গল্প: প্রেমের আলোড়ন
লেখক:এমডি সুহান জয়
পেজ: Midnight Tales by Joy
পর্ব: ৩৮
(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)
পেছনের গাড়ি থেকে আতিফ মির্জা এবং জাহাঙ্গীর সাহেব হাসিমুখে একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। জাহির সুহানার মাথার ওপর হাত দিয়ে তাকে আগলে রাখল। ওই একই গাড়ি থেকে আরও তিনজন নারী ও একজন পুরুষ নামলেন; জাহির তাঁদের না চিনলেও কলেজে আতিফ সাহেবকে আগে বেশ কয়েকবার দেখার কারণে তাঁকে চিনতে পারল।
জাহির ওপরের দিকে তাকাতেই আফ্রিদিসহ সবাইকে দেখতে পেল। তাদের চোখাচোখি হতেই আফ্রিদি দ্রুত তুহিনার কাছে ছুটে গেল। জানলা দিয়ে উঁকি মারতে দেখে আফ্রিদি তাকে টেনে সরিয়ে আনল।
"তোতাপাখি..."
"তুমি—" তুহিনাকে থামিয়ে দিয়ে আফ্রিদি বলল, "শোনো।"
তুহিনা আফ্রিদির দিকে তাকালে সে প্রশ্ন করল, "তোমার বাবা যদি তোমাকে জোর করে নিয়ে যেতে চান, তবে কি তুমি চলে যাবে?"
"না, যাবো না ।"
"যদি তিনি আমাদের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ান?"
"আমি শুধু তোমাকেই চাই।"
আফ্রিদি তুহিনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তুহিনাও তাকে জাপটে ধরল। দীর্ঘ সময় পর তারা হৃদয়ে এক প্রশান্তি অনুভব করল। এর মধ্যেই ছোট বোনগুলো বাইরে বেরিয়ে গেল। ফিনা করিডোরের পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে সব দেখছিল।
এদিকে সামির দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল স্লিপ কেটে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো,কোনো মতে পিলার ধরে ডাক ছাড়লো --"বড় মা...…”
সাবেরা বেগম তখন ফোনে কথা বলছিলেন। কারও ডাক শুনে পেছনে তাকাতেই সামিরকে তাঁর দিকে হাঁফাতে দেখে তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, --"কী হয়েছে? কী হয়েছে সামির?"
"নতুন ভাবির বাড়ির লোক এসেছে, তাড়াতাড়ি যাও!"
"কী?"
"হ্যাঁ, বাইরে আছে, দ্রুত যাও।"
খবরটা শুনেই সবাই হাতের কাজ ফেলে ছুটে এল। মহিলারা দ্রুত মাথায় আঁচল টেনে নিলেন। জাহিরের দাদি ঘরের ভেতর থেকে এসব শুনতে পেয়ে চিৎকার শুরু করলেন— "ওরে বউ, আঁরে লৈ চল! নয়া বউ কঁডে? হন ফলাই যারগুই?" (“ওরে বউ, আমারে নিয়ে চল! নতুন বউ কোথায়? কে পালিয়ে যাচ্ছে?”)
রুহানি দৌড়ে নিচে নেমে দাদির কাছে গেল, রামিম এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে ইনফরমেশন দিতে হবে যে;
জাহির সুহানার হাত শক্ত করে ধরে ঝিলের ধার ঘেঁষে বাগানের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সুহানা কয়েকবার পেছন ফিরে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু জাহির তাকে রীতিমতো টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ায় সে পেরে উঠল না।
সুহানা বলে উঠল, "আপনার এখন এভাবে দৌড়ানো ঠিক হচ্ছে না।"
জাহির কোনো উত্তর দিল না। সে বাগান ঘুরে বাড়ির পেছনের দিকে চলে এল। দীর্ঘ পথ পার হয়ে আসায় দুজনেই তখন হাঁপাচ্ছে। জাহির বিড়বিড় করে বলল, ---"এই দিক দিয়েই যেতে হবে, সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে না চলো” ।
সে সিঁড়ির নিচের দরজাটি ঠেলে ভেতরে ঢুকল। জায়গাটি দাদির ঘরের ঠিক পাশেই। ভেতর থেকে রুহানি আর দাদির কথোপকথন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। দাদি চিৎকার করে বলছেন, "এই, আমাকে বাইরে নিয়ে চল! এখানে আমায় ফেলে রেখেছিস কেন? আমি কিছুই জানতে পারি না। দুই দিন হলো নাতবউ বাড়িতে এল, অথচ আমাকে কিছুই জানানো হলো না! সর দেখি সামনে থেকে!"
দুইজনেই হাঁপাচ্ছে। জাহির দেয়ালের পিঠে হেলান দিতেই ব্যথায় তার মুখ দিয়ে ‘উফ’ শব্দ বেরিয়ে এল। সুহানা তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে জাহিরের মুখ চেপে ধরল। সিঁড়ির নিচের ওই সরু আর অন্ধকার জায়গায় তারা একে অপরের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। কেউ এই দিকে এলেই বিপদ, কিন্তু বেহায়া জাহিরের কি সেদিকে খেয়াল আছে? নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে তার ঠোঁট দুটো নিশপিশ করছে।
সুহানা বাইরে উঁকি দিল। দরজার সামনে তখনো ভিড়। জাহিরের দিকে না তাকিয়েই সে নিচু স্বরে বলল:
“সবাই এখনো দরজার সামনেই আছে, কেউ ভেতরে ঢোকেনি। চলুন।”
জাহির কোনো কথা বলছে না দেখে সুহানা মাথা তুলে তার দিকে তাকালো। দেখল, জাহির একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সুহানা নিজের হাতের দিকে তাকাতেই সেখানে এক অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি হলো। সে হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু জাহির তার ঠোঁটের ওপর রাখা সুহানার হাতটি আরও শক্ত করে চেপে ধরল। আবেশে সুহানা চোখ বন্ধ করে ফেলল, পায়ের স্লিপারগুলো আঙুল দিয়ে খামচে ধরল।
সুহানার অবস্থা দেখে জাহির আর এগোলো না, তাকে ছেড়ে দিল। সিঁড়ির নিচের ওই অন্ধকার জায়গা থেকে সে উঁকি দিয়ে দেখল সবাই ভেতরে ঢুকে পড়েছে। জাহির সরে এসে নিচের দরজা আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল, এবার জানালাটাও টেনে দিল যাতে আলো না আসে। তবে তাদের এখন এখান থেকে বেরোতে হবে।
এদিকে দাদির গলার স্বর ক্রমেই বাড়ছে; মনে হচ্ছে তিনি যেকোনো মুহূর্তে ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন।
রুহানি দাদিকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, “দাদি, একটু শান্ত হও! সবাই তো বাইরে আছে নতুন ভাবির বাড়ির লোক এসেছে তো, তাই একটু ব্যস্ত সবাই।”
দাদি এতে আরও খেপে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “"ওরে নচ্ছার! বেগগুন গেটত গিয়ই অঁরে ফেলাই কেনে? আঁই কি এই ঘরের কেউ ন না? চল্ কঁদ্দে, এহনই আঁরে লৈ চল!" (“ওরে নচ্ছার! সবাই গেটে গেছে তো আমাকে ফেলে রেখে কেন? আমি কি এই বাড়ির কেউ না? চল বলছি, এখনই আমাকে নিয়ে চল”)
বাইরে তখন অনেক মানুষের পায়ের শব্দ আর কথা বলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এখনই ওপরের ঘরে পৌঁছাতে না পারলে তারা ধরা পড়ে যাবে। সুহানা ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে জাহির সুহানার কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “দাদি ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই তুমি দাদির রুমে ঢুকে যাবে, আর আমি সুযোগ বুঝে ওপরে চলে যাব।”
কথাটা শেষ করেই জাহির সুহানার কানে আলতো করে একটা ফুঁ দিল। সুহানা শিউরে উঠে ঘাড় কাত করে সরে গেল, আর জাহির নিঃশব্দে এক চিলতে হাসল মজা লাগে তার এই মেয়েটাকে ভাঙতে সবে শুরু আসতে ধীরে সমস্ত আবরণ উন্মুক্ত করবে সে, সময় নিয়ে।
জাহিরের কথায় সুহানা সাড়া দিয়ে শুধু মাথা নাড়ল। তার বুক তখন প্রচণ্ড ধকধক করছে। জাহির সাবধানে একটু এগিয়ে গিয়ে স্লাইডিং উইন্ডোটা ফাঁক করে দেখল যে রুহানি দাদিকে সামলাতে ব্যস্ত এবং ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে বাইরের দিকে যাচ্ছে। জাহির ভাবল, এই সুযোগে দাদি বেরিয়ে গেলেই সে সুহানা কে ঘরে ঢুকিয়ে, সে সোজা উপরে চলে যাবে। ওদিকে আফ্রিদি কী করছে তার ঠিক নেই!
জাহির সুহানার হাত ধরে নিঃশব্দে সামনে পা বাড়াল। কিন্তু মাত্র দুই কদম যেতেই দেখল আয়না বেগম হাতে প্লেট নিয়ে এই দিকেই আসছেন। সুহানা ভড়কে গিয়ে শক্ত করে জাহিরের শার্ট চেপে ধরল। সে জাহিরকে টেনে সরিয়ে আনতে চাইল কিন্তু পারল না। উল্টো জাহিরের পা টেবিলের কোণায় লেগে সে সশব্দে পড়ে গেল। সুহানা শার্ট ধরে রাখায় সে-ও তার সাথে নিচে পড়ে গেল।
ভারী কিছু পড়ার শব্দ শুনে আয়না বেগম সেদিকে তাকালেন। কিন্তু সামনে কিছু না দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, "কিছু তো দেখছি না, তুই কি কোনো শব্দ শুনলি?"
রাবাইদা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উল্টো প্রশ্ন করলেন, "না তো, কেন?"
আয়না বেগম বললেন, "আমার কেন জানি মনে হলো কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো।"
রাবাইদা উত্তর দিলেন, "আরে, বিড়াল-টিড়াল হয়তো লাফ দিয়েছে।"
"হতে পারে," বলে আয়না বেগম কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। তারপর বললেন, "চল রান্নাঘরে দেখি ওখানে আবার কি অবস্থা।" এরপর দুজনই সেখান থেকে চলে গেলেন।
জাহির দাদুর বড় সোফাটা নামক সিংহাসন এর আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে, আর সুহানা একেবারে পিলারের সঙ্গে মিশে দাঁড়িয়ে আছে। দাদি যেহেতু মেহমানদের খোঁজ নিতে গেছেন, এটাই পালানোর মোক্ষম সুযোগ। সুহানা চট করে দাদির ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। জাহির সোফার আড়াল থেকে লক্ষ্য করল সবাই নিজ নিজ জায়গায় বসে পড়েছে; কেউ এই দিকে তাকানোর আগেই তাকে সরতে হবে। অন্য কোনো উপায় না দেখে সে-ও দ্রুত দাদির ঘরের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে চলল।
সুহানা মাত্রই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, কিন্তু তা আর স্থায়ী হলো না— জাহির নামক ভেমরুল সেখানে হাজির হলো! জাহির ঘরে ঢুকতেই তড়িঘড়ি করে দরজা আটকে দিল।
উপর থেকে এই পুরো দৃশ্যটি দেখছিল রামিম আর সাদাদ। জাহিরকে ওভাবে যেতে দেখে রামিম সাদাদকে বলল, "মা তো আর জানে না যে ওটা কোনো বিড়াল নয়, ওটা তো স্বয়ং বিড়ালের ভাগ্নে ‘হালুম মামা’!
সাদাদ মজা করে বলল, “ মেজো মামির জন্য আমার এক বুক আফসোস হচ্ছে।"
তখনই সামির পেছন থেকে এসে বলল, "আফসোস পরে করিস, আগে আফ্রিদি ভাইকে তৈরি কর, ওর ডাক পড়েছে।"
সামিরের কথা শুনে রামিম ঝট করে তার দিকে তাকাল এবং বলল, "তার মানে এরাই ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির লোক! আমি ঠিকই ধরেছি, এই কারণেই সে এত জোরে দৌড়েছে।"
রামিমের কথা শুনে সাদাদ আর সামির দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ল। ঠিক তখনই মিহু দ্রুত ভাইদের কাছে ছুটে এল।
"মেজদা, তাড়াতাড়ি চলো! দাদাভাই ডাকছে।"
"কেন?"
"বড়দা কোথায়? তাকে তো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তোমরা কি দেখেছ?"
সাদাদ উত্তর দিল, "না, জানি না তো। চল দেখি, দাদাভাই আবার নতুন কী ঝোল পাকাচ্ছেন!"
"আপনি এখানে কেন?"
"ওপরে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই।"
"তাহলে অন্য কোনো রুমে যান।"
"কেন?"
"কেন মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?"
"তুমি কি নিজেকে সামলাতে পারবে না? আমার এই হ্যান্ডসাম আর ড্যাশিং বডি দেখে কি তাল হারিয়ে ফেলবে?"
সুহানা রেগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল "হ্যান্ডসাম মাই ফুট!"
জাহির ব্যঙ্গ করে সুহানার কথা রিপিট করে বলল, “হ্যান্ডসাম মাই ফুট!”
সুহানা আর কী-ই বা করবে! সে জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে বাইরে উঁকি দিল, আসলে কারা এসেছে সেটা দেখার খুব কৌতূহল হচ্ছে তার। এদিকে জাহির এখনো হাঁপাচ্ছে; তার বুকের ভেতরটা যেন চেপে আসছে, বেশ কষ্ট হচ্ছে। পিঠেও খিঁচ ধরেছে তার, তাই পাশের একটা চেয়ার টেনে সে বসে পড়ল।
সুহানা জানালা দিয়ে উঁকি দিলেও বিশেষ কিছু দেখতে পেল না, কারণ বড় সোফাটার আড়ালে সব ঢাকা পড়ে গেছে; শুধু যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামান্য দেখা যাচ্ছে। সে জাহিরের দিকে তাকিয়ে দেখল সে ভীষণ হাঁপাচ্ছে। সুহানা পর্দা টেনে দিয়ে টেবিলের কাছে গেল এবং এক গ্লাস পানি ঢেলে জাহিরের দিকে বাড়িয়ে দিল।
জাহির পানির গ্লাসটা নিয়েই এক নিশ্বাসে সবটা ভেতরে চালান করে দিল; এই মুহূর্তে এটার সত্যিই খুব প্রয়োজন ছিল।
মোহনা বেগম ভেতরে ঢুকেই নিজের মেয়ের খোঁজ করলেন। মালেহা বেগম মেয়েকে ডেকে ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন তুহিনার কাছে। এদিকে তানি আর আয়েশা সবকিছু হাঁ করে গিলছে; তারা ভাবতেও পারেনি যে ছেলেটি এমন রাজকীয় পরিবারের হবে। সকালে যখন এদের দেখেছিল, তখন কত আজেবাজে কথাই না ভেবেছিল!
বিহান সকালের কথাগুলো ভাবছে। হুট করেই সবকিছু ঘটে গেল। সব ঠিকঠাক থাকলেও এই লোকগুলোকে তার মোটেও সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না। সে এক কোণে চুপচাপ বসে সবার ওপর কড়া নজরদারি করছে। জাহিরকে নাকি এদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে—কথাটা শুনেই তার মাথা গরম হয়ে গেছে। ও কেন ক্ষমা চাইবে? ও কী অপরাধ করেছে? বরং উল্টো ওদেরই ক্ষমা চাওয়া উচিত গুলি চালানোর জন্য।আবারও সকালের সেই স্মৃতিগুলো তার মনে ভিড় করে এল।
সকালবেলা হঠাৎ জিসান তাকে ডাকতে এল— "মেজদা ডাকছে, নিচে চল।"
বিহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন?"
"জানি না তো, তোকে সাথে নিতে বলল। মনে হয় কোথাও যাবে, তুই চটপট তৈরি হয়ে নিচে আয়।"
বিহান ভাবল হয়তো কোনো প্রয়োজনে শহরে যাবে। সে হেলতে-দুলতে পোশাক পরে তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। সেখানে তিন ভাইয়ের সাথে দেখা হতেই সবাই হুড়োহুড়ি করে গাড়িতে চড়ে বসল। যাত্রা শুরু হলো, আর সাথে আরও দুটো খালি গাড়ি নেওয়া হলো।
বিহান কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, "খালি গাড়ি কেন নেওয়া হচ্ছে?"
"দরকার আছে।"
"কী দরকার?"
"গেলেই দেখতে পাবি।"
"আরে আমাকে বলোই না!"
"না, এখন বলা যাবে না।"
তিন ভাই মিলে আসলে কী পরিকল্পনা করছে, বিহান তা ঠিক বুঝতে পারছিল না। তবে যখন তারা মিষ্টি কেনার জন্য গাড়ি থামাল, তখন সে কিছুটা আন্দাজ করতে পারল; তবুও সে চুপ করে রইল এবং সন্তর্পণে জাহিরকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল। দীর্ঘ যাত্রার পর যখন তুহিনাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামল, তখন বিষয়টি বুঝতে আর বাকি রইল না। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না, যতটুকু সাবধান করার সে আগেই করে দিয়েছে।
তারা গাড়ি থেকে নামতেই আশপাশের বিল্ডিংয়ের মহিলারা জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন এবং নানা রকম মন্তব্য করছিলেন। জাহাঙ্গীর সাহেব গায়ের পাঞ্জাবিটা ঠিকঠাক করে সবার দিকে তাকালেন। দেখলেন সবাই বেশ পরিপাটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—সবার হাতে মিষ্টি, দই, ফল - ফুল। তিন ভাই এবং ড্রাইভাররাও বেশ কিছু ব্যাগ হাতে নিয়ে প্রস্তুত। সবকিছু ঠিক আছে দেখে জাহাঙ্গীর সাহেব কলিং বেল চাপলেন।
তানি তখন লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিল। কলিং বেলের শব্দ শুনে সে রান্নাঘরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখল মা আর বড়মা দুজনেই কাজে ব্যস্ত। ঘড়িতে তখন সকাল ৯টা ২৫ । তানি নিজেই উঠে গেল দেখার জন্য যে এই সময়ে আবার কে এল। সে ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলল। বাইরে একদল অচেনা মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে যেমন অবাক হলো, তেমনি মনে মনে কিছুটা ভয়ও পেল—কে জানে আবার কী বিপদ ঘটে!
জাহাঙ্গীর সাহেব মিষ্টি হাসি দিয়ে তানিকে জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কি তরিকুল মির্জার বাড়ি?"
তানি উত্তর দিল, "জি, কিন্তু দাদু তো মারা গেছেন।"
বাইরের আওয়াজ কানে যেতেই আয়েশা বেগম বেরিয়ে এলেন। দরজার সামনে এতগুলো মানুষ দেখে তিনি দ্রুত গায়ে আঁচল টেনে সামনে এগিয়ে এলেন। জাহাঙ্গীর সাহেব তাঁকে দেখে সালাম দিলেন এবং আয়েশা বেগম সালামের উত্তর নিলেন। তবে সাতসকালে এতজন মানুষের আগমনের কারণটা তাঁর খতিয়ে দেখা দরকার।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "কাকে চাইছেন?"
"আমি আফ্রিদির ফুফা।"
"কে আফ্রিদি?"
জিসান তখন চট করে বলে উঠল, "তুহিনা কি এই বাড়ির মেয়ে?"
আয়েশা বেগম এবার বেশ নড়েচড়ে বসলেন এবং সবার হাতের দিকে কড়া নজর দিলেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, "হ্যাঁ, কেন?"
"তুহিনা আমাদের বাড়িতেই আছে।"
আয়েশা বেগম যা বোঝার বুঝে গেলেন। তিনি বেশ গম্ভীর কণ্ঠে তাঁদের ভেতরে আসার অনুমতি দিয়ে বললেন, "ভেতরে আসুন।"
সে দ্রুত গিয়ে মোহনা বেগমকে সব কিছু জানাল এবং তানিকে উপরে পাঠাল আতিফকে ডেকে আনতে। মোহনা বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং বাইরে এসে সবাইকে দেখে সালাম দিলেন। জাহাঙ্গীর সাহেব তাঁদের এই তড়িঘড়ি অবস্থা দেখে জাসমিরকে কিছু একটা বললেন এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, "ব্যস্ত হবেন না, বাড়িতে কি ভাইজান নেই?"
"আছেন, উপরে আছেন। এখনই আসছেন।"
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে হাই তুলতে তুলতে নামছে রাদিফ। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা তার পুরনো অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ কড়া দুধ চা না খেলে তার দিনটি মোটেও ভালো কাটে না। সে বেশ জোর গলায় গুনগুন করতে করতে ডাক দিল, "আয়েশা, আমার চা-টা দাও!"
স্বামীর এমন আলসেমি দেখে আয়েশা বেগম বেশ বিপাকে পড়লেন। তিনি দ্রুত পাশ কাটিয়ে গিয়ে রাদিফের সামনে দাঁড়ালেন। রাদিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হলো? চা কই?"
"বাড়িতে মেহমান এসেছে, চোখে দেখছ না তুমি?"
রাদিফ এবার সরাসরি লিভিং রুমের দিকে দৃষ্টি দিলেন। ততক্ষণে তানির সাথে আতিফও নিচে নেমে এসেছে। জাহাঙ্গীর সাহেব আতিফকে দেখামাত্রই উঠে দাঁড়ালেন, আর আতিফ নিজেও তাঁকে দেখে বেশ চমকে উঠল।
দুইজনই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
"আতিফ!"
"জাহাঙ্গীর!"
"তুই?"
"আরে!"
আতিফ হাসিমুখে জাহাঙ্গীরের দিকে এগিয়ে এল এবং দুজনে হাসতে হাসতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। উপস্থিত সবার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল, কেউ কিছুই বুঝতে পারল না।
"কত বছর পর দেখা! উফ, তুই তো একদম বুড়ো হয়ে গেছিস!"
"শালা!"
দুজনে সবকিছু ভুলে কুশল বিনিময়ে মেতে উঠল। জাহাঙ্গির সাহবে বলল, "উফ, কতদিন পর বল তো? সেই বার্লিনে থাকতে তোর সাথে শেষ দেখা। তারপর তোকে কত খুঁজেছি!"
আতিফ উত্তর দিল, "আমি দুই বছর পরেই দেশে চলে এসেছিলাম, তারপর চাকরিতে জয়েন করেছি সেখানে গিয়ে।"
হঠাৎ "বড়দা" ডাক শুনে জাহাঙ্গীরের মনে পড়ল তারা আসলে কী প্রয়োজনে এখানে এসেছে। সে মাথা দুলিয়ে একটু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল। তারপর গলার স্বর ভারী করে জিজ্ঞেস করল, "তুহিনা কি তোর মেয়ে, আতিফ?"
আতিফ সাহেব গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন।
"আফ্রিদি আমার শ্যালকের ছেলে, ও আমার কাছেই বেশি থাকে। তুহিনা..."
"ওর সাথেই গেছে, তাই তো?" আতিফের কথায় জাহাঙ্গীর সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন।
তিনি বললেন, "তোর মেয়ে আমার বাড়িতেই আছে এবং একদম সুরক্ষিত আছে। আমি এখনো তাদের বিয়ে দেইনি। আফ্রিদির বাবাও কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। আমি এখনো তাদের বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে দিতে চাইছি না, সেই কারণেই তো তোর দুয়ারে এসে হাজির হয়েছি।"
আতিফ কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বললেন, "এখানে আমার মতামত দেওয়ার কী আছে বল তো? বাড়ি থেকে যখন পা বাড়িয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন কি আমার মত চেয়েছিল যে এখন লাগবে?"
জাহাঙ্গীর আশ্বস্ত করে বললেন, "আমার আফ্রিদি খারাপ ছেলে নয়, ও খুব ভালো। তোর মেয়ে ওর কাছে সুখী হবে।"
আতিফ পাল্টা উত্তর দিলেন, "যার সুখ সে নিজেই বেছে নিয়েছে, এই নিয়ে আমাকে আর কিছু বলিস না জাহাঙ্গীর।"
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা দিয়ে একজন প্রবেশ করলেন। জাহাঙ্গীর সাহেব উঠে গিয়ে দরজার সামনে থেকে তাঁকে ভেতরে নিয়ে আসলেন। তিনি হলেন আফসার শেখ। তিনি ঘরে ঢুকেই সবার উদ্দেশে সালাম দিলেন।
জাহাঙ্গীর সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, "ইনি আফ্রিদির বাবা।"
আতিফ স্যুট-বুট পরা মানুষটির দিকে তাকালেন। মানুষটির মুখে সাদা পাকা দাড়ি, ফর্সা গায়ের রং আর নাকটা হুবহু আফ্রিদির মতো। তাঁর চোখগুলো বেশ ছোটো, দীর্ঘ কপালে একটি গোলাকার কালো দাগ দেখা যাচ্ছে। পরনে সাদা সাফারি স্যুট, মাথায় সামনের দিকে টাক পড়েছে এবং বয়সের ভারে মুখের চামড়া কিছুটা কুঁচকে গেছে। মানুষটি বেশ লম্বা।
আফসার সাহেবকে ভালোভাবে দেখে নেওয়ার পর আতিফ জাহাঙ্গীরের দিকে তাকালেন। তখন উপস্থিত সবাই আতিফের দিকেই তাকিয়ে ছিল। আতিফ হাতের ইশারায় মোহনা বেগমকে কাছে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, "একে চিনতে পারছ?"
মোহনা বেগম প্রথমে চিনতে পারলেন না। আতিফ মনে করিয়ে দিলেন, "যার কথা তোমাকে প্রায়ই বলতাম, সেই বার্লিনের দিনগুলোর কথা।"
এবার মোহনা বেগম চিনতে পেরে বললেন, "ওহ হ্যাঁ, জি জি।"
আস্তে আস্তে বাড়ির সবার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। রাদিফের সাথেও পরিচয় হলো। তবে বিহান তীক্ষ্ণ চোখে রাদিফকে পর্যবেক্ষণ করছিল; তার মনে হলো এই লোকটা সুবিধার নয়। যে পুরুষ বেলা দশটা পর্যন্ত ঘুমায়, তাকে সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। সবাই যখন পরিচয়পর্ব সারছে, বিহান তখন একভাবে পায়ের ওপর পা তুলে বসেই রইল।
সবাই মিলে আতিফ সাহেবকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তিনি কিছুতেই মানতে রাজি নন। তাঁর মতে, সমাজে তাঁর মান-সম্মান গেছে, অর্থকড়িরও ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না যে, ছেলের বাবা বেঁচে থাকতেও সে কেন ফুফার কাছে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি এখনো পাননি।
তিনি সরাসরি প্রশ্ন করলেন, "আচ্ছা জনাব, আপনার ছেলে জাহাঙ্গীরের কাছে থাকে কেন? আপনার কাছে থাকে না কেন?"
আফসার সাহেব আগে থেকেই এমন কোনো প্রশ্নের আশঙ্কা করেছিলেন। এখন তাকে সত্যিটা বলতে হবে...
চলবে….
(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)
#প্রেমের_আলোড়ন
#md_suhan_joy
#midnight_tales_by_joy
Thank You🍀
(Don’t copy without permission)
Enjoy your reading 🎀