচ্ছা শুন আমি একটু বেড়োচ্ছি, প্লিজ আম্মু আন্টি, এদের ম্যানেজ করে নিস।

ভাইয়ার কথায় টাস্কি খেলাম আমি। একটু আগে রুশো ভাইয়া যেই আবদার নিয়ে এসেছিলো অগ্নি ভাইয়াও সেই একই আবদার করছে দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। কিন্তু কিছু পেতে হলে যে কিছু দিতে হয় এই সিস্টেম টা যে এই কিপ্টুস ভাইয়ের মধ্যে কবে সেট হবে আল্লাহ মালুম।

তাই বিনিময়ে মুখ বাঁকালাম আমি। মুখভার করে বলে উঠলাম,

---- কিছু না দিয়েই কাজ করিয়ে নিতে চাস লজ্জা করে না?

আমার কথার বিপরীতে অগ্নি ভাইয়া আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। আমি ভ্রু নাচাতেই মুখে জোড়পূর্বক হাসি ফুটিয়ে ভাইয়া বললো,

---- আচ্ছা যা ম্যাগনাম আইসক্রিম খিলাবো! আব তো মান যা মেরি মা।

বিনিময়ে মিষ্টি হাসলাম আমি। দুষ্টু হাসি দিয়ে বললাম,

---- যা, জলদি আসবি। বেশিক্ষণ ম্যানেজ করতে পারবো না আমি।

আমার পুরো কথাটা শুনার পূর্বেই ভাইয়া হাওয়া! এক ছুটেই পগারপার! স্ট্রেঞ্জ! যাচ্ছে কোথায় এরা? হলুদের দিন তো কোনো পার্টি-শার্টি হবার কথা নয়। তবে?

.

🍁

.

ঘরে লাইভ কুস্তি খেলা চলছে। এই কুস্তি খেলার একদিকে আমি এবং অপরপক্ষে আম্মু-খালামুনি! অদ্ভুত হলেও এই কুস্তি খেলার মূলে রয়েছে ইয়েলো শাড়ি। এই শাড়ি আমায় পড়িয়ে দেবার জন্য আমার সাথে কুস্তি লড়ছেন তারা দুজনেই। এইদিকে আমি তাদের কুস্তি লড়ার চূড়ান্ত প্রতিনিধি! আমার কথা একটাই, সুনামি এসে যাক, টর্নেডো বয়ে যাক আমি হলুদ শাড়ি পড়বো না না না। সেটা কথাটা এতোবার বলার পরও যেনো তাদের স্নায়ুতন্ত্র অবদি পৌঁছোচ্ছেই না।

বিয়েতে ডিপ রেড পড়তে রাজি হয়েছি তার মানে এই নয় যে গা জ্বলানো বিরক্তিকর রংটাও গায়ে জড়াতে হবে আমায়। গায়ে হলুদ তো কি হয়েছে? হলুদ বাটা ছোঁয়াবে, ছোটখাটো মিষ্টি-ফল খাওয়াবে, দ্যটস এনাফ! এর সাথে হলুদ শাড়ি পড়ার কি দরকার সেটা তো বুঝতে পারছি না আমি।

---- অনন্যা দেখ এবার কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছিস তুই! ভালোয় ভালোয় খাট থেকে নেমে আয়। বাড়ি ভর্তি মেহমান এসেছে সবাই অপেক্ষা করছে।

---- হ্যা রে মা আর না করিস না। শুধু একটা দিনেরই তো ব্যাপার।

আম্মু আর খালামুনির কথা প্রতিবারের মতোই উপেক্ষা করে আরো একধাপ পিছিয়ে এলাম আমি।

আম্মু বুঝলো এভাবে হবে না তাই অন্য ফন্দি আঁটতে হবে ভেবেই শাড়ি বিছানায় রেখে দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে গেলো আম্মু। যেতে যেতে আম্মু বলে উঠলো,

---- ঠিক আছে, আমি নীবিড়দের বাসায় ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি, মেয়ে আমার বিয়ে করবে না। তারা যেনো অনুষ্ঠান এখানেই বন্ধ করে দেয়।

কথাগুলো একদমে বলে নিয়ে আবারও হাটা ধরতেই এক লাফে খাট থেকে নেমে পড়লাম আমি। অবশেষে কোনো পথ খোলা না পেয়ে অগত্যাই হলুদ শাড়ি পড়তে রাজি হতে হলো আমায়।

.

🌼

.

আম্মু আর খালামুনি আমায় শাড়ির সাথে ফুলের অর্নামেন্টস পড়িয়ে দিয়ে ঘর থেকে যেতেই দুটো পার্লার থেকে আগত মেয়ে হাতে এতো বড় বড় সুটকেসের সমান মেকআপ বক্স নিয়ে ঢুকতে নিলেই দরজার সামনে দুহাত মেলে তাদের ঢুকতে নিষেধ করে দিয়েছি আমি। "অল্প সাজে সুশ্রী আর অতি সাজে পেত্নি" কথাটায় প্রচন্ড রকমভাবে বিশ্বাসী আমি। তাই তাদের বের করে দিয়ে একাই সাজতে লেগে পড়েছি আমি।

আম্মু বা খালামুনি কেউই আমায় এবার মানাতে পারেনি। তারা খুব ভালো করেই জানে যদি জোড়পূর্বক মেয়েদুটোকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় তবে দুটোর একটাও সোজা কোমড় নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে না। বেড়ালের মতোই খিলকা বানিয়ে ছিলকা তুলে দেবো আমি দুজনেরই।

অগ্নি ভাইয়া বা রুশো ভাইয়া কেউই এখনোও ফেরে নি যার দরুন ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে সাজছি আমি। সাজছি বললে ভুল হবে, গত ১০ মিনিট যাবৎ চুলে শুধু চুরুনীই করে চলেছি স্রেফ। এমন সময় দরজায় টোকা পড়তেই টনক নড়লো আমার। ভাইয়ারা বোধহয় এসে গিয়েছে ভেবেই হেয়ার ব্রাশটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে উঠে পড়লাম আমি। শাড়ির কুঁচিতে বেল লেগে পড়ে যাবো ভেবে সাবধানে কুচি ধরে হেটে গিয়ে দরজা খুলতেই ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকে পড়ে আমার মুখ চেপে ধরলো কেউ। আমি চোখ বড়বড় করে তাকাতেই এক হাত দরজা লাগিয়ে দিয়ে আমায় দেয়ালের সাথে চেপে ধরলেন নীবিড় ভাইয়া। হঠাৎ এমন আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলাম আমি। উনি আমার মুখ থেকে হাত সরিয়ে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিচ-উপরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন আমায়। আমি অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়লাম,

---- একি আপনি? কখন, কিভাবে, কোথায় থেকে ভূতের মতো টপকে এলেন?

উনি কোনো প্রশ্নেরই জবাব না দিয়ে আমার একদম কাছে চলে এসে কোমড় জড়িয়ে ধরলেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন,

---- সারাজীবন তো শুধু ব্লাক ব্লাক করেই মাথাটা খেয়ে নিলে, নিজেকে আয়নায় দেখেছো কি লাইট কালারে কতোটা মানিয়েছে তোমায়?

উনার কথার কোনো জবাবই দিতে পারলাম না আমি। কোমড়ে শীতল এক অনুভূতি হতেই চমকে উঠলাম সাথেসাথেই। মুচকি হেসে নিজের হাতে লাগিয়ে রাখা হলুদ আমার কোমড়ে ছুঁইয়ে হাত উঠিয়ে নিজের গালে হলুদ লাগালেন উনি। আমি স্তব্ধ হয়ে জমে গিয়েছি যেনো। নড়বার বিন্দুমাত্র শক্তিও অবিশিষ্ট নেই আমার মাঝে।

এবার নিজের ঠোঁটের কোণে ঝুঁলিয়ে রাখা ঘায়েল করা দুষ্টু হাসির রেখা দীর্ঘ করে ঝুঁকে পড়লেন উনি। আমার গালে নিজের হলুদ লাগানো গাল ছোঁয়াতেই আবারও কেঁপে উঠলাম আমি। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘোড়ার বেগে ছুটতে লাগলো আমার। কিন্তু তাতে উনার কোনো হেলদোল নেই। উনি আমার গালের সাথে নিজের গাল ঘষতেই ব্যস্ত!

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ নিজের গাল আমার অসহায় গালের সাথে ঘষে নিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালেন উনি। নেশা ভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠলেন,

---- লুকিং বিউটিফুল! প্রথম হলুদটা তোমার গায়ে ছোঁয়ানোর অধিকারটা আমারই ছিলো। সেই হিসেবেই লাগিয়ে দিতে এসেছিলাম। আল্লাহ হাফেজ!

বলে খুবই সাবধানে এবার দরজার বদলে জানালা দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন উনি।

আমি এখনো আগের মতো স্ট্যাচু সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এতোক্ষণ ঠিক কি হলো তার কোনো অর্থই খুঁজে পাচ্ছি না আমি। উনি কি ভূত নাকি এলিয়েন? এলেন ঝড়ের বেড়ে আবার চলে গেলেন একরাশ নিস্তব্ধতা দিয়ে!

.

দেয়াল টপকে খুবই সাবধানে বাগানে নেমে পড়লো অগ্নি। বাড়ির পেছনে দিকটায় কেউই নেই দেখে বুক চিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। এদিক-ওদিক চোখ বুলাতে বুলতে এক ধাপ এগোবে তার আগেই আসমান থেকে ধপাস করে ৬২ কেজি ওজনের বস্তা পড়লো তার ওপর। ভার সামলাতে না পেরে দুজনেই পড়ে গেলো ঘাসের ওপর। হঠাৎ এমন আকস্মিক ঘটনার সাথে আঘাতের সংমিশ্রণে ঠোঁট চেপে ধরে কুঁকিয়ে উঠলো অগ্নি।

রুশো বুঝলো তার ল্যান্ডিং পজিশন একেবারেই ঠিক ছিলো না যার দরুন কোনো মানুষের ওপর এভাবে দেয়াল টপকে লাফ দিতে গিয়ে ধুপ করে পড়েছে সে। কিন্তু যার ওপর পড়েছে তাকে দেখতে সচেতন চোখে তাকাতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার। দাঁত কেলিয়ে হেসে দিয়ে সে বলে উঠলো,

---- আরে ব্রো! ভেবেছিলাম এই বুঝি ভান্ডা ফুটলো, বাট আই ওয়াজ রং। আসমান সে গিরা লেকিন খাঞ্জুর মে তো নেহি আটকা! ভাজ্ঞিস তোমার ওপরই ল্যান্ড করলাম আমি।

অগ্নি বুঝলো আসমান থেকে কোনো বস্তা হয় বরং দেয়াল টপকে তার মতোই রুশোও লাফ মারতে গিয়ে ওর ওপর পড়েছে। ব্যাথায় দাঁতে দাঁত চেপে সে রুশোকে উদ্দেশ্য করে বললো,

---- আবে নাম ওপর থেকে, এদিকে ব্যাথায় জান বেড়িয়ে যাচ্ছে আমার।

রুশো জিহ্বায় কামড়ে ধরে "উপপপসসস...! সরি ব্রো" বলে নামতে নিতেই বাগানের গাছের আড়াল থেকে নীবিড় লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়োতে যেয়ে হোচট খেয়ে ধরাম করে পড়লো তাদের ওপর। একে তো রুশো তার ওপরে নীবিড়! দুজনই অগ্নির ওপর ভর করে পরায় ব্যাথাটা আরোও তীব্রতর হয়ে উঠলো অগ্নির। এবার আর সহ্য করতে না পেরে "ওরে মারে মাইরা লাইচ্চে রে.....! বলে চাপা আর্তনাদ করলো অগ্নি।

রুশোও "আইয়াম্মমায়ায়া.....!" বলে চিৎকার জুড়ে দিলো অগ্নির সাথে তাল মিলিয়ে।

নীবিড় তৎক্ষণাৎ তাদের ওপর থেকে উঠে পড়তেই কোমড় চেপে ধরে উঠে পড়লো রুশো। অগ্নি একা উঠে দাঁড়াবার মতো অবস্থায় নেই দেখে নীবিড়-রুশো দুজনেই টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলো তাকে।

তিনজনই জোড়ে জোড়ে বার কয়েক শ্বাস টেনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

---- তোরা....!

মাঝখান থেকে রুশো ঠোঁট উল্টে বলে উঠলো,

---- এইবার বুঝলাম। আমরা তিনজনই তবে একি গোয়ালের গরু!

.

.

.

.

চলবে..................💕

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন