ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

২৬তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ২৬

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

জাহির তখনো স্ট্যাচুর মতো দরজার সামনে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গালে সুহানার চড়ের জ্বালাটা এখন এক তীব্র যন্ত্রণায় রূপ নিয়েছে, তবে সেই যন্ত্রণার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তার মনের ভেতরের শূন্যতা। তার শরীর আর মস্তিষ্ক যেন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

জাহির দরজার কাছে এক পা এগিয়েও থমকে গেল। সুহানার সেই ঘৃণাভরা কণ্ঠস্বর তার বুকে তীরের মতো বিঁধছে। আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না সে। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল; তার মাথায় তখন একটাই কথা হাতুড়ি পেটা করছে—তার ‘সুহু’ তাকে আর দেখতে চায় না। তার সামান্য এক মুহূর্তের পৈশাচিক উন্মাদনা সব শেষ করে দিয়েছে। অনুশোচনার এক তীব্র আগুন যেন তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।

গাড়িতে গিয়ে বসতেই ড্রাইভার জাহিরের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে চমকে উঠল। চকোলেট ব্রাউন হুডির নিচে জাহিরের মুখটা তখন ফ্যাকাশে, চোখে এক অসীম শূন্যতা। ড্রাইভার কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না, নিঃশব্দে গাড়িটা বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে নিল। জাহির জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে কোনো শহর নেই, আছে শুধু সুহানার সেই অশ্রুসিক্ত রাগী মুখটা।

ওদিকে সুহানা তখন বিছানায় পাথরের মতো বসে আছে। তার চোখ দুটো লাল, মুখটা অপমানে বিবর্ণ। সে স্থির দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে—কী হয়ে গেল এটা? একটু আগের সেই দুঃস্বপ্ন যেন তার সমস্ত সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে নিজের কাছে নিজে ছোটো হয়েগেছে। জাহির তাকে কতটা নগণ্য মনে করলে এমনটা করার সাহস পায়?

সুহানার বুক ফেটে কান্না আসছে। আজ যদি তার বাবা-মা থাকতেন, তবে কি কারো সাহস হতো একটা মেয়ের ঘরে এভাবে ঢুকে পড়ার? কেউ কি পারত তাকে এভাবে লাঞ্ছিত করতে? না, কেউ পারত না।

বাপ শব্দ টা মনে আসতেই সুহানার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত আর তাচ্ছিল্যের হাসি। নিজের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। সে বিড়বিড় করে উঠল, “বাপ ? বাপ হওয়া কি এতই সোজা? হাহ!”

পৃথিবীর মানুষের কাছে হয়তো বাবা হওয়া মানে অনেক বড় দায়িত্ব, কিন্তু তার কাছে বিষয়টা বড্ড তুচ্ছ। একাকীত্বের এই চরম অপমান তাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। জীবনটা তার কাছে আজ বড্ড বেশি ভারী মনে হচ্ছে; এই যন্ত্রণার চেয়ে মৃত্যুও যেন অনেক বেশি শ্রেয়।

ফিনা বাইরে থেকে ডাকছে, তার গলায় কিছুটা বিস্ময়, “আনা... দরজা খোল! আমি ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সব গরম গরম খাবার।”

সে দ্রুত বেডশিট গুছিয়ে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা একবার দেখল—ফোলা চোখ আর লাল হয়ে থাকা ঠোঁটগুলো তাকে যেন বিদ্রূপ করছে। দ্রুত মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে সে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কাউকে কিছু জানতে দেওয়া যাবে না, আর ফিনাকে তো একদমই নয়; ওই মেয়ে তো আরেক ‘মেন্টাল পিস’।

সুহানা নিজেকে শান্ত করে দ্রুত দরজা খুলে দিল। ফিনা ট্রে হাতে রুমে ঢুকে বিছানার ওপর সেটা রাখল।

“কিরে, হুট করে দরজা লক করেছিলি কেন?”

সুহানা চোখের পলক এড়িয়ে খুব স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে ছোট করে উত্তর দিল, -“এমনি... একা ছিলাম তো, তাই।”

হ্যাঁ!.....

ফিনা খাবারের ট্রে থেকে বাটিটা এগিয়ে দিয়ে হালকা চালে বলল, “আচ্ছা বাদ দে ওসব। এটা খেয়ে দেখ, আমাদের আজকের স্পেশাল নিউ ডিশ—স্রেফ আনার জন্য।”

কথাটা বলতে বলতেই ফিনা সুহানার মুখের দিকে তাকাল। সুহানার লাল হয়ে থাকা চোখ আর ফোলা মুখটা এবার আর ফিনার নজর এড়ালো না। সে কিছুটা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই, তোর কি শরীর খারাপ লাগছে? কী হয়েছে বল তো? মুখ-চোখ এমন লাল কেন?”

সুহানা তড়িঘড়ি উত্তর দিল, “না না, কিছু হয়নি। ঠান্ডায় গোসল করেছি তো অনেক দিন পরে , হঠাৎ পানি গায়ে লাগায় মনে হয় একটু ঠান্ডা লেগে গেছে। তাই এমন দেখাচ্ছে।”

সুহানা বিছানায় গিয়ে বসল। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ঝটপট স্যুপের বোলটা হাতে নিয়ে ফুঁ দিয়ে খেতে শুরু করল। সুহানার অভিনয়টুকু ফিনা সত্যি বলে বিশ্বাস করে আর কথা না বাড়ালো না খাবারগুলো গুছিয়ে দিতে লাগল।

ফিনা সুহানার সামনে বসে উৎসাহের সাথে আড্ডা আর গল্পের ডালি সাজিয়ে বসল। সুহানা প্রতিবারের মতো তার বুকের গহিনে জমে থাকা তীব্র কষ্ট আর লাঞ্ছনাকে আড়াল করে হেসে হেসে কথা বলতে লাগল। এই তো তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস—নিজের কোনো অনুভূতি, কোনো কান্না বা গোপন ইচ্ছেকে কখনো অন্য কারো সামনে প্রকাশ হতে দেয় না সে। মিথ্যে হাসির আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখতে সে এখন বড্ড পারদর্শী।

অন্যদিকে, জাহির গাড়ি থেকে নামল এক বিধ্বস্ত সত্তা নিয়ে। তার পরনের পোশাক এলোমেলো, আলুথালু পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলো । কম্পিত হাতে সে মেইন ডোর-এর কলিং বেল প্রেস করল। কিছুক্ষন এর মধ্যেই একজন সার্ভেন্ট এসে দরজা খুলে দিল। জাহির ভেতরে প্রবেশ করল সামনের দুটো সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে সে হোঁচট খেল।

সেই মুহূর্তে ড্রয়িং রুমে বসে আফ্রিদি কারোর সাথে কোনো ইম্পর্টেন্ট আলোচনায় মগ্ন ছিল। জাহির কে দেখে ফোনের ওপর প্রান্তে থাকা মানুষটিকে কথা বলা থামিয়ে দিয়ে সে শঙ্কিত দৃষ্টিতে জাহিরের দিকে তাকালো।

"আমি আপনার সঙ্গে পরে কথা বলছি, বাই।"

ফোনের ওপ্রান্তে থাকা মানুষটিকে একপ্রকার থামিয়ে দিয়েই আফ্রিদি ফোনটা সোফার ওপর ছুড়ে ফেলল। সে তড়িঘড়ি করে জাহিরের দিকে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে জাহির নিজেকে টলমলে পায়ে এগিয়ে এসেছে।

আফ্রিদি কাছে আসতেই জাহিরের চেহারাটা তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। বাতির আলোয় সে দেখল জাহিরের বিধ্বস্ত মুখ, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখের শূন্য দৃষ্টি। জাহিরের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া গালে হাতের আঙুলের স্পষ্ট লাল ছাপ দেখে আফ্রিদির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

কী হয়েছে ভাই?"

জাহির এক মুহূর্তের জন্য আফ্রিদির দিকে তাকাল, আফ্রিদি খেয়াল করল, রান্নাঘর থেকে দুজন সার্ভেন্ট উৎসুক হয়ে উঁকি দিচ্ছে। সেদিকে একবার কড়া চোখে তাকাতেই তারা ভয়ে ভেতরে সেঁধিয়ে গেল। জাহির কোনো কথা না বলে টলমলে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতে শুরু করল।

আফ্রিদি সোফা থেকে দ্রুত ফোনটা তুলে নিয়ে জাহিরের পিছু পিছু ছুটল। জাহির নিজের রুমে ঢুকতেই আফ্রিদিও তার সাথে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আফ্রিদি অস্থিরভাবে প্রশ্ন করল, "কী হয়েছে বলবি তো? তুই তো সুহানার সাথে দেখা করতে গেলি, তা এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি যে? আবারও কি ঝগড়া করেছিস? ও কি কিছু বলেছে তোকে?"

জাহির কোনো উত্তর দিল না। সে যন্ত্রের মতো হেঁটে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নার প্রতিফলনে নিজের বিধ্বস্ত মুখটা দেখল সে। আর সাথে সাথেই চোখের সামনে য়ে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের সেই দৃশ্য—নিজের কৃতকর্মের কথা ভেবে জাহিরের ভেতরটা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। তার মনে হলো, আয়নার ওপারে যে দাঁড়িয়ে আছে সে কোনো মানুষ নয়, বরং এক জানোয়ার।

ছিঃ! কী জঘন্য কাজ সে করে ফেলেছে! অনুশোচনার এক তীব্র বিষাক্ত ঢেউ জাহিরের সমস্ত চেতনাকে গ্রাস করে ফেলল।

আফ্রিদি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল, কিছুতেই পরিস্থিতির কূলকিনারা করতে পারছে না। জাহিরের নীরবতা আর এই অস্বাভাবিক আচরণ তাকে ভেতরে ভেতরে অস্থির করে তুলছে।

হঠাৎ জাহির এক ঝটকায় তার গায়ের হুডিটা খুলে ফ্লোরে ছুড়ে মারল। সে ধীর পায়ে আয়নার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতি ঘৃণায় তার রক্ত টগবগ করে উঠল।

পর মুহূর্তেই এক প্রচণ্ড শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল। জাহির সর্বশক্তি দিয়ে দেওয়ালে থাকা বিশাল আয়নাটার ওপর এক শক্তিশালী ঘুষি মারল। মুহূর্তেই কাঁচগুলো ঝরঝর করে ভেঙে সারা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। আফ্রিদি শিউরে উঠল; জাহিরের কাছ থেকে এমন জ্ঞানশূন্য কাজ সে কখনোই আশা করেনি। এমন কী হয়েছে ?

আফ্রিদি আর দেরি করল না। জুতো দিয়ে কাঁচ সরিয়ে সে দ্রুত জাহিরের কাছে গিয়ে তাকে টেনে নিজের সামনে নিয়ে এল। জাহিরের হাত থেকে তখন টপ টপ করে রক্ত ঝরছে, সাদা ফ্লোরটা লাল বর্ণ ধারণ করছে।

আফ্রিদি চিৎকার করে উঠল, “কী হচ্ছে এসব? কী করছিস তুই নিজের সাথে?

জাহির নিজের রক্তমাখা হাতটার দিকে তাকালো, তার গলার স্বরে ঝরে এক বুক হাহাকার , তীব্র আত্মগ্লানি। সে ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে উঠল, “বেশ করেছি! মরে যাওয়া উচিত আমার... যে মেয়েটাকে আগলে রাখার কথা ছিল, উল্টে আমিই তাকে আরও একটা ক্ষতবিক্ষত পরিস্থিতির মুখে ফেলে দিয়ে এলাম। সে আমাকে আর সহ্য করতে পারছে না... ও বলেছে আমার মুখ আর কোনোদিন দেখবে না! দেখবে না আমার মুখ!”

সে এক হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো সজোরে খামচে ধরলো। তার চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে; এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু তার চোখের কোণে টলমল করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে।

আফ্রিদির দিকে না তাকিয়েই সে আবারও বলতে লাগল, “আমি খুব খারাপ... আমি ওর সাথে অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি আফ্রিদি। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না ও আমাকে ক্ষমা করবে না কোনো দিন ভালবাসবে না !”

সারা ঘরে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এখানে থাকা নিরাপদ নয় দেখে আফ্রিদি জোর করেই জাহিরকে নিজের রুমে টেনে নিয়ে গেল। জাহির কোনো প্রতিরোধ করল না, যন্ত্রের মতো আফ্রিদির পিছু পিছু এল।

আফ্রিদি ফার্স্ট এইড বক্স বের করে খুব সাবধানে জাহিরের হাত থেকে কাঁচের টুকরোগুলো বের করতে লাগল। কাঁচগুলো মাংসের গভীরে গেঁথে গেছে, ক্ষতস্থান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাহিরের মুখে ব্যথার কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই। তার শূন্য দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ, সে ইহজগতে নেই।

আফ্রিদি ইতিমধ্যে ডাক্তারকে কল করেছে। জাহিরের এই অস্বাভাবিক শান্ত ভাব তাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলছে। সে জাহিরের সামনে একটা চেয়ার টেনে বসল, তারপর তার কাঁধে হাত দিয়ে খুব নিচু স্বরে ডাকল, "জাহির? কী হয়েছে আমাকে বলবি তো, সুহানা বলেছে ?"

আফ্রিদির প্রশ্নে জাহির ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। তার সেই লাল হয়ে থাকা নোনা চোখে এক অসীম হাহাকার। সে কেবল নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল—হ্যাঁ, সুহানাই বলেছে।

আফ্রিদি অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, “কী বলেছে ও? কী হয়েছে সেখানে?”

জাহির এবার মুখ খুলল,-, “আমাকে বলেছে ও আর কোনো দিন আমার মুখ দেখতে চায় না। ও আর কখনো আমার সামনে আসবে না আফ্রিদি... কোনোদিন না।”

জাহিরের কথা শুনে আফ্রিদি পুরো ভেবাচেকা খেয়ে গেল। আফ্রিদি জাহিরের কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে অস্থিরভাবে জিজ্ঞেস করল, “কেন বলেছে এমন? কী করেছিস তুই যে ও তোকে এতটা ঘৃণা করছে? মুখ খুলবি তো!”

কিন্তু জাহিরের যেন আবারও 'রেডিও অফ' হয়ে গেল।আফ্রিদি এবার মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “কিরে ব্যাটা, নাটক বন্ধ কর! মুখ ফুটে বলবি তো ঠিক কী করেছিস?”

জাহির মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বসে রইল। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর অত্যন্ত লজ্জিত কণ্ঠে স্বীকার করল, “আমি... আমি ওকে চুমু খেয়ে ফেলেছি।”

শুনেই আফ্রিদির চোখ কপালে উঠল। সে অবিশ্বাসের সুরে চিৎকার করে বলল, “কীহ্‌? কী বললি তুই?”

জাহির আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মাথায় ডার্টি থটস আসছিল ওকে দেখে... আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি আর অমন অমন করে ফেলেছি ”

আফ্রিদি অবিশ্বাস কন্ঠে বলল, “পুরোটা খুলে বল আমাকে। সেখানে ঠিক কী কী হয়েছে?”

জাহির একে একে সবটা খুলে বলল—জাহিরের কথাগুলো শুনতে শুনতে আফ্রিদি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে আর চেয়ারে বসে থাকতে পারল না, সশব্দে বেডে ধপ করে শুয়ে পড়ল।

ভাই তার সত্যি বড়ো খেলোয়াড়, এবার সত্যিই কামাল করে ফেলেছে! একটা মেয়ের বেডরুমে ঢুকে তার অমতে তাকে এমনভাবে আক্রমণ করা? তাও আবার সুহানার মতো মেয়েকে যে কি না আগুনের স্ফুলিঙ্গের চেয়েও বেশি ভয়ংকর । আফ্রিদি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবল, জাহির যে কেবল চড় খেয়ে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছে, এটাই তো মিরাকল!

আফ্রিদি বিছানা থেকে ঝট করে উঠে বসল এবং জাহিরকে আরও একবার ওপর-নিচ পরখ করে দেখল। তার কণ্ঠে তখন মিশ্র এক অনুভূতি—একদিকে ভাইয়ের জন্য মায়া, অন্যদিকে সুহানার প্রতি সমবেদনা। সে কিছুটা গম্ভীর হয়েই বলল, “সুহানা ভালো বলে স্রেফ একটা চড় মেরে তোকে ছেড়ে দিয়েছে। অন্য কোনো মেয়ে হলে নির্ঘাত তোকে লাংটা করে বাড়ি পাঠাতো। বাচ্চা মেয়েটার জন্য আমার খারাপ লাগছে—চেনা নেই জানা নেই, আর তুই কি না হুট করে গিয়ে তাকে চুমু খেয়ে বসে আছিস?”

জাহিরের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে আফ্রিদি কিছুটা নরম গলায় বলল, “তাও ভাই, তোর একটু নিজেকে কন্ট্রোল করা উচিত ছিল। কাজটা কিন্তু ঠিক হয়নি।”

জাহির এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিল, আফ্রিদির কোথাও তার দিকে তাকালো -, “ ও যদি অত সুন্দর হয় তবে আমি কী করব বল?

আফ্রিদি এবার একটু বাঁকা চোখে চেয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, “আরো বসে বসে নষ্ট বই পড়, অসভ্য জিনিস পড়লে মাথায় তো সব সময় ওই সবই ঘুরবে”।

জাহির মুহূর্তেই বুঝে নিল আফ্রিদি কোন ইঙ্গিত দিচ্ছে। লজ্জায় আর অপরাধবোধে সে কোনো উত্তর দিল না, চুপচাপ মাথা নিচু করে রইল।

“শোন, তুই গিয়ে সুন্দর করে একটা সরি বলিস, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েটা রেগে গিয়ে ওসব বলেছে, ওটা ওর মনের কথা নয়।”

কথাটা শুনে জাহির হঠাৎ আশার আলো দেখল। সে উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “যদি না মানে ?”

“তবে পায় ধরবি যতক্ষণ না ক্ষমা করবে ছাড়বি না”

“তুই সিওর?”

আফ্রিদি আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল, “আমি সব জানি। মেয়েদের মন বুঝতে অতটা কষ্ট হয় না।”

আফ্রিদির কথা শুনে জাহির আর এক মুহূর্ত দেরি করতে চাইল না, হুট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তাহলে আমি এখনই যাই!”

কিন্তু জাহির পা বাড়ানোর আগেই আফ্রিদি তাকে টেনে ধরে আবার বসিয়ে দিয়ে বলল, “কোথায় যাবি?”

“সরি বলতে।”

আফ্রিদি বিরক্তির স্বরে বলল, “তাহলে তো আবারও মার খাবি! ও এখন ভীষণ রেগে আছে। এখন যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। কয়েকটা দিন পার হতে দে, তারপর ধীরেসুস্থে সরি বলিস। দেখবি আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

জাহির অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুই সিওর তো?”

আফ্রিদি মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে বলল, “yes 300% sure”

ডাক্তার এসে জাহিরের হাতের ক্ষত পরিষ্কার করে ড্রেসিং করে দিয়ে গেছেন। ঘর থেকেও কাঁচের টুকরোগুলো সরিয়ে ফেলেছে একজন সার্ভেন্ট। এখন জাহিরের রুমে চলছে প্যাকিং-এর তোড়জোড়। জাহিরের হাত কাটা বলে আফ্রিদিই মূলত সব গুছিয়ে দিচ্ছে, আর জাহির পাশে বসে কেবল নির্দেশনা দিচ্ছে। সেই কখন থেকে শুরু করেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বার সে সুহানার কথা জিজ্ঞেস করে ফেলেছে। আফ্রিদি মনে মনে প্রচণ্ড বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না তার উত্তর দিচ্ছে, এমন পাগলা প্রেমিক সে এই জনমে দেখেনি ফিউচার এ আবার দেখার সম্ভবনা থাকতে পারে যদি ওর ছেলে মেয়ে এমন হয় তবে আফ্রিদি তখন তার ভাইপো ভাইজি কে ব্যাপার পাগলামির কথা বলবে না হওয়া মায়ের জন্য তার পাগল বাপের আর্তনাদ আহহা কতই না দুঃখ।

সুহানা নিজের রুমে চুপ করে বসে আছে। নিচে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। মনটা শান্ত করতে কিছুক্ষণ গিটারটা নিয়ে বসেছিল, কিন্তু তার সুরগুলো আজ যেন বিষাদ ছড়াচ্ছে। তাই গিটারটা রেখেদিয়েছে । কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।

নিজেকে এই অস্থিরতা থেকে বের করে আনতে সে কম্পিউটার ডেস্কের সামনে গিয়ে বসল। মুডটা ঠিক করা খুব জরুরি। সে ব্রাউজার খুলে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখতে লাগল কোন এনিমে নতুন সিজন এসেছে।

কিছুক্ষন পরেই সুহানার ফোন টা বেজে উঠল পাশে তাকিয়ে দেখলো বাইরের নম্বর, ভুরু কুঁচকে ফেলল সুহানা। দ্রুত রিসিভ করলো ওপাশে ভেসে এলো এক কান্নারত কন্ঠস্বর সুহানা বিচলিত হলো ধীর গলায় বলল, “হ্যালো...?”

তুহিনার গলার স্বর কান্নার তোড়ে ভেঙে আসছিল। "সুহানা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে রে! ভাইয়া আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। প্লিজ, তুই কিছু একটা কর... আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা..."

“দি..!হেলো

“ কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। হুট করে কলটা কেটে গেল।এক মুহূর্ত দেরি না করে সে দ্রুত ওই নম্বরটিতেই ব্যাক কল করল।

একবার, দুইবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হলো। সুহানা অস্থির হয়ে বলে উঠল, “হ্যালো! দি? দি, কথা বলো কি হয়েছে ?”

কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো মেয়েলি কণ্ঠস্বর শোনা গেল,

-“হ্যালো... হ্যালো ম্যাডাম”।

“কে বলছেন আপনি? দি কোথায়?ওকে ফোন টা একটু দিন”

“উনি তো চলে গেছেন, ম্যাডাম”।

সুহানা অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল, “কোথায় গেছেন?”

“ম্যাডাম, আমি এই দোকানের কর্মচারী। উনি এখানে শপিং করতে এসেছিলেন, খুব কান্নাকাটি করছিলেন। তারপর জরুরি দরকার বলে আমার ফোনটা চেয়ে নিয়ে আপনাকে কল করেছিলেন”।

সুহানা আবারও জিজ্ঞেস করল, “উনি কার সাথে এসেছিলেন? একা ছিলেন?”

“না না, ওনার সাথে ওনার ফ্যামিলির লোকজন ছিল। আর ওনার হবু বরও সাথে ছিলেন। সবাই মিলে বিয়ের কেনাকাটা করতে এসেছিলেন। কাজ শেষ করে ওনারা এইমাত্র গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন”।

“Okey, Thank you”

সুহানা দ্রুত হাতে আফ্রিদিকে কল লাগালো। একবার, দুবার—বারবার রিং হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আফ্রিদি ফোন রিসিভ করছে না।

“ধুর! দরকারের সময় এই লোকটা কখনোই ফোন ধরে না!”

এখন কী করবে সে? সুহানা ঝটপট হাত বাড়িয়ে কালো রঙের লম্বা ওভারকোটটা টেনে নিয়ে গায়ে চড়িয়ে নিল সাথে একটা সাদা রঙের মোটা উলের স্কার্ফ বের করে দ্রুত গলায় পেঁচিয়ে নিলো। অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে টেনে যেমন তেমন একটা হাত-খোঁপা করে নিলো। ফোনটা পকেটে গুঁজে সে দ্রুত বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এলো।

নিচে তখন ফিনা একজন কাস্টমারের অর্ডার নিয়ে আসছিল। সুহানাকে এমন তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যেতে দেখে সে ফিনা দ্রুত পায়ে সুহানার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, -“কী হয়েছে আনা? তুই এভাবে কোথায় যাচ্ছিস?”

সুহানা ফিনার হাত চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ফিনা… তুই পাসপোর্ট আর দরকারি সব জিনিস গুছিয়ে রাখ। আমরা বিডি যাচ্ছি।”

ফিনা আকাশ থেকে পড়ল। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন? হঠাৎ কী হয়েছে?”

“দি ঠিক নেই! অনেক বড় প্রবলেম হয়ে গেছে। আমি আগেই দি-কে এলার্ট করেছিলাম, কিন্তু আমার কথা শোনেনি। এখন দেরি করার মতো একদম সময় নেই।”

সুহানার কথা সে সবটা পরিষ্কার না বুঝলেও এটা বুঝতে পারল যে এটা ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন। ফিনা ব্যাগ গোছানোর জন্য পা বাড়িয়েও থামলো, দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তুই এখন কোথায় যাচ্ছিস?”

সুহানা দ্রুত দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, “আফ্রিদি ব্রো জানে না, তাকে জানাতে হবে”

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন