ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৩১তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক: সুহান জয়

পর্ব: ৩১

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

জাহির সবার জন্য আনা উপহারগুলো বিলিয়ে দেওয়ার পর পরিবেশটা বেশ জমে উঠল। বড় ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সবাই বলে উঠল, "থ্যাঙ্ক ইউ বড়দা ভাই!"

এরপর সুহানা উদ্দেশ্য করে বলা হলো, "এই যে মিস্ ষোলোআনা , এদের সাথে তো তোমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি। চলো, এখনই সেটা সেরে ফেলি। এই যে তোরা সবাই, সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী একে একে নিজেদের পরিচয় দে। রামিম, starts from you।"

সুহানার দিকে তাকিয়ে রামিম উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে শুরু করল, "আমি এমডি রামিম উদ্দিন, বয়স ২১। বুয়েটে পড়াশোনা করছি।"

এরপর একে একে বাকিরা নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করল:

তাসফীন: "আমি তাসফীন, বয়স ২১। ঢাকা ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে আছি।"

সামির: "আমি সামির, বয়স ২০। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে প্রথম বর্ষে পড়ছি।"

সাদাত: "আমি সাদাত, বয়স ১৯। এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।"

তিতাস: "আমি তিতাস, বয়স ১৫। ক্লাস নাইনে পড়ি।"

তাসিন: "আমি তাসিন, বয়সও ১৫। তিতাসের মতোই ক্লাস নাইনে।"

ছেলেদের পর্ব শেষ হতেই পরিচয় দেওয়ার পালা এল মেয়েদের। একে একে তারা বলতে শুরু করল:

রুহানি: "আমি রুহানি। মিউনিখ ইউনিভার্সিটিতে সোসিওলজি ডিপার্টমেন্টে পড়ছি।"

রিফা: "আমি রিফা। বয়স ১৮, ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছি।"

মিহু: "আমি মিহু। এবার এইচএসসি দিচ্ছি।"

মোহিনী: "আর আমি মোহিনী, বয়স ২০। থার্ড ইয়ারে পড়ছি।"

সুহানা বেশ মনোযোগ দিয়েই সবার পরিচয় শুনল। সবার পরিচয় শেষ হতে জাহির হাত ঝেড়ে সোজা হয়ে বসল। এবার পরিবারের জটিল সমীকরণটা খোলসা করার পালা।

সে বলতে শুরু করল, "এবার শোনো আমি বলি—রামিম, রিফা আর মিহু হলো মেজো আব্বুর ছেলে-মেয়ে। তিতাস, তাসিন আর তাসফিন হলো সেজো আব্বুর। সাদাত আর সামির আমার একমাত্র ফুপ্পির ছেলে, আর রুহানি হচ্ছে ছোট পাপার মেয়ে।"

সব শুনে সুহানা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, "বাপরে! এটা ফ্যামিলি নাকি ব্যাটেল স্কোয়াড!"

জাহির এবার কড়া গলায় বাচ্চাকাচ্চা গুলোকে হুকুম দিল, "পরিচয় তো হলো, এবার সবাই সোজা নিচে যা!"

শুনেই রুহানি চোখ কপালে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, "কেন?"

"আমাদের দরকারি কথা আছে," জাহিরের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

রুহানি দমবার পাত্র নয়, সে পাল্টা যুক্তি দিল, "তো? আমরা থাকলে কী সমস্যা?"

জাহির এবার ভ্রু কুঁচকে ধমক দেওয়ার সুরে বলল, "একদম বেশি তর্ক করবি না। যা বলছি তা-ই কর, সোজা নিচে নাম। চল ফুট!"

“যাবো না!”

রুহানির জেদ দেখে জাহির রামিমকে উদ্দেশ্য করে বলল, “রামিম, এই বলদগুলোকে ছাদ থেকে ফেলে দে তো!”

রামিম আদেশের ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা বড়দা।”

রামিম যেই না রুহানির হাত ধরতে যাবে, তার আগেই রুহানি একছুটে দরজার দিকে পালাল। রামিম থমকে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল, “উফ, এই মেয়েটা কি আমার জান নিয়ে ছাড়বে!” তাকে দেখে বাকি সবাইও একে একে নিচে নেমে গেল।

ছাদে এখন শুধু হাতেগোনা কয়েকজন। জাহির নিজের গলা পরিষ্কার করে সুহানাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ষোলোআনা, এবার বলো তোমার মাস্টার প্ল্যান কী?”

সুহানা নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “আমি কোনো প্ল্যান করিনি।”

ঠিক তখনই তাশফিন পাশ থেকে হুট করে বলে উঠল, “বউমনি, তুমি শুধু ঠিকানাটা বলো, বাকিটা আমরাই খুঁজে নেব।”

সুহানা চমকে উঠে তাশফিনের দিকে তাকাল। তার কানে তখনো শব্দটা বাজছে—‘বউমনি’! কী বলল ও এক্ষুনি? মানে কী এর?

রামিম ধপাস করে তাসফিনের পিঠে একটা ঘুষি মারল। তারপর ওর কানে কানে ফিসফিস করে ধমকে উঠল, “তুই কি পাগল হয়েছিস নাকি রে শালা? বড়দা তোকে ল্যাংটো করে তালগাছে উল্টো ঝুলিয়ে রাখবে, চুপ থাক!”

তাসফিন সাথে সাথে মুখে কুলুপ আঁটল। জাহির অসহায়ভাবে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল; ভাবল—এদের নিয়ে বউ আনতে যাবে সে ? কী করে!

সুহানা অবশ্য ওসব কথা গায়ে মাখল না। তার কাছে এখন তুহিনা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। একবার আফ্রিদির দিকে তাকাতেই দেখল আফ্রিদিও তার দিকেই তাকিয়ে আছে—ছেলেটার জন্য সুহানার খুব মায়া হলো।

ছাদে উপস্থিত সবার উৎসুক দৃষ্টি এখন সুহানার দিকে। সুহানা ফোনে কিছু একটা সার্চ করে স্ক্রিনটা জাহিরের দিকে বাড়িয়ে দিল। জাহির দেখল, সেটা তুহিনার ‘লাইভ লোকেশন’! জাহির মনে মনে ভাবল—উফ, কী মেয়ে রে বাবা! সবকিছু আগে থেকেই রেডি করে রেখেছে।

জাহির এবার আফ্রিদিকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আফ্রিদি, তুহিনার লাইভ লোকেশন পেয়ে গেছি!”

আফ্রিদি মুহূর্তের মধ্যে ফোনটা কেড়ে নিল। ম্যাপের দিকে তাকিয়ে দেখল লোকেশনটা ঢাকার ভেতরেই দেখাচ্ছে। সে অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চল, এখনই চল!”

জাহির তাকে বাধা দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল, “আরে দাঁড়া ব্যাটা! আমরা তো যাবই, তুই আগে শান্ত হ।”

এরপর সবাই মিলে পরিকল্পনা অনুযায়ী গোছগাছ শুরু করল। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কেনাকাটা করতে হবে, বাকি প্ল্যান যাওয়ার পথে গাড়ি তেই করে নেওয়া যাবে বলে ঠিক হলো নইলে সময় কম দেখা যাবে প্ল্যান করতে গিয়ে বিয়ে কমপ্লিট হয়েগেছে এখন একটাই উপায় ধর তক্তা মার পেরেক ।

সুহানা ফিনার দিকে তাকিয়ে বলল, “ফিনা, তুই এখানেই থাক।”

ফিনা তড়িৎবেগে সুহানার কাছে এগিয়ে এসে পালটা প্রশ্ন করল, “কেন?”

সুহানা বুঝিয়ে বলল, “কারণ এই জায়গাটা সেফ ওখানে গিয়ে আমাদের কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তার কোনো ঠিক নেই। সেখানকার অবস্থা সম্পর্কে আমরা একদমই জানি না।”

ফিনা নাছোড়বান্দা হয়ে বলল, “না, আমি যাবই!”

সুহানা কঠোর গলায় সাফ জানিয়ে দিল, “না মানে না!”

“কিন্তু আমি...”

সুহানা এবার ধমকের সুরে বলল, “আর একটা শব্দও নয়! একদম মাথা খারাপ করবি না আমার ওখানে কোনো প্রবলেম হলো তখন আমি তোকে বাঁচাতে পারবো না ফেলে চলে আসবো কিন্তু গেলে নিজের রিস্কে যাবি আমার ভরসা নয়।”

ব্যাস ফিনা চুপ আর কোনো কথা নেই সুহানা যে একদম জায়গায় ঘা দিয়েছে সে তো এডভেঞ্চার এনজয় করতে যাচ্ছিল ওখানে গিয়ে দেখা যাবে তাকে নিয়েই টানাটানি সে বুদ্ধিমান মেয়ে এমন করতেই পারে না তাই সুহানা কে বলল_“থাক এই বার টা বাদ দিলাম”

জাহাঙ্গীর সাহেব সোজা হয়ে শুয়েছেন কপালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। বোঝা যাচ্ছে, কোনো একটি গভীর বিষয় তাঁকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।

সাবেরা বেগম যাবতীয় কাজকর্ম গুছিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। নিজের প্রাণ প্রিও পুরুষের চিন্তিত মুখচ্ছবি দেখে তিনি ধীরপায়ে তাঁর কাছে এগিয়ে এলেন। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? এখনো ঘুমাওনি যে?”

জাহাঙ্গীর সাহেব ছোট করে উত্তর দিলেন, “ঘুম আসছে না।”

“কেন?”

জাহাঙ্গীর সাহেব এবার সরাসরি তাঁর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “ওই মেয়েটার কথা তুমি আগে থেকেই জানতে, তাই না সাবেরা?”

সাবেরা বেগম হঠাৎ এমন প্রশ্নে কিছুটা চমকে উঠলেন। অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “আমি আসলে...”

সাবেরা বেগমকে আমতা আমতা করতে দেখে জাহাঙ্গীর সাহেব এবার চটে গেলেন। ক্ষোভের স্বরে বললেন, “তবে আমায় আগে বলোনি কেন?”

সাবেরা বেগম নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আসলে আমি তো বুঝতে পারিনি...”

জাহাঙ্গীর সাহেব তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “সবাই আমাকে এই নিয়ে প্রশ্ন করছিল, আর আমি কিছুই জানতাম না!”

সাবেরা বেগম অপরাধীর মতো স্বরে বললেন, “আমি সত্যি ভাবিনি যে বিষয়টা এতদূর গড়াবে।”

জাহাঙ্গীর সাহেব ক্ষোভ উগরে দিয়ে বললেন, “ভাবা উচিত ছিল তোমার! ছেলে বড় হয়েছে বলে কি যখন যা খুশি তাই করবে? আমার কি কোনো মান-সম্মান নেই?”

সাবেরা বেগম মাথা নিচু করে চুপ করে রইলেন। তাঁর উচিত ছিল আগেই সব জানানো, কিন্তু ছেলে তাঁকে আগেভাগেই বারণ করে রেখেছে; এখন তিনি কী করবেন? সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, “এখন ওরা কোথায় যাবে? এখানে তো কিছুই চেনে না!”

জাহাঙ্গীর সাহেব গমগমে কন্ঠে বলে উঠলেন , “তোমার ছেলে নির্ঘাত আমার কাছে কিছু গোপন করছে। বাপের চোখে ধুলো দিতে চায়! আফ্রিদির বিয়েটা হয়ে গেলেই ওর বিয়েটাও আমি দিয়ে দেব। খবরদার, এটা যেন ও এখনই জানতে না পারে কয়েক দিনের মধ্যেই সব ব্যবস্থা করে ফেলবো আমি। সন্ধ্যায় এই কথা আলোচনা করব আফ্রিদির বাবার সাথে ডাইরেক্ট বিয়ে হবে কোনো দেখা দেখি না সুন্নতি বিয়ে যেমন হয় পরে আমি গ্রামের লোককে খাইয়ে দেবো বস্ত্র দান করব নিজের ক্ষমতায় আল্লাহ হায়াতে রাখলে সব হবে ইনশাআল্লাহ!”

সাবেরা বেগম অবাক হয়ে বললেন, “এত তাড়াতাড়ি?”

“হ্যাঁ, এখনই! তোমার ছেলে আর কচি খোকাটি নেই, ওর বয়স হয়েছে যথেষ্ট ছেলের মতিগতি দেখে বুঝতে পারছ না ?। আমি কাল থেকেই মেয়ে দেখা শুরু করব।”

সাবেরা বেগম স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মাথায় নতুন এক দুশ্চিন্তা এসে ভর করল। এখন উপায় কী হবে?

জাহির বাইরে ছোট চাচুর সাথে আফ্রিদির বিষয়ে আলোচনা করছে। এই মুহূর্তে বাড়ির অন্য কাউকে কিছু জানানো যাবে না, তাই ছোট চাচুই এখন তাদের একমাত্র ভরসা।

বিহান সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোরা কি এখনই বের হচ্ছিস?”

জাহির উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

“আমি কি ওখানকার পুলিশকে একটা খবর দিয়ে রাখব?”

জাহির বাধা দিয়ে বলল, “না, ওসবের দরকার নেই। মেয়ে তো রাজিই আছে, তাই পুলিশ ফোর্স ব্যবহার করলে উল্টো পরে আমাদেরই প্রবলেম ফেস করতে হতে পারে।”

বিহান সাহেব কিছুটা চিন্তিত হয়ে বললেন, “কিন্তু তোর কী মনে হয়...”

জাহির তাঁকে আশ্বস্ত করে বলল, “সেসব নিয়ে তুমি চিন্তা করো না চাচু। তুমি শুধু এদিকটা সামলাও আর আব্বুকে একটু বুঝিয়ে বোলো কনভেন্স করো প্লিজ।”

বিহান সাহেব মজা করে বললেন, “কেন রে? তোর আব্বুকে দেখলে হাঁটু কাঁপার রোগটা কি এখনো যায়নি?”

জাহির একটু অভিমানী সুরে ডাকল, “চাচু!”

বিহান সাহেব হোহো করে হেসে উঠলেন। কথাটি জাহিরের আত্মসম্মানে লাগলেও সে মনে মনে জানে যে চাচু ঠিকই বলেছেন। আব্বুকে দেখলে তার এখনো পিলে চমকে যায়, আর এতে তার করারও কিছু নেই। ছোটবেলায় আব্বুর হাতের সেই মারের স্মৃতি এখনো তাজা, তাই ভয়টা রয়েই গেছে। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে সে আগে মাকেই জানায়, তারপর মা গিয়ে আব্বুকে বলেন। আব্বুর সাথে সরাসরি কথা বলার সাহস বা সুযোগ তার খুব একটা হয়ে ওঠে না।

বাড়ির পুরুষরা সবাই একে একে বাইরে বেরিয়ে এল। ভেতরের মেয়েরা দরজার আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে; তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না আসলে কী ঘটছে। তিতাস তাসিন ছাদেই দাঁড়িয়ে আছে তাদের একটা দায়িত্ব দিয়েগাছে বড়দা সেটা অমান্য করলে তাদের জিএফ দের পটিয়ে নেবে এমন হুমকি দিয়ে গেছে তাই জন্য পাহারা দিচ্ছে এখন থেকে সমস্ত ইনফরমেশন দিতে হবে তাদের মেজদা কে। ওপর থেকে ফিনা সবটা দেখছিল। সে রুহানিকে উদ্দেশ্য করে ডাক দিল—

“রুহানি আপু!”

ফিনার ডাকে রুহানি ওপরে তাকাল। ফিনা হাতের ইশারায় তাকে ওপরে আসতে বললে রুহানি বাকিদের সাথে নিয়ে ফিনার কাছে গেল।রূহানী মেয়েদের মধ্যে বড়ো তাই সে যেখানে বাকি গুলোও তার সাথে সাথে লেজের মতো লেগে থাকবে।

বাইরে তখন যাত্রার প্রস্তুতি শেষ। তারা দুটি গাড়ি নিল। একটিতে উঠল জাহির, আফ্রিদি, সুহানা আর তাসফিন। অন্য গাড়িটিতে বসল রামিম, সাদাদ আর সামির। জাহির নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে। সে সুহানাকে তার পাশের সিটেই বসাল। এটাও অবশ্য তাদের পূর্বপরিকল্পনারই অংশ ছিল; জাহির আগেই সবাইকে পেছনের সিটে গিয়ে বসতে বলেছিল যাতে সুহানা সামনের সিটে বসতে বাধ্য হয়।

আয়নার সামনে তুহিনাকে ঘিরে ধরেছে কয়েকজন মেয়ে, তারা সবাই মিলে তাকে কনের সাজে সাজাচ্ছে। তুহিনা কোনো প্রতিবাদ না করে পুতুলের মতো শান্ত হয়ে বসে আছে, তার চোখ দুটো মেঝের দিকে নামানো।

কাজিনরা নিজেরাও সাজগোজ শুরু করেছে এবং একে অপরকে সাহায্য করছে। এখন সন্ধ্যা সাতটা বাজে; আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বর চলে আসবে। বাড়ির বাইরে রং-বেরঙের ছোট ছোট বাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। গেট সাজানো হয়েছে সুগন্ধি কাঁচা ফুল দিয়ে, যার মিষ্টি সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বাইরে সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ ভেসে আসছে, কিন্তু যার বিয়ে—তার মধ্যে কোনো আনন্দ বা ভাবাবেগ নেই।

মোহনা বেগম ধীরপায়ে ঘরের ভেতর ঢুকলেন। উপস্থিত সবাই একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে আবার নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তিনি মেয়ের সামনে গিয়ে আয়নায় তুহিনার প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন; মুহূর্তেই তাঁর বুকটা হাহাকার করে উঠল। মেয়েকে তিনি কোনোদিন চোখের আড়াল করেননি, আজ থেকে সে পরের বাড়ির হয়ে যাবে। অন্য কারো হাতে নিজের কলিজার টুকরোকে তুলে দেওয়ার কথা ভেবে তাঁর কষ্ট আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল।

মেয়ের বিষণ্ণ মুখখানা দেখে মোহনা বেগম যা বলতে এসেছিলেন, তা আর বলতে পারলেন না। তিনি তিনটি গহনার বাক্স খাটের ওপর রাখলেন এবং মেকআপ আর্টিস্টকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এই গহনাগুলো ওকে পরিয়ে দেবেন। এগুলো ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছে।”

আর্টিস্ট জবাব দিল, “জি আন্টি, পরিয়ে দেব।”

মোহনা বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন, কিন্তু তুহিনার অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই—সেই একই রকম পাথর হয়ে বসে থাকা। তিনি আর সেখানে দাঁড়াতে পারলেন না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন এখন কিছু করার নেই তার।

তুহিনার পরনে এখন টকটকে লাল রঙের একটি বেনারসি শাড়ি। শাড়িটির জমিন রেশমি লাল, আর তার আঁচল ও পাড়জুড়ে সোনালি সুতোর নিপুণ কারুকাজ। মাথার ওপর থেকে নেমে এসেছে একটি পাতলা লাল ঘোমটা, যার চারপাশ সোনালি ঝালর দিয়ে ঘেরা। শাড়ির উজ্জ্বল লাল রং আর গহনার সোনালি আভা যেন চারদিকে আলোকছটা ছড়াচ্ছে। গলায় স্তরে স্তরে সাজানো সোনালি হার, যার বড় লকেটটি সবার নজর কেড়ে নিচ্ছে। কানে বড় ঝুমকো আর নাকে একটি বিশাল নথ, যা সরু চেইনের মাধ্যমে চুলের সাথে চমৎকারভাবে যুক্ত করা হয়েছে। কপালে ছোট একটি টিকলি তার চুলের সিঁথিকে রাঙিয়ে তুলেছে। হাতে দুই গুচ্ছ চুড়ি—একদিকে চওড়া বালা আর অন্যদিকে কালচে নীল রঙের রেশমি চুড়ির সমাহার। তুহিনাকে আজ একজন নিখুঁত বাঙালি কনে হিসেবে অপরূপ সুন্দরী দেখাচ্ছে।

তুহিনাকে এভাবে দেখে তানির মনে প্রবল হিংসার উদ্রেক হলো। তবে আজ তুহিনার বিয়ে এবং সে-ই সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে, তাই তানি আপাতত কিছু বলল না; নয়তো সে হয়তো সব গহনা নিজের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করত। বিশেষ করে গলার সেই স্বর্ণের হারগুলো দেখে তার চোখ কপালে উঠল—বড়মার কাছে যে এত গহনা আছে, তা তো তার মা জানতেনই না! দাদীর গহনাগুলো তুহিনা পেয়েছে ভেবে তার মনে ঈর্ষা জন্মালেও সে সিদ্ধান্ত নিল এটা নিয়ে পরে ভাববে। আপাতত সে নিজের সাজগোজেই মন দিল।

জাহির একটি শপিং মলের সামনে এসে গাড়ি থামাল। কিছু জরুরি কেনাকাটা এখনো বাকি আছে, যা এখনই সেরে নেওয়া দরকার। জাহির নিজের সিট বেল্ট খুলে নিল ঠিকই, কিন্তু সে নিজে বাইরে যেতে পারবে না; কারণ তাকে কেউ চিনে ফেললে পুরো পরিকল্পনাই ভণ্ডুল হয়ে যাবে।

অগত্যা সে কেনাকাটার তালিকা ধরিয়ে সামির আর তাসফিনকে পাঠাল। মনে সায় না থাকলেও তারা বড়দার কথা অমান্য করতে পারল না। ওদিকে সুহানা বসে বসে ফোনের ম্যাপে লোকেশন চেক করছিল; তুহিনাদের বাড়ি আর খুব বেশি দূরে নয়, তাদের দ্রুত পৌঁছাতে হবে।

সুহানা আফ্রিদির দিকে তাকিয়ে দেখল সে জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। অবিন্যস্ত চুল আর শুকনো মুখ দেখে তাকে খুব বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সামিররা কাজ সেরে ফিরে এল এবং জাহির দ্রুত গাড়ি স্টার্ট করল। যাত্রার একঘেয়েমি কাটাতে সুহানা হাত বাড়িয়ে ড্যাশবোর্ডের বক্স অন করল এবং ভলিউম কমিয়ে দিয়ে একটি গান চালিয়ে দিল।

Heeriye sehra baandh ke Main

Toh aaya re..

Doli barat bhi saath mein

Main toh laaya re

Abb toh na hota hai

Ek roz intezaar soni

Aaj nahi toh kal hai

Tujhko toh bas meri honi re

Tenu leke main javaanga

Dil deke main javaanga

Tenu leke main javaanga

Dil deke main javaanga

গানের কথাগুলো কানে যেতেই গাড়ির সবাই নড়েচড়ে বসল। তারা বেশ সন্ধিহান দৃষ্টিতে সুহানার দিকে তাকাল—এমন কঠিন সিচুয়েশনে গান চালানোর মানে কী? সুহানা সবার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে নিজেই হেসে বলে উঠল, “আফ্রিদি ব্রো তো বিয়ে করতেই যাচ্ছে, আর আমরা হলাম বরের পক্ষ, ভাই যখন সেহরা বেঁধে বিয়ে করতে যাচ্ছে, তখন এই গান তো একদম মানানসই!”

এতক্ষণের গুমোট ভাব কাটিয়ে আফ্রিদির ঠোঁটে এবার এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। জাহির লুকিং গ্লাসে আফ্রিদির হাসিমুখ দেখে বেশ মজা পেল। সে দ্বিগুণ উৎসাহে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলে উঠল—

“চলোওওওওওও...!”

বরের গাড়ি গেটের সামনে এসে পৌঁছেছে। দরজায় এখন বরযাত্রীদের সাথে গেট ধরা নিয়ে দর কষাকষি আর হাসাহাসি চলছে; কিন্তু ভেতরে তুহিনা নিজের রুমে একাই পাথরের মতো বসে রইল।

জাহিরদের গাড়িটা বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে থামল। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে বাড়ির সামনে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ঝলমলে আলোকসজ্জা আর বিয়ের সাজ দেখে আফ্রিদির বুকের ভেতরটা ভয়ে শুকিয়ে গেল। কোনো কিছু না ভেবেই সে উন্মাদনার মতো গাড়ি থেকে নেমে ছুটতে শুরু করল। সুহানা বিদ্যুৎগতিতে গাড়ি থেকে নেমে আফ্রিদির সামনে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়াল।

সে বাধা দিয়ে বলল, “ব্রো, স্টপ ! এভাবে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে যাওয়া যাবে না উই হ্যাভ এ প্রপার প্ল্যান।”

আফ্রিদি পাগলের মতো বলতে লাগল, “না না, আর এক মুহূর্ত দেরি করা যাবে না! আমি এখনই ভেতরে গিয়ে ওকে নিয়ে আসব।”

সুহানা তাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিল না। ততক্ষণে জাহিরও গাড়ি থেকে নেমে আফ্রিদির সামনে এসে দাঁড়াল। সে আফ্রিদির কাঁধ ধরে বলল, “শান্ত হ ভাই, একটু শান্ত হ! আমরা আছি তো।”

কিন্তু আফ্রিদি কোনো কথাই কানে নিচ্ছিল না; তার অস্থিরতা যেন ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিল।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সুহানা ধীরপায়ে আফ্রিদির একদম কাছে এগিয়ে গেল। সে কৌশলে আফ্রিদির ঘাড়ের একটি নির্দিষ্ট নার্ভে চাপ দিতেই আফ্রিদি অবশ হয়ে জাহিরের গায়ের ওপর ঢলে পড়ল।

সুহানা শান্ত গলায় বলল, “কিছুক্ষণ পর ওর জ্ঞান ফিরে আসবে আমাদের হাতে সময় কম অনলি ২০ মিনিটস। ব্রো এখন অতিরিক্ত হাইপার হয়ে গেছে; এই অবস্থায় ভেতরে গেলে আমাদের রেসকিউ প্ল্যান ফ্লপ হয়ে যাবে।”

পেছনের গাড়ি থেকে বাকিরা নেমে আসতেই সবার চোখ কপালে উঠল; আফ্রিদির অবস্থা দেখে তারা স্তম্ভিত কারো মুখ দিয়ে কথা সরল না। জাহির পরম যত্নে আফ্রিদিকে গাড়ির সিটে শুইয়ে দিল। বাড়ির চার পাশে গার্ড দিয়ে ঘেরা এমপি এর বিয়ে বলে কথা বউ নিয়ে যাওয়া এত সোজা নয়। জাহির গাড়ি আরেকটু দূরে নিয়ে গেলো এরপর সবাই গাড়ি থেকে বের হয়ে ব্যাগ থেকে কালো রঙের ফুল মাস্ক বের করে পরে নিল।

মাথার চুল থেকে শুরু করে মুখমণ্ডল সব ঢাকা—শুধু চোখ দুটো বের হয়ে আছে। তবে কালো চশমা পরে সেই চোখও ঢেকে ফেলল সবাই, কেবল সুহানা নিজের নিয়মিত চশমাটিই পরে রইল। আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা দলটিকে দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন কোনো ব্যাংকে ডাকাতি করতে এসেছে; চুল থেকে জুতো পর্যন্ত সব কালো হওয়ায় কাউকেই চেনার উপায় নেই। অমন কি তারা একে অপরকেই চিন্তে পারছে না জাহির লম্বা তাই তার উচ্চতা দেখে বোঝা যাচ্ছে নইলে বাকি সব ডাকাত।

সুহানা একটি বক্স বের করে সেখান থেকে কিছু দরকারি সরঞ্জাম পকেটে পুরে নিল আর সিক্রেট পকেটে ঢুকিয়ে নিলো। এরপর গম্ভীর গলায় বলল, "আমি দির কাছে যাচ্ছি। আপনারা বাড়ির পেছনের দিকে পজিশন নিন। সবাই কি ব্লুটুথে কানেক্টেড আছেন?"

সবাই একবার নিজের কানে লাগানো ডিভাইস চেক করে নিয়ে নিশ্চিত করল, "হ্যাঁ, সবাই লাইনে আছি।"

সুহানা সংক্ষেপে বলল, "ওকে দেন।"

সুহানা পাঁচিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রামিম সংশয় নিয়ে প্রশ্ন করল, “বড়দা, ও কি পাঁচিল টপকাতে পারবে? আমি যাব সাহায্য করতে?”

রামিমের কথা শেষ হওয়ার আগেই সুহানা কোনো শব্দ না করে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে পাঁচিল টপকে ওপাশে চলে গেল। ওর এমন অসাধ্য সাধন দেখে বিস্ময়ে সবার হাত আপনাআপনি মুখে চলে এল। রামিম অবাক হয়ে বিড়বিড় করে বলল, “বড়দা, বউমনি তো দেখছি জ্যাকি চ্যানের নানি!”

জাহির অবশ্য সুহানার এসব দক্ষতা সম্পর্কে আগে থেকেই জানত, তাই সে কথায় কান না দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। কারণ তাকে এখন দ্রুত বাড়ির পেছনের দিকে যেতে হবে সুহানা ।

এদিকে সুহানা পাঁচিলের ওপারে তো পৌঁছাল, কিন্তু এখন বড় সমস্যা হলো তুহিনাকে খুঁজে পাওয়া। চারদিকে প্রচুর মানুষের ভিড়, তবে এদিকটায় হালকা জঙ্গল থাকায় সে কিছুটা আড়ালে আছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে লোকেশনটা জুম করে দেখল। ওপরের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করল যে মাঝখানের ঘরটা তুহিনার হতে পারে, তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে আগে ছাদে উঠতে হবে।

সুহানা পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে গেল জাহির দূর থেকে দূরবীণ দিয়ে সবটা লক্ষ করছে । ছাদে এই মুহূর্তে কেউ নেই; সবাই নিচে গেট আর বরযাত্রীদের নিয়ে ব্যস্ত। সে আলতো পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। দোতলার রান্নাঘর থেকে কিছু শব্দ শোনা যাচ্ছে। সুহানা আড়াল থেকে দেখল দুজন মহিলা সেখানে কাজ করছেন, যাদের শুধু পেছনটা দেখা যাচ্ছে। সুহানা দ্রুত পাশের ঘরগুলো উঁকি দিয়ে দেখল, কিন্তু কোথাও তুহিনাকে পাওয়া গেল না। তবে কি সে এখানে নেই?

ঠিক সেই সময় ওয়াশরুমের পাশের একটি ঘর থেকে কয়েকজন মেয়ে হাসাহাসি করতে করতে বেরিয়ে এল। সুহানা তড়িঘড়ি করে আবার উপরে উঠে গা ঢাকা দিল। মেয়েগুলো নিচে নেমে যাওয়ার পর সে পাঁচ মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মন বলছে, তুহিনা ওই ঘরটাতেই আছে। সে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে ঘরটির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একবার আড়চোখে পেছনে তাকিয়ে দেখে নিল যে রান্নাঘরের মহিলারা এখনো ভেতরেই আছে। সে সাবধানে দরজার নব ঘোরালো, কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ এই মাত্র তো খোলা দেখলো তবে ?

সুহানা সময় নষ্ট না করে পাশের রুমে ঢুকে পড়ল। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে একজন মহিলা বাইরে বেরোলেন। সুহানা দ্রুত সেই ঘরের ব্যালকনিতে চলে গেল এবং সেখান থেকে উঁকি দিয়ে পাশের ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল। একটু মাথা ঝুঁকিয়ে ভেতরে তাকাতেই সে লাল শাড়ি পরা কাউকে দেখতে পেল। সুহানা নিশ্চিত হলো—এটাই তুহিনা। সে এক লাফে পাশের ব্যালকনিতে চলে গেল এবং ঘরে ঢুকেই দ্রুত দরজা আটকে দিল ব্যালকনির নইলে তার টেকনিক তার উপরেই এপ্লাই হবে।উত্তেজনায় সুহানার বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে জীবনে এটাই করা বাকি ছিল তার ; সে ধীর পায়ে তুহিনার দিকে এগিয়ে গেল।

আয়নার প্রতিবিম্ব দেখে সুহানার মনে হলো, তুহিনাকে ঠিক এক জীবন্ত পুতুলের মতো সুন্দর লাগছে। সুহানা ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে তুহিনার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। তুহিনা তখনো নিস্পলকভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে।

সুহানা ফিসফিস করে ডাকল, “দি...”

তুহিনা সামান্য মাথা তুলল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই আবার আগের মতো স্থির হয়ে গেল। সুহানা এবার তুহিনার কাঁধ ধরে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে জোরালো স্বরে ডাকল, “দি!”

তুহিনা ঝট করে আয়নার দিকে তাকাল। আয়নায় কালো মাস্ক পরা এক রহস্যময় অবয়ব দেখে সে আঁতকে উঠল। সুহানা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত নিজের মুখের মাস্কটা সরিয়ে ফেলল। সুহানাকে দেখে তুহিনা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না; সে ভাবল হয়তো এটা তার মনের ভুল বা কোনো কল্পনা, যেটুকু মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে।

তুহিনার কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে সুহানা ওর হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তুহিনা প্রথমে সুহানার হাতের স্পর্শ অনুভব করল, তারপর অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সুহানার মুখের দিকে তাকাল।

সুহানা আবার ডাকল, “দি!”

এবার তুহিনা সুহানার হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। অস্ফুট স্বরে বলল, “তুই... তুই সত্যি এসেছিস?”

সুহানা আশ্বস্ত করে বলল, “হ্যাঁ দি, আমি ইটস মি।”

তুহিনা কয়েক মুহূর্ত বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে সে বাকরুদ্ধ। তারপর হঠাৎ সব বাঁধ ভেঙে সে সুহানাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

“আনা...”

তুহিনা সুহানাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে চলেছে, কান্নার বেগে তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। সুহানা তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে; কারণ হাতে একদম সময় নেই, যেকোনো মুহূর্তে কেউ ঘরে ঢুকে পড়তে পারে।

সুহানা তাড়া দিয়ে বলল, “দি, বাইরে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাড়াতাড়ি চলো, আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

তুহিনা থামল ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ তার মাথা ঘুরে উঠল। সে মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। সুহানা তাকে ধরার সুযোগ পাওয়ার আগেই সে পড়ে গেল, বাধ্য হয়ে সুহানাও তার পাশে মেঝেতে বসে পড়ল।

“কী হয়েছে তোমার?” সুহানা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ঠিক তখনই সুহানার নজরে এল পাশে পড়ে থাকা একটি রক্তমাখা ছুরি। সে চমকে উঠে তুহিনার দিকে তাকাতেই দেখল, তার বাম হাত দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে আর সাদা মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।

“দি...!” সুহানা চিৎকার করে উঠল।

সুহানা দ্রুত তুহিনার হাত টেনে ধরল এবং হাতের চুড়িগুলো সরিয়ে দিল। এরপর খাটের ওপর রাখা একটি সুতির ওড়না টেনে নিয়ে দ্রুত ছিঁড়ে ফেলল। সে তুহিনার ক্ষতের ওপর ওড়নাটা শক্ত করে পেঁচিয়ে দিল—এই মুহূর্তে রক্ত বন্ধ করাটা সবচেয়ে জরুরি বোকা মেয়ে কোনো কিছু না ভেবেই মরার পদক্ষেপ নিয়েছে আহ।এরপর সুহানা নিজের ব্লুটুথ ডিভাইসটি অন করল।

গাড়িতে সবাই গভীর উদ্বেগের সাথে অপেক্ষা করছে। সুহানা ভেতরে গিয়ে কী করছে, তার কোনো খবর না পেয়ে সবার দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে বাইরে তাকালো জাহির বরযাত্রী ভিতরে চলে গেছে । ঠিক সেই মুহূর্তে জাহিরের ফোনে সুহানার নোটিফিকেশন এল। জাহির দ্রুত কানেক্ট হয়েই অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল, “সুহু... তুমি ঠিক আছো তো? ওখানে কী হচ্ছে? তুহিনাকে কি খুঁজে পেয়েছো?”

সুহানা ওপাশ থেকে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, পেয়েছি। আপনারা দ্রুত একটা মই বা সিঁড়ি নিয়ে বাড়ির পেছনের ব্যালকনির নিচে আসুন আমরা ওখানে দাঁড়াচ্ছি তবে দেখে ওখানে কয়েকজন আছে ঝোপের পাস দিয়ে আসবেন। দি-র অবস্থা ভালো নয় হাত কেটে ফেলেছে মেবি সুইসাইড করতে চাইছিল ”

“সিট, ওকে ওকে আসছি আমরা ততক্ষণ বি কেয়ারফুল !” জাহির দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। সে সাথে নিল রামিম, তাসফিন কে; আর সাদাদ আর সামির কে রেখে গেল আফ্রিদির পাহারায় নইলে ড্রাইভ করবে কে ?

তারা দ্রুত পাঁচিলের কাছে গিয়ে ওপাশে লাফিয়ে পড়ল, কিন্তু নামার সময় রামিম ব্যথায় চিৎকার করে উঠল, “আহহহহ!”

জাহির তৎক্ষণাৎ রামিমের মুখ চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “চুপ কর ইডিয়ট! সবাইকে কি মার খাওয়াবি ডিরেক্ট শুট করে দেবে আমার বিয়ে হয়নি ভাই তোর ভাবি বিধবা হবে এটা চাস?”

রামিম এখন কীভাবে বোঝাবে যে তার পেছনের দিকে একটা ধারালো কাঁটা ঢুকে গেছে! জাহির মুখ থেকে হাত সরাতেই সে ফিসফিস করে যন্ত্রণাকাতর গলায় বলল, “বড়দা, আমার পেছনে কাঁটা ফুটেছে!”

জাহির অবাক হয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “বলিস কী! একদম ওখানেই ফুটেছে?”

রামিম করুণ মুখে উত্তর দিল, “হম!”

রামিমের করুণ দশা দেখে তাসফিন ফিক করে হেসে দিল। জাহির বিরক্ত হয়ে পিঠে সপাটে চড় বসিয়ে দিয়ে বলল, “হাসাহাসি বন্ধ কর! গণপিটুনি শুরু হলে কিন্তু তোদের এখানেই রেখে পালাব।”

দুজন তড়িঘড়ি করে জিভ কেটে বলল, “না না, আর একটা কথাও বলব না।”

এদিকে ঘরের ভেতরে সুহানা তুহিনাকে কিছুটা পানি খাওয়ালো। তুহিনা পানিটুকু খেল ঠিকই, কিন্তু সে এখন চোখে বেশ ঝাপসা দেখছে। উঠে দাঁড়ানোর মতো ন্যূনতম শক্তিটুকুও তার শরীরে নেই সুহানা ঘেঁটে ঘেঁটে ওষুধ পেলো কয়েকটা গুড়ো করে হাতে দিয়ে শক্ত করে বেধে দিল আরেকবার।

সুহানা তাকে সাহস জুগিয়ে বলল, “দি, আমার কথা শোনো।”

তুহিনা অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল, “হ্যাঁ...”

“এখনই উঠতে হবে। বরযাত্রী বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে, আমাদের হাতে একদম সময় নেই। ওদিকে আফ্রিদি ভাইয়াও তোমার চিন্তায় সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে।”

তুহিনাকে দ্রুত রাজি করানোর জন্য সুহানা কিছুটা বাড়িয়ে বলল, কারণ সে জানে ভাইয়ার কথা শুনলে তুহিনা নিজে থেকে চেষ্টা করবে। সুহানা তাকে ধরে টেনে তুলল এবং ব্যালকনির দিকে পা বাড়াল। কিন্তু হঠাৎ তুহিনা আচমকা দাঁড়িয়ে বলল, “দাঁড়া, ওই ল্যাগেজ গুলো নিয়ে আয়।”

সুহানা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কেন? ওগুলো দিয়ে কী হবে?”

তুহিনা দৃঢ় গলায় বলল, “ওটার মধ্যে আমার সব জরুরি জিনিস আছে, ওগুলো ছাড়া আমি যেতে পারব না।”

সুহানা তাড়া দিয়ে বলল, “এসবের এখন কোনো দরকার নেই, চলো!”

কিন্তু তুহিনা নাছোড়বান্দা, সে জোরাজুরি করে বলল, “না, এগুলো লাগবেই। তুই প্লিজ নে।”

তুহিনার চার-চারটে ব্যাগ; এই অবস্থায় সুহানা একা এতগুলো জিনিস কীভাবে নেবে? সে বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এর মধ্যে কোনগুলো সবথেকে দরকারি?”

তুহিনা ইশারায় দেখিয়ে বলল, “ওই দুটো।”

সুহানা আর তর্ক না করে দ্রুত ল্যাগেজ দুটো টেনে ব্যালকনিতে নিয়ে গেল। এরপর সে আবার ঘরের ভেতরে ফিরে এলে দেখল তুহিনা টলমল পায়ে গিয়ে ড্রয়ার খুলে একটা সাইড ব্যাগ বের করল। সেখানে আরও কিছু জিনিস আর একটা ছোট বক্স ঢুকিয়ে দ্রুত চেইনটা টেনে দিল। সুহানা ভীষণ বিরক্ত হচ্ছিল—এই বিপদের সময় এসব জিনিসের কী প্রয়োজন! ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় সজোরে টোকা পড়ল। সুহানা যেটার ভয় পাচ্ছিল ঠিক সেটাই হলো; বাইরে থেকে তুহিনাকে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে।

সুহানা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। তুহিনার হাত ধরে একপ্রকার টেনেই ব্যালকনিতে নিয়ে গেল। নিচে তাকিয়ে দেখল আশেপাশে কেউ নেই। সে দ্রুত জাহিরকে কমান্ড দিতেই জাহির একটি মই নিয়ে এসে সুহানাদের ব্যালকনিতে লাগিয়ে দিল। সুহানা হাতের ইশারায় সংকেত দিয়ে প্রথমে ব্যাগগুলো নিচে ফেলে দিল। জাহির ইশারা করতেই তাসফিন সেই ব্যাগপত্রগুলো নিয়ে দ্রুত গাড়ির দিকে চলে গেল। রামিম আর জাহির মই ধরে নিচে দাঁড়িয়ে রইল। সুহানা তুহিনাকে ধরে মইয়ের প্রথম সিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে দিল; তুহিনা টলমলে পায়ে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল ভারী গহনা সাজ শাড়ি নিয়ে বড্ড ঝামেলায় পড়েছি তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না ।

ওদিকে ঘরের বাইরে তখন হইচই শুরু হয়ে গেছে। তুহিনা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে রাখায় সবাই ডাকাডাকি করছিল। তানি ভিড় ঠেলে দরজার সামনে এসে নিজের কাছে থাকা একটি সরু চাবি দিয়ে লক খুলে ফেলল। সবাই হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল, কিন্তু ঘর ফাঁকা দেখে সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল উল্টো ছুটলো বাইরের দিকে । তবে তানি তড়িঘড়ি করে একজনকে নিচে পাঠাল বড়মাকে ডাকার জন্য, আর সে নিজে ব্যালকনির দিক থেকে আসা অদ্ভুত শব্দের উৎস খুঁজতে সেখানে গেল।

তুহিনা তখন মইয়ের মাঝামাঝি পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই তানি ব্যালকনিতে এসে হাজির হলো। সুহানা পেছন ফিরে তানিকে দেখতে পেল। তানি চিৎকার দেওয়ার আগেই সুহানা বাজপাখির মতো ঝাপটে ধরে তার মুখ চেপে ধরল। তানি বাঁচার জন্য ছটফট শুরু করল। তুহিনা নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকাতেই দেখল সুহানা আর তানির ধস্তাধস্তির সেই দৃশ্য।

“সুহানা...!”

তুহিনার আর্তচিৎকার শুনে জাহির ওপরের দিকে তাকাল এবং দেখল সুহানা একটি মেয়েকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জাহির বিড়বিড় করে উঠল, “শিট!” সে তুহিনাকে তাড়া দিয়ে বলল, “তুহিনা, তুই দ্রুত নিচে নেমে আয়!” তুহিনা টলমল পায়ে যতটা দ্রুত সম্ভব নিচে নেমে এল।

ঠিক সেই মুহূর্তে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী (গার্ড) সেদিকে এগিয়ে এল। এই অবস্থা দেখে তারা পকেট থেকে বন্দুক বের করতেই জাহির তৎক্ষণাৎ দুই হাত ওপরে তুলে সংকেত দিল। সে গম্ভীর গলায় বলল, “ডোন্ট মুভ! ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।”

ওদিকে ওপরের ব্যালকনিতে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তানি সুযোগ বুঝে সুহানার হাঁটুতে সজোরে লাথি মারল। হাই হিলের আঘাতে যন্ত্রণায় সুহানা তানিকে ছেড়ে দিল। সবাই এখন নিচে, ঘর পুরোপুরি ফাঁকা। তানি হাতের কাছে পানি ভর্তি একটি কাঁচের জগ পেয়ে সেটা সজোরে সুহানার দিকে ছুঁড়ে মারল। সুহানা দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও জগটি তার পিঠে এসে লাগল এবং ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সুহানা ব্যথায় কুঁকড়ে মেঝেতে বসে পড়ল তবে শব্দ করলো না জাহির উপরের শব্দ শুনতে পাচ্ছে তবে কিছু করার নেই তাকে এখন থেকে বেরোতে হবে আগে সুহানা সামলে নেব ওই মেয়েকে এটা জানে সে।

তানি এই সুযোগে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু সুহানা ক্ষিপ্রতার সাথে ওর পা ধরে টেনে ফেলে দিল। এরপর পকেট থেকে স্প্রে বের করে তানির মুখে ছিটিয়ে দিতেই সে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল। সুহানা টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। শরীর ঝাড়া দিতেই পিঠ থেকে কাঁচের টুকরোগুলো ঝরঝর করে নিচে পড়ে গেল। ওর পিঠ থেকে রক্ত ঝরছে, কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই। সুহানা নিচে তাকিয়ে দেখল গার্ডরা জাহিরদের ঘিরে ফেলেছে। সুহানা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ব্যালকনির দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।

সুহানা দ্রুত ব্লুটুথ অন করে সবাইকে সতর্ক করে দিল, “নিশ্বাস বন্ধ করো! কেউ শ্বাস নেবে না স্টপ ইউর ব্রেথ!”

জাহির সংক্ষেপে উত্তর দিল, “ওকে!” তারপর সে তুহিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তুহিনা, শ্বাস বন্ধ কর।”

সুহানা কালক্ষেপণ না করে ব্যাগ থেকে ছোট ছোট গোল কিছু বল বের করল এবং গার্ডদের লক্ষ্য করে সেগুলো দ্রুত ছুঁড়ে মারল। মুহূর্তের মধ্যেই বলগুলো থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল এবং গার্ডরা একে একে অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জাহির চট করে পকেট থেকে একটি এয়ার পিউরিফায়ার মাস্ক পরে নিল এবং তুহিনাকে অন্য একটি মাস্ক পরিয়ে দিল। সুহানা নিজেও আগে থেকে মাস্ক পরা ছিল; সে দ্রুত মই বেয়ে নিচে নেমে এল।

সুহানা তুহিনার হাত শক্ত করে ধরে ছোট গেটের দিকে ছুটল। সেখানকার গার্ডরা এখন আর কোনো বাধা দেওয়ার অবস্থায় নেই, তারা সবাই অঘোরে পড়ে আছে। জাহির দ্রুত সেখানে গাড়ি নিয়ে আসার নির্দেশ দিল কেউ শুনল কিনা দেখলো না । তবে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সুহানা একবার অচেতন হয়ে পড়ে থাকা গার্ডদের কাছে গেল এবং সেখান থেকে কোনো একটি জিনিস নিল।

জাহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী করছ তুমি?”

সুহানা স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল, “কিছু না, চলুন।”

তারা বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে একদল লোক নিয়ে সেখানে হাজির হলো আরও কিছু মানুষ। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জাহির আর বাকিরা দ্রুত একটি দেয়ালের সাথে মিশে গিয়ে আড়ালে দাঁড়াল। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্থির হয়ে রইল। দুশ্চিন্তায় বুক কাঁপছে—এখন কী হবে?

আগন্তুকরা চারদিকে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করল, এদিক-ওদিক তাকাল এবং শেষমেশ কিছু না পেয়ে সেখান থেকে চলে গেল। গার্ড দের খুজতে এসেছিল কিন্তু তারা পরে আছে ঝোঁপের মধ্যে।জাহির-সুহানা একে অপরের মুখ চাইলো বুঝতে পারল, এখানে আর এক মুহূর্ত রিস্ক নেওয়া যাবে না। সুহানা তাড়া দিয়ে বলল, “ভাগ দি, ভাগ!”

সুহানা তুহিনার হাত ধরে সামনের দিকে দৌড় দিল। জাহির আর রামিম কয়েক সেকেন্ড একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিল, তারপর ওরাও তাদের পেছনে ছুটল। জাহির চিৎকার করে বলল, “ভাগ রামিম, ভাগ!”

দৌড়ে গিয়ে তারা গাড়ির সামনে পৌঁছাল এবং সুহানা দ্রুত তুহিনাকে গাড়ির ভেতর তুলে দিল গাড়ি যেখানে ছিল ওখানেই থাকলো কেউ নেই গাড়ির ভিতরে । ঠিক সেই মুহূর্তেই দূর থেকে কানফাটা চিৎকার ভেসে এল— “বউ পালিয়েছে! বউ পালিয়েছে!”

জাহির সেই চিৎকার শুনে বিড়বিড় করে বলল, “ব্যাস, এবার সলিড কেস খেয়েছি ফ্যামিলি মেলোড্রামা স্টার্ট ওন স্টার জলসা, আমাদের জন্য জীবন মানে জি-বাঙলা না হলেও এদের জন্য ওটাই!”

এদিকে ঘরে কী ঘটছে তা দেখতে মোহনা বেগম দ্রুত তুহিনার ঘরে এলেন। কিন্তু ঘর ফাঁকা; কোথাও কেউ নেই। বুকটা কেঁপে উঠল তাঁর—কোথায় গেল তাঁর আদরের মেয়েটা?

বিয়েবাড়ির চারদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সবার আগে খবরটি কানে গেল রিফাতের। সে দ্রুত ছুটে গেল তার ভাই রিয়াজের কাছে। খবরটা শোনা মাত্রই রিয়াজ রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে ভরা মজলিসে নিজের পাগড়িটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। পুরো বাড়ি গার্ড দিয়ে ঘেরা, কারণ এটা স্বয়ং এমপির বিয়ে। বড় বড় সব আমন্ত্রিত অতিথি আর রাজনৈতিক অনুসারীদের সামনে এমন ঘটনায় চারদিকে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল।

রিয়াজ স্টেজ থেকে নেমে সোজা আতিফ সাহেবের কলার চেপে ধরল। রাদিফ তার ভাইকে বাধা দিতে গেলে রিয়াজের বাবা সজোরে রাদিফের গালে একটি চড় বসিয়ে দিলেন। তিনি গর্জে উঠে বললেন, “কেমন মেয়েছেলে তোদের বাড়ির? একটা মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে পারিস না? আর তুই কেমন পুরুষ যে নিজের ভাতিজি কে সামলাতে পারলি না?” অপমানে রাদিফ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

ওদিকে রিয়াজ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আতিফকে কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, “কোথায় তোর ওই চরিত্রহীন মেয়ে? খুব তো গর্ব ছিল মেয়েকে নিয়ে, এখন কোথায় গেল সে? আমার মান-সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চাস? তোকে এবার ল্যাং*টো করে সারা ঢাকা শহর ঘোরাব, শু*য়ো*রের বা*চ্চা!”

আতিফ সাহেব মিনতি করে বলতে লাগলেন, “বাবা, আমার কোনো দোষ নেই। তুমি একটিবার আমার কথা শোনো। আমার মেয়ে নিজে থেকে এমনটা করার মেয়ে নয়, তাকে নিশ্চয়ই কেউ জোর করে তুলে নিয়ে গেছে!”

রিয়াজ চরম ক্ষিপ্ত হয়ে হঠাৎ আতিফ সাহেবের মুখে এক প্রচণ্ড ঘুষি বসিয়ে দিল। সেই আঘাতে তিনি ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে শ্মশানের নীরবতা নেমে এল কেউ এগিয়ে এলো না সাহায্য করতে উল্টে দুই পা পিছিয়ে গেলো কটু কথা শোনাল। রাদিফ ছুটে ভাইয়ের কাছে গিয়ে তাঁর মুখটা তুলে ধরল; দেখল আতিফ সাহেবের নাক ফেটে রক্ত ঝরছে।

রাদিফ অস্ফুট স্বরে ডাকল, “ভাইয়া!”

রিয়াজ গর্জে উঠে হুমকি দিল, “তোদের মাত্র ১০ মিনিট সময় দিলাম। যেখান থেকে পারিস আমার হবু বউকে এনে দে। আর যদি আনতে না পারিস, তবে এই বাড়ির একটা মানুষের মাথাও ঘাড়ের ওপর থাকবে না—সব কে*টে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেব।”

মুহূর্তেই এমপি সাহেবের সব গার্ড চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বাড়ির এক কোণায় যারা গান-বাজনা আর নাচে মেতে ছিল, এক পলকেই সব আনন্দ স্তব্ধ হয়ে গেল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমন্ত্রিত অতিথিরা নানা কানাঘুষা করতে করতে দ্রুত বিয়েবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। দুই ভাই অপমানে মাটিতে বসে রইলেন।

মোহনা বেগম নিজের চোখে দেখলেন যে ছেলেটি বয়সের কোনো তোয়াক্কা না করে তাঁর স্বামীকে এভাবে আঘাত করল। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ছুটে এলেন। তাঁকে আসতে দেখে আতিফ সাহেব হাত দিয়ে ইশারা করে থামিয়ে দিলেন এবং রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, “ভেতরে যাও মোহনা।”

স্বামীর এই অবস্থা দেখে মোহনা বেগম আর এগোতে সাহস পেলেন না। আয়েশা বেগম তাঁকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। তানি জ্ঞান হারিয়ে পরে আছে উপরে তাকে খাটে শুইয়ে দিয়েছেন কেউ জানলো না এর পেছনের কারণ কি?

রিয়াজের বাবা যাওয়ার আগে আতিফ সাহেবের মুখে ঘৃণাভরে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিলেন, তারপর তাচ্ছিল্যের সাথে ধুতি উঁচিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। সেখানে শুধু দাঁড়িয়ে রইল রিয়াজ আর তার ভাই রিফাত।

রিয়াজ গমগমে গলায় আদেশ দিল, “রিফাত, গাড়ি বের কর!” পুরো ঢাকা কে খবর দে।

কিন্তু ঠিক তখনই অন্য এক জায়গায় বাধল বিপত্তি। যাকে পাহারার দায়িত্বে রেখে যাওয়া হয়েছিল, সেই মানুষ দুটো উধাও! তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুটো গাড়ি এখানেই আছে বেশ খানিকটা দূরে আস্তে হয়েছে তাদের কারণ গাড়ি গেটের সামনে যায়নি।সব গার্ড বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে সামনের গেটের দিয়ে তারা এসেছে পেছনের ওটি দিয়ে বাড়ি বেশি বড়ো নয় তাই তেমন প্রবলেম হয়নি তবে এখন কোথায় খুঁজবে ওই দুইজন কে ?

চলবে…….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন