#crown_of_shadows
#sadiya_afrin
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
Part 20
সকালটা ধীরে ধীরে গড়িয়ে দুপুরের তপ্ত রোদের দিকে যাচ্ছে।
বিশালাকার মির্জা ভিলার দৈনন্দিন ব্যস্ততা আগের দিনের মতোই চেনা ছন্দে চলছে। সদর দরজায় গার্ডদের উপস্থিতি, বাগানে মালীদের ব্যস্ততা আর ড্রয়িংরুমে কাজের লোকদের চলাচল—সবকিছুই স্বাভাবিক।
কিন্তু চারতলার একটা বিশেষ ঘরের জানালায় তখনও ঘন ভারী পর্দা টানা। ঘরের ভেতরটা আধা-অন্ধকার ও বেশ নিঝুম।
নাইরা নিজের রাজকীয় বিছানায় তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
গভীর রাতভর সেন্ট্রাল হাসপাতালে থেকে সেই জটিল অস্ত্রোপচারের মানসিক ও শারীরিক ধকল সামলানোর পর তার অবশ শরীরটা যেন অবশেষে কিছুটা হলেও বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছে। নাইটস্ট্যান্ডের কাঁচের টেবিলের ওপর রাখা সকালে আম্মুর বানিয়ে পাঠানো কফির মগটা অনেক আগেই হিমশীতল ও ঠান্ডা হয়ে গেছে।
অন্যদিকে নিচতলার লবিতে জায়ান এসে নাইরার স্পোর্টস বাইকের চাবিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আঙুলে চাবিটি ঘোরাচ্ছিল।
সে চাবিটা রিংয়ে পেঁচাতে পেঁচাতে বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মেইন গেটের দিকে এগোতেই ডাইনিং টেবিল থেকে আয়ান তাকে দেখে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল—
— “জায়ান ভাইয়া, দুপুরবেলা চাবি হাতে কোথায় যাচ্ছ?”
জায়ান হালকা হেসে উত্তর দিল—
— “তোর নাইরা আপুর বাইকে পেট্রোল পাম্প থেকে ফুল পেট্রোল লোড করে দিতে যাচ্ছি রে।”
আয়ান সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের কথা শুনেই সব বুঝে গেল।
— “ওহ্! তার মানে আপু আবার বিকেলে কোথাও বের হবে?”
— “হুম, তেমনই তো মনে হচ্ছে।”
জায়ান আর অযথা দাঁড়িয়ে কিছু না বলে ধীরপায়ে গ্যারেজের দিকে চলে গেল।
কিন্তু একটু দূরে লিভিং রুমের ভারী সোফায় হেলান দিয়ে বসে থাকা ইহানের তীক্ষ্ণ কানে তাদের প্রতিটি কথা খুব স্পষ্টভাবেই পৌঁছে গেল।
ইহান মুখে কিছু বলল না।
সে কেবল ক্ষণিকের জন্য জায়ানের হাতে থাকা বাইকের সেই চাবিটার দিকে শাণিত চোখে তাকাল। তারপর নিজের পকেট থেকে ব্যক্তিগত এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করল। কিছুক্ষণ ফোনটির উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থেকে আবার নীরবতায় ফোনটি পকেটে রেখে দিল।
দুপুরের ঠিক আড়াইটার দিকে নাইরার ঘুম ভাঙল।
চোখ মেলতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে বুঝতে পারল না ঠিক কয়টা বাজে। সিলিংয়ের আবছায়া আলোর দিকে তাকিয়ে সে ধীরহেসে হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে সময় দেখে সে চমকে উঠে তাড়াহুড়ো করে উঠে বসল।
টানা ঘুমানোর পরও রাতজাগার ধকলের কারণে মাথাটা এখনও সামান্য ভারী ভারী ঠেকছে।
সে ধীরপায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা পানির ঝাপসা ঝাপসা ঝাপটায় নিজেকে সম্পূর্ণ ফ্রেশ করে বেরিয়ে এলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কিছুটা ফ্যাকাশে ও শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজ বিকেলে তাকে ভিলার বাইরে বের হতেই হবে। গতকাল মনে মনে যে সিদ্ধান্তের কথা ভেবেছিল, সেটার কথা সে এত সহজে ভুলে যায়নি। তাছাড়া দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর পুরোনো চেনা পরিচিত কারও সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করার ভেতরে এক অদ্ভুত আবেগ ও উত্তেজনা কাজ করে।
নাইরা বিশাল ওয়্যারড্রব খুলে নিজের জন্য একটা অত্যন্ত আরামদায়ক কিন্তু ডেসেন্ট আউটফিট বের করল।
বাইরে যাওয়ার সময় সে সাধারণত নিজের অভিজাত ও ক্লাসি ফরমাল স্টাইলটাই নিখুঁতভাবে মেইনটেইন করতে পছন্দ করে। কিন্তু আজকের এই বের হওয়াটা কোনো ব্যবসায়িক বা কর্পোরেট মিটিং নয়। তবুও নিজের স্বাভাবিক রুচি বজায় রেখে সে নিজেকে সুন্দরভাবে তৈরি করে নিল।
নিচে তখন কাজ শেষ করে জায়ান এসে নাইরার বাইকের চাবিটা বড় ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখল।
রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আফরোজা মির্জা তা দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
— “বাইক নিয়ে এত দুপুরে কী করছিলি জায়ান?”
জায়ান উত্তর দিল—
— “নাইরা সকালে বলেছিল বাইকে পেট্রোল ভরে রাখতে, তাই পাম্পে গিয়ে তেল ভরে দিয়ে এলাম ছোট আম্মু।”
ডাইনিংয়ের প্রধান চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন শাহরিয়ার মির্জা। তিনি কাগজের ওপর দিয়ে চশমা নামিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
— “নাইরা কি বিকেলে আবার কোনো জরুরি কাজে বাইরে যাবে?”
জায়ান মাথা নেড়ে বলল—
— “হুম বড় বাবা, আমাকে তো তেমনটাই বলল।”
ইহান এতক্ষণ টেবিলের এক কোণে নীরব দর্শকের মতো চুপচাপ বসেছিল। কিন্তু এবার সে হঠাৎ মাথা তুলল। তার গলার আওয়াজ আগের চেয়ে বেশ কিছুটা গম্ভীর—
— “কোথায় যাবে ও?”
জায়ান কিছুটা অবাক ও বিস্ময় নিয়ে ইহানের দিকে তাকাল।
— “আমি কীভাবে জানব? আমাকে শুধু বাইকে পেট্রোল ফুল করে এনে দিতে বলেছিল, বাকি তো কিছু বলেনি।”
ইহান আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করল না।
সে চুপচাপ মাথা নিচু করে নিজের কালো কফির মগে মন দিল। কিন্তু তার ক্ষুরধার মস্তিষ্কের ভেতর সেই প্রশ্নটা আরও বেশি জোরালো ও উগ্র হয়ে উঠল—
নাইরা কার সাথে দেখা করতে এত গোপনে বাইরে যাচ্ছে?
বিকেল চারটা বেজে গড়িয়ে এসেছে।
নাইরা নিজের চারতলার সুসজ্জিত ঘর থেকে বের হয়ে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো। আজ তার চেহারায় গত রাতের সেই অমানুষিক ক্লান্তি অনেকটাই উধাও, সেখানে ফুটে উঠেছে এক কোমল ও প্রাণবন্ত ভাব।
লবিতে বসে থাকা জায়ান তাকে দেখেই হেসে উঠে বলল—
— “কী খবর ম্যাডাম? ঘুম কেমন হলো?”
— “মোটামুটি ভালো। শরীরটা এখন হালকা লাগছে।”
জায়ান টেবিল থেকে স্পোর্টস বাইকের চাবিটা নাইরার দিকে এগিয়ে দিল।
— “তোর বাইক একদম রেডি।”
নাইরা মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে চাবিটা হাতে নিল।
— “অনেক থ্যাংকস তোকে, জায়ান।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ইহানের বরফের মতো ঠান্ডা ও সুগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “কোথায় যাচ্ছিস তুই, নাইরা?”
নাইরা হঠাৎ থমকে গিয়ে পেছনে ঘুরল। ইহানের কঠোর ও দৃষ্টিবদ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ও সোজা গলায় বলল—
— “জরুরি এক জায়গায় যাচ্ছি, ইহান ভাই।”
ইহান দুই ভ্রু কুঁচকে এক পা এগিয়ে এসে ভারী গলায় বলল—
— “ঠিক কোথায়?”
নাইরা এবার সামান্য বিরক্ত হয়ে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
— “আপনি আমাকে এত জেরা আর প্রশ্ন করছেন কেন বলুন তো?”
ইহান সম্পূর্ণ শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় উত্তর দিল—
— “কারণ তুই গতরাতে একটা এক্সট্রিম ইমার্জেন্সি অপারেশন সামলে সকালবেলা ফ্যাকাশে মুখে বাসায় ফিরেছিস। আজ আবার বিকেলেই বাইক নিয়ে হুট করে একা বের হচ্ছিস।”
নাইরা কয়েক সেকেন্ড নিজের ভেতরের রাগটা চেপে রেখে শান্ত ভঙ্গিতে বলল—
— “আমি একদম সুস্থ আর ঠিক আছি। আর আমি খুব বেশি দূরের কোনো জায়গায় যাচ্ছি না, তাই আপনার চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই।”
ইহান আরও কিছু একটা বলতে গিয়েও নাইরার তেজী চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকে থামিয়ে নিল।
নাইরা বাইকের চাবিটা শক্ত হাতে মুঠে ধরে রাজকীয় এন্ট্রান্স গেটের দিকে দ্রুত হেঁটে গেল।
জায়ান পেছন থেকে শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো ডেকে বলল—
— “সাবধানে বাইক ড্রাইভ করিস নাইরা!”
নাইরা দরজার কাছে গিয়ে একবার পেছন ফিরে মুচকি হেসে বলল—
— “হুম, তুই চিন্তা করিস না।”
কথাটা বসেই সে মেহগনি দরজা ঠেলে বাইরে রোদে বেরিয়ে গেল।
ইহান দ্রুত পা চালিয়ে বিশাল ফ্রেঞ্চ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যারেজের দিক থেকে হেভি স্পোর্টস বাইকের এঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার বিকট ও শক্তিশালী গর্জন ভেসে এলো। নাইরা মাথায় ব্ল্যাক হেলমেটটা চাপিয়ে মসৃণ হাতে বাইক স্টার্ট করল। তারপর চোখের পলকে মির্জা ভিলার বিশালাকার অটোমেটিক গেট পেরিয়ে মেইন রোডে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ইহান জানালার কাঁচের ওপার দিয়ে নাইরার চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
তার মস্তিষ্কে বারবার একটাই চেনা নাম কালান্তক আগুনের মতো ফিরে ফিরে আসছিল—
আলভী (Alvi)।
কয়েকদিন আগে নাইরা যে ছেলেটার কথা জায়ানের সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলছিল!
ইহান নিজের অজান্তেই পকেট থেকে এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের দিকে কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক চেয়ে থেকে একটা বিশেষ আনলিস্টেড সিক্রেট নম্বরে সরাসরি কল দিল।
ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই ভারী এক পুরুষালী গলা ভেসে এলো।
ইহান কঠোর গলায় নির্দেশ দিল—
— “ওকে সরাসরি ফলো করার বা ইন্টারফেয়ার করার কোনো প্রয়োজন নেই।”
ওপাশ থেকে কোনো এক গুপ্তচর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।
ইহান অত্যন্ত সতর্ক ও বরফের মতো ঠাণ্ডা কণ্ঠে শেষ বাক্যটি বলল—
— “শুধু দূর থেকে নজরে রাখবি। ও ঠিক কার সাথে দেখা করছে আর কোথায় যাচ্ছে—প্রতিটা আপডেট আমার চাই।”
কথাটা বলেই সে কলটা কেটে দিল। তার মুখে কোনো প্রকাশ্য রাগ বা আবেগ নেই, কিন্তু নীলচে দুই চোখে ছড়িয়ে রয়েছে মারাত্মক এক আইনি ও পারিবারিক সতর্কতা।
অন্যদিকে নাইরা ঢাকার ব্যস্ত ও ঝলমলে পিচঢালা রাজপথ পেরিয়ে নিজের বাইক নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
আজ বাইকের স্পিড খুব একটা বেশি নয়। দীর্ঘদিন বিদেশে কাটানোর পর নিজের শহরের চেনা বাতাসে নিজের ভালোবাসার স্পোর্টস বাইক নিয়ে বের হওয়ার অনুভূতিটা সত্যিই ভারী দারুণ আর রোমাঞ্চকর।
কিন্তু সে ঠিক কোথায় যাচ্ছে, সেই ডেস্টিনেশনের কথা সে ভিলার কাউকে স্পষ্ট করে বলে আসেনি। কারণ আজকের এই বিকেলের দেখাটা কোনো সাধারণ কাজের জন্য নয়—একটি বহু পুরোনো, মিষ্টি ও বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের সাথে পুনরায় দেখা করার জন্য।
আর সেই বিশ্বস্ত পুরোনো বন্ধুর নাম—আলভী।
নাইরার হেলমেটের ভেতরে থাকা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন ও সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। সে জানত না, আজকের এই ছোট্ট একটা সাধারণ দেখা তার জীবনে কতগুলো স্মৃতি আর সম্পর্কের নতুন মোড় ফিরিয়ে আনবে।
তবে নাইরা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারল না—
তার বাইকের বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে পিছন পিছন সম্পূর্ণ অদৃশ্যভাবে কেউ একজন সুপরিকল্পিতভাবে তার ওপর কড়া নজর রাখছে।
ঘন কালো রঙের একটা দামি গ্লাস-টিন্টেড স্পোর্টস কার ধীরে ধীরে ও নিখুঁত দূরত্ব বজায় রেখে নাইরার বাইকের পথ অনুসরণ করে চলেছে।
সেই কালো গাড়ির ভেতরে কালো চশমা পরা এক রহস্যময় লোক ফোনে খুব নিচু ও বিষাক্ত গলায় কাউকে রিপোর্ট দিল—
— “বস, টার্গেট মির্জা ভিলা থেকে নিজের বাইক নিয়ে একাই বের হয়েছে।”
ফোনকলের ওপাশ থেকে এক ভারী ও হিংস্র আওয়াজ ভেসে এলো—
— “খুব ভালো। একদম কাছে যাবি না। শুধু দূরত্ব রেখে নজর রাখ, ও কার ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে!”
কথা শেষ হতেই ফোনকলটা কেটে গেল।
কালো স্পোর্টস কারটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে নাইরার স্পোর্টস বাইকের পেছনে পেছনে শহরের অজানা ও অচেনা পথের দিকে ছায়ার মতো এগোতে থাকল। আর নাইরা নিজের মনের আনন্দে বাইক চালিয়ে সামনের অজানা বিপদের কথা একদম না জেনে এগিয়ে যেতে থাকল।
(চলবে…)