গল্প: প্রেমের আলোড়ন
লেখক: সুহান জয়
পর্ব: ৩০
(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)
কিছুক্ষণ আগেই তাদের ফ্লাইটটি অবতরণ করেছে। বিমান থেকে বাইরে পা রাখতেই সুহানার চোখে পড়ল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কুচকুচে কালো চকচকে গাড়ি। গাড়ির পাশে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, তবে দূরত্বের কারণে তার ঝাপসা মুখাবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
জাহির সুহানার ঠিক পেছনেই ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। এর মধ্যেই গার্ড এবং স্টাফেরা মিলে দ্রুততার সাথে সব ল্যাগেজ গাড়িতে তুলে ফেলল। সুহানা নিচে নেমে শান্তভাবে দাঁড়াল, আর ফিনাও কোনো কথা না বলে তার পাশে এসে যোগ দিল।
আকাশ একদম স্বচ্ছ ও পরিষ্কার। এখানেও এখন শীতকাল, তবে জার্মানির সেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডার তুলনায় এখানকার আবহাওয়া অনেকখানি সহনীয়। সুহানা তার সোয়েটারটা খুলে আগেই ব্যাগে ভরে ফেলেছে, এখন শুধু গলায় একটা স্কাফ জড়িয়ে রাখা।
গার্ডদের বিদায় করে দেওয়ার জন্য জাহির বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোমরা এবার রিটার্ন যাও। এখানে আমাদের আর কোনো গার্ডের প্রয়োজন পড়বে না।”।
নিরাপত্তার কথা ভেবে একজন কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল, “কিন্তু স্যার...”
জাহির তাকে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে সরাসরি বলে উঠল, “না, জাস্ট গো ব্যাক।”
জাহির কোনো দ্বিধা না রেখে দুই গার্ড, কেয়ারটেকার এবং পিএ—সবাইকে ফিরতি টিকিট ধরিয়ে বিদায় করে দিল। এখানে ব্যক্তিগত জেট রাখার মতো নিজস্ব জায়গা নেই, তাই পাইলট এবং জেটকে অন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখার অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
সব গুছিয়ে নিয়ে জাহির সুহানার দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “চলো।”
বলেই সে সুহানার হাত শক্ত করে ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। জাহিরের এমন আকস্মিক আচরণে সুহানা বেশ হকচকিয়ে গেল। অথচ কালকেই সে এই ছোঁয়াছুঁইয়ের জন্য ক্ষমা চেয়েছিল, কিন্তু আজ আবার সেই একই কাজ! লোক সমক্ষে কোনো ঝামেলা করতে চায় না বলেই সুহানা চুপ করে রইল। জাহির তার কোনো আপত্তির তোয়াক্কা না করে তাকে টেনে নিয়ে গাড়ির কাছে গেল এবং দরজা খুলে ভেতরে বসার ইশারা করল।
সুহানা বাধ্য হয়ে ভেতরে গিয়ে বসল। ফিনাও অন্য পাশের দরজা দিয়ে সুহানার পাশে গিয়ে বসল আর আফ্রিদি গিয়ে বসল সামনের সিটে, ড্রাইভারের পাশে। জাহির একবার পেছন ফিরে তাকাল—সেখানে বিদায় নেওয়ার অপেক্ষায় সবাই পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সবাইকে বিদায় জানানোর জন্য জাহির উচ্চস্বরে বলে উঠল, “থ্যাঙ্ক ইউ গাইস! টেক কেয়ার অ্যান্ড বাই-বাই!”
এরপর সে গাড়ির ভেতরে থাকা সুহানাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “একটু সরে বসো।” সুহানা ঠিক বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। জাহির আবারও জোর দিয়ে বলল, “সরে বসো ।”
সুহানা পাল্টা প্রশ্ন করল, “আপনি কি এখানে বসবেন?”
“হ্যাঁ, আমি এখানেই বসবো।”
সুহানা এবার নাছোড়বান্দার মতো বলল, “না, আমি উইন্ডো সিটেই বসবো।”
জাহির একটু হেসে হালকা স্বরে বলল, “ওহ, আচ্ছা! এই ব্যাপার? তাহলে তুমি নেমে যাও, আমি মাঝখানে বসি।”
সুহানা জেদ ধরে জবাব দিল, “নাহ!”
জাহির এবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। তার শান্ত ও গভীর চাহনি সুহানার দিকে স্থির। সে ধীর গলায় জানতে চাইল, “সরবে, নাকি আমি সরাবো?”
জাহিরের কণ্ঠ শুনে সুহানা আর তর্কে গেল না, সে বাধ্য হয়ে মাঝখানের সিটে সরে গেল। জাহির বিজয়ীর বেশে উঠে বসল। তাদের এই ছোটখাটো খুনসুটি দেখে সামনে বসা আফ্রিদি আর পাশে থাকা ফিনা মুখ টিপে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
জাহির ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিল, “লেট’স গো ডিয়ার!”
গাড়িটি টার্মিনাল ছেড়ে হাইওয়েতে উঠে এল। লম্বা সফরের ক্লান্তি সবার শরীরে, সিটে গা এলিয়ে দিতেই চোখের পাতায় রাজ্যের ঘুম নেমে এল। এখান থেকে গ্রামে পৌঁছাতে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগবে। ফিনা নিজের চাদরটা ভালো করে মুড়ি দিয়ে চোখ বুজল।
সুহানা আড়চোখে পাশে বসা জাহিরের দিকে তাকাল। সেও চোখ বন্ধ করে শান্ত হয়ে বসে আছে। এই শান্ত মুহূর্তে সুহানা নতুন করে জাহিরকে আবিষ্কার করল।
—জাহিরের নাকের ঠিক বাঁ পাশে একটা ছোট্ট কালো তিল আছে, আর কপালে একটা হালকা কাটা দাগ; হয়তো কোনো কালে সেখানে সেলাই পড়েছিল। জাহিরের মুখের গঠন ভীষণ সুন্দর, ঠিক কোনো রাজপুত্রের প্রতিচ্ছবি। তার বসার ভঙ্গি থেকে শুরু করে হাঁটাচলা—সবকিছুতেই এক সহজাত রাজকীয়তার ছাপ মিশে আছে। লোকটা কিছুটা জেদি আর পাগলটে ঠিকই, কিন্তু মোটেও অহংকারী নয়, বরং মনের দিক থেকে খুব ভালো।
সুহানা একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছিল। হঠাৎ একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বরের তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। সে চমকে উঠল যখন জাহির চোখ বুজেই বলে উঠল:
“অমন করে দেখো না, পরে কিছু হলে আমার দোষ দিও না কিন্তু! মনে রেখো, আমি তোমার পাশেই আছি।”
সুহানা কথাটার গূঢ় অর্থ বোঝার চেষ্টা করল না, কারণ অর্ধেক কথা শুনেছে সে বাকিটা ঠিকমতো শুনতেই পায়নি।
সামনে সুহানা একবার সামনের দিকে তাকাল; আফ্রিদি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জাহির তখনও চোখ বন্ধ করেই তার পাশে বসা রমণীর অস্থিরতা অনুভব করছিল। সে খুব আলতো করে বলল, “ঘুমাও সুহু, আমাদের পৌঁছাতে এখনো বেশ দেরি।”
সুহানা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চট করে চোখ বন্ধ করে ফেলল। লজ্জায় তার কান-মুখ লাল হয়ে উঠেছে—হাতে-নাতে এভাবে ধরা পড়ে যাবে সে ভাবতেও পারেনি। মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিল সে। জাহির যখন তাকে ‘ষোলোআনা’ বলে ডাকে, তখন তার খুব রাগ হয়; কিন্তু যখন মাথা নিচু করে তার দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে কোমল স্বরে ‘সুহু’ বলে ডাকে, তখন তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে ওঠে। সমুদ্রের ঢেউ যেমন কিনারায় আছড়ে পড়ে বালি নিয়ে যায় আর বিনিময়ে নতুন কিছু রেখে যায়, জাহিরও তেমনি তার মনের গহীনে আসে—সব ওলটপালট করে কিছু নিয়ে যায়, আবার বিপরীতে কঠিন এক অনুভূতি রেখে যায়।
অন্যদিকে, সুলাইমান মঞ্জিল আজ এক মহোৎসবে মেতেছে। বিরাট এক আয়োজন চলছে সেখানে। বাড়ির ছোট-বড় সবাই যারপরনাই ব্যস্ত; প্রত্যেকেই হাতে হাত মিলিয়ে কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে। বাড়ির বড়রা অর্থাৎ চাচারা সবটা তদারকি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এমন সময় জাহিরের মেজো চাচা চারপাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে ডাকলেন—
“রামিম!”
রামিম একটি চালের বস্তা কাঁধে করে ঘরে রেখে ঘুরে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ আব্বা, কিছু বলবে?”
মেজো চাচা অস্থিরভাবে বললেন, “এদিকে আয় বাপ। ওরা এখনো এল না, বেলা তো গড়িয়ে যাচ্ছে। এমনিতেও এখানকার অবস্থা ভালো ঠেকছে না সামনে ভোট, তুই ড্রাইভারকে একটা কল কর তো।”
রামিম আশ্বস্ত করে বলল, “এক্ষুনি করছি।”
অন্যদিকে, জাহিরের মা আর সেজো চাচি মিলে শাশুড়িকে ধরে এনে উঠোনের একটি চেয়ারে বসালেন। শীতকাল চলছে, শরীরটা কয়েকদিন ধরে বেশ ম্যাজম্যাজ করছে বুড়ির—একটু গায়ের রোদ লাগলে ভালো লাগবে।
শাশুড়ি আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বড় বউ, আমার নাতি দুইটা কখন আসবে?”
মা মৃদু হেসে বললেন, “এই তো মা, চলে আসবে এখন।”
বাড়ির এক কোণে তুহিনা একা বসে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। দুই হাত মেহেদির রঙে কালচে হয়ে গেছে; তার ফর্সা হাতে সেই গাঢ় রঙ ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। নকশার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে তার প্রিয়তম পুরুষের নাম। কিন্তু হাতের সৌন্দর্যের বিপরীতে তার বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। তুহিনা অনুভব করছে, আজই এই পৃথিবীতে তার শেষ দিন। তাকে বাঁচাতে কেউ আসেনি, কোনো আশার আলোও আর অবশিষ্ট নেই।
কাল থেকে সে দানাপানি স্পর্শ করেনি, সব খাবার ফেলে দিয়েছে। শরীরটা আর চলছে না তার। কিছুক্ষণ আগেই কাজিনরা মিলে তাকে জোর করে গোসল করিয়ে দিয়ে গেছে। একরাশ ক্লান্তি আর হাহাকার নিয়ে সে শুধু সময়ের অপেক্ষা করছে।
বিছানায় রাখা লাল বেনারসি শাড়িটার ওপর তুহিনার নজর পড়ল। শাড়িটা সুন্দর চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো। তার স্বপ্ন ছিল এই শাড়িটা পরেই সে আফ্রিদির সাথে ঘর বাঁধবে; কিন্তু সেই মানুষটার সাথে একটা ছোট্ট সংসার করা আর হলো না তার।
ঘরের ভেতর বড্ড শোরগোল, যা তার একটুও ভালো লাগছে না। সবাই এটা-সেটা নিয়ে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। তুহিনার চোখে এখন আর জল নেই, কান্নার সবটুকু পুঁজি ফুরিয়ে গেছে। অন্যের নামের হলুদ ইতিমধ্যে তাকে স্পর্শ করে ফেলেছে।
এমন সময় তার বাবা আতিফ সাহেব দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করলেন। তাকে দেখা মাত্র ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “তুহিনার সাথে আমার একটু কথা আছে, তোমরা কি একটু বাইরে যাবে মা?”
মেয়েরা সমস্বরে “জি আঙ্কেল” বলে একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তুহিনা একবারের জন্যও মাথা তুলে তার বাবার দিকে তাকাল না। আতিফ সাহেব লক্ষ্য করলেন, গত এক মাস ধরে এটাই হয়ে আসছে। তিনি তুহিনার সামনে এসে দাঁড়ালেন, নিজের পাঞ্জাবিটা একটু ঝেড়ে নিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিলেন।
“আমি যা করেছি বা এ পর্যন্ত যা করছি, তা তোমার ভালোর জন্যই করেছি। বাবা কোনোদিন তার সন্তানের খারাপ চায় না মা।”
তুহিনা নির্লিপ্ত স্বরে পাল্টা প্রশ্ন করল, “এবার কী হুকুম করতে এসেছেন, সেটা বলুন।”
মেয়ের কাছ থেকে এমন তপ্ত কথা আতিফ সাহেব আশা করেননি। তার ভীষণ রাগ হলো, ইচ্ছে হলো ঠাস করে একটা চড় মারতে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নিলেন তিনি।
আতিফ সাহেব কঠোর গলায় বললেন, “বাইরে অনেক লোকজন। আমি কয়েকজন মেয়ে পাঠাচ্ছি তোমাকে সাজানোর জন্য; তাদের সাথে যেন কোনো রকম বেয়াদবি না হয়। তোমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ যেন আমার কানে না আসে, অন্যথায় তোমার গলা টিপে এখানেই কবর দিয়ে দেবো, যে মেয়ে বাপেরসন্মানরাখতেপারে না তেমন মেয়ে আমার দরকার নেই”।
নিজের কথা শেষ করে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তুহিনা পাথরের মতো চুপ করে রইল, একটি শব্দও উচ্চারণ করল না; নিজের সবটুকু হাহাকার সে মনের গহীনে দাফন করে দিল। এরপর সে ধীরহাতে পাশের ড্রয়ারটা খুলে একটি বক্স বের করল এবং সেটি হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল—
“আমায় ক্ষমা করে দিও, আমি কিছুই করতে পারলাম না। এই দুনিয়াতে না হোক, ওপারে আমরা একসাথেই থাকব। আল্লাহ, আমার অপরাধের শাস্তি তুমি ওকে কেন দিচ্ছ? আমাকে দাও, কিন্তু ওকে তুমি রেহাই দাও।”
এদিকে গ্রামের মেঠো পথ চিরে দ্রুত গতিতে গাড়ি ছুটে চলেছে। রাস্তার দুপাশে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ খেত—এক ভীষণ মনোরম দৃশ্য। জাহির আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসল; তারা গ্রামে ঢুকে পড়েছে। পাশে তাকিয়ে দেখল সুহানা ফিনার কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সে পরম মমতায় সুহানার গায়ের চাদরটা টেনে দিল।
গাড়ির হর্নের শব্দ কানে আসতেই বাড়ির সবাই কাজ ফেলে প্রধান ফটকের দিকে ছুটে এল। দারোয়ানরা বড় গেটটা খুলে দিতেই গাড়িটি ধীরলয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়ির সবাই মুহূর্তেই গাড়িটিকে ঘিরে ধরল। জাহির দরজা খুলে বাইরে পা রাখল, আর আফ্রিদি বের হলো সামনের সিট থেকে। জাহির আফ্রিদি কে দেখামাত্রই শুরু হলো এক আবেগঘন ফ্যামিলি ড্রামা; চাচিরা তাকে দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
ভাই-ব্রাদারেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে, আর ছোট বোনেরা আনন্দে হইহুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে। ভিড়ের মাঝখান থেকে দাদি ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, “এই সর, সবাই সর! আমার নাতিরে দেখতে দে আগে।”
সবাই হাসাহাসি করে পথ ছেড়ে দিল। জাহির তার দাদিকে দেখে এগিয়ে এসে ডাকল, “দাদি!”
দাদি নাতির মুখটা দুহাতে আগলে ধরে বললেন, “কত বড় হয়ে গেছিস তুই! একদম তোর দাদুর মতো দেখতে হয়েছে রে।”
জাহির হেসে জিজ্ঞেস করল, “তোমার শরীর কেমন আছে এখন?”
“তোরে দেইখা আমি এক্কেবারে ভালো হয়ে গেছি ভাই!”
আফ্রিদি একটু মজা করে পাশ থেকে বলে উঠল, “আমারে তো ভুলেই গেলে গো দাদি!”
দাদি হেসে উত্তর দিলেন, “আহা, আমি তোরে ভুলতে পারি নাকি?”
সবাই যখন এমন হাসি-ঠাট্টায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই সুহানা আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু বাইরে আসতেই দেখল বাড়ির সবাই হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রস্তুত হয়ে সে দ্রুত হাত নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ফিনাও ধীরপায়ে নেমে এসে সুহানার পাশে দাঁড়াল।
পেছনে তাকিয়ে সুহানাকে দেখে জাহিরের হুঁশ ফিরল—আবেগের চোটে সে ভুলেই গিয়েছিল যে সুহানাও সাথে আছে। জাহিরের মা সাবেরা বেগম এগিয়ে এলেন; ছেলের কাছে তিনি আগেই সুহানার কথা শুনেছেন। তবে জাহাঙ্গীর সাহেব দূর থেকে সুহানাকে দেখে স্থবির হয়ে রইলেন। তার মনে হচ্ছে এই মুখটা বড্ড চেনা, কোনো এক পুরনো স্মৃতি বারবার কড়া নাড়ছে তার মনে।
সাবেরা বেগম সামনে আসতেই সুহানা কিছুটা জড়তা নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় তাকে সালাম দিল। সাবেরা বেগম কিছুটা অবাক হলেও সামলে নিয়ে সালামের উত্তর দিলেন। তিনি মায়াভরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “খুব কষ্ট হয়েছে মা আসতে?”
সুহানা দ্রুত উত্তর দিল, “না না আন্টি, ঠিক আছে।”
সাবেরা বেগম সুহানার মুখের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকালেন। মেয়েটার মায়াবী চেহারা দেখে কলিজা ঠান্ডা হয়েযাবে।ন নাক-নকশার গঠন থেকে শুরু করে ডাগর ডাগর চোখ জোড়া—সবই ভীষণ সুন্দর। একদম বাচ্চা একটা মেয়ে। তিনি পাশে থাকা ফিনাকেও দেখলেন, দুজনেই আলাদা ধাঁচের একজন সুন্দরী একজন মায়াবী।
জাহির এগিয়ে এসে সুহানার অস্বস্তি কাটাতে বলল, “ষোলোআনা, এসো সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।”
জাহির তাকে এক প্রকার টেনে নিয়ে গেল সবার মাঝখানে। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে নবাগত সুহানার দিকে তাকিয়ে আছে। জাহির একে একে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করল: “ইনি আমার আব্বু, আর পাশের জন আম্মু। ওনারা আমার মেজো আব্বা জাসমির আর মেজো চাচি আয়না। ওদিকে সেজো আব্বা জিসান আর সেজো চাচি মালেহা। আর এই যে আমার ছোট চাচু বিহান আর ছোট মা রুবাইদা।”
বেচারি সুহানা একে একে সবাইকে সালাম দিতে দিতে রীতিমতো হাঁফিয়ে উঠল। সবার পরিচয় শেষ করে জাহির সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করল “আর এটি হলো সুহানা উরফে ষোলোআনা।”
দাদি জাহিরের হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়ে সোৎসাহে বলে উঠলেন, “মেলা সুন্দর তো রে! বিয়া কইরা ফালাইলি, অথচ আমারে একবার জানাইলিও না!”
দাদির কথা শুনে সুহানা হকচকিয়ে গেল। অন্যদিকে জাহির কিছু না বলে মনে মনে মিটিমিটি হাসতে লাগল। পরিস্থিতি সামাল দিতে ছোট মা রুবাইদা বলে উঠলেন, “আরে না না মা, ও তো ওদের সাথে দেশ ঘুরতে এসেছে।”
দাদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অ্যাঁ! কী কইলে ছোট বউ? বিয়া করে নাই?”
“না মা।”
“কে করে নাই?”
দাদির এমন উল্টোপাল্টা প্রশ্নে সেখানে আরও একবার হাসির রোল পড়ে গেল। অবস্থা দেখে সেজো আব্বা জিসান সাহেব সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “অনেক হয়েছে, এবার থামো। ওরা অনেক দূর থেকে জার্নি করে এসেছে, এখন একটু বিশ্রাম নিতে দাও।”
তার কথা শুনে সবাই একে একে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। এদিকে বাড়ির কর্মচারীরা এসে গাড়ি থেকে তাদের ব্যাগ আর মালপত্রগুলো নামিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল।
সুহানা এবার বাড়িটার দিকে ভালো করে নজর দিল—পুরো যেন এক বিশাল রাজপ্রাসাদ! খিলানযুক্ত লম্বা বারান্দা আর কারুকার্যময় গম্বুজগুলো এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিটি পিলারের সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং সিঁড়ির রেলিংয়ের জ্যামিতিক নকশা আভিজাত্যের এক অনন্য স্বাক্ষর বহন করছে। বাড়িটি অনেক আগে তৈরি হলেও এখনো তা সজীব ও প্রাণবন্ত। পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায় এক বিশাল বাগান, যেখানে নানা রকম গাছে ফলে ভরে আছে আর ফুটে আছে হরেক জাতের ফুল। বাড়ির ঠিক মাঝখানে, অর্থাৎ বড় সদর দরজার ওপরের দিকে একটি কালো রঙের সিংহের মাথা দেখা যাচ্ছে। তার ঠিক নিচেই শ্বেতপাথরের ওপর খোদাই করে লেখা আছে—‘সুলেমান মঞ্জিল’। বিশাল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদের উঁচু উঁচু পিলারগুলো দেখে সুহানার মনে হলো, সে যেন হঠাৎ করেই কোনো প্রাচীন রাজার আমলে চলে এসেছে।
ফিনা পাশ থেকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফিসফিস করে বলল, “কিরে?”
সুহানা ঘোর কাটিয়ে উত্তর দিল, “হুম?”
ফিনা মুগ্ধ হয়ে বলল, “জাহির ভাইরা তো দেখছি অনেক বড়লোক!”
সুহানা কঠোর চোখে তাকাতেই ফিনা সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল। সুহানা আবার চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগল; কিছুটা দূরে ডান পাশে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ আর তার নিচে একটি কাঠের দোলনা রাখা। সেখান থেকে একটি বড় ঝিল দেখা যাচ্ছে, যেখানে সূর্যের আলো পড়ে জল চিকচিক করছে। ঝিল থেকেই আসা শীতল হাওয়া তাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জাহির আর আফ্রিদিকে এখন আর কে পায়! তারা ভাইদের সাথে মিলে বাগানে ছুটেছে। তাদের ছোট ভাইরা এক মুহূর্তের জন্যও জাহিরকে হাতছাড়া করতে রাজি নয়, সবাই তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে।
বাড়ির এক পাশে বড় বড় চুলোয় রান্নাবান্না চলছে, যেখান থেকে আগুনের কালো ধোঁয়া উপরে উঠে গিয়ে নীল আকাশে মিশে যাচ্ছে। সাবেরা বেগম দূর থেকে সেটা লক্ষ্য করলেন এবং বুয়াকে প্রয়োজনীয় কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সুহানাদের দিকে এগিয়ে এলেন। তাকে আসতে দেখে ফিনা হালকা করে সুহানাকে ধাক্কা দিল। সুহানা তাকাতেই ফিনা চোখের ইশারায় সাবেরা বেগমকে দেখাল। সুহানা তৎক্ষণাৎ সচেতন হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সাবেরা বেগম কাছে এসে মমতা মাখানো স্বরে বললেন, “কী হলো মা? তোমরা এখনো বাইরেই দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
সুহানা কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “না না আন্টি, এমনি দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
“আসো আমার সাথে, তোমাদের থাকার ঘরটা দেখিয়ে দিই। একটু বিশ্রাম করো গে।”
সুহানা বিনীতভাবে বাধা দিয়ে বলল, “না না আন্টি, ইটস ওকে। আপনাকে এত কষ্ট করতে হবে না, আমরা এমনিতেই...”
সাবেরা বেগম তাকে আর কথা বাড়াতে দিলেন না। বেশ আদুরে ধমকের সুরে বললেন, “একদম চুপ! আমার সাথে আসো। আর ফিনা, তুমিও আসো আমাদের সাথে।”
সাবেরা বেগম সুহানার হাত ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন। ভেতরের দৃশ্য দেখে সুহানা এবার আরও বেশি অবাক হয়ে পড়ল। পুরো ছাদটি সোনালী রঙের সূক্ষ্ম নকশায় মোড়ানো এবং তার মাঝে আয়নার কাজ করা হয়েছে, যা আলোর প্রতিফলনকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ছাদের ঠিক মাঝখান থেকে একটি বিশালাকার ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি ঝুলে আছে।
বিশাল হলরুমটি দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো পিলারের ওপর। প্রতিটি পিলারে সোনালী কারুকার্য এবং নকশা করা ক্যাপিটাল শোভা পাচ্ছে। পিলারের মাঝখানের বারান্দাগুলোতে লোহার গ্রিলের অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজ নজরে পড়ে। মেঝের মার্বেল পাথরগুলো আয়নার মতো চকচক করছে। হলরুমের মাঝখানে রয়েছে একটি বড় বৃত্তাকার পার্সিয়ান গালিচা, যার গাঢ় নীল এবং সোনালী রঙের কারুকার্য পুরো পরিবেশের আভিজাত্যকে পূর্ণতা দিয়েছে। গালিচার পাশে রাখা হয়েছে লাল মখমলের রাজকীয় বসার আসন। তবে সবকিছুর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি তেজী ঘোড়ার ধাতব ভাস্কর্য, যা একটি মার্বেল পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়েছে—এটি শক্তি এবং ঐতিহ্যেরই প্রতীক।
সুহানা আর ফিনা বিস্ময়ের পর বিস্ময় নিয়ে দেখছিল সবকিছু। হলরুমের মাঝখান দিয়ে একটি চওড়া সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে; সাবেরা বেগম তাদের সেই পথেই নিয়ে চললেন। সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসতেই একটি বড় করিডোর চোখে পড়ল। সেটি পেরিয়ে তিনি একটি ঘরের দরজা ঠেলে তিনজনকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।
সাবেরা বেগম শান্ত স্বরে বললেন, “এটা তোমাদের রুম।”
সুহানা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ আন্টি।”
সাবেরা বেগম মৃদু হেসে বললেন, “না মা, এখনো তোমাদের জন্য আমি কিছুই করতে পারিনি। তোমরা একটু রেস্ট নাও, আমি আসছি।”
সুহানা সম্মতি জানিয়ে বলল, “আচ্ছা।”
সাবেরা বেগম ঘর থেকে চলে যাওয়ার পর সুহানা পুরো ঘরটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ঘরের মাঝখানে একটা বিশাল খাট, যা মেঝে থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে বসানো; সেখানে ওঠার জন্য এমনকি দুটো ছোট সিঁড়িও রয়েছে। বামদিকের ওয়াশরুমের দরজা খুলতেই সুহানা দেখল ভেতরে একটি জানালা, যেখান দিয়ে আসা পর্যাপ্ত আলোয় পুরো বাথরুমটি ঝলমল করছে। গোসলখানাটি বেশ বড় এবং সেকেলে আমলের তৈরি। কোণায় একটি চৌকোমতো জায়গায় জল রাখা আছে, পাশে তোয়ালে ঝোলানোর ব্যবস্থা এবং একটি ছোট তাকও রয়েছে।
সুহানা দরজা বন্ধ করে পাশে থাকা গোলাকার বারান্দাটির দিকে পা বাড়াল। ফিনাও তার পিছু পিছু এল। এখান থেকে পুরো বাগানটা নজরে পড়ছে এবং নিচ থেকে ছেলেদের হইহুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছে। একরাশ টাটকা বাতাস ফুসফুসে টেনে নিল সুহানা; তার মনটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল।
সে ফিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “চল, এবার ফ্রেশ হয়ে নিই।”
ফিনা সায় দিয়ে বলল, “হুম।”
অন্যদিকে বাগানে, জাহির আর আফ্রিদি একটা গাছের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। গাছের মগডালে লুঙ্গি পরে জাঁকিয়ে বসে আছে তাসিন। তাকে ওই অবস্থায় দেখে জাহির হেসে কুটিপাটি। তাসিন ওপর থেকে চিৎকার করে ডাকল, “দাদাভাই...!”
কিন্তু জাহিরের হাসি যেন থামছেই না, কারণ তাসিন যেভাবে লুঙ্গি পরে মগডালে ঝুলে আছে, তাতে যেকোনো সময় অঘটন ঘটে যাওয়ার ভয় রয়েছে কারণ সে নিচে কিছুই পড়েনি !
জাহির কোমরে হাত দিয়ে তাসিনের দিকে তাকিয়ে কৌতুকভরা কণ্ঠে ছড়া কেটে বলে উঠল:
~“কী হয়েছে বাছা?
আলগা কেন কাছা?”~
তাসিন গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, “বড়দা, তিতাস আমাকে গাছে তুলে দিয়ে মই নিয়ে চলে গেছে! আমাকে বাঁচাও বড়দা, আমার ভীষণ ভয় লাগছে!”
কথাটা শুনে জাহির আফ্রিদির দিকে তাকাল, আফ্রিদিও জাহিরের দিকে। জাহির আবার হাসতে হাসতে বলল:
~“গাছে তুলে মই টেনেছে
ডোরেমনের চাচা!” ~
দুইজনে মিলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, এদিকে তাসিনের তখন ভয়ে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা। শেষমেশ জাহির তিতাসকে ডেকে পাঠাল এবং মই নিয়ে এসে তাসিনকে নিচে নামিয়ে আনল। নিচে নামতেই জাহির ধমক দিয়ে বলল, “সোজা বাড়ি যাবি দুইজন, ঠিক আছে?”
ধমক খেয়ে তিতাস আর তাসিন আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, সোজা দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল। এবার বাগানের মাঝে পাঁচ ভাই এক জায়গায় হলো। গল্পের ফাঁকে রামিম হঠাৎ আফ্রিদিকে জিজ্ঞেস করল, “দাদাভাই কি ওই মেয়েটাকে বিয়ে কবে?”
আফ্রিদি মাথা নেড়ে উত্তর দিল, “জানি না।”
রামিম অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “তাহলে ওর বাড়ি কোথায়, সেটা জানো?”
আফ্রিদি আবারও সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, “নাহ।”
সবাই বেশ অবাক হলো। যদি মেয়েটার ঠিকানাই না জানা থাকে, তবে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে কীভাবে? আর এর মধ্যে যদি মেয়েটার বিয়ে হয়ে গিয়ে থাকে, তবে তো সব শেষ! কিন্তু আফ্রিদির সামনে এখন কোনো নেতিবাচক কথা বলা যাবে না; কারণ ওর মনের অবস্থা যা, তাতে একটু এদিক-সেদিক হলেই ছেলেটা হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
জাহির গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এবার বল, তোদের প্ল্যান কী?”
আফ্রিদি সরাসরি জাহিরকে বলল, “ভাই, সুহানাকে ডাক। ওকে ছাড়া কিছু হবে না। ও অন্তত কিছুটা হলেও জানবে। আমার কিছু জানা নেই।”
আফ্রিদির কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল, কেউ কোনো কথা বলছে না। জাহির গভীর চিন্তায় পড়ল—এখন উপায় কী?
এদিকে সুহানা গোসল সেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল; ফিনা তার আগেই গোসল সেরে নিয়েছে। সুহানা বাইরে এসেই দেখল বিছানার ওপর চারজন মেয়ে বসে আছে। সে বের হতেই তারা উৎসুক চোখে তার দিকে তাকাল। সুহানা ধীরপায়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে তার চশমাটা পরে নিল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে নজর পড়ল তার। মেয়েটি বেশ লম্বা; আসলে এ বাড়ির সবাই লম্বা কিন্তু সাবেরা বেগম ছোটো খাটো তবে তার থেকে লম্বা! মেয়েটির নাম রুহানি। সে জাহিরের মতোই বেশ ফর্সা, আর বাকি যারা বসে আছে তাদের মুখগুলোও দারুণ সুন্দর। এদের সবার মাঝে সুহানা একটু অস্বস্তি অনুভব করতে লাগল। ফিনা ফর্সা হলেও সুহানা নিজে একটু শ্যামবর্ণের বা 'ডাস্কি'।
লজ্জায় আর অস্বস্তিতে সুহানা চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখনই রুহানি এগিয়ে এসে সুহানার থুতনিতে আঙুল ঠেকিয়ে মুখটা উপরে তুলল। সুহানা ধীরলয়ে চোখ মেলে তার দিকে তাকাল।
“মাশাআল্লাহ! দাদাভাই একে কোথায় পেল রে?”
রুহানির কথা শেষ হতে না হতেই বাকি সবাই হুড়মুড় করে খাট থেকে নেমে সুহানাকে ঘিরে ধরল। ফিনা পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে; তার সাথে মেয়েগুলোর আগেই বেশ ভাব হয়ে গেছে। এরা সবাই ভীষণ মিশুক, যা ফিনার খুব পছন্দ হয়েছে।
রিফা সুহানার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, “কী সুন্দর চোখ তোমার! তুমি কি লেন্স পরো?”
সুহানা মাথা নেড়ে জানাল যে না, সে লেন্স পরে না।
রিফা বিস্ময় নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “আল্লাহ! এটা তোমার সত্যি চোখ?”
সুহানা মৃদু স্বরে বলল, “হ্যাঁ।”
আরেকজন কৌতূহল সামলাতে না পেরে জানতে চাইল, “তুমি মুখে কী মাখো গো? একদম কাঁচের মতো চকচক করছে!”
সুহানা ঠিক ভেবে পেল না কী উত্তর দেবে!সবাই মিলে একে একে সুহানাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল, যেন আস্ত একটা স্ক্যান চলছে। মেয়েটিকে তাদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে—তাদের তুলনায় সুহানা ছোটখাটো হলেও দেখতে একদম পুতুলের মতো। সুহানা তার সাধারণ পোশাকই পরে আছে। রুহানি এবার তার হাত ধরে তাকে নিচে নিয়ে গেল, আর বাকি মেয়েরাও পেছনে পেছনে নেমে এল।
ডাইনিং এরিয়ায় আসতেই বাড়ির মায়েদের সাথে দেখা হলো। সাবেরা, আয়না, রুবাইদা আর মালেহা বেগম—সবাই এগিয়ে এসে সুহানাকে একটি বড় সোফায় বসালেন এবং নিজেরাও তার পাশে বসলেন। বাড়ির মেয়েরা নিচে কার্পেটের ওপর গোল হয়ে বসল। ছেলেরা সবাই বাইরে কাজে ব্যস্ত, তাই মায়েদের জন্য সুহানার সাথে কথা বলার এটাই মোক্ষম সুযোগ। কারণ কিছুক্ষণ পরই সবাই আবার অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
এতগুলো অচেনা মানুষের মাঝখানে পড়ে সুহানা বেশ ঘাবড়ে গেল। সে অস্বস্তিতে বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল আর ঘনঘন নাকের ওপর উঠে আসা চশমাটা ঠিক করছিল।
মালেহা বেগম মানুষ হিসেবে একটু চঞ্চল স্বভাবের; তাই তিনিই সবার আগে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, “তোমার নাম কী ?”
সুহানা মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “সুহানা।”
এরপর তিনি ফিনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আর তোমার?”
“ফিনা।”
এরই মাঝে বাইরে সমস্ত কাজ সেরে চার ভাই বাড়ির ভেতরে ঢুকল। হলরুমের মাঝখানে গোল হয়ে মিটিং বসতে দেখে তারা সেদিকে আর না গিয়ে একটু দূরে গিয়ে বসল। কাজ করে তারা সবাই তখন বেশ ঘামছে।
হঠাৎ আয়না বেগম সরাসরি প্রশ্ন করে বসলেন, “তোমার মা-বাবা এত দূরে দুটো ছেলের সাথে তোমাদের আসার অনুমতি দিয়ে দিল?”
এই একটি প্রশ্নের উত্তর দিতেই সুহানা সবথেকে বেশি ভয় পাচ্ছিল, আর শেষমেশ সেটাই হলো। প্রশ্নের চোটে সে রীতিমতো হাঁসফাস করতে লাগল। সুহানা মাথা নিচু করে খুব ধীরে বলল, “ নেই।”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আয়না বেগম অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ? কী বললে?”
সুহানা শান্ত গলায় বলল, “আমার মা-বাবা কেউ নেই আন্টি। আমি আর ফিনা—আমরা দুজনেই অনাথ আশ্রমেবড় হয়েছি। তারপর হোস্টেলে থেকেছি।”
সুহানার কথা শুনে উপস্থিত সবাই বেশ ব্যথিত হলেন। সাবেরা বেগম পরম মমতায় সুহানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
সুহানা এসব থেকে সব সময় দূরে থাকতে চায়। কারো করুণা বা দয়া পাওয়া তার একদম অপছন্দ। এই কারণেই সে পারতপক্ষে কাউকে নিজের অতীত নিয়ে কিছু বলে না। যেটুকু প্রয়োজন সেটুকুই শুধু জানায়, এর বেশি কাউকে জানাতে সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি একদম ভিন্ন; উত্তর না দিয়ে কোনো উপায় নেই, অন্যথায় জেরা চলতেই থাকবে। বাঙালি মহিলারা যে একবার কৌতূহলী হলে সহজে থামেন না, সে সম্পর্কে সুহানার বেশ ভালোই ধারণা আছে।
এরপর তারা আরও নানারকম প্রশ্ন করলেন আর সুহানা ও ফিনা মিলে একে একে সবকিছুর উত্তর দিল। সাবেরা বেগমের সুহানাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন—এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মেয়েটা কী অটল থেকে নিজেকে গড়ে তুলেছে! তবে আয়না বেগমের মনোভাব ঠিক উল্টো; তার সুহানাকে একদম পছন্দ হলো না। তিনি মনে মনে জাহিরকে নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করলেন—তার ধারণা, এই মেয়ে নিশ্চয়ই জাহিরকে কোনোভাবে ফাঁসিয়েছে। লোভ সামলাতে না পেরে এমন ভালো ঘরের ছেলের পেছনে লেগেছে। তিনি বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে উঠে বাইরে চলে গেলেন। বাকি তিনজন অবশ্য সেখানেই বসে রইলেন এবং প্রাণবন্ত সব গল্প জুড়ে দিলেন।
ধীরে ধীরে সময় গড়াল। আড্ডা শেষ করে সবাই এবার দুপুরের খাবারের টেবিলে গিয়ে বসল। সুহানা আর ফিনা পাশাপাশি বসেছে। হঠাৎ জাহির সেখানে এসে ধুপ করে সুহানার পাশের চেয়ারটাতে বসে পড়ল।
এরপর সে মৃদু হেসে বলে উঠল, “হ্যালো ষোলোআনা!”
সুহানা জাহিরের কথার কোনো উত্তর দিল না; জাহিরও তাকে আর বিরক্ত না করে খাওয়ায় মনোনিবেশ করল। বিশাল এক কাঠের ডাইনিং টেবিল—যেখানে একসাথে প্রায় চল্লিশ জন বসে অনায়াসে খেতে পারবে। টেবিল ভর্তি রাজকীয় সব খাবারের আয়োজন। মাথার ওপর থেকে ঝুলে থাকা বিশাল ঝাড়বাতির সোনালী আলোয় চারপাশটা ঝিকমিক করছে। প্রতিটি চেয়ারের ওপরের অংশে করা হয়েছে নিখুঁত কারুকাজ।
সবচেয়ে বড় চেয়ারটিতে বসেছেন বাড়ির বর্তমান অভিভাবক, জাহিরের বাবা জাহাঙ্গীর সাহেব। সুহানা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে বসেছেন, চোখে মোটা সোনালী ফ্রেমের চশমা। পাশে সাবেরা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন তাকে ভাত বেড়ে দেবেন বলে। মানুষটিকে দেখে মনে হয় তিনি বেশ গম্ভীর স্বভাবের; সুহানা ভেবে পেল না তার ছেলে জাহির তবে এতটা চঞ্চল হলো কীভাবে?
সুহানা এবার পাতের খাবারের দিকে নজর দিল। মেন্যুতে আছে সর্ষে ইলিশ, চিংড়ি পটল, দুই ধরনের মাংস, সাদা ভাত, আমের চাটনি আর মুচমুচে পাঁপড়। শেষপাতে মিষ্টির আয়োজনে আছে কালাকাদ, রসগোল্লা আর ছানা ভাজা।
কিন্তু খাবার সামনে আসতেই সুহানা আর ফিনা বেশ বিপাকে পড়ল। চপস্টিক আর কাঁটাচামচে অভ্যস্ত দুই মেয়ে আজ খাঁটি বাঙালি ভোজে হাত দিয়ে খেতে গিয়ে কিছুটা ঝামেলাতে পড়েছেন। জাহির মুহূর্তেই ওদের সমস্যাটা আঁচ করতে পারল। সে চোখের ইশারায় মাকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করল। সাবেরা বেগম প্রথমে বুঝতে না পারলেও জাহির যখন সুহানার দিকে ইঙ্গিত করল, তখন তিনি দেখলেন মেয়েটি পাতে ভাত নিয়ে নিশ্চুপ বসে আছে।
সাবেরা বেগম জাহাঙ্গীর সাহেবকে খাবার পরিবেশন শেষ করে সরাসরি সুহানার পাশে এসে দাঁড়ালেন। মমতা মাখানো স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি মাছ বেছে দেবো মা?”
সুহানা ঠিক এমন একটি সাহায্যের জন্যই মনে মনে দোয়া করছিল। সাবেরা বেগম ওদের অবস্থা বুঝতে পেরে পাশের চেয়ারটি টেনে বসলেন। হাতের বালাগুলো আলতো করে কনুইয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে তিনি পরম যত্নে মাছ বাছতে শুরু করলেন। সুহানা খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁর মাছ বাছা দেখছিল। সাবেরা বেগম একে একে সুহানা ও ফিনা—দুজনের মাছই বেছে দিলেন।
খাবার টেবিলে সবাই নিঃশব্দে নিজ নিজ খাবারে মনোনিবেশ করেছে; কেউ কারো সাথে কথা বলছে না বা কারো দিকে তাকাচ্ছে না। এটিই এই বাড়ির দীর্ঘদিনের নিয়ম—সবাই একসাথে বসে খাবে ঠিকই, কিন্তু সেখানে কোনো গল্প-গুজব বা আলোচনা চলবে না।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই সবাই একে একে উঠে পড়লেন; ডাইনিং রুমটি মুহূর্তেই জনশূন্য হয়ে গেল। এরপর সব ভাই-বোন মিলে সিদ্ধান্ত নিল তারা ছাদে যাবে, সেখানেই পরবর্তী সব পরিকল্পনা করা হবে। জাহির সবার আগে একটি বড় লাগেজ নিয়ে উপরে চলে গেল;ভাই-বোনদের জন্য আনা উপহারগুলো বিলিয়ে দেবে, আর চাচা-চাচিদের উপহারগুলো সন্ধ্যায় তুলে দেবে। শীতের দুপুরে নরম রোদে বড়ো ছাদে মাদুর পেতে বসা হলো সেখানে বাড়ির বড়ো বাদে সবাই উপস্থিত আছে।
চলবে…….
(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)
#প্রেমের_আলোড়ন
#suhan_joy
#midnight_tales_by_joy
Thank You🍀
(Don’t copy without permission)
Enjoy your reading 🎀