#পর্ব_৩৮
#জটিল_প্রেম
----------------------☞
(গল্প কপি করা নিষেধ।)
.
জায়ান নিঃশব্দে রুমির পাশে এসে দাঁড়ালো।। বাড়ি ভর্তি তখন খান আর শেখ পরিবার এর মানুষ জন।। এক সুখকর আবহ চারি পাশে।। দুপুরের রান্নায় হাত লাগিয়েছে দুই পরিবারের বৌরা,,, এ যেনো হুট করেই বয়ে আসা কোনো উৎসব। আয়োজন সাদামাটা কিন্তু এখানে ভরপুর ভালোবাসা।। দের,দুই ঘন্টা আগেই একটা পবিত্র কাজ সম্পন্ন হলো।। ছোটো বিয়ে বারাকাহ সম্পন্ন।। বড় আয়োজন হবে শুধুই আয়াজ এর দিকে থেকে,সেটা ছেলেটা পরিষ্কার ও স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছে।।
শান্ত চলে যেতেই রুমি দেখে ওর পাশে জায়ান। রুমি চলে যেতে চায় কিন্তু পরে না। কেনো জানি মন চাইলো না চলে যেতে...দাড়িয়ে রইলো বাহিরের দিকে তাকিয়ে। চোখে মুখে দৃঢ়তা তাও কোমলতা কোথাও যেনো! জায়ান সামান্য ঊমুহু করে গলা পরিষ্কার করে বললো,,,
"তোমার আমাকে কিছু বলার নেই!?"
রুমি হঠাৎ এহেন কথা শুনে কিছুটা চোখ ছোটো ছোটো করে,ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবার প্রয়াস চালিয়ে বললো,,,
"আমার কি কিছু বলার ছিলো আপনাকে!?"
জায়ান নিজের প্যান্ট এর দুই পকেটে হাত পুরে টানটান হয়ে দাঁড়ালো ওর মুখমুখী বললো,,,
"অবশ্যই,,,তোমার ভাই যে আমার আসু কে বিয়ে করলো আজ. তার পিছনে আমারও কিছুটা অবদান আছে।"
রুমি এইবার ললাটে ভাঁজ ফেলে,দুই হাত বুকে আড়াআড়ি ভাবে রেখে, সরু চোখে তাকিয়ে বলে,,,"তাই নাকি! আপনার অবদান সেই প্রথম দিন থেকেই,,,কারণ তাদের প্রেমের বাগড়া দেওয়ার প্রথম মানুষটা আপনিই ছিলেন।।"
এতক্ষণ জায়ান এর হাসি হাসি মুখটা চুপসে গেল। বেচারা গোলগোল চোখে তাকিয়ে রইলো রুমির দিকে। আচ্ছা সে কি মেয়েটার কাছে কখনও ভালো হবে না!! রুমি আরও একটু এগিয়ে জায়ান এর চোখে চোখ রেখে বলল,,,
"আমার ভাই আপনার বোনকে অন্তর দিয়ে ভালো বেসেছিল,,,তাই আপনার ফালতু কথা শোনার পর যতটা না উত্তেজিত হয়েছিল তার থেকে হাজার গুণ বেশি আসুর করা ইয়ার্কিতে হয়েছিল।। ভালোবাসা হারানোর ভয়ে কাল রাতেই আপনাদের বাড়ি আসার জিদ করছিল,,,অবশেষে আজ বিয়েও করে ফেললো।।
ভালোবাসায় অবজ্ঞা পাপ,,,আর যে এই পাপ করে তার ক্ষমা হয় না।"
শেষের কথা জায়ান এর বুকে যেনো খঞ্জর চালালো। ওর প্রশস্থ,পেটানো শরীর ঝিমঝিম করে উঠলো।। শুকনো ঢোক গিলে রুমির গভীর চোখে নিজের তীক্ষ্ম নজর রেখে বলল,,,
"তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো,,,তোমার ভাই ও প্রথমে পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসু'কে দূরে ঠেলে দিয়েছিল।।
রুমি তুমি জানো,,,এখানে অনেকেই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনেক কিছুর কুরবানী দিয়েছে।"
রুমি চুপ করে থাকে। জায়ান এর স্পষ্ট সত্য কথা,,,যা অস্বিকার করার কোনো উপায় নেই।।
জায়ান রুমির নীরবতা দেখে সান্নিধ্য অবলম্বন করলো মেয়েটার।। ঝুঁকে মেয়েটার নাকের কাছে নাক এনে অর্নিমেশ কন্ঠে বলে,,,
"তুমি বললে সারাজীবন এইভাবেই ঝুঁকে থাকবো তোমার নিকট।। একবার কাছে থাকার অধিকার দিয়ে দেখো...জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড তোমার নামে লিখে দেবো।"
রুমি ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। চারি পাশ কেমন উত্তাল হয়ে এলো।। বুক দুরদুর করছে মেয়েটার।। জায়ান কেমন হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মত কথা বলে।।
জায়ান মেয়েটার গালে হাত রাখে। কেমন এক মাতাল বাতাস বইছে। ছেলেটার কোনো দিকে খেয়াল নেই। ও যেনো হারিয়ে এই মেয়েটার মাঝে।।
জায়ান ধির স্বরে আওড়ায়,,,
"তোমার এই গোল গোল চোখে আমার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আমি কিন্তু কবুল বলে ফেলব।।
এমনিতেও.....আশে পাশে সব জোড়া জোড়া আর মাঝখানে আমি কপাল পোড়া।। মায়া লাগে না আমায় দেখে!?"
জায়ান কথাটি কিছুটা রসিকতা করে বললো।। এদিকে রুমি ওর কথা শুনে মনে মনে হাসছে। পেট ফেটে হাসি আটকিয়ে রাখলো কোনো রকম। রুমি ঠোঁট চোকা করে চূ চূ শব্দ করে জায়ান এর গালে আঙ্গুল ছুঁইয়ে বলে,,,
"তাই নাকি!! তাহলে নিদাহ কে বিয়ে করে নিন,,, এমনই ওনার হাসি নাকি ক্যান্ডি ক্রাশ এর মত,,,তো সারাজীবন সেটাই খান"
শেষের কথাটি রুমি চোখ মুখ শক্ত করে জায়ান কে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে চলে গেল চপল পায়ে। এদিকে জায়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এ মেয়ে নাকি আগুনের গোলা।। জায়ান রুমির উদ্দেশে জোর কন্ঠে বলল,,,
"আরে ওর হাসি নিমপাতা,,, সত্যিই বলছি। রুমি,,,এই মেয়ে...."
সেই রুমি আর কোই! এদিকে জায়ান দুই কোমড়ে হাত রেখে মাথা উল্টে রুদ্ধ শ্বাস ফেলে বলে,,,
"সূর্যমুখী,,,অনেক ঝাঁজ তোমার।। আমার ঝাঁঝালো জিনিস পছন্দের...একদম মানুষকে কাহিল করে ছাড়ে। যেমন আমি প্রতিটা মুহূর্তে হচ্ছি।"
কিছু পল চুপ থেকে জায়ান কপাল ঘোষে আকাশের দিকে তাকিয়ে অসহায় স্বরে বলে,,,"ওহহ আল্লাহ তুমি আমার কপালে কোন গ্রহ চালাচ্ছ! যাই করি তাই উল্টা,,,একটু শান্তি দাও।"
জায়ান কথা গুলি বলে শেষ করার সাথে সাথেই কারোর ফিক করে হেসে ওঠার আওয়াজ পেতেই জায়ান পিছে ফিরে দেখে শান্ত দাড়িয়ে। বেচারা মুখ চেপে আছে। জায়ান ছোটো ছোটো চোখে ওর দিকে তাকালে শান্ত বলে,,,
"হাসলে কি পাপ হবে ভাইয়া! তাহলে একটু হাসতাম।"
শান্তর কথা শুনে জায়ান তাচ্ছিল্য হেসে বলে,,,"হাসো তুমিও হাসো,,তুমি কেনো বাদ যাবে?? বান্ধবী তো তোমার,,,জীবনটা তেজ পাতা করে দিলো মেয়েটা।। ওই চার ফুট দশ ইঞ্চির মেয়ে আমার নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে!! ভাব দেখায় এমন যেনো প্রিন্সেস ডায়ানা,,,মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হয় কাঁধে তুলে নিয়ে নাচি,,,যেমন আমায় নাচাচ্ছে।"
জায়ান যেনো প্রোলাব বলছে। ছেলেটা পায়চারি করছে,অশান্ত হয়ে নিজে নিজের সাথে কথাবার্তা চালাচ্ছে। এদিকে শান্ত ঠোঁট চেপে হাসি সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো,
“ভাইয়া, এবার থামুন প্লিজ,,"
জায়ান থেমে ওর দিকে তাকালো। চোখে লালচে রাগ নয়, বরং মিশ্র এক ক্লান্তি আর হালকা হেরে যাওয়ার গন্ধ। হুড়মুড় করে বললো,,,
"কেনো থামবো,,,তুমি নিজেই বলো আমি কি একটাও ভুল বলেছি?"
শান্ত এবার একটু সিরিয়াস হয়ে তাকাল। মাথা নাড়ে,,,চোখের ইশারায় কিছু একটা দেখিয়ে বলে,,,
"আমি কিছু বললে আমার মাথা ফাটাবে।"
জায়ান ভ্রু কুঁচকে বলে,,,"কে?"
"যে আপনার পিছে দাড়িয়ে,,,"
জায়ান কিছু বোঝে। গাল হা করে অতপর চোখ খিঁচে বন্ধ করে আবার খুলে শান্তর দিকে তাকিয়ে বলে,,,"নো"
"ইয়েস ভাইয়া"
"সত্যিই!"
"তিন সত্যি,,,"
বলেই শান্ত হাওয়া। এদিকে জায়ান ওপরওয়ালা কে ডাকতে ডাকতে পিছন ফিরে দাঁড়ালো।। চোখ পিটপিট করে তাকাতেই দেখলো রুমি কে।। কেমন শাণিত চোখে দেখছে। যেনো চোখ দিয়েই গিলে খাবে জায়ান কে। মুখে রাগের ছাপ নেই, কিন্তু একরকম বাঁক ঠোঁটের কোণে। দু’হাত ক্রস করে বুকের কাছে রাখা। জায়ান শ্বাস টেনে কিছু বলবে তার আগেই রুমি এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,,,
"কে আপনার জীবন তেজপাতা করেছে! আমি?"
জায়ান ত্বরিত না ইশারায় মাথা নাড়িয়ে বলে,,,"ন...নাহ তো,,,কে বললো এই কথা!?"
"চার ফুট দশ ইঞ্চির মেয়ে আমি? নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাই আপনাকে!"
"একদম না,,,তোমার হাইট আমার থেকে দুই ইঞ্চি বেশি,,,আর নাকে দড়ি দিয়ে কি ভাবে ঘোরাবে! আমি কি গরু!!"
"আমি প্রিন্সেস ডায়ানা!?"
"তার থেকেও বেশি সুন্দর"
"আমায় কাঁধে নিয়ে নাচবেন,,, তাই না!?"
"নাহ,,,বুকে নিয়ে"
রুমি এইবার একদম জায়ান সান্নিধ্যে দাঁড়ালো। ছেলেটার বুক কাঁপলো কি!! হ্যাঁ মনে হচ্ছে। কেমন ধকধক করছে।। চোখে চোখ মেলে দুই জনের।। তারা জানে এই তারা.... চাঁদ তারা।। আলাদা তারা হবে না,,, কখনই না। তাও কোথাও একটা দ্বিধা। এত দিন এর তিক্ততা হুট করেই উবে যেতে পারছে না। তাও অনুরাগ অনুভবে গেঁথে আছে।।
রুমি এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। চারপাশে বাতাস ভারি।। তাদের দু’জনের নিঃশ্বাস যেন বাতাসে মিশে যাচ্ছে।রুমি হঠাৎ বলল নিচু স্বরে,,,
"জায়ান, কি চাইছেন!?"
জায়ান ঠোঁট কামড়ে বলল,,,"তোমাকে!?"
"যদি না পান!?"
"মন থেকে কিছু চাইলে পাওয়া যায়,,,আমি অপেক্ষা করতে রাজি"
একটা অস্বস্তিকর নীরবতা এল। রুমির হৃদ মাঝারে ঠান্ডা বাতাস বইছে। তার রাগ অভিমান সব গোলেছে কবেই তাও নিজেকে শক্ত করে রাখার এত দিনের চেষ্টা যেনো মিশে যাচ্ছে বাতাসে।।
জায়ান এবার মেয়েটার দিকে আরো এগিয়ে যায়। ওর চোখে গভীরতা। ভারী গলায় বলে উঠল,
"রুমি,তোমায় হারালে বুক খালি হয়ে যাবে আমার,,,আমি নিঃস্ব হয়ে রয়ে যাবো কোথাও।"
রুমি চুপ। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে মেয়েটার।চোখ ঝিলমিল করছে।। এক অদ্ভুত মিশ্র আবেগে দুলছে তার মন। ঠোঁট কাঁপিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই জায়ান নিজের শাহাদত আঙুল ওর ঠোঁটের ওপর রেখে ঘণ স্বরে বলে,,,
"বুকের বাম পাশ তোমার নামেই রাখা। তুমি এসো,,, আস্তে, ধীরে,সময় নিয়ে,,,আমি আছি এখানেই তোমার ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য। যতই সময় লাগুক আমি ধৈর্য ধরবো,,,কিন্তু শেষটা যেনো তুমিই হও"
রুমির সর্ব শরীর থরথর করে উঠলো। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে কিছু লামহা তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। হঠাৎ কিছু না বলে চলে গেলো মেয়েটা। তবে এবার পায়ে আগের সেই চপলতা নেই, কোথাও যেনো একটু ধীরতা, একটু থেমে যাওয়া।
জায়ান একটু হাসে। নিচু গলায় বলে,,,
“এই মেয়ে আমার ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছে..."
----------------
দুপুর দুটো। খাওয়ার টেবিল সাজানো হয়েছে। যেখানে নানান পদের খাবার রাখা। সুস্বাদু,লোভনীয় ঘ্রাণে জিভে জল আসবে যেনো।। খান বাড়ির টেবিলে এক সাথে দশ জন বসে খাওয়া যায়। মুরুব্বী সহ, মধ্য বয়স্ক পুরুষ মানুষ দের আগে খাওয়ানো শেষ করে বসলো মহিলা মানুষ সহ ইয়াং পাঁচ জন। জায়ান,রুমি,আসিফা, আয়াজ, শান্ত সাথে অবশ্যই রাফাজ জারিন।। খাওয়া দাওয়া শেষ হলো খুনসুঁটি পূর্ণ ভাবে। হাসি,আড্ডা ছিলো খাওয়ার টেবিলেই।।
এদিকে আসিফা লজ্জায় একাকার। শাড়ি পড়ে যেনো টুকটুকে বউ লাগছে। নতুন নতুন কিছু ঠেকছে তার। কেনো মনে হচ্ছে আজ ঘুম থেকে উঠেই সে নতুন জীবনে পা দিয়েছে। একদম স্বপ্নের মত। যেই জীবনে তার হাত ধরার সঙ্গী তার ভালোবাসার মানুষ,তার প্রথম অনুভব, তার প্রথম প্রেম, তার প্রথম অনুরাগ। মাথায় আঁচল দেওয়ার সুবাদে মেয়েটাকে অনন্যা প্রতিত হচ্ছে।। আয়াজ সবার সামনেও লুকিয়ে দেখতে ভুলছে না নিজের নব বিবাহিতা স্ত্রী'কে।। চোখ চাইছে মেয়েটাকে অপলক দেখে যেতে, হাত চাইছে একবার ছুঁয়ে যেতে, বাকি আকাঙ্ক্ষা পরে,,, নীরবে ,নিভৃতে।।
আয়াজ সবার সামনেই এক টুকরা মাংস ওর মুখের সামনে ধরলে সবাই মিটি মিটি হাসে। আসিফা গাল লাল করে মাথা নিচু করে বলে,,,
"আমি খাচ্ছি তো"
"হ্যাঁ সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।"
অতঃপর আয়াজ আসিফার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,,,"খেতে দেননা ওকে আম্মা!?"
ভদ্র মহিলা হতাশ সুরে বলল,,,"বেশি ভাত দিলে তুলে দেয়,,,খেতে চায় না, বলে মোটা হয়ে যাবে। এবার তোমার হাভালে দিলাম,,, দেখো মেরে ধরে খাওয়াতে পারো কি না!!"
আয়াজ তার শাশুড়ি মায়ের কথায় মাথা নাড়িয়ে মেয়েটার দিকে সংগোপনে ঝুঁকে কাঠকাঠ গলায় বলল,,,"মোটা তুমি হবেই,,,খেয়ে নাহলে অন্য ভাবে।"
আসিফা ফট করে ওর দিকে তাকালো।। মানুষটা আবার নিজের মত খাচ্ছে। জামাই মানুষ ছেলেটা তাই ওর পাত খালি যাচ্ছে না। পাত খালি নেই রাফাজের ও। দুই চাচা ভাতিজা খান বাড়ির জামাই বলে কথা। খান বাড়ি নিজের জামাইদের সেবা যত্নে নিখুঁত অবশ্যই।। জায়ান ইচ্ছে করে আয়াজ এর পাতে এটাসেটা তুলে দিচ্ছে।। আয়াজ কটমট করে তাকালে জায়ান কুটিল হেসে বলে,,,
"তোর বড় শালা আমি,,,চোখ নামিয়ে সম্মান দে।।"
আয়াজ ফট করে জায়ান এর পেটে ঘুষী দিয়ে,, পেষণ কন্ঠে বলল,,,"আচ্ছা তাই নাকি! মনে রাখবি আমিও কারোর বড় ভাই."
জায়ান পেটে ব্যাথা পাওয়ার জায়গায় হাত ডলে,বলে,,,"তোরা দুই ভাই বোন এরকম ডাকাত কেনো!! শালা,,,মানে তোকে শালা ডাকার জন্য অনেক কসরত করতে হবে,,,আপাতত তুই আমাকে সন্মান দে,,"
"ভাগ,,,"
"ছোটো মা,,,ইলিশের বড় পিস্ টা আয়াজ এর পাতে দাও,,,ছেলেটা চাইতে লজ্জা পাচ্ছে,,"
বলেই শয়তানি হাসি দিয়ে জায়ান উঠে গেলো। এদিকে আয়াজ হা হয়ে রইলো। লজ্জা পেলো ছেলেটা। কি ভাবছে সবাই? আয়াজ টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে যেতে বলল,,
"জায়ান এর বাচ্চা,,"
এদিকে জায়ান দৌড়,,,পিছে আয়াজ ও।। দুই সুঠাম দেহের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ দের মাঝেও রয়েছে কৈশোর ভাব। সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো। হেসে উঠলো সবাই।। যেনো তারা দেখছে সেই ছোটো জায়ান,আয়াজ দের।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই ড্রয়িং রুমে বসে। আসিফা অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ করছে যে রুমি তার সাথে কথা বলছে না। আসিফা রুমির গা ঘেঁষে বসে। রুমি সরে যেতে নিলেই মেয়েটা ওর হাত ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,,,
"রাগ করিস না প্লিজ,,,"
"ছাড় আমার হাত।। তলে তলে টাইটানিক চালাবে আমার ভাই এর সাথে আর বিয়ে করবে অন্য কাউকে!?'
"আরে তুইও ওটা সিরিয়াস নিয়েছিস? আমি মজা করেছিলাম,,, সত্যিই বলছি"
রুমি এইবার ছোটো ছোটো চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,,,"তোদের খান বংশ কে বলে! তোদের নাম দেওয়া উচিত প্যারা বংশ।। এই সত্যি করে বলতো,,, তোদের দুই ভাই বোনের মাথায় কি ছোটো বেলায় চোট লেগেছিল?"
আসিফা ভ্রু কুঁচকে ভেবে বলে,,,"দাভাইয়ের মাথায় চোট লেগেছিলো কিনা সেটা উনিই ভালো বলতে পারবে,,,কিন্তু ছোটো বেলায় দুষ্টামি করার জন্য মাম্মা গ্লাস ছুঁড়ে আমার কপালে মেরেছিল। দেখ দেখ এখনও নিশান আছে"
বলেই কপালের কিনারে চুল সরিয়ে দেখলো আসিফা। রুমিও তাহ দেখলো,,,অতপর সেখানে আঙ্গুল চেপে সিরিয়াস হয়ে বলে,,,
"এবার বুঝেছি"
"কী?"
"তোর সব বুদ্ধি এই জানালা দিয়ে পালিয়ে যায়,,,তাই তো শুধু মাথায় বদমাইশি ঘোরে।"
আসিফা এইবার ছোটো ছোটো চোখ করে তাকিয়ে রইল রুমির দিকে। এদিকে রুমি হাসছে খিলখিল করে। দুই বান্ধবীর খুনসুটি চলল বেশ।। তার মধ্যেই জায়ান এর ইম্পর্টেন্ট কল আসে। আয়াজ আর জায়ান দের একটু সাইডে যেতে হবে,,,আরো একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু হয়েছে তাদের।। জায়ান বেরিয়ে যায় বিদায় নিয়ে। এদিকে আয়াজ সবার আড়ালে আসিফা কে উপরে ডেকে নিজে মেয়েটার রুমে চলে যায়।।
আসিফার অন্তরে দামামা বাঁজছে।। সে ধীর পায়ে হাঁটছে। নিশ্বাস ভারী হলো তার,,,মনে পড়লো সকালের কথা আর সাথে সাথেই চিকন শরীর সাপের মত ঠান্ডা হয়ে গেলো।। রুমের সামনে দাঁড়ানোর পরপর আয়াজ ওকে টেনে ভিতরে নিলো,,,দরজা বন্ধ করে দিলো।। আসিফা গোলগোল চোখে ওর দিকে তাকাতেই আয়াজ বাজখাঁই স্বরে বলে,,,
"এত দেরি হয় আসতে?"
আসিফা চোখ নামিয়ে বলে,,,"আসছিলাম তো,,,"
"ডাকার সাথে আসতে হবে,,,কথার সাথেই কাজ হবে। দেরি আমার পছন্দ না,,,আর সেটা তুমি আজ ভালই বুঝতে পেরেছো।"
আসিফা মিনমিন করে বলে,,,"আপনি কি স্ট্রিক্ট হাসবেন্ড হবেন?"
আয়াজ মেয়েটার গলার ভাঁজে হাত রেখে ওকে নিজের দিকে টেনে এনে বলে,,,"হব,,,আমার কথা না শুনলে আরো বেশি স্ট্রিক্ট হাসবেন্ড হবো। কেনো? তোমার অসুবিধে?"
আসিফা ঠোঁট উল্টে বলে,,,"আমি সব সময় একটা সফট, কাম,লাভি,ডিসেন্ট হাসবেন্ড চেয়েছিলাম।"
আয়াজ ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপ হাসি আর সরু চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে।। মেয়েটা যেমন চায় সে কি আদো ওরকম হতে পারবে? পারবে না। মেয়েটার বেলায় সে চরম অভদ্র,অশান্ত এবং হার্ড। মেয়েটা তাকে সামলাতে হিমসিম খাবে,তার প্রণয় ব্যাথায় কাদবে, আর সব শেষে তার বুকে মাথা রেখে আরামের আবেসে নিদ্রায় মগ্ন হবে। মেয়েটার সাথে তার জীবন কাটবে স্বপ্নের মত,যেখানে ভালোবাসা থাকবে,,,রাগ অভিমান থাকবে। থাকবে আস্থা, দায়িত্ব,আনুগত্য,যত্ন আর আকাশ পরিমাণ প্রণয়।।
মেয়েটা তার রঙ্গিন প্রজাপতি। একটা সাধারণ,চঞ্চল,প্রাণবন্ত মেয়ে তার হৃদয়ে গেঁথে বসেছে। মেয়েটার মায়া ছড়িয়ে পড়েছে অন্তর জুড়ে। এই অনুভূতি যেনো থাকে আমৃত্যু। থাকবে,,,ইনশা আল্লাহ।। আয়াজ এই ফিল্টার ব্যবহার করা কৃতিম দুনিয়ায় পেয়েছে একটা সহজাত,প্রাকৃত মেয়ে। যার কোনো রকম ভনিতা নেই ,,যা আছে তার সামনেই।।
আয়াজ কিছুক্ষন অপলক তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। মেয়েটার চোখ নামিয়ে রাখা। লজ্জা পাচ্ছে কি!! আয়াজ ঘন স্বরে মেয়েটার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললো,,,
"তোমার ভাষ্য মতন আমি তো হতে পারব না আসু। তোমার বেলায় আমি বড়ই বেপরোয়া। তুমি জানো, দেখেছো আজ যে,আমি কেমনভাবে তোমায় ভালোবাসি।"
আসিফা একটু চমকে গেলো। চোখ তুলে তাকালো আয়াজের চোখে। সেখানে কিছু ছিল যা মেয়েটার অন্তর ঝালাফলা করে দিলো।
"আমি কেবল তোমার জন্য পাগল। আর পাগলরা যেমন হয়, আমিও ঠিক তেমন তোমার বেলায়। রাফ এন্ড টাফ আমার রোমান্স। ডিসেন্ট সময় সাপেক্ষে। তোমাকে নিয়ে আমার হোক রাগ, হোক ভালোবাসা,,সবকিছুই চরমে। সফট কিছু পারি না।"
আসিফার গলা শুকিয়ে এলো। ঠোঁট কেঁপে উঠলো, কিন্তু কিছু বললো না। আয়াজ ধীরে ধীরে সান্নিধ্য বাড়ালো।। ওর হাতের অবাধ্য স্পর্শ মেয়েটার শাড়ীর আড়ালে,উন্মুক্ত কোমড়ে। আসিফা চোখ বন্ধ করে। আয়াজ ওর শাড়ির আঁচল সরিয়ে ফেলে দিলো। কাঁধ,গলায়, বুকের কাছে নিজের দেওয়া চিহ্ন গুলো একবার ছুঁয়ে দিলো। ব্যাথা,,, কেঁপে উঠলো মেয়েটা। অতপর মেয়েটার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,,,,
"I like everything hard, darling."
আসিফা এইবার মুখ লুকিয়ে ফেললো আয়াজ এর বুকে। ছেলেটা হেসে ফেলে।। মেয়েটাকে মুড়িয়ে নিলো নিজের সহিত। সময় কাটলো গভীর ভাবে।। আয়াজ এইবার ওকে দাড় করিয়ে শাড়ীর আঁচলটা ঠিক করে মাথায় চাপিয়ে অপলক কিছুক্ষণ দেখে বলল,,,
"সুন্দর লাগছে তোমায়,,,পাখি।"
আসিফা লাজুক হাসে।। আয়াজ এইবার কিছুটা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল,,,
"কিছু কথা,,,তুমি আমার হালাল বউ, তোমার উপর আমার যতটা অধিকার আছে ততটা আর কারোর নেই। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী আমার অর্ধেক অংশ। এখন থেকে তোমার ভালো-মন্দের দায়িত্ব আমার। তোমার সমস্তটা আমার সাথে শেয়ার করবে আর অবশ্যই শান্ত ছাড়া অন্য কোন ছেলে ফ্রেন্ড তোমার আশেপাশে আমি দেখতে চাই না।। কোনো রকম,কোনো কথা আমার থেকে লুকাবে না,,,এই লুকোচুরি পরে সম্পর্কে টানাপড়ার সৃষ্টি করে। কখনও কোনো বিষয়ে খারাপ লাগলে বা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হলে সেটা এক সাথে সমাধান করব না হলে সেটা পরে সম্পর্কে তিক্ততা বাড়িয়ে দেয়। আমি কি বোঝাতে পেরেছি?"
আয়াজ নিজের নব বিবাহিতা স্ত্রীকে যেনো বিবাহ সুখী দাম্পত্য জীবনের মূলমন্ত্র গুলি শেখালো।। আসিফা সমস্ত কিছু শুনে মাথা নাড়িয়ে বলে,,,
"আপনি আমাকে বিবাহিত জীবনের পাঠ শেখাচ্ছেন!?"
"এখনও পুরো শেখানো হয়নি।।"
আসিফা কৌতূহলী হয়ে তাকালে আয়াজ মেয়েটার নরম কোমল ঠোঁট নিজের অধর ছোঁয়ালো নানান ভঙ্গিমায়। যেনো সে চুমুর'ও পাঠ শেখাচ্ছেন।। আসিফা চোখ বন্ধ করে ভারী নিশ্বাস ত্যাগ করে। নিশ্বাসের ঘাটতি অনুভব হলো,,, আয়াজ শেষে শক্ত চুমু এঁকে মেয়েটার দিকে তাকালো। হাঁফিয়ে শ্বাস টেনে হাস্কি স্বরে বলল,,,
"এটা হলো মূল পাঠ। আমার স্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে যাও মেয়ে,,,আমি মোটেও তোমায় ছাড় দেবো না।।
যখন,যেমন ইচ্ছে তেমন করে আদর করবো আর তোমাকে সবটা সহ্য করতে হবে। আমি না শুনবো না,,,কোনো ভাবেই না।।"
রুমে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। ঘরের ভেতর, দুটো মানুষ একে অপরের ভালোবাসায় গলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে… নীরবে। আসিফা শরমে গোলে পানি হয়ে যাবে যেনো।। সে পারে না হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে।।
আয়াজ ওর দুই গালে হাত রেখে বলে,,,
"I have to go,,, রাতে আসবো। তোমার বাড়ির সবাই আমাকে থাকার কথা বলছে কিন্তু আমি থাকবো না,,,তোমাকে আগেই জানিয়ে দিলাম।"
"কেনো থাকবেন না!?"
আয়াজ দুষ্টু হেসে বলে,,,"তুমি চাও আমি থাকি!? থাকলে কিন্তু আমায় থামানো যাবে না,,,একদম হার্ড ড্রা*ইভ করবো,,,তারপর কেঁদেও কুল পাবে না!? এবার বলো থাকবো!"
আসিফার কান হতে গরম ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। এই ছেলে এতটা বেলাজ? জানা ছিল না। আসিফা শুকনো ঢোক গিলতে লাগলো। আয়াজ কেমন দুরন্ত নজরে তাকিয়ে।। আসিফা মিহি স্বরে বলে,,,
"ন... নাহ। নাহ মানে..."
"থাক এত মানে মানে করতে হবে না। নয়টার মধ্যে রেডি থাকবে,,,রাতের ডিনার বাহিরে করবো।।"
আসিফা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। আয়াজ ওর ললাটে আদুরে চুমু এঁকে বেরিয়ে যায় আর রেখে
যায় এলোমেলো আসিফা কে।।
দুপুর বিকাল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা।। আলোচনায় পুরো খান আর শেখ বাড়ি শুধু উপস্থিত নেই আয়াজ আর জায়ান। ছুটির দিনেও তারা আটকা পড়েছে কোনো কাজে। তাদের ছাড়াই চলছে কিছু আলোচনা রাফাজ আর জারিন এর রিসিপশনের। জারিন নিজের ভাবীদের সাথে। এই আলোচনা তাকে লজ্জা দিচ্ছে।। আসিফা আর রুমি বসে আছে রুমে। শান্ত বিকাল এর দিকেই চলে গেছে।।
"আসু আমি তোর এখন কে বলতো?"
আসিফা চোখ ছোটো ছোটো করে বললো,,,"বাঁধাকবি।"
রুমি এতক্ষণ চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলো কিন্তু আসিফার কথা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসলো।
"আরে এখন বলতে তোর আর ভাইয়ার বিয়ের পর আমি তোর কে হই সম্পর্কে!?"
আসিফা মাথা চুলকিয়ে বলে,,,"ননদ!"
"এক্সাকলি ননদ,,,তুই জানিস ননদেরা কি করে!?"
আসিফা বোকার মত মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। রুমি কুটিল হেসে বলল,,,"ননদেরা তাদের ভাবীদের জ্বালায়,,,বিরক্ত করে,,,বিনা কারণে ভাই আর ভাবির মধ্যে ঝগড়া বাঁধায়,,,তাদের প্রাইভেট মুহূর্তে ব্যাঘাত ঘটায়।।"
আসিফা চোখ বড় বড় করে বলে,,,"সত্যিই!?'
"হ্যাঁ,,,"
"কিন্তু আমার ফুমাও তো আমার মা, বড় মা'দের ননদ,,,উনি কিন্তু কখনও ওরকম করেনি।"
রুমি নাক কুঁচকে বলে,,"আরে উনি তো ভালো,,,কিন্তু আমি,,,আমি কিন্তু মোটেও ভালো না।"
আসিফা কিছুক্ষন রুমির দিকে তাকিয়ে বলল,,,"তার মানে তুই বলতে চাইছিস যে তুই খারাপ ননদ হবি। আমায় জ্বালাবি, বিরক্ত করবি, আমার আর ওনার মাঝে ঝগড়া লাগাবি! লাইক সিরিয়াসলি!?"
রুমি কনফিডেন্স নিয়ে বলে,,,"ঠিক বলেছিস"
আসিফা তাচ্ছিল্য হেসে বলে,,,"যে মেয়ে আমার সামান্য লুজ মোশানে আমার মা হয়ে,আমার মাথার ওপরে উড়তে থাকে, সে নাকি আমায় আবার জ্বালাবে"
"তোর বিশ্বাস হচ্ছে না!?"
আসিফা ঠোঁট বাঁকিয়ে মাথা দুলিয়ে বলল,,,"নাহ"
"দাঁড়া,,,"
রুমি ফোন বের করে সোজা আয়াজ কে কল করে। দুই সেকেন্ড পর কল রিসিভ হয়। আয়াজ বলে,,,
"হ্যাঁ বল বনু"
রুমি কলটা লাউড স্পীকারে দিল ,,অতঃপর আসিফের দিকে তাকিয়ে শয়তানি হেসে আয়াজ কে বলতে লাগলো,,,
"ভাইয়া আসু বলছে তুমি নাকি কিপটা।"
"কিই?"
এদিকে আসিফা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রুমির দিকে।। রুমি আরও বললো,,,"আসু বলে তুমি নাকি কিপটা তাই জন্য তো ঘরোয়া ভাবে বিয়ে করে টাকা বাঁচিয়েছো ,আরো বলে তুমি নাকি আনরোমান্টিক। তাই তো বিয়ের দিনেই বউ ফেলে তুমি কাজে চলে গেছো। আরও অনেক কথা,,,ভাইয়া আমি আবার এই সমস্ত কিছু শুনতে পারছি না তোমার নামে,,, আমার বান্ধবী হলে কি হবে,,,আমি তো তোমার বোন আগে,,,তাই না!!"
আসিফা যেনো বাক্য হারা। রুমি এই গুলো কি বললো! এদিকে রুমি কুটিল হাসছে। আয়াজ সব কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে বলে,,,"ও কি সত্যিই এরকম বলেছে!?"
"বলেছে ভাইয়া,,,"
"কোথায় ও এখন!?"
"আমার পাশে,,,"
"আমার কথা শুনতে পাচ্ছে!?"
"পাচ্ছে ভাইয়া,,"
"ওকে বল আমি দের ঘণ্টার মধ্যে আসছি,,, ও যেনো রেডি থাকে।। বাদ বাকি রাতে একাকিত্বে বোঝাবো।"
বলেই কল কাটলো আয়াজ।। এদিকে আয়াজ এর শেষের কথা শুনে রুমি নিজেই লজ্জায় পড়ে যায়। তাও নিজেকে ঠিক রেখে বাকবাকুম বনে যাওয়া আসিফার দিকে তাকালো। মেয়েটা এখনো বিস্ময়ে অভিভূত। কি হলো এতক্ষণ,,,যখন বুঝলো তখন বালিস নিয়ে মারতে লাগলো রুমি কে। রুমি হো হো করে হাসছে।।
"আরে ননদ কে মারছিস পাপ হবে কিন্তু,,,"
আসিফা রুমিকে মারতে মারতে বলে,,,"হোক পাপ,,,"
"আরে আমাকে না মেরে আগের ডিসাইড কর যে কি পড়বি ,,,ভাইয়া কিন্তু চলে আসবে দেড় ঘণ্টার মধ্যে আর এসে যদি তোকে রেডি না পায় তাহলে,,,,"
রুমি কাঁধ নাচায়। আসিফার গলা শুকিয়ে গেলো। আয়াজের সেই হৃদয় নিংড়ানো কথা তার কানে বাজছে।। সে থেমে গিয়ে থম মেরে বসে যায়। রুমি উঠে বসে চুল ঠিক করে বলে,,,
"কি হলো!?"
আসিফা ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,,,"আমি যাবো না"
"আচ্ছা দাড়া আমি ভাইয়া কে বলি,,,"
বলেই ফোন হাতে নিলেই আসিফা সেটা কেড়ে নিয়ে বলে,,,"মার খাবি"
"আচ্ছা আচ্ছা বলবো না,,, কিন্তু যেতে তো তোকে হবেই,,,"
আসিফা কিছুটা চিন্তিত হয়ে বললো,,,"কি পড়বো!?"
"শাড়ি,,,"
"না না আর শাড়ি পরবো না,, সকাল থেকে এই শাড়িটা পরে আছি এখন চুলকাচ্ছে,,,"
রুমি দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না ইশারা করে বলল,,,"শাড়ি তো তোকে পড়তে হবে আর সেটা তোর আলমারিতেই রাখা আছে।। তুই কি জানিস, ভাইয়া পাঁচদিন আগে আমাকে সাথে করে নিয়ে প্রায় তেরোটা শাড়ি কিনেছে তোর জন্য।ওর নাকি হঠাৎ তোর জন্য শাড়ি কিনতে মন চাইছিল তাই আর কোন দিকে না তাকিয়ে কিনে ফেলেছে।।
আজ বিয়ের প্ল্যান নিয়েই ও তোদের বাড়িতে এসেছিলো,,,তোর সামান্য একটা মজা ভাইয়া কে এলোমেলো করে দিয়েছিল। আজ যদি বিয়ে না হতো তাহলে ও তোদের বাড়ির সামনে থেকে যেতই না এমনটাই ওর মাথায় ছিলো। যাক,,শেষে আল্লাহর রহমতে বিয়ে হলো তোদের।। আসু,,,ভাইয়া সত্যিই তোকে ভালোবাসে।।"
শেষের কথাটি রুমি খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল।। আসিফাও সব কিছু শুনে স্তব্ধ।। ও পিটপিট করে তাকিয়েই আছে রুমির দিকে। মেয়েটার মনে প্রজাপতি উড়লো ডানা মেলে। আহা,,,কেউ তাকে কতটা মরিয়া হয়ে ভালোবাসে! আসিফা লাজুক হাসে,,মাথা নিচু করে নেয়। রুমি এবার বিছানা থেকে নেমে যেতে যেতে বলল,,,
"ওয়ে লজ্জা পাবি বরের সামনে। আয় তোকে রেডি করিয়েদি,,,ভাইয়া লেট কাজ একদম পছন্দ করে না।।"
রুমি শাড়ীর প্যাকেট বের করে।। একটা কালো রঙের সিফন শাড়ি। একদম সিম্পেল কাজ করা,, ব্লাউজ ও কালো,ফুল হাতা।। আসিফা শাড়িটি দেখলো ভালো করে। একদম সিম্পল এর মধ্যে নজর কাড়া সুন্দর।। রুমি বলে,,,
"পছন্দ কিন্তু ভাইয়ার,,,সব শাড়িই ও নিজে পছন্দ করে কিনেছে।।"
আসিফা শাড়ি ছুঁয়ে দেখলো ভালো করে।। অতপর রুমি ওকে সময় নিয়ে ভালো করে শাড়ি পরিয়ে দিল। একদম মিনিমাল কিছু ওরানামেন্টস,চোখে কাজল আর ঠোট হালকা লিপস্টিক আর সাথে খোলা চুল ব্যাস এতেই মেয়েটাকে অত্যাধিক সুন্দর লাগছে।। আয়নায় নিজেকে একবার ভালো করে দেখলো,,,সুন্দর লাগছে।। শাড়ি অতি পাতলা না হলেও ভালো করে দেখলে একটু পেট কোমর দেখা যাবে,,,যদিও শাড়িটি অনেক শালীন ভাবেই পড়া।।
রুমি ওকে সাজানোর শেষে বললো,,,"শাড়ীর আঁচল মাথায় রাখ,,,ভাইয়া ক্রাউড কোনো জায়গায় যাবে না,,,তাই নো চিন্তা।।"
আসিফা মাথা নাড়ায়।। এর মাঝেই আসিফার ফোন কল আসে। আয়াজ নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।। এইবার মেয়েটার মনে দুরদুর শুরু হয়।
রুমিকে এক বার হাগ করে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।। রুমি হাসে,,,মনটা উচ্ছ্বাস হয় তার।। ভালোবাসা দেখতেও ভালো লাগে।।
এদিকে শেখ বাড়ির মানুষ আধা ঘন্টা আগেই ফিরে গেছে।। খান বাড়ির সবাই অত্যাধিক রিকোয়েস্ট করার পরেও তারা আর থাকবে না। আসমা সুলতানার ভাইরা নাকি আসছে,,,তাই তাদের ফিরে যেতেই হবে।। শেখ বাড়ির সবাই যাওয়ার আগে রুমি কে ডাকেনি। ভেবেছে বান্ধবী বান্ধবী সময় কাটাচ্ছে,,থাক।। এদিকে রুমি আর নিচে নামে না। শান্তর দেওয়া নোটস দেখতে থাকে,,, আসিফার বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো।। কোমর পিঠ ব্যাথা হচ্ছে তার।।
----------
আয়াজ এর পরনে একটা কালো রঙের পাঞ্জাবি আর জিন্স।। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে ফোন ঘাটছে ছেলেটা।। হঠাৎ কারোর এগিয়ে আসার আভাস পেয়ে চোখ তুলে তাকালো আর সঙ্গে সঙ্গে একটা হার্টবিট মিস হলো তার। সটাং হয়ে দাড়িয়ে ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিলো ছেলেটা।
মেয়েটা কুচি, আঁচল সামলিয়ে এগিয়ে আসছে,,, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল পিছন দিকে ঠেলে দিচ্ছে বারবার।। কাজল কালো আঁখি নিয়ে যেই না আয়াজ কে দেখলো তখনই অন্তরে দামামা বাজলো।
শাড়ির ভাঁজে লুকানো সেই লাজুক সৌন্দর্য, খোলা চুলের ঢেউ আর চোখে ছায়া পড়া কাজল সব মিলিয়ে যেনো এক পরিপূর্ণ চিত্রকল্প। মেয়েটা কে সত্যিই এত মুগ্ধকর লাগছে নাকি মেয়েটা তার ভালোবাসার মানুষ এজন্য বেশি চিত্তাকর্ষক ঠেকছে!!
এমন তো নয় যে, আয়াজ এর আগে কখনো সুন্দরী মেয়ে দেখেনি।তবুও আসিফাকে ভালোবেসে ফেলার পর যেন আর কোনো মুখেই আলো খুঁজে পায় না সে। এই প্রাণবন্ত, চোখে ভাষা মাখা মেয়েটাই তার একমাত্র অনুরাগ, তার প্রেম, তার ভালোবাসা।
আয়াজের চোখ ধীরে ধীরে নিচ থেকে ওপরে উঠলো। তার চোখের দৃষ্টি আটকে গেলো আসিফার কোমরের পাশ দিয়ে হালকা দেখা যাওয়া ত্বকে।
সে ঠোঁট কামড়ে নিজের প্রতিক্রিয়া আড়াল করার চেষ্টা করলো কিন্তু চোখে একরাশ মুগ্ধতা লুকাতে পারলো কোই!!
সে ধীরে ধীরে মেয়েটার দিকে এগিয়ে এলো। অতপর ওর হাত টেনে ধরে নিজের সান্নিধ্যে দাঁড় করলো।। চোখে চোখ রেখে ওর কানের কাছে আলতো ঝুঁকে ফিসফিস করে সুধায়,,,
"এই শাড়ি আরেকটু পাতলা হলে আমাদের ঘুরতে যাওয়া ক্যানসেল হয়ে যেতো আসু,,,
আসিফা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো
ও বুঝেছে ছেলেটার কথার অর্থ। আজ যেনো এই ছেলেটাকে একদম অন্যরূপে উদ্ভব করছে আসিফা। আয়াজ নিজের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি টেনে মেয়েটাকে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,,,
"Let's go, for our first date, even after our wedding!"
আসিফা সিটে বসে। আয়াজ ওর সিট বেল্ট লাগিয়ে দেয় একদম ওর দিকে ঝুঁকে। আসিফা সেই সময় আয়াজ এর চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলল,,,
"It seems like this is all a fantasy."
আয়াজ মুচকি হেসে ওর কপালে চুমু এঁকে বলে,,,
"fantasy না আসু,,,এটা স্বপ্নের থেকেও সুন্দর বাস্তব। যেখানে তুমি আছো,আমি আছি আর আছে এক সমুদ্র প্রেম।"
আসিফা হাসে,,, শীতল মোলায়েম হাসি।। তার ভিতরটা উষ্ণ হয়ে যায়। আয়াজ ড্রাইভিং সিটে বসে। গাড়ি স্টার্ট দেয়।। তাদের গন্তব্য আজ নদী।
-------
জায়ান নিজের রুমের দিকে যেতে নিলে ছেলেটা থেমে যায়।। আসিফা নেই সেটা সে জানে কিন্তু রুমে লাইট ফ্যান চলছে,,,দরোজা ভিড়িয়ে রাখা। জায়ান হাত ঘড়ি দেখে,,,এখন বাজে রাত নয়টা আট।। জায়ান প্রথমে নক করে,,পড়ে কোনো রকম উত্তর না পেয়ে নিজেই রুমে প্রবেশ করে দেখলো বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ঘুমিয়ে রুমি।। মেয়েটা যায়নি!!
হাতে কিছু নোটস মেয়েটার।। এক কাঁধে ওড়না ঝুঁকে আছে ফ্লোরে,,, আধশোয়ার কারণে ওর বিউটি বোন স্পষ্ট,,,গলা, কাঁধ,বুক এর ত্বক দেখা যাচ্ছে ভীষন ভাবে।। অবাধ্য চুল মেয়েটার মুখে এসে ভিড় জমাচ্ছে।। জায়ান কিছুক্ষন অপলক তাকিয়ে রইলো রুমির দিকে,,,ওর গলা শুকিয়ে আসছে।। মেয়েটার ঘুমন্ত অবস্থাতেও তাকে বেহাল করে দিচ্ছে।।
জায়ান ধির পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলো। ওর হাত থেকে নটস নিয়ে টেবিলে রাখলো।। ওকে সোজা করে বালিশে শুইয়ে,,,চাদর টেনে শরীরটাকে ঢেকে দিলো সে।। অতপর ওর মুখে পড়া অবাধ্য চুল সরিয়ে কপালে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিলো জায়ান।। মেয়েটা জানলো না এই স্পর্শের কথা,,,অনুভব করলো এই নরম চুমু।। আচ্ছা জেগে থাকলে মেয়েটা নির্ঘাত ওকে দেখে তেঁতে উঠত। বলতো,,,আপনি পাষাণ জায়ান। কথা গুলো ভেবেই জায়ান হাসে।
"এই ঘুমন্ত স্নিগ্ধ মুখটা দেখার পর কেউ বলবে এই মেয়ের মাঝে কতটা তেজ আছে!! কতটা কঠোরতা,সাহসিকতা রয়েছে! আমি তোমার প্রতিটা রূপে সমাহিত সূর্যমুখী,,,তোমার প্রতিটা কথায় আমি নিস্তেজ।।"
একদম মিহি কন্ঠে কথা গুলি আওরালো জায়ান। ছেলেটা সোজা হয়ে দাড়ালো। আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে সে পাগল হবে তাই ঝটপট বেরিয়ে যায় রুম থেকে। আপন মা, চাচী দের বলে দেয় রুমি আছে,,,তাকে ডিস্টার্ব না করতে।। তারাও রুমির কথা শুনে খুশি হয়।
----------
আসিফা দের গাড়ি এসে থামলো।। আয়াজ নিজে নেমে ওর দিকে দরোজা খুলে দিলো। আসিফা শাড়ীর কুচি সামলিয়ে নেমে দাঁড়ালো।। আশপাশ কেমন শুনশান নীরবতা। ঠান্ডা,মন্দ বাতাস বইছে শাঁ শাঁ করে । মেয়েটা ভীত হলো খানেক। ওর চোখে ভয় দেখে আয়াজ এক হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে মাথার উপর চুমু এঁকে বলে,,,
"ভয় পাচ্ছো?"
আসিফা মাথা তুলে আয়াজ এর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে,,,"হুম,,, কোথায় আমরা এখন?"
আয়াজ মেয়েটার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,,,"In the land of the sky"
আয়াজ ওর চোখের উপর হাত রাখলো,,,"আমার সাথে সাথে হাটো পাখি"
অতপর দুই জনেই এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। আয়াজ এর পদচারণ অনুভব করছে আসিফা। ছেলেটার কাছ থেকে ভেসে আসছে একটা নেশালো ঘ্রাণ।। পায়ে পা মিলিয়ে,প্রশস্থ বুকের সাথে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে মেয়েটা হাঁটছে। ধীরে ধীরে হওয়ার গতি বাড়াতে লাগলো,,,একটা মিষ্টি শীতল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে দেহে। সাথে ভাসছে আয়াজ এর পারফিউম এর ঘ্রাণ। কানে আসছে পানির ঢেউরের শব্দ। আসিফা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। আয়াজ নিজের হাত সরিয়ে নিতেই আসিফা চোখ পিটপিট করে অতপর চোখ মেলে সামনে তাকাতেই দেখলো বিশাল নদীর তীর।।
এটা সেই জায়গাটাই যেখানে আয়াজ নিজেকে এবং নিজের অনুভূতিকে মেলে ধরে ছিলো,অপেক্ষা করেছিল আসিফার জন্য। আসিফা অবাক হয়ে চেয়ে রইলো কিছুক্ষন,,,আকাশে চমকাচ্ছে তারকা মেলা,,, চাঁদ দেখা দিচ্ছে উকি দিয়ে। প্রতীত হচ্ছে আকাশ মিশেছে নদীর মাঝে। ঝকমকে পরিবেশে তারা দুই প্রেম পাখি ছাড়া আর কেউ নেই। নীরব কিন্তু স্নিগ্ধ।।
আসিফা দেখলো নদীর ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটা ছোট নৌকা।। নৌকার শেষ মাথায় খুঁটির সাথে বাঁধা একটা ঝুলন্ত,হলদে আভার ফানুস লাইট।। নৌকার আনাচে কানাচে জারবেরা ফুল আটকানো। কি যে মুগ্ধকর।
আসিফা পাশে তাকিয়ে দেখলো আয়াজ নেই। ছেলেটা ইতি মধ্যে নৌকায় মাঝির জায়গায় বসেছে,,,আসিফা অবাক হয়ে এগিয়ে গেলো। ওর আঁচল উড়ছে।
"আসো ভ্রমণে যাই।"
আসিফা বিস্মিত সুরে বলল,,,"নদীতে!! আপনি চালাবেন নৌকা!?"
"অফকোর্স ডার্লিং,,,কেনো ভরসা নেই!?"
আসিফা কৌতুক সুরে বলল,,,"ইঞ্জিনিয়ার'রা মাঝির পদ নিলে, মাঝিরা কোথায় যাবে?"
আয়াজ ঠোঁট কামড়িয়ে হেসে বলে,,,"বউ এর জন্য সব। মাঝি, শেফ,টিচার আর আশিক।। আশিক মানে প্রেমিক। তুমি শুধু আমায় প্রেমিক হিসেবে দেখো বাকিটা আমি সামলে নেবো।"
আয়াজ মেয়েটার হাত ধরে ওর সামনা সামনি বসালো। অতঃপর ছেলেটা বৈঠা টানলো। নৌকা ভেসে যেতে লাগলো সামনের দিকে।। আহা এ যেনো স্বপ্ন,,,রূপকথার গল্পের মত।। নৌকা যখন তীর থেকে বেশ দূরে চলে এসেছে অমনি আয়াজ বৈঠা ছেড়ে একদম মেয়েটার সান্নিধ্যে এসে বসে।।
আসিফা খানিক ভয়ে পেলে আয়াজ অভয় দিয়ে বলে,,,
"ভয় নেই আসু,,,আমরা সেফ জোনের মধ্যে। আর আমার পারমিশন নেওয়া,,,সাথে ইনফর্ম করা। Don't worry about it... You just feel that moment."
কথা গুলো বলতে বলতে আয়াজ নিজের পাঞ্জাবির পকেটে হতে একটা ছোট বক্স বের করে। সেথা থেকে একটা এক পাথরের সিম্পল আংটি। আয়াজ ধীরে ধীরে মেয়েটার বাম হাত নিজের হাতের মাঝে নিলো,,, অতঃপর অনামিকা আঙুলে সেই আংটি পরিয়ে দিতে দিতে মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
"তোমাকে আমার হয়েই থাকতে হবে আসু,,, শুধু আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে,,,আমার অফুরন্ত ভালোবাসা নিজের মধ্যে যত্ন করে রাখতে হবে।।
চিৎকার করে ভালবাসি বলতে পারব না,,,তুমি অনুভব করে নেবে। ধীর স্থির ভাবে আদর করতে পারব না,,,তোমাকে আমায় সামলাতে হবে।। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমাকে আমার পাশে চাই,,,আমার কাছে চাই। আমার প্রতি তোমার এক বিন্দু অবহেলা ও আমি মেনে নেব না।। এটাকে আমার দাবি বলো, হুমকি বল কিংবা বলো অনুরাগ,,,তুমি শুধুই আমার।"
আয়াজ এর কথার মাঝে কি ছিলো!! এত প্রখর ভালোবাসার দাবি ছেলেটার।। এতো নিরেট,নিখুঁত প্রকাশ্য ধাঁচ।। যেখানে ছাড় নেই মোটেই,,,নেই কোনো উপেক্ষার রাস্তা। এরকম ভালোবাসা কোন নারী ফিরিয়ে দিতে পারে!! কে পারে!! আসিফার চোখ ভিজে উঠলো। ফট করে আয়াজ কে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে মুখ লুকিয়ে বলল,,,
"আমি তো আপনার কবেই হয়ে গেছি আয়াজ।"
"আরো হওয়া বাকি আছে বোকা মেয়ে।"
আয়াজ ওর দুই গালে হাত রেখে ওর ঠোঁটের মাঝে ডুবে গেলো।। আসিফা চোখ বন্ধ করে রইলো। ওর ছোটো দেহ খানা কাপছে থরথর করে।। আয়াজ শাড়ি ভেদ করে ওর মুক্ত কোমরে হাত রাখল।। ধীরে ধীরে বেসামাল হলো ছেলেটা। সময়টা যেন থমকে গেল কোথাও। আকাশের চাঁদ ধীরে ধীরে লুকিয়ে গেল কালো মেঘের আবরণে, তারা গুলো বুঝি লজ্জা পেল। ভালোবাসা বুঝি এত সুন্দর!
আসিফা হাঁফিয়ে উঠল। আয়াজ রমণীর কপালে গালে চোখে কানে থুতনিতে কোথাও চুমু দিতে ভুললো না।। ছেলেটার চোখ জ্বলছে মেয়েটাকে আরো সান্নিধ্যে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু নিজেকে সামলে নিলে ছেলেটা। কোন রকম মেয়েটার চুল ঠিক করে ওর কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলল,,,
"কেমন লাগলো সারপ্রাইজ!?'
আসিফা লাজুক হাসে বলে,,,"একদম কল্পনার মত।"
"তাই নাকি!!'
আসিফা মাথা নাড়িয়ে বলে,,,"আপনি আমার ড্রিম পুরো করলেন আজ,,,"
"তোমার সমস্ত ড্রিম পুরো করার দায়িত্ব আমি নিলাম।"
আসিফা ওর বুকে মাথা রেখে আকাশ পানে তাকালো।। সময় এর স্রোত বয়ে গেলো।। তারা কথা বলল,,,খাপছাড়া। সময়টা বেশি দিল একে অপরকে অনুভব করার, বোঝার।।
"আসু,,,"
"হুম"
"এই নদী যতটা গভীর হয়তো তাঁর থেকেও বেশি গভীর আমার ভালোবাসা তোমার জন্য।। কবে এতটা ভালোবাসলাম তোমায়!! আমি জানিনা। সত্যি জানিনা,,, শুধু আমি জানি তোমাকে আমার লাগবে।সারা জীবনের জন্য।। ভালোবাসা যদি কোন নাম পেত,, তাহলে আমি বলতাম,, তার নাম ' তুমি'।।"
আসিফা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো।। যে ছেলে একটা সময় তার ভালোবাসাকে পাগলামি বলে উপেক্ষা করেছিল আজ সেই ছেলেই কিভাবে তার প্রতি নিজের ভালোবাসার বর্ণনা দিচ্ছে।। ধৈর্যের ফল পেয়েছে মেয়েটা। আসিফা ঠোঁট ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলে,,,
"কেঁদে দেবো এবার,,,এত সুন্দর কথা বলেন কি করে!!"
আয়াজ হেসে কাঁধ নাচিয়ে বলল,,,"কি জানি! বেশি প্রেম প্রেম পেলে মনে হয় এরকমই কথা বের হয় মুখ থেকে!"
"ধুর"
আয়াজ মেয়েটাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে কানের কাছে মুখ নিয়ে গেয়ে উঠলো,,,
"Hum Tum kitne paas Hai kitne
dur hai Chand sitare
Sach poochho to Man Ko jhuthe
lagte Hain yah sare
Magar sacche lagte Hain
Ye Dharti, ye rahana , yah Nadiya
"Aur"(আসিফা)
"Aur Tum"
বলেই হেসে উঠলো আয়াজ সাথে আসিফা।। এই নিস্তব্ধ নদীর মাঝে, দূর দূরান্ত পর্যন্ত গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল দুই নরনারীর সুখ ভরা হাসির শব্দে।। দেখালো আকাশ, দেখল চাঁদ।। তারা যেন এমনই থাকে, এমনই প্রেমময় শান্তিময় হোক তাদের বাকি জীবন।।
ধীরে ধীরে আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করল।। এখন আবহাওয়ার ঠিক-ঠিকানা সেরকম নেই বললেই চলে।। ঘড়িতে তখন বাজে রাত ১১ টা ২০। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হল আয়াজ জলদি বৈঠা ঘোরালো,, তারা বেশি দূরে ছিল না তাই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ার আগেই তীরে এসে থামল তাদের নৌকা।। তারা নেমে দাঁড়াতেই আকাশ ফেটে বৃষ্টি শুরু হল মুহূর্তেই ভিজে গেল দুই নরনারী।।
মেয়েটার শাড়ি একদম লেপ্টে গেল শরীরের সাথে।। উঠানামা মেয়েলি বদন স্পষ্ট ছেলেটার চোখে।। আয়াজ দ্রুত ওর সামনে এসে দাড়ালো।। আসিফা লজ্জায় একাকার।। নিজেকে ঢাকতে ব্যাস্ত।। ঠিক তখনই আকাশের মাঝে বিদ্যুৎ চমকালো।। বিকট শব্দ শুনে আসিফা ভয়ে এক ঝটকায় আয়াজ কে জড়িয়ে ধরল।। ছেলেটা যেন এবার উন্মাদ হয়ে যাবে।।
তাও নিজেকে ধাতস্ত করে মেয়েটা নিয়ে এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে।। শোনা গেলো সামনের রাস্তায় গাছ পরে রাস্তা ব্লক। কাল সকাল পর্যন্ত রাস্তা ঠিক হবে না। এদিকে আসিফা ঠান্ডায় কাপছে।। আয়াজ দ্রুত গাড়ি ভাগালো বিপরীত রাস্তায়।। গুগল ম্যাপ দেখে জানা গেল কিছুটা দূরেই রয়েছে একটা হোটেল।।
----------
হোটেলটা অতিরিক্ত অভিযাত্যপূর্ন না হলেও বিস্তীর্ণ এরিয়া জুড়ে হোটেল এর বাউন্ডারি। পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি থামিয়ে আসিফাকে নিয়ে নেমে এলো আয়াজ। তখন ও বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝমিয়ে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বিকট শব্দে। এখন আবহাওয়াটা এমন,কখন ঝড় কখন বৃষ্টি আবার কখন ঝিলিমিলে আকাশ তাহ্ বলা ভারী মুশকিল।।
দুই নরনারী নিজের শরীর ভিজিয়ে এগিয়ে চলল।। হোটেলের রিসেপশনে আসিফাকে দাঁড় করিয়ে নিজেই রিসিপশনিস্ট এর সাথে কথা বলতে লাগলো।। এইখানে মানুষজনের আনাগোনা আছে,,, হয়তো প্রায় টুরিস্ট কিংবা রাস্তা বন্ধ হওয়ার চক্করে করে তারা এখানে।।
"One room, for one night."
রিসেপশনের মেয়েটা মিষ্টি হেসে বলল,,,"sure sir... May I know your identity please."
"Yah,,, it's my id card and she is my Mrs asifa Ayaz Shaikh."
আয়াজ নিজের ভোলেট থেকে তার আইডি কার্ড বের করে রিসেপশনিস্ট কে শো করে। মেয়েটা আসিফের দিকে একবার তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলে,,,
"Ma'am is completely wet, sir."
"Yes for unwanted rain."
মেয়েটা কম্পিউটারে কিছু মুহূর্ত টাইপিং করে অতঃপর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আয়াজ এর দিকে কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবে বলে,,,
"স্যার আসলে সমস্ত কাপল রুম থেকে শুরু করে সিঙ্গেল রুম বুকট,,, বাট আমাদের একটা প্যাকেজ আছে সেটা চাইলে নিতে পারে।"
"কেমন প্যাকেজ!?"
"স্যার হানিমুন প্যাকেজ।। আপাতত সেটাই এভেলেভেল বাদ বাকি সব রিজার্ভ।"
মেয়েটার কথা শুনে আয়াজ একবার পিছে ফিরে আসিফার দিকে তাকালো। মেয়েটা মাথা নিচু করে, জড়সড় হয়ে কাপছে সিক্ত দেহে। আয়াজ এক পল ও দেরি না করে হ্যাঁ বলে দেয়।। আজ প্রকৃতি তাদের কাছাকাছি আনতে চাইছে। আয়াজ মনে মনে হাসে। রিসেপশনিস্ট এর কাছ থেকে কার্ড নিয়ে এগিয়ে যায় সেদিকে।। মেয়েটাকে নিয়ে লিফ্ট এ ওঠে। আসিফা বলে,,,
" আজ আমরা এখানে থাকবো!?"
"হ্যাঁ,,,রাস্তা ব্লক আসু,,,আজ এখানেই থাকতে হবে।।"
"বাড়িতে সবাই টেনশন করবে"
"নাহ,,,আমি চাচু আর জায়ান কে ম্যাসেজ করে দিয়েছি।"
আসিফা সন্তুষ্টির শ্বাস ছাড়ে। লিফ্ট থার্ড ফ্লোরে থামতেই তারা বেরিয়ে কোনার রুমের দিকে অগ্রসর হয়। দরজায় ডিজিটাল লকে কার্ড এন্টার করতেই দরজা খুলে গেলো।। প্রথমে আসিফা পরে আয়াজ প্রবেশ করে ডোর লক করে।।।
এদিকে আসিফা রুমে ঢুকে পুরাই অবাক।।
রুমটা একদম স্বপ্নের মতো। ক্রিম রঙে সাজানো দেয়ালগুলোতে ঝুলছে স্নিগ্ধ পেইন্টিং, যেগুলো রোমান্সের নীরব প্রতিচ্ছবি। ছাদ থেকে নামানো পাতলা সিল্কের পর্দা যেন বাতাসে দুলে মৃদু ভালোবাসা ছড়াচ্ছে।
গোলাকার বিছানা। সাদা ও মেরুন রঙের কভার আর গোলাপের পাঁপড়িতে ছেয়ে আছে। বালিশের মাঝে রাখা দুটো সাদা তোয়ালে পাখির আকৃতিতে ভাঁজ করা। একপাশে কাচের বড় জানালা,,, যেখান থেকে লেক এবং বহুদূরের নদীর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
ঘরের এক কোণে ছোট্ট একটি টেবিল, তাতে দু’গ্লাস শ্যাম্পেইন আর চকোলেট-ডিপড স্ট্রবেরি সাজানো। আরেকদিকে ওপেন ওয়াশরুম।। সুগন্ধিতে পুরো রুম মোমো করছে।।
সুঘ্রাণ যুক্ত মোমবাতির আলোয় পুরো রুম যেন এক মোহময় পরিবেশে ঘেরা। এমন পরিবেশ যেনো উত্যক্ত করছে একে অপরের মাঝে হারিয়ে যেতে।
আসিফা বিস্মিত, হতভম্ব সাথে লাজে শরীর রিরি করছে।। মেয়েটা আয়াজ এর দিকে তাকাতে ছেলেটা কাঁধ নাচিয়ে বলে,,,
"অপশন ছিলো না আসু,,, সমস্ত রুম বুকট।"
আসিফা মাথা নিচু করে। এর মাঝেই ওদের দরোজায় নক হয়। রুম সার্ভিস হিসাবে তাদের দুটো সাদা বাথরোপ, স্টিম মেশিন আর রাতের ডিনার হিসাবে লার্জ সাইজ চীজ পিট্জা সাথে কোন্ড ড্রিঙ্কস এর দুটো ক্যান। আয়াজ সেসব রেখে ছেলেটাকে বলে,,,
"আমাদের কাপড় কাল সকালের মধ্যেই ক্লিন এবং ড্রাই চাই।"
"জ্বী স্যার,,,আপনি কাপড় গুলি দরজার সামনে ক্লোথ বিনে রেখে দেবেন আমরা নিয়ে যাবো। "
"ওকে"
আয়াজ দরোজা বন্ধ করে একটা বাথরোপ মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিলো,,,"চেঞ্জ করে এটা পড়ে নাও,,,ঠান্ডা লাগবে আরও কিছুক্ষন এই কাপড়ে থাকলে।"
আসিফা মাথা নাড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতেই থেমে যায় তার পা জোড়া। সব তো দেখা যাবে। কাঁচের দেয়াল। আসিফা মনে মনে গালি দিল তাদের, যারা এরকম ওয়াশরুম বানিয়েছে।। আরে ওয়াশরুম তো প্রাইভেসি,,, সেখানে যা হয় সেটা দেখানোর জন্য নাকি!! আজব!!
এদিকে আয়াজ আসিফার ইতস্তত দেখে বলল,,,,
"ইউ আর মাই ওয়াইফ আসু, এত হেসেটেসান, লজ্জা ঠিক নয়। এক না এক দিন,আজ নাহলে কাল আমি তোমার কাছে যাবই,,,,তখন কি ভাবে আড়াল করবে নিজেকে!?"
আসিফার কান থেকে গরম ধোঁয়া নির্গত হয় লাগলো।। চোখ বন্ধ করে, মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো মেয়েটা,,, ওর বুক ঢিপঢিপ করছে। আয়াজ রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে একটা বাটন প্রেস করতেই কাচের উপর নেমে এলো একটা পর্দা।
"যাও এবার,,,পর্দা দেওয়া। আমিও দেখব এরকম কতদিন চলে"
আসিফা দৌড়ে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। আয়াজ হেসে নিজেও কাপড় পাল্টে ফেললো।। অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরেও আসিফাকে রুমে আসতে না দেখে আয়াজ জোর গলায় বলল,,,
"আসু,,,কি হলো! বেরিয়ে এসো,,,শরীর খারাপ লাগছে নাকি,,,,আসু"
আয়াজ কথাগুলি বলতে বলতে নিজেই ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে তখনই খট করে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আসিফা।।
খোলা সিক্ত লম্বা চুল, সাদা বাথরোপ যা হাটুর কিছুটা নিচে গিয়ে থেমেছে। মেয়েটা যেন এই বাথরোপে ঢেকে গেছে। দড়ি বাঁধা টাইট করে। মেয়েটাকে এহেন রূপে দেখে আয়াজ এর মাথা রাখাপ এর পর্যায়।। সম্মোহিত কন্ঠে বলল,,,
"আমি যদি আজ বেসামাল হই তার পিছনে আমি না তুমি দায়ী হবে।"
আসিফা নজর তুলে তাকালো। ঘোর লাগালো সেই দৃষ্টির অন্তরালে পবিত্র চাওয়া দেখতে পাচ্ছে মেয়েটা। তাও কোথাও একটা ভয় কাজ করছে।। আসিফা ধির কন্ঠে বলল,,,
"খিদে পাচ্ছে,,,"
আয়াজ বাঁকা হেসে বলল,,,"গুড ট্রাই,,,মাইন্ড ডাইভার্ট করার। চলো পিত্জা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে এমনিতেও।।"
আসিফা আর আয়াজ বিছানায় বসে পিজ্জার বক্সে খোলে। ঘ্রানেই জিভে জল আসছে মেয়েটার। আয়াজ এক স্লাইজ ওকে দিয়ে,মেয়েটা মাথায় হাত রেখে চুল ঘেঁটে বললো,,,
"বাচ্চা একটা,,,"
"আর আপনি বুড়ো"
"তাই নাকি,,,বুড়ো কি না বোঝাবো!?"
বলেই ও আসিফার দিকে ঝুঁকে পড়তেই মেয়েটা ওর মুখের উপর হাত রেখে বলল,,,,"নাহ নাহ বুঝতে চাই না।"
খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে নিতেই আয়াজ এর ফোন বেজে উঠলো। ছেলেটা ফোন নিয়ে বারান্দায় গেলো। এদিকে আসিফা বালিশে হেলান দিয়ে বসলো। ধীরে ধীরে চোখে নেমে এলো এক রাশ ঘুম। প্রায় আধা ঘন্টা পর আয়াজ ফিরে এসে দেখে তার আদরের বউ স্বপ্নের দেশে তলিয়ে।
--------------
ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা হবে।। একটা অচেনা জায়গায় চোখ খুলতেই রুমি ভরকে গেল একদম। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে মেয়েটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসে। ভারী নিশ্বাস ফেলে এদিক সেদিক তাকাতেই রুমি বুঝতে পারে একটা আসিফার রুম। অতি ক্লান্তির চোটে সে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল টেরই পাইনি।। এখন ঘড়িতে মধ্যরাত। এই সময় সে বাড়িও ফিরে যেতে পারবে না।। এর মধ্যেই রুমির পেট থেকে গুড়গুড় শব্দ ভেসে আসে।। খিদে পাচ্ছে তার।।
রুমি ধির পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে দাঁড়ায়।। পুরো বাড়ি ড্রিম লাইটের আলোয় আলোকিত। রুমি শুকনো ঢোক গিলে করিডোরের সামনে এসে দাড়াতেই তার মনে হলো কেউ তার পিছে। ভয় শরীর হিম, ভারি হয়ে এলো। আতঙ্ক নিতে আস্তে ধীরে পিছন ফিরতে গেলেই ধাক্কা খেল কোনো প্রশস্থ বুকের সহিত। ও পড়ে যেতে নিলেই জায়ান ওর কোমড় ধরে ওকে টেনে দাঁড় করালো নিজের সাথে।
রুমি ড্যাবড্যাব আঁখি মেলে দেখলো।। টি শার্ট আর ট্রাউজার পরনে ছেলেটার। কেমন করে যেন দেখছে তাকেই।। এদিকে জায়ান মেয়েটাকে এত সান্নিধ্যে পেয়ে খাপছাড়া।। তার ঘুম আসছিল না মোটেই,,,ওর মন বলছিল রুমি মাঝ রাতে উঠবেই।। তাই তো করিডোরের একপাশে দাড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। যেই না রুমিকে রুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখল অমনি ছেলেটার অন্তর আকুলিবিকুলি অনুভূতিতে ছেয়ে গেল।।
"আপনি?"
জায়ান ওকে ছেড়ে দাঁড়ায়।। বলে,,,"হুমম,,,তুমি জেগে গেলে যে!?"
রুমি মিনমিন সুরে বলে,,,"ঘুম ভেঙ্গে গেল হুট করেই। তখন যে কিভাবে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝতেই পারিনি,,,মা আব্বু টেনশান করবে"
"রিল্যাক্স তারা জানে তুমি এখানে। এখন বলো,কিছু লাগবে তোমার?"
রুমির দোলায়মান আঁখি,,,সে কি ভাবে বলবে যে তার খিদে পাচ্ছে কিছু খেতে দাও। রুমি মাথা নিচু করে হাত কচলায়। জায়ান ওকে দেখছে। হুট করেই এমন কিছু হয় যার দরুন রুমি লজ্জায় পানি পানি হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ওর পেট থেকে গুড়গুড় শব্দ আসছে যা জায়ান স্পষ্ট শুনতে পারছে। জায়ান হেসে উঠলো। রুমি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে।
"এত জেদ কেনো তোমার রুমি,,,খিদেও বুঝি চেপে রাখতে হয় আমার থেকে! এত রাগ আমার উপর!"
রুমি কিছু বলে বলে না। জায়ান ঝুঁকে রুমির নাক হালকা করে টেনে দিয়ে বলে,,,"এইখানে সব রাগ,জেদ বসে থাকে।। ছোটো বেলায় আমার আগে পিছে ঘুরঘুর করতে,,,ভুলে যেওনা।"
রুমি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,,,"তখন ছোট ছিলাম।"
"এখনও ঘুরঘুর করো,,,,মানা করেছে কে!?"
জায়ান ওর হাত টেনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নিয়ে গেলো। ওকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে বলে,,,"বসো আমি নুডলস বানিয়ে নিয়ে আসি,,,"
"আপনি পারেন!?"
"তোমার অভিমান ভাঙ্গানোর সঠিত উপায় ছাড়া আমি সব পারি,,,সানফ্লাওয়ার।"
জায়ান কিচেনে যায়।। পনেরো মিনিট সময় নিয়ে এক বোল স্যুপি নুডলস নিয়ে এসে সেও রুমির পাশের টেবিলে বসে।। রুমি এক চামচ নুডলস খেতে যাবে কি অমনি ও দেখে জায়ান গালে হাত ঠেকো দিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। রুমি চোখ ছোটো ছোটো করে বললো,,,
"এভাবে তাকিয়ে থাকলে খাব কি করে! নজর লেগে যাবে তো!!"
জায়ান মুচকি হেসে বলল,,,"আমার নজর তো তোমার উপর কবেই লেগে গেছে রুমি।।"
রুমি এক চামচ খেতেই ওর মুখ যেনো টেস্টে ভরে গেলো। ও মাথা নাড়িয়ে বলে,,,
"ইম্প্রেসিভ,,,অনেক টেস্টি হয়েছে আপনি একটু খেয়ে দেখুন।"
"তো খাইয়ে দাও"
"কেনো আপনাদের বাড়িতে আর চামচ নেই!?"
"চামচ আছে কিন্তু রুমি নেই।। রুমি কে আজ এত সহজে কাছে পেয়েছি এর সুযোগ তো আমি নেবই।"
রুমি উত্তর দেয় না। এক চামচ জায়ান এর মুখে দিতেই ছেলেটা নিজের রান্নার তারিফ নিজেই করে।
"বাহ্,,,আমি এত ভালো রান্না করি!?"
"আপনি সবকিছুই অনেক ভালো করেন।। ঘৃণা ,ভালোবাসা সবকিছুর পরিমাণ আপনার কাছে সমান।। তাই না!?"
জায়ান খানিক নিশ্চুপ থাকে,,,চোখ নামিয়ে এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে ধীরে বলে,,,
"ঘৃণা আমি তোমায় কখনো করতে পারিনি রুমি,,,হয়ত শুধু ভালোবাসাটাই ঠিকভাবে দেখাতে পারিনি।"
রুমির চোখ কেমন যেন নরম হয়ে আসে। সেই কথাগুলো শুনে ওর চিত্ত গলে যায়। ওর সমস্ত রাগ অভিমান গলে জল হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই তারপরেও মানুষটাকে এরকম দেখতে তার ভালো লাগে। তার প্রতি অনুভূতির স্বীকারোক্তি শুনতে ভাল লাগে।। কিন্তু মুখে কিছু না বলেই সে আবার এক চামচ তুলে নেয় নুডলসের। জায়ান তাকিয়ে থাকে, একদম গভীরভাবে।
সে আবার বলে,,,
"অবুঝ কাল থেকে আমার হৃদয় নিবাসে তুমি নিজের একটা কক্ষ বানিয়ে রেখেছিলে রুমি। হয়তো সময়ের সাথে সেই কক্ষে ধুলো পড়েছে, ময়লা জমেছে কিন্তু বিশ্বাস কর কক্ষের দরজা কখনো বন্ধ হয়নি,,,হবে না ,,,হতে দেব না।।"
রুমি এবার তার চামচটা থামিয়ে জায়ানের দিকে তাকায়। চোখে একটা হালকা ঝিলিক। সে ঠোঁটে চাপা হাসি নিয়ে বলে,,,
"তাই বুঝি মাঝ রাতে রাধুনি হয়ে বসে গেলেন আমার জন্য?"
জায়ান আলতো হেসে বলে,,,"তুমি বললে দেবদাস হয়ে যাই তোমার জন্য,,,"
"নাহ,,, আপনি দেবদাস হলে আমাকে পার্বতী হতে হবে আর পার্বতী বিয়ে করেছিল একটা বুড়ো জমিদারকে,,, আর আমি কোন বুড়ো জমিদারকে বিয়ে করতে পারবোনা।"
"তাহলে আমায় করে নাও বিয়ে।"
"ভেবে দেখবো,,,"
জায়ান এর চোখ চকচক ওঠে। ও রুমির দিকে প্রত্যাশা যুক্ত চাহনি নিক্ষেপ করে ত্বরিত বলে,,,"সত্যিই!?"
"হ্যাঁ"
"কত দিন সময় লাগবে ভাবতে!?"
"এই ধরুন আজীবন"
জায়ান এর আশার আলো নিভে গেলো। রুমি তাহ দেখে হাসলো। এই সময়টা ভালই লাগছে তার। একটা সময় খাওয়া শেষ হলে জায়ান দাড়িয়ে উঠে রুমির দিকে তাকিয়ে বলল,,,
"চলো"
"এখন!? কোথায়?"
"তোমাকে তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো আজ,,,"
"মানে!?"
"চলো আগে দেখতে পাবে,,, কাম ফাস্ট।"
"কেউ দেখলে!? কি ভাববে!?"
"যা ইচ্ছে ভাবুক"
"মাঝ রাত এখন"
"সব সময় এমন সুযোগ পাবে না রুমি,,,তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাতের দুনিয়া দেখো।"
জায়ান বাইক বের করে। রুমি উঠে বসে। মেয়েটা না করতে পারছে না। আজ তারও পাগলামি করতে মন চাইছে। রাতের দুনিয়া দেখতে মন চাইছে। আজ বাঁধা ধরা নিয়ম পেরিয়ে দুই নর নারী উড়ে চলল।।
https://www.facebook.com/share/p/1CTX5aPcXa/
#জটিল_প্রেম পর্বের লিংক
ক্রমশ
--------------(মায়ের বেড রেস্ট,,,, বাড়ির সমস্ত কাজ এক হাতে করতে হচ্ছে। তার মধ্যে আমি টিউশনি পরাই সব মিলিয়ে গল্প লেখার সময় পাইনা বললেই চলে,,,আপনারা আমার পাশে থাকবেন এই আশায় রাখি।। রিচ কমে গেছে পেজের তাই দয়া করে সবাই 5 টা করে কমেন্ট করুন প্লিজ। পরের পর্ব আসিফা আর আয়জ এর রোমান্স থাকবে😁🤫😉 )