ফন্ট সাইজ:
থিম:
জটিল প্রেম

১ম পর্ব

লেখক: আসিফা খান

"আল্লাহ্ আমার ফোন নিয়ে গেলো! চোর।"

গ্রোসারি শপ থেকে সবেই বেরিয়েছে রুমি। হলদে শুভ্র চেহারায় কিছুটা ক্লান্তির ছাপ। চিকন বদনে পিঙ্ক সালোয়ার কামিজ পরিহিত। রিকশা চোখে পড়ছে না আশেপাশে তাই ভাবল হেঁটেই এগিয়ে যাবে কিছুটা। যে ভাবা সেই কাজ। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে রুমির মনে হল কেউ তার পিছন থেকে দৌড়িয়ে আসছে। যার গতি এতটাই দ্রুত যে রুমির কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ফোন ছিনিয়ে পালালো।

মুহূর্তের মধ্যে এহেন এক ঘটনার সম্মুখীন রুমিকে বাকরুদ্ধ করে ছাড়লো। হতবাক হয়ে রইল কিছু পল। যখন বুঝতে পারে তখন সামান্য চিৎকার করে উঠলো রুমি।

আশেপাশের মানুষ এগিয়ে এলো সাহায্যের জন্য। কেউ কেউ দৌড় লাগলো তার পিছে। রুমিও গেলো। কিন্তু সবাই কে অবাক করে দিয়ে চোরটি'র দেখা মিলল। হ্যাংলা, পাতলা এক ছেলে। বয়স তার কতই হবে এই ধরো ১৭ কিংবা ১৮। রুমি থমকে দাঁড়ালো। ছেলেটি মাথা নিচু করে এগিয়ে এসে ফোনটা রুমির দিকে বাড়িয়ে বলল,,,,

"মাফ করবেন আপা,,,ভুল হয়ে গেছে।"

রুমি এখনো বাকরুদ্ধ। এরকম হয় নাকি! চোর চুরি করে আবারো জিনিস ফেরত দেয়! এত এক অবিশ্বাস্য ঘটনা! রুমিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছেলেটি আবার বলে ওঠে,,,,"ফোনটা নিন না আপা। আমায় মাফ করে দেন।"

রুমি ফোন নিয়ে নিতেই ছেলেটি যেভাবে তখন দৌড় দিয়েছিল তার থেকে দ্বিগুণ দৌড় দিয়ে সীমান্ত ত্যাগ করে। রুমি আশেপাশে তাকালো। কিছু মানুষ যারা রুমিকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল তারা যেন কিছুটা হতাশ হয়। চোরকে ধরবে, মারবে, রাস্তায় একটা সুন্দর সিনক্রেট হবে। সেগুলোর মধ্যে কিছুই হলো না। তাও রুমি সবার দিকে তাকিয়ে মলিন একটা ধন্যবাদ জানায়।

দুই দিন পর ঝলমলে আকাশের দেখা পেলো ধরণী। গাছের পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু বারিকণা যেনো মুক্তার মতো চিকচিক করছে। হালকা নীল আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের ভেলা, ঠিক যেন হাওয়ায় মিঠাই। রাস্তার পাশে জমে থাকা জল প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিশাল আসমান এর।

এই পৃথিবীতে কোন কিছুই সহজ, সরল নয়। সব কিছুর মাঝেই জটিলতা দেখা যায়। কিন্তু এই জটিলতার মাঝেও রয়েছে এক অব্যক্ত অনুভূতি।

রুমি এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ কারোর ধাক্কায় পড়ে যেতে নিলে সামলে নেয় নিজেকে। সামনের দিকে তাকাতেই রুমি কিছুটা অপ্রস্তত হয়। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার দিকে ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকিয়ে আছে। জেনো রুমি ধাক্কাটা ইচ্ছে করেই মেরেছে। রুমি পাশ কাটিয়ে চলে আসতে নিলে শুনতে পায় পুরুষালি গম্ভীর,শক্ত কণ্ঠ,,,,

"রাস্তায় যখন চলাচল করতে পারো না,,, নিজেকে প্রটেক্ট করতে পারো না। তাহলে বেরাও কেন,রূপ দেখাতে? ওহ,,,সেটাও তো নেই।"

রুমির পা থেমে যায়। অপমানে চোয়াল কাপছে তার। জায়ান এর সম্মুখীন হতে চায় না সে কিন্তু তারপরেও বারবার এই মানুষটার সাথে তার দেখা হয়। রুমি জায়ান এর দিকে না তাকিয়েই বলে,,,,

"আমার কিছু নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না!"

জায়ান এই বার তির্যক হাসে। পৌরুষপূর্ণ সুঠাম দেহ তার। দুই পকেটে হাত পুরে টান টান হয়ে দাঁড়ায় রুমির সম্মুখে। মেয়েটা তার দিকে তাকাচ্ছে না, যা দেখে জায়ান এর রাগ এইবার আস্কারা পেয়ে মাথায় চড়ে। দাতে দাঁত পিষে বলে,,,,

"তোমাকে নিয়ে আমার ভাবার সময় নেই। যে থার্ড ক্লাস ফ্যামিলি থেকে তুমি বিলং কর সেই বাড়ির মেয়ের দিকে তাকাতেও আমার রুচিতে বাধে।"

কথাটা মিথ্যে। জায়ান আহমেদ খান মিথ্যে বলেছে। মেয়েটার প্রতি তার রয়েছে আসমান সমান আক্রোশ। এক অজানা জটিলতা থেকেই মেয়েটার সাথে তার এমন আচরণ। অনুভূতির জোয়ারে যেনো কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। পানি আর আগুনের কুন্ডুলিতে পুড়ে যায় হৃদয়।

রুমি মাথা তুলে না। চোখের কোন বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা। তার বুক কেঁপে উঠছে। মানুষটি এত অচেনা হল কবে! অবুঝ রুমি যখন জায়ান এর শাসনে অতিষ্ঠ, তার না বলা আদরে আকৃষ্ট। ঠিক তারপরেই বুঝদার রুমি পেল শুধু অবহেলা,কটূক্তি। আচ্ছা এই জায়ান ভাইয়া কি সেই মানুষটাই যে মানুষটা ছোটবেলায় তাকে এত আদর করত আগলে রাখত!! নাহ এটা সেই জায়ান নয়।এটা শুধুই একটি মানুষ,,যে রুমি কে সহ্য করতে পারে না। রুমি কম্পিত কন্ঠে বলে,,,

"আপনার রুচি সম্পর্কে আমি অবগত তাই চেষ্টা করি আপনার সামনের না আসার। কিন্তু আমার ভাগ্যটাই যে খারাপ,, বারবার অপমান সহ্য করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় আপনার সাক্ষাৎ।"

জায়ান চোয়াল দৃঢ় করে। রুমির সহ্য ক্ষমতা আরো দেখতে চায় সে। মেয়েটার দিকে কিছুটা ঝুঁকে,,,কর্কশ কন্ঠে তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বলে,,,

"এরকম ধাক্কাধাক্কি করলে পুরুষেরা আকৃষ্ট হয়! নাকি আকৃষ্ট করার জন্যই এরকম অজানা হওয়ার নাটক কর?"

এই বার রুমি নিজের লাল চোখে তাকায় জায়ান এর দিকে। হ্যাঁ এটাই তো চাইছিল জায়ান। মেয়েটা কে দেখার জন্যই তো এত কুটিল বাক্য ব্যয় করলো সে। রুমির পুরো শরীর কাপছে। এত ঘৃণা! যার বসে সামনের মানুষটি তার চরিত্রে আঙ্গুল তুলছে!

রুমি ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে বলে,,,,

"আপনাকে আমি আগে চিনতাম, খুব কাছ থেকেই চিনতাম। কিন্তু এখন আমি নিজেকে ভুল প্রমাণ করলাম। আপনি আসলেই ভালো মানুষ নন।"

জায়ান বাঁকা হেসে,,,ফিসফিস কন্ঠে রুমির চোখে চোখ রেখে বলল,,,"আমি খারাপ,,,ভীষণ খারাপ।"

রুমি এইবার হু হু করে কেঁদে ওঠে। জায়ান এর পাশ কাটিয়ে দৌড় দিয়ে জায়ান এর চোখ সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তখনই জায়ান এর সম্বিত ফিরে আসে। হঠাৎ করেই মনে হয় কেউ তার হৃদপিন্ড খামচে ধরেছে। নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো তার,চোখ মুখ কুচকে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো গাড়িতে হেলান দেয়। সামনের চুল চেপে ধরে গাড়ির দরজায় দেয় জোরদার লাথি। জায়ান যেনো নিজের মাঝে নেই।

"অগোছালো হলো সব। জটিলতার রাস্তা এত প্রশস্থ কেনো!"

---------------------

. পাত্রের সামনে মথা নুইয়ে বসে আছে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক পূর্ণাঙ্গ নারী। দৃষ্টি তার নত কিন্তু দৃঢ় তার মনোভাব। বয়স পঁয়ত্রিশ কিন্তু এই নারীটি'কে অনায়াসে সাতাস,আঠাস এর তরুণীর কাতারে ফেলা যাবে। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। সুন্দর,নীরব চেহারা। যে কেউ এই নারীকে পেতে চাইবে। কিন্তু এই নারী কি চায় তাহ কি কেউ বোঝে? বোঝে হয়তো কিন্তু মানতে নারাজ।

নারীটির পাশে বসে আছে এক বয়স্ক মহিলা। দামী শাড়িটি পাটে পাটে গুছিয়ে পড়া। মাথায় এক্সটা ওড়না দেওয়া। চোখে মুখে খুশির জোয়ার। বয়স্ক মহিলা কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে তার মনোকামনা পূরণের লক্ষ্যে সে কিছুটা এগিয়ে। আরো এগানোর জন্য শুধু একটা ' হ্যাঁ ' শব্দের দেরি। আর সেই শব্দ উচ্চারণ করবে তার মেয়ে। মহিলা'টি নিজ মেয়ের বাহুতে আলতো গুতা মেরে বলে,,,

"জারিন আকরাম সাহেব কে পকোড়া এগিয়ে দাও।"

"এগিয়ে দেওয়ার কি আছে মা! দেখছো না! না বলাতেই টেবিলের সব খাবার উনি তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছেন!"

সুস্থ অপমান। জারিন এর কথা শুনেই সামনে বসে থাকা উনপঞ্চাস বছর বয়সী আকরাম আলী হাতে থাকা বিস্কুটের প্লেটটি নিচে রাখলো। এরকম নয় তার জারিন এর কথা গায়ে লেগেছে! নাহ একদম লাগেনি। এই বয়সে এসে এমন সুন্দরী বউ পাবে কিনা। এটা কি একটুখানি কথা! সুন্দরী মেয়েদের জুতোর আঘাত ও অমৃত। সেখানেতো শুধুই জারিন অপমান করেছে। আকরাম আলী'র পেট টাইটুম্বুর। সকল নাস্তা সে একাই সাপাট করেছে। এইবার তুললো স্বস্তির ঢেঁকুর। হেসে উঠলো খ্যাক খ্যাক করে।

আনোয়ারা বেগম হাসার চেষ্টা করে বললেন,,,"কিছু মনে করো না বাবা,,,আসলে মেয়ে আমার সামান্য ঘাবড়ে আছে তো,,তাই অমন কথা বলেছে।"

জারিন নিজের মায়ের দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে বিতৃষ্ণা। আকরাম আলী দাঁত কেলিয়ে বলে,,,"কিছু মনে করিনি আম্মাজি। বিয়ের আগে একটু জেনে নেওয়া খারাপ কি!"

"সেটা অবশ্যই। আচ্ছা তোমার বাড়িতে কে'কে আছে।"

"আজ্ঞে আমার উনিশ বছরের মেয়ে সাফা,,,আমার বাবা আর আমার বড় বোন। আমার বউ মরেছে প্রায় দেড় মাস।"

দেড় মাস কথাটি এমন ভাবে উচ্চারণ করলো যেনো এক যুগের কথা বলেছেন তিনি। জারিন সবটা শুনলো মাথা গুঁজে। তার ভাষা নেই। একজন যুবতী মেয়ের বাবা কতটা নির্লজ্জ হলে আবার বিয়ে করতে আসে! তাও ফুল দমে।

জারিন হাতে হাত মুঠো করে ধরে। এখানে আর এক সেকেন্ড ও নয়। কিন্তু সে অসহায়। উঠতে পারবে না। তার মায়ের কসমে বাঁধা তার পা দুটো।

আকরাম আলী এবার লাজুক মুখে বললো,,,"আম্মাজী,,,মেয়ে আমার পছন্দ।"

আনোয়ারা বেগম খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে। আলহামদুলিল্লাহ্ বলে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে,,,"ওরে মিঠাই আনো,,, ঘর সাজাও।"

আকরাম আলী ফুলে উঠলেন। তার যে কি আনন্দ লাগছে। জারিন নিশ্চুপ। তার শরীরে যেনো প্রাণ নেই। আকরাম আলী জারিন এর চুপ থাকা মানতে পারছেন না। তিনি জারিন এর মিষ্টি কণ্ঠ শুনতে চাইছেন। সুন্দরী নারীর সুন্দর কণ্ঠস্বর শোনার জন্য তার কান খাড়া হয়ে আছে। কিন্তু এই নারীটি একটা কথাও বলছে না। আকরাম আলী এইবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। জারিনের কাছে নিজের ইম্প্রেশন বানানোর জন্য তৈরি তিনি। নারীটাকে একটু হাসাবে,,এই তার লক্ষ্য। আনোয়ারা বেগম আকরাম আলী'কে মিঠাই এগিয়ে দিলে তিনি দুটো মিঠাই দুই হাতে তুলে নিয়ে বলে,,,"আমার একটা প্রশ্ন আছে।"

জারিন বোঝে লোকটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাও মাথা তুলে না। আনোয়ারা বেগম আলতো হেসে বলে,,," অবশ্যই করো বাবা।"

"আচ্ছা,,,বলো তো মেয়ে,, ছাগলের কয় ঠ্যাং!?'

আশেপাশের সবাই অবাক। এটা কি প্রশ্ন! জারিন চুপ থাকে। তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সবাই কে অবাক করে দিয়ে উপরের করিডোর থেকে ভেসে আসে এক চঞ্চল কন্ঠস্বর,,,

"আরে আঙ্কেল জানেন না! ছাগলের ছয় ঠ্যাং।"

আসিফা'র কথাটি যেনো সৃষ্টি করলো সবার মনে কৌতূহল। ছাগলের ছয় ঠ্যাং ? কি ভাবে। সবার বিস্মিত,উতলা দৃষ্টি সেই চটপটে মেয়েটির দিকে।

সবার মনে প্রশ্ন। এদিকে সেই বেয়াক্কেল লোকটা' র ভ্রু কুঁচকে যায়। আগ্রহের সহিত বলে ওঠে,,,

"ছাগলের ছয় ঠ্যাং! কিন্তু সেটা কিভাবে? আমি তো জানি ছাগলের চার ঠ্যাং! ছয় ঠ্যাং কি করে, যদি একটু বুঝিয়ে বলতে মামনি।"

আসিফা দেয় এক শয়তানি হাসি। বিশাল জেনে গেছে কিছু,এমন ভঙ্গিতে রেলিং এ ঝুঁকে বললো,,,"why not uncle! আমি এক্সপ্লেইন করছি খুব সুন্দর করে। আপনার সমস্যার সমাধান করার জন্য আমি আসিফা তো এখানে আছি।।

শুনুন তাহলে,,,ছাগলের চার ঠ্যাং আর যে প্রশ্নটি করেছে তার দুই ঠ্যাং। এই মোট ছয় ঠ্যাং। ঠিক বলেছি না আঙ্কেল!"

আসিফা যেনো মহৎ কিছু করেছে,তার ভাব ভঙ্গি ঠিক তেমনি। জারিন মাথা নিচু করেই ফিক করে হেসে ফেলে। বাড়ির সবাই ঠোঁট চেপে হাসে। আনোয়ারা বেগম রাগী চোখ নিয়ে উপর দিকে তাকায়। । তার ছোটো ছেলের এক মাত্র মেয়ে আসিফা দাঁড়িয়ে সেখানে। চোখে মুখে দুষ্টামি উপচে পড়ছে। করিডোরের রেলিং ধরে একপ্রকার ঝুলে আছে মেয়েটা। হাতের চকলেটের প্যাকেট থেকে চকলেট কামড় দিচ্ছে আর দুষ্টু হাসছে।

এদিকে অপমানে আকরাম আলী জবুথবু।বেচেরা চেয়েছিল জারিনের মনোযোগ আকর্ষণ করবে নিজের প্রশ্ন দ্বারা কিন্তু উল্টে তারই ইজ্জতের রফাদফা হয়ে গেল। কিছু কথা বলে কেটে পড়ে সে। এখানে থাকা মানে পদে পদে অপমানিত হওয়া। শুধুই এই নারীকে এক বার বিয়ে করলেই হয়।

জারিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো। সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে নিলে আনোয়ারা বেগম বলে উঠলো,,,"এটা কি রকমের ব্যবহার জারিন! মানুষটা কি ভাবলো? হ্যাঁ!"

"তিনি কি ভাবলো সেটা আমি কি ভাবে জানবো!"

জারিন এর স্পষ্ট কথা। এখন নিজ মায়ের সামনে থাকা মানে কানের পোকা দের অকালে মেরে ফেলা। জারিন সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলো উপর। অবশ্য কিছু দূর গিয়ে দাড়িয়ে পড়ে,,,পিছে না ফিরেই আনোয়ারা বেগম এর উদ্দেশ্যে বলে,,,

"এই পৃথিবীতে মায়ের সম্মান সব থেকে বেশি, আমাকে সেই সম্মান'টা ধরে রাখতে দাও মা। এর পরে আমি এমন কোনো মাহফিল চাইনা। আমি একা ভালো আছি। আমার একাকিত্বের উপর জোর না দিয়ে, আমার ভালো থাকার উপর মনোনিবেশ করো,, তাহলে তুমিও ভালো থাকবে।।"

আনোয়ারা বেগম মুখ থমথমে রইলো।। মেয়ের উপর তিনি উদাসীন হতে পারেন না। একটা মা হিসাবে তিনি নিজের কর্তব্য পালন করতে চান। দুই ছেলের বিয়ে হয়ে তাদের বাড়ির সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক আর মেয়ে হয়ে এখনো জারিন অবিবাহিত।। আনোয়ারা বেগমের মন কাঁদে মাঝের মধ্যে। ভুলতে পারেনা এক যুগ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি। তার মেয়ে তো বউ সেজে ছিল, বাজনা বেজেছিল, ঘরও সেজেছিল, কিন্তু অবশেষে কি হলো!

আনোয়ারা বেগমের মুখের পরিবর্তন ঘটল আসিফার বেফাঁস কন্ঠে,,,"ওওওওও দাদিইই,,, চকলেট খাবে নাকি? আচ্ছা থাক তোমার আবার সুগার আছে।"

আনোয়ারা বেগম তেঁতে উঠলো। খিটখিটে কন্ঠে বলে উঠলো,,,"এই বেয়াদব,,নিচে নাম। তোর টোপে পড়া রস শেষ করবো আজ।"

আসিফা চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। যেন সে গোবরে পা রেখে ভুল করেছে। কানে হাত রেখে বলল,,,"ছিঃ ছিঃ দাদি। আস্তাগফিরুল্লাহ!! তুমি কি নাউজুবিল্লাহ মার্কা কথা বলছো? আল্লাহ,,,আমার কান এসব শোনার আগে ফেটে কেনো গেলো না!"

ঢং,,, আসিফা'র এই অভিনয়ে দাদি আর বেশী ক্ষেপে গেলো। চোখ মুখ কাপিয়ে বললো,,," বাড়িতে আসা মেহমানের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় জানিস না বেয়াদব! দাঁড়া তোর আব্বু আসুক আজ,,, ভাতার ধরাবো তোর।"

আসিফা দাঁত কেলিয়ে হাসলো। তার কিছুই যায় আসে না। দাদির সাথে তার সব সময় ঝগড়া লেগেই থাকে। আবার সেই দাদি'র কোলের কাছে গিয়ে শুয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটায় সে। আসিফা নাচতে নাচতে নিজের রুমে যেতে যেতে বলল,,,,

"আগে তোমাকে ভাতার ধরাবো আমি তারপর আমি ধরবো। দাদু পটল তোলার পর থেকেই এমন খ্যাপাটে হয়ে গেছো তুমি।"

এরই মাঝে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে খান বাড়ির বড়ো ছেলে জায়ান। শ্যাম সুন্দর মানব জায়ান আহমেদ খান। টানা চোখ,খাড়া নাক, দৃষ্টি আকর্ষণ কারী তার হাইট। চোখে মুখে নিয়ে বেড়ায় রাশভারী ভাব।সুঠাম দেহে পরিহিত ফরমাল পোশাক। শোরগোল তার পছন্দ নয়। ভীষণ শান্ত এবং মার্জিত ছেলে সে। অল্পস্বল্প কথায় নিজের বক্তব্য রাখতে পছন্দ করে। ছেলেটা'র ব্যাক্তিত্ব ভারিক্কি বুদ্ধিসম্পন্ন, অতিশয় দক্ষ ছেলে সে,খান বাড়ির সবাই জায়ান কে মান্য করে চলে। জায়ান এর হঠাৎ প্রবেশে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত প্রতিটা ব্যক্তি খানিক ঘাবড়ে যায়।

জায়ান ড্রইং রুমে একবার নজর বুলিয়ে নিজ দাদির দিকে তাকায়। আনোয়ারা বেগম জায়ানে'র সামনে নরম থাকে। প্রথম দাদি হবার সুখ এই ছেলের কাছ থেকেই তার পাওয়া। ভীষণ ভালোবাসে জায়ান'কে। নাতির প্রবেশে আনোয়ারা বেগম নালিশ সুরে বললেন,,,

" জানিস আসু কি করেছে!"

জায়ান জানে। সে আধা ঘন্টা যাবত বাড়ির ভিতর। কাঁচের দেয়াল রয়েছে ড্রয়িং রুম আর লিভিং স্পেস এর মাঝে। এই লিভিং স্পেসে যেমন বসার সুবিধা রয়েছে ঠিক তেমনি সেখানে কিছু খেলার সরঞ্জাম রয়েছে ক্যারাম বোর্ড সাথে আরো বেশ কিছু জিনিস। দাদির কথা শুনে জায়ান কিছু মুহূর্ত চুপ করে রাশভারী কন্ঠে বলে ওঠে,,,

"একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক ছাগলের মতো প্রশ্ন করলে উত্তরটাও ছাগলের মতোই দেওয়া উচিত। তাই না দাদি! আর রইল আসু'র কথা! আমার মনে হয় সে একদম সঠিক উত্তর দিয়েছে, তাকে আরো বেশি কিছু বলা উচিত ছিল। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের কাছ থেকে এরকম থার্ড ক্লাস প্রশ্ন আশা করাটা বেমানান।"

দাদি চুপসে গেল। মনে মনে ভাবে,,, তার এই গম্ভীর নাতির মুখ থেকে এমনি সময় একটা শব্দ শোনাও আহামরি ব্যাপার,,, কিন্তু আপন ছোট চাচাতো বোনের জন্য তার কথার শেষ নেই। দাদি রান্নাঘরে অগ্রসর হয়। সেখানে তার দুই বউ রান্নায় ব্যাস্ত। দুপুরে বাড়ির ছেলেরা ফিরবে লাঞ্চ এর জন্য। ইতিমধ্যে দেড়টা বেজে গেছে।

------------

জারিন এর নিষ্পলক দৃষ্টি সুদূর আকাশ পানে। জীবনের অন্যতম সুখের স্মৃতি'তে গুম তার হৃদয়। সেই দিন কেনো এলো না তার প্রিয়তম! সে তো অপেক্ষা করেছিল লালা বউ সেজে। তাহলে কেনো এলোনা তার ভালোবাসার মানুষটি! চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা পানি হঠাৎ কেউ সযত্নে মুছে ফেললো। জারিন ফিরে তাকাতেই দেখলো তার ভাতিজা জায়ান দাড়িয়ে। ফুপির কান্নার কারণ আন্দাজ করতে পারে গমগমে সুরে বলল,,,

"কার জন্য এই চোখের পানি! সেই প্রতারকের জন্য? যে কিনা নিজের জীবন সুখে কাটাচ্ছে!"

"ও বিয়ে করেছে?"

জারিন এর উদ্বিঘ্ন কণ্ঠ। জায়ান ক্ষীণ স্বরে বলল,,,"নাহ,,,"

#জটিল_প্রেম

#পর্ব_১

---------------------☞

(গল্প কপি করা নিষেধ। গল্প শেয়ার করতে হলে আমার পেজ থেকে সরাসরি শেয়ার করবেন!)

(গল্প:রোমান্টিক ধর্মী)

(নতুন গল্প। কাহিনীতে রয়েছে আরো চরিত্র সেগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসবে। কাহিনীতে বলা কাল, সময়, জায়গা এবং গল্প সবটাই কাল্পনিক। আমার কল্পনায় ভাসমান রাজ্যের খনি থেকে উঠিয়ে আনা এই গল্প। এই গল্পের সাথে অন্য কোন কিছুর মিল পেলে সেটা পুরোটাই কাকতালীয়।)

ক্রমশ

-----------------

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন