ধ্রুবতারা...
পর্ব ১৮..
লেখিকা... আঁখি শেখ..
.........…..…
ভোর সাড়ে চারটে।
তারার এলার্ম দেয়া ছিল। নইলে ওর আযানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গে না। তাই অ্যালার্ম দিয়ে রাখে।
ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নিল। তারপর বই নিয়ে বসলো। কিন্তু কিছুতেই জানে না পড়াতে মন বসছে না। সেই তখন থেকে শুধু একটা নামই কানে বাজছে। একটাই কন্ঠ বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সুউউখ! কি ছিল ওই কন্ঠে? জানিনা কেন যেন মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত আকলতা যেন ওই কন্ঠের মধ্যেই বিদ্যমান। একটা মানুষের ঘুম জড়ানো কন্ঠ কি এতটা সুমধুর এতটা নেশা তোর এতটা আসক্ত হয়? বারবার চোখ যাচ্ছে টেবিলের উপর রাখা বই গুছি ব্র্যান্ডের পারফিউমের ওপর।
তারার গুচ্ছি ব্র্যান্ডের ওপরে সচরাচর একটা দুর্বলতা কাজ করে। হঠাৎ করেই তারার মনে হল, ওতো পারফিউমটা চুরি করে এনেছে, সকালে যখন পাবে না ওই এসপি সাহেব তো আবার তারাকে সন্দেহ করতে পারে। যদি সন্দেহ করে এই রুমে খুঁজতে আসে এটাতো সামনেই আছে ধরা পড়ে যাবে। না না এটাকে লুকাতে হবে। কোথায় লুকাবে কোথায় লুকাবে ভাবতে ভাবতে তারা একটা জায়গা খুঁজে পাই। জায়গাটা হল তারার আলমারি। আলমারির মধ্যে গাদাগাদা কাপর ঠাসা। কোনদিনও নিজের আলমারি নিজেকে গুছায় না। হয় তারমিন চৌধুরী নাহয় জ্যোৎস্না চৌধুরী গুছিয়ে দেন। এই মুহূর্তে আলমারিটা বোধ হয় গোছানো না। তারা যেই আলমারিটা খুলেছে, অমনি কিছু জামা কাপড় তারার মুখের উপর এসে পড়ল। তারা কাপড় গুলোকে তুলে সাইডে রেখে ওই জামা কাপড়ের মধ্যেই ঠেসে ঠেসে পারফিউম টা লুকিয়ে রাখল।
যাক বাবা লুকানো শেষ। এসপি কেন এসপির বাপ এসে খুঁজে পাবে না।
নিচে পড়ে থাকা জামা কাপড় গুলো যখন তুলে রাখছিল, হঠাৎই চোখ গেল সেই সাদা গাউন টার উপরে। তারপর মনে পড়লো সেদিন রাতের কথা। আচ্ছা তার তো একটুও মনে নেই ড্রেসটা কে চেঞ্জ করে দিয়েছিল তারার।
তারা ড্রেসটা হাতে নিল। তারপর চোখ বন্ধ করে মনে করতে লাগলো। অনেক চেষ্টার পরে আপছা আপছা কিছু মনে পড়লো,
ওই মেয়েদের সাথে নাচানাচি করার দৃশ্য ছেলেগুলো তারাকে ঘিরে ধরে ছিল তার দৃশ্য সবচেয়ে সে গাড়ির মধ্যে যখন ধ্রুবর কোলে উঠে বসলো সেই দৃশ্য মনে পড়তেই তারা ঝটপট চোখ খুলে ফেলল ।
কি দেখল তারা? ওই অসহ্য পুরুষটার কোলে উঠে বসে ছিল তারা?
আচ্ছা ওই লোকটা তারার ঘুমের সুযোগ নেয়নি তো?
তার জন্যই হয়তো ড্রেস চেঞ্জ করে দিয়েছে। ও মাই গড। এরকম কিছু একটা বলছিল তো তারা অস্পষ্ট মনে আছে, ধ্রুব বলছিল, আশেপাশে কেউ নাই সংসার নিরব রাস্তায় শুধু তারা দুজন একা। তারপরে তারার ও হশ ছিল না। ওই অসহ্য পুরুষটার সাথে আজ একটা হেস্ত নেস্ত করেই ছাড়বে।
এই ভেবে তারা জামাটা রেখে চলে গেল ধ্রুব'র রুমের সামনে।
কোন প্রকার নক না করে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে দিয়ে রুমে ঢুকে গেল। দেখল রুমে কেউ নেই।
ব্যালকনিতে গেল খুঁজতে সেখানেও নেই। তারপর যে রুমে পা রাখল, তখনই ওয়াশরুমের দরজাটাও খট করে খুলে গেল।ধ্রুব ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসছে। তারা ধ্রুবকে দেখামাত্র হা হয়ে গেল। ধ্রুবর পরনে মাত্র একটা তোয়ালে জড়ানো ছিল।। সবে গোসল করেছে বলে চুলগুলো ভেজা মুছেনি। চুলগুলো দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। জিম করার সুঠাম শক্ত পোক্ত লোম হিন ফর্ষা বুক উন্মুক্ত । ফর্সা বুকের দুপাশে দুটো কয়লার ফোটা। তারা ধ্রুব'র বডি দেখে শুকনো ঢোক গিলল। চুলের পানি ফর্সা ঘাড় বেয়ে পাথরের ইস্পাতের মতো বুকে পরছিল, দেখে মনে হচ্ছে যেন গলিত স্বর্ন বেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বুকের বাম পাশে ওটা কিসের দাগ? দেখে তো মনে হচ্ছে কামরের দাগ। কেউকি কামড়ে দিয়েছিল ?
" ওই ড্রামা কুইনের বাচ্চা এখানে কি চাই? নক না করে আমার রুমে আসছিস কেন? আর এভাবর তাকিয়ে আছিস কেন পুরুষ মানুষ কোনোদিন দেখিস নাই নাকি?"
তারা আনমনে বলল,
" দেখেছি তো কিন্তু আপনার মত কোনদিন দেখিনি। আপনার এই মার্সেল গুলো কি সত্যি? "
ধ্রুব তারার তাকানোর ভাব দেখে তড়িঘড়ি করে একটা টি-শার্ট গায়ে পড়ে নিল। তারপর বলল,
" অসভ্য মেয়েছেলে, লজ্জা করে না তোর। মেয়ে হয়ে একটা ছেলের দিকে নজর দিস। আমার বডি কি মেয়েদের মত নাকি। এভাবে হা করে তাকিয়ে দেখছিলি। "
তারা তখন বাস্তবে ফিরে এলো। তারপরে গলায় আরেকটু জোর বাড়িয়ে বলল,
" আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আমি একজন মেয়ে আর আপনি একজন পুরুষ। আর তাই আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, একজন পুরুষ মেয়েদের বডি দেখে পুরুষের বডি না আর একজন মেয়েও পুরুষের বডি দেখে মেয়েদের বডি না। কারণ একজন মেয়ে জানে মেয়েদের বডি কিরকম দেখতে হয়। আর একজন পুরুষ ও জানে পুরুষদের বডি কেমন দেখতে হয়। তাই ছেলেমেয়ের উভয়েরই বিপরীত লিঙ্গের উপরে বেশি টান। "
ধ্রুব কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। চৌধুরী বাড়ির মেয়ে এত সেইমলেস। কিভাবে মুখের উপর এসব বলে দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে তো ধ্রুব'র সন্দেহ হয়, এ আসলেও মেয়ে তো? ধ্রুব দুপাশে মাথা ঝাকি মেরে আবার বিড়বিড় করে বলে, নানা এসব কি ভাবছি ছিহঃ।
গলা খাকারি দিয়ে ধ্রুব বলে,
"কী জন্য এসেছিস তাই বল? আজাইরা প্যাচাল পাড়ার সময় নাই।
" পরশুদিন রাতে আমার ড্রেস কে চেঞ্জ করেছে? "
তারার কথায় ধ্রুবর আপনা আপনি কাশি উঠে যায়। এই মেয়ে প্রশ্ন তাকে কেন করছে? তোর ড্রেস তো তরু বদলে দিয়েছে। তাহলে তাকে কেন জিজ্ঞেস করছে?
তারা এবার দ্রুত ধ্রুব'র কাছে গিয়ে বুক মালিশ করে দেয়। ধ্রুব'র অবস্থা আরো নাজেহাল। এই মেয়ে বোধহয় জন্ম নিয়েছে শুধুমাত্র ধ্রুবকে জালানোর জন্য। তারা ধ্রুবর খুব কাছে চলে যায়। এই মেয়ে সকাল সকাল এসে ধ্রুবকে নাজেহাল করে ছাড়ছে। এখন তো এত কাছে আসছে। এদিকে ধ্রুব'র অবস্থা খারাপ। ধ্রুব কোনো মতে বলে,
" দূরে যা দূরে গিয়ে কথা বল "!
তারা তখন ছিটকে দূরে সরে যায়। নিজের উপরে এবার খুব রাগ হয়। কিসব পাগলের মত উদ্ভট কাজকর্ম করে মাঝে মাঝে তারা? তা নিজেই ভেবে পাইনা।
"বলছি পর্রসু রাতে আপনি আমার ড্রেস চেঞ্জ করে দিয়েছিলেন কেন?"
" ইউ ম্যাড! তোর ড্রেস আমি চেঞ্জ করবো কেন? "
" তাহলে কে করেছে শুনি? বাই দ্যা ওয়ে, আপনি গাড়ির মধ্যে আমার সুযোগ নেন নি তো?"
এইবার ধ্রুব রাগ উঠে যায়। রাগে চয়াল শক্ত করে ফেলে, দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। কি বলছে এই মেয়ে? তাকে কোনোভাবে দুশ্চরিত্র বলছে। চরিত্রহীন ক্যারেক্টার লেস? চয়ল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ,
" হোয়াট ডু ইউ মিন? কি বলছিস তুই তোর মাথা ঠিক আছে? সকাল সকাল কি আবার মদ খেয়ে এসেছিস? আমি তো সুযোগ নেব মানে? এসব কথা তোর মাথায় এলো কি করে? তোর ড্রেস তো তরু চেঞ্জ করে দিয়েছে যা গিয়ে তরু কে জিজ্ঞেস কর। হাউ ডেয়ার ইউ? হু দ্যা হেল আর ইউ? আমাকে দুশ চরিত্র বলার তুই কে ? কে বলেছিল সেদিন মদ গিলতে? আমি বলেছিলাম তোকে? "
"মদ! মদ খেয়েছিলাম আমি? আমার তো কিছুই মনে নেই? আমি তো অন্য ভাইয়ের কাছ থেকে পানি খেয়েছিলাম। ওটা পানি ছিল কিনা জানিনা এমন জানি একটা খেতে ছিল। এটা খাওয়ার পর থেকে তোমার কিছুই মনে নেই। আজ সকালে আবছা আবছা কিছু কিছু মনে পড়েছে। আপনার কোলে উঠেছিলাম আমি। "
" হ্যাঁ আমার কোলে উঠেছিল। আমাকে পুরো নাজেহাল করে ছেড়েছিল। কিন্তু আমি তোর কোন সুযোগ নেইনি। এতটাও লম্পট আমি নই। একটা অসহায় মেয়ের সুযোগ নেব। ২৯ বছরের জীবনে কোনদিন কোন মেয়ে আমাকে এই ধরনের কথা বলতে পারেনি যা তুই আজ বললি। বেরিয়ে যা
আমার রুম থেকে আর কোনদিনও আমার রুমে আসবি না। তোর এই মুখটা আমাকে আর দেখাবি না। গেট লস্ট মাই রুম ওর মাই লাইফ! "
এই বলে ধ্রুব নিজেই তারার হাত ধরে দরজার বাইরে বের করে দিল। তারপর মুখের ওপর সজরে দরজাটা আটকে দিল।
তারা বন্ধ দরজার দিকে কিছু সময় চেয়ে রইল। নিজের মাথায় নিজেই একটা চাটি মারল। বিড়বিড় করে নিজেই নিজেকে বলতে লাগলো,
" তারা তুই কি কোনদিনও ভালো হবি না। আগামাথা কিছু না ভেবে কাউকে কোন কথা শোনাতে যাস কেন? মানুষটা তো রেগে গেল তোর উপর? রাগবারই তো কথা। তোর এই মুখটাকে একটু বন্ধ রাখতে পারিস না? সারাক্ষণ শুধু পটর পটর পটর পটর করেই যাস?নেশা করেছিলি তুই। আচ্ছা ধ্রুব ভাই কি সবাইকে বলে দিয়েছে? না বলেনি মনে হয়। কারণ নানীর বাচ্চা এখনো চুপ। না হলে তো এতক্ষণ সারা বাড়ি মাথায় করতো। "
(চলবে.....)