ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার (সিজন ১)

৬৫তম পর্ব

লেখক: আয়ানা জাহান নুসরাত

#প্রেম_আমার♥

#পার্ট-৬৫♥

#Ayanaa_Jahan(Nusraat)♥

.

🌺

.

আমার ঠিক সামনে কোমড় চেপে ধরে মুখে জোড়পূর্বক হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অগ্নি ভাইয়া-রুশো ভাইয়া।

তাদের ভাবখানা কিছুটা এরকম যেনো কোমড় ফাটবে তবুও মুখ ফুটবে না।

তখন নীবিড় ভাইয়া চলে যাবার পর বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে উনি ঠিক কোনদিন দিয়ে যাবেন তা দেখতেই ছুট লাগাই আমি। যেহেতু আমার ঘরের জানালা দিয়ে বাড়ির পেছন দিকে যাওয়া যায় সেই হিসেবেই আমি তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বেড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ির পেছন সাইডে চলে আসি। আর এসেই আমার দু ভাইকে কোমড় চেপে ধরে এক পা এক পা করে হেটে আসতে দেখেই থেমে যাই আমি। ভাইয়ারাও তাই, আমায় এভাবে এই সময় এই জায়গায় একদমই আশা করে নি তারা। দুজন দুজনের দিকে অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অতঃপর দাঁত কেলিয়ে তাকিয়ে আছে তারা আমার দিকে। কিন্তু আমার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ তাতে জমা একরাশ সন্দেহ। নিজেরদের বাড়িতে কেউ এভাবে চোরের মতো ঢুকলে তাতে নিশ্চয় কোনো না কোনো ঘাপলা রয়েছে এটা বাস্তব। সেই ভেবেই চোখের দৃষ্টি আরোও খানিকটা সরু করলাম আমি। ভ্রু নাচিয়ে ভাইয়াদের জিজ্ঞেস করলাম,

---- কি! কোথায় থেকে আসা হচ্ছে ভাইয়ারা?

আমার প্রশ্নে একটা শুকনো ঢোক গিললো দুজনেই। রুশো ভাইয়া এক হাতে অগ্নি ভাইয়াকে ধরে রেখেই দাঁত কেলিয়ে বলে উঠলো,

---- আরে ছুটকি, তু..তু..তুই এখানে কি করছিস, এখনোও তো পুরোপুরি রেডিই হোস নি!

রুশো ভাইয়াকে থামিয়ে দিয়ে এবার আমার বিগ পয়েন্টে আঘাত করে বসলো অগ্নি ভাইয়া। বেঁকে যাওয়া কোমড় টাকেই চেপে ধরে মুখ তুলে তাকিয়ে বিচক্ষণ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অামায় দেখে নিয়ে ভাইয়া বললো,

---- একি রে, তোর গালে হলুদ! এখনোও তো প্রোগ্রাম শুরুই হয় নি তাতেই হলুদ লাগালো কে তোকে?

এবার পড়লাম আমি চরম বিপাকে, না জানি নীবিড় ভাইয়াকে ভাইয়ারা দেখেছে কি না। যদি না দেখে থাকে তবে আলহামদুলিল্লাহ! কিন্তু যদি দেখে থাকে? কি বলবো আমি এখন?

আমায় চুপ থাকতে দেখে ভাইয়ারা একে অপরের দিকে দুষ্টু হাসি হেসে তাকালো। রুশো ভাইয়া দাঁত বের করে লম্বা একটা হাসি দিয়ে বলে উঠলো,

---- একচুয়ালি কি হয়েছে জানিস তো ছুটকি! ব্রো যেই কাজে এসেছিলো আমরাও ঠিক একই কাজে বেড়িয়ে ছিলাম। বাট ভাগ্য দেখ! আমরা দেয়াল টপকে ফেরার পথে আর ব্রো যাওয়ার পথে, তিন জনই একি জায়গায় ধুপুস!

রুশো ভাইয়ার কথার প্রতিউত্তরে আমার ঠিক কি বলা উচিত বা কি ধরণের রিয়াকশন দেওয়া উচিৎ জানা নেই আমার। লজ্জার সাথে পেট ফাটা হাসির সংমিশ্রণ ঘটিত এক উদ্ভুৎ বিক্রিয়া সাধিত হচ্ছে আমার অন্তরে। জানি না উৎপাদ হিসেবে ঠিক কি ফলাফল আসবে যার দরুন নির্বিকার আমি। যেহেতু হেসে উড়িয়ে দেবার মত পরিস্থিতি আমার নেই সেহেতু ঠোঁট চেপে ধরে হাসি কন্ট্রোল করে জিজ্ঞেস করলাম,

---- তা উনি কি চলে গিয়েছেন?

বিনিময়ে অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়া স্বস্তির হাসি হাসলো, মাথা নাড়ি সম্মতি জানাইয়ে ধীর পায়ে চললো তারা আমার পিছু পিছু। তিন ভাই বোনই অবশেষে নিজেদের বাসায়ই চোরের বেশে প্রবেশ করলাম অগত্যাই।

.

🌼

.

পুরো বাড়ি জুড়ে হলুদের তোরজোড় চলছে। সবার খুশি যেনো আর ধরে না। হলুদেই এতো মানুষ এসেছে তবে বিয়েতে ঠিক কতো জন মানুষ আসবে ভাবতেই চোখে সরষে ফুল দেখতে শুরু করে দিয়েছি আমি।

এদিকে রুশো ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়াকে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে মুভ লাইগিয়ে দিয়ে তাদের কিছুক্ষণ রেস্ট নিতে বলায় তারা একটু বিশ্রাম করছে। যদিও আমি বাদে বাড়ির লোকেরা কেউই জানে না বিয়ের আগে দুই ছেলেই কোমড় ভেঙে ফেলেছে। জানলে নিশ্চয়ই এলাহি কান্ড বাঁধিয়ে ফেলতো সকলে মিলে।

কিছুক্ষণ আগে আমি রেডি হয়েছি কিনা তা স্বচক্ষে দেখবার সুবাদে ঘরে এসেছিলো খালামুনি। আর ঘরে এসে আমাদের তিন ভাই-বোনেরই গালে হলুদ দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান তিনি। অবশ্য ভ্যাবাচেকা না খাবার মতো কান্ড তো আর আমরা ঘটাইনি। সেহেতু টাস্কি খাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। খালামুনি আমাদের গায়ে হলুদ ছোঁয়ানোর পূর্বের হলুদের অস্তিত্ব দেখতে পেয়ে কপাল কুঁচকায়, অবাক হয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করে,

---- কিরে তোদের গালে হলুদ এলো কোথায় থেকে?

খালামুনির প্রশ্নের জবাব স্বরূপ আমি বা অগ্নি ভাইয়া কিছু বলবো তার আগেই রুশো ভাইয়া দাঁত কেলিয়ে জবাব দেয়,

---- আর বলো না আম্মু, ছুটকি আর ব্রোর নাকি হলুদ হলুদ খেলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো তাই আর কি তিন ভাই-বোন মিলে একটু হলুদ হলুদ খেলছিলাম। হেহে!

রুশো ভাইয়ার জবাবের বিনিময়ে খালামুনি চোখ বড়বড় করে ফেলে। আমাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোড় পূর্বক দাঁত কেলিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাই আমরা। অতঃপর খালামুনি হাসতে হাসতে বলে,

---- তোরা কি আজীবনেও বড় হবি না?

সাথেসাথেই আমরা তিন জনই খুব সুন্দর করে নিজেদের ঝকমকে দাঁত গুলো বের করে দিয়ে বলে উঠি,

---- বুড়ো হয়ে দাঁত পড়ে গেলেও না।

খালামুনি আমাদের কথায় হু হা করে হেসে ফেলে। আরোও ১০ মিনিট সময় দিয়ে, ঠিক সেই ১০ মিনিট পরই আমাদের স্টেজে গিয়ে বসতে হবে বলে কড়া গলায় আদেশ দিয়ে যায়। আমরাও বাধ্য সন্তানের মতোই চোখের পলক ফেলে খালামুনির আদেশ ধার্য ধরেই সম্মতি জানাই।

.

---- ভাইয়ারা তোমাদের হলো? এখন তো চলো, সবাই অপেক্ষা করছে!

বিনিময়ে ভাইয়ারা একে অপরের দিকে এক পলক চেয়ে ঠোঁট উল্টালো। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগোতে নিলেই আমি হাতের ইশারায় থামতে বললাম তাদের। দৌড়ে গিয়ে হেয়ার ব্রাশটা নিয়ে এসে এক এক করে দুজনেরই চুলগুলো খুবই যত্নসহকারে ব্রাশ করে দিলাম আমি।

অগ্নি ভাইয়া-রুশো ভাইয়া মুচকি হেসে ছলছল চোখে আমার দিকে তাকাতেই আমারও চোখে জলেরা এসে জমাট বাধতে শুরু করলো। ঠোঁট উল্টে আমি জিজ্ঞাস করলাম,

---- তোমদের চোখে জল কেনো ভাইয়া?

আমার প্রশ্নে চটজলদি চোখ মুছে নিয়ে আমায় ঝাপটে ধরলো দুজনেই। পরম স্নেহে আবদ্ধ হয়ে ভাইয়াদের আঁকড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে নিলাম আমিও। বিয়ের পূর্বে বিয়ে নিয়ে উত্তেজনার শেষ না থাকলেও শেষ সময় এসে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেড়োয় সকলেরই। মেয়েদের যে যেতেই হয়, আজ হোক কাল হোক একদিন না একদিন শ্বশুর বাড়িতে কদম ফেলতেই হয়। সেই থেকেই শুরু হয় দূরত্ব তবে সেটা শুধুই আপেক্ষিক। আর রইলো ভালোবাসার দূরত্ব? সেতো কমার বদলে আরোও মাত্রাতিরিক্ত গভীরতায় ছেঁয়ে যায়। হাহাকার হয়ে পড়ে রয়ে হৃদয়ের ছোট্ট কুঠুরিটায়।

.

🌼

.

অবশেষে শেষ হলো গায়ে হলুদ ছোঁয়ানোর প্রতিযোগিতা। এখন মনে হতে পারে অনুষ্ঠানের বদলে গায়ে হলুদকে প্রতিযোগিতার সাথে তুলনা করছি কেনো? তবে বলবো একবার অগ্নি ভাইয়া আর রুশো ভাইয়ার দিকে চোখ বুলিয়ে নিতে। হলুদের চাদরে ঢাকা পরে তারা বর্তমানে হলুদিয়া ভূত বৈ কিছুই না। ভাজ্ঞিস মাঝখান থেকে বেঁচে গিয়েছি আমি। তবে হলুদের থেকে বেঁচে গেলেও মিষ্টি আর ফলের থেকে বাঁচতে পারিনি আমি। অনুষ্ঠানে যতো জন মহিলারা এসেছে সবারই আবদার আমার গায়ে হলুদ ছোঁয়ানোর। বেশ তো! হলুদই তো ছোঁয়াবে, তাতে আর এমন কি? তাই দুবার না ভেবেই খুশি মনে মিষ্টি হাসি আমি। কিন্তু এই মিষ্টি হাসিই যে আমার পেটে মিষ্টির গোডাউন তৈরি করে ফেলবে তা জানা ছিলো না আমার।

আম্মু-খালামুনির পর আমায় যতো জন মহিলারা মিলে হলুদ ছুঁইয়েছে তারা সকলেই সাথে করে একটা করে মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছে আমায়। ছোট ছোট মিষ্টি হলেই কি হবে? তাদের মিষ্টতা তো আর কম নয়! যার দরুন টানা ১০ পিস মিষ্টি গিলে নেওয়ার পর উল্টি সিস্টেম অন হয়ে যায় আমার। এমন করুন অবস্থায় একমাত্র আম্মুই পারে মহিলাদের বোঝাতে, সেই হিসেবেই করুন চোখে আকুতি করি আমি আম্মুর কাছে। আম্মু মেয়ের এমন করুন পরিস্থিতি দেখে কষ্ট পাওয়ার বদলে ফিক করে হেসে ফেলে, অতঃপর মহিলাদের বুঝিয়ে বলে যাতে শুধু হলুদই ছোঁয়ায়, এসব মিষ্টি কিংবা ফল না খাওয়ায়, নয়তো তার মেয়ে বিয়ের আগেই ঠাস করে ফুটে গিয়ে আকাশে উড়ে যাবে।

সবই যেখানে ঠিক চলছিলো সেখানে বিপত্তি ঘটায় রুশো ভাইয়া আর অগ্নি ভাইয়া। তাদের একে অপরের অভিযোগ তাদের নাকি বেশি করে হলুদ মাখানো হচ্ছে যেখানে অপর পক্ষকে কম। কিন্তু এই দুই বান্দরকে কে বোঝাবে যে হলুদ কেউ দাড়ি-পাল্লায় মেপে ছোঁয়ায় না। যার দরুন সকলের ছোঁয়ানো হয়ে গেলে দুজনেই হলুদের বাটি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ইচ্ছেমতো একে অপরকে হলুদে চুবিয়ে তবে শান্ত হয় তারা। তাদের কোমড় ভাঙা অবস্থায় হলুদ নিয়ে কুস্তি করা দেখে হাসিতে ফেটে পড়ে সবাই। তবুও কেউই তাদের থামাতে পারে নি। অবশেষে কুস্তি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে হলুদিয়া ভূত হিসেবে পরিচয় পেলো দুজনেই।

.

রাত ৮ টা বেজে ১৫ মিনিট..........

আর হয়তো ১০ কি ১৫ মিনিটের মাথায় নীবিড় ভাইয়ারা পৌঁছোবেন আমাদের বাসায়। রাত্রিরা বেশ কিছুক্ষণ আগেই এসে পড়েছে। আজকের হলুদের কাহিনি শুনে রাত্রির সে কি হাসি!

রুশো ভাইয়া কি করে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে হলুদ লাগিয়ে দিয়ে এসেছে সেই গল্প ধরেই পাড় করে দিয়েছে পুরো ৩০ টা মিনিট।

এদিকে রিমির আনন্দের সীমা নেই। পুরো বাড়ি জুড়ে দাপিয়ে বেড়োচ্ছে সে। অথচ গতকাল কতো বড় একটা কান্ড ঘটালো তার বিন্দুমাত্রও রেশ নেই তার ছোট্ট মস্তিষ্কটায়। ভাজ্ঞিস মদ খেয়ে সব ভুলে গিয়েছে নয়তো ভাইয়াদের সামনে ভুলক্রমেও পড়তো না সে।

আমাদের গল্পের মাঝেই গাড়ির হর্ণ কানে ভেসে আসতেই বসা থেকে উঠে পড়ে ভাইয়ারা। একসাথেই দ্রুত পায়ে ছুট লাগালো তারা সদর দরজা বরাবর। সাথে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো আম্মু আর খালামুনিও। অবশেষে নীবিড় ভাইয়ারা চলে এসেছেন। নিচ থেকে ভাইয়াদের সম্মিলিত হাসির ঝংকারে তা স্পষ্ট।

নীবিড় ভাইয়ার কন্ঠ কানে পৌঁছোতেই মুচকি হাসলাম আমি। হলুদের সময় হাতে পড়ে নেওয়া মেহেন্দির দিকে তাকাতেই সর্বপ্রথম "নীবিড়" লেখাটা চোখে ভাসলো আমার। অল্প সময় রেখেই এতো গাঢ় রং দেখে বিস্মিত হলো রাত্রি। আমার হাতটা নিজের কোলের ওপর বিছিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগলো সে মেহেন্দির মন মাতানো রঙের মাঝে অন্ধিসন্ধির সাথে নীবিড় ভাইয়ার জ্বলজ্বল করতে থাকা নামটা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাতটা দেখে নিয়ে মুখ কালো করলো রাত্রি। নিজের মেহেন্দি পরা হাতটা আমার সামনে ধরে ঠোঁট উল্টে সে বলে উঠলো,

---- তোর ডিজাইনটা কতো সুন্দর হয়েছে রে! আর আমারটা দেখ, পার্লারের পঁচা মেয়েটা কি বিশ্রী করেই না পড়িয়ে দিয়েছে আমায়! দেখ, মনে হয় যেনো অ্যামাজনের জংগল বানিয়ে দিয়েছে।

রাত্রির কথায় হু হা করে হেসে ফেললাম আমি। আমায় হাসতে দেখে ঠোঁট উল্টানোর পরিধিটা আরোও খানিকটা বাড়িয়ে সে বললো,

---- দেখেছিস, তুইও হাসছিস! এই পঁচা মেহেন্দির ডিজাইন দেখেই যে কেউই হাসবে।

আমি আরো কিচ্ছুক্ষণ হেসে নিয়ে জোড়ে শ্বাস ফেললাম। ওর গালে দুবার চাপড় মেরে বলে উঠলাম,

---- ওরে পেত্নি! আমি তোর মেহেন্দির ডিজাইন দেখে হাসি নি। হেসেছি তোর কথা শুনে। হুহ! আরোও মেহেন্দি পড় পার্লারের মাইয়ার হাতে। এমনই হইবো!

বিনিময়ে চোখ বড়বড় করে ফেললো রাত্রি। অবাক চোখে তাকিয়ে সে বলে উঠলো,

---- মানে! তুই পার্লারের মেয়েদের থেকে পড়িয়ে নিস নি? তবে কার কাছে পড়িয়ে নিয়েছিস?

রাত্রির এমন বোকাবোকা প্রশ্নে হাসলাম আমি, উঠে দাঁড়িয়ে ওর মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলে উঠলাম,

---- নিজের হাত থাকতে মানুষের হাত দিয়ে পড়িয়ে নেবো কোন দুঃখে?

বলেই ঘর থেকে বেড়িয়ে হাটা ধরলাম ড্রয়ই রুমের উদ্দেশ্যে। আমার পেছন পেছন "বলিস কি? একাই পড়েছিস? আরে কই যাস, দাঁড়া আমিও আসছি!" বলেই ছুট লাগালো রাত্রিও।

.

ড্রয়িং রুমে পৌছোতেই সর্বপ্রথম নীবিড় ভাইয়ার গলায় যেই বাক্যটি কানে পৌছোলো সেটি হলো,

---- কিরে তোরা কি হলুদের ছোঁয়ানোর পর পানি দিয়ে গোসল করেছিস নাকি? পানি ছোঁয়ানোর পর হলুদে ডুবকি লাগিয়ে গোসল করেছিস?

বিনিময়ে একে অপরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো অগ্নি ভাইয়া-রুশো ভাইয়া। দুজনই দুজনকে চোখের ইশারায় অভিযোগ ছুড়ে মেরে দোষী সাব্যস্ত করায় ব্যস্ত। এদিকে নীবিড় ভাইয়ার প্রশ্নের পরই বাড়ি কাঁপিয়ে হু হা করে হেসে উঠলাম সকলেই। নীবিড় ভাইয়া হাসতে হাসতে ভাইয়াদের কাধে দু হাত রেখে বলে উঠলেন,

---- চল শালারা, ঘরে গিয়ে তোদের সাইজ করছি।

বলেই সিঁড়ি বেয়ে ভাইয়াদের সাথে করে নিয়ে উপরে উঠতে লাগলেন উনি। ভাইয়াদের উপরে আসতে দেখে সিঁড়ির সাইডে চেপে এলাম আমি। উনি যেতে যেতেই এক পলক আমার দিয়ে তাকিয়ে নিজের ঘন পল্লব বিশিষ্ট বাম চোখটা টিপ মেরে সোজা বুকের বা পাশে গুলিয়ে চালিয়ে চলে গেলেন আমার। সাথেসাথেই ধক করে উঠলো আমার অসহায় হৃদপিন্ডটা, আবারও এক দফা ক্রাশ খেয়ে ডান হাতে বুক চেপে ধরে আনমনেই বলে উঠলাম,

---- পাগল হয়ে যাবো আমি পাগল হয়ে যাবো....!

.

🍁

.

রাত দুটো বেজে ২ টো ১৬ মিনিট,

বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। তবুও ঘুমের ছিটেফোঁটাও চোখে ধরা দিচ্ছে না আজ আমার। ঘুমের বাপ না হোক নানু-দাদু বা তাদের আত্মাই আসুক, তাও চলবে। কিন্তু ঘুমের কোনো বংশধরই যে আমার ধারের কাছেও এসে ঘেঁষছে না। অথচ এদিকে নিত্য আপু আর রাত্রি সারাদিনের ধকল শেষে কি সুন্দর চুপটি করে ঘুমিয়ে রয়েছে। আর এদিকে আমি, না আম্মুর ভাষ্যমতে গরু চুরি করছি আর না মুরগী। তবুও মধ্যরাতে চোখ মেলে চেয়ে রয়েছি আমি। শুধু মস্তিষ্কে একটাই কথা চরকার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে যে কাল আমার নয় আমাদের বিয়ে। কি অদ্ভুত ভাবে ৬ টা মানুষেরই একইদিনে বিয়ে। ব্যাপারটায় এতোটাই এক্সাইটেড আমি যে ঘুম তো দূরে থাক চোখটাই বন্ধ করে শুয়ে থাকতে বিরক্ত লাগছে আমার।

বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে আবারও পাশ ফিরে শুবো ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনে মেসেজের টিউন বেজে উঠায় হকচকিয়ে উঠে বসলাম আমি। বেড টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিতেই চোখের সামনে বড়বড় অক্ষরে ভেসে উঠলো "সাদা বিলাই" send a message! স্ক্রিনে সাদা বিলাই নামটা দেখতেই ঠোঁট চেপে ধরে ফিক করে হেসে উঠলাম আমি। লক খুলে মেসেজ ওপেন করতেই চোখ বড়বড় হয়ে এলো আমার।

"ছাদে এসো অনন্যা!" মেসেজটি দেখেই খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি। আমি যে জেগে রয়েছি এটা উনি জানলেন কিভাবে আর এতো রাতে ছাদেই বা ডাকলেন কেনো আমায়? আমার ভাবনার মাঝেই আবারও মেসেজ আসলো উনার নম্বর থেকে। সেখানে লেখা, " এতো ভাবলে অল্প বয়সেই চুল পেকে যাবে, জলদি আসো আমি ছাদে অপেক্ষা করছি। কাম ফাস্ট!"

এবার আগের থেকেও চোখ বড়বড় হয়ে এলো আমার। আপাতত নিজের ভাবনাগুলো কে সাইডে রেখে খাট থেকে নেমে গলায় ওড়না ঝুলিয়ে নিঃশব্দে দরজা চাপিয়ে দিলাম আমি। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে নিয়ে হাটা ধরলাম ছাদের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ না করুক কারো চোখের সামনে যেনো ধরা না পড়ি, নয়তো ইজ্জতের ফালুদা ছেড়ে কাস্টার্ড হয়ে যাবে আমার।

.

ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছেন নীবিড় ভাইয়া। চাঁদের আলোয় উনার স্নিগ্ধ মুখখানা দেখে আবারও বুকের বাম পাশটা চিনচিন করে উঠলো আমার। আমায় পা-মাথা অবদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে ঠোঁটের দুষ্টু হাসির রেখা আরো দীর্ঘ করলেন উনি। বা হাতের বৃদ্ধা আঙুল বাদে বাকি চারটে আঙুল দুবার ভাঁজ করে ইশারায় নিজের কাছে ডাকলেন আমায়। আমি উনার মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতেই এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলাম উনার নিকটে। দূরত্ব আর মাত্র ১ হাত থাকাকালীন হাত বাড়িয়ে কোমড় জড়িয়ে ধরে হেঁচকা টান মেরে নিজের বুকের ওপর ফেললেন উনি আমায়। আমি ভয়ে উনার শার্টের হাতা খাঁমচে ধরতেই বাঁকা হাসলেন উনি। আমায় সোজা করে দাঁড় করিয়ে হাতটা নিজের সামনে ধরে বলে উঠলেন,

---- নামটা তুমি লিখেছো?

বিনিময়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে মৃদু স্বরে আমি বললাম,

---- পুরো মেহেন্দি টা আমিই লাগিয়েছি।

উনি ছোট্ট করে "ইম্প্রেসিভ!" বলেই নিজের হাতটা আমার হাতের উপরে রাখলেন। উনার হাতে মেহেদী দিয়ে নিজের নাম লেখা দেখে চমকে উঠলাম আমি। বড়বড় চোখ করে অবাক হয়ে বলে উঠলাম,

---- আমি তো জানি শুধু মেয়েরাই বিয়ের আগে মেহেদি পরে আর তাতে তার হবু বরের নাম লেখে। কিন্তু ছেলেরাও লেখে বুঝি?

বিনিময়ে হাল্কাস্বরে হাসলেন উনি। আমার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,

---- কোথায় লেখা আছে শুধু মেয়েরাই তাদের জীবনসঙ্গীর নাম হাতে লিখতে পারবে, আর ছেলেরা নয়? প্রচলিত প্রথা দেখে বুঝি ভালোবাসা হয়?

.

.

.

চলবে.................💕

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন