ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের আলোড়ন

৪৮তম পর্ব

লেখক: এমডি সুহান জয়

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৪৮ (প্রথম অংশ)

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

তুহিনা আসার পর থেকেই সুহানাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ফিনা সব জায়গায় দেখেছে, কিন্তু তার কোনো হদিস নেই। তুহিনা ফিনা কে আবার জিজ্ঞাস করলো –“সুহানা কোথায় ?”

ফিনা ফোন করতে করতে বলল, -“আমি নিজেও ওকে খুঁজে পাচ্ছি না, ফোন করলেও ধরছে না”

আফ্রিদি ভাইদের নিয়ে উপরে জাহিরের ঘরে এল। জাহির তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আকাশের অবস্থা একদম ভালো নয়, ঝড় হচ্ছে। নিচে প্যান্ডেলের ভেতর খাওয়াদাওয়া চলছে; অল্প কিছু লোক সেখানে আছে, আর বাকি গ্রামবাসীদের জন্য মসজিদের সামনের বড়ো মাঠে ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জাহির সাদা প্যান্ট আর আকাশী রঙের শার্ট পরেছে। বাতাসের ঝাপটায় সে কিছুটা ভিজে গেছে, কিন্তু বাইরের সেই বৃষ্টি তার মনের অস্থিরতা শান্ত করতে পারছে না। সুহানাকে একবার দেখার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে আছে। কাল রাতের কথা মনে পড়তেই তার আরও খারাপ লাগছে। নিজের কর্মের কথা ভেবেই নিজের ওপর রাগ হচ্ছে তার। কিন্তু এই মুহূর্তে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। আজ আফ্রিদির বিয়ে; কত কী ভেবেছিল জাহির, কিন্তু কিছুই ঠিকঠাক হলো না।

আফ্রিদি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখল রুমে কেউ নেই। বারান্দার দরজা খোলা দেখে সেদিকে এগিয়ে গেল। তাসফিন মিষ্টির বাটিটা টেবিলের ওপর রাখল। সাদাদ ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সামির আর রামিম এখনো নিচে আছে; তারা সব গুছিয়ে প্রায় শেষের দিকে মেহমানদের খাওয়াদাওয়া তদারকি করছে।

জাহির...

আফ্রিদির ডাক শুনে জাহির মুখ তুলে তাকালো। তার চেহারা কিছুটা মলিন হয়ে গেলেও সেটা আড়াল করতে এক চিমটি হাসি ঝেড়ে সে আফ্রিদির কাছে এগিয়ে এলো। দুই বন্ধু কাঁধে হাত দিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকলো। আফ্রিদি নিঃশব্দে লক্ষ্য করলো জাহিরের মুখের ডান পাশটা লাল হয়ে আছে—ওখানেই সে ঘুষিটা মেরেছিল।

জাহির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে উঠলো, "কংগ্রাচুলেশন ব্রো! ফাইনালি তুই বিয়েটা করে ফেললি।"

আফ্রিদি জাহিরকে জড়িয়ে ধরে অপরাধবোধ মেশানো স্বরে বললো, "সরি ভাই, আমি আসলে..."

জাহির তাকে থামিয়ে দিয়ে রসিকতা করলো, "এত ফরমালিটি মা*স না তো! তোর বাসর ঘরে বাতি জ্বালাবো !"

আফ্রিদি হেসে গালি দিয়ে উঠলো, "শালা হারামি!" তারপর সে জাহিরের জন্য দোয়া পড়া শুরু করলো।

জাহির হাসতে হাসতে প্রায় শেষ! যেখানে তাসফিন আর সামির হেসে ককিয়ে উঠলো, যেখানে বড়দা আছে, সেখানে হাসাহাসি হবে না—এটা অসম্ভব। আফ্রিদি জাহিরের সামনে গিয়ে মনে করিয়ে দিল, "শুধু আমি একা জামাই না, তুইও সাথে আছিস। যদিও মুখ কালো করে বিয়েটা করেছিস।"

জাহির হেসেই আফ্রিদির পিঠ চাপড়ে দিল। "সম্পর্কে তুই আজ আমার বড় হলি। একদিকে বউয়ের বড় বোনের জামাই, আবার সুহুর ভাই হিসেবে আমার শালা"

“আমার শালা মুখ যে বড়ই কালা,

সারাদিন সে গলায় পরে মিথ্যে কথার মালা।

পকেট তাহার গড়ের মাঠ, বুদ্ধি মাথায় কম,

দেখলে তারে পাড়ার লোকে পাছায় মারে বোম”

জাহির এর কবিতা শুনে আফ্রিদি হাসি বাদ দিয়ে জাহিরের ঘাড় ধরে টেনে আনলো পিঠে কিল বসালো, “ জীবনে পাল্টাবি না তুই, হারামী কোথাকার, *****”

তাসফিন পেটে হাত দিয়ে জাহিরকে উদ্দেশ্য করে বলল-“বড়দা থামো প্লীজ হাসতে কষ্ট হচ্ছে উফফফ”

সামির দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতেই বলে ফেলল,- “ আফটার কবি জসিমউদ্দিন, আল্লাহ্ ক্রিয়েটেড জাহির উদ্দিন”

আফ্রিদি ছেড়ে দিলো -"শেষ পর্যন্ত একই দিনে আমাদের বিয়ে হলো, তাও আবার দুই বোনের সাথে! ওদের ঝগড়া হবে না কোনোদিন ঝগড়া হবে না, আমাদের মাঝে আমাদের বউরা আসবে না।"

মুহূর্তেই জাহিরের হাসি মিলিয়ে গেল। সে জানে সুহানা এত সহজে তাকে ক্ষমা করবে না। এই মুহূর্তে মেয়েটা কোথায় আছে, সেটা জানার জন্য তার মন ছটফট করছে। আফ্রিদি জাহিরের চেহারার পরিবর্তন দেখে ওর মনের অবস্থা বুঝতে পারলো। যা হয়েছে সেটা ঠিক না ভুল, তা সে জানে না, তবে এটাই হওয়ার ছিল। সুহানার খোঁজ নিয়েছে সে—সুহানা নিচের রুমেই আছে। তুহিনা বা ফিনা এখনো সবটা জানে না, তাদের সাথে বিশদ কথা হয়নি। জাহির- সুহানা কোনো কিছুতেই অংশ নেয়নি, এদিকে তাদের জন্য আজ তুহিনা কে পেলো সে। তুহিনা শেষ মুহূর্তে সুহানার কথা জিজ্ঞেস করলেও সময়ের অভাবে কেউ কিছু বলেনি। আফ্রিদি ঠিক করেছে, পরে মাথা ঠাণ্ডা করে তুহিনাকে সবটা বুঝিয়ে বলবে।

আফ্রিদি ইশারা করতেই সাদাদ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। এদিকে তাসফিন আর আফ্রিদি দুপাশ থেকে জাহিরের বাহু জড়িয়ে ধরে সামনে এগোলো

"কী হলো? চল আমাদের সাথে!"

"কোথায় যাচ্ছিস তোরা?"

"চল গেলেই দেখতে পাবি..."

আফ্রিদি আর তাসফিন জাহিরকে একরকম টেনে নিয়ে চলল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জাহির দেখল, জাহাঙ্গীর সাহেব মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। পাশে চাচারা সবাই খেয়েদেয়ে বসেছে। একপাশে অতিফ আর রাদিফ বসা, আর আসফার সাহেব জাহাঙ্গীর সাহেবের পাশে বসে নিচু স্বরে কিছু বলছেন।

দুই ভাই যখন জাহিরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন জাহিরের চোখ পুরো বাড়িটা একবার খুঁজে নিল। সে রান্নাঘরের পাশের গেস্টরুমের দরজার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল, কাউকে দেখার তীব্র চেষ্টা করছিল তার চোখ দুটো। জাহাঙ্গীর সাহেব লক্ষ্য করলেন, তার ছেলে সুহানা যে রুমে আছে সেই রুমে দিকেই তাকিয়ে আছে। তিনি মনে মনে যা ভয় পেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো।

বাইরে তখন সামির একটা বড় ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। জাহিররা আসতেই সবাই কাদা মাড়িয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকতেই সবাই চিৎকার করে স্বাগত জানাল। জাহির এক চিমটি হাসি দিল। সব ভাইয়েরা এক জায়গায় হতেই মুহূর্তের জন্য সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গেল তারা। গান শুরু হলো, আর বাইরের বৃষ্টির বেগও বাড়ল। আফ্রিদি জাহিরের হাত ধরে তাকে নাচার জন্য মাঝখানে টেনে নিল। সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরে লাফালাফি শুরু করতেই জাহিরও তালে তাল মেলালো। জোরে গান বাজছে জাহির কোথা থেকে একটা ওড়না জোগাড় করলো গলায় পেঁচিয়ে নিলো গানের সাথে তালমেলালো— "বিড়ি জলাইলে জিগারসে পিয়া...”

জাহাঙ্গির সাহেব ভাবছে দুপুরের কথা, সবাই বাড়ির ভীতরে খেয়েছে তারা, জাহাঙ্গীর সাহেবের সাথে খাওয়ার সময় কাজী সাহেবের কথা হচ্ছিল।

কাজী সাহেব মুচকি হেসে বললেন, "এত তাড়াতাড়ি আমার কথা রাখলে জাহাঙ্গীর?"

জাহাঙ্গীর সাহেব কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারলেন না। প্লেটে হাত নাড়াতে নাড়াতে আনমনেই জিজ্ঞেস করলেন, "কোন কথা চাচা?"

"এই যে নাতির বিয়ের কথা!"

জাহাঙ্গীর সাহেবের হাতের নাড়াচাড়া থেমে গেল।কাজী সাহেব আবার বললেন, "আমি তোমারে সেইদিন ওই মেয়ের কথাই বলেছিলাম।"

জাহাঙ্গীর সাহেব ভাবলেন, চাচা তানিকে দেখিয়ে এই কথা বলেছিলেন, তিনি দ্বিধা নিয়ে বললেন, "কিন্তু চাচা, ওই মেয়ের সাথে তো বিয়ে হয়নি..."

কাজী ভুল শুধরে বলল "না না, আমি ওই মেয়ের কথাই বলেছিলাম যে চেয়ারম্যানের ছেলেকে মেরেছিল!"

জাহাঙ্গীর সাহেবের মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। ভেতরে যখন সবাই বসে ছিল, তখন চাচা তাকে এই মেয়েটির কথা বলেছিলেন আঙুল দিয়ে ডিকেহিয়ে দিয়েছিলেন তাহলে এখন ... ঘটনা তবে অন্যরকম ছিল ? তার কি কোথাও ভুল হলো ?

সেই দিনের কথা আবার ভাবলেন তানির ডানপাশে সুহানা ছিল তবে কিছুটা দূরে তাহলে কি তার বুঝতে ভুল হয়েছে…

কাজী সাহেব খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিজের পারিশ্রমিক নিয়ে বিদায় নিলেন, আর কোনো ঝামেলায় জড়ালেন না।

রান্নাঘরে সাবেরা প্লেটে খাবার বাড়ছেন সুহানার জন্য। মেয়েটা সকাল থেকে কিছুই খায়নি, অথচ দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। চারদিকের এই ঝামেলার মাঝে সুহানার কথা মনেই ছিল না তার। আগে তুহিনাকে খাইয়ে এখন সুহানার জন্য খাবার নিয়ে যাবেন। মেয়েটাকে ঘরে একা বন্ধ করে রাখা হয়েছে, কে জানে কী অবস্থায় আছে সে! সাবেরার খুব কান্না পাচ্ছে; মেয়েটাকে এত মেরেছে অথচ সে টু শব্দটিও করেনি। সুহানা বরাবরই চুপচাপ, খুব একটা হাসে না, নিজের মতো থাকতেই ভালোবাসে। সাবেরা ছেলের পছন্দের তারিফ করেছিল কতো কিছু ভাবনা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি এমন হবে তিনি ভাবেননি। আয়না তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিল, "কেঁদো না বুবু, যা হয়েছে মেনে নাও।"

এদিকে ফিনা হন্তদন্ত হয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, "আন্টি, সুহানাকে দেখেছেন? ওর মেডিসিন নেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে, আমি ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।"

মালেহা ফিনাকে একপাশে ডেকে নিয়ে থামালেন। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কিছু শোনোনি?"

ফিনা অবাক হয়ে বলল, "কী আন্টি?"

মালেহা তখন শুরু থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা ফিনাকে খুলে বললেন। শুনে ফিনার চোখ ভিজে উঠল। এত কিছু হয়ে গেল আর সে শুধু সাজগোজেই ব্যস্ত ছিল! সুহানার বিরুদ্ধে ওঠা মিথ্যে অভিযোগ সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। জাহির ভাইয়া এমন কাজ করবে আর সুহানা সুযোগ দেবে—এটা অসম্ভব। প্রেগন্যান্সির খবরটা নির্ঘাত ওই পরিবারের কোনো চাল। ফিনা ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইল, "ও এখন কোথায়?"

মালেহা সুহানার অবস্থান বলে দিতেই ফিনা ছুটে তুহিনার রুমে ঢুকল। সেখানে সবাই আনন্দ করছিল, কেউ এই ভয়ানক খবরটা জানত না। ফিনাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে তুহিনা হকচকিয়ে উঠে দাঁড়াল।

"ফিনা, কী হয়েছে তোর? এভাবে কাঁদছিস কেন?"

ফিনা ফুঁপিয়ে উঠে বলল, "দি... সুহানা!"

"কী হয়েছে সুহানার?"

ফিনা সবটা বলে দেওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে ঘরের পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। হাসি-ঠাট্টা সব বন্ধ। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না এমনটা সম্ভব। রুহানি আর রিফা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তানিও সেখানে ছিল, সব শুনে তারও চোখ ভিজে উঠল। মা আর বড়মা কেন এতক্ষণ রুমের বাইরে আসছিলেন না। তানিও দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তুহিনা নিজের মাথার ওড়না ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের রুমের দিকে দৌড় দিল। ঘরে ঢুকতেই এক দমকা হাওয়া তাকে গ্রাস করল। বিছানার ওপর সব জিনিস ছড়ানো-ছিটানো। সে বড় ব্যাগ থেকে শুরু করে সব ওলটপালট করে কিছু একটা খুঁজতে লাগল। মেঝেতে পড়ে থাকা একটি লাল রুমালের দিকে নজর পড়তেই তার বুক কেঁপে উঠল—সে বুঝে গেল ঠিক কী ঘটেছে।

জুতো ছাড়াই শাড়ি পরে তুহিনা দৌড়াতে শুরু করল। তার পায়ের নূপুর আর হাতের চুড়ির শব্দে চারদিকের মানুষ সচকিত হয়ে উঠল। আতিফ চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তুহিনা হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, "সুহানা কোথায়?"

ফিনা তুহিনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। সাবেরা প্লেট নিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাচ্ছিলেন, তখনই তুহিনা আর ফিনা ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল। সাবেরাও দ্রুত পা বাড়ালেন,

দরজা খোলার শব্দ শুনে সুহানা জানলা থেকে মুখ ফেরাল। তার পরিচিত দুটি প্রিয় মুখ দেখেই সে বুঝে নিল যে, সবকিছু জানাজানি হয়ে গেছে। ফিনা দৌড়ে এসে সুহানাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তুহিনা স্তব্ধ হয়ে সুহানার দিকে তাকিয়ে রইল।ওর চশমার একটা কাঁচ ভেঙে গেছে, মুখের দু-তিন জায়গায় ক্ষত। থুতনিতে আঁচড়ের দাগ, চুলগুলো এলোমেলো আর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। গালে এখনো স্পষ্ট আঙুলের ছাপ বসে আছে। তুহিনা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল; আজ তার চোখে জল নেই, শুধু একরাশ হাহাকার। দরজার বাইরে সাবেরা, রুবাইদা, আয়না আর মালেহা সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে।

ফিনা কান্নায় ভেঙে পড়েছে, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। সুহানা শান্তভাবে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “আমি ঠিক আছি, ইটস ওকে”।

ফিনা চিৎকার করে উঠল, “এখনো ইটস ওকে? তুই এমন কেন রে? এত বড় অপমান এত সহজে হজম করে ফেললি?”

সুহানা ধীরস্থিরভাবে জবাব দিল, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে করতে হয়।“

ফিনাকে সরিয়ে সুহানা তুহিনার দিকে এগিয়ে গেল। তুহিনাও সামনে এগিয়ে আসতে ওর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সুহানা আলতো করে সেই জল মুছে দিল।

“কাঁদছ কেন?”

“কেন ও এমনটা করল?” তুহিনা ফুঁপিয়ে উঠল।

সুহানা আঙুল দিয়ে তুহিনার পেটের দিকে ইঙ্গিত করে শান্ত স্বরে বলল, “ওর জন্য এটা খুব জরুরি ছিল”।

তুহিনা আর্তনাদ করে বলল, “এমনিতেও তো আমাদের বিয়ে হতো, তবে নিজের ওপর এমন অপবাদ কেন নিলি?”

“যাতে ওকে কেউ অবৈধ না বলতে পারে, ওর গায়ে আমার মতো কোনো তকমা না লাগুক”

“তাই বলে নিজের...”

সুহানা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমার আর কী! আজ আছি, কাল নেই। আমার আগে-পিছেও কেউ নেই। আমাকে কেউ কিছু বললেও যায় আসে না, না বললেও যায় আসে না। আমি সয়ে নিতে পারব।”

“কিন্তু জাহিরের সাথে তো তোর বিয়ে হয়ে গেছে!”

সুহানা থামল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁট এলিয়ে হাসল, ওর গালের টোলটা ফুটে উঠল। বিষণ্ণ স্বরে সে বলল, “তার পাশে দাঁড়ানোর এক শতাংশ যোগ্যতাও আমার নেই।সে আবেগের বশে এটা করেছে পরে আফসোস করবে কিন্তু তার আগেই আমি...”

হঠাৎ কিছু একটা পড়ার শব্দে সবাই পেছন ফিরে তাকাল। দেখা গেল সাবেরার হাত থেকে ভাতের প্লেটটা পড়ে গেছে। সুহানা আঁতকে উঠল। সে সাবেরার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে তুহিনা শক্ত করে ওর হাত টেনে ধরল।

"চল আমার সাথে!"

"দি, দাঁড়াও!" সুহানা তুহিনাকে টেনে ধরার চেষ্টা করল।

"অপরাধ আমার, তুই কেন এর ভাগীদার হবি? তুই শাস্তি পাবি কেন?"

"কথা বাড়িও না আর, বোকামি করো না তুমি দি —সব ভেস্তে যাবে!"

তুহিনা কোনো বাধা মানল না। সে জোর করে সুহানাকে টেনে দরজার সামনে নিয়ে এল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সাবেরা, রুবাইদা আর বাকিদের পাশ কাটিয়ে সে গটগট করে বেরিয়ে এল। সুহানা একবার পেছন ফিরে সাবেরার দিকে তাকাল; সে এখন কী করবে, ভেবে পেল না।

তুহিনা সুহানাকে টেনে ডাইনিং রুমে নিয়ে এল, সেখানে দেখা গেল তানি হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামছে। তার পেছনে মোহনা আর আয়েশা বেগম চিৎকার করতে করতে নেমে আসছেন— "থাম তানি, আমার কথা শোন! যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন আর কিছু করিস না!"

বাড়ির সব মেয়েরা এক জায়গায় জড়ো হলো। সেখানে একটি ছেলেও নেই; সবাই বাইরে প্যান্ডেলে গানের তালে আনন্দ করছে। কিন্তু বাড়ির ভেতরের পরিস্থিতি এখন চরম আশঙ্কাজনক।

মোহনা তার মেয়েকে দেখে ঠিক বুঝতে পারলেন না। নতুন বউয়ের গায়ের ওড়না নেই, সাজগোজ সব এলোমেলো হয়ে গেছে। সুহানাকে পাশে দেখে তিনি থতমত খেয়ে গেলেন। তানি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিচে নেমে সুহানার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তুহিনা সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জাহাঙ্গীর সাহেব চুপচাপ বসে আছেন, এসব নিতে নিতে তার শরীর খারাপ লাগছে। আতিফ সাহেব এগিয়ে এলেন মেয়ের কাছে।

"কী হয়েছে তুহিনা?"

তুহিনা সরাসরি প্রশ্ন করল, "ওকে কে মেরেছে আব্বু?"

আতিফ সাহেব সুহানার দিকে তাকালেন, কিন্তু সুহানা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মোহনা এগিয়ে এসে বললেন, "ও যা করেছে, সেই অনুযায়ী এই মার তো কমই হয়েছে! চল তুই এখান থেকে..."

তুহিনা ঝটকা দিয়ে মায়ের হাত সরিয়ে দিল। তারপর সবার সামনে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করল:

"প্রেগন্যান্ট আমি, সুহানা নয়!"

তুহিনার শেষ কথাগুলো জলজ্যান্ত এক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো পুরো লিভিং রুমে আছড়ে পড়ল। আতিফ, যে এতক্ষণ সুহানার দিকে ঘৃণার চোখে তাকিয়ে ছিল, তার পা দুটো মাটিতে গেঁথে গেল। মোহনার হাতটা তুহিনার কবজি থেকে আলগা হয়ে ঝুলে পড়ল। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল এক অসহ্য স্তব্ধতায়।

আতিফ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে একবার তুহিনার দিকে, আবার সুহানার দিকে তাকাল আতিফ অস্ফুট স্বরে বলল, “তুহিনা... তুই কী বলছিস এসব? এটি মিথ্যে তাই না ওই মেয়ে তোকে এইসব শিখিয়েছে তাই তো ?”

"নাহ্‌, কেউ আমাকে কিছু শেখায়নি। আমি শুধু তোমাদের চোখের পর্দাটা সরিয়ে দিলাম। এটা আমার আর আফ্রিদির সন্তান। আমি আগেই তোমাদের সবটা জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা কেউ শোনার মতো অবস্থায় ছিলে না। আমার ভয় ছিল তোমরা যদি কোনো ক্ষতি করে দাও, তাই মুখ খুলিনি।"

তুহিনার কথা শুনে জাহাঙ্গীর সাহেব ছাড়া বাকি সবাই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। জাহাঙ্গীর সাহেব ঠায় বসে রইলেন; এক সমস্যার পর আরেক বড় সমস্যা এসে হাজির হয়েছে। সাবেরা বেগম নির্বাক হয়ে সব শুনছেন আর মনে মনে প্রার্থনা করছেন— 'হে আল্লাহ, রহম করো! এই অশান্তির ঝড় থামিয়ে দাও, সবাইকে শান্তি দাও।'

তুহিনা এবার ডুকরে কেঁদে উঠল। নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, "এটা মিথ্যে নয় মা! সুহানা শুধু আমাকে বাঁচানোর জন্যই এই কলঙ্ক নিজের মাথায় নিয়েছিল। ও চেয়েছিল আমার সন্তানকে যেন কেউ অবৈধ না বলে, ওর সাথে যা হয়েছে সেটা যেন আমার বাচ্চার সাথে না হয়। তোমরা যখন ওকে মারছিলে, ও একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি—শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করেছে। না বুঝে কেন তোমরা ওর ওপর এমন অন্যায় করলে? আমি আর পারছি না মা, এই পাপের বোঝা আমি একা বইতে পারছি না! ওইটুকু একটা মেয়ে তোমাদের তো কোনো ক্ষতি করেনি, তবে কেন তোমরা সব সময় ওর ক্ষতি করার জন্য মুখিয়ে থাকো?!"

সুহানা তাকে থামাতে চাইল, "দি, প্লিজ..."

"তুই চুপ কর! নিজেকে খুব মহান ভাবিস, তাই না? সব সময় তোকেই কেন ত্যাগ করতে হবে? আমাদের জন্য কেন তুই এত কিছু করবি? যারা তোকে ভালোবাসে না, ভালো বলে না, তাদের সম্মানের কথা তুই কেন চিন্তা করিস?"

মোহনা বেগম পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যে সুহানাকে তিনি এতক্ষণ দুশ্চরিত্রা বলে গালি দিচ্ছিলেন, যাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার উপক্রম করেছিলেন, তার কথা শুনে তিনি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে পড়ে গেলেন।

তুহিনা এবার জাহাঙ্গীর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "জাহির সব জানত। আমি আফ্রিদিকে এখনো বলিনি, কিন্তু জাহির সবটা জানে। ওই আমাকে বলেছিল কাউকে কিছু না জানাতে।"

রাদিফ স্তব্ধ হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল; 'অবৈধ' শব্দটা তীরের মতো তার বুকে বিঁধছে। তানি পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল—এতসব কাণ্ড আসলে তুহিনার জন্যই ঘটেছে। তার মনে হলো, সব দোষ তাহলে তুহিনা আর তার অনাগত সন্তানের।

পুরো পরিবার এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে সুহানার প্রতি হওয়া চরম অন্যায়, আর অন্যদিকে তুহিনার এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির খবর। বাড়ির বড়রা কেউ কোনো কথা বলতে পারছেন না; লজ্জা, ঘৃণা আর অনুশোচনায় জাহাঙ্গীর সাহেবের মনে হচ্ছে মাথার ওপর ছাদটা ভেঙে পড়ছে। ছেলেকে ভুল বুঝে তিনি সুহানা আর জাহিরকে হুট করেই এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছেন—এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন তাদের।

বিহান সুহানার দিকে এগিয়ে এল। কঠোর স্বরে প্রশ্ন করল, "কে তুমি? এই পরিবারের সাথে আসলে তোমার সম্পর্কটা কী? আজ সব সত্যি কথা বলো। আমাদের পরিবারে যেহেতু নাম লিখিয়েছ, তাই সবটা জানার অধিকার এখন আমাদের আছে।"

এদিকে তানি রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে এসেছিল সুহানাকে আঘাত করতে, কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে আসল শত্রু তো তুহিনা! তুহিনা তার সাথে বেইমানি করে সব কিছু শেষ করে দিয়েছে।

তানি মনে মনে বিড়বিড় করছে , "সব নষ্টের গোড়া তুই! আমি না পেলে তুই-ই বা পাবি কেন? এত সোজা নয় সব কিছু”

সবার অলক্ষ্যে পাশের টেবিল থেকে একটি ছুরি তুলে নিয়ে সে তুহিনার দিকে ধেয়ে এল। সবাই তখন নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল বলে কেউ খেয়াল করল না। সুহানা শুধু তুহিনার দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠিক তখনই...

গল্প: প্রেমের আলোড়ন

লেখক:এমডি সুহান জয়

পেজ: Midnight Tales by Joy

পর্ব: ৪৮ (শেষ অংশ) (18+ restriction)

(Note – এটি একটি প্রণয় ও জীবনবোধের মিশ্রণ সম্বলিত গল্প। যেখানে তীব্র রোম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।)

"আহ্!"

ফিনা দ্রুত তুহিনাকে সরিয়ে নিতেই সুহানা সামনে এসে দাঁড়াল। তানির হাতের ছুরিটা সরাসরি সুহানার পিঠে গিয়ে বিঁধল। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল সুহানা, কিন্তু তাতে তানির রাগ যেন আরও বেড়ে গেল; সে ছুরিটা আরও গভীরে বসিয়ে দিল। সুহানা ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও উল্টো ঘুরে তানির হাত চেপে ধরে মুচড়ে দিল। ফিনা ততক্ষণে তুহিনাকে আগলে ধরেছে।

চারপাশে কান্নাকাটি আর চিৎকার শুরু হলো— "আল্লাহ! এসব কী হচ্ছে!" সাবেরা বেগম সুহানার দিকে এগিয়ে আসতে চাইলেন। এর মধ্যেই সুহানা তানিকে নিজের সামনে টেনে আনল। তানি আবারও আঘাত করতে চাইলে সুহানা তাকে সজোরে এক চড় মারল। চড়ের ধাক্কায় তানি মেঝেতে ছিটকে পড়ল। মোহনা বেগম আর্তনাদ করে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। জাহাঙ্গীর সাহেব তানির এমন উগ্র রূপ দেখে দ্রুত উঠে এলেন। সবাই গোল হয়ে দাঁড়াল, জাহাঙ্গীর সাহেব সুহানার ক্ষতবস্থায় এগিয়ে এলেন। সুহানার সাদা টি-শার্ট তখন রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে।

"জাসমীর, জলদি ডাক্তার ডাক!" জাহাঙ্গীর সাহেবের গলার স্বরে উদ্বেগ ঝরে পড়ল।

"হ্যাঁ, ডাকছি!"

সাবেরা বেগম সুহানাকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইলেন, কিন্তু সুহানা নড়ল না। সে নিজেই নিজের শরীর থেকে ছুরিটা টেনে বের করে আনল। ব্যথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই রক্ত ছিটকে বেরোল। বিহান তৎক্ষণাৎ রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরলেন। শ্বশুর হিসেবে নয়, বরং একজন বাবার মতো সুহানাকে আগলে নিলেন। বিয়ের সময় এই বিহান সাহেবই সুহানার বাবার পরিচয় দিয়ে নিজের নামটুকু দিয়েছিলেন। তিনি শক্ত হাতে ওকে ধরে রাখলেন।

তানি তখনো মেঝেতে বসে আছে, জাহাঙ্গীর সাহেব রাগী চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়েশা বেগম মেয়ের কাছে বসে কান্নাকাটি করছেন। রাদিফ তানির হাত ধরে টেনে তুলল এবং সজোরে এক চড় কষাল। তানি তখনো চুপ করে আছে। সুহানা কোনোমতে গোল পিলারটাতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, যন্ত্রণায় তার মুখ লাল হয়ে গেছে। সাবেরা বেগম বিহানকে সরিয়ে নিজে ক্ষতস্থান চেপে ধরলেন। তুহিনা একদম শান্ত হয়ে তানির দিকে তাকিয়ে রইল, আর ফিনা সুহানার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ তানির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, "তুই আমাকে মারলি কোন সাহসে?" সুহানা চোখ তুলে সরাসরি তার দিকে তাকাল। তানি আবারও চেঁচিয়ে উঠল, "তোর হেসিয়াত কী? আমাকে ছুলি কেন তুই? আমার বাপের অবৈধ সন্তান হয়ে তোর এত সাহস হলো কী করে আমাকে মারার? শালা বেজ*ন্মা!"

তানির কথা শুনে রাদিফ চরম অবাক হলো, মোহনা বেগমও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। আজকের দিনটা যেন সবার জন্য শুধু অবাক হওয়ার দিন। তানি নিজের বাবার হাত থেকে ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল এবং কড়া চোখে তার দিকে তাকাল।

বিহান সাহেবকে উদ্দেশ্য করে সে বলল, "আপনি জানতে চাইছিলেন না ও কে? কী ওর পরিচয়? আমি বলছি—এই যে আমার বাপ, ওর মা আমার বাপের সাথে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ার ফল হচ্ছে ও! আমার বাপ ওকে মানেনি। ওর মা তো একটা..."

তানির মুখে নিজের মায়ের নামে এমন কুরুচিকর কথা শুনে সুহানার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে আর কারও তোয়াক্কা করল না। সাবেরা বেগম ওকে ধরে রাখতে চাইলেন, কিন্তু সুহানা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

তানিকে টেনে এনে মুখ চেপে ধরল সুহানা। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, "আমি মা কোনো বে*শ্যা নই!" ফিনা ছুটে এসে বলল, "একী করছিস সুহানা, ছাড় ওকে!" আয়েশাও গিয়ে সুহানাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, আর ফিনা সুহানাকে পেছন থেকে জাপটে ধরল।

সুহানা প্রচণ্ড ক্ষোভে বলতে থাকল, "আমার মা কি কোনোদিন তোদের বাপের নাম চেয়েছে? আমি চেয়েছি? বলেছি কোনোদিন? তোদের দিকে তাকাতেও আমার ঘৃণা লাগে! কে বলল আমি তোদের কেউ? আমি তোদের কেউ নই, তোদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি একাই যথেষ্ট, তোদের নামের টাইটেল আমার চাই না। কিন্তু আমার মাকে কেন টানলি?"

সে আবারও তানির দিকে তেড়ে যেতে চাইল, কিন্তু ফিনা তাকে ধরে রাখল। রাদিফ পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার আতিফ সামনে এগিয়ে এলে সুহানা সরাসরি তাকে প্রশ্ন করল, "কিছু বলার আগে ভাবুন—আমার মাকে আপনাদের খারাপ লাগে, কিন্তু আমার মায়ের টাকা খেতে আপনাদের খারাপ লাগে না, তাই না?"

আতিফ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তানি তখন তালি দিয়ে জোরে হাসতে হাসতে বলল, "কার জন্য মরছিস তুই? ওই তোর দি-র জন্য? আরে, তোর ওই সিগনেচারটা তো ও-ই এনে দিয়েছিল। আমি নিজের কানে শুনেছি, তোর অ্যাকাউন্ট থেকে যে টাকা গায়েব হয়েছিল, সেটা তোর ওই নামধারী দি-ই করেছে... নিজের প্রেমিককে পাওয়ার জন্য!"

তুহিনা ধমক দিয়ে বলল, "তানি!"

তানি তুহিনার দিকে তাকিয়ে বলল, "ওর জানা উচিত তুমি স্বার্থের জন্যই ওর সাথে মিশেছিলে, নিজের ইচ্ছেয় নয়। তুমি একটা স্বার্থপর!"

তুহিনা চিৎকার করে উঠল, "বাজে বকা বন্ধ কর!"

তানি থামল না, বরং আরও উসকে দিয়ে বলল, "ওহ হ্যাঁ, তোর সই জাল করতে সাহায্য করেছিল তোর ওই প্রিয় বান্ধবী—যিনি তোকে এখন ধরে আছেন, কী যেন নাম? হ্যাঁ, ফিনা! টাকার বিনিময়ে সইটা তো সেই করিয়ে দিয়েছিল।"

কথাটা শুনে সুহানা রাগের মাথায় তানিকে কষে একটা চড় মারল। সে গর্জে উঠে বলল, "আর একটা বাজে কথা বললে তোকে জানে মেরে ফেলব!" আয়েশা এবারও সুহানাকে সরাতে পারল না। তখন সাবেরা এসে সুহানাকে টেনে সরিয়ে আনলেন এবং মিনতি করে বললেন, "ছেড়ে দে।"

তানি মেঝেতে বসে হাসতে হাসতে বলল, "আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না, তোর ওই সখীকে জিজ্ঞাসা কর।" এরপর সে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়না গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে হাসতে হাসতে উপরে চলে গেল।

জাহাঙ্গীর মানুষ চিনতে বড় ভুল করেছেন, ভীষণ বড় ভুল।সুহানা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সে সবকিছু মনে করার চেষ্টা করল এবং ফিনার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জানতে চাইল, "তুই এটা করিসনি আমি জানি সব মিথ্যে তাই না ?"

ফিনা কোনো উত্তর দিল না, চুপ করে রইল। সুহানার বুকের ভেতরটা হঠাৎ তীব্র ব্যথায় চিনচিন করে উঠল। সে কাঁপতে থাকা তুহিনার কাছে গেল এবং তার হাত ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওকে একটা সিঙ্গেল সোফায় বসাল। টেবিল থেকে পানি এগিয়ে দিল, আর নিজে ঠিক সামনে টেবিলের ওপর বসল।

তুহিনা পানি খেল। সুহানা ওর হাত ধরে বলল, "আমি ওর কথা বিশ্বাস করিনি, করবও না। কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। সবার সামনে শুধু একবার বলে দাও যে ওটা মিথ্যে ছিল। আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা অন্য কোনো কারণে গেছে, এর পেছনে তোমরা নেই—শুধু এইটুকু বলো সবাইকে, বাকিটা আমি দেখে নেব।" তুহিনাকে চুপ থাকতে দেখে সুহানা ওকে ঝাঁকিয়ে অস্থির হয়ে বলল, "বলো...!"

আয়েশা এবার রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "কী বলবে ও? আমাদের সবাইকে খারাপ বানিয়ে নিজে এখন ভালো সাজছে! নাটকবাজ মেয়ে একটা। আমরা যদি সত্যিই খারাপ হই, তবে তুই কেন বলছিস না যে ওটা মিথ্যে? বল!"

সুহানা কারো কথা কানে তুলল না। সবাই স্তব্ধ হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। সুহানার পিঠ রক্তে ভিজে গেছে, অথচ সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে আকুতিভরা কণ্ঠে বলল, "দি... এসব মিথ্যে, তাই না?"

তুহিনা ফিনার দিকে তাকালে ফিনা মাথা নেড়ে 'না' সঙ্কেত দিল। তুহিনা কান্নায় ভেঙে পড়ে কোনোমতে বলল, "সরি।"

সুহানা তুহিনার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। এরপর চিৎকার করে উঠল, "বলো...!" তার চিৎকারে বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেল। সবাই নির্বাক দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কারো মুখে একটি শব্দও নেই। আজ অনেক না বলা কথা ডানা মেলে উড়ছে আর সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে যে—সত্য কখনও চাপা থাকে না।

তুহিনা শিউরে উঠল। চোখভর্তি জল নিয়ে মাথা নেড়ে স্বীকার করল যে, হ্যাঁ—সে এমনটা করেছে।

মুহূর্তেই সুহানার হাতের বাঁধন আলগা হয়ে গেল। সে তুহিনার হাত ছেড়ে দিল। তুহিনা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সুহানার হাত চেপে ধরল। ফিনাও এসে সুহানাকে জড়িয়ে ধরল এবং বলল, "আমি জানতাম না এমনটা হবে, আমাকে বলেছিল যে..."

সুহানা আলতো করে নিজেকে সরিয়ে নিল। ফিনা সাথে সাথে চুপ হয়ে গেল। সুহানা হেসে তুহিনার কাছ থেকেও নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল এবং উঠে দাঁড়াল।

সে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে, বুকের ভেতরটা পাথর হয়ে আছে। প্রচণ্ড কষ্টে সে বা হাত দিয়ে বুকটা ডলে নিল, সেই ভার নামানোর চেষ্টা করছে।

আজ আর অশ্রু গুলো কন্ট্রোল হলো না তার , তা উপচে বেরিয়ে এল। সে চট করে চোখের চশমাটা খুলে হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরল। সে কিছুতেই তার দুর্বলতা কাউকে দেখাতে চায় না; সবাই তাকে দুর্বল ভাবুক সেটা সে চায় না, সে মোটেও দুর্বল নয়।

সাবেরা নিজের চোখের জল মুছে এগিয়ে এসে সুহানার হাত ধরতে চাইলেন। সুহানা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "ঠিক আছে আন্টি, হয়তো এটাই হওয়ার ছিল। আমি মেনে নিয়েছি।"

ফিনা সুহানার সামনে এসে দাঁড়াল, "সু...।"

সুহানা নরম করেই বলল , "কী করে পারলি ফিনা? কেন করলি? এতই কি টাকার দরকার ছিল? কত টাকা চাই তোর?"

ফিনা কাছে বড্ড করুন শোনালো সুহানার কন্ঠ, - "সু, আমি তখন—"

"আমি কি কোনোদিন তোর কাছে কোনো কৈফিয়ত চেয়েছি?"

"না।"

"টাকার হিসাব চেয়েছি?"

"না।"

"কোনো কিছুতে বাধা দিয়েছি তোকে?"

"না।"

"তাহলে কেন করলি? আমার আপন বলতে কেউ ছিল না, শুধু তুই ছিলি। মা-বাবা, ভাই-বোন—সব দরজা তোকে দিয়েছিলাম, আর তুই শেষ পর্যন্ত আমার বুকে ছুরি গেঁথে দিলি? এই আমার পাওনা ছিল না রে?"

ফিনা আবার ডাকল, "সু...।"

সুহানা পিছিয়ে গিয়ে বলল, "দূরে থাক ফিনা, একদম কাছে আসবি না।"

এবার সুহানা আতিফের দিকে ফিরে তাকাল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "ওয়ারিশন সার্টিফিকেট কি বানানো হয়ে গেছে? জালিয়াতি করে তো সব ফাইলই গুছিয়েছিলেন, সব মিলেছে তো?"

আতিফ থমকে তাকিয়ে রইল। সুহানা বলতে থাকল, "আমাকে সহ্য হয় না, অথচ আমার জিনিসগুলো হাতিয়ে নেওয়ার জন্য এত আয়োজন? আপনাদের চোখে তো আমি নর্দমার কীট, তাহলে সেই কীটের টাকাগুলো হজম করলেন কী করে? তখন কি গলায় বাঁধেনি? অনেক দিন ধরেই তো আমার ভাগের মোটা অঙ্কের অর্থ আপনারা আত্মসাৎ করছেন, তখন কোথায় ছিল আপনাদের আভিজাত্য? লজ্জা লাগেনি?"

জাহাঙ্গীর অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, "কিসের টাকা?"

সুহানা শান্ত গলায় বলল, "উনাকেই জিজ্ঞাসা করুন।"

আতিফ চিৎকার করে উঠল, "এসব মিথ্যে! আমি ওর কোনো টাকা নিইনি।"

সুহানা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, "তাই? প্রমাণ দেব?"

আতিফ এবার সত্যি ঘাবড়ে গেল। সুহানা তাকে আর গুরুত্ব না দিয়ে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকাল। জাহাঙ্গীরের কাছে এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেছে—আতিফ যে মিথ্যে বলেছে আর রাফিদ যে সত্য গোপন করেছে, সেটা তিনি বুঝতে পারছেন। সুহানার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, চারপাশের এই বিশ্বাসঘাতকতার ভার সে আর সইতে পারছে না।

তুহিনা পাথরের মূর্তির মতো নিঃশব্দে বসে আছে। সুহানা তার সামনে গিয়ে পকেট থেকে একটি বক্স বের করে রাখল। তারপর বলল, "আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল, আপনার ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করেছি মিসেস শেখ। এবার আমাকে মাফ করবেন।"

বিহানকে উদ্দেশ্য করে সুহানা বলতে শুরু করল, "আপনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কে, তাই না? আজ বলছি আমি কে। আমার পরিচয় শুধু সুহানা—এর আগে বা পিছে কোনো নাম নেই। নানা মারা যাওয়ার পর অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি। তারপর কেউ একজন এসে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল নিজের স্বার্থে, সেটা বুঝতে আমার বহু বছর সময় লেগেছে। এই দুনিয়াতে আমি একদম একা। সম্পর্ক কী বা কেমন হয়, তা কেউ কোনোদিন আমাকে শেখায়নি। যা করেছি নিজের চেষ্টায় করেছি। এই সুহানা নামটাই আমার জন্য যথেষ্ট।"

সে আরও যোগ করল, "মানুষকে বিশ্বাস করার মতো ইচ্ছা বা ধৈর্য কোনোটাই আমার অবশিষ্ট নেই। জীবনে মানুষের অনেক অবহেলা আর কটু কথা সহ্য করেছি, কিন্তু বিপদে কাউকে পাশে পাইনি। আপনারা সমাজের কথা বলেন? যখন আমি না খেয়ে পড়ে ছিলাম, তখন কোথায় ছিল আপনাদের এই সমাজ? এই সমাজে আমার মায়ের ঠাঁই হয়নি কেন? সেদিন তো কেউ আসেনি আমাকে কিছু বোঝাতে! পচা খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েছি, তবু কারও কাছে মাথা নত করিনি। জীবনে শুধু দুজনকে বিশ্বাস করেছিলাম- see what does faith look like! ওনাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই ছিল না কোনো কালে । আমি একা, আমাকে ভাঙা এত সহজ নয়। তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তোলা এই সুহানা মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে, কিন্তু পরাজয়কে নয়।"

সুহানার কথাগুলো শুনে বিহানের চোখে জল এসে পড়ল। উপস্থিত সবার চোখই ভিজে উঠেছে—একটি মেয়ের জীবন এত কঠিন হতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

সুহানার মাথা ঘুরছে। সে চশমা খুলে চোখ চেপে ধরল। ফিনা কোনো কথা বলছে না, এমনকি কাঁদছেও না—শুধু তাকিয়ে আছে। সুহানা তার দিকে ফিরে আর্তনাদ করে উঠল, "কেন করলি এমন? আমাকে একবার বললে কি আমি তোকে দিতাম না? কেন এই ধোঁকাটা দিলি? আমার আর কেউ রইল না রে..."

যন্ত্রণায় তার কথা আটকে আসছে, মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন। সবাই একপাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর সুহানা অন্যপাশে—আজও সে একদম একা।

ঠিক তখনই কেউ তাকে ডাকল, "আপু...!"

সুহানা পেছনে তাকিয়ে দেখল মিলি দৌড়ে আসছে। সুহানা তড়িঘড়ি করে টিশার্টের হাতায় মুখ মুছে নিল। মিলি এসে সুহানার কোমর জড়িয়ে ধরল এবং বলল, "তোমারে যে আইজ কত খুঁজছি! এহন পাইলাম তোমারে।"

সুহানা নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। গলা ঝেড়ে মিলিকে জিজ্ঞেস করল, "খেয়েছিস রে মিলি?"

মিলি খুশিতে উত্তর দিল, "হ, খাইছি তো! পোলাওটা মেলা সোয়াদ হইছিল।"

"তাই?" সুহানা মৃদু স্বরে বলল।

মিলি সুহানার দিকে তাকাতেই ওর মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই। সে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুমার শরীল কি খারাপ লাগতাছে আপু?"

সুহানা একটু হেসে বলল, "একটু..."

"ওহ, ওষুধ খাইছো তুমি?"

সুহানা বিষণ্ণ হেসে উত্তর দিল, "হ্যাঁ খেয়েছি তো। দামী ওষুধ, সব ব্যথা সারিয়ে দেয়।" এরপর মিলিকে জিজ্ঞেস করল, "তুই কেমন আছিস?"

"মুই মেলা ভালো আছি! খাড়াও, তোমার লাইগা একটা জিনিস আনছি।"

মিলি দৌড়ে তার বাবার কাছে গেল এবং পকেট থেকে পুঁতি দিয়ে তৈরি একটি ব্রেসলেট বের করল। ছোট ছোট রঙিন পুঁতি দিয়ে সে নিজের হাতে এটি বানিয়েছে। সে উৎসাহ নিয়ে বলল, "এইডা তোমার লাইগা আমি কালকা রাইতে বানাইছি, জানো?"

সুহানা দেখে বলল, "বাহ! এটা তো অনেক সুন্দর।"

"তুমি পরবে আপু?"

সুহানা হেসে হাত বাড়িয়ে দিলে মিলি সেটি পরিয়ে দিল। হাত ঘুরিয়ে দেখে মিলি তৃপ্তির সাথে বলল, "মেলা সুন্দর লাগতাছে কিন্তু!"

সুহানা মিলির মাথায় হাত রেখে দোয়া করল, "খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করিস, অনেক বড় হতে হবে , বুঝলি?"

মিলি গর্বের সাথে বলল, "হ হবো তো! হুবহু তুমার মতো সাহসী হমু।"

কথাটা শুনে সুহানা মিলিকে নিজের বুকের কাছে টেনে জড়িয়ে ধরল। তার চোখের কোণ আবার ভিজে উঠল। সে মনে মনে বলল, "আমার মতো না হোক, তোর জীবনে কোনো কষ্ট স্পর্শ না করুক, আমার মতো না হোক তোর, আর কোনো 'সুহানা'র আগমন না হোক এই পৃথিবীতে।"

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মিলির বাবা এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, "মিলি মা, এবার চলো। অনেক দেরি হয়ে গেছে।"

মিলি যাওয়ার সময় হাত নেড়ে বলল, "আপু, আইজ যাই, আবার আমু কিন্তু!"

সুহানা শুধু বলল, "হুম।"

সুহানা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মিলির যাওয়ার দিকে। মিলি তার বাবার হাত ধরে যাচ্ছে। পরনের লেহেঙ্গাটা পায়ে আটকে সে বারবার হোঁচট খাচ্ছে, কিন্তু তার বাবার হাতটা শক্ত করে ধরা আছে। সেই হাত তাকে পড়ে যেতে দিচ্ছে না, আগলে রাখছে। মাথার ওপর ছাতা ধরে তারা দুজনে চলে গেল, আর সুহানা সেই আশ্রয়ের দৃশ্যটি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল।

সুহানার হাতের ওপর টপটপ করে রক্ত পড়তে দেখে সে নিজের নাকে হাত দিল। একটা বিষণ্ণ হাসি হেসে সে বিড়বিড় করল, "এটারই কি কমতি ছিল ...?" সে হাত দিয়ে রক্ত মোছার চেষ্টা করল, কিন্তু লাভ হলো না; বরং রক্তের স্রোত আরও বেড়ে গেল। তার খুব কান্না পাচ্ছে, জীবনের এই পর্যায়ে এসে সে নিজের মৃত্যু কামনা করছে। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সুহানা টলতে টলতে কোনোমতে সোফার হাতলটা ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।

তার মাথা ঘুরে উঠল, কথা জড়িয়ে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু দুলছে বলে মনে হলো। সে চোখ কচলে আবার তাকানোর চেষ্টা করতেই হাত থেকে চশমাটা পড়ে গেল। চোখের পাতা বুজে আসছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে সুহানার। এক সময় সে শরীরের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গা ছেড়ে দিল।

বিহান, রুবাইদা, আয়না, মালেহা, জাসমীর আর জিসান সবাই দৌড়ে আসার আগেই জাহির সুহানাকে ধরে ফেলল। নাক দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরতে দেখে জাহির ভীষণ ঘাবড়ে গেল। সে মেঝেতে বসে পড়ে সুহানার মাথাটা নিজের কোলের ওপর রাখল।

আর্তনাদ করে সে ডাকল, "এই, কী হয়েছে তোমার? চোখ খোলো!"

আফ্রিদি ছুটে এসে সুহানার এই অবস্থা দেখে অবাক হয়ে জানতে চাইল, "কী হয়েছে ওর?"

সুহানার পিঠ থেকে হাত সরানোর সময় জাহির নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল—পুরো হাত রক্তে লাল হয়ে আছে। সে দ্রুত সুহানাকে ঘুরিয়ে ধরল এবং দেখল তার সারা পিঠ রক্তে ভিজে একাকার। জাহির কিছুই বুঝতে পারছে না, শুধু একরাশ দুশ্চিন্তা তাকে ঘিরে ধরল। সে তৎক্ষণাৎ সুহানাকে কোলে তুলে নিল।

জিসান চেঁচিয়ে বলল, "ডাক্তার এখনই চলে আসবে, তুই ওকে রুমে নিয়ে যা!" জাহির রক্তে ভেজা সুহানাকে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। সে সুহানার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, নাক দিয়ে রক্ত পড়া এখনো থামেনি। এদিকে ফিনা মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ল। সে নিজের মনেই ভাবছে—একী করল সে!

আফ্রিদি তুহিনার দিকে একবার তাকাল; তুহিনা কেমন করে বসে আছে। কিন্তু এখন তাকে দেখার সময় নেই, সে জাহিরের সাথে উপরে ছুটে গেল। বাড়ির সবাই এখন সুহানাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জাহাঙ্গীর এখনো আগের জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর সাবেরা হন্তদন্ত হয়ে উপরে ছুটলেন।

আতিফ এখনো মাথায় কুলাতে পারছে না যে সুহানা এতসব গোপন তথ্য জানল কীভাবে। রাদিফ সিঁড়িতে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে; মোহনারও আজ কোনো হুঁশ নেই। আয়েশা বাইরের পরিস্থিতির দিকে নজর না দিয়ে সোজা উপরে মেয়ের ঘরে চলে গেছেন। তানি মাত্রই গোসল সেরে বেরিয়েছে এবং সে এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। সবাইকে সব সত্যি বলে দিয়ে তার মনের ভেতর এখন এক অদ্ভুত শান্তি—অন্যকে কষ্ট দিয়ে নিজেরা শান্তিতে থাকবে, তা তো হয় না! আয়েশা নিজের মেয়ের এই পরিবর্তন দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লেন; তাকে জানতেই হবে মেয়ে এসব তথ্য কোথা থেকে পেল।

ততক্ষণে একজন নারী চিকিৎসক এলেন এবং রামিম তাকে দ্রুত উপরে নিয়ে গেল। জাহির সুহানাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর মুখে পানির ঝাপটা দিচ্ছিল। ডাক্তার ঘরে ঢুকেই জাহিরকে বাইরে যেতে বললেন।

জাহির জেদ ধরে বলল, "না, আমি যাব না।"

ডাক্তার কড়া গলায় বললেন, "আপনাকে বাইরে যেতেই হবে স্যার, নইলে আমি চিকিৎসা শুরু করতে পারব না।"

"আমার সামনেই যা করার করুন,"

ডাক্তার নিজেকে সামলে নিয়ে কাজ শুরু করলেন। তার সাথে থাকা সহকারী সুহানাকে পরীক্ষা করে নিচু স্বরে বললেন কী হচ্ছে সুহানার, জাহির শুনতে পেলো না।

জাহিরের হৃদপিণ্ড থমকে গেল, আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার দশা তার। সে অবিশ্বাসে সুহানার দিকে চেয়ে রইল—একটু আগেও তো সব ঠিক ছিল, কে তার 'সুহু'কে এভাবে আঘাত করল?

ডাক্তার আবার অনুরোধ করলেন, "সব ঠিক হয়ে যাবে, আপনি প্লিজ বাইরে যান। নইলে পেশেন্টের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। আমাকে কাজ করতে দিন, প্লিজ!"

জাহির মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করতে লাগল এবং নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে দোয়া পড়তে শুরু করল। আফ্রিদি আর রামিম জোর করে তাকে টেনে ঘর থেকে বের করে আনল। রুমের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জাহির দরজার সামনেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল; সে ভিজে একাকার হয়ে আছে, তার শরীর থেকে টপটপ করে পানি পড়ে মেঝে ভিজে যাচ্ছে। বাকি ছেলেদের অবস্থাও তথৈবচ। আফ্রিদি নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল তুহিনা এখনো সোফায় বসে আছে, আর ফিনা মেঝেতে বসে সমানে কেঁদে চলেছে।

তুহিনা উঠে দাঁড়িয়ে ফিনাকে টেনে তুলল। লজ্জিত স্বরে বলল, "আই এম সরি... আমি তোকে সবটা বলিনি।"

ফিনা তুহিনাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "তুমি ভেবেছিলে ও পরে মেনে নেবে বললে আমি মেনে নেব? তোমার কাজটা আমাকে দিয়ে করাতে হলো? আসলে তোমার রক্তই খারাপ, ভালো কিছু তোমার থেকে আশা করা ভুল। সুহানা আমাকে আর কোনোদিন ক্ষমা করবে না, আমি ওকে তেরো বছর ধরে চিনি। ও কিছুতেই এটা মেনে নেবে না। আজ তোমার কথা শুনতে গিয়ে আমি আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধুকে হারাতে বসেছি। আসল সত্যি জানলে আমি কখনোই করতাম না, তুমি.. তুমি করেছো সবটা।কেন করলে এমনটা?"

তুহিনার কাছে কোনো উত্তর ছিল না। সে যা করেছে নিজের স্বার্থেই করেছে। তার বাবা কথা দিয়েছিল যে, একটি সই এনে দিতে পারলে তিনি আফ্রিদিকে মেনে নেবেন। তুহিনা সেটাই করেছিল, কিন্তু বিনিময়ে জুটল কেবল প্রতারণা। সুহানা যেমন তুহিনাকে বিশ্বাস করে ঠকেছে, তুহিনাও তেমনি নিজের মা-বাবাকে বিশ্বাস করে ধোঁকা খেয়েছে।

লজ্জায় মাথা নিচু করে তুহিনা উপরে দিকে পা বাড়ালো কাউকে কিছু বোঝাতে ইচ্ছে করছে না। আফ্রিদি তুহিনা কে উপরে আসতে দেখে নিজে কিছু সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো, তুহিনা কে ধরে নিয়ে এলো; সে সবটাই শুনেছে কিন্তু কিছু বোঝেনি কিছু একটা করেছে তুহিনা সেই জন্যই হয়তো এত কিছু। ফিনা কেন সবার সাথে এমন আচরণ করছে—তার মনে এমন অনেক প্রশ্ন থাকলেও এখন উত্তর পাওয়া যাবে না সময় লাগবে।

জাহির সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। নিচে সবাই তার অপেক্ষা করছিল, আর জাহাঙ্গীর নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনায় ভুগছিল। বিহান জাহিরের পাশেই ছিল, কিন্তু জাহির সেখান থেকে নড়লো না কিছুক্ষণ আগে যখন রিফা সেখানে প্যান্ডেলে গিয়েছিল, তখন সবাই বেশ আনন্দ-মজায় মেতে ছিল।

"বড়দা...!"

রিফা দৌড়ে জাহিরের কাছে এলো। মিউজিকের বিকট শব্দে কেউ কারও কথা শুনতে পাচ্ছিল না, তাই রিফা রাগের মাথায় বক্সের তার টেনে ছিঁড়ে দিল। গান বন্ধ হতেই সবাই বিরক্ত হয়ে রিফার দিকে তাকাল। জাহির ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এসে জানতে চাইল কী হয়েছে ?

রিফা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "সেই কখন থেকে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছ না? ফোন করেও তোমাদের পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়িতে কী হয়েছে জানো? সুহানা আপু খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে!"

খবরটা শোনামাত্র জাহির আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। আফ্রিদিও তার পিছু নিল। তাসফিন রিফার হাত ধরে সেখান থেকে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে এল। সেখানে গিয়ে জাহির দেখল তার সদ্য হাওয়া আদুরে বউ, তার 'সুহু'র এই অবস্থা...

উত্তেজনায় জাহিরের ঠোঁট শুকিয়ে আসছিল, সে বারবার ঠোঁট ভেজাচ্ছিল। এমন সময় আফ্রিদি তুহিনাকে জাহিরের সামনে নিয়ে এল। তুহিনা অপরাধীর মতো এগিয়ে গিয়ে বলল, "আমায় মাফ করে দে ভাই...।"

জাহির তুহিনার মাথায় হাত রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "ওর কী হয়েছে আমায় সত্যি করে বলবি?"

তুহিনা ডুকরে কেঁদে ফ্লোরে বসে পড়ল এবং সবটা খুলে বলল। সব শুনে জাহির স্তব্ধ হয়ে গেল; সে-ও দেয়াল ঘেঁষে নিচে বসে পড়ল। ধরা গলায় জাহির বলল, "ওর শরীরে রক্ত কম, ওকে কোনো মানসিক চাপ দেওয়া বারণ ছিল। ওর ব্রেইন এখনো পুরোপুরি রিকভার হয়নি, ডাক্তার বার বার বলে দিয়েছিল, বারবার নাক দিয়ে রক্ত বেরোয় চাপ দিলেই। যদি একবার শিরা ফেটে যায় তবে আর... তোকে তো সবটা বলেছিলাম আমি, কেন এমন করলি ওকে নিয়ে? সবটা আজকেই জানাতে হলো তোর, আমি তো বলেছিলাম আমি…."

আফ্রিদি ‘প্রেগন্যান্ট’ শব্দটা শুনে জমে গেল; তার কানে একনাগাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার মতো শব্দ হতে লাগল। জাহির সবটা জানত, তাহলে সুহানা কি...? না, এর বেশি আর ভাবার ক্ষমতা তার নেই। বাকিরা সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না রামিম জাহিরের পাশে বসলো সবাই এখানে আছে কেউ বড়দা কে ছেড়ে যাবে না।

আফ্রিদি কাঁপা হাতে তুহিনাকে ধরে তুলল পাঞ্জাবির কোট খুলে ফেলেছে আগেই। কী করবে বুঝতে না পেরে তাকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিল। সবাই দাঁড়িয়ে দেখলো কিছু বলল না অনেক কথা আছে তাদের ঘিরে। সাবেরা যেতে চাইলে তাকে আটকে দিল জাহাঙ্গির হাত ধীরে নিজের কাছে বসালো। সবাই এখন জাহিরের রুমের সামনে দাড়িয়ে।

উন্মাদনার মতো আফ্রিদি বলতে লাগল, "ওরা আমার সন্তানকে আগলে রাখছিল, আর আমি... আমি এই হাত দিয়ে আমার ভাইকে মেরেছি?" নিজের দুই হাত সামনে মেলে ধরল সে বিড়বিড় করতে লাগলো "এই হাত দিয়ে আমি জাহিরকে আঘাত করেছি, তাকে আজেবাজে কথা বলেছি, বিশ্বাস করিনি! সুহানা নিজের ঘাড়ে সব দোষ নিয়েছে যাতে তোমার চরিত্র নিয়ে কেউ কথা না বলে, তোমার গায়ে কোনো আঁচ না লাগে”

জাহির তার অনুপস্থিতিতে তুহিনার কত খেয়াল রেখেছে, কিন্তু আফ্রিদি নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে একটা অপদার্থ নিকম্মা , সে সুহানাকে বাঁচাতে তো পারেইনি, উল্টো তাকে অবিশ্বাস করেছে।

রাগের মাথায় আফ্রিদি টেবিল ল্যাম্পে সজোরে ঘুষি মারল। ল্যাম্পটা ভেঙে কাঁচের টুকরো তার হাতে ঢুকে গেল। তুহিনা ভয় পেয়ে আর্তনাদ করে আফ্রিদির কাছে এগিয়ে গেল।

আফ্রিদি চিৎকার করে উঠল, "কেন এমন করলে? ওর টাকা নিয়ে তোমার বাবা কী করবে, শুনি? তুমি সব জেনেও ওকে আগে থেকে কেন সতর্ক করোনি? নিজের স্বার্থের জন্য তুমি এত বড় ঘটনাটা ঘটিয়ে দিলে!"

তুহিনা রেগে গেলো এবার কেউ তাকে বিশ্বাস করছে না সে তো বলছে উচ্ছে করে করেনি রাগের বশে বলল, "হ্যাঁ, করেছি! তোমাকে পাওয়ার জন্য করেছি। মা-বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে তোমাকে পেতে চাইছিলাম না তাই করেছি আমার মাথা কাজ করেনি তখন, আর কোনো পথ আমার জানা ছিল না...।"

আফ্রিদি তীব্র ঘৃণার সাথে বলল --"তাহলে এখন কীভাবে রাজি হলেন তোমার বাবা? তিনি এতটাই লোভী যে টাকার মুখ দেখেই অমনি সব মেনে নিলেন? আর কী কী পরিকল্পনা আছে তাঁর? ওই মেয়েটার সাথে তিনি আর কী কী করতে চান, সব বলো!"

তুহিনা বড্ড করুণ চোখে আফ্রিদির দিকে তাকাল। আফ্রিদি তাকে অবিশ্বাস করছে, এটা সে সইতে পারছিল না। তখন সে বুঝতে পারেনি; তার বাবা তাকে এমনভাবে বুঝিয়েছিলেন যে বোকা মেয়েটি সেটাই বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু তার মনে একটা খটকা জাগল—বাবা যদি টাকাই ভালোবাসবেন, তবে আগে আফ্রিদিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কেন? আফ্রিদির তো টাকার অভাব ছিল না।

আফ্রিদি আবার গর্জে উঠল, "এত বড় একটা সত্যি আমার কাছে লুকিয়ে রাখলে তোতাপাখি? আমার অধিকার থেকে আমাকেই বঞ্চিত করলে তুমি?"

তুহিনা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ল, "আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করো, সেই সুযোগটাই পাইনি।"

আফ্রিদি এবার তুহিনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল শান্ত হয়ে। শাড়ির আঁচল সরিয়ে পেটের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। এক অদ্ভুত ভালো লাগায় বুক কাঁপছে, আবার কিছু হারানোর ভয়ে ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। বাবা হওয়ার এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এই সত্যিটাকে সে অস্বীকার করতে পারবে না। নিজের সন্তানের জন্য সে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। কেউ যদি তার অনাগত সন্তানকে নিয়ে একটা কটু কথা বলে, তবে সে তার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলবে সে।

আফ্রিদি তুহিনার পেটে মুখ গুঁজে দিল। তুহিনা শক্ত করে আফ্রিদির মাথা চেপে ধরল। আফ্রিদি নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে, আর তুহিনার কান্নার শব্দ ঘরের বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছিল।

আফ্রিদির মনে পড়ে গেল তুহিনার সাথে কাটানো সেই শেষ দিনটির কথা। তুহিনাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে সে জাহিরের সাথে সব কাজ গুছিয়ে নিজের ঘরে ফিরেছিল। কিন্তু মন কিছুতেই মানছিল না; এক অস্থিরতা কাজ করছিল তার ভেতরে।

কাউকে কিছু না জানিয়েই সে গাড়ি নিয়ে তুহিনাদের বাড়ির দিকে রওনা হলো। সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আফ্রিদি পাঁচিল টপকে তুহিনার রুমের সামনে এলো আকতলা বাড়ি, তুহিনা গ্রাউন্ড ফ্লোরেই থাকে সে তার রুমের সামনে এলো, তুহিনার জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতর থেকে জানালা লক করা দেখে সে তুহিনাকে ফোন করল। তুহিনা তখন গভীর ঘুমে। বাইরের আবহাওয়া ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা, কিন্তু প্রেমের টানে সে চোর সেজে প্রেমিকার সাথে দেখা করতে এসেছে—এই রোমাঞ্চকর অনুভূতি তার বেশ ভালোই লাগছিল। বারবার কল করার পর তুহিনার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ শোনা গেল— "হ্যালো..."

আফ্রিদি হেসে ফিসফিস করে বলল, "ওঠো পাখি, আমি তোমার জানালার বাইরে। প্লিজ খোলো, বাইরে ভীষণ ঠান্ডা"

তুহিনা ধড়ফড় করে উঠে বসল, তার ঘুম এক নিমেষেই ছুটে গেল। সে জানালার দিকে তাকাতেই দেখল আফ্রিদি হাত নাড়িয়ে ‘হাই’ বলছে। তুহিনা দ্রুত জানালা খুলে দিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "এখানে কেন এসেছ তুমি তাও আবার এই সময়?"

"ভেতরে আসতে দেবে না?" আফ্রিদির কথায় তুহিনার খেয়াল হলো সে সরে দাঁড়াতেই সে লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকল এবং জানালাটা আটকে দিল। তুহিনা হালকা গোলাপি রঙের একটা ঢিলেঢালা পোশাক পরে ছিল, সেই সাধারণ সাজেও তাকে অপূর্ব লাগছিল।

"কী হয়েছে? এখন কেন এলে?" তুহিনার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আফ্রিদি তাকে কোমরে জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। তুহিনা স্তব্ধ হয়ে রইল।

জানালার বাইরে ঝোড়ো হাওয়া বইছিল, কিন্তু ঘরের ভেতরটা তখন একদম শান্ত। আফ্রিদি তুহিনাকে নিজের একদম কাছে টেনে নিল, তুহিনা থমকে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে ঢিপঢিপ করছিল। তুহিনার হালকা গোলাপি রঙের পাতলা পোশাকটি রাতের মৃদু আলোয় তাকে যেন এক মায়াবী অপ্সরার মতো করে তুলেছিল।

আফ্রিদি তুহিনার কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “তোমাকে না দেখে থাকতে পারছিলাম না তোতাপাখি, এই ঠান্ডায় রাতে তোমায়ে প্রয়োজন এটা আমি উপেক্ষা করতে পারিনি।“

তুহিনা কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল, “যদি কেউ দেখে ফেলত? পাগল হয়েছ তুমি?”

আফ্রিদি হালকা হেসে তুহিনার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস তুহিনার শরীরে এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তুহিনা চোখ বুজে আফ্রিদির শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল। আফ্রিদি আলতো করে তুহিনার চিবুক ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। দুজনের চোখের ভাষা তখন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। বাইরের পৃথিবীর সব ভয়, সব নিয়ম তখন তাদের কাছে তুচ্ছ।

তুহিনার হুস এলো আফ্রিদি কে সরিয়ে দিলো নিজের থেকে, আফ্রিদি আবারও নিজের কাছে টেনে নিলো তুহিনা কে জানালার পর্দা টেনে দিল আলো কমে এলো আস্তে আস্তে।

আফ্রিদি ধীরলয়ে তুহিনার কপালে, তারপর দুই চোখে গভীর ভালোবাসায় চুমু খেল। তুহিনা নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে আফ্রিদির এই সান্নিধ্য অনুভব করছিল। একসময় আফ্রিদির ঠোঁট তুহিনার ঠোঁটকে ছুঁয়ে নিল—এক নিবিড় ও দীর্ঘ চুম্বনে লিপ্ত হলো।

আজ আফ্রিদির অন্য রূপ উন্মোচন হলো তুহিনার সামনে, সে জানে আফ্রিদি লাজুক প্রকৃতির কিন্তু আজকে তার ধারণা কে সম্পূর্ণ ভুল করে দিলো আফ্রিদি। আফ্রিদির প্রতিটি স্পর্শে আজ এক অদ্ভুত পাগলামি ছিল। তুহিনা যখন তাকে আলতো করে সরিয়ে দিতে চাইল, আফ্রিদি যেন আরও অবাধ্য হয়ে উঠল। তার দুচোখে আজ কোনো দ্বিধা নেই, আছে শুধু তুহিনাকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার এক প্রবল তৃষ্ণা। কবে আবার তাদের দেখা হবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ সব নিয়ম , জড়তাকে দূরে সরিয়ে সে শুধু নিজের মনের কথা শুনতে চাইল।

আফ্রিদি ধীরলয়ে নিজের জ্যাকেটটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলল। একবার নিশ্চিত হয়ে নিল ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে ঠিকমতো বন্ধ আছে কি না। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে ঘরের ভেতর তখন কেবল দুজনের উত্তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল।

আফ্রিদি হুট করেই তুহিনাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তুহিনা অপ্রস্তুত হয়ে আফ্রিদির গলা জড়িয়ে ধরল। ভয়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল। সে শুধু ফিসফিস করে বলল, "আফ্রিদি... এটি সঠিক সময় নয়, কেউ দেখলে আমাদের…?"

আফ্রিদি কোনো উত্তর দিল না। সে তুহিনাকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল আস্তে করে। তুহিনার পিঠ বিছানার চাদর ছুঁতেই এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল তার শরীরে। আফ্রিদি তার ওপর ঝুঁকে পড়ে তুহিনার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল। বিছানার নরম আলোয় তুহিনার চোখের মণি দুটো তখন চকচক করছিল।

আফ্রিদি তুহিনার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত কণ্ঠে বলল, "আজ আর কেউ নেই তোতাপাখি, শুধু আমি শুধু তুমি । বিলিভ মে লাভ , আমি তোমাকে কোনোদিন হারিয়ে যেতে দেব না, নেভার লিভ ইউ।"

আফ্রিদির গভীর আশ্বাস আর ভালোবাসার তাপে তুহিনার সব ভয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। সে নিজেকে সঁপে দিল আফ্রিদির কাছে। আফ্রিদি পরম আবেশে তুহিনার গলায় আর কাঁধে নিজের ঠোঁটের ছোঁয়া দিতে লাগল। তুহিনা চোখ বুজে অনুভব করছিল সেই মুহূর্তের মাদকতা। সেই রাতে সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল। অন্ধকার ঘরের নির্জনে দুটি প্রাণ একে অপরের শরীরের ও মনের ঘ্রাণে মিশে গিয়ে এক নতুন ইতিহাস লিখল। তুহিনা আর আফ্রিদি সেই মিলনের গভীরতায় জীবনের সবচাইতে সুন্দর অনুভূতিটা খুঁজে পেল।

পুরোনো সেই স্মৃতি মনে পড়তেই আফ্রিদির ভেতরে সেই আগের মতো শিহরণ জেগে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই বর্তমান পরিস্থিতির কথা মনে আসতেই বুকটা ভারী হয়ে গেল। সুহানার কথা ভেবে তার মনটা বিষাদে ভরে উঠল—মেয়েটা তাদের জন্য অনেক করেছে, সুহানা আর জাহির মিলে যেন তাদের ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আফ্রিদি উঠে বসল এবং তুহিনাকে বিছানায় বসাল। দুজনের চোখই লাল হয়ে আছে। তুহিনা ইচ্ছে করে এমনটা করেনি; তাকে পাওয়ার লোভ দেখিয়ে এই কাজটা করানো হয়েছে। সুহানা কষ্ট পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু যা হয়ে গেছে তা তো আর পাল্টানো সম্ভব নয়। জাহির সব জেনেও কেন তাকে বলেনি, সেটা আফ্রিদিকে জানতে হবে। ইনশাআল্লাহ, সময় হলে সব হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেবে সে।

তুহিনা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, "আমি সুহানার সাথে এমনটা করতে চাইনি। ফিনা সবটা জানে না, আমি ওকে বলিনি। বিশ্বাস করো, আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। আমাকে বলা হয়েছিল যে..."

আফ্রিদি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "চুপ করো, আর এসব ভেবো না। আই এম সরি… আমি ওই সময়টায় তোমার কাছে ছিলাম না, এখন বোকেছি তার জন্য ডাবল সরি। সুহানা এখন অসুস্থ। যে এতটা ভালোবাসতে পারে, সে ক্ষমাও করতে পারবে। সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ"

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে একসময় ডাক্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। জাহির উৎকণ্ঠা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে? সুহু কেমন আছে?"

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, "ওঁর কি কোনো ওষুধের কোর্স চলছিল?"

জাহির মাথা নেড়ে সায় দিলে ফিনা দ্রুত গিয়ে প্রেসক্রিপশন আর ওষুধের বক্স নিয়ে এল। ডাক্তার সবকিছু খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন। বর্তমানে সুহানা যে ওষুধগুলো খাচ্ছে সেগুলো বেশ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় তিনি নতুন কোনো ওষুধ দিলেন না। আগের আঘাতের জন্য যে চিকিৎসা চলছিল, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কয়েকটা রেখে বাকিগুলো বন্ধ করার পরামর্শ দিলেন। ছুরির ক্ষতটা সেলাই না করে ব্যান্ডেজ আর পেস্টিং করে দেওয়া হলো।

ফিনা ঘরে ঢুকে দেখল সুহানা নিস্তেজ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। সে এক পা এগোতে চাইল, কিন্তু তীব্র অপরাধবোধে তার পা যেন আটকে গেল; কিছুতেই সে আর সামনে এগোতে পারল না। ওর মনে ভয় হচ্ছিল—কাছে গেলে যদি সুহানা রেগে যায়? ফিনা মুখে হাত দিয়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। সাবেরা বেগম ফিনাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন; বাড়ির সবার মনে আজ এত দুঃখ কেন, তা কেউ জানে না।

ফিনা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে ভেবে জাহিরের নির্দেশে মিহু তাকে রুম থেকে নিয়ে গেল। বাইরে বেরোনোর সময় জাহিরের সাথে দেখা হলেও কেউ কোনো কথা বলল না। বাড়ির সবাই একে একে এসে বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে সুহানাকে দেখে গেল। জাহাঙ্গীর সাহেব আসতেই জাহির তার দিকে তাকাল। নিজের ছেলেকে দেখে জাহাঙ্গীর সাহেবের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল; জাহিরকে তিনি কোনোদিন এমন থমকে যেতে দেখেননি। চঞ্চল আর হাসিখুশি ছেলেটাকে আজ মনে হয় প্রথমবার কিছু হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে যেতে দেখলেন।

জাহির সরে দাঁড়াল। জাহাঙ্গীর সাহেব দূর থেকে সুহানাকে দেখলেন—নাকের মধ্যে পাইপ দেওয়া, হাতে চ্যানেল করে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, মুখের কাটা জায়গায় লালচে ওষুধ লাগানো। যন্ত্রণায় মেয়েটার মুখখানা আরও ছোট হয়ে গেছে। তিনি শুনলেন সকাল থেকে মেয়েটা দানাপানি কিছুই মুখে দেয়নি। -- “আমায় ক্ষমা করে দিও মা, আমার যে জানা ছিল না। তুমি তো কিছুই জানো না; একসময় তোমাকে সবটা বলব আমি। আমি কে, সেটা তোমার জানা খুব দরকার। মনে যে ভুল ধারণা পুষে রেখেছ, তা দূর করতে হবে।” নিজের মনের কথাগুলো তিনি নিজের ভেতরেই চেপে রাখলেন।

জাহির গত তিন ঘণ্টা ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে যাওয়ার সাহস কিছুতেই সঞ্চয় করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত রামিম নিরুপায় হয়ে আফ্রিদিকে ডেকে পাঠাল। আফ্রিদির দরজার টোকা দিলো আফ্রিদি তুহিনাকে শুইয়ে দিয়ে দরজা খুলে বাইরে এল।

রামিম নিচু স্বরে বলল, "দাদাভাই, বড়দা এখনো সেই ভেজা জামাকাপড় পরেই দাঁড়িয়ে আছে, ফ্রেশ হতে যাচ্ছে না। গায়ের ভিজে জামা শুকিয়ে গায়ের সাথেই সেঁটে গেছে, বড়মার কথাও শুনছে না। তুমি চলো না..."

আফ্রিদি দূর থেকে জাহিরের দিকে তাকাল; দেখল সে একদৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আফ্রিদি পা বাড়াল, "চল।"

তুহিনা কান্নাকাটি করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে। আফ্রিদি ভেতরে গিয়ে নিজের পাঞ্জাবিটা বদলে একটা টি-শার্ট পরে রামিমকে নিয়ে বেরিয়ে এল। আফ্রিদি কাছে যেতেই জাহির তার দিকে তাকাল। জাহিরের চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে; তাতে কোনো জল নেই, আছে শুধু এক বুক আক্ষেপ।

আফ্রিদি শান্ত গলায় বলল, "ভেতরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়।"

জাহির কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল।আফ্রিদি জাহিরকে জড়িয়ে ধরল। জাহির তখনো পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, একসময় সে নিজের মাথাটা আফ্রিদির কাঁধে এলিয়ে দিল। বড় ভাইয়ের এমন ভেঙে পড়া অবস্থা দেখে রামিমের খুব কষ্ট লাগল। সামির আর বাকিরাও সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, কেউ নিজের জায়গা থেকে নড়েনি।

আফ্রিদি বন্ধুর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, "ভয় লাগছে?"

সে ধীরে ধীরে রুমের দরজাটা একটু ফাঁক করল। ভেতরে বিছানায় শুয়ে থাকা দেহটার ওপর নজর পড়তেই জাহির থমকে গেল। সে সুহু-কে এভাবে দেখতে চায় না; তার কাছে সেই রাগী আর মেজাজি সুহানাই বেশি প্রিয়। এমন অসহায় সুহানাকে তার মোটেও সহ্য হচ্ছে না।

আফ্রিদি একরকম জোর করেই জাহিরকে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিল। এরপর রামিম, সামির, সাদাদ, তাসফিন, তিতাস আর তাসিন—সবাই রুমে ঢুকে সুহানাকে গোল করে ঘিরে ধরল। বয়সের হিসাবে সুহানা তিতাস আর তাসিনের চেয়ে বড় হলেও বাকি সবার চেয়ে ছোট। নিজের চেয়ে ছোট একটা মেয়ে তাদের বড়দার বউ অর্থাৎ 'বৌমনি', এটা ভাবতেই তাদের লজ্জা লাগছিল। তবে বড়দা যদি কোনোভাবে তাদের মনের এই ভাবনা টের পায়, তবে নির্ঘাত বাগানে ল্যাংটো করে ঝুলিয়ে রাখবে! এই ভয়ংকর চিন্তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তারা আফ্রিদিকে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাত ৯টা বেজে পার হয়েগেছে, সারাদিনের ধকল তারা আর নিতে পারছিল না।

সবাই চলে যাওয়ার পর আফ্রিদি সুহানার মাথার কাছে বসল এবং পরম স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

আফ্রিদি সুহানার মাথার কাছে বসে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "তোর বর কি কম ছিল যে এখন তুইও যোগ দিয়েছিস বোঝা বাড়াতে? আর কত কী করবি তোরা আমাদের জন্য? তোদের এই ঋণ মরার পরেও শোধ করতে পারব না। তোর ওই হারামি বরটা সারাজীবন আমাকে খোটা দেবে, তুইও কি ওর মতোই চাস? না না, তুই ওর মতো পচা নোস, তুই তো আমার হতে হতে না হওয়া বুনু আম্মু বেঁচে থাকলে হয়তো তুইই আমার বোন..." কথাগুলো বলতে বলতে আফ্রিদির গলা ধরে এল, সে ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করল।

ততক্ষণে জাহির গোসল সেরে হাফ প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। আফ্রিদি উঠে দাঁড়িয়ে জাহিরের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, "শোন, ও এখন খুব অসুস্থ। জানি আজ তোর বাসর রাত, কিন্তু দয়া করে ওর ওপর কোনো জোর করিস না..."

কথাটা শুনেই জাহির রেগে গিয়ে পেছন থেকে আফ্রিদির গলা চিপে ধরল, "তোর কি আমাকে এতটাই খারাপ মনে হয় যে একটা অজ্ঞান মানুষের সাথে ছি?"

আফ্রিদি কোনোমতে ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বলে উঠল, "হ্যাঁ, তার চেয়েও বেশি! বিয়ের আগেই ছাড়িসনি, আর এখন তো তুই সার্টিফায়েড! তুই একটা আস্ত নষ্ট ব্যাটাছেলে, আমি বলব তোর বুক্’স কালেক....."

আফ্রিদির কথা শেষ হওয়ার আগেই জাহির ওর মুখ বরাবর একটা পাঞ্চ মারল। আফ্রিদি তাল সামলাতে না পেরে নিচে ছিটকে পড়ল। আসলে জাহিরের গুমোট মেজাজটা হালকা করার জন্যই আফ্রিদি একটু মজা করতে চেয়েছিল, কিন্তু জাহির তাকে একেবারে বেঁকে গিয়েছে, নিচে পড়ে গিয়ে আফ্রিদি কঁকিয়ে উঠল, "আহ্! লেগেছে রে শালা!"

জাহির আফ্রিদির কলার ধরে তাকে টেনে তুলল এবং ফিসফিস করে বলল, "তুই তো নিজেই আগে বাসর সেরে ফেলেছিস, তুই আবার জ্ঞান দিচ্ছিস?"

আফ্রিদি অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "সরি সরি ভাই, এবার সিরিয়াসলি লেগেছে আমার, ভাল্লুকের মতো বড়ো বড়ো হাত তোর উফফ শালা" জাহির খেয়াল করল আফ্রিদির মুখের ডানপাশে লাল দাগ পড়ে গেছে, তাই সে থেমে গেল। আফ্রিদি তখন হঠাৎ করে জাহিরকে জড়িয়ে ধরে বলল, "থ্যাংক ইউ..."

জাহির বুঝতে পারল আফ্রিদি কোন কৃতজ্ঞতার কথা বলছে, মুহূর্তেই সে শান্ত হয়ে গেল। আফ্রিদি তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, "ওর খেয়াল রাখিস।"

আফ্রিদি রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই জাহির দরজাটা লক করে দিল। তার বুকটা তখনো কাঁপছে। সে জানত, সুহানাকে কোনো বাহানা দিয়ে সে বাঁচাতে পারত, কিন্তু সুহানাকে পাওয়ার তীব্র লোভ তাকে পেয়ে বসেছিল। সুহানা কোনোদিন স্বেচ্ছায় তাকে মেনে নিত না, বিয়ে তো বহুদূর। তাই আজকের এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সে সুহানাকে বিয়ে করে নিয়েছে। সুহানাকে সে এখন নিজের নামে চিরস্থায়ীভাবে লিখে নিয়েছে; চাইলেও সুহানা আর তার থেকে দূরে যেতে পারবে না।

চলবে….

(গল্পের সমস্ত চরিত্র,কাল সবই কাল্পনিক সকলে সেই ভাবেই নেবেন, লেখার মাঝে কোনো বানান ভুল থাকলে মাফ করবেন)

#প্রেমের_আলোড়ন

#md_suhan_joy

#midnight_tales_by_joy

Thank You🍀

(Don’t copy without permission)

Enjoy your reading 🎀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন