ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

২৭তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ২৭

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

গাড়ির চাকা স্থির হতেই সুহানা নেমে দাঁড়াল। ভাড়া মিটিয়ে দিতেই ট্যাক্সিটি চলে গেল। সুহানা চোখের চশমাটা খুলে একবার মুছে নিল, তারপর আবার সেটা পরে নিয়ে ধীরপায়ে হাঁটতে শুরু করল।

রাস্তা পার হয়ে, 'নো পার্কিং' এর পাস দিয়ে ভেতরে ঢুকল। কিছুদূর এগোতেই সে এসে দাঁড়াল জাহিরের বাড়ির সামনে। কিন্তু এটাকে কি আসলেও 'বাড়ি' বলা যায়? না, সাধারণ সংজ্ঞায় একে বাড়ি বলা চলে না।

একটি বিশাল খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। তার বাঁদিকের দেওয়ালে অত্যন্ত স্টাইলিশ ফন্টে লেখা— "Riemann Hypothesis"। নীলচে এলইডি আলোয় নামটা যেন অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলজ্বল করছে।

সুহানা অবাক হয়ে ভাবল, "এটা কেমন নাম? বাড়ি নাকি অংকের অনুশীলনী?"

নাম দেখে সুহানার বুঝতে বাকি রইলো না যে, এমন অদ্ভুত নাম কার দেওয়া হতে পারে। বড় গেট পেরিয়ে ভেতরে তাকাতেই চোখে পড়ল মডার্ন নিও-ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যে নির্মিত এক রাজকীয় ম্যানসন। তবে পুরো বাড়িটিই উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। মূল ফটকের সামনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন দেহরক্ষী।

সুহানা সামনে এগিয়ে যেতেই গার্ডরা সতর্ক হলো। সে গেটের কাছে পৌঁছানোর আগেই একজন গার্ড পথ আটকে সামনে এসে দাঁড়াল।

— "Who are you?" (আপনি কে?)

— "Human." (মানুষ।)

গার্ডটি ভ্রু কুঁচকে আবারও জিজ্ঞেস করল— "What?" (কী?)

সুহানা শান্ত স্বরে জবাব দিল, "আমি মিস্টার আফ্রিদির সাথে দেখা করতে এসেছি। ওনাকে ইনফর্ম করুন, না হলে আমাকে ভেতরে যেতে দিন।"

"আপনার কাছে কোনো কার্ড আছে?"

সুহানা পাল্টা প্রশ্ন করল, "What card?" (কীসের কার্ড?)

— "ম্যাডাম, without permission আপনি ভেতরে যেতে পারবেন না।"

সুহানা সহজভাবেই বলল, "ঠিক আছে, তাহলে permission নিয়ে আসুন। গিয়ে বলুন যে সুহানা ওনার সাথে দেখা করতে এসেছে।"

গার্ডটি মাথা নেড়ে সরাসরি না করে দিল, "দুঃখিত ম্যাম, এটা আমাদের রুলবুকের বাইরে। এভাবে কাউকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না"

শুরু হলো দুপক্ষের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি।কিন্তু গার্ডরা তাদের নিয়মের বাইরে এক চুলও নড়তে নারাজ। কোনোভাবেই তারা সুহানাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেবে না।

সুহানা গার্ডদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে এলো। সে আবারও আফ্রিদিকে কল করল, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই—ফোনটা রিসিভ হচ্ছে না।হাতে সময় একদমই কম।

সে ঘুরে দাঁড়িয়ে ভালো করে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করল। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে তাকাতেই চোখে পড়ে আরও একটি বিশাল, দুই পাল্লার অটোমেটিক গেট। এটি ম্যাট ফিনিশ দেওয়া কোনো দামী ধাতু বা উন্নতমানের অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল দিয়ে তৈরি। পুরো গেট এবং এর সংলগ্ন কংক্রিটের কাঠামোতে চারকোল শেড ব্যবহার করা হয়েছে। গেটের চারপাশের আয়তাকার কংক্রিট ফ্রেমের ভেতরের দিকে একটি কন্টিনিউয়াস LED স্ট্রিপ বসানো, যার আলো গেটটিকে একটি বর্ডারের মতো হাইলাইট করে রেখেছে।

গেটের দুই পাশে নিচে দুটি মেকানিক্যাল মোটর বা গেট ওপেনার দৃশ্যমান, যা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এটি রিমোট কন্ট্রোল বা স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বাম পাশের পিলারে বসানো একটি ছোট ডিজিটাল প্যানেল—সম্ভবত এটি ভিডিও ইন্টারকম, ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডার কিংবা কি-প্যাড লক।

সামনের বড় আকারের টাইলসগুলো তুষারের পাতলা আস্তরণে ঢাকা পড়েছে, যা একজন কর্মী যত্ন পরিষ্কার করছেন। চারিদিকের আকাশচুম্বী উঁচু পাঁচিলেও নান্দনিক পাথরের কারুকাজ। সেখানেও লাগানো LED স্ট্রিপ থেকে হালকা হলদেটে আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আকাশের মুখ ভার, বেলা বাড়লেও গুমোট পরিস্থিতির কারণে মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, যদিও আদতে তা নয়।

সুহানা দ্রুত পায়ে বাড়ির একদম পেছনের দিকে চলে এলো। এখানে কেউ নেই, কিন্তু সমস্যা হলো এই আকাশচুম্বী পাঁচিল—এটা টপকাবে কী করে? সে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিল। জিমন্যাস্টিক কাজে লাগবে কবে?আজই কাজে লাগানোর উপযুক্ত সময়। চোখের পলকে দেওয়াল টপকে সে ওপাশে নরম ঘাসের ওপর ল্যান্ড করল। উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকের দৃশ্য দেখে সে যেন ৪৪০ ভোল্টের এক বৈদ্যুতিক ঝটকা খেল।

তার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এল— "wooow!"

সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক মিনিমালিস্টিক স্টাইলে তৈরি এক অপূর্ব ম্যানসন। কালো এবং সাদা পাথরের বৈপরীত্য ভবনটিতে এক চরম আভিজাত্য এনে দিয়েছে। বিশাল সব ফ্লোর-টু-সিলিং কাঁচের জানালা দিয়ে ভেতরকার বিলাসবহুল ইন্টেরিয়র বাইরে থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই কাঁচের আবরণের কারণে যেমন পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ভেতরে ঢুকছে, তেমনি ভেতর থেকেও বাইরের মনোরম পরিবেশ উপভোগ করা যায়।

পুরো ভবনের মাঝখানে রয়েছে একটি কাঁচের গম্বুজ, যার ঠিক ওপরে ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশালাকার কৃষ্ণবর্ণের ঈগল ভাস্কর্য। প্রবেশপথের বৃত্তাকার পথের ঠিক মাঝখানে একটি সুন্দর ফোয়ারা, সেখানেও ডানা ঝাপটানোর ভঙ্গিতে বসানো রয়েছে আরেকটি ঈগলের ভাস্কর্য। ভবনের ডানদিকের ছাদে একটি কালো হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আর পেছনের দিকে তাকালে চোখে পড়ে এক বিশাল মাঠের অংশবিশেষ।

সুহানা দ্রুত সামনের গেটের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে বাম পাশে তার চোখে পড়ল একটি উজ্জ্বল নীল রঙের আধুনিক বাস্কেটবল কোর্ট। ঠিক তার পাশেই আয়তাকার একটি সুইমিং পুল, যার নীল জল টলটল করছে। অন্যদিকে, ডান পাশে রয়েছে পেশাদার মানের একটি বিশাল টেনিস কোর্ট, যা কালো নেট দিয়ে চারপাশ থেকে ঘেরা।

হঠাৎ একজন গার্ডকে এই দিকে আসতে দেখে সুহানা লুকানোর জায়গা খুঁজতে লাগল। একটু দূরে নিচের দিকে একটি আলো জ্বলতে দেখে সে দ্রুত সেই দিকে সরে গেল। সেখানে ‘BASECAMP’ লেখাটি তার নজরে এল, কিন্তু ভেতরে ঢোকার কোনো পথ নেই; এখানেও বসানো আছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডার।

সুহানা ওপরের দিকে তাকিয়ে ভাবল কাঁচ বেয়ে কীভাবে ওঠা যায়। মনে মনে বিরক্ত হয়ে ভাবল, কী এক ঝামেলায় ফেঁসে গেল সে! আফ্রিদি ফোনটা ধরলে এই কসরত করার কোনো দরকারই হতো না। সুহানার নিজেকে ছিঁচকে চোর বলে মনে হতে লাগল। গার্ডটি আবার নিজের জায়গায় ফিরে যেতেই সুহানা সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। বিশাল এক কাঠের দরজা, তার পাশেই কলিং বেল—কিন্তু সেটি অনেক উঁচুতে রাখা, সাধারণ উচ্চতায় হাত পৌঁছানো অসম্ভব। আবারও সেই লাফালাফি করতে হলো তাকে; এক লাফে কোনোমতে কলিং বেলটা বাজিয়ে দিল সে।

খুলে দিল। সে বিনীতভাবে বলল, "Welcome mam।" (স্বাগতম ম্যাম।)

কিন্তু সুহানা ভেতরে ঢুকতে যেতেই সেই পরিচারিকা সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল। সে পেশাদার ভঙ্গিতে চাইল— "কার্ড ম্যাম?"

সুহানা যা বোঝার বুঝে গেল; এখানে কার্ড ছাড়া প্রবেশাধিকার নেই। সে আশেপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো যে কেউ কোথাও নেই। এরপর তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল, যাতে গালের টোলটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। সেই হাসির আড়ালেই সুহানা অত্যন্ত দক্ষ হাতে মেয়েটির 'ক্যারোটিড সাইনাস'-এ হালকা চাপ দিল। মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

সুহানা নিচু স্বরে বলল, "Sorry for that।" (এটার জন্য দুঃখিত।)

এরপর সে দুটো সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এল। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই ওখানকার জাঁকজমক আর আভিজাত্য দেখে সে একেবারে ভেবাচেকা খেয়ে গেল।

তবে এখন আর চারপাশ দেখার সময় নেই। সুহানা দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। চারদিক একদম নিস্তব্ধ, কোথাও কোনো শব্দ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, সে খুঁজে পাবে কীভাবে? আফ্রিদি আদেও বাড়িতে আছে তো? সুহানা সামনে এক লম্বা করিডোর দেখতে পেল, ওপরের ঝকঝকে আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। সে যেন হঠাৎ করেই কোনো এক এলাহী মহলে ঢুকে পড়েছে।

“মানুষের টাকা থাকলে কত কী-ই না করে!”

এদিকে জাহির আর আফ্রিদি জাহিরের ঘরে প্যাকিং শেষ করে সেখানেই বসে ছিল। বেলা গড়িয়ে গেছে, দুপুরেও কিছু খাওয়া হয়নি। দুজনেরই বেশ খিদে পেয়েছে। জাহির বলল, "চল লাঞ্চ করব, খিদে পেয়েছে।" সে বিছানা থেকে নেমে স্লিপারটা পায়ে গলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আফ্রিদি তার আগে আগে এগোচ্ছে, আর জাহির তার পেছনে। ঠিক সেই সময় সুহানা ওপরের কারুকাজের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওই দিকেই আসছিল। খেয়াল না করায় সামনে থাকা একটি ছোট টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের ফ্লাওয়ার ভাসটি তার পায়ে লেগে নিচে পড়ে গেল। নিস্তব্ধতা ভেঙে কাঁচ ভাঙার এক বিকট 'ঝন ঝন' শব্দ হলো।

আফ্রিদি ততক্ষণে নিজের রুমে ফোন নিতে চলে গেছে। কাঁচ ভাঙার শব্দ পেয়ে জাহির পেছন ফিরে তাকাল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে দেখে সে রীতিমতো চমকে উঠল। —এটা কীভাবে সম্ভব?

জাহির ভাবল সে হয়তো পাগল হয়ে গেছে, নইলে কি এসব মতিভ্রম দেখছে? সে চোখ কচলে আবার তাকাল। না, সত্যিই সুহানা দাঁড়িয়ে আছে। জাহির আলতো পায়ে এগিয়ে গেল। সুহানা ভাঙা কাঁচগুলো পেরিয়ে সামনে তাকাল এবং জাহিরকে তার দিকে আসতে দেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জাহিরের হাতের সাদা ব্যান্ডেজটা সুহানার নজর এড়াল না; সে যখন দেখেছিল, তখন তো সব ঠিকই ছিল।

জাহির কিছুটা দূরত্ব রেখে সুহানার সামনে এসে দাঁড়াল। সকালের ঘটনার পর সুহানা আর তার দিকে তাকাল না, দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল নিচের দিকে। জাহিরের এখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না; সে ভাবল এটাও হয়তো তার কোনো কল্পনা। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে একটি আঙুল সুহানার দিকে বাড়িয়ে দিল। সুহানা মাথা তুলে চোখ ছোট করে তাকাল। জাহির হাত বাড়াতেই সুহানা তার হাত ধরে ফেলল।

জাহির বড় বড় চোখে সুহানাকে দেখে বিস্ময় হা হয়েগেছে

"What!" (কী!)

এরপর অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "তুমি সত্যি?"

সুহানা ঠিক বুঝতে পারল না এমন প্রশ্নের কী উত্তর দেবে। এমনিতেও এই লোকটির সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র রুচি নেই তার।

— "আফ্রিদি ব্রো কোথায়? একটু ডাকুন, কথা আছে।"

জাহির তখনও মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখেমুখে অবিশ্বাসের রেশ কাটেনি। জাহিরের এমন ভাব দেখে সুহানা বেশ বিরক্ত হলো। সে এবার গলা চড়িয়ে একটু জোরেই বলল, "আফ্রিদি ভাইকে একটু ডেকে দেবেন?"

জাহির চমক ভেঙে অস্ফুট স্বরে বলল, "হ্যাঁ!"

সে যেন পুরোপুরি বোকা বনে গেছে। তার মাথায় একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—সুহানা ভেতরে ঢুকল কীভাবে?

পরক্ষণেই জাহির নিজেকে সামলে নিল।গম্ভীর ও গমগমে গলায় বলল, "আমার সাথে এসো।"

সুহানা বাধ্য মেয়ের মতো জাহিরের পিছু পিছু হাঁটা দিল। তারা যখন আফ্রিদির ঘরের সামনে পৌঁছাল, জাহির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। কিন্তু সুহানা চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল না, বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল। তাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাহির ডাক দিল, "ভেতরে আসো।"

সুহানা শান্ত গলায় জবাব দিল, "না, আমি এখানেই ঠিক আছি।"

— "ও ওয়াশরুমে গেছে।"

— "আমি ওয়েট করছি।"

— "প্লিজ।"

সুহানা ঘরের ভেতরে ঢুকতেই জাহির দরজাটা আটকে দিল। তা দেখে সুহানা সন্দিগ্ধ চোখে জাহিরের দিকে তাকাল,দ্রুত পায়ে তার থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। সুহানার এই পিছু হটে যাওয়া দেখে জাহিরের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল—সুহানা কি তবে তাকে ভয় পাচ্ছে? থেকে সে তৎক্ষণাৎ দরজাটা আবার খুলে দিল।

সুহানা ঘরের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর জাহির ধীরপায়ে গিয়ে একটি সিঙ্গেল সোফায় বসল। মাথা নিচু করে বসে রইলো, লজ্জায় আর অনুশোচনায় সে যেন এখনই মরে যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল আফ্রিদি। সামনে সুহানাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে রীতিমতো চমকে উঠল। নিজের চোখে বিশ্বাস করতে না পেরে সে হাতে একটা জোরে চিমটি কাটল—ভূত দেখছে না তো?

না, ব্যথা লাগছে; তার মানে কোনো ভূত নয়।

আফ্রিদি অস্ফুট স্বরে ডাকল, "সুহানা?"

সুহানা ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল—উফ, শেষ পর্যন্ত দেখা মিলল! সে কিছু একটা বলতে চাইল, "ব্রো, দি..."

কিন্তু সুহানার মুখে তুহিনার কথা শুনতেই আফ্রিদি সবকিছু ভুলে গেল। সে বড় বড় পা ফেলে দ্রুত সুহানার কাছে এগিয়ে গেল। ওর হাত ধরে টেনে সযত্নে বিছানায় বসাল আর নিজে অস্থির হয়ে বসে পড়ল নিচের কার্পেটের ওপর। অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে সে প্রশ্ন করল—

— "তোতাপাখির কি হয়েছে বল, বল না কী হয়েছে?"

সুহানা অবাক হয়ে দেখল, এক মুহূর্তের মধ্যে আফ্রিদি কেমন পাগলাটে আচরণ শুরু করেছে। জাহির লক্ষ্য করল আফ্রিদি সুহানার হাত দুটো শক্ত করে মুঠোর মধ্যে ধরে রেখেছে, কিন্তু সে কিছু বলল না।

সুহানা আলতো করে আফ্রিদির হাত দুটো ধরল। কীভাবে শুরু করবে ভেবে পাচ্ছিল না সে। কাঁপা গলায় শুধু বলল, "দি... ভালো নেই ব্রো।"

আফ্রিদি দিশেহারা হয়ে পড়ল। "কী হয়েছে ওর? আমাকে বল প্লিজ! ও কেন আমার কল রিসিভ করে না? কেন ফোন সুইচড অফ? এতদিন কোনো কথা বলেনি—ও কি আমার ওপর রাগ করেছে? খুব রাগ হয়েছে, তাই না? আমি... আমি..."

"দি-কে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে ওর ফ্যামিলি।"

খবরটা শোনামাত্র আফ্রিদির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। জাহিরও স্তম্ভিত হয়ে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল। দুজনের মুখ থেকেই অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল— "What?" (কী!)

— "দি আমাকে অন্য একটা নম্বর থেকে কল করেছিল, সম্ভবত শপিং কমপ্লেক্সের কোনো স্টাফের ফোন থেকে হবে।"

— "তারপর?"

সুহানা একে একে সব কথা খুলে বলল আফ্রিদি আর জাহিরকে। সব শুনে আফ্রিদি পাথর হয়ে গেল; সে স্তব্ধ হয়ে ফ্লোরের ওপর বসে রইল। সুহানা আফ্রিদিকে উদ্দেশ্য করে বলল, "আমি আপনাকে অনেকবার কল করেছি, কিন্তু পাইনি।"

জাহির এবার নিজের জায়গা থেকে উঠে আফ্রিদির কাছে এগিয়ে গেল। সে হাঁটু গেড়ে ওর সামনে বসল এবং কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে ডাকল— "এই আফ্রিদি!"

আফ্রিদি শূন্য দৃষ্টিতে জাহিরের দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো ততক্ষণে জলে ভিজে উঠেছে। জাহির তাকে আশ্বস্ত করতে শান্ত স্বরে বলল, -"আমরা ওকে ঠিক খুঁজে বের করব, তুই চিন্তা করিস না। ও তোরই হবে। আমি আছি তো চিন্তা কিসের ?I promise তোর তুহিনা কে পাতাল থেকেও তুলে আনব শান্ত হয়"

আফ্রিদি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জাহিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে বলতে লাগল, -"ভাই, আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। তোতাপাখিকে ছাড়া আমি মরেই যাবো রে ভাই!"

আফ্রিদির করুণ অবস্থা দেখে সুহানার খুব কষ্ট হচ্ছে। এরেই কি ভালোবাসা কয়?জাহির যখন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল, তখন সে পাশ ফিরে সুহানার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হতেই সুহানা দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

কিছুক্ষণ পর আফ্রিদি একটু শান্ত হলে সুহানা তার কাছে এগিয়ে এল এবং সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। দৃঢ় স্বরে বলল, "we have to go।"

আফ্রিদি কেবল মাথা নাড়ল। তার আবারও কান্না পাচ্ছিল, তাই ঠোঁট কামড়ে সুহানার দিকে তাকাল। এত বড় ঝামেলার মাঝেও সুহানা সাথে যাবে শুনে জাহিরের মনটা গোপনে খুশি হয়ে উঠল, যদিও সে মুখে তার প্রকাশ ঘটাল না। আবেগপ্রবণ হয়ে আফ্রিদি সুহানাকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল, কিন্তু পারল না। জাহির আলতো করে হাত দিয়ে আফ্রিদিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। আফ্রিদি ভ্রু কুঁচকে জাহিরের দিকে তাকাল—এমন সিরিয়াস পরিস্থিতিতেও এই ছেলেটা এসব করছে!সুহানা এবার উঠে দাঁড়াল।

— "আমাকে এবার যেতে হবে," স

আফ্রিদি চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। সে বলল, "আমরা এমনিতেও আজ রাতেই যাচ্ছি, টিকিট বুক হয়ে গেছে। তোদেরটাও কি করে দেব"

সুহানা উত্তর দিল, "না, আমি করে নেব। টিকিট আছে কি না দেখতে হবে একবার।"

আফ্রিদি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলল, "না, তোদের একা ছাড়া যাবে না। তোরা ওখানের কিছু জানিস না, চিনিস না।"

— "আমি..."

আফ্রিদি থামিয়ে দিয়ে বলল, -"কোনো কথা নয়। বড়রা কিছু বললে শুনতে হয়, চুপ!"

— "আমার..." সুহানা আবারও শুরু করতে চেয়েও আর কিছু বলল না। সে বুঝল, এবার সত্যিই বেয়াদবি করে ফেলছে সে ।

— "সব প্যাকিং করে নে, আমি টিকিট বুক করে দিচ্ছি," আফ্রিদি নির্দেশ দিল।

— "হুম।"

— "এবার আমি যাই,"

— "হুম।"

জাহির আলতো করে আফ্রিদিকে ইশারা করল। আফ্রিদি দ্রুত সুহানার পিছু নিল এবং কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "শোন, তুই ভেতরে এলি কী করে?"

সুহানা নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, "পাঁচিল টপকে।"

— "কী?"

— "হ্যাঁ, সামনের গার্ডরা ঢুকতে দিচ্ছিল না, কার্ড চাইছিল। তাই ব্যাক সাইড দিয়ে ঢুকেছি।"

সুহানার কথা শুনে আফ্রিদি আর জাহির—দুজনেরই মুখ হা হয়ে গেল। বিস্ময়ে তারা বাক্যহারা।

গেটের কাছে পৌঁছে সুহানা একটি সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থামল। তারপর পেছনে ঘুরে সামনের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল। জাহির আর আফ্রিদি দুজনেই সেই দিকে তাকাল। দেখল, দরজা খোলা এবং একজন স্টাফ অচৈতন্য অবস্থায় সিঁড়িতে পড়ে আছে।দৃশ্যটি দেখে জাহির নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল।

আফ্রিদি রীতিমতো কেঁপে উঠে তোতলানো স্বরে বলল, "মে-মেরে ফেলেছিস?"

সুহানা দ্রুত জোরে জোরে মাথা নেড়ে বাধা দিয়ে বলল, "না না! এক ঘণ্টার মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। আসলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না, বারবার কার্ড চাইছিল, তাই..."

আফ্রিদি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বলল, "বুঝেছি, বুঝেছি।"

সুহানা লজ্জিত স্বরে বলল, "সরি।"

আফ্রিদি এবার নির্দেশ দেওয়ার সুরে বলল, "তোকে একা যেতে হবে না, জাহির তোকে পৌঁছে দিয়ে আসছে।"

সুহানা আপত্তি জানিয়ে বলল, "না, আমি একাই যেতে পারব।"

আফ্রিদি পাল্টা প্রশ্ন করল, "ওর সাথে যেতে তোর কি কোনো প্রবলেম আছে?"

সুহানা এবার মহাবিপদে পড়ল—কী বলবে সে? যা ঘটেছে তা তো আর মুখ ফুটে বলা সম্ভব নয়, এমনকি বলার মতোও নয়। জাহির কোনো কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। সে ভালো করেই জানে, সুহানা কখনোই তার সাথে যেতে রাজি হবে না।

— "না না, কোনো প্রবলেম নেই। আমি যেতে পারব, আপনি শুধু গার্ডদের একটু বলে দিন।"

আফ্রিদি মানল না, সে সাফ জানিয়ে দিল— "এই রাস্তা তুই একা যাবি না। আসার ব্যাপারটা আলাদা ছিল, এখন ওর সাথেই যা। আমার কিছু কাজ আছে, নইলে আমিই..."

সুহানা হার মানলো শেষে উপায় না পেয়ে রাজি হলো আর্গুমেন্ট শেষ হচ্ছে না।

— "তুই বস, আমি ওকে বলে আসছি।"

আফ্রিদি দ্রুত বড় বড় পা ফেলে জাহিরের ঘরে গেল। জাহির বাইরের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আফ্রিদির পায়ের শব্দ পেয়ে সে পেছন না ঘুরেই বিষণ্ণ স্বরে বলল, "তুই যা, আমি ঠিক আছি। আমাকে এখন একটু একা থাকতে দে।"

— "ও ঠিক আছে ! ও তোর সাথে যেতে রাজি হয়েছে, তাই বলছিলাম যে..."

আফ্রিদির কথা শেষ হওয়ার আগেই জাহির ছিটকে ওর সামনে চলে এল। সে যেন আনন্দে লাফাচ্ছে, অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করল— "সত্যি?"

আফ্রিদি জবাব দিল, "হ্যাঁ, আমি মানা..."

— "আমি যাচ্ছি, চল।" জাহির আলমারি থেকে জ্যাকেটটা বের করে গায়ে গলিয়ে নিল। সে আফ্রিদির আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু আফ্রিদি তার হাত ধরে থামাল।

— "এটাই কিন্তু মোক্ষম সুযোগ, বুঝলি? একটা 'সরি' বলে সব মিটমাট করে নে। মনে আছে তো আমি তোকে কী কী বলেছি?"

— "হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে।"

— "যাহ তবে, অল দ্য বেস্ট!"

— "ওকে।"

জাহির দ্রুত নিচে নেমে এল। সুহানা তখন নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। জাহির সুহানার সামনে আসতেই নিজের হাসিটাকে গিলে ফেলে বত্রিশ পাটি দাঁত ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। সে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,- "Come with me" (আমার সাথে এসো)।

নির্দেশ দিয়ে সে নিজেই আগে আগে হাঁটতে শুরু করল। সুহানা নিঃশব্দ চুপচাপ তার পিছু পিছু আসতে লাগল। আফ্রিদি হাত নাড়িয়ে তাদের বিদায় জানাল। একই সাথে সে সমস্ত গার্ডদের কড়া নির্দেশ দিয়ে দিল যে— এই মেয়েটি যখনই আসবে, তাকে যেন কোনোভাবেই আটকানো না হয়; তার জন্য কোনো কার্ডের প্রয়োজন নেই, তাকে যেন সরাসরি ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়।

জাহির গাড়িটি বের করে আনল। বাইরে বেরিয়ে সে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে হাত দিয়ে ইশারা করল। সুহানার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো মানুষ আর জাহির তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার। কিন্তু সুহানা তো হার মানতে জানে না, বিশেষ করে এই 'বিচ্ছু' লোকটার কাছে তো কখনোই নয়।

সে জাহিরকে অবাক করে দিয়ে পেছনের বদলে সামনের সিটের দরজা খুলে ধপ করে বসে পড়ল। জাহির হ্যাবলার মতো হা করে শুধু তাকিয়েই রইল। সুহানা সটান বলে দিল, "আমার ড্রাইভার সাজতে হবে না।"

জাহির যেন পুরোপুরি বোকা বনে গেল। মনে মনে সে কেঁদে গড়াগড়ি খেল—উফ, এই মেয়েটা কেন সবসময় তার সাথে এমন করে! এক অদ্ভুত জ্বালা। এদিকে সব স্টাফরা তাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। জাহিরের মতো একজন মেজাজি মানুষ কারো সেবায় ব্যস্ত, কারো জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিচ্ছে, আবার নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে—এসব দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া।

হঠাৎ 'ধুপ' করে কিছু একটা পড়ার শব্দ শুনে তারা দুজনেই সেই দিকে তাকাল। দেখা গেল বাগানের মালি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে; জাহিরকে ওভাবে সেবা করতে দেখে বেচারা রীতিমতো শক খেয়েছে। জাহির বুঝতে পারল আর দেরি করা ঠিক হবে না। সে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। দারোয়ান ততক্ষণে বাইরের দুটো বড় গেটই খুলে দিয়েছে।

গাড়ি রাস্তায় চলছে, কিন্তু জাহির এতই ধীরে ড্রাইভ করছে যে সুহানা প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, বাড়ি গিয়ে অনেক কাজ বাকি, এভাবে চললে তো এই জন্মে আর কাজ শেষ হবে না। কিন্তু সরাসরি কিছু বলতেও পারছে না। শেষমেশ বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেলল—

"একটু তাড়াতাড়ি চলুন, আমার কাজ আছে।"

ব্যাস, বলাই সার! জাহির মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল। হঠাৎ ঝটকায় সুহানা সিটের সাথে সেঁটে গেল এবং শক্ত করে সিট ধরে ফেলল। তার বুক ধড়ফড় করছে। রাস্তা ফাঁকা থাকায় জাহির ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। সুহানা আড়চোখে জাহিরের দিকে তাকাল; সে খুব সিরিয়াস মুখে ড্রাইভ করছে। সুহানা নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে সামনের দিকে তাকাল।

যে পথ যেতে ১৫ মিনিট লাগে, সেই পথ মাত্র ৮ মিনিটে পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে গেল তারা। গন্তব্যে পৌঁছাতেই জাহির সজোরে ব্রেক কষল। সুহানা একবার সামনের দিকে হেলে পড়ে আবার সিটে ফিরে এল। সে সিটে গা এলিয়ে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। জাহির আড়চোখে দেখল, উত্তেজনায় সুহানার বুক দ্রুত ওঠা-নামা করছে। মনে অন্যরকম কোনো অনুভূতি দানা বাঁধার আগেই জাহির চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

সুহানার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হতেই 'খট' করে শব্দ হলো; সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। জাহিরও তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল এবং সুহানা যাওয়ার আগেই ভূতের মতো উড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। হুট করে এভাবে জাহিরকে সামনে দেখে সুহানা দুই কদম পিছিয়ে গেল। জাহির আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে সুহানাকে গাড়ির বডির সাথে একরকম সেঁটে দাঁড়াল।

জাহির এগিয়ে আসতেই সুহানা হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিল—"Stop!" (থামো!)

জাহির সাথে সাথে থেমে গেল এবং দুই কদম পিছিয়ে এল। তারপর বিনীত স্বরে বলল, -"ষোলোআনা, I am sorry।"

কথাটা শুনে সুহানার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। এতক্ষণ সে ঘটনাটা ভুলেই ছিল, কিন্তু জাহির তাকে আবার সব মনে করিয়ে দিল। সে ক্ষোভের সাথে বলল, -"Sorry for what? হ্যাঁ? বারবার ভুল করবেন আর শুধু একটা সরি বলবেন, তাই না?"

জাহির আমতা আমতা করে বলল, "আমি আসলে..."

সুহানা তাকে শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল, "আপনি আমাকে একটু সাহায্য করেছিলেন, দয়া করেছিলেন—তার প্রতিদান হিসেবে আমাকে আপনার সাথে শুয়ে পড়তে হবে, এটাই তো আপনার ভাবনা? তাই তো?"

জাহির ঝট করে মাথা তুলে তাকাল। সুহানা তাকে এতটা নিচ আর খারাপ ভাবে? তার সম্পর্কে ওর ধারণা এতটাই জঘন্য? সে করুন স্বরে বলল, "তুমি আমাকে ভুল বুঝছ..."

— "আমি এতদিন পরে আপনাকে ঠিকই চিনেছি। আমাকে তো খুব সস্তা মনে হয় আপনাদের, তাই না? আপনি যখন খুশি আসবেন আর..."

জাহির আর সহ্য করতে পারল না, ক্ষিপ্রতায় সুহানার মুখ চেপে ধরল। আর্তনাদ করে সে বলল, "আল্লাহর দোহাই লাগে, এমন কথা বলো না! আমি ওসব ভাবি না। তুমি সস্তা নও, একদমই নও। যদি সস্তা হতে, তবে আমি তোমাকে স্পর্শই করতাম না। তুমি আমার কাছে অনেক দামী , তুমি expensive বলেই আমি... আমার ভুল ছিল, আমি স্বীকার করছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও, তবুও ওসব বলো না। আমার বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে, আমি এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে পারছি না। প্লিজ!"

সুহানা প্রথমে ছটফট করলেও এখন শান্ত হয়ে গেল। সে জাহিরের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে অনুশোচনা স্পষ্ট। সুহানা আলতো করে জাহিরের হাতটি নিজের মুখ থেকে সরিয়ে দিল এবং তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এল। সে আর পেছনের দিকে তাকাল না। আশেপাশে খুব বেশি লোকজন নেই, হাতেগোনা কয়েকজন যাতায়াত করছে। হাঁটতে হাঁটতে সুহানা হঠাৎ ভিমি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং নিচের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।

জাহির রাস্তায় বসে তার দুই পা জড়িয়ে ধরেছে। -, "প্লিজ সুহু, ক্ষমা করে দাও। প্লিজ!"

সুহানা আকাশ থেকে পড়ল। এটা কি কোনো মানুষ নাকি অন্য কিছু? ভররাস্তার মাঝে কেউ এমন আচরণ করে? সে অস্বস্তি নিয়ে আশেপাশে তাকাল; দেখল বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে তাদের এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখছে।

সে বিরক্ত হয়ে বলল, "কী হচ্ছে কী এসব?"

জাহির নাছোড়বান্দার মতো পা জড়িয়ে ধরে রেখেই জবাব দিল, "আমাকে ক্ষমা করো, নইলে আমি এখান থেকে নড়ব না, তোমাকেও যেতে দেব না।"

সুহানা ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল, "ছাড়ুন আমাকে!"

— "উঁহু, ছাড়ব না।"

সুহানা যেন এক মহা বিপদে পড়ল। জাহির পণ্ডিত তার দুই হাত আর পা দিয়ে সুহানার পা দুটো এমন শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল যে ছাড়ানোর কোনো উপায় নেই। ঠিক বাঁশ আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকা কোনো পাণ্ডা! তফাৎ শুধু এটুকুই যে, এখানে 'বাঁশ' অর্থাৎ সুহানা একটু ছোট আর 'পাণ্ডা' অর্থাৎ জাহির বিশাল বড়। বড় পাণ্ডার ভারে বাঁশ ভেঙে পড়ার উপক্রম, কিন্তু পাণ্ডা কিছুতেই তার বাঁধন আলগা করছে না।

সুহানা কোমরে হাত দিয়ে নিচের দিকে তাকাল। তার মনের ভেতরটা মায়ায় ভিজে উঠল। চারদিকে বরফ জমে আছে, প্রচণ্ড ঠান্ডা; অথচ জাহির সেই ঠান্ডার তোয়াক্কা না করে তার পা জড়িয়ে ধরে আছে। জাহিরের মুখ-চোখ বসে গেছে, লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে সে সুহানার দিকে একবুক আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে।

সুহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল, "আর কখনো ওই ভুল হবে?"

জাহির সাথে সাথে দুদিকে মাথা নেড়ে জানাল—না, আর কখনো নয়।

— "শিওর তো?"

জাহির দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল, "তুমি যত পারসেন্ট বললে আশ্বস্ত হবে, আমি তত পারসেন্টই শিওর।"

সুহানা এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না, হেসে ফেলল। সেই হাসি দেখে জাহিরের মনে হলো, তার কলিজাটা ভুনা হওয়া থেকে বেঁচে গেল।

সে কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে ক্ষমা করেছ তো?"

— "হুম।"

— "একদম মন থেকে তো?"

— "হুম।"

— "সত্যি বলছ?"

সুহানা এবার ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। জাহির এআর দাঁত বের করে একটা ক্লোজআপ হাসি দিয়ে বলল, "অপস, সরি!"

— "এবার উঠুন।"

জাহির বাধ্য ছেলের মতো উঠে দাঁড়াল এবং নিজের জামাকাপড় ও প্যান্ট থেকে বরফ বা ধুলো ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিল। তারপর কৃতজ্ঞতাভরে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ ষোলোআনা।"

সুহানা আবারও নিজের মুখটা গম্ভীর করে নিল এবং বলল, "এবার যান।"

জাহির সরে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পথ করে দিল। সুহানা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। ওপরে ওঠার সময় সে একবার পেছন ফিরে জাহিরের দিকে তাকাল। জাহির একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল; সে মূলত এটারঅপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। সুহানা তাকাতেই জাহির নিজের ডান হাতটা বুকের ওপর রাখল। সুহানা তা লক্ষ্য করলেও কোনো মন্তব্য করল না, শুধু মাথা নিচু করে ওপরে উঠে গেল।

জাহির নিজের বুকের ওপর হাত রেখে ধীর পায়ে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে হাসি লেগে আছে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছে সে; তার বুকের ভেতরের সেই অস্থিরতা কেটে গিয়ে এখন এক গভীর শান্তি বিরাজ করছে।

পেছনে হাঁটতে হাঁটতে জাহির একটা সাইকেলের সাথে ধাক্কা খেল, তবুও তার কোনো হেলদোল নেই; সে আপনমনে হেসেই চলেছে। সাইকেলের মালিক বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, "Are you crazy?" (আপনি কি পাগল?)

জাহির সেই লোকটার দিকে না তাকিয়েই দুই দিকে দুই হাত মেলে ঘোরের মধ্যে চিৎকার করে উত্তর দিল, "Yeah, I am crazy for her." (হ্যাঁ, আমি ওর জন্য পাগল।)

কথাটা বলেই সে আঙুল উঁচিয়ে সুহানার রুমের দিকে ইশারা করল। লোকটা আর কিছু না বলে তাকে আস্ত পাগল ভেবে সেখান থেকে চলে গেল। ভাবা যায়! জাহির উদ্দিনকে কেউ পাগল বলছে! ভাগ্যিস লোকটা জাহিরের মুখটা চিনতে পারেনি, চিনলে সে নিজেও পাগল হয়ে যেত।

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন