ফন্ট সাইজ:
থিম:
Crown Of Shadows

১৯তম পর্ব

লেখক: SADIYA AFRIN

#crownof_shadows 

#sadiya_afrin
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
Part 19
রাতের একদম শেষ প্রহর।
চারিদিকে তখনও ঘন আঁধার। মির্জা ভিলার চারিটি দিক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিজের চারতলার অন্ধকার ঘরে শুয়ে নাইরা অনবরত এপাশ-ওপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষণ আগে পাওয়া সেই অচেনা এনক্রিপ্টেড নম্বর থেকে আসা দুটি হুমকিমাখা বার্তা আর সেগুলোর পেছনের বিভীষিকা তার মনের শান্ত ভাব পুরোপুরি কেড়ে নিয়েছে।
ঠিক তখনই নীরব ঘরটাকে কাঁপিয়ে নাইটস্ট্যান্ডের ওপর রাখা তার পার্সোনাল ফোনটা তীক্ষ্ণ সুরে বেজে উঠল।
ঘুমঘুম ও ক্লান্ত চোখে ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজ বা নোটিফিকেশন নয়, সরাসরি ডিসপ্লের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই নাইরার চোখের ঘুম এক সেকেন্ডের মধ্যে কর্পূরের মতো পুরোপুরি উড়ে গেল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে—Central Hospital Urgent Calling…
নাইরা এক মুহূর্তও অযথা সময় নষ্ট করল না। সোজা হয়ে বসে সঙ্গে সঙ্গে স্লাইড করে কল রিসিভ করল।
— “হ্যালো, ডক্টর নাইরা বলছি।”
ওপাশ থেকে হাসপাতালের ডিউটি স্টাফ নাইট-ইন-চার্জ অত্যন্ত তাড়াহুড়ো ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে দ্রুত বলে উঠল—
— “ডক্টর নাইরা, এক্সট্রিমলি সরি এত রাতে আপনাকে ডিসটার্ব করার জন্য! কিন্তু ট্রমা সেন্টারে একটা ভয়াবহ মাল্টিপল ফ্র্যাকচার আর ইন্টারনাল ব্লিডিংয়ের ইমার্জেন্সি অপারেশন কেস এসেছে। চিফ সার্জন আউট অফ টাউন। আপনি যদি জলদি আসতে পারেন, তবে পেশেন্টকে সেভ করা সম্ভব।”
নাইরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না। প্রফেশনাল দায়িত্বের সামনে নিজের ব্যক্তিগত ভয় বা ক্লান্তি সবসময়ই তার কাছে তুচ্ছ। সে সটান গলায় জবাব দিল—
— “আমি ঠিক ৩০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাচ্ছি। ওটি রেডি করুন, আর এনাস্থেসিওলজিস্টকে ইমিডিয়েট ইনফর্ম করুন।”
কথাটা শেষ করেই সে লাইনটা কেটে দিল।
তারপর এক নিমেষে বিছানা ছেড়ে সতেজ হয়ে উঠে দাঁড়াল। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা ক্যাজুয়াল জিন্স, শার্ট আর ওপর দিয়ে ক্যাজুয়াল জ্যাকেট চাপিয়ে, দরকারী স্টেথোস্কোপ, ডায়েরি ও আইডি কার্ড নিয়ে সে একদম রেডি হয়ে গেল।
রাতের সেই অচেনা মেসেজের হুমকি, বোর্ড রুমের সেই গোপন কনফিডেন্সিয়াল ফাইলের লাল দাগ—সবকিছু আপাতত সে মন থেকে একদম মুছে ফেলল। এই মুহূর্তে একজন মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানোই তার একমাত্র ধর্ম।
রুমের দরজা খুলে দ্রুত পায়ে করিডোর পার হয়ে সে প্যাঁচানো বড় মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।
ঠিক তখনই নিচতলার লবির আবছায়া আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ইহানের সঙ্গে তার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল।
ইহান তখনও তার আইনি পেপারওয়ার্ক আর ট্রেসিংয়ের কাজে জেগে ছিল। এত রাতে নাইরাকে এভাবে ব্যাকপ্যাক কাঁধে আর হাতঘড়ি পরতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে অবাক কণ্ঠে ভারী গলায় প্রশ্ন করল—
— “এত রাতে এভাবে ফর্মাল ড্রেস-আপ করে তুই কোথায় যাচ্ছিস, নাইরা?”
নাইরা দরজার দিকে এগাতে এগাতে এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। অত্যন্ত তড়িঘড়ি গলায় বলল—
— “হসপিটালে একটা এক্সট্রিম ইমার্জেন্সি অপারেশন এসেছে। আমাকে এখনই যেতে হবে।”
বলেই সে প্রধান ফটকের দিকে পা বাড়াল।
ইহান দরজার চৌকাঠের কাছে কয়েক মুহূর্ত তার অস্থির ও ব্যস্ত ভঙ্গির দিকে তাকিয়ে থেকে শান্তভাবে বলল—
— “রাত অনেক বেশি। আমি তোকে গাড়ি চালিয়ে ড্রপ করে দিয়ে আসব?”
নাইরা এবার বেশ কিছুটা বিরক্ত হয়ে থেমে গিয়ে পেছন ফিরে ইহানের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল এক চিলতে অভিমান আর স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান—
— “নো থ্যাংকস। আপনি অযথা চিন্তা করবেন না, আমার নিজের বাইক আছে। আমি একাই যেতে পারব।”
কথাটা স্পষ্ট গলায় বলেই সে আর একমুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। বিশাল মেহগনি দরজা ঠেলে বাইরের ঠান্ডা বাতাসে বেরিয়ে গেল।
ইহান লবির দরজার কাছে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে নাইরার স্পোর্টস বাইকের এঞ্জিনের স্টার্ট হওয়ার বিকট শব্দ এবং দ্রুতগতিতে গেট পার হয়ে বের হয়ে যাওয়ার আলোটুকু সে এক দৃষ্টিতে দেখল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে গেল।
কয়েক ঘণ্টা পর—
সেন্ট্রাল হাসপাতালের চার নম্বর ওটি-র লাল ইমার্জেন্সি বাল্বটা অবশেষে নিভে গেল। দীর্ঘ চার ঘণ্টার টানা জটিল ও সংকটপূর্ণ অস্ত্রোপচার শেষ হতে হতে রাতের আঁধার কেটে বাইরে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
অপারেশন থিয়েটার থেকে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এসে নাইরা বেসিনের সামনে গিয়ে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক চাপের পর অবশেষে সংকটাপন্ন রোগী এখন বিপদমুক্ত ও স্ট্যাবল। নাইরা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের ক্লান্ত চেহারার ওপর এক গভীর ও তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরের প্রতিটি পেশী অবসন্নতায় ভেঙে পড়ছে। চোখ দুটো যেন ঘুমে ভার হয়ে আসছে। এত ভোরে মির্জা ভিলায় ফিরে গিয়ে নিজের এই ক্লান্ত ও বিশৃঙ্খল চেহারা দেখিয়ে বাড়ির কাউকেই অহেতুক চিন্তিত করতে ইচ্ছে হলো না তার। তাই সার্জনদের বিশ্রামাগারে আরামদায়ক সোফাতেই কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল এবং সকালের রোদ ফোটা পর্যন্ত সেখানেই বিশ্রাম নিল।
সকাল ঠিক ৯:৩০ মিনিট।
প্রাসাদসম মির্জা ভিলার বিশালাকার সেন্ট্রাল ডাইনিং রুমে তখন পরিবারের সবাই প্রাতঃরাশের জন্য একসঙ্গে টেবিলে সমবেত হয়েছে।
টেবিলের একদম প্রধান চেয়ারে বসে শাহরিয়ার মির্জা মনোযোগ দিয়ে আজকের সংবাদপত্র পড়ছেন। পাশে বসে ফারহান মির্জা, আমজাদ মির্জা আর মনসুর মির্জা মির্জা গ্রুপের নতুন টেক্সটাইল প্রজেক্ট আর শেয়ার মার্কেট নিয়ে নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় সিরিয়াস আলোচনা করছেন। টেবিলের অন্য প্রান্তে জায়ান, আয়ান আর ছোটরা নিজেদের মতো নাস্তা করতে করতে হালকা হাসাহাসি করছে।
কিন্তু পরিবারের কর্ত্রী আফরোজা মির্জার তীক্ষ্ণ চোখ বারবার ফাঁকা সিঁড়িটার দিকেই ফিরে ফিরে যাচ্ছে।
সকালের প্রাতঃরাশের সময় পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ নাইরাকে এখনও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা কি আজও অফিসে বা ক্লাসে যাবে না?
কিছুক্ষণ অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করার পর আফরোজা মির্জা বিরক্তি ও চিন্তার কণ্ঠে টেবিলে রাখা জুসের গ্লাস নামিয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— “আয়ান, তুই একবার কষ্ট করে যা তো। গিয়ে নাইরাকে ডেকে তো নিয়ে আয়। মেয়েটা কাল রাত থেকে কী শুরু করেছে, আর কত ঘুমাবে সে?”
আয়ান মুখে চামচ রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই প্রধান ফটকের দিক থেকে নাইরার অত্যন্ত শান্ত ও ক্লান্ত স্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “কাউকে উপরে যেতে হবে না, আম্মু।”
মুহূর্তের মধ্যে ডাইনিং রুমের সবকটি গ্লাস আর চামচের টুংটাং শব্দ থেমে গেল। ঘরের সবাই একযোগে বিশাল রাজকীয় এন্ট্রান্স গেটের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
দরজার কাঁচের ফ্রেমে হেলান দিয়ে নির্জীবের মতো দাঁড়িয়ে আছে নাইরা।
এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো ডাইনিং রুমের কোলাহল এক গভীর ও অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় রূপ নিল।
আফরোজা মির্জা আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে তড়িঘড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে মেয়ের কাছে দ্রুত এগিয়ে গেলেন।
নাইরার মুখের দিকে তাকাতেই একজন মায়ের চোখে তীব্র চিন্তা ও উদ্বেগ ফুটে উঠল। মেস করা এলোমেলো চুল, চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে, ফর্সা রেশমী ত্বকে রাতভর জেগে থাকার ও অপারেশনের অমানুষিক পরিশ্রমের স্পষ্ট ছাপ।
আফরোজা মির্জা মেয়েকে দুই বাহু ধরে কিছুটা শাসন আর ভালোবাসার গলায় বললেন—
— “কীরে মা, তুই এত সকাল সকাল কোথায় গিয়েছিলি? আর তোর চেহারা এমন অসুস্থ আর ভাঙা দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে তোর?”
নাইরা আম্মুর কাঁধে হালকা মাথা রেখে ক্লান্ত নিচু গলায় বলল—
— “আসলে কাল গভীর রাতে হসপিটাল থেকে একটা এক্সট্রিম ট্রমা ইমার্জেন্সি কল এসেছিল, আম্মু। একজন পেশেন্টের জীবন বাঁচাতে আমাকে হুট করে যেতে হয়েছিল।”
আফরোজা মির্জা এবার একটু অভিমানী ও খিটখিটে গলায় বললেন—
— “তো আমাকে অন্তত একবার ডেকে বলে তো যাবি! রাতে এভাবে বাইক নিয়ে বের হয়ে গেলি, আমার কি বুক কাঁপে না?”
নাইরা ধীরে ধীরে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল—
— “তখন এক সেকেন্ড সময় ছিল না, আম্মু। তার ওপর গভীর রাত হয়ে গিয়েছিল, সবার ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করেনি, তাই আর কাউকে বলিনি।”
খাবারের টেবিলে বসে থাকা শাহরিয়ার মির্জা থেকে শুরু করে ফারহান মির্জা—সবাই অত্যন্ত কৌতূহল ও অবাক চোখে নাইরার এই পেশাদারিত্বের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
টেবিলের এক কোণে কালো শার্ট পরে ইহান চুপচাপ বসে ছিল। সে মুখে কিছুই বলল না। কেবল নিজের নীলচে প্রখর চোখে নিঃশব্দে নাইরার সেই নিদারুণ ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় মুখটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
আফরোজা মির্জা স্নেহে মেয়ের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন।
— “ঠিক আছে, বুঝেছি। এবার যা, আগে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছুটা পেটে দে, তারপর সোজা ঘুমিয়ে পড়।”
নাইরা ধীরে মাথা নাড়ল।
— “না আম্মু, এখন বিন্দুমাত্র কিছু খাওয়ার মতো অবস্থা নেই আমার। আপনি দয়া করে আমার জন্য এক কাপ স্ট্রং ব্ল্যাক কফি বানিয়ে জায়ানকে দিয়ে আমার রুমে পাঠাও।”
কথাটা স্পষ্ট করে বলেই নাইরা আর কোনো দিকে বা কারো জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে না তাকিয়ে সোজা মার্বেলের প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে নিজের চারতলার ঘরের দিকে উঠে গেল।
আফরোজা মির্জা কিছুক্ষণ চিন্তিত চোখে মেয়ের উঠে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কারো সাথে কথা না বলে কিচেনের দিকে হেঁটে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর কিচেনে আফরোজা মির্জার নিজের হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ স্ট্রং ব্ল্যাক কফি তৈরি হয়ে গেল।
তিনি কফির ট্রেইটা ডাইনিং রুমে এসে জায়ানের হাতে তুলে দিয়ে বললেন—
— “জায়ান, এই নে। এটা নাইরার রুমে দিয়ে আয় তো বাবা। মেয়েটা না খেয়েই শুয়ে পড়ল।”
জায়ান এক গাল হেসে ট্রে-টা হাতে নিল।
— “ঠিক আছে ছোট আম্মু, আমি দিয়ে আসছি।”
কফির কাপ হাতে নিয়ে জায়ান ধীরপায়ে চারতলার করিডোর পার হয়ে নাইরার ঘরের দিকে চলে গেল।
নাইরা তখন নিজের সুবিশাল কিং-সাইজ বিছানায় একপাশে হয়ে শুয়ে আছে।
চোখ দুটো বন্ধ। অনবরত মাথা ব্যথার সাথে সারাদিনের ধকল মিলে তার শরীর যেন এক ইঞ্চি নড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।
দরজায় হালকা নক করে জায়ান ভেতরে ঢুকল।
তার হাতে গরম কফির মগ। বিছানায় নাইরাকে একেবারে নিস্তেজ ও কাত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে জায়ান তার চিরচেনা মিষ্টি ও কৌতুকপূর্ণ হাসি হেসে ডেক্সের দিকে এগোলো।
— “কীরে সার্জন সাহেবা? এক রাতের ডিউটিতেই এত করুণ অবস্থা? বেশি খারাপ লাগতেছে নাকি তোর?”
নাইরা চোখ না খুলেই খুব খিন ও নিচু গলায় উত্তর দিল—
— “হুম, মারাত্মক লাগতেছে। অনেক মাস পর এভাবে টানা অপারেশন ও রাতজাগা হলো তো, তাই শরীর আর সইতে পারছে না।”
জায়ান কফির মগটা টেবিলের ওপর সাবধানে রেখে সোজা হয়ে বলল—
— “ফালতু কথা বন্ধ কর। আগে উঠে গরম কফিটা শেষ কর, তারপর একদম সোজা একটা ঘুম দে।”
নাইরা অতি কষ্টে বিছানায় উঠে বসে টেবিলের কফির ধোঁয়ার দিকে একপলক তাকাল।
তারপর কিছুটা নিচু ও সতর্ক গলায় বলল—
— “শোন জায়ান, তোকে যে গোপন কাজের জন্য এখন ডাকলাম…”
জায়ান ওর পাশে বিছানার কোণে বসে সিরিয়াস হয়ে বলল—
— “হুম বল, মন দিয়ে শুনতেছি।”
নাইরা ক্লান্ত গলায় অথচ স্পষ্ট করে বলল—
— “আমার স্পোর্টস বাইকটা নিচতলার গ্যারেজে আছে। তুই বাইকের চাবিটা নিয়ে গিয়ে ফুয়েল স্টেশন থেকে ফুল পেট্রোল লোড করে নিয়ে আসবি? কারণ আজ বিকেলে আমাকে জরুরি এক জায়গায় বাইক নিয়ে যেতে হবে।”
জায়ান খুব স্বাভাবিকভাবে মাথা নেড়ে হেসে বলল—
— “আরে এ তো সামান্য কাজ! তুই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নে, আমি এখনই গিয়ে পেট্রোল ভরে এনট্রি করে রেখে দিচ্ছি।”
সে কফির মগটা নাইরার কাছে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে ধীরপায়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেল।
নাইরার ঘরের ভারী দরজাটা আবার সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
জায়ান নাইরার ঘর থেকে বের হয়ে দরজা লাগাতেই করিডোরের ঠিক অন্য পাশে দেওয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইহানের সাথে তার হুট করে চোখাচোখি হয়ে গেল।
ইহান মুখে কোনো কথা বলল না।
কিন্তু তার দুই চোখের তীক্ষ্ণ চাউনিতে একটি স্পষ্ট ও গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে ছিল—উৎসুকতা।
জায়ান ইহানের সেই প্রশ্নবিদ্ধ চেহারার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে আর কিছু না বলে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে গেল।
ইহান একাকী বেশ কিছুক্ষণ চারতলার নিঝুম করিডোরটিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মস্তিষ্কে অনবরত নাইরার শেষ কথাটা বিষাক্ত পোকার মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল—
“আজ বিকেলে আমাকে জরুরি এক জায়গায় বাইক নিয়ে যেতে হবে।”
কোথায় যাবে মেয়েটা? কাল রাতে অত বড় হুমকির মেসেজ পাওয়ার পরও সে কোন সাহসে আবার একাকী বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে?
ঠিক তখনই ইহানের স্মৃতির পাতা উল্টে কয়েকদিন আগের একটা গোপন কথা মনে পড়ে গেল।
নাইরা সেদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে জায়ানের সাথে খুব নিচু গলায় কথা বলছিল। সে খুব স্পষ্ট করে জায়ানকে বলেছিল—
সে আলভীর সাথে পারসোনালি দেখা করতে চায়।
ইহানের চোখের শাণিত দৃষ্টি ধীরে ধীরে বরফের মতো কঠিন ও ভয়ংকর হয়ে উঠতে লাগল।
সে হাতের মুঠো শক্ত করে সাইলেন্ট করিডোরে বিড়বিড় করে উঠল—
— “সেদিন যে বলেছিল আলভীর সাথে গোপনে দেখা করতে চায়…”
সে কয়েক মুহূর্ত সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই এক বিষাদময় প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
— “আজ বিকেলেও কি সে সব নিষেধ উপেক্ষা করে ওই আলভীর সাথেই দেখা করতে যাচ্ছে?”
কেন বা কী কারণে জানে না, এই চিন্তাটা মাথায় আসার সাথে সাথেই ইহানের বুকের ভেতর অজানা এক তীব্র হিংসা, ক্ষোভ আর অদ্ভুত অস্বস্তিকর বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ল। সে নিজে একজন বিচক্ষণ আইনজীবী হয়েও নিজের এই অস্বাভাবিক অনুভূতির কোনো স্পষ্ট কারণ খুঁজে পেল না।
তবে এই মুহূর্তে একটি বিষয় তার মস্তিষ্কে পাথরের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে—
আজ বিকেলে নাইরা ঠিক কোথায় আর কার কাছে যায়, সেটা তাকে জানতেই হবে।
আর সেই রহস্যময় উত্তরের পেছনে ছুটতে গিয়ে ইহান হয়তো খুব শীঘ্রই এমন এক মারাত্মক ও ভয়ংকর সত্যের সামনে এসে দাঁড়াতে চলেছে—যার কালান্তক তারের সাথে জড়িয়ে আছে মির্জা পরিবারের রক্ত, মির্জা গ্রুপের গোপন স্ক্যাম এবং তাদের ওপর ছায়ার মতো চেপে বসা সেই অদৃশ্য শত্রুর অস্তিত্ব! 
(চলবে…)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন